📄 সমঝৌতার পথ
কুরাইশের লোকেরা শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে রাজি হলো। এদিকে উসমানও ততক্ষণে ফিরে এসেছেন। কুরাইশরা মুসলিমদের কাছে মুখপাত্র হিসেবে পাঠালো সুহাইল ইবন আমরকে। সুহাইল তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন একজন কুশলী কূটনীতিক। বাক্যবাগীশ, বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। সুহাইলের দায়িত্ব ছিল চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে মুসলিমদের সাথে বোঝাপড়া করা। সুহাইলকে দেখামাত্র নবীজি সাহাবিদের বলে উঠলেন, 'তোমাদের কাজ এবার সহজ হয়ে যাবে।'
রাসূলুল্লাহ এবং সুহাইল ইবন আমর বেশ খানিকক্ষণ ধরে সন্ধির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করলেন। তবে মুসলিমরা যাতে সে বছর মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে -- সে ব্যাপারে কাফিররা ছিল বদ্ধপরিকর। এই একটা জায়গাতে তারা কিছুতেই ছাড় দেবে না। তারা এটা মানতেই পারছিল না যে, লোকে বলাবলি করবে রাসূলুল্লাহ তাদের ওপর জোর খাটিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে পেরেছে। এটা ছিল তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন। নবীজি এই বিষয়ে তাদের সাথে আপস করার বহু চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হলো না।
নবীজি চেষ্টা করেছেন যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে হলেও একটা মীমাংসা হোক। তিনি আগেই বলেছিলেন, 'তারা যদি আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে আহবান করে যাতে ইসলামের পবিত্রতা লঙ্ঘিত না হয়, তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে তাদের প্রস্তাব কবুল করবো।'
শান্তিচুক্তির শর্তাবলি এতক্ষণ পর্যন্ত মুখে মুখে আলোচনা করা হয়েছে। বাকি ছিল খালি লিখিত করা। উমার ইবন খাত্তাব চুক্তির শর্তগুলো শুনে খুবই আহত হলেন। নবীজির কাছে গিয়ে বললেন,
- আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
-তাহলে আমরা আমাদের দ্বীনকে কেন ছোট করবো?
উমার ইবন খাত্তাবের চোখে মনে হচ্ছিল এই ধরনের একটি চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তার বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন -- আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল, আপনি হকের ওপরে আছেন। আমরা মুসলিমরা সত্যের অনুসারী। আর তারা হলো মুশরিক, তারা আছে বাতিলের ওপরে। তাদের সাথে কেন আমাদের এমন চুক্তি করতে হবে যার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান নিচু হয়ে যাবে?
রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'শোনো, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি তাঁর অবাধ্য হবো না, আর তিনিও আমাকে পরিত্যাগ করবেন না।'
উমার তার কথা বোঝাতে না পেরে মরিয়া হয়ে আবু বকরের কাছে গেলেন।
- আবু বকর, আমাকে বলুন, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমরা কেন আমাদের দ্বীনকে ছোট করছি?
আবু বকর শক্তভাবে বললেন, 'তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল, তাঁর অনুসরণ করো। আল্লাহ কক্ষণো তাঁকে পরিত্যাগ করবেন না।'
এরপর আর উমার কিছু বললেন না। পরবর্তীতে এই আচরণের জন্যই উমার ইবন খাত্তাব অনেক অনুশোচনা করেছিলেন। যদিও ভালো নিয়তেই তর্ক করেছিলেন। আসলে উমার ইবন খাত্তাব হকের ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর ছিলেন, তাকে বলা হতো আল ফারুক। তিনি ছিলেন একজন সতর্ক ব্যক্তি। হক-বাতিলের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতেন, নফসের ধোঁকায় পড়তেন না, কেউ তাকে ধোঁকা দিতে পারতো না, এমনকি শয়তান পর্যন্ত তাকে ভয় পেতো! তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী ব্যক্তি। এখানে তিনি চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কারণ তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হোক। চুক্তির শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে তার কাছে অপমানজনক মনে হচ্ছিল, তাই কাফিরদের সাথে বোঝাপড়া করে চুক্তি করাটা তিনি মানতে পারছিলেন না। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন -- ব্যাপারটি নবুওয়াতের মাধ্যমে ফায়সালা করা হয়েছে, নবীজি নিজে থেকে কিছুই করেননি -- তখন উমার চুপ হয়ে গেলেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে উমার ইবন খাত্তাব বলতেন, 'সেই দিনে আমি যা বলেছি আর যা ভুল করেছি, সেই ভয়ে আমি নিয়মিত (নফল) সালাহ, সাওম, দান-সাদাকাহ আর দাস আযাদ করতে থাকি।' কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'ভালো কাজ খারাপ কাজকে মুছে দেয়।' কাজেই আমাদের উচিত কোনো ভুল করলে, বেশি বেশি ভালো কাজ করা, যেমনটা উমার করেছিলেন।
📄 সন্ধির শর্তাবলি
সন্ধির শর্তগুলো মৌখিকভাবে ঠিকঠাক হলো। রাসূলুল্লাহ আলীকে ডাকলেন শর্তগুলো লেখার জন্য। তাকে বললেন, 'লেখো, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম...'
