📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রেরিত বুদাইল ইবন ওয়ারকা

📄 কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রেরিত বুদাইল ইবন ওয়ারকা


কুরাইশরাও দূত পাঠাতে লাগলো। প্রথমে তারা পাঠালো বুদাইল ইবন ওয়ারকাকে। সে ছিল বনু খুযাআ গোত্রের। সে সাথে করে নিজ গোত্রের আরও কিছু লোক নিয়ে এসেছিল। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, খুযাআ গোত্র হচ্ছে রাসূল এবং মুসলিমদের প্রতি বিশ্বস্ত। এমন বর্ণনা আছে যে, খুযাআ গোত্র মক্কার যাবতীয় তথ্য নবীজিকে পাচার করতো।

নবীজির যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল বিভিন্ন গোত্রের সাথে তাঁর সম্পর্ক। কুরাইশরা তার শত্রু হলেও বনু খুযাআর সাথে তার সুসম্পর্ককে তিনি নিজের কাজে লাগিয়েছেন। যাই হোক, বুদাইল রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'কুরাইশরা এমন উট নিয়ে এসেছে যে দুধ দেয়।' অর্থাৎ, কুরাইশরা দীর্ঘদিন অবস্থানের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। পরিস্থিতি যদি থাকার দাবি করে, তাহলে তারা সেটাই করবে। তারা যুদ্ধের জন্যে তৈরি। রাসূলুল্লাহ তখন তাকে বুঝিয়ে বললেন যুদ্ধ করার তার উদ্দেশ্য নয়, বায়তুল্লাহর যিয়ারত করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।

বুদাইল রাসূলুল্লাহর এই বার্তা নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। কিন্তু কুরাইশরা তাকে পাত্তাই দিল না, তারা তাকে উপেক্ষা করলো। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনলো, তার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। সে তাদের বললো, 'কুরাইশরা, তোমরা মুহাম্মাদের সাথে বাড়াবাড়ি করছো। যুদ্ধ করার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি আসেননি, তিনি বায়তুল্লাহ যিয়ারত করতে এসেছেন।' বলাই বাহুল্য, এসব কথা কুরাইশদের মোটেও পছন্দ হলো না।

টিকাঃ
৭৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মিকরাজ ইবন হাফস

📄 মিকরাজ ইবন হাফস


বুদাইলের পর কুরাইশরা পাঠালো মিখরাজ ইবন হাফসকে। তাকে দেখামাত্র রাসূলুল্লাহ বলে উঠলেন, 'সে হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক!' মিখরাজের স্বভাব সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। দেখা গেল মিখরাজ কুরাইশদের চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটি দল নিয়ে মুসলিমদের তাঁবুর চারপাশে ঘুরঘুর করছে। তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মধ্যে কাউকে একা পেলে তাকে বন্দী করে কুরাইশদের হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টো, মিখরাজের পুরো বাহিনীই মুসলিমদের হাতে ধরা পড়ল। শুধুমাত্র সে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচল। রাসূলুল্লাহ চাচ্ছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাই তিনি বন্দীদের বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুলাইস ইবন আলকামাহ

📄 হুলাইস ইবন আলকামাহ


এরপর পাঠানো হলো হাবশীদের প্রধান হুলাইস ইবন আলকামাহকে। তাকে দেখে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এই লোকটা আন্তরিক। কুরবানির পশুগুলো তার দিকে ঠেলে দাও যেন সে সেগুলো দেখতে পায়।'

মুসলিমদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল এটা প্রমাণ করা যে, তারা শুধু উমরা করতে এসেছেন। একদল লোক কাবাঘরে উমরা করতে এসেছে, তারা কুরবানির পশু নিয়ে হাজির হয়েছে -- এই দৃশ্য দেখেই তার মন আর্দ্র হয়ে উঠলো। সে মক্কায় চলে গেল, এমনকি সে রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করারও প্রয়োজন বোধ করলো না। সে সোজা কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। শোনো, এই লোকগুলোকে মক্কা থেকে দূরে ঠেলে রাখা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।'

