📄 উরওয়া ইবন মাসউদ
কুরাইশদের সব প্রচেষ্টা একে একে ব্যর্থ হতে লাগলো। তারা যাকেই পাঠায়, প্রত্যেকেই মুসলিমদের উমরা করতে দেওয়ার পক্ষে মত দিতে থাকে। তাদের মনমতো কাউকে তারা পাচ্ছিল না। বিষয়টি খেয়াল করলেন উরওয়া ইবন মাসউদ। উরওয়া ছিলেন তাইফের বিশিষ্ট কূটনীতিক। সে বুঝতে পেরেছিল জনমত মুসলিমদের পক্ষে, কুরাইশদের একগুঁয়েমিতে কাজ হবে না। অবস্থার হাল ধরতে সে নিজেই এগিয়ে গেল, কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলল,
- তোমরা কি আমার পিতা নও?
- হ্যাঁ।
- আমি কি তোমাদের ছেলে নই? উরওয়া ছিলেন তাইফের কিন্তু তার মা ছিলেন কুরাইশি।
- হ্যাঁ, তুমি আমাদের ছেলে।
- বলো, আমার বিরুদ্ধে কি তোমাদের কোনো অভিযোগ আছে?
- না, নেই।
- উকাযের ঘটনা মনে আছে? আমি কি সে সময় তোমাদের পক্ষ নিইনি?
- হ্যাঁ, নিয়েছো।
এসব কথাবার্তা মনে করিয়ে দিয়ে সে কুরাইশদের কাছে আস্থা অর্জন করে নিলো। কুরাইশরাও দেখলো তাইফের হলেও উরওয়া তো তাদের পক্ষেরই লোক, তার উপর ভরসা করা যায়। এবার তারা তাকেই দূত হিসেবে নিযুক্ত করলো। উরওয়া ইবন মাসউদ রাসূলুল্লাহর কাছে গেল। তার উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। বর্তমানের পরিভাষায় যাকে বলে -- Psychological Warfare বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাসূলুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলল,
'মুহাম্মাদ! ধরে নিলাম তুমি তোমার স্বজাতিকে যুদ্ধে পরাজিত করলে, আচ্ছা, তুমি কি কখনো এমন আরবের কথা শুনেছো যে নিজ জাতিকে ধ্বংস করেছে? আর যদি কুরাইশদের হাতে তুমি পরাজিত হও, তাহলে আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি যে কাপুরুষ লোকগুলোকে জড়ো করেছো, এরা একটাও তোমার পাশে থাকবে না, সবকটা তোমাকে ছেড়ে পালাবে!'
উরওয়া তার বক্তব্যকে এমনভাবে সাজালো যেন রাসূলুল্লাহই হচ্ছেন অপরাধী আর কুরাইশরা সাধু! যেন রাসূলুল্লাহ এসেছেন যুদ্ধ করতে আর কুরাইশরা শান্তি চায়! অথচ ঘটনা ছিল পুরোই উল্টো -- রাসূলুল্লাহ এসেছেন শান্তিপূর্ণভাবে উমরা করতে আর কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিচ্ছিল। বর্তমান সময়ে আমরা দেখি, পশ্চিমা শক্তি এভাবেই তাদের বক্তব্যকে সাজায়। তাদের ভাবটা এমন যে মুসলিমরা হলো সন্ত্রাসী, তারাই শান্তি বিনষ্ট করছে আর পশ্চিমারা হলো শান্তিকামী। অথচ বাস্তবতা হলো, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে পশ্চিমারাই মুসলিম ভূমিগুলোতে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে এবং লুটপাট-সন্ত্রাস-ধংসযজ্ঞ করে চলেছে। আর আমরা অনেক মুসলিমরাও তাদের এই 'পিসফুল' ন্যারেটিভে বিশ্বাস করে বসে আছি।
যাই হোক, উরওয়া ইবন মাসউদ এর কথা থেকে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট। সে ইসলামকে বিচার করছিল জাহিলিয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আরবদের সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক, তাদের কাছে গোত্রপরিচয়টাই ছিল সব! অন্যায় করলেও তারা নিজ গোত্রের পক্ষ নেবে, নিজ গোত্রের জন্য তারা জীবন দিতেও রাজি। তাই একজন মানুষ নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে -- এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। আজকের হিসেবে অনেকটা নিজ দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো ব্যাপার। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাই করছিলেন। তিনি কুরাইশ হয়েও কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। দ্বীন বা ধর্মের অবস্থান যে গোত্র বা জাতিপরিচয়েরও ওপরে -- জাহিল আরবরা সেটা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তাই উরওয়া বলতে চাইছিল, কেমন করে তুমি নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছো? এমন নিকৃষ্ট একটা কাজ তুমি কীভাবে করতে পারো?
