📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইসলামের প্রথম গেরিলা যোদ্ধা: আবু বাসীর ؓ

📄 ইসলামের প্রথম গেরিলা যোদ্ধা: আবু বাসীর ؓ


মুসলিমরা মদীনায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরের ঘটনা। আবু বাসীর উতবাহ ইবন উসাইদ নামের এক মুসলিম লোক মক্কা থেকে মদীনায় পালিয়ে চলে এলেন। তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনতে দুই মুশরিক মদীনায় এল। এদের একজন বনু আমীর গোত্রের, আরেকজন ছিল আযাদকৃত দাস। তারা দাবি করলো আবু বাসীরকে যেন তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কেননা হুদাইবিয়ার সন্ধি মতে মক্কা থেকে কেউ মদীনায় আসলে তাকে মক্কার হাতে হস্তান্তর করতে আল্লাহর রাসূল বাধ্য থাকবেন।

নবীজি আবু বাসীরকে ডেকে বললেন, 'তোমাকে ফিরে যেতে হবে।'

আবু বাসীর বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাকে মুশরিকদের মাঝে ফিরিয়ে দিচ্ছেন! এদের মাঝে থাকলে তো আমি দ্বীন নিয়ে ফিতনায় পড়ে যাবো!'

একজন মুসলিমকে কাফিরদের হাতে এভাবে তুলে দেওয়ার চাইতে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ইসলামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতারণা করা ইসলামে বৈধ নয়। নবীজি আবু বাসীরকে তাই বললেন, 'দেখো, এই লোকগুলোর সাথে আমরা চুক্তিবদ্ধ। আমাদের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতা শোভা পায় না। তুমি ফিরে যাও, নিশ্চয়ই তুমি এবং তোমার মতো যারা আছে -- আল্লাহ তোমাদের জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।'

নবীজি কাফিরদের হয়ে কাজ করছিলেন না। কিংবা তাদেরকে খুশি করার জন্য মুসলিমদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন না। শুধুমাত্র একটি কারণে তিনি আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন, তা হলো চুক্তি রক্ষা করা। আর আল্লাহর তরফ থেকে ওয়াদা পাওয়ার পরেই এমন একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতেই হবে, সে চুক্তি মুসলিমদের সাথে হোক বা কাফিরদের সাথে হোক।

আবু বাসীরকে কুরাইশদের সেই দুই ব্যক্তির সাথে ফিরে যেতে হলো। মক্কায় যাওয়ার পথে যুল হুলাইফা নামক স্থানে জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে যুহরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। আবু বাসীর সালাত আদায় করলেন। এরপর কিছু খেজুর নিয়ে বাকি দু'জনের সাথে একসাথে খেতে বসে গল্পগুজব করতে লাগলেন। কথাপ্রসঙ্গে আবু বাসীর জিজ্ঞেস করলেন,
- 'বনু আমীরের ভাই, তোমার তলোয়ারটা তো বেশ!'
'হ্যাঁ! আসলেই তাই!' নিজের তরবারির প্রশংসা পেয়ে লোকটাও বেশ গদগদ হয়ে উত্তর দিলো।
- আমাকে একটু দাও তো, আমি একটু পরখ করে দেখি!

আবু বাসীরের হাতে তরবারি আসামাত্র মুহূর্তের মাঝে বনু আমীরের লোকটির লাশ পড়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে দ্বিতীয় ব্যক্তি আতঙ্কে দিল ভোঁ দৌড়। একেবারে জান হাতে নিয়ে পালানো যাকে বলে! দৌড়াতে দৌড়াতে নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়। এক দৌড়ে সে মদীনায় চলে এল। তাকে ওভাবে দৌড়াতে দেখেই রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন মারাত্মক কিছু ঘটেছে। সে রাসূলুল্লাহকে জানালো, 'আমার সাথীকে ঐ লোক হত্যা করেছে! সে পেলে আমাকেও মেরে ফেলবে!'

ততক্ষণে আবু বাসীরও তরবারি হাতে মদীনায় ঢুকলেন। নবীজিকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন, আমাকে ওদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।'

নবীজি বললেন, 'ওয়াইলুই উম্মিহি! সাথে আর কয়জন লোক থাকলে তো এই ছেলে রীতিমতো যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারতো!'