বাগড়া বাঁধালেন সুহাইল। তিনি বলে বসলেন, 'আর-রাহমান? আর-রাহমানকে তো আমরা চিনি না। আপনি লিখতে বলুন, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা (অর্থাৎ, আপনার নামে হে আল্লাহ)'
সাহাবিরা প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা -- এটাই লেখো।'
সাহাবিরা চুপ হয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ আলীকে বললেন, 'এরপর লেখো, নিম্নোক্ত বক্তব্যের উপরে আল্লাহর রাসূল চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন...'
আবারও আপত্তি জানালেন সুহাইল। বললেন, 'আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলে জানতাম, তাহলে তো আপনার সাথে যুদ্ধ না করে আপনার অনুসরণ করতাম। আপনি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ লিখতে বলুন।'
সুহাইলের এই কথা সাহাবিদের মোটেও পছন্দ হলো না। কিন্তু এবারও তাদের থামিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ আলীকে বললেন, 'মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ লিখে দাও আর রাসূলুল্লাহ শব্দটা মুছে দাও।' আলী ইতস্তত করছিলেন, রাসূলুল্লাহ বললেন, 'লেখাটা কোথায় আমাকে বলো,' তিনি নিজ হাতে সেটা মুছে দিলেন। এরপর সন্ধির শর্তগুলো লেখা হলো।
সন্ধির মূল ধারাগুলো নিম্নরূপ।
- উভয় পক্ষ দশ বছরের শান্তি-চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে। এই দশ বছরের মধ্যে কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
- যদি কুরাইশদের কেউ তার গোত্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মাদের দলে যোগ দেয়, তাহলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
- যদি মুহাম্মাদের দলের কেউ কুরাইশদের সাথে যোগ দেয়, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।
- উভয় পক্ষই পরস্পরের প্রতি ভালো নিয়ত রাখবে।
- কোনো প্রকার চুরি বা বিশ্বাসঘাতকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
- যার ইচ্ছা সে মুহাম্মাদের সাথে জোট বাঁধতে পারবে আর যার ইচ্ছা সে কুরাইশের সাথে জোট বাঁধতে পারবে।
মুহাম্মাদ এবং সাহাবিরা এই বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ঘরে ফিরে যাবে। পরবর্তী বছরে কুরাইশরা মক্কা খালি করে চলে যাবে, যেন রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর সাহাবিরা মক্কায় প্রবেশ করতে পারেন এবং তারা তিন দিন অবস্থান করতে পারবেন। এই সময়টায় ততটুকু অস্ত্রশস্ত্র রাখা সংগত হবে, যতটুকু অস্ত্রশস্ত্র সাধারণত একজন মুসাফির তার সাথে রাখে, এর বেশি নয়।
📄 আবু জান্দালের ؓ নাটকীয় আগমন
চুক্তি লেখা শেষ, স্বাক্ষর দেওয়ার পালা। হঠাৎ নাটকীয়ভাবে সেই মুহূর্তে আগমন ঘটলো আবু জান্দালের। তিনি সুহাইল ইবন আমরের আপন ছেলে। বাবা স্বয়ং কাফিরদের মুখপাত্র, আর ছেলে কিনা মক্কা থেকে পালিয়ে এসেছেন নবীজির সাথে যোগ দিতে! আবু জান্দালকে মক্কায় কারাবন্দী ছিলেন বেশ কয়েক বছর। মুসলিমরা উমরা করতে এসেছে শুনে তিনি পালিয়ে এসেছেন। তার শরীরে তখনও শিকল বাঁধা। সে অবস্থাতেই পাহাড়ি পথ, উপত্যকা সবকিছু ডিঙিয়ে মুসলিমদের ঘাঁটিতে এসে পৌঁছেছেন। আজ তার মুক্তির দিন! কিন্তু বাধ সাধলেন তার বাবা। সুহাইল তাকে দেখেই রাসূলুল্লাহকে বলে উঠলেন,
- চুক্তির আওতায় এই হলো আমার প্রথম ব্যক্তি। একে আমার কাছে ফেরত দিন।
- তাকে তুমি আমার কাছেই থাকতে দাও।