উরওয়ার জাহিলি দৃষ্টিভঙ্গি আরও একটি ব্যাপার হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেটা হলো মুসলিমদের ঐক্যের ভিত্তি। সাহাবিরা ছিলেন বিভিন্ন গোত্র থেকে আগত। সেখানে যেমন সম্মানিত কুরাইশ বংশের লোক ছিল, তেমনি ছিল আওস, খাযরাজ গোত্র, ছিল আসলাম এবং গিফারের মতো নিচু শ্রেণির গোত্র। এই গোত্রগুলোকে উরওয়া তৃতীয় শ্রেণীর গোত্র বলে মনে করতো। তার ধারণা ছিল মানুষ শুধু নিজ গোত্রের জন্যই যুদ্ধ করে। কিন্তু একজন মুসলিম যুদ্ধ করে তার দ্বীনের জন্য, আদর্শের জন্য, গোত্র পরিচয় এখানে মুখ্য নয়। বরং উচু-নিচু সকল গোত্রের মানুষকে ইসলাম এক সমতলে আনতে পেরেছে। কারণ এই বন্ধন হলো ঈমানের বন্ধন, জাতীয় বা গোত্রীয় বন্ধন থেকে তা অনেক বেশি শক্তিশালী। রাসূলুল্লাহর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা কত নিখাদ আর গভীর, উরওয়া সেটা তখনো টের পায়নি। তাই সে খোঁচা মেরে বলতে চাইছিল, বিপদে পড়লে তোমার সঙ্গীসাথীরা তোমাকে ফেলে পালিয়ে যাবে!
বলা বাহুল্য, এই কথাটি ছিল খুবই অপমানজনক। আবু বকর পাশেই ছিলেন, এই কথা শুনে তিনি প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। উরওয়াকে বললেন, 'যা ভাগ এখান থেকে! তুই গিয়ে তোদের দেবী আল-লাতের লজ্জাস্থান চোষ! আমরা আল্লাহর রাসূলকে ছেড়ে পালিয়ে যাবো? এই আমরা তাঁকে পরিত্যাগ করবো? হ্যাঁ? '
লজ্জাস্থান চোষার এই কথাটি ছিল আরবের প্রচলিত একটি গালি। আবু বকর এমনিতে শান্তশিষ্ট মানুষ ছিলেন, কিন্তু উরওয়ার এই কথায় তিনি শান্ত থাকতে পারলেন না। একেবারে গালি দিয়ে বসলেন। রাসূলুল্লাহ শুনলেন, কিছুই বললেন না। উরওয়া গালি হজম করে নিয়ে বললো, 'অতীতে তুমি আমাকে একবার উপকার করেছিল আবু বকর, সেটা আমার শোধ করা হয়নি। তা না হলে আজকে তোমার এই কথার উচিত জবাব দিয়ে দিতাম।'
উরওয়াকে একবার একশো উট রক্তপণ দিতে হয়েছিল। কিন্তু রক্তপণ আদায়ের সামর্থ্য তার ছিল না। আবু বকর তখন উরওয়াকে দশটি উট দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এটা জাহিলিয়াতের যুগের কথা। এই কারণে উরওয়া আবু বকরকে কিছু বললো না।
উরওয়া ইবন মাসউদ ছিলেন একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। কথার জোরে তিনি প্রতিপক্ষের মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে চাইছিলেন। নিজ গোত্রের সাথে তুমি কীভাবে যুদ্ধ করছো— এই কথা বলে তিনি রাসূলুল্লাহকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে চাচ্ছিলেন। আর সাহাবিদের গোত্রভিন্নতার দিকে আঙুল তুলে, তাদের কাপুরুষ আখ্যা দিয়ে রাসূলুল্লাহ আর সাহাবিদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করতে চাইছিলেন। পেশাদার রাজনীতিকের মতো তার কথায় আত্মবিশ্বাসের সুস্পষ্ট ছাপ। কিন্তু এসবের কিছুই মুসলিমদের টলাতে পারলো না, উল্টো উরওয়াই আবু বকরের আচরণ দেখে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল।
এরপরে ঘটলো আরও একটি ঘটনা। সমঝোতার আলোচনা চলাকালীন সময়ে উরওয়া আল্লাহর রাসূলের দাড়ি স্পর্শ করছিলেন। এটা সে যুগের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। দেহরক্ষী হিসেবে রাসূলুল্লাহর মাথার কাছে ছিলেন আল মুগীরা ইবন শু'বা। ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। উরওয়াকে দাড়ি ধরতে দেখে আল-মুগীরা তার সাথে থাকা তলোয়ারের বাট দিয়ে উরওয়ার হাতে আঘাত করে বললেন, 'তোমার ঐ হাত আল্লাহর রাসূলের দাড়ি থেকে সরিয়ে রেখো। বেশি দেরি করলে ঐ হাত আর তোমার কাছে ফেরত যাবে না।'
উরওয়া হতভম্ব হয়ে গেল, কেউ তার সাথে এমন রূঢ় আচরণ করতে পারে তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কে এভাবে তার সাথে এভাবে কথা বললো সেটাও বোঝার উপায় নেই কারণ আল-মুগিরা ইবন শু'বা ছিলেন আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা। উরওয়া রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এই লোক? তোমার বাহিনীতে এত রুক্ষ লোক আর একটিও দেখিনি।' রাসূলুল্লাহ মুচকি হেসে বললেন, 'এ হচ্ছে তোমার ভাতিজা আল-মুগিরা ইবন শু'বা।'
