📄 বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের মর্যাদা
১) "যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অতি অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যেই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ সত্ত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১০)
যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন তাদের জন্য এটা একটা বিরাট সম্মান। তারা বাইয়াত করেছিলেন রাসূলুল্লাহর হাতে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন এই বাইয়াত ছিল আল্লাহর কাছেই। ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ছিলেন আল্লাহ তাআলা এবং সাহাবিদের মাঝে একজন প্রতিনিধিস্বরুপ। কারণ যে আনুগত্যের শপথ তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে করেছিলেন, সেটা ছিল আসলে স্বয়ং আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ।'
২) "আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন। এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ লদ্ধ সম্পদ যা তারা হস্তগত করবে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮-১৯)
আল্লাহ সেই চৌদ্দশো সাহাবির ওপরে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দিলেন। এর থেকে বিশাল ঘটনা আর কী হতে পারে! দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ তাআলা এই মানুষগুলোকে সবচাইতে বড় সুখবর জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই লোকগুলোর অন্তরে কী আছে তা তিনি জানতেন। অর্থাৎ এই সাহাবিদের আন্তরিকতা আর ঈমান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। একই সাথে আল্লাহ তাআলা তাদের আসন্ন বিজয় এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভের সুসংবাদ দিচ্ছেন। এটি হলো খাইবারের বিজয়ের সুসংবাদ।
৩) বাইয়াতে রিদওয়ানের সাহাবিরা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবেন না। জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল হাফসাকে বলেছেন, 'ইনশা আল্লাহ, গাছের নিচে যারা বাইয়াত করেছিল, তারা কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।' ইমাম নববীর মতে, এখানে ইনশা আল্লাহ বলার অর্থ আল্লাহর বরকতের আশা করা, সন্দেহ পোষণ করা নয়।
৪) অন্য একটি হাদীসে আছে যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র লাল উটের মালিককে ছাড়া। এই লাল উটের মালিক হচ্ছে জা’দ ইবন কায়েস। বাইয়াত দেওয়ার ভয়ে সে নিজেকে রাসূল থেকে আড়াল করে রেখেছিল। মর্যাদা অনুযায়ী ভাগ করা হলে প্রথমেই আসবে সেই দশজন সাহাবি যাদের জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর হচ্ছেন সেইসব সাহাবি যারা বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আর তারপর হচ্ছেন বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা। তারা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ।
৫) বাইয়াতে রিদওয়ানের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা তাদের শুধুমাত্র একজন সাথীর জন্যেও যুদ্ধ করতে এবং মৃত্যুবরণ করতে একতাবদ্ধ। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত। শরীরের একটি অংশ ব্যথা পেলে সমস্ত শরীরেই সেই ব্যথা সংক্রমিত হয়। সেই জন্যেই পুরো ১৪০০ লোকের মুসলিম বাহিনী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র একজন মানুষের জন্যে।
পরবর্তীতে জানা যায় যে, উসমান জীবিত আছেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল গুজবমাত্র। কিন্তু তারপরও এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা হয়ে আছে। এই বাইয়াতের ঘটনা অনন্যসাধারণ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে ইসলাম এবং রাসূলুল্লাহর জন্যে সাহাবিরা মৃত্যুর শপথ নিয়েছিলেন। তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। বাইয়াতের ঘটনা মক্কার মুশরিকদের অন্তরে প্রবল ভীতির সৃষ্টি করেছিল। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাইয়াত দেওয়া শেষ হলে রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা হচ্ছো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।' আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'
টিকাঃ
৭৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ১৯৮।
📄 সমঝৌতার পথ