- না না! হয় আপনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন, না হলে কোনো সন্ধিই করবো না।
নবীজি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন বললেন, 'দেখো, আমরা কিন্তু এখনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি।'
কিন্তু সুহাইল নাছোড়বান্দা, কিছুতেই রাজি হলেন না। শেষমেশ আবু জান্দালের দিকে ফিরে নবীজি বললেন, 'তোমাকে ফিরে যেতে হবে।'
আবু জান্দালের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো! এমন পরিস্থিতির জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কী করে আমাকে কাফিরদের মাঝে ফিরে যেতে বলছেন? ওদের মাঝে থাকলে আমি ফিতনায় পড়ে যাবো...'
নবীজি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। বললেন, 'ধৈর্য ধরো আবু জান্দাল। আল্লাহর জন্য তোমার কষ্টগুলো সহ্য করে যাও। নিশ্চয়ই তোমার এবং তোমার মতো আরও যারা কষ্টভোগ করছে, তিনি তাদের সবার কষ্ট দূর করবেন। আমরা এই লোকদের সাথে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি। চুক্তির প্রতিটি শর্ত রক্ষা করবো বলে আল্লাহর নামে শপথ নিয়েছি। আমরা আমাদের অঙ্গীকার ভাঙতে পারি না।'
আবু জান্দালকে মারধোর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। উমার তখন ইচ্ছা করেই নিজের তরবারিটার হাতলটা আবু জান্দালের পাশে ঝুলিয়ে রেখে হাঁটছেন আর আবু জান্দালের কানে কানে ফিসফিস করে বলছেন, 'এরা কাফের। এদের জীবনের কোনো দাম নেই। এদের রক্তের দাম কুকুরের রক্তের দামের সমান!' তিনি চাচ্ছিলেন আবু জান্দাল যেন তাঁর তরবারিটা কেড়ে নিয়ে তাঁর বাবাকে টুকরো-টুকরো করে ফেলুক। কিন্তু আবু জান্দাল পর্বতসমান ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু সহ্য করে নিলেন।
এই দৃশ্য দেখে সাহাবিদের হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি হয়, চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাদের একজন দ্বীনি ভাইকে তাদেরই চোখের সামনে এভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তারা চুপচাপ দেখছেন-- এটা তারা মানতেই পারছিলেন না। সাহাবিরা ছিলেন মর্যাদাবান লোক। এই ঘটনা মেনে নেওয়া তাদের জন্য খুব কঠিন ছিল। তাদের চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে থাকে।
চুক্তি লেখা শেষ হলো। রাসূলুল্লাহ সবাইকে আদেশ করলেন পশু কুরবানি করতে আর মাথা মুড়িয়ে নিতে। কিন্তু সাহাবিরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনবার আদেশ করার পরেও সবাই একদম নিথর দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য সময় নবীজি আদেশ করলে সবাই ছুটে গিয়ে তা পালন করতেন। এবার যেন কারো মধ্যে কোনো ভাবাবেগ নেই।
রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের এ আচরণে মর্মাহত হলেন। সাহাবিরা হলেন মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ জাতি। এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ আল্লাহর রাসূলকে অনুসরণ করা। রাসূলুল্লাহর অবাধ্যতা করলে জান্নাতে কেউ ঠাঁই পাবে না, জাহান্নামের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। সাহাবিদের ওপর রাগ করে আল্লাহর রাসূল স্ত্রী উম্ম সালামাকে বললেন, 'মুসলিমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলছে! আমি তাদেরকে একটা আদেশ দিলাম আর তারা অবাধ্যতা করছে!' উম্মুল মু'মিনীন উম্ম সালামাহ ছিলেন বিচক্ষণ নারী। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি এই বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে আর কোনো কথা তুলবেন না। আপনি আগে নিজে যান, পশু জবাই করুন আর নাপিত ডেকে নিজের চুল মুড়িয়ে নিন।'