কথাটা ছিল প্রশংসাসূচক। আবু বাসীর ছিলেন একজন টগবগে যুবক, সাথে কিছু লোকবল থাকলে তিনি একাই কুরাইশদের নাস্তানাবুদ করার ক্ষমতা রাখেন, রাসূলুল্লাহ এটাই ইঙ্গিত করেছিলেন। কিন্তু চুক্তিমতে তিনি আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। এই কথা শুনে আবু বাসীর মদীনা ছেড়ে চলে গেলেন। কারণ কুরাইশদের কেউ তাকে ফেরত চাইলে নবীজি আবারো তাকে কাফিরদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন। তাই তিনি চলে গেলেন সাইফুল বাহরে।

আবু বাসীর নবীজির কাছে বনু আমীরের লোকটির জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু নবীজি সেগুলো নিতে রাজি হননি, কারণ সেক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করা হয়ে যায়। যা-ই হোক, সাইফুল বাহরে আবু বাসীরের নতুন জীবন শুরু হলো। সমুদ্রতীরে তিনি একাকী দিন কাটাতে লাগলেন, কোনো সঙ্গীসাথী নেই। ওদিকে কুরাইশরা হন্যে হয়ে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সম্বল বলতে তার কাছে ছিল কয়েকটা খেজুর। খেজুর শেষ হয়ে গেলে সমুদ্রতীরে ভেসে ওঠা মাছ খেয়ে সারাদিন পার করে দিতেন। এভাবে কিছুদিন কেটে গেল।

এত বড় খবর তো চাপা থাকে না। আবু বাসীরের ঘটনা মক্কায় জানাজানি হয়ে গেল। আবু জান্দালের কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো মক্কা থেকে পালিয়ে গেলেন। এবার গিয়ে আবু বাসীরের সাথে যোগ দিলেন। জুলুমের শিকার মক্কার আরও কিছু মুসলিমও আবু বাসীরের সাথে যোগ দিলেন এবং শুরু করলেন একের পর এক গেরিলা অপারেশন। এভাবেই আবু বাসীরের নেতৃত্বে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গেরিলা আক্রমণ শুরু হয়। আজ পর্যন্ত আবু বাসীরের নাম মুসলিমরা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে।

আবু বাসীর আর তাঁর সঙ্গীরা মিলে কুরাইশদের অতর্কিতে হামলা করা শুরু করলেন। তারা অবস্থান করছিলেন 'ঈস' নামক স্থানে। জায়গাটা ছিল কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক রুটের একেবারে কাছেই। তারা সেখানে ওঁৎ পেতে থাকতেন আর কুরাইশদের কোনো কাফেলাকে অতিক্রম করতে দেখলে সেটাকে আক্রমণ করে কাফেলার সবাইকে হত্যা করে কাফেলার সম্পদ লুট করতেন। কুরাইশদের জীবন রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে গেল। এই অপারেশনগুলোর কথা দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়াতে লাগলো আর অনেক মুসলিম সেই গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে শুরু করল। এভাবে প্রায় সত্তর জনের একটি দল কুরাইশদের পর্যুদস্ত করে দিল।

রাসূলুল্লাহ সবকিছুই জানতেন কিন্তু তিনি কিছুই বলছিলেন না। তিনি এসবের সাথে জড়িত ছিলেন না, কিন্তু তিনি এসব ঘটনার প্রতি 'তীব্র নিন্দা'ও জ্ঞাপন করেননি। চুক্তির কারণে আবু বাসীরকে তিনি মদীনায় আশ্রয় দেননি, আবার তাকে থামানোরও কোনো চেষ্টা করেননি। রাসূলুল্লাহ কেবল দায়িত্বশীল ছিলেন মদীনার অভ্যন্তরে মুসলিম নাগরিকদের ব্যাপারে। মক্কার মুসলিমরা মদীনার বাইরে সমুদ্রতীরে কী করছে -- সেসবের ব্যাপারে তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল না। তাই নবীজি এসব থামানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নিলেন না।

বনু আমীরের লোকটির হত্যার খবর যখন মক্কায় পৌঁছলো তখন সুহাইল ইবন আমর খুব দুঃখ পেলেন। কারণ সেই লোকটি ছিল তার গোত্রের লোক। কাবাঘরে পিঠ ঠেকিয়ে সুহাইল মরিয়া হয়ে বলতে লাগলো, 'এই লোকের রক্তপণ আদায় করার আগ পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হচ্ছি না, ঠিক এইভাবে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো! মুহাম্মাদকে এই টাকা দিতেই হবে!' আবু সুফিয়ান বলে উঠলো, 'পুরোই পাগলামি! মুহাম্মাদ এই টাকা কেন দিতে যাবে? সে তার কাজ করেছে। সে তো আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিয়েছেই।'

