📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ স্বপ্ন

📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ স্বপ্ন


"আমি কা'বাকে করেছি মানুষের জন্য মাসাবাহ..." (সূরা বাকারাহ, ২:১২৫)

কা'বার একটা অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে। যে কা'বাকে একবার দেখে, সে বার বার সেখানে ফিরে যেতে চায়। তীব্র একটা টান তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, বাইতুল্লাহ হলো মাসাবাহ। মাসাবাহ মানে সম্মিলনস্থল। কোনো বাচ্চা উট যখন খেলতে যায়, সে একটু পর পর তার মাকে দেখার জন্য ফিরে আসে। এই ঘটনাকেই বলে মাসাবাহ। কা'বাঘর ঠিক তেমনই মানুষের জন্য মাসাবাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইবরাহীমের দুআ’র কারণে মানুষের অন্তরে কা'বার প্রতি একটা তীব্র ভালবাসা সৃষ্টি করে দেন। যে এই ঘরে যাবে সে এর প্রেমে আটকে যাবে।

প্রায় ছয় বছর কা'বা থেকে দূরে থেকে রাসূলুল্লাহর মনে কা'বার কাছে যাওয়ার তীব্র বাসনা জেগে উঠলো। তিনি স্বপ্নে দেখলেন তিনি আর সাহাবিরা একসাথে কা'বার চতুর্দিকে তাওয়াফ করছেন। তাওয়াফ শেষে কেউ কেউ মাথা মুণ্ডন করেছেন, আবার কেউ কেউ চুল ছেঁটে ছোট করেছেন। স্বপ্ন দেখার পর রাসূল মুসলিমদের তাঁর সাথে উমরা করার আহবান জানালেন। মক্কায় যাওয়ার জন্যে, আল্লাহর ঘরকে এক নজর দেখার জন্যে সাহাবিরাও উতলা হয়ে উঠলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মক্কার পথে যাত্রা

📄 মক্কার পথে যাত্রা


আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া দিলেন প্রায় চৌদ্দশ সাহাবি। সবাই মিলে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যুল হুদাইফায় ইহরাম বাঁধলেন। কুরবানীর পশুগুলোর গায়ে চিহ্ন লাগিয়ে দিলেন। কুরবানীর আগে পশুর গায়ে সনাক্তকরণ চিহ্ন দেওয়া ছিল আরবের ঐতিহ্য। এই যাত্রায় নবীজির সাথে ছিল প্রায় সত্তরটি উট।

সফর শুরু হলো। রাসূল ও তাঁর সাথীরা তালবিয়া পাঠ করছেন-- লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ মেজাজে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিরা এগিয়ে চলছেন। কোনো যুদ্ধংদেহী ভাব নেই। সবার সাথে শুধুমাত্র একটি তরবারি ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই। এই অস্ত্র রাখাও ছিল আরবদের ঐতিহ্য মাত্র। অস্ত্র ছাড়া ভ্রমণ করার কথা আরবরা চিন্তাও করতে পারত না। যার অস্ত্র নেই তার সাথে একটা উটের কোনো পার্থক্য নেই। যুদ্ধের কোনো পরিকল্পনা ছিল না বিধায় রাসূলুল্লাহ কোনো ভারী অস্ত্রশস্ত্র সাথে রাখেননি।

যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চাননি। তাই বিশ সদস্যের একটা অশ্বারোহী দলকেও সাথে রেখেছিলেন। তাদের কাজ ছিল পুরো জামাআতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পথে কোনো বাধাবিপত্তি আছে কিনা সেদিকে লক্ষ রাখা। গুপ্তচর হিসেবে সাথে ছিলেন বিশর ইবন সুফিয়ান আল-খুযাই। তার কাজ ছিল প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে নবীজির কাছে পৌঁছে দেওয়া।

উমার ছিলেন খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এবং সতর্ক একজন মানুষ। তাকে বোকা বানানো যেত না। তিনি নিজেই নিজের ব্যাপারে একবার বলেছিলেন, 'আমি নিজে ধুরন্ধর নই, কিন্তু ধুরন্ধর লোকেরা আমাকে বোকা বানাতে পারবে না।' তাঁর এই গুণের পরিচয় মেলে তাঁর কথা, কাজ এবং নবীজিকে দেওয়া পরামর্শে। উমরা করার উদ্দেশ্যে একেবারে খালি হাতে যাওয়াটা তাঁর কাছে কেমন যেন ঠেকলো। তিনি আল্লাহর রাসূলকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি কোনো রকম অস্ত্র ছাড়া এমন লোকদের দেশে প্রবেশ করতে চান যারা আপনার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত?'