কুরাইশের লোকেরা শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে রাজি হলো। এদিকে উসমানও ততক্ষণে ফিরে এসেছেন। কুরাইশরা মুসলিমদের কাছে মুখপাত্র হিসেবে পাঠালো সুহাইল ইবন আমরকে। সুহাইল তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন একজন কুশলী কূটনীতিক। বাক্যবাগীশ, বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। সুহাইলের দায়িত্ব ছিল চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে মুসলিমদের সাথে বোঝাপড়া করা। সুহাইলকে দেখামাত্র নবীজি সাহাবিদের বলে উঠলেন, 'তোমাদের কাজ এবার সহজ হয়ে যাবে।'
রাসূলুল্লাহ এবং সুহাইল ইবন আমর বেশ খানিকক্ষণ ধরে সন্ধির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করলেন। তবে মুসলিমরা যাতে সে বছর মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে -- সে ব্যাপারে কাফিররা ছিল বদ্ধপরিকর। এই একটা জায়গাতে তারা কিছুতেই ছাড় দেবে না। তারা এটা মানতেই পারছিল না যে, লোকে বলাবলি করবে রাসূলুল্লাহ তাদের ওপর জোর খাটিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে পেরেছে। এটা ছিল তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন। নবীজি এই বিষয়ে তাদের সাথে আপস করার বহু চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হলো না।
নবীজি চেষ্টা করেছেন যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে হলেও একটা মীমাংসা হোক। তিনি আগেই বলেছিলেন, 'তারা যদি আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে আহবান করে যাতে ইসলামের পবিত্রতা লঙ্ঘিত না হয়, তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে তাদের প্রস্তাব কবুল করবো।'
শান্তিচুক্তির শর্তাবলি এতক্ষণ পর্যন্ত মুখে মুখে আলোচনা করা হয়েছে। বাকি ছিল খালি লিখিত করা। উমার ইবন খাত্তাব চুক্তির শর্তগুলো শুনে খুবই আহত হলেন। নবীজির কাছে গিয়ে বললেন,
- আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
-তাহলে আমরা আমাদের দ্বীনকে কেন ছোট করবো?
উমার ইবন খাত্তাবের চোখে মনে হচ্ছিল এই ধরনের একটি চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তার বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন -- আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল, আপনি হকের ওপরে আছেন। আমরা মুসলিমরা সত্যের অনুসারী। আর তারা হলো মুশরিক, তারা আছে বাতিলের ওপরে। তাদের সাথে কেন আমাদের এমন চুক্তি করতে হবে যার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান নিচু হয়ে যাবে?
রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'শোনো, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি তাঁর অবাধ্য হবো না, আর তিনিও আমাকে পরিত্যাগ করবেন না।'
উমার তার কথা বোঝাতে না পেরে মরিয়া হয়ে আবু বকরের কাছে গেলেন।
- আবু বকর, আমাকে বলুন, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমরা কেন আমাদের দ্বীনকে ছোট করছি?
আবু বকর শক্তভাবে বললেন, 'তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল, তাঁর অনুসরণ করো। আল্লাহ কক্ষণো তাঁকে পরিত্যাগ করবেন না।'
এরপর আর উমার কিছু বললেন না। পরবর্তীতে এই আচরণের জন্যই উমার ইবন খাত্তাব অনেক অনুশোচনা করেছিলেন। যদিও ভালো নিয়তেই তর্ক করেছিলেন। আসলে উমার ইবন খাত্তাব হকের ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর ছিলেন, তাকে বলা হতো আল ফারুক। তিনি ছিলেন একজন সতর্ক ব্যক্তি। হক-বাতিলের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতেন, নফসের ধোঁকায় পড়তেন না, কেউ তাকে ধোঁকা দিতে পারতো না, এমনকি শয়তান পর্যন্ত তাকে ভয় পেতো! তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী ব্যক্তি। এখানে তিনি চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কারণ তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হোক। চুক্তির শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে তার কাছে অপমানজনক মনে হচ্ছিল, তাই কাফিরদের সাথে বোঝাপড়া করে চুক্তি করাটা তিনি মানতে পারছিলেন না। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন -- ব্যাপারটি নবুওয়াতের মাধ্যমে ফায়সালা করা হয়েছে, নবীজি নিজে থেকে কিছুই করেননি -- তখন উমার চুপ হয়ে গেলেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে উমার ইবন খাত্তাব বলতেন, 'সেই দিনে আমি যা বলেছি আর যা ভুল করেছি, সেই ভয়ে আমি নিয়মিত (নফল) সালাহ, সাওম, দান-সাদাকাহ আর দাস আযাদ করতে থাকি।' কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'ভালো কাজ খারাপ কাজকে মুছে দেয়।' কাজেই আমাদের উচিত কোনো ভুল করলে, বেশি বেশি ভালো কাজ করা, যেমনটা উমার করেছিলেন।
📄 সন্ধির শর্তাবলি
সন্ধির শর্তগুলো মৌখিকভাবে ঠিকঠাক হলো। রাসূলুল্লাহ আলীকে ডাকলেন শর্তগুলো লেখার জন্য। তাকে বললেন, 'লেখো, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম...'