যারা রাসূলুল্লাহর কাছে চিঠি লিখে তাকে মদীনায় পাঠিয়েছিল, তারাও এই মৃত্যুর ব্যাপারে দায়দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালো। এভাবে বনু আমীরের সেই লোকের রক্তপণ হারিয়ে গেল। সুহাইল ইবন আমর তার বংশের লোকের মৃত্যুর বিনিময়ে কোনো টাকাই পেলেন না। আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তাআলার কদর অনুযায়ী সবকিছুই মুসলিমদের পক্ষে কাজ করছিল।

আবু বাসীরের গেরিলা আক্রমণে কুরাইশদের নাকানি-চুবানি খেয়ে দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যখন হুদাইবিয়ার সন্ধি করা হলো, কুরাইশরা ভেবেছিল যেন তাদেরই বিজয় হচ্ছে। কোনো মুসলিম মক্কা থেকে পালিয়ে আসলে তাকে মদীনায় ফিরিয়ে দেওয়া -- চুক্তির এই ধারার জন্য তারাই চাপাচাপি করেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। কয়েক বছর মুসলিমদের সাথে টানা যুদ্ধের পর হুদাইবিয়ার সন্ধি কেবলই তাদের একটু দম নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর আগ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর বাহিনীর ক্রমাগত হামলায় তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। শান্তিচুক্তি করার পর তারা ভেবেছিল তারা আবার ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করতে পারবে। কিন্তু তারা ভাবতেই পারেনি আবু বাসীরের কারণে তাদের এভাবে নাস্তানাবুদ হতে হবে। এই পরিস্থিতির কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা নবীজির শরণাপন্ন হলো।

আল্লাহ এভাবেই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন। যে শর্ত ছাড়া কুরাইশরা সন্ধি করতেই রাজি হচ্ছিল না, সেগুলোই বদলাবার জন্যে তারা এবার নবীজিকে চিঠি পাঠিয়ে মিনতি করতে লাগলো। সে চিঠির ভাষা ছিল অনেকটা এমন,
'আপনার ও আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই লাগে, দয়া করে এই লোকদেরকে ডেকে আপনি মদীনায় স্থান দিন।'

রাসূলুল্লাহ তাদের অনুরোধ রাখলেন। তিনি চিঠি পাঠিয়ে আবু বাসীর এবং অন্যান্যদের মদীনায় চলে আসতে বললেন। রাসূলুল্লাহর চিঠি যখন আবু বাসীরের হাতে পৌঁছালো, তখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত। দ্বীন ইসলামের ছায়ার নিচে থাকার জন্য যার এত প্রয়াস, রাসূলের শহর মদীনায় ঢোকার জন্য যার এত আকুতি, সেই স্বপ্ন সত্য হতে হতেও যেন হলো না। তার এই ব্যাকুলতার সমস্ত প্রতিদান অপেক্ষা করে ছিল তার জান্নাতের বাড়িতে। যে আবু বাসীরের আক্রমণের সূত্র ধরে মক্কার নিপীড়িত মুসলিমরা মদীনায় আসার সুযোগ পেলেন, সেই আবু বাসীর আল্লাহর রাসূলের চিঠি বুকে চেপে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

টিকাঃ
৭৮. সীরাহ ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৮।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কুরআনের চোখে হুদাইবিয়ার সন্ধিঃ সূরা ফাতহ

📄 কুরআনের চোখে হুদাইবিয়ার সন্ধিঃ সূরা ফাতহ


সূরা ফাতহ অবতীর্ণ হয় হুদাইবিয়া সন্ধির সময়ে। এই সূরা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সে উদ্দেশ্যে এর কয়েকটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হলো।

মু'মিনদের অন্তরে প্রশান্তি
"নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ আপনাকে আগে পরের যাবতীয় ত্রুটি ক্ষমা করে দিতে পারেন, আপনার ওপর তাঁর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করতে পারেন, আর আপনাকে পরিচালিত করতে পারেন সহজ-সঠিক পথে।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১-২)

