📄 সংঘর্ষের ঘটনা
"তিনি মক্কা উপত্যকায় তোমাদেরকে তাদের ওপর বিজয়ী করার পর তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা দেখেন।" (সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৪)
কুরাইশদের অনেকেই খুব করে চাচ্ছিল একটা যুদ্ধ বেঁধে যাক। সত্যি বলতে মুসলিমদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধ বাঁধার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন মক্কায় যেন কোনো যুদ্ধ না বাঁধে এবং তাই হয়েছে। কুরাইশদের ৮০ জনের একটি অস্ত্রশজ্জিত দল মুসলিমদের উপর অতর্কিতে হামলা চালানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু তারা ধরা পড়ে যায় এবং তাদের বন্দী করে রাখা হয়। আরও একটি ঘটনা ঘটে, সালামা ইবন আল-আকওয়াও ঘটনাক্রমে চার মুশরিককে বন্দী করেন। এরপর আল্লাহ তাআলা উপরের আয়াত নাযিল করলে রাসূলুল্লাহ সমস্ত বন্দীকে ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ছেড়ে দেন। পুরো ঘটনাকে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর রাসূল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন যে, সন্ধির পথে পা বাড়ানো ছাড়া কুরাইশদের আর কোনো উপায়ই থাকলো না।
📄 বাইয়াতুর রিদওয়ান
এই ঘটনার সময় উসমান ছিলেন মক্কায়। হঠাৎ গুজব উঠলো, উসমানকে হত্যা করা হয়েছে। এই কথা শুনামাত্র রাসূলুল্লাহ বনু নাজ্জারের তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা আলাদা আলাদা তাঁবুতে অবস্থান করছিল। উম্মে আম্মারা নামের বনু নাজ্জারের এক মহিলা রাসূলুল্লাহকে দেখতে পেলেন। তিনি বলেন, 'আমি নবীজিকে আমাদের তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। আমি ভাবলাম রাসূলুল্লাহর বুঝি কিছুর দরকার হয়েছে।' রাসূল এসে বসলেন এবং বললেন, 'আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছ থেকে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।' এরপর সাহাবিরা একে একে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত করলেন।
কীসের ওপর এই বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নেওয়া হয়েছিল সেটা নিয়ে একাধিক বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনায় আছে এই বাইয়াত হচ্ছে মৃত্যুর বাইয়াত। অন্য বর্ণনায় আছে এই বাইয়াত হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন না করার বাইয়াত। তৃতীয় বর্ণনা বলছে এই বাইয়াত ছিল রাসূলুল্লাহর অন্তরে যা আছে তার প্রতি বাইয়াত। এই বর্ণনা থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, সাহাবিরা জানতেন না নবীজি কী চান। কিন্তু তারা সেই না-জানা জিনিসের উপরই বাইয়াত দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে এই বাইয়াতের অর্থ দাঁড়ায়-- আমরা এই শপথ করছি যে আল্লাহর রাসূল আমাদের যা করতে বলবেন আমরা তা-ই করবো। এই বাইয়াতকে বলা হয় বাইয়াতুর রিদওয়ান। রিদওয়ান মানে সন্তুষ্টি। এই বাইয়াতের পর আল্লাহ মুসলিমদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।
এই বাইয়াত নেওয়া হয়েছিল বনু নাজ্জারের তাঁবুর সামনে। বনু নাজ্জার ছিল আল খাযরাজের অন্তর্ভুক্ত। সম্পর্কের দিক থেকে রাসূলুল্লাহর মায়ের দিকের আত্মীয়। তারা ছিল রাসূলুল্লাহর খুব কাছের। বলা যেতে পারে রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিগত সৈন্যবাহিনীর মতো। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার সময় প্রথমে মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে তিনি ছিলেন বনু আমর ইবন আউফ গোত্রের সাথে। মদীনায় প্রবেশ করার পর তিনি থেকেছেন বনু নাজ্জারদের বাড়িতে। বনু নাজ্জারের লোকেরা রাসূলুল্লাহকে ঘিরে রেখেছিল। তার সুরক্ষার জন্যে তারা সেদিন তলোয়ার নিয়ে রাসূলুল্লাহর চারিদিকে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই বাইয়াতে রিদওয়ান নেওয়ার জন্যেও তিনি বনু নাজ্জারের তাঁবুর সামনেই গিয়েছিলেন। উম্মে আম্মারার বর্ণনায়,
'আমার স্বামীর বাইয়াত দেওয়ার সময় হাতে তলোয়ার ধরা ছিল, কারণ এটি হচ্ছে মৃত্যুর বাইয়াত। এই দৃশ্য দেখে আমি আমার কোমরবন্ধনীর সাথে একটি ছুরি বেঁধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। তখন যদি আমার সামনে কোনো লোক যুদ্ধ করতে আসতো তাহলে আমি তার শরীরে ছুরি ঢুকিয়ে দিতাম, ছুরির বাট দিয়ে তাকে আঘাত করতাম।'