এই শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে গিয়ে সাহাবিরা অনেক চাপের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল তারা কিছুই অর্জন করতে পারেননি। তারা নবীজির অবাধ্য হয়েছিলেন, এটা ভাবা ঠিক হবে না। বরং তারা আদেশ পালনে কিছুটা বিলম্ব করছিলেন। তাদের ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো নবীজির কাছে ওয়াহী আসবে। হয়তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই পরিস্থিতি বদলে যাবে, আর তারা মক্কায় ঢোকার অনুমতি পাবেন। তারা এসেছিলেন কাবা শরীফ তাওয়াফ করতে, খালি হাতে ফিরে যেতে তারা আসেননি।
কিন্তু উম্ম সালামার বিচক্ষণতায় পরিস্থিতি সহজ হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নবীজি যদি নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে কাজগুলো করেন তাহলে তাঁর দেখাদেখি সাহাবিরাও সেসব করবেন। নবীজি বেরোলেন, তাঁর নাপিতকে ডাকিয়ে নিজের মাথা মুড়িয়ে নিলেন এবং পশু জবাই করলেন। এরপর তাঁর দেখাদেখি সব সাহাবি তৎক্ষণাৎ নবীজির আদেশ পালন করলেন। অবশ্য তখনও সবাই বেশ বিমর্ষ হয়ে ছিলেন।
মুসলিমরা মদীনায় ফিরে এল। ফেরার পথে তাদের মনে দুটো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। উমার ভণিতা করার মানুষ নন। তিনি রাসূলুল্লাহকে অকপটে জিজ্ঞেস করলেন,
- আচ্ছা রাসূলুল্লাহ, আমাদের ওয়াদা করা হয়েছিল আমরা তাওয়াফ করতে পারবো। সেটা কেন হলো না?
- আমি কি তোমাকে বলেছি যে আমরা এই বছর তাওয়াফ করবো?
- না।
- তাহলে তোমরা অবশ্যই তাওয়াফ করবে।
নবীজির আশ্বাসে সাহাবিরা আশ্বস্ত হলেন। সাহাবিরা দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন তা হলো আবু জান্দালকে কুরাইশদের কাছে ছেড়ে দেওয়া। তারা খোলাখুলিভাবে বিষয়টি রাসূলুল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ তাদের বুঝিয়ে বললেন আবু জান্দাল এবং তার মতো যারা আছে, তাদের নিষ্কৃতির পথ শীঘ্রই উন্মুক্ত হবে -- আল্লাহ তাকে এমনটাই ওয়াদা করেছেন। সাহাবিরা তাদের খটকা নিয়ে খোলাখুলিভাবে নবীজির সাথে আলোচনা করলেন এবং নবীজি তাদের কথা শুনে বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না। বরং তাদের শান্তভাবে বুঝিয়ে দিলেন যেন তাদের খটকাগুলো দূর হয়ে যায়।
তবে এখানে দুটো ব্যাপার উল্লেখ্য, মক্কার কেউ মুসলিম হয়ে মদীনায় আসলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দেওয়া এই নিয়মটি মুসলিম নারীদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হয়নি। আল্লাহ তাআলা এই ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেছেন,
"মু'মিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা করো। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা নিশ্চিত জানো যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিও না..." (সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১০)
তবে এই আয়াত দিয়ে মুসলিম নারীদের ব্যাপারে মূল চুক্তির শর্ত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, নাকি মূল চুক্তির শর্তে কিছুই উল্লেখ না থাকায় আল্লাহ তাআলা আয়াত পাঠিয়ে বিষয়্টা পরিষ্কার করে দিয়েছেন--সেটা নিশ্চিত নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