হুদাইবিয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নবীজিকে বিজয় দান করেছেন এবং এই বিজয়ের মুহূর্তেই আল্লাহ তাআলা নবীজির সমস্ত গুনাহ মুছে দিবেন। এর মানে কি নবীজি গুনাহের কাজ করেছেন? না, আসলে একজন রাসূলের পদমর্যাদা অনেক ওপরে, তাই তাদের ভুল বা দুর্বলতাগুলোকে এখানে গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, আক্ষরিক অর্থে গুনাহ বোঝানো হচ্ছে না। আর হিদায়াহ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে দিক-নির্দেশনা। রাসূলুল্লাহ আগেই হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিলেন, এখানে বলা হচ্ছে, পরবর্তীতে তাঁর কাছে শরীয়াহর আরও আইন অবতীর্ণ হবে, এটাই হলো হিদায়াহ বা সরল পথ প্রদর্শন।

"এবং যেন আল্লাহ আপনাকে দান করেন মহা-বিজয়। তিনিই সেই সত্তা যিনি মু'মিনদের অন্তরে প্রশান্তি ঢেলে দেন, যাতে তাদের (বর্তমান) ঈমানের সাথে সাথে ঈমান আরও বেড়ে যায়। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ৩-৪)

হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল মুসলিমদের জন্য রহমত-স্বরূপ। এই সন্ধির সূত্র ধরে পরবর্তীতে মক্কা বিজয় সহ মুসলিমদের যতগুলো বিজয় অর্জিত হয়েছে, তাকেই এখানে 'মহাবিজয়' বলা হচ্ছে। মুসলিমরা এসেছিল উমরা করার আশায়। কিন্তু তাদের মক্কায় ঢুকতেই দেওয়া হলো না। ঘটনাচক্রে মুসলিমরা মৃত্যুর শপথ করলো -- হয় লড়বো নাহয় মরবো। পরিস্থিতি বার বার নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। একের পর এক অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা সাহাবিরা নিশ্চয়ই চাননি। আল্লাহ তাই বলছেন, অন্তরের এই অনিশ্চিত ও অশান্ত অবস্থানকে তিনি সুকুন বা প্রশান্তি দিয়ে মুছে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার বিজয়ের ওয়াদা তাদের অন্তরকে শান্ত করে দেয়।

এরপর আল্লাহ তাআলা মু'মিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলির সমস্ত শক্তির মালিক তিনিই। তাঁর ইচ্ছাতে নিতান্ত তুচ্ছ বস্তুও আল্লাহর সৈনিকে পরিণত হতে পারে। বদরের যুদ্ধে বৃষ্টি আর ফেরেশতারা ছিল আল্লাহর সৈনিক, খন্দকের যুদ্ধে বাতাস ছিল আল্লাহর সৈনিক। আল্লাহর সৈনিক কে বা কারা, তা আমরা জানিনা, শুধু আল্লাহ তাআলাই জানেন।

সুসংবাদ মু'মিনাহদের জন্য
সূরা ফাতহের প্রথম আয়াত শুনে মুসলিমরা খুব খুশি হলো। তারা রাসূলুল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন, 'আর আমাদের জন্য কী আছে?' আল্লাহ তাআলা বললেন,

"যাতে তিনি ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে এবং যাতে তিনি তাদের গুনাহগুলো মুছে দেবেন। এটাই আল্লাহর কাছে মহাসাফল্য।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ৫)

এ আয়াতে মু'মিন পুরুষ এবং মু'মিন নারী উভয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন আসতে পারে নারীদের কথা কেন আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলো যেখানে সুলহুল হুদায়বিয়্যাতে কেবল পুরুষরা ছিল? পুরুষদের সাথে নারীরাও পুরস্কার পাবে কারণ যখন তাদের স্বামী যুদ্ধে গেছে, আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে-- তখন তারা সবর করেছে, পরিবারকে আগলে রেখেছে। তাই মুসলিম নারীরাও পুরুষদের সাথে সাথে সর্বোচ্চ মর্যাদার অংশীদার হবে।

"আর যেন তিনি শাস্তি দিতে পারেন মুনাফিক পুরুষদের ও মুনাফিক নারীদের এবং মুশরিক পুরুষদের ও মুশরিক নারীদের--যারা আল্লাহ সম্বন্ধে খারাপ ধারণা ধারণ করে থাকে। তাদের পরিণাম মন্দ। তাদের ওপর আছে আল্লাহর ক্ষোভ। তিনি তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, আর তাদের জন্য তিনি জাহান্নাম তৈরি করে রেখেছেন। আর তা কতই না নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ৬)