হুলাইস ছিল মুশরিক, একজন কাফের। কিন্তু সে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের মতো নীতিহীন ছিল না। মুসলিমদেরকে কা'বাঘরে আসতে বাধা দেওয়া যে অন্যায় হচ্ছে, সেটা সে ঠিকই বুঝতে পারছিল। বললো, 'তোমরা আবদুল মুত্তালিবের সন্তানদের কা'বায় প্রবেশ করতে দেবে না আর লাখাম, জুদাম, হিমইয়ার আর কিন্দার লোকরা কা'বা পরিদর্শন করতে পারবে-- আল্লাহ তাআলা এটা হতে দেবেন না।' এই চারটি গোত্র হলো কাহতানি শাখা, আরবদের ইয়েমেনি শাখা থেকে উদ্ভূত। আর এদের অবস্থান কা'বা থেকে অনেক দূরে -- লাখাম, জুদাম এই দুটোর অবস্থান আরবের একদম উত্তরে, আর হিমইয়ার এবং কিন্দার অবস্থান একদম দক্ষিণে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি। দূরদূরান্তের গোত্ররা কা'বায় তাওয়াফ করছে অথচ বনু মুত্তালিবের কিছু সন্তান মক্কায় বড় হয়েও কা'বায় প্রবেশ করার অধিকার পাচ্ছে না -- কুরাইশদের এই দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করায় কুরাইশরা ক্ষেপে গিয়ে তাকে বললো, 'চুপ থাক, কাণ্ডজ্ঞানহীন বেদুইন কোথাকার!'

হুলাইস খুব রেগে গেল। সে বললো, 'দেখো, তোমাদের সাথে এই শর্তে চুক্তি করিনি যে, কেউ কা'বাঘর পরিদর্শনে আসবে আর তোমরা তাদেরকে বাধা দিবে। শপথ সেই সত্তার যার হাতে হুলাইসের প্রাণ, হয় তোমরা মুহাম্মাদকে কাবাঘরে প্রবেশ করতে দিবে, না হলে আমি হাবশিদের নিয়ে আলাদা হয়ে যাবো!' কুরাইশরা তখন অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে বললো, 'আচ্ছা, তুমি শান্ত হও, দেখি কী করা যায়।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উরওয়া ইবন মাসউদ

📄 উরওয়া ইবন মাসউদ


কুরাইশদের সব প্রচেষ্টা একে একে ব্যর্থ হতে লাগলো। তারা যাকেই পাঠায়, প্রত্যেকেই মুসলিমদের উমরা করতে দেওয়ার পক্ষে মত দিতে থাকে। তাদের মনমতো কাউকে তারা পাচ্ছিল না। বিষয়টি খেয়াল করলেন উরওয়া ইবন মাসউদ। উরওয়া ছিলেন তাইফের বিশিষ্ট কূটনীতিক। সে বুঝতে পেরেছিল জনমত মুসলিমদের পক্ষে, কুরাইশদের একগুঁয়েমিতে কাজ হবে না। অবস্থার হাল ধরতে সে নিজেই এগিয়ে গেল, কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলল,
- তোমরা কি আমার পিতা নও?
- হ্যাঁ।
- আমি কি তোমাদের ছেলে নই? উরওয়া ছিলেন তাইফের কিন্তু তার মা ছিলেন কুরাইশি।
- হ্যাঁ, তুমি আমাদের ছেলে।
- বলো, আমার বিরুদ্ধে কি তোমাদের কোনো অভিযোগ আছে?
- না, নেই।
- উকাযের ঘটনা মনে আছে? আমি কি সে সময় তোমাদের পক্ষ নিইনি?
- হ্যাঁ, নিয়েছো।

এসব কথাবার্তা মনে করিয়ে দিয়ে সে কুরাইশদের কাছে আস্থা অর্জন করে নিলো। কুরাইশরাও দেখলো তাইফের হলেও উরওয়া তো তাদের পক্ষেরই লোক, তার উপর ভরসা করা যায়। এবার তারা তাকেই দূত হিসেবে নিযুক্ত করলো। উরওয়া ইবন মাসউদ রাসূলুল্লাহর কাছে গেল। তার উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। বর্তমানের পরিভাষায় যাকে বলে -- Psychological Warfare বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাসূলুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলল,

'মুহাম্মাদ! ধরে নিলাম তুমি তোমার স্বজাতিকে যুদ্ধে পরাজিত করলে, আচ্ছা, তুমি কি কখনো এমন আরবের কথা শুনেছো যে নিজ জাতিকে ধ্বংস করেছে? আর যদি কুরাইশদের হাতে তুমি পরাজিত হও, তাহলে আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি যে কাপুরুষ লোকগুলোকে জড়ো করেছো, এরা একটাও তোমার পাশে থাকবে না, সবকটা তোমাকে ছেড়ে পালাবে!'