রাসূলুল্লাহর মহিলা সাহাবিরাও এমনই সাহসিকতার অধিকারী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের জন্যে, রাসূলুল্লাহর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতে এক মুহূর্তের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। যে কাজটি করতে আজকের অনেক পুরুষও আমতা আমতা করবে।
সর্বপ্রথম বাইয়াত দেন আবু সিনান আবদুল্লাহ ইবন ওয়াহাব আল-আসদী। সালামাহ ইবন আল-আকওয়া থেকে আল্লাহর রাসূল তিনবার বাইয়াত নেন। শুরুতে, মাঝে এবং শেষে। সেদিন বাইয়াত নেন সব মিলিয়ে চৌদ্দশো সাহাবি।
বাইয়াতে রিদওয়ান প্রসঙ্গে শিয়াদের একটি দাবি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। শিয়ারা উসমানকে পছন্দ করে না। উসমানের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তাই তারা বলে, উসমান বদর যুদ্ধে অংশ নেননি, উসমান বাইয়াতে রিদওয়ানের সময়ও ছিলেন না ইত্যাদি। বদরের যুদ্ধে উসমানের অংশ না নেওয়ার আগেই বলা হয়েছে, সে মুহূর্তে উসমানের স্ত্রী, রাসূলুল্লাহর কন্যা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। স্বয়ং আল্লাহর রাসূলই তাকে যুদ্ধে অংশ নিতে বারণ করেন এবং স্ত্রীর পাশে থাকার নির্দেশ দেন। আর উসমানের বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ না নেওয়ার কারণ কী? এই প্রশ্ন একমাত্র বোকারাই করতে পারে। কারণ বাইয়াতে রিদওয়ানের পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছেন উসমান। তাঁর মৃত্যুর গুজব শুনেই মুসলিমদের থেকে বাইয়াত নেওয়া হয়েছিল। আর সত্যি বলতে, তিনি বাইয়াহ দিয়েছিলেন। রাসূল নিজের এক হাত অন্য হাতের ওপর রেখে বলেছিলেন, 'এইটা হচ্ছে উসমানের বাইয়াত।' উসমান নিজের হাতে বাইয়াত দেননি কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহর হাত তার প্রতিনিধিত্ব করেছে।
বাইয়াত দেওয়া শেষ হলে রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা হচ্ছো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।'
টিকাঃ
৭৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযী, হাদীস ১১১।
📄 বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের মর্যাদা
১) "যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অতি অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যেই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ সত্ত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১০)
যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন তাদের জন্য এটা একটা বিরাট সম্মান। তারা বাইয়াত করেছিলেন রাসূলুল্লাহর হাতে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন এই বাইয়াত ছিল আল্লাহর কাছেই। ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ছিলেন আল্লাহ তাআলা এবং সাহাবিদের মাঝে একজন প্রতিনিধিস্বরুপ। কারণ যে আনুগত্যের শপথ তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে করেছিলেন, সেটা ছিল আসলে স্বয়ং আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ।'
২) "আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন। এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ লদ্ধ সম্পদ যা তারা হস্তগত করবে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮-১৯)
আল্লাহ সেই চৌদ্দশো সাহাবির ওপরে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দিলেন। এর থেকে বিশাল ঘটনা আর কী হতে পারে! দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ তাআলা এই মানুষগুলোকে সবচাইতে বড় সুখবর জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই লোকগুলোর অন্তরে কী আছে তা তিনি জানতেন। অর্থাৎ এই সাহাবিদের আন্তরিকতা আর ঈমান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। একই সাথে আল্লাহ তাআলা তাদের আসন্ন বিজয় এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভের সুসংবাদ দিচ্ছেন। এটি হলো খাইবারের বিজয়ের সুসংবাদ।
৩) বাইয়াতে রিদওয়ানের সাহাবিরা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবেন না। জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল হাফসাকে বলেছেন, 'ইনশা আল্লাহ, গাছের নিচে যারা বাইয়াত করেছিল, তারা কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।' ইমাম নববীর মতে, এখানে ইনশা আল্লাহ বলার অর্থ আল্লাহর বরকতের আশা করা, সন্দেহ পোষণ করা নয়।
