📄 মুসলিমদের প্রথম দূত: খাররাশ ইবন উমাইয়্যাহ
এই কাজের জন্যে পাঠানো হলো খাররাশ ইবন উমাইয়্যাহকে। মক্কায় গেলেন। কিন্তু খাররাশের সাথে মক্কাবাসীর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত রূঢ়। তারা তার উটকে হত্যা করে এবং তাকেও মেরে আধমরা করে ফেলে।
একজন দূতের সাথে এরকম হীন আচরণই বলে দেয় মক্কাবাসীরা তখন চূড়ান্তভাবে দিগ্ভ্রান্ত এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ছিল। তাদের ছিল প্রচণ্ড অহংকার কিন্তু এখন তারা অপমানিত। তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধীরে ধীরে খর্ব হচ্ছিল। তারা বিষয়টা মানতে পারছিল না বিধায় উদভ্রান্তের মতো আচরণ করতে থাকে।
📄 মুসলিমদের দ্বিতীয় দূত: উসমান ইবন আফফান ؓ
রাসূল আরেকজনকে দূত হিসেবে পাঠাতে চাইলেন, উমারকে ডাক দিলেন। উমার বললেন,
'ইয়া রাসূলুল্লাহ, মক্কায় আমার পরিবারের এমন কেউ নেই যে আমাকে নিরাপত্তা দেবে। আর আমি কুরাইশদের কী পরিমাণ ঘৃণা করি সেটাও তাদের ভালোই জানা আছে। তারপরও আপনি যদি যেতে বলেন, আমি যাবো।'
রাসূল কিছু বললেন না। উমার তখন আরেকটি নাম প্রস্তাব করলেন-- উসমান। কারণ উসমানের গোত্র তখনো মক্কায় ছিল।
উসমান ছিলেন বনু উমাইয়্যা গোত্রের। উমাইয়্যা গোত্র কুরাইশদের অন্যতম প্রধান শাখা বনু আবদে মানাফের অন্তর্ভুক্ত। মক্কা শহরের নেতৃত্ব ছিল দুই গোত্রের হাতে। বনু মাখযুম আর বনু আবদে মানাফ। বনু মাখযুমের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিল আবু জাহল, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সে নেতৃত্ব দিয়ে গেছে। এই গোত্রে আরও ছিল ওয়ালিদ ইবন মুগিরা এবং তার ছেলে খালিদ ইবন ওয়ালিদ।
অন্যদিকে বনু আবদে মানাফের প্রধান দুই শাখা গোত্র হচ্ছে বনু হাশিম আর বনু উমাইয়্যা। এই শাখা গোত্র দুটির মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। রাসূল ছিলেন বনু হাশিমের আর উসমান ছিলেন বনু উমাইয়্যার। বনু উমাইয়্যার শীর্ষনেতা ছিল আবু সুফিয়ান। রাসূল যখন উসমানকে কুরাইশদের কাছে পাঠালেন, সাথে সাথেই তিনি বনু উমাইয়্যার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার কাছে থেকে সুরক্ষার আশ্বাস লাভ করলেন। এই ব্যক্তিটি হলেন উসমানের চাচাতো ভাই আব্বান ইবন সায়িদ ইবন আল আস। তিনি উসমানকে নিজের উটের পিঠে করে কুরাইশদের সামনে নিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিলেন যে, এই লোকটিকে আমি আমার তরফ থেকে নিরাপত্তা দান করলাম।
উসমানের সফরের উদ্দেশ্য ছিল মূলত দুইটি।
প্রথমত, এটা ঘোষণা করা যে, মুসলিমরা কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে মক্কায় আসেনি।
আর দ্বিতীয়ত, মু'মিন নরনারী যারা তখনো মক্কায় রয়ে গেছেন তাদেরকে রাসূলুল্লাহর আশ্বাসবাণী পৌঁছে দেওয়া যে ইসলাম অবশ্যই বিজয়ী হবে।
উসমান মক্কার ভেতর পুরো সময়টিকে কাজে লাগালেন। কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে আলোচনায় বসলেন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন মুসলিমদের অভিপ্রায়। কিন্তু কুরাইশা গোঁ ধরেই থাকলো। তাদের এক কথা-- তোমাদের আমরা মক্কায় ঢুকতে দেবো না, বলেছি তো দেবো না। উসমান মক্কার জনগণের কাছে গেলেন। তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
'আমাকে আল্লাহর রাসূল পাঠিয়েছেন যেন তোমাদেরকে আল্লাহ আর ইসলামের পথে ডাকি, যেন তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো। আল্লাহ ইসলামকে বিজয় দান করবেন এবং তার রাসূলকে সম্মানিত করবেন। তোমরা আমাদের ছেড়ে দাও যেন অন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে পারি। যদি তারা আমাদের পরাজিত করতে পারে, তাহলে তো তোমাদের মনের আশা পূর্ণ হয়েই যাবে। আর যদি আমরা তাদের পরাজিত করি তাহলে তোমরা আমাদের অনুসরণও করতে পারো, আবার চাইলে আমাদের সাথে যুদ্ধও করতে পারো। কিন্তু এখন আমার মনে হয় তোমাদের বিশ্রাম দরকার। আমাদের সাথে যুদ্ধে না যাওয়াই তোমাদের জন্য ভালো হবে। তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছ। তোমাদের সেরা লোকগুলোও সব মারা গেছে। তোমরা জেনে রাখো, আমরা এখানে এবার যুদ্ধের জন্যে আসিনি, এসেছি উমরা করতে। কুরবানির পশু চিহ্নিত করে রেখেছি, পশুগুলো কুরবানী করে চলে যাবো।'