এবার আল্লাহ তাআলা শত্রুদের পাওনা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এখানেও নারীদেরকে কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কেননা তারা ছিল পুরুষদের সহযোগী। তাই শাস্তির বেলায় পুরুষদের সাথে সাথে নারীদেরকেও এর ভাগ বহন করতে হবে।

সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা
"নিশ্চয়ই যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে (হে মুহাম্মাদ), তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; তাহলে এর ভয়াবহ পরিণাম তার নিজের ওপরই এসে পড়বে। যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ অচিরেই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।” (সূরা ফাত্হ, ৪৮: ১০)

আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের বলছেন- তোমরা রাসূলুল্লাহর কাছে নয়, বরং আল্লাহর কাছেই অঙ্গীকার দিয়েছো! নিশ্চয়ই এটা ছিল সেই চৌদ্দশো সাহাবির জন্য এক বড় মর্যাদা। এই সাহাবিদের কেউই সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেননি।

মুনাফিক চিহ্নিতকরণ
“বেদুইনদের মধ্যে যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল তারা শীঘ্রই আপনাকে বলবে--আমাদের ধনসম্পত্তি ও আমাদের পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা আমাদের মশগুল করে রেখেছিল, তাই আমাদের জন্য আপনি ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তারা তাদের জিহবা দিয়ে এমন সব কথা বলে যা তাদের অন্তরে নেই। আপনি বলুন, কে তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের জন্য কিছু করবার ক্ষমতা রাখে যদি তিনি তোমাদের অপকার করতে চান অথবা তোমাদের উপকার করতে চান? বস্তুত তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকেবহাল।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১১)

মরুবাসীদের অনেকেই কুরাইশদের শক্তিমত্তার ভয়ে হুদায়বিয়ায় যোগ দেয়নি। তারা ভাবছিল মুসলিমরা নির্ঘাৎ তাদের হাতে মারা পড়বে। তারা অজুহাত দেখিয়েছে তাদের পরিবার-পরিজন আর ধনসম্পদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তারা আসতে পারেনি। আল্লাহ তাদের এই অজুহাত গ্রহণ করেননি। পরিবার-পরিজন আর ধনসম্পদ বাকিদেরও ছিল, তারা এই অজুহাতে পেছনে পড়ে থাকেননি। পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরির অজুহাতে জিহাদ থেকে মাফ পাওয়া যাবে না。

“না, বরং তোমরা মনে করেছিলে, রাসূল ও মু'মিনগণ তাদের বাড়ি-ঘরে কিছুতেই ফিরে আসতে পারবে না। আর এই ধারণা তোমাদের কাছে খুবই সুখকর লাগছিল। তোমরা তাদের সম্পর্কে খুবই খারাপ ধারণা করেছিল, (আসলে) তোমরা হচ্ছো একটি নিশ্চিত ধ্বংসোন্মুখ জাতি!

আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস করে না, আমরা তো অবশ্যই সেসব কাফিরদের জন্য তৈরি করেছি জ্বলন্ত আগুন। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আর তিনি ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল, তারা বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সঙ্গে আসতে দাও। এভাবে তারা আল্লাহর ফরমানই বদলে দিতে চায়। বলুন, তোমরা কখনো আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না। আল্লাহ আগে থেকেই এরূপ বলে দিয়েছেন। তারা বলবে, বরং তোমরাই আমাদের ঈর্ষা করছো। না। বস্তুত তারা এসব বিষয়ের সামান্যই বোঝে।" (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮: ১২-১৫)

মুনাফিকরা হুদাইবিয়ার সময় যেতে চায়নি, কারণ তারা ধরেই নিয়েছিল মুসলিমরা পরাজিত হবে। যখন তারা আবিষ্কার করলো মুসলিমদের কিছুই হয়নি, উল্টো আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য গনিমতের সম্পদের ওয়াদা করেছেন, তখন তারা যুদ্ধে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠলো! এরা আসলে আল্লাহর রাস্তায় বের হতে চায়নি, তারা বের হতে চেয়েছে দুনিয়ার সন্ধানে। তাদের এই হঠকারী আচরণের শাস্তি স্বরূপ পরবর্তী যুদ্ধে অর্থাৎ খাইবারের সময় তাদের যুদ্ধে যোগ দিতে নিষেধ করা হয়।