বাগড়া বাঁধালেন সুহাইল। তিনি বলে বসলেন, 'আর-রাহমান? আর-রাহমানকে তো আমরা চিনি না। আপনি লিখতে বলুন, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা (অর্থাৎ, আপনার নামে হে আল্লাহ)'
সাহাবিরা প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা -- এটাই লেখো।'
সাহাবিরা চুপ হয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ আলীকে বললেন, 'এরপর লেখো, নিম্নোক্ত বক্তব্যের উপরে আল্লাহর রাসূল চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন...'
আবারও আপত্তি জানালেন সুহাইল। বললেন, 'আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলে জানতাম, তাহলে তো আপনার সাথে যুদ্ধ না করে আপনার অনুসরণ করতাম। আপনি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ লিখতে বলুন।'
সুহাইলের এই কথা সাহাবিদের মোটেও পছন্দ হলো না। কিন্তু এবারও তাদের থামিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ আলীকে বললেন, 'মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ লিখে দাও আর রাসূলুল্লাহ শব্দটা মুছে দাও।' আলী ইতস্তত করছিলেন, রাসূলুল্লাহ বললেন, 'লেখাটা কোথায় আমাকে বলো,' তিনি নিজ হাতে সেটা মুছে দিলেন। এরপর সন্ধির শর্তগুলো লেখা হলো।
সন্ধির মূল ধারাগুলো নিম্নরূপ।
- উভয় পক্ষ দশ বছরের শান্তি-চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে। এই দশ বছরের মধ্যে কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
- যদি কুরাইশদের কেউ তার গোত্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মাদের দলে যোগ দেয়, তাহলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
- যদি মুহাম্মাদের দলের কেউ কুরাইশদের সাথে যোগ দেয়, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।
- উভয় পক্ষই পরস্পরের প্রতি ভালো নিয়ত রাখবে।
- কোনো প্রকার চুরি বা বিশ্বাসঘাতকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
- যার ইচ্ছা সে মুহাম্মাদের সাথে জোট বাঁধতে পারবে আর যার ইচ্ছা সে কুরাইশের সাথে জোট বাঁধতে পারবে।
মুহাম্মাদ এবং সাহাবিরা এই বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ঘরে ফিরে যাবে। পরবর্তী বছরে কুরাইশরা মক্কা খালি করে চলে যাবে, যেন রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর সাহাবিরা মক্কায় প্রবেশ করতে পারেন এবং তারা তিন দিন অবস্থান করতে পারবেন। এই সময়টায় ততটুকু অস্ত্রশস্ত্র রাখা সংগত হবে, যতটুকু অস্ত্রশস্ত্র সাধারণত একজন মুসাফির তার সাথে রাখে, এর বেশি নয়।
📄 আবু জান্দালের ؓ নাটকীয় আগমন
চুক্তি লেখা শেষ, স্বাক্ষর দেওয়ার পালা। হঠাৎ নাটকীয়ভাবে সেই মুহূর্তে আগমন ঘটলো আবু জান্দালের। তিনি সুহাইল ইবন আমরের আপন ছেলে। বাবা স্বয়ং কাফিরদের মুখপাত্র, আর ছেলে কিনা মক্কা থেকে পালিয়ে এসেছেন নবীজির সাথে যোগ দিতে! আবু জান্দালকে মক্কায় কারাবন্দী ছিলেন বেশ কয়েক বছর। মুসলিমরা উমরা করতে এসেছে শুনে তিনি পালিয়ে এসেছেন। তার শরীরে তখনও শিকল বাঁধা। সে অবস্থাতেই পাহাড়ি পথ, উপত্যকা সবকিছু ডিঙিয়ে মুসলিমদের ঘাঁটিতে এসে পৌঁছেছেন। আজ তার মুক্তির দিন! কিন্তু বাধ সাধলেন তার বাবা। সুহাইল তাকে দেখেই রাসূলুল্লাহকে বলে উঠলেন,
- চুক্তির আওতায় এই হলো আমার প্রথম ব্যক্তি। একে আমার কাছে ফেরত দিন।
- তাকে তুমি আমার কাছেই থাকতে দাও।
- না না! হয় আপনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন, না হলে কোনো সন্ধিই করবো না।