৪) অন্য একটি হাদীসে আছে যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র লাল উটের মালিককে ছাড়া। এই লাল উটের মালিক হচ্ছে জা’দ ইবন কায়েস। বাইয়াত দেওয়ার ভয়ে সে নিজেকে রাসূল থেকে আড়াল করে রেখেছিল। মর্যাদা অনুযায়ী ভাগ করা হলে প্রথমেই আসবে সেই দশজন সাহাবি যাদের জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর হচ্ছেন সেইসব সাহাবি যারা বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আর তারপর হচ্ছেন বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা। তারা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ।
৫) বাইয়াতে রিদওয়ানের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা তাদের শুধুমাত্র একজন সাথীর জন্যেও যুদ্ধ করতে এবং মৃত্যুবরণ করতে একতাবদ্ধ। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত। শরীরের একটি অংশ ব্যথা পেলে সমস্ত শরীরেই সেই ব্যথা সংক্রমিত হয়। সেই জন্যেই পুরো ১৪০০ লোকের মুসলিম বাহিনী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র একজন মানুষের জন্যে।
পরবর্তীতে জানা যায় যে, উসমান জীবিত আছেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল গুজবমাত্র। কিন্তু তারপরও এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা হয়ে আছে। এই বাইয়াতের ঘটনা অনন্যসাধারণ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে ইসলাম এবং রাসূলুল্লাহর জন্যে সাহাবিরা মৃত্যুর শপথ নিয়েছিলেন। তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। বাইয়াতের ঘটনা মক্কার মুশরিকদের অন্তরে প্রবল ভীতির সৃষ্টি করেছিল। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাইয়াত দেওয়া শেষ হলে রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা হচ্ছো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।' আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'
টিকাঃ
৭৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ১৯৮।
📄 সমঝৌতার পথ
কুরাইশের লোকেরা শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে রাজি হলো। এদিকে উসমানও ততক্ষণে ফিরে এসেছেন। কুরাইশরা মুসলিমদের কাছে মুখপাত্র হিসেবে পাঠালো সুহাইল ইবন আমরকে। সুহাইল তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন একজন কুশলী কূটনীতিক। বাক্যবাগীশ, বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। সুহাইলের দায়িত্ব ছিল চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে মুসলিমদের সাথে বোঝাপড়া করা। সুহাইলকে দেখামাত্র নবীজি সাহাবিদের বলে উঠলেন, 'তোমাদের কাজ এবার সহজ হয়ে যাবে।'
রাসূলুল্লাহ এবং সুহাইল ইবন আমর বেশ খানিকক্ষণ ধরে সন্ধির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করলেন। তবে মুসলিমরা যাতে সে বছর মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে -- সে ব্যাপারে কাফিররা ছিল বদ্ধপরিকর। এই একটা জায়গাতে তারা কিছুতেই ছাড় দেবে না। তারা এটা মানতেই পারছিল না যে, লোকে বলাবলি করবে রাসূলুল্লাহ তাদের ওপর জোর খাটিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে পেরেছে। এটা ছিল তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন। নবীজি এই বিষয়ে তাদের সাথে আপস করার বহু চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হলো না।
নবীজি চেষ্টা করেছেন যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে হলেও একটা মীমাংসা হোক। তিনি আগেই বলেছিলেন, 'তারা যদি আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে আহবান করে যাতে ইসলামের পবিত্রতা লঙ্ঘিত না হয়, তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে তাদের প্রস্তাব কবুল করবো।'
শান্তিচুক্তির শর্তাবলি এতক্ষণ পর্যন্ত মুখে মুখে আলোচনা করা হয়েছে। বাকি ছিল খালি লিখিত করা। উমার ইবন খাত্তাব চুক্তির শর্তগুলো শুনে খুবই আহত হলেন। নবীজির কাছে গিয়ে বললেন,
- আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
-তাহলে আমরা আমাদের দ্বীনকে কেন ছোট করবো?