তখন তারা বলাবলি করতে থাকে, 'তোমরা আমাদেরকে হিংসে করছো! তোমরা গনিমতের মাল সব নিজেরা ভোগ করতে চাও!' আল্লাহ তাআলা এদের ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন-- এদের বোধশক্তি নেই। দুনিয়া ছাড়া তারা আর কিছুই বোঝে না। সবকিছুকে কেবল টাকার অঙ্কে বিচার করে। দুনিয়াই তাদের সব, আল্লাহ বা আখিরাতের জন্য তাদের চিন্তা নেই। এটাই হচ্ছে সেকুলারিজম।

সন্ধির পেছনে হিকমাহ
"যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকতো, যাদের কথা তোমরা জানতে না, তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা যদি না থাকতো, অতঃপর সে কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা মক্কায় শক্তির সাথে প্রবেশের অনুমতি পেতে। কিন্তু তোমাদের হাতকে আল্লাহ বিরত রাখলেন যাতে তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাঁর করুণার মাঝে নিয়ে আসতে পারেন। তারা যদি আলাদা থাকতো (অর্থাৎ মক্কার মু'মিনরা যদি কাফিরদের থেকে আলাদা থাকতো), তাহলে আমি নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে শাস্তি দিতাম যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৫)

হুদাইবিয়ার সন্ধির ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যুদ্ধ বাধার অনুকূল পরিস্থিতি বারবারই তৈরি হয়েছে কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় সেটা হয়নি। আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন মক্কার মু'মিনরা যেন হেফাযতে থাকে। মুসলিম বাহিনী যদি যুদ্ধ করে মক্কায় প্রবেশ করতো, তাহলে মক্কার মুসলিম নারী-পুরুষ নিহত হতো। এজন্যই আল্লাহ তাআলা মুসলিম ও কাফির উভয় বাহিনীকেই যুদ্ধ থেকে বিরত রেখেছেন। আর যুদ্ধ না হওয়ার ফলে মক্কার বহু লোক ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পেল। মুসলিম হয়ে গেল। এ সবই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা এবং আল্লাহর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশ। যুদ্ধ করা যাবে না--এমন কোনো হুকুম আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ফয়সালা এসেছিল। মুসলিম বাহিনী যদি তাড়াহুড়ো করতো, তাহলে যুদ্ধ হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে সংযমের ওপর দাখিল রাখেন, আর এটাই মুসলিমদের জন্য পরবর্তীতে সুফল বয়ে আনে।

রাসূলুল্লাহর সত্য স্বপ্ন
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চান তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, নিরাপদে, মস্তকমুণ্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়, তখন তোমাদের মাঝে কারো প্রতি কোনো ভয় থাকবে না। তিনি জানেন যা তোমরা জানো না। এবং তিনি তোমাদের জন্য আয়োজন করেছেন একটি আসন্ন বিজয়।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৭)

আল্লাহ বলছেন হুদাইবিয়ার আগে যে স্বপ্ন তিনি নবীজিকে দেখিয়েছেন সেটা একদিন অবশ্যই সত্য হবে। সত্যিই তা-ই হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিরা হজ্জ করেছিলেন, যা ইতিহাসে 'বিদায় হজ্জ' নামে পরিচিত। সেদিন কারো মনে কোনো ভয় ছিল না।

সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, আপনি তাদেরকে রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবেন। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মতো, যে তার কচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সাহাবিদের কিছু গুণাবলির কথা বলেছেন।
১. তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর।
২. তারা নিজেদের মধ্যে অর্থাৎ মুসলিমদের প্রতি কোমল। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে এমন কিছু মুসলিম আছে যারা এই কুরআনের এই বিবরণ থেকে একশো আশি ডিগ্রি বিপরীত। তারা মুসলিমদের প্রতি শক্ত আর কাফিরদের প্রতি দরদে বিগলিত।
৩. তাদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সালাত। তারা আল্লাহর করুণার আশায় সালাত আদায় করবে।
৪. সিজদা তাদের চেহারায় চিহ্ন তৈরি করেছে। এখানে সিজদার ফলে কপালে যে কালো দাগ পড়ে, সেটার কথা বলা হচ্ছে না। এখানে বলা হচ্ছে সিজদার কারণে চেহারা দিয়ে যে নূর বের হয় তার কথা।
৫. মু'মিনদের মাঝে দৃঢ়তা থাকবে। তাদের উদাহরণ হচ্ছে একটি গভীর শেকড়যুক্ত মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের মতো। জীবনের বিপদ আপদ বা পরীক্ষা তাদের টলাতে পারে না। তাদের এই দৃঢ়তা কাফিরদের ক্ষোভের কারণ হবে। তারা হবে কাফিরদের চক্ষুশূল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px