টিকাঃ
৭৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬।
📄 ইসলামের প্রথম গেরিলা যোদ্ধা: আবু বাসীর ؓ
মুসলিমরা মদীনায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরের ঘটনা। আবু বাসীর উতবাহ ইবন উসাইদ নামের এক মুসলিম লোক মক্কা থেকে মদীনায় পালিয়ে চলে এলেন। তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনতে দুই মুশরিক মদীনায় এল। এদের একজন বনু আমীর গোত্রের, আরেকজন ছিল আযাদকৃত দাস। তারা দাবি করলো আবু বাসীরকে যেন তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কেননা হুদাইবিয়ার সন্ধি মতে মক্কা থেকে কেউ মদীনায় আসলে তাকে মক্কার হাতে হস্তান্তর করতে আল্লাহর রাসূল বাধ্য থাকবেন।
নবীজি আবু বাসীরকে ডেকে বললেন, 'তোমাকে ফিরে যেতে হবে।'
আবু বাসীর বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাকে মুশরিকদের মাঝে ফিরিয়ে দিচ্ছেন! এদের মাঝে থাকলে তো আমি দ্বীন নিয়ে ফিতনায় পড়ে যাবো!'
একজন মুসলিমকে কাফিরদের হাতে এভাবে তুলে দেওয়ার চাইতে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ইসলামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতারণা করা ইসলামে বৈধ নয়। নবীজি আবু বাসীরকে তাই বললেন, 'দেখো, এই লোকগুলোর সাথে আমরা চুক্তিবদ্ধ। আমাদের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতা শোভা পায় না। তুমি ফিরে যাও, নিশ্চয়ই তুমি এবং তোমার মতো যারা আছে -- আল্লাহ তোমাদের জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।'
নবীজি কাফিরদের হয়ে কাজ করছিলেন না। কিংবা তাদেরকে খুশি করার জন্য মুসলিমদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন না। শুধুমাত্র একটি কারণে তিনি আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন, তা হলো চুক্তি রক্ষা করা। আর আল্লাহর তরফ থেকে ওয়াদা পাওয়ার পরেই এমন একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতেই হবে, সে চুক্তি মুসলিমদের সাথে হোক বা কাফিরদের সাথে হোক।
আবু বাসীরকে কুরাইশদের সেই দুই ব্যক্তির সাথে ফিরে যেতে হলো। মক্কায় যাওয়ার পথে যুল হুলাইফা নামক স্থানে জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে যুহরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। আবু বাসীর সালাত আদায় করলেন। এরপর কিছু খেজুর নিয়ে বাকি দু'জনের সাথে একসাথে খেতে বসে গল্পগুজব করতে লাগলেন। কথাপ্রসঙ্গে আবু বাসীর জিজ্ঞেস করলেন,
- 'বনু আমীরের ভাই, তোমার তলোয়ারটা তো বেশ!'
'হ্যাঁ! আসলেই তাই!' নিজের তরবারির প্রশংসা পেয়ে লোকটাও বেশ গদগদ হয়ে উত্তর দিলো।
- আমাকে একটু দাও তো, আমি একটু পরখ করে দেখি!
আবু বাসীরের হাতে তরবারি আসামাত্র মুহূর্তের মাঝে বনু আমীরের লোকটির লাশ পড়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে দ্বিতীয় ব্যক্তি আতঙ্কে দিল ভোঁ দৌড়। একেবারে জান হাতে নিয়ে পালানো যাকে বলে! দৌড়াতে দৌড়াতে নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়। এক দৌড়ে সে মদীনায় চলে এল। তাকে ওভাবে দৌড়াতে দেখেই রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন মারাত্মক কিছু ঘটেছে। সে রাসূলুল্লাহকে জানালো, 'আমার সাথীকে ঐ লোক হত্যা করেছে! সে পেলে আমাকেও মেরে ফেলবে!'