উরওয়া তার বক্তব্যকে এমনভাবে সাজালো যেন রাসূলুল্লাহই হচ্ছেন অপরাধী আর কুরাইশরা সাধু! যেন রাসূলুল্লাহ এসেছেন যুদ্ধ করতে আর কুরাইশরা শান্তি চায়! অথচ ঘটনা ছিল পুরোই উল্টো -- রাসূলুল্লাহ এসেছেন শান্তিপূর্ণভাবে উমরা করতে আর কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিচ্ছিল। বর্তমান সময়ে আমরা দেখি, পশ্চিমা শক্তি এভাবেই তাদের বক্তব্যকে সাজায়। তাদের ভাবটা এমন যে মুসলিমরা হলো সন্ত্রাসী, তারাই শান্তি বিনষ্ট করছে আর পশ্চিমারা হলো শান্তিকামী। অথচ বাস্তবতা হলো, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে পশ্চিমারাই মুসলিম ভূমিগুলোতে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে এবং লুটপাট-সন্ত্রাস-ধংসযজ্ঞ করে চলেছে। আর আমরা অনেক মুসলিমরাও তাদের এই 'পিসফুল' ন্যারেটিভে বিশ্বাস করে বসে আছি।

যাই হোক, উরওয়া ইবন মাসউদ এর কথা থেকে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট। সে ইসলামকে বিচার করছিল জাহিলিয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আরবদের সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক, তাদের কাছে গোত্রপরিচয়টাই ছিল সব! অন্যায় করলেও তারা নিজ গোত্রের পক্ষ নেবে, নিজ গোত্রের জন্য তারা জীবন দিতেও রাজি। তাই একজন মানুষ নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে -- এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। আজকের হিসেবে অনেকটা নিজ দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো ব্যাপার। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাই করছিলেন। তিনি কুরাইশ হয়েও কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। দ্বীন বা ধর্মের অবস্থান যে গোত্র বা জাতিপরিচয়েরও ওপরে -- জাহিল আরবরা সেটা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তাই উরওয়া বলতে চাইছিল, কেমন করে তুমি নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছো? এমন নিকৃষ্ট একটা কাজ তুমি কীভাবে করতে পারো?

উরওয়ার জাহিলি দৃষ্টিভঙ্গি আরও একটি ব্যাপার হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেটা হলো মুসলিমদের ঐক্যের ভিত্তি। সাহাবিরা ছিলেন বিভিন্ন গোত্র থেকে আগত। সেখানে যেমন সম্মানিত কুরাইশ বংশের লোক ছিল, তেমনি ছিল আওস, খাযরাজ গোত্র, ছিল আসলাম এবং গিফারের মতো নিচু শ্রেণির গোত্র। এই গোত্রগুলোকে উরওয়া তৃতীয় শ্রেণীর গোত্র বলে মনে করতো। তার ধারণা ছিল মানুষ শুধু নিজ গোত্রের জন্যই যুদ্ধ করে। কিন্তু একজন মুসলিম যুদ্ধ করে তার দ্বীনের জন্য, আদর্শের জন্য, গোত্র পরিচয় এখানে মুখ্য নয়। বরং উচু-নিচু সকল গোত্রের মানুষকে ইসলাম এক সমতলে আনতে পেরেছে। কারণ এই বন্ধন হলো ঈমানের বন্ধন, জাতীয় বা গোত্রীয় বন্ধন থেকে তা অনেক বেশি শক্তিশালী। রাসূলুল্লাহর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা কত নিখাদ আর গভীর, উরওয়া সেটা তখনো টের পায়নি। তাই সে খোঁচা মেরে বলতে চাইছিল, বিপদে পড়লে তোমার সঙ্গীসাথীরা তোমাকে ফেলে পালিয়ে যাবে!