উমার ইবন খাত্তাবের চোখে মনে হচ্ছিল এই ধরনের একটি চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তার বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন -- আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল, আপনি হকের ওপরে আছেন। আমরা মুসলিমরা সত্যের অনুসারী। আর তারা হলো মুশরিক, তারা আছে বাতিলের ওপরে। তাদের সাথে কেন আমাদের এমন চুক্তি করতে হবে যার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান নিচু হয়ে যাবে?
রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'শোনো, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি তাঁর অবাধ্য হবো না, আর তিনিও আমাকে পরিত্যাগ করবেন না।'
উমার তার কথা বোঝাতে না পেরে মরিয়া হয়ে আবু বকরের কাছে গেলেন।
- আবু বকর, আমাকে বলুন, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
- হ্যাঁ।
- আমরা কি মুসলিম নই?
- হ্যাঁ।
- ওরা কি কুফফার নয়?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমরা কেন আমাদের দ্বীনকে ছোট করছি?
আবু বকর শক্তভাবে বললেন, 'তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল, তাঁর অনুসরণ করো। আল্লাহ কক্ষণো তাঁকে পরিত্যাগ করবেন না।'
এরপর আর উমার কিছু বললেন না। পরবর্তীতে এই আচরণের জন্যই উমার ইবন খাত্তাব অনেক অনুশোচনা করেছিলেন। যদিও ভালো নিয়তেই তর্ক করেছিলেন। আসলে উমার ইবন খাত্তাব হকের ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর ছিলেন, তাকে বলা হতো আল ফারুক। তিনি ছিলেন একজন সতর্ক ব্যক্তি। হক-বাতিলের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতেন, নফসের ধোঁকায় পড়তেন না, কেউ তাকে ধোঁকা দিতে পারতো না, এমনকি শয়তান পর্যন্ত তাকে ভয় পেতো! তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী ব্যক্তি। এখানে তিনি চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কারণ তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হোক। চুক্তির শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে তার কাছে অপমানজনক মনে হচ্ছিল, তাই কাফিরদের সাথে বোঝাপড়া করে চুক্তি করাটা তিনি মানতে পারছিলেন না। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন -- ব্যাপারটি নবুওয়াতের মাধ্যমে ফায়সালা করা হয়েছে, নবীজি নিজে থেকে কিছুই করেননি -- তখন উমার চুপ হয়ে গেলেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে উমার ইবন খাত্তাব বলতেন, 'সেই দিনে আমি যা বলেছি আর যা ভুল করেছি, সেই ভয়ে আমি নিয়মিত (নফল) সালাহ, সাওম, দান-সাদাকাহ আর দাস আযাদ করতে থাকি।' কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'ভালো কাজ খারাপ কাজকে মুছে দেয়।' কাজেই আমাদের উচিত কোনো ভুল করলে, বেশি বেশি ভালো কাজ করা, যেমনটা উমার করেছিলেন।