ততক্ষণে আবু বাসীরও তরবারি হাতে মদীনায় ঢুকলেন। নবীজিকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন, আমাকে ওদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।'
নবীজি বললেন, 'ওয়াইলুই উম্মিহি! সাথে আর কয়জন লোক থাকলে তো এই ছেলে রীতিমতো যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারতো!'
কথাটা ছিল প্রশংসাসূচক। আবু বাসীর ছিলেন একজন টগবগে যুবক, সাথে কিছু লোকবল থাকলে তিনি একাই কুরাইশদের নাস্তানাবুদ করার ক্ষমতা রাখেন, রাসূলুল্লাহ এটাই ইঙ্গিত করেছিলেন। কিন্তু চুক্তিমতে তিনি আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। এই কথা শুনে আবু বাসীর মদীনা ছেড়ে চলে গেলেন। কারণ কুরাইশদের কেউ তাকে ফেরত চাইলে নবীজি আবারো তাকে কাফিরদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন। তাই তিনি চলে গেলেন সাইফুল বাহরে।
আবু বাসীর নবীজির কাছে বনু আমীরের লোকটির জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু নবীজি সেগুলো নিতে রাজি হননি, কারণ সেক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করা হয়ে যায়। যা-ই হোক, সাইফুল বাহরে আবু বাসীরের নতুন জীবন শুরু হলো। সমুদ্রতীরে তিনি একাকী দিন কাটাতে লাগলেন, কোনো সঙ্গীসাথী নেই। ওদিকে কুরাইশরা হন্যে হয়ে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সম্বল বলতে তার কাছে ছিল কয়েকটা খেজুর। খেজুর শেষ হয়ে গেলে সমুদ্রতীরে ভেসে ওঠা মাছ খেয়ে সারাদিন পার করে দিতেন। এভাবে কিছুদিন কেটে গেল।
এত বড় খবর তো চাপা থাকে না। আবু বাসীরের ঘটনা মক্কায় জানাজানি হয়ে গেল। আবু জান্দালের কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো মক্কা থেকে পালিয়ে গেলেন। এবার গিয়ে আবু বাসীরের সাথে যোগ দিলেন। জুলুমের শিকার মক্কার আরও কিছু মুসলিমও আবু বাসীরের সাথে যোগ দিলেন এবং শুরু করলেন একের পর এক গেরিলা অপারেশন। এভাবেই আবু বাসীরের নেতৃত্বে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গেরিলা আক্রমণ শুরু হয়। আজ পর্যন্ত আবু বাসীরের নাম মুসলিমরা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে।
আবু বাসীর আর তাঁর সঙ্গীরা মিলে কুরাইশদের অতর্কিতে হামলা করা শুরু করলেন। তারা অবস্থান করছিলেন 'ঈস' নামক স্থানে। জায়গাটা ছিল কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক রুটের একেবারে কাছেই। তারা সেখানে ওঁৎ পেতে থাকতেন আর কুরাইশদের কোনো কাফেলাকে অতিক্রম করতে দেখলে সেটাকে আক্রমণ করে কাফেলার সবাইকে হত্যা করে কাফেলার সম্পদ লুট করতেন। কুরাইশদের জীবন রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে গেল। এই অপারেশনগুলোর কথা দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়াতে লাগলো আর অনেক মুসলিম সেই গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে শুরু করল। এভাবে প্রায় সত্তর জনের একটি দল কুরাইশদের পর্যুদস্ত করে দিল।
রাসূলুল্লাহ সবকিছুই জানতেন কিন্তু তিনি কিছুই বলছিলেন না। তিনি এসবের সাথে জড়িত ছিলেন না, কিন্তু তিনি এসব ঘটনার প্রতি 'তীব্র নিন্দা'ও জ্ঞাপন করেননি। চুক্তির কারণে আবু বাসীরকে তিনি মদীনায় আশ্রয় দেননি, আবার তাকে থামানোরও কোনো চেষ্টা করেননি। রাসূলুল্লাহ কেবল দায়িত্বশীল ছিলেন মদীনার অভ্যন্তরে মুসলিম নাগরিকদের ব্যাপারে। মক্কার মুসলিমরা মদীনার বাইরে সমুদ্রতীরে কী করছে -- সেসবের ব্যাপারে তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল না। তাই নবীজি এসব থামানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নিলেন না।
বনু আমীরের লোকটির হত্যার খবর যখন মক্কায় পৌঁছলো তখন সুহাইল ইবন আমর খুব দুঃখ পেলেন। কারণ সেই লোকটি ছিল তার গোত্রের লোক। কাবাঘরে পিঠ ঠেকিয়ে সুহাইল মরিয়া হয়ে বলতে লাগলো, 'এই লোকের রক্তপণ আদায় করার আগ পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হচ্ছি না, ঠিক এইভাবে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো! মুহাম্মাদকে এই টাকা দিতেই হবে!' আবু সুফিয়ান বলে উঠলো, 'পুরোই পাগলামি! মুহাম্মাদ এই টাকা কেন দিতে যাবে? সে তার কাজ করেছে। সে তো আবু বাসীরকে ফিরিয়ে দিয়েছেই।'
যারা রাসূলুল্লাহর কাছে চিঠি লিখে তাকে মদীনায় পাঠিয়েছিল, তারাও এই মৃত্যুর ব্যাপারে দায়দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালো। এভাবে বনু আমীরের সেই লোকের রক্তপণ হারিয়ে গেল। সুহাইল ইবন আমর তার বংশের লোকের মৃত্যুর বিনিময়ে কোনো টাকাই পেলেন না। আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তাআলার কদর অনুযায়ী সবকিছুই মুসলিমদের পক্ষে কাজ করছিল।
আবু বাসীরের গেরিলা আক্রমণে কুরাইশদের নাকানি-চুবানি খেয়ে দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যখন হুদাইবিয়ার সন্ধি করা হলো, কুরাইশরা ভেবেছিল যেন তাদেরই বিজয় হচ্ছে। কোনো মুসলিম মক্কা থেকে পালিয়ে আসলে তাকে মদীনায় ফিরিয়ে দেওয়া -- চুক্তির এই ধারার জন্য তারাই চাপাচাপি করেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। কয়েক বছর মুসলিমদের সাথে টানা যুদ্ধের পর হুদাইবিয়ার সন্ধি কেবলই তাদের একটু দম নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর আগ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর বাহিনীর ক্রমাগত হামলায় তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। শান্তিচুক্তি করার পর তারা ভেবেছিল তারা আবার ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করতে পারবে। কিন্তু তারা ভাবতেই পারেনি আবু বাসীরের কারণে তাদের এভাবে নাস্তানাবুদ হতে হবে। এই পরিস্থিতির কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা নবীজির শরণাপন্ন হলো।
আল্লাহ এভাবেই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন। যে শর্ত ছাড়া কুরাইশরা সন্ধি করতেই রাজি হচ্ছিল না, সেগুলোই বদলাবার জন্যে তারা এবার নবীজিকে চিঠি পাঠিয়ে মিনতি করতে লাগলো। সে চিঠির ভাষা ছিল অনেকটা এমন,
'আপনার ও আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই লাগে, দয়া করে এই লোকদেরকে ডেকে আপনি মদীনায় স্থান দিন।'
রাসূলুল্লাহ তাদের অনুরোধ রাখলেন। তিনি চিঠি পাঠিয়ে আবু বাসীর এবং অন্যান্যদের মদীনায় চলে আসতে বললেন। রাসূলুল্লাহর চিঠি যখন আবু বাসীরের হাতে পৌঁছালো, তখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত। দ্বীন ইসলামের ছায়ার নিচে থাকার জন্য যার এত প্রয়াস, রাসূলের শহর মদীনায় ঢোকার জন্য যার এত আকুতি, সেই স্বপ্ন সত্য হতে হতেও যেন হলো না। তার এই ব্যাকুলতার সমস্ত প্রতিদান অপেক্ষা করে ছিল তার জান্নাতের বাড়িতে। যে আবু বাসীরের আক্রমণের সূত্র ধরে মক্কার নিপীড়িত মুসলিমরা মদীনায় আসার সুযোগ পেলেন, সেই আবু বাসীর আল্লাহর রাসূলের চিঠি বুকে চেপে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
টিকাঃ
৭৮. সীরাহ ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৮।