আবান ইবন সায়িদ উসমানকে বললেন, 'তুমি চাইলে কাবা ঘর তাওয়াফ করতে পারো, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।' মুসলিমরা তখন বলতে লাগলো উসমান কতই না সৌভাগ্যবান। তিনি কাবাঘর তাওয়াফের সুযোগ পেয়েছেন! কিন্তু রাসূল বললেন, 'তার প্রতি আমার চাওয়া, সে যদি যুগ যুগ ধরেও সেখানে থাকে, আমি তাওয়াফ না করা পর্যন্ত সে কাবাঘর তাওয়াফ করবে না।'
উসমান রাসূলুল্লাহর চাওয়া অনুযায়ী কাজ করেছিলেন। এক পা বাড়ালে যেই কাবাঘরকে ছোঁয়া যাবে, তা না ছুঁয়ে আবান ইবন সায়িদকে তিনি বলে দিলেন, 'আল্লাহর রাসূল তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি কাবাঘর তাওয়াফ করবো না।'
এই একটা কথা অনেক কিছুই বলে দেয়। রাসূলুল্লাহর প্রতি সাহাবিদের ভক্তি আর ভালোবাসা কত গভীর, তা বুঝতে এই একটি কথাই যথেষ্ট।
📄 কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রেরিত বুদাইল ইবন ওয়ারকা
কুরাইশরাও দূত পাঠাতে লাগলো। প্রথমে তারা পাঠালো বুদাইল ইবন ওয়ারকাকে। সে ছিল বনু খুযাআ গোত্রের। সে সাথে করে নিজ গোত্রের আরও কিছু লোক নিয়ে এসেছিল। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, খুযাআ গোত্র হচ্ছে রাসূল এবং মুসলিমদের প্রতি বিশ্বস্ত। এমন বর্ণনা আছে যে, খুযাআ গোত্র মক্কার যাবতীয় তথ্য নবীজিকে পাচার করতো।
নবীজির যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল বিভিন্ন গোত্রের সাথে তাঁর সম্পর্ক। কুরাইশরা তার শত্রু হলেও বনু খুযাআর সাথে তার সুসম্পর্ককে তিনি নিজের কাজে লাগিয়েছেন। যাই হোক, বুদাইল রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'কুরাইশরা এমন উট নিয়ে এসেছে যে দুধ দেয়।' অর্থাৎ, কুরাইশরা দীর্ঘদিন অবস্থানের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। পরিস্থিতি যদি থাকার দাবি করে, তাহলে তারা সেটাই করবে। তারা যুদ্ধের জন্যে তৈরি। রাসূলুল্লাহ তখন তাকে বুঝিয়ে বললেন যুদ্ধ করার তার উদ্দেশ্য নয়, বায়তুল্লাহর যিয়ারত করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।
বুদাইল রাসূলুল্লাহর এই বার্তা নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। কিন্তু কুরাইশরা তাকে পাত্তাই দিল না, তারা তাকে উপেক্ষা করলো। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনলো, তার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। সে তাদের বললো, 'কুরাইশরা, তোমরা মুহাম্মাদের সাথে বাড়াবাড়ি করছো। যুদ্ধ করার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি আসেননি, তিনি বায়তুল্লাহ যিয়ারত করতে এসেছেন।' বলাই বাহুল্য, এসব কথা কুরাইশদের মোটেও পছন্দ হলো না।
টিকাঃ
৭৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৭।
📄 মিকরাজ ইবন হাফস
বুদাইলের পর কুরাইশরা পাঠালো মিখরাজ ইবন হাফসকে। তাকে দেখামাত্র রাসূলুল্লাহ বলে উঠলেন, 'সে হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক!' মিখরাজের স্বভাব সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। দেখা গেল মিখরাজ কুরাইশদের চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটি দল নিয়ে মুসলিমদের তাঁবুর চারপাশে ঘুরঘুর করছে। তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মধ্যে কাউকে একা পেলে তাকে বন্দী করে কুরাইশদের হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টো, মিখরাজের পুরো বাহিনীই মুসলিমদের হাতে ধরা পড়ল। শুধুমাত্র সে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচল। রাসূলুল্লাহ চাচ্ছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাই তিনি বন্দীদের বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দিলেন।