রাসূল বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন এবং উমারের সাথে একমত পোষণ করলেন। তাই তিনি মদীনা থেকে অস্ত্র নিয়ে আসার আদেশ দিলেন। কিন্তু অস্ত্রগুলোকে দল থেকে দূরে রাখা হলো। তিনি চাননি মানুষ ভাবুক যে তিনি যুদ্ধ করতে এসেছেন।

রাসূলুল্লাহর গোয়েন্দা বিশর ইবন সুফিয়ান কুরাইশদের ব্যাপারে তথ্য নিয়ে ফিরে এলেন। তিনি জানালেন কুরাইশরা যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা যুদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যেকোনো মূল্যে তারা রাসূলুল্লাহর মক্কা প্রবেশ ঠেকাবে। এজন্য তারা লোকও জড়ো করছে। নারী-শিশুদের নিয়ে ময়দানে নামছে। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ বললেন,

"হায় রে কুরাইশ! যুদ্ধের চিন্তা ওদের পাগল করে রেখেছে! তাদের কী এমন ক্ষতি হতো যদি তারা পুরো বিষয়টাকে আমার আর আরবদের হাতে ছেড়ে দিত! আরবরা যদি আমাকে হত্যা করতো, তাহলে তো এমনিতেই তাদের মনের আশা পূর্ণ হয়ে যেতো। আর আল্লাহ যদি আমাকে বিজয়ী করেন, তাহলে কুরাইশরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে নিজেরাই লাভবান হতো। কিন্তু না, যতদিন তাদের শক্তি আছে ততদিন তারা আমার সাথে লড়ে যেতে চায়! কুরাইশরা ভেবেছেটা কী? আমি হাল ছেড়ে দেবো? আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে যে উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন, আমি সে উদ্দেশ্যে জিহাদ চালিয়ে যাবো -- যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে বিজয়ী করেন অথবা আল্লাহর পথে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়!"

মুসলিমদের কা'বায় প্রবেশের বাধা দেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার কুরাইশদের ছিল না। কুরাইশরা ছিল কা'বার রক্ষণাবেক্ষণকারী, কা'বা তাদের সম্পত্তি ছিল না। কা'বা তৈরি করে গেছেন আরবদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল। তাই সবারই কা'বাঘরে যাওয়ার অধিকার আছে। কাউকে কা'বায় প্রবেশ করতে না দেওয়া খুবই গুরুতর বিষয়। আর বিশেষত যেখানে রাসূলুল্লাহ আগেই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি শুধু উমরা করতে চান, যুদ্ধ করতে চান না। কুরাইশদের এই সিদ্ধান্ত আরবরা তেমন পছন্দ করলো না। জনমত রাসূলুল্লাহর পক্ষেই গেল।

দেখতে দেখতে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলো। রাসূল সাহাবিদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও। তোমরা কী চাও? যারা আমাদের কাবাঘরে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, আমরা তাদের সন্তান এবং পরিবারদের দিকে অগ্রসর হই?'

এখানে সেসব গোত্রের কথা বোঝানো হয়েছে যারা রাসূল এবং তাঁর সাহাবিদের কাবাঘরে প্রবেশে বাধাদানের মতো ঘৃণ্য কাজে কুরাইশদের সাহায্য করছে। এই যুদ্ধে কুরাইশরা একা ছিল না, তাদের সাথে হাত মিলিয়েছিল আল হাবিশ। তারা ছিল তিন বা ততোধিক গোত্রের মিলিত জোট। রাসূল সাহাবিদের কাছে জানতে চাইছিলেন হাবিশদের আক্রমণ করা ঠিক হবে কিনা। আবু বকর তখন নবীজিকে বললেন,

"হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কাবাঘর তাওয়াফে এসেছেন, কারো সাথে যুদ্ধ করতে নয়। আপনি আপনার লক্ষ্যে অটল থাকুন। যারা এই লক্ষ্যে বাধা দেবে, আমরা কেবল তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।"

আবু বকরের পরামর্শ নবীজির পছন্দ হলো। তিনি নিজ থেকে যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হলেন।

কুরাইশরা খালিদ ইবন ওয়ালিদ এবং ইকরামা ইবন আবু জাহলের নেতৃত্বে দুইশো সৈন্যের এক বাহিনী পাঠালো। খবর পেয়ে রাসূল বিকল্প পথে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত নিলেন যেন খালিদ ইবন ওয়ালিদকে এড়াতে পারেন। আসলাম গোত্রের এক লোক মুসলিম বাহিনীকে বিকল্প পথে মক্কায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিলেন। নতুন পথটি ছিল খুবই রুক্ষ, বন্ধুর। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সফল হলেন। মক্কার অদূরে হুদাইবিয়া নামক জায়গায় এসে উপস্থিত হলেন। হুদাইবিয়া থেকে মক্কার দূরত্ব ছিল মাত্র এক দিনের। মক্কার বিপদসীমার ভেতরে। খালিদ ইবন ওয়ালিদ তখন তড়িঘড়ি করে বাহিনী নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন।