বলা বাহুল্য, এই কথাটি ছিল খুবই অপমানজনক। আবু বকর পাশেই ছিলেন, এই কথা শুনে তিনি প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। উরওয়াকে বললেন, 'যা ভাগ এখান থেকে! তুই গিয়ে তোদের দেবী আল-লাতের লজ্জাস্থান চোষ! আমরা আল্লাহর রাসূলকে ছেড়ে পালিয়ে যাবো? এই আমরা তাঁকে পরিত্যাগ করবো? হ্যাঁ? '

লজ্জাস্থান চোষার এই কথাটি ছিল আরবের প্রচলিত একটি গালি। আবু বকর এমনিতে শান্তশিষ্ট মানুষ ছিলেন, কিন্তু উরওয়ার এই কথায় তিনি শান্ত থাকতে পারলেন না। একেবারে গালি দিয়ে বসলেন। রাসূলুল্লাহ শুনলেন, কিছুই বললেন না। উরওয়া গালি হজম করে নিয়ে বললো, 'অতীতে তুমি আমাকে একবার উপকার করেছিল আবু বকর, সেটা আমার শোধ করা হয়নি। তা না হলে আজকে তোমার এই কথার উচিত জবাব দিয়ে দিতাম।'

উরওয়াকে একবার একশো উট রক্তপণ দিতে হয়েছিল। কিন্তু রক্তপণ আদায়ের সামর্থ্য তার ছিল না। আবু বকর তখন উরওয়াকে দশটি উট দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এটা জাহিলিয়াতের যুগের কথা। এই কারণে উরওয়া আবু বকরকে কিছু বললো না।

উরওয়া ইবন মাসউদ ছিলেন একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। কথার জোরে তিনি প্রতিপক্ষের মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে চাইছিলেন। নিজ গোত্রের সাথে তুমি কীভাবে যুদ্ধ করছো— এই কথা বলে তিনি রাসূলুল্লাহকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে চাচ্ছিলেন। আর সাহাবিদের গোত্রভিন্নতার দিকে আঙুল তুলে, তাদের কাপুরুষ আখ্যা দিয়ে রাসূলুল্লাহ আর সাহাবিদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করতে চাইছিলেন। পেশাদার রাজনীতিকের মতো তার কথায় আত্মবিশ্বাসের সুস্পষ্ট ছাপ। কিন্তু এসবের কিছুই মুসলিমদের টলাতে পারলো না, উল্টো উরওয়াই আবু বকরের আচরণ দেখে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল।

এরপরে ঘটলো আরও একটি ঘটনা। সমঝোতার আলোচনা চলাকালীন সময়ে উরওয়া আল্লাহর রাসূলের দাড়ি স্পর্শ করছিলেন। এটা সে যুগের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। দেহরক্ষী হিসেবে রাসূলুল্লাহর মাথার কাছে ছিলেন আল মুগীরা ইবন শু'বা। ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। উরওয়াকে দাড়ি ধরতে দেখে আল-মুগীরা তার সাথে থাকা তলোয়ারের বাট দিয়ে উরওয়ার হাতে আঘাত করে বললেন, 'তোমার ঐ হাত আল্লাহর রাসূলের দাড়ি থেকে সরিয়ে রেখো। বেশি দেরি করলে ঐ হাত আর তোমার কাছে ফেরত যাবে না।'

উরওয়া হতভম্ব হয়ে গেল, কেউ তার সাথে এমন রূঢ় আচরণ করতে পারে তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কে এভাবে তার সাথে এভাবে কথা বললো সেটাও বোঝার উপায় নেই কারণ আল-মুগিরা ইবন শু'বা ছিলেন আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা। উরওয়া রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এই লোক? তোমার বাহিনীতে এত রুক্ষ লোক আর একটিও দেখিনি।' রাসূলুল্লাহ মুচকি হেসে বললেন, 'এ হচ্ছে তোমার ভাতিজা আল-মুগিরা ইবন শু'বা।'

উরওয়া যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে তার ভাতিজা মুগীরাকে উদ্দেশ্য করে বললো, 'বিশ্বাসঘাতক কোথাকার! তোর অপকর্মের দাগ তো মাত্র সেদিন পরিষ্কার করলাম!'

উরওয়া তার ভাতিজা মুগীরাকে অতীতের একটা ঘটনা নিয়ে খোঁচা দিলেন। একবার মুগীরা তেরো জন মুশরিকের সাথে সফরে বের হন এবং পথিমধ্যে তাদের লুট করে তাদের হত্যা করেন। সাকিফের গোত্রগুলোর মধ্যে তখন সেটা নিয়ে ব্যাপক যুদ্ধ লাগার মতো অবস্থা তৈরি হয়। উরওয়া নিজের ভাতিজাকে বাঁচানোর জন্য তার হয়ে রক্তমূল্য পরিশোধ করে দেন। ইতিমধ্যে মুগীরা মদীনায় চলে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল তাকে বললেন, 'তোমার মুসলিম হওয়া আমি মেনে নিলাম, কিন্তু যে ধনসম্পদ নিয়ে এসেছো সেটা আমি গ্রহণ করবো না।' যেহেতু মুগীরা অন্যায়ভাবে সফরের মধ্যে তাদের সম্পদ হস্তগত করেছিলেন, তাই সেই সম্পদ রাসূলুল্লাহ গ্রহণ করেননি। একই সাথে তিনি মুশরিকদের কাছে এ বিষয় নিয়ে কোনো ক্ষমাও চাননি।

এখানে লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, ইসলাম মানুষের চরিত্রকে কী অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়! জাহিলিয়াতের জীবনে মুগীরা ইবন শু'বা ছিলেন মদখোর, লুটতরাজ আর খুনখারাপি করা একজন মানুষ। ইসলামে এসে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহর দেহরক্ষক, রাসূলুল্লাহর ভালোবাসায় নিবেদিত প্রাণ! আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা যে বাকি সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার দৃষ্টান্ত হলেন আল-মুগীরা। মুগীরা ইবন শু'বাকে তার চাচা উরওয়া একটা বড় বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। এই জন্যে মুগীরা ইবন শু'বার উচিত ছিল উরওয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু না, রাসূলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি উরওয়াকে এতটুকু ছাড় দেননি।

উরওয়া ফিরে এলেন। উরওয়া গিয়েছিলেন মুসলিমদের মনোবলকে নষ্ট করে দিতে, অথচ নিজেই হার মেনে গেলেন। ইসলাম আর মুসলিমদের ব্যাপারে এক নতুন ধারণা নিয়ে ফিরে এলেন। কুরাইশদের বললেন,

"হে কুরাইশ, আমি আমার জীবনে পারস্যের বাদশাহ কিসরাকে দেখেছি। রোমের সম্রাট কায়সারকে দেখেছি, দেখেছি রাজা নাজাশীকে। আল্লাহর কসম করে বলছি, মুহাম্মদের অনুসারীরা তাঁকে যেভাবে করে সম্মান করে-- এমনটা আমি আর কোথাও দেখিনি। তিনি শুধু একটা কাজের কথা বলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুসারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই কাজ করে ফেলে। তিনি যখন থু থু ফেলেন, তাঁর অনুসারীরা হাত বাড়িয়ে সেই থুথু তালুতে নেয়, বরকতের আশায় শরীরে মাখে। তিনি যখন ওযু করেন, তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়, আর প্রত্যেকে সেই পানি সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যখন তিনি কোনো কথা বলেন, তাঁর অনুসারীরা চুপ করে তাঁর কথা শোনে, সম্মানের আতিশয্যে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকায় পর্যন্ত না।

তোমরা নিশ্চিত থাকো, তোমরা যদি তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে চাও, এই লোকগুলো কখনো তাদের নেতাকে ছেড়ে যাবে না। নিজেদের নেতাকে তারা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করে যাবে। তারা কোনোকিছুর তোয়াক্কা করবে না... এমন একজন মানুষ যখন তোমাদের প্রস্তাব দিয়েছে, আমার পরামর্শ হচ্ছে তার প্রস্তাব গ্রহণ করা। তোমরা তাদেরকে হারাতে পারবে না। আমি তোমাদের জন্য কোনো আশা দেখছি না। তোমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই তার প্রস্তাব গ্রহণ করো।"

উরওয়ার এই চমৎকার কথাগুলো কুরাইশদের মন ভরাতে পারলো না। যদিও তারা ঠিকই জানতো উরওয়া যা বলছেন সত্যিই বলছেন।

উরওয়া ইসলামের ব্যাপারে শুনেছেন, কিন্তু যখন নিজের চোখের সামনে ইসলামকে দেখলেন, তার ধারণা পাল্টে গেল। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ উরওয়ার জন্য এটা ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। মুসলিমদের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। এই ঘটনা ছিল উরওয়ার প্রতি ইসলামের দাওয়াহ। এই দাওয়াহ খালি কথার দাওয়াহ ছিল না, এই দাওয়াহ ছিল কাজের মাধ্যমে দাওয়াহ। নিঃসন্দেহে কাজের মাধ্যমে দাওয়াহ অন্তরে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।

টিকাঃ
৭৪. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px