নবীজি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন বললেন, 'দেখো, আমরা কিন্তু এখনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি।'
কিন্তু সুহাইল নাছোড়বান্দা, কিছুতেই রাজি হলেন না। শেষমেশ আবু জান্দালের দিকে ফিরে নবীজি বললেন, 'তোমাকে ফিরে যেতে হবে।'
আবু জান্দালের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো! এমন পরিস্থিতির জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কী করে আমাকে কাফিরদের মাঝে ফিরে যেতে বলছেন? ওদের মাঝে থাকলে আমি ফিতনায় পড়ে যাবো...'
নবীজি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। বললেন, 'ধৈর্য ধরো আবু জান্দাল। আল্লাহর জন্য তোমার কষ্টগুলো সহ্য করে যাও। নিশ্চয়ই তোমার এবং তোমার মতো আরও যারা কষ্টভোগ করছে, তিনি তাদের সবার কষ্ট দূর করবেন। আমরা এই লোকদের সাথে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি। চুক্তির প্রতিটি শর্ত রক্ষা করবো বলে আল্লাহর নামে শপথ নিয়েছি। আমরা আমাদের অঙ্গীকার ভাঙতে পারি না।'
আবু জান্দালকে মারধোর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। উমার তখন ইচ্ছা করেই নিজের তরবারিটার হাতলটা আবু জান্দালের পাশে ঝুলিয়ে রেখে হাঁটছেন আর আবু জান্দালের কানে কানে ফিসফিস করে বলছেন, 'এরা কাফের। এদের জীবনের কোনো দাম নেই। এদের রক্তের দাম কুকুরের রক্তের দামের সমান!' তিনি চাচ্ছিলেন আবু জান্দাল যেন তাঁর তরবারিটা কেড়ে নিয়ে তাঁর বাবাকে টুকরো-টুকরো করে ফেলুক। কিন্তু আবু জান্দাল পর্বতসমান ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু সহ্য করে নিলেন।
এই দৃশ্য দেখে সাহাবিদের হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি হয়, চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাদের একজন দ্বীনি ভাইকে তাদেরই চোখের সামনে এভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তারা চুপচাপ দেখছেন-- এটা তারা মানতেই পারছিলেন না। সাহাবিরা ছিলেন মর্যাদাবান লোক। এই ঘটনা মেনে নেওয়া তাদের জন্য খুব কঠিন ছিল। তাদের চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে থাকে।
চুক্তি লেখা শেষ হলো। রাসূলুল্লাহ সবাইকে আদেশ করলেন পশু কুরবানি করতে আর মাথা মুড়িয়ে নিতে। কিন্তু সাহাবিরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনবার আদেশ করার পরেও সবাই একদম নিথর দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য সময় নবীজি আদেশ করলে সবাই ছুটে গিয়ে তা পালন করতেন। এবার যেন কারো মধ্যে কোনো ভাবাবেগ নেই।
রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের এ আচরণে মর্মাহত হলেন। সাহাবিরা হলেন মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ জাতি। এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ আল্লাহর রাসূলকে অনুসরণ করা। রাসূলুল্লাহর অবাধ্যতা করলে জান্নাতে কেউ ঠাঁই পাবে না, জাহান্নামের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। সাহাবিদের ওপর রাগ করে আল্লাহর রাসূল স্ত্রী উম্ম সালামাকে বললেন, 'মুসলিমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলছে! আমি তাদেরকে একটা আদেশ দিলাম আর তারা অবাধ্যতা করছে!' উম্মুল মু'মিনীন উম্ম সালামাহ ছিলেন বিচক্ষণ নারী। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি এই বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে আর কোনো কথা তুলবেন না। আপনি আগে নিজে যান, পশু জবাই করুন আর নাপিত ডেকে নিজের চুল মুড়িয়ে নিন।'