হুদাইবিয়া পৌঁছে নবীজির বিখ্যাত উট কাসওয়া হঠাৎ বসে পড়ল। অনেক পীড়াপীড়ি করেও তাকে ওঠানো যাচ্ছে না। সাহাবিরা মন্তব্য করতে লাগলেন, কাসওয়া অবাধ্য হয়ে গেছে। কিন্তু রাসূল বললেন, 'না, কাসওয়া অবাধ্য হয়নি। অবাধ্যতা কাসওয়ার স্বভাব নয়। সে তাঁর নির্দেশেই থেমেছে যিনি আবরাহার হাতিগুলোকে থামার নির্দেশ দিয়েছিলেন।'

অর্থাৎ, স্বয়ং আল্লাহর আদেশেই কাসওয়া বসে পড়েছিল। যখন আবরাহা ও তার বাহিনী মক্কা আক্রমণ করতে গেল তখন তার হাতিগুলো মাটিতে বসে পড়েছিল। অনেক ঠেলেও হাতিগুলোকে ওঠানো সম্ভব হয়নি। মুসলিমদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটলো, উট বসে পড়লো। কিন্তু আবরাহার বাহিনী ছিল কাফির বাহিনী, আর রাসূলুল্লাহর বাহিনী ছিল মুসলিম বাহিনী। সেক্ষেত্রে এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য কোথায় থাকলো? ইবন হাজার আসকালানি এই সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন,

"আল্লাহ আযযা ওয়া জাল অতীত বর্তমান সবই জানেন। তিনি জানতেন যে, মক্কার লোকেরা একসময় মুসলিম হবে। তাই তিনি অতীত এবং বর্তমান কোনো সময়ই রক্তপাত হতে দেননি। আবরাহার ক্ষেত্রে সেটি করেছেন আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংসের মাধ্যমে, আর হুদাইবিয়ার সময় তা করেছেন শান্তির দরজা উন্মোচনের মাধ্যমে। রাসূল যদি সেদিন সামনে অগ্রসর হতেন তাহলে যুদ্ধ লেগে যেত, অনেক রক্তপাত হতে পারতো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কাসওয়াকে থামিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মুসলিমদের যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রেখেছিলেন।"

কাসওয়াকে বসে পড়তে দেখে রাসূল বললেন,

"সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আমি কুরাইশদের যেকোনো প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি আছি যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর মর্যাদা রক্ষিত হয়।"

রাসূল স্পষ্ট করে দিলেন যে তিনি শান্তি চান এবং তিনি তাদের যে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করবেন। শুধুমাত্র আল্লাহর মর্যাদা বা অধিকার লঙ্ঘিত না হলেই হলো, এই ক্ষেত্রে সেটি ছিল হারামের ভেতরে রক্তপাত।

হুদাইবিয়াতে একটি কুয়া ছিল। কিন্তু সাহাবিরা পানি পান করতে গিয়ে দেখলেন যে কুয়াটি খালি। রাসূল একটি তীর তাদের হাতে দিলেন, বললেন সেটিকে কুয়ায় নিক্ষেপ করতে। তীর নিক্ষেপ করতেই কুয়া থেকে কলকল করে পানি বের হতে শুরু করে। আল্লাহর রাসূলের আরও একটি মু'জিযা।

টিকাঃ
৭২. সহীহ বুখারি, অধ্যায় শর্তাবলী, হাদীস ১৯।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দুই পক্ষের মধ্যে দূত প্রেরণ

📄 দুই পক্ষের মধ্যে দূত প্রেরণ


একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল দুই শিবিরেই। রাসূল কুরাইশদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে চাইলেন যে, তারা যুদ্ধ করতে আসেননি, এসেছেন আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুসলিমদের প্রথম দূত: খাররাশ ইবন উমাইয়্যাহ

📄 মুসলিমদের প্রথম দূত: খাররাশ ইবন উমাইয়্যাহ


এই কাজের জন্যে পাঠানো হলো খাররাশ ইবন উমাইয়‍্যাহকে। মক্কায় গেলেন। কিন্তু খাররাশের সাথে মক্কাবাসীর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত রূঢ়। তারা তার উটকে হত্যা করে এবং তাকেও মেরে আধমরা করে ফেলে।

একজন দূতের সাথে এরকম হীন আচরণই বলে দেয় মক্কাবাসীরা তখন চূড়ান্তভাবে দিগ্‌ভ্রান্ত এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ছিল। তাদের ছিল প্রচণ্ড অহংকার কিন্তু এখন তারা অপমানিত। তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধীরে ধীরে খর্ব হচ্ছিল। তারা বিষয়টা মানতে পারছিল না বিধায় উদভ্রান্তের মতো আচরণ করতে থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px