উরওয়া যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে তার ভাতিজা মুগীরাকে উদ্দেশ্য করে বললো, 'বিশ্বাসঘাতক কোথাকার! তোর অপকর্মের দাগ তো মাত্র সেদিন পরিষ্কার করলাম!'
উরওয়া তার ভাতিজা মুগীরাকে অতীতের একটা ঘটনা নিয়ে খোঁচা দিলেন। একবার মুগীরা তেরো জন মুশরিকের সাথে সফরে বের হন এবং পথিমধ্যে তাদের লুট করে তাদের হত্যা করেন। সাকিফের গোত্রগুলোর মধ্যে তখন সেটা নিয়ে ব্যাপক যুদ্ধ লাগার মতো অবস্থা তৈরি হয়। উরওয়া নিজের ভাতিজাকে বাঁচানোর জন্য তার হয়ে রক্তমূল্য পরিশোধ করে দেন। ইতিমধ্যে মুগীরা মদীনায় চলে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল তাকে বললেন, 'তোমার মুসলিম হওয়া আমি মেনে নিলাম, কিন্তু যে ধনসম্পদ নিয়ে এসেছো সেটা আমি গ্রহণ করবো না।' যেহেতু মুগীরা অন্যায়ভাবে সফরের মধ্যে তাদের সম্পদ হস্তগত করেছিলেন, তাই সেই সম্পদ রাসূলুল্লাহ গ্রহণ করেননি। একই সাথে তিনি মুশরিকদের কাছে এ বিষয় নিয়ে কোনো ক্ষমাও চাননি।
এখানে লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, ইসলাম মানুষের চরিত্রকে কী অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়! জাহিলিয়াতের জীবনে মুগীরা ইবন শু'বা ছিলেন মদখোর, লুটতরাজ আর খুনখারাপি করা একজন মানুষ। ইসলামে এসে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহর দেহরক্ষক, রাসূলুল্লাহর ভালোবাসায় নিবেদিত প্রাণ! আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা যে বাকি সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার দৃষ্টান্ত হলেন আল-মুগীরা। মুগীরা ইবন শু'বাকে তার চাচা উরওয়া একটা বড় বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। এই জন্যে মুগীরা ইবন শু'বার উচিত ছিল উরওয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু না, রাসূলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি উরওয়াকে এতটুকু ছাড় দেননি।
উরওয়া ফিরে এলেন। উরওয়া গিয়েছিলেন মুসলিমদের মনোবলকে নষ্ট করে দিতে, অথচ নিজেই হার মেনে গেলেন। ইসলাম আর মুসলিমদের ব্যাপারে এক নতুন ধারণা নিয়ে ফিরে এলেন। কুরাইশদের বললেন,
"হে কুরাইশ, আমি আমার জীবনে পারস্যের বাদশাহ কিসরাকে দেখেছি। রোমের সম্রাট কায়সারকে দেখেছি, দেখেছি রাজা নাজাশীকে। আল্লাহর কসম করে বলছি, মুহাম্মদের অনুসারীরা তাঁকে যেভাবে করে সম্মান করে-- এমনটা আমি আর কোথাও দেখিনি। তিনি শুধু একটা কাজের কথা বলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুসারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই কাজ করে ফেলে। তিনি যখন থু থু ফেলেন, তাঁর অনুসারীরা হাত বাড়িয়ে সেই থুথু তালুতে নেয়, বরকতের আশায় শরীরে মাখে। তিনি যখন ওযু করেন, তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়, আর প্রত্যেকে সেই পানি সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যখন তিনি কোনো কথা বলেন, তাঁর অনুসারীরা চুপ করে তাঁর কথা শোনে, সম্মানের আতিশয্যে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকায় পর্যন্ত না।
তোমরা নিশ্চিত থাকো, তোমরা যদি তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে চাও, এই লোকগুলো কখনো তাদের নেতাকে ছেড়ে যাবে না। নিজেদের নেতাকে তারা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করে যাবে। তারা কোনোকিছুর তোয়াক্কা করবে না... এমন একজন মানুষ যখন তোমাদের প্রস্তাব দিয়েছে, আমার পরামর্শ হচ্ছে তার প্রস্তাব গ্রহণ করা। তোমরা তাদেরকে হারাতে পারবে না। আমি তোমাদের জন্য কোনো আশা দেখছি না। তোমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই তার প্রস্তাব গ্রহণ করো।"
উরওয়ার এই চমৎকার কথাগুলো কুরাইশদের মন ভরাতে পারলো না। যদিও তারা ঠিকই জানতো উরওয়া যা বলছেন সত্যিই বলছেন।
উরওয়া ইসলামের ব্যাপারে শুনেছেন, কিন্তু যখন নিজের চোখের সামনে ইসলামকে দেখলেন, তার ধারণা পাল্টে গেল। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ উরওয়ার জন্য এটা ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। মুসলিমদের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। এই ঘটনা ছিল উরওয়ার প্রতি ইসলামের দাওয়াহ। এই দাওয়াহ খালি কথার দাওয়াহ ছিল না, এই দাওয়াহ ছিল কাজের মাধ্যমে দাওয়াহ। নিঃসন্দেহে কাজের মাধ্যমে দাওয়াহ অন্তরে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।
টিকাঃ
৭৪. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১২।
📄 সংঘর্ষের ঘটনা
"তিনি মক্কা উপত্যকায় তোমাদেরকে তাদের ওপর বিজয়ী করার পর তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা দেখেন।" (সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৪)
কুরাইশদের অনেকেই খুব করে চাচ্ছিল একটা যুদ্ধ বেঁধে যাক। সত্যি বলতে মুসলিমদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধ বাঁধার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন মক্কায় যেন কোনো যুদ্ধ না বাঁধে এবং তাই হয়েছে। কুরাইশদের ৮০ জনের একটি অস্ত্রশজ্জিত দল মুসলিমদের উপর অতর্কিতে হামলা চালানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু তারা ধরা পড়ে যায় এবং তাদের বন্দী করে রাখা হয়। আরও একটি ঘটনা ঘটে, সালামা ইবন আল-আকওয়াও ঘটনাক্রমে চার মুশরিককে বন্দী করেন। এরপর আল্লাহ তাআলা উপরের আয়াত নাযিল করলে রাসূলুল্লাহ সমস্ত বন্দীকে ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ছেড়ে দেন। পুরো ঘটনাকে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর রাসূল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন যে, সন্ধির পথে পা বাড়ানো ছাড়া কুরাইশদের আর কোনো উপায়ই থাকলো না।
📄 বাইয়াতুর রিদওয়ান
এই ঘটনার সময় উসমান ছিলেন মক্কায়। হঠাৎ গুজব উঠলো, উসমানকে হত্যা করা হয়েছে। এই কথা শুনামাত্র রাসূলুল্লাহ বনু নাজ্জারের তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা আলাদা আলাদা তাঁবুতে অবস্থান করছিল। উম্মে আম্মারা নামের বনু নাজ্জারের এক মহিলা রাসূলুল্লাহকে দেখতে পেলেন। তিনি বলেন, 'আমি নবীজিকে আমাদের তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। আমি ভাবলাম রাসূলুল্লাহর বুঝি কিছুর দরকার হয়েছে।' রাসূল এসে বসলেন এবং বললেন, 'আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছ থেকে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।' এরপর সাহাবিরা একে একে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত করলেন।
কীসের ওপর এই বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নেওয়া হয়েছিল সেটা নিয়ে একাধিক বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনায় আছে এই বাইয়াত হচ্ছে মৃত্যুর বাইয়াত। অন্য বর্ণনায় আছে এই বাইয়াত হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন না করার বাইয়াত। তৃতীয় বর্ণনা বলছে এই বাইয়াত ছিল রাসূলুল্লাহর অন্তরে যা আছে তার প্রতি বাইয়াত। এই বর্ণনা থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, সাহাবিরা জানতেন না নবীজি কী চান। কিন্তু তারা সেই না-জানা জিনিসের উপরই বাইয়াত দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে এই বাইয়াতের অর্থ দাঁড়ায়-- আমরা এই শপথ করছি যে আল্লাহর রাসূল আমাদের যা করতে বলবেন আমরা তা-ই করবো। এই বাইয়াতকে বলা হয় বাইয়াতুর রিদওয়ান। রিদওয়ান মানে সন্তুষ্টি। এই বাইয়াতের পর আল্লাহ মুসলিমদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।
এই বাইয়াত নেওয়া হয়েছিল বনু নাজ্জারের তাঁবুর সামনে। বনু নাজ্জার ছিল আল খাযরাজের অন্তর্ভুক্ত। সম্পর্কের দিক থেকে রাসূলুল্লাহর মায়ের দিকের আত্মীয়। তারা ছিল রাসূলুল্লাহর খুব কাছের। বলা যেতে পারে রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিগত সৈন্যবাহিনীর মতো। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার সময় প্রথমে মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে তিনি ছিলেন বনু আমর ইবন আউফ গোত্রের সাথে। মদীনায় প্রবেশ করার পর তিনি থেকেছেন বনু নাজ্জারদের বাড়িতে। বনু নাজ্জারের লোকেরা রাসূলুল্লাহকে ঘিরে রেখেছিল। তার সুরক্ষার জন্যে তারা সেদিন তলোয়ার নিয়ে রাসূলুল্লাহর চারিদিকে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই বাইয়াতে রিদওয়ান নেওয়ার জন্যেও তিনি বনু নাজ্জারের তাঁবুর সামনেই গিয়েছিলেন। উম্মে আম্মারার বর্ণনায়,
'আমার স্বামীর বাইয়াত দেওয়ার সময় হাতে তলোয়ার ধরা ছিল, কারণ এটি হচ্ছে মৃত্যুর বাইয়াত। এই দৃশ্য দেখে আমি আমার কোমরবন্ধনীর সাথে একটি ছুরি বেঁধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। তখন যদি আমার সামনে কোনো লোক যুদ্ধ করতে আসতো তাহলে আমি তার শরীরে ছুরি ঢুকিয়ে দিতাম, ছুরির বাট দিয়ে তাকে আঘাত করতাম।'
রাসূলুল্লাহর মহিলা সাহাবিরাও এমনই সাহসিকতার অধিকারী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের জন্যে, রাসূলুল্লাহর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতে এক মুহূর্তের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। যে কাজটি করতে আজকের অনেক পুরুষও আমতা আমতা করবে।
সর্বপ্রথম বাইয়াত দেন আবু সিনান আবদুল্লাহ ইবন ওয়াহাব আল-আসদী। সালামাহ ইবন আল-আকওয়া থেকে আল্লাহর রাসূল তিনবার বাইয়াত নেন। শুরুতে, মাঝে এবং শেষে। সেদিন বাইয়াত নেন সব মিলিয়ে চৌদ্দশো সাহাবি।
বাইয়াতে রিদওয়ান প্রসঙ্গে শিয়াদের একটি দাবি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। শিয়ারা উসমানকে পছন্দ করে না। উসমানের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তাই তারা বলে, উসমান বদর যুদ্ধে অংশ নেননি, উসমান বাইয়াতে রিদওয়ানের সময়ও ছিলেন না ইত্যাদি। বদরের যুদ্ধে উসমানের অংশ না নেওয়ার আগেই বলা হয়েছে, সে মুহূর্তে উসমানের স্ত্রী, রাসূলুল্লাহর কন্যা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। স্বয়ং আল্লাহর রাসূলই তাকে যুদ্ধে অংশ নিতে বারণ করেন এবং স্ত্রীর পাশে থাকার নির্দেশ দেন। আর উসমানের বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ না নেওয়ার কারণ কী? এই প্রশ্ন একমাত্র বোকারাই করতে পারে। কারণ বাইয়াতে রিদওয়ানের পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছেন উসমান। তাঁর মৃত্যুর গুজব শুনেই মুসলিমদের থেকে বাইয়াত নেওয়া হয়েছিল। আর সত্যি বলতে, তিনি বাইয়াহ দিয়েছিলেন। রাসূল নিজের এক হাত অন্য হাতের ওপর রেখে বলেছিলেন, 'এইটা হচ্ছে উসমানের বাইয়াত।' উসমান নিজের হাতে বাইয়াত দেননি কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহর হাত তার প্রতিনিধিত্ব করেছে।
বাইয়াত দেওয়া শেষ হলে রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা হচ্ছো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।'
টিকাঃ
৭৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযী, হাদীস ১১১।
📄 বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের মর্যাদা
১) "যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অতি অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যেই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ সত্ত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১০)
যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন তাদের জন্য এটা একটা বিরাট সম্মান। তারা বাইয়াত করেছিলেন রাসূলুল্লাহর হাতে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন এই বাইয়াত ছিল আল্লাহর কাছেই। ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ছিলেন আল্লাহ তাআলা এবং সাহাবিদের মাঝে একজন প্রতিনিধিস্বরুপ। কারণ যে আনুগত্যের শপথ তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে করেছিলেন, সেটা ছিল আসলে স্বয়ং আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ।'
২) "আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন। এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ লদ্ধ সম্পদ যা তারা হস্তগত করবে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮-১৯)
আল্লাহ সেই চৌদ্দশো সাহাবির ওপরে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দিলেন। এর থেকে বিশাল ঘটনা আর কী হতে পারে! দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ তাআলা এই মানুষগুলোকে সবচাইতে বড় সুখবর জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই লোকগুলোর অন্তরে কী আছে তা তিনি জানতেন। অর্থাৎ এই সাহাবিদের আন্তরিকতা আর ঈমান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। একই সাথে আল্লাহ তাআলা তাদের আসন্ন বিজয় এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভের সুসংবাদ দিচ্ছেন। এটি হলো খাইবারের বিজয়ের সুসংবাদ।
৩) বাইয়াতে রিদওয়ানের সাহাবিরা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবেন না। জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল হাফসাকে বলেছেন, 'ইনশা আল্লাহ, গাছের নিচে যারা বাইয়াত করেছিল, তারা কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।' ইমাম নববীর মতে, এখানে ইনশা আল্লাহ বলার অর্থ আল্লাহর বরকতের আশা করা, সন্দেহ পোষণ করা নয়।
৪) অন্য একটি হাদীসে আছে যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নিয়েছে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র লাল উটের মালিককে ছাড়া। এই লাল উটের মালিক হচ্ছে জা’দ ইবন কায়েস। বাইয়াত দেওয়ার ভয়ে সে নিজেকে রাসূল থেকে আড়াল করে রেখেছিল। মর্যাদা অনুযায়ী ভাগ করা হলে প্রথমেই আসবে সেই দশজন সাহাবি যাদের জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর হচ্ছেন সেইসব সাহাবি যারা বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আর তারপর হচ্ছেন বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা। তারা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ।
৫) বাইয়াতে রিদওয়ানের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা তাদের শুধুমাত্র একজন সাথীর জন্যেও যুদ্ধ করতে এবং মৃত্যুবরণ করতে একতাবদ্ধ। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত। শরীরের একটি অংশ ব্যথা পেলে সমস্ত শরীরেই সেই ব্যথা সংক্রমিত হয়। সেই জন্যেই পুরো ১৪০০ লোকের মুসলিম বাহিনী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র একজন মানুষের জন্যে।
পরবর্তীতে জানা যায় যে, উসমান জীবিত আছেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল গুজবমাত্র। কিন্তু তারপরও এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা হয়ে আছে। এই বাইয়াতের ঘটনা অনন্যসাধারণ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে ইসলাম এবং রাসূলুল্লাহর জন্যে সাহাবিরা মৃত্যুর শপথ নিয়েছিলেন। তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। বাইয়াতের ঘটনা মক্কার মুশরিকদের অন্তরে প্রবল ভীতির সৃষ্টি করেছিল। তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাইয়াত দেওয়া শেষ হলে রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা হচ্ছো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।' আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'
টিকাঃ
৭৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ১৯৮।