এই শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে গিয়ে সাহাবিরা অনেক চাপের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল তারা কিছুই অর্জন করতে পারেননি। তারা নবীজির অবাধ্য হয়েছিলেন, এটা ভাবা ঠিক হবে না। বরং তারা আদেশ পালনে কিছুটা বিলম্ব করছিলেন। তাদের ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো নবীজির কাছে ওয়াহী আসবে। হয়তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই পরিস্থিতি বদলে যাবে, আর তারা মক্কায় ঢোকার অনুমতি পাবেন। তারা এসেছিলেন কাবা শরীফ তাওয়াফ করতে, খালি হাতে ফিরে যেতে তারা আসেননি।
কিন্তু উম্ম সালামার বিচক্ষণতায় পরিস্থিতি সহজ হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নবীজি যদি নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে কাজগুলো করেন তাহলে তাঁর দেখাদেখি সাহাবিরাও সেসব করবেন। নবীজি বেরোলেন, তাঁর নাপিতকে ডাকিয়ে নিজের মাথা মুড়িয়ে নিলেন এবং পশু জবাই করলেন। এরপর তাঁর দেখাদেখি সব সাহাবি তৎক্ষণাৎ নবীজির আদেশ পালন করলেন। অবশ্য তখনও সবাই বেশ বিমর্ষ হয়ে ছিলেন।
মুসলিমরা মদীনায় ফিরে এল। ফেরার পথে তাদের মনে দুটো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। উমার ভণিতা করার মানুষ নন। তিনি রাসূলুল্লাহকে অকপটে জিজ্ঞেস করলেন,
- আচ্ছা রাসূলুল্লাহ, আমাদের ওয়াদা করা হয়েছিল আমরা তাওয়াফ করতে পারবো। সেটা কেন হলো না?
- আমি কি তোমাকে বলেছি যে আমরা এই বছর তাওয়াফ করবো?
- না।
- তাহলে তোমরা অবশ্যই তাওয়াফ করবে।
নবীজির আশ্বাসে সাহাবিরা আশ্বস্ত হলেন। সাহাবিরা দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন তা হলো আবু জান্দালকে কুরাইশদের কাছে ছেড়ে দেওয়া। তারা খোলাখুলিভাবে বিষয়টি রাসূলুল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ তাদের বুঝিয়ে বললেন আবু জান্দাল এবং তার মতো যারা আছে, তাদের নিষ্কৃতির পথ শীঘ্রই উন্মুক্ত হবে -- আল্লাহ তাকে এমনটাই ওয়াদা করেছেন। সাহাবিরা তাদের খটকা নিয়ে খোলাখুলিভাবে নবীজির সাথে আলোচনা করলেন এবং নবীজি তাদের কথা শুনে বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না। বরং তাদের শান্তভাবে বুঝিয়ে দিলেন যেন তাদের খটকাগুলো দূর হয়ে যায়।
তবে এখানে দুটো ব্যাপার উল্লেখ্য, মক্কার কেউ মুসলিম হয়ে মদীনায় আসলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দেওয়া এই নিয়মটি মুসলিম নারীদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হয়নি। আল্লাহ তাআলা এই ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেছেন,
"মু'মিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা করো। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা নিশ্চিত জানো যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিও না..." (সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১০)
তবে এই আয়াত দিয়ে মুসলিম নারীদের ব্যাপারে মূল চুক্তির শর্ত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, নাকি মূল চুক্তির শর্তে কিছুই উল্লেখ না থাকায় আল্লাহ তাআলা আয়াত পাঠিয়ে বিষয়্টা পরিষ্কার করে দিয়েছেন--সেটা নিশ্চিত নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
টিকাঃ
৭৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬।