📄 ৪) আল-গাবার অভিযানঃ পদাতিক সৈনিক সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার বীরত্ব
এই অভিযানটি ছিল ষষ্ঠ হিজরিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিযান। আর অভিযানের মূল নায়ক ছিলেন সালামা ইবন আল-আকওয়া। এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচশো সাহাবি, কিন্তু সালামার বীরত্ব আর সাহসিকতা আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন মক্কা ছেড়ে আসা এক মুহাজির। পরিবার, সহায়-সম্পদ সবকিছু ছেড়েছুড়ে তিনি আল্লাহ ও তাঁর নবীর পথে হিজরত করেছিলেন। মদীনায় এসে তিনি তালহা ইবন উবায়দুল্লাহর চাকরি নেন। তাঁর ঘোড়া চড়ানো, তাঁকে খেদমত করা, এভাবেই দিন কাটতে থাকে।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা এভাবে, আবদুর রহমান উয়াইনা ইবন হিসন আল-ফিজারীর নেতৃত্বে গাতফানের কিছু লোক গাবাহ নামক স্থানে হামলা চালায়। গাবাহ মদীনার কাছেই একটা উর্বর জায়গা। সেখানে মুসলিমরা তাদের উট চড়ানোর জন্য পাঠাতো। একদিন আবদুর রহমান আল-ফিজারীর লোকেরা এসে মুসলিম মেষপালক যার ইবন আবি যারকে হত্যা করে। তার স্ত্রী লাইলাকে বন্দী করে এবং বিশটা উট লুট করে পালিয়ে যায়। উটগুলো ছিল আল্লাহর রাসূলের উট।
ঘটনাস্থলের কাছেই উপস্থিত ছিলেন সালামা ইবন আল আকওয়া এবং রাবাহ। তারা দুজনেই সেদিন উট চরাতে তৃণভূমিতে নিয়ে এসেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ভোর বেলায়। সালামা এই ঘটনা দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ রাবাহকে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেন। আর তিনি নিজে শত্রুদের দৌড়ে ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
"ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা!"
'ওয়া সুবহা' ছিল সে যুগের বিপদ সংকেত। সালামার চিৎকার মদীনা থেকেও শোনা গেল। সাহাবিরা দ্রুত রাসূলুল্লাহর কাছে এসে জমা হলেন। এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই হবে। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাৎ পাঁচশো সৈনিকের দল প্রস্তুত করলেন।
এদিকে সালামা সৈন্যবাহিনী আসার অপেক্ষা না করে একাই উয়াইনা আর তার দলবলের পিছু নেওয়ার জন্য ছুটে গেলেন। কিন্তু তার কাছে তখন না আছে কোনো ঘোড়া, না আছে কোনো উট, ছিল শুধু দুটো পা। সেই পা দুটোকে পুঁজি করেই লুটেরাদের ধরার জন্য দৌড়াতে লাগলেন। সালামার ভাষায়,
'আমি লুটেরাদের তাড়া দিতে বেরিয়ে পড়লাম। তাদের দিকে একের পর এক তীর ছুঁড়ছি আর ছন্দ মিলিয়ে হুংকার দিচ্ছি,
এই দ্যাখ! আমি হলাম আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
যাকেই হাতের নাগালে পাচ্ছি, এমনভাবে তীর ছুঁড়ে মারছি যে কাঁধ ছেদ করে তীরের মাথা বেরিয়ে আসছে। তাদের কেউ যখন আমার দিকে পিছু ফিরতো, আমি গাছের গোড়ায় বসে পড়তাম আর আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে তাকে কিংবা তার পশুকে ঘায়েল করতে লাগলাম!'
লুটেরাদের সবাই ছিল ঘোড়ায় আর সালামা ইবন আল আকওয়া পদাতিক একজন সৈনিক মাত্র। অথচ সালামার ধাওয়া খেয়ে তাদের রীতিমতো পাগল হওয়ার মতো অবস্থা! তারা কোনোরকমে একটা পাহাড়ের পাশে সরু গিরিপথের মতো জায়গায় আশ্রয় নিল। সালামা এরপর সেই পাহাড়ে উঠে ওপর থেকে তাদের ওপর একের পর এক পাথর মারতে লাগলেন। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তারা লুট করা সবগুলো উট ছেড়ে দিয়ে ক্ষান্ত হলো।
শত্রুরা ক্ষান্ত হলেও সালামা ইবন আল আকওয়া মোটেও ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাদের ধাওয়া করতেই থাকলেন। ধাওয়া খেতে খেতে শত্রুদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম! কোনোমতে ত্রিশটা জোব্বা আর ত্রিশটা বর্শা ফেলে নিজেদের বোঝা হালকা করে পড়িমরি করে পালাতে লাগলো। ফেলে যাওয়া জিনিসগুলোও সালামা চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। জিনিসগুলোর ওপর সালামা একটা করে নিশানা রেখে দিতে দিতে এগোচ্ছিলেন যেন জিনিসগুলো পরে খুঁজে পেতে সমস্যা না হয় আর রাসূলুল্লাহর পাঠানো বাহিনীও যেন এই চিহ্ন দেখে পথ চিনে নেয়। সালামা বর্ণনা করেন,
'শেষ পর্যন্ত লুটেরার দল এক সরু পাহাড়ি পথে গিয়ে থামলো। সেখানে তারা বদর আল ফাজারির ছেলের সাথে মিলিত হলো। সবাই মিলে সকালের নাস্তা খেতে বসেছে, আমি তখন একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো। আমাকে দেখিয়ে ফাজারি বললো, এই লোকটা কে? তারা বললো, এই লোক-ই তো আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। সেই ভোর থেকে আমাদের পিছু ছাড়েনি! তীর মারতে মারতে আমাদের থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ফাজারি বললো, তোমরা তাকে তাড়া করছো না কেন! যাও, চার জন গিয়ে এখনই এই লোককে শেষ করে দাও।
তাদের মধ্যে চারজন পাহাড়ে উঠে আমার কাছাকাছি এল। আমি বললাম,
- তোরা চিনিস আমাকে?
- না, চিনি না। কে তুমি?
- আমি হলাম সালামা ইবন আল-আকওয়া। সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, আমি চাইলে তোদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করে দিতে পারি কিন্তু তোরা কেউ আমার কিছুই করতে পারবি না।
এই কথা শুনে তাদের একজন বললো, আমার মনে হয় সে ঠিকই বলছে।
এরপর তারা চলে গেল। আল্লাহর রাসূলের ঘোড়সওয়ারিরা আসা পর্যন্ত আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। সবার আগে দেখতে পেলাম আখরাম আল-আসাদীকে। তার পেছনে পেছনে আসছে আবু কাতাদা আল-আনসারি, আর তারও পেছনে ছিল মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ। আমি আখরামের ঘোড়ার লাগাম টেনে বললাম, আখরাম, তুমি সতর্ক থাকো। ওরা একা পেলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
আখরাম আমাকে বললো, সালামা! যদি তুমি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তুমি যদি বিশ্বাস করে থাকো যে জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য -- তাহলে আমার আর শাহাদাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িও না।'
কারো কারো বুকের ভেতর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বাসনা কত যে তীব্র হয়! আখরামের অদম্য সাধ শহীদ হবেন। এরপর সালামাহ আর বাধা দিলেন না। পথ ছেড়ে দিলেন। আখরাম ছুটে গেলেন লুটেরাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হতে। উয়াইনার মুখোমুখি আখরাম। দু'জন প্রচণ্ড লড়াই করছেন। আখরামের আঘাতে উয়াইনার ঘোড়া আহত হলো, কিন্তু উয়াইনার পাল্টা আঘাতে আখরাম শহীদ হয়ে গেলেন। শাহাদাত। আখরামের কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত। আল্লাহর রাসূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষগুলো এভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বরণ করে নিতেন।
আখরামকে হত্যা করে উয়াইনাহ তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বসলো। এরপর দৃশ্যপটে আসলেন দ্বিতীয় বীরযোদ্ধা আবু কাতাদা। আবু কাতাদা উয়াইনাকে আক্রমণ করলেন, পাল্টা আঘাতে উয়াইনা আবু কাতাদার ঘোড়াকে মেরে ফেললো। কিন্তু আবু কাতাদা আল্লাহর ইচ্ছায় উয়াইনাকে হত্যা করলেন আর তার ঘোড়া নিজের দখলে নিয়ে সেটায় চড়ে বসলেন। সেটা আসলে আখরামের ঘোড়া ছিল। সালামা এরপর আবারও ডাকাতদলকে তাড়া করতে শুরু করলেন। আবার ফেরা যাক সালামার বর্ণনায়,
'সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখকে উজ্জ্বল করেছেন, আমি তখন এতটাই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ধাওয়া করছি যে পেছনে রাসূলুল্লাহর কোনো সাহাবিকেই দেখতে পেলাম না। এমনকি তাদের ঘোড়ার খুরের উড়ানো ধূলিও আমার চোখে পড়ল না। এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ডাকাতদল একটা গিরিপথে থামলো। সেখানে যি-কারদ নামে একটা ঝর্ণা ছিল। খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি খাবে, এরকম মুহূর্তে তারা আমাকে দেখে পানি খাওয়া ছেড়ে পড়িমরি করে পাহাড়ের ওপরে পালাতে শুরু করলো! আমি হুংকার দিয়ে বলে উঠলাম,
এই দ্যাখ! আমি আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
সারিবদিনের ছুটোছুটির পর লুটেরার দল তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত। তাদের আর চলার শক্তি বাকি নেই। সালামাকে দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না এই একটি লোক সেই ভোর থেকে দৌড়ে তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে তাদের একজন বললো,
- তুমিই কি সেই লোক যে ভোর থেকে আমাদের তাড়া করে ফিরছো!
- হ্যাঁ! আমিই তোদের জানের দুশমন! ভোরবেলার সেই আকওয়া!'
লুটেরার দল সারাদিন ঘোড়ায় করে পালিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের ঘোড়াগুলোও ছুটতে ছুটতে কাহিল হয়ে পড়েছে, শক্তির আর লেশমাত্র নেই। তারা দুটো ক্লান্ত ঘোড়া উপত্যকায় রেখে চলে গেল। সালামা বলেন,
'তারা যে দুটো ঘোড়া পেছনে ফেলে পালিয়েছিল আমি সেগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে ফেরত গেলাম। তিনি তখন সেই ঝর্ণার কাছে। সেখান থেকে সকালে মুশরিকদের পানি খেতে না দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে শত্রুদের ফেলে যাওয়া চাদর আর বর্শাগুলো রাসূলুল্লাহর হস্তগত হয়েছে। আর বিলালকে দেখলাম উদ্ধার করা উটগুলোর একটিকে জবাই করে সেটার কলিজা ভুনা করছেন। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে তাঁকে বললাম,
- ইয়া আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আপনার বাহিনী থেকে একশো জন লোক নিয়ে এই কাফিরদের ধাওয়া করবো। এমনভাবে তাদের হত্যা করবো যে তাদের খবর আনার মতো একটা লোকও থাকবে না।
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসলেন যে, আগুনের আলোয় আমি তাঁর দাঁত দেখতে পেলাম!
- তুমি আসলেই এই কাজ করতে পারবে তো সালামা?
- সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, অবশ্যই পারবো!'
গাতফানের এক লোক থেকে পরে সাহাবিরা জানতে পারেন যে, সেদিন তারা একটা উট জবাই করেছিল। এমন সময় তারা সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার আগমন টের পেয়ে জবাই করা উট ফেলেই পালিয়ে যায়। এই ছিল রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের কাজের নমুনা! শত্রুদলের লোকগুলো তাদের খাবার পর্যন্ত মুখে তোলার সুযোগ পায়নি।
পরদিন সকাল রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিলেন, 'আমাদের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী হলো আবু কাতাদা আর শ্রেষ্ঠ পদাতিক সৈন্য হলো সালামা।' রাসূলুল্লাহ সালামাকে পদাতিক এবং অশ্বারোহী দুটো ভাগেরই গনিমত দেন। যখন কোনো সাহাবি কৃতিত্বের কোনো কাজ করতেন, রাসূলুল্লাহ তাকে কদর করতে ভুলতেন না। তিনি সালামা ইবন আল আকওয়াকে তাঁর উট 'আদবা'র পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। দুজন একই উটের পিঠে চেপে একসাথে মদীনায় ফেরত আসলেন।
আল-গাবার অভিযান থেকে শিক্ষা
প্রথমত, শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার গুরুত্ব। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন সুস্থ-সমর্থ, শক্তিশালী একজন মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে অনায়াসে পরিশ্রম করে গেছেন। ঘোড়াও তার সাথে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তিনি ক্লান্ত হননি। সেই অভিযান থেকে আসার পথেও এক আনসারী সাহাবির সাথে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন। আজকের দিনের যুবকদের মধ্যে এমন ফিটনেস বিরল। সাহাবিরা ঘরের কোণে বসে থেকে বইপত্র বা কম্পিউটারে মাথা গুঁজে থাকার মানুষ ছিলেন না। দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর ছোঁড়া- এসব ছিল সাহাবিদের নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন। জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে তারা নিয়মিত এসব অনুশীলন করতেন।
দ্বিতীয়ত, লাইলার ঘটনা থেকে ইমাম নববী মহিলাদের একা ভ্রমণের ওপর একটি মাসআলা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'জরুরি প্রয়োজনে মুসলিম নারী নিজের স্বামী বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন। এরকম জরুরি প্রয়োজন উদ্ভূত হতে পারে যদি কোনো মহিলা দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করতে চায় কিংবা কেউ তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করাতে চায় বা এরকম কিছু। প্রয়োজন ছাড়া একাকী ভ্রমণ মুসলিম মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ।' অর্থাৎ প্রয়োজনে মুসলিম নারীদের একা ভ্রমণ করা জায়েয তবে প্রয়োজন বলতে কী বোঝায় সেটা ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়া চাই।
টিকাঃ
70 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় মানত, হাদীস ১১।
এই অভিযানটি ছিল ষষ্ঠ হিজরিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিযান। আর অভিযানের মূল নায়ক ছিলেন সালামা ইবন আল-আকওয়া। এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচশো সাহাবি, কিন্তু সালামার বীরত্ব আর সাহসিকতা আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন মক্কা ছেড়ে আসা এক মুহাজির। পরিবার, সহায়-সম্পদ সবকিছু ছেড়েছুড়ে তিনি আল্লাহ ও তাঁর নবীর পথে হিজরত করেছিলেন। মদীনায় এসে তিনি তালহা ইবন উবায়দুল্লাহর চাকরি নেন। তাঁর ঘোড়া চড়ানো, তাঁকে খেদমত করা, এভাবেই দিন কাটতে থাকে।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা এভাবে, আবদুর রহমান উয়াইনা ইবন হিসন আল-ফিজারীর নেতৃত্বে গাতফানের কিছু লোক গাবাহ নামক স্থানে হামলা চালায়। গাবাহ মদীনার কাছেই একটা উর্বর জায়গা। সেখানে মুসলিমরা তাদের উট চড়ানোর জন্য পাঠাতো। একদিন আবদুর রহমান আল-ফিজারীর লোকেরা এসে মুসলিম মেষপালক যার ইবন আবি যারকে হত্যা করে। তার স্ত্রী লাইলাকে বন্দী করে এবং বিশটা উট লুট করে পালিয়ে যায়। উটগুলো ছিল আল্লাহর রাসূলের উট।
ঘটনাস্থলের কাছেই উপস্থিত ছিলেন সালামা ইবন আল আকওয়া এবং রাবাহ। তারা দুজনেই সেদিন উট চরাতে তৃণভূমিতে নিয়ে এসেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ভোর বেলায়। সালামা এই ঘটনা দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ রাবাহকে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেন। আর তিনি নিজে শত্রুদের দৌড়ে ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
"ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা!"
'ওয়া সুবহা' ছিল সে যুগের বিপদ সংকেত। সালামার চিৎকার মদীনা থেকেও শোনা গেল। সাহাবিরা দ্রুত রাসূলুল্লাহর কাছে এসে জমা হলেন। এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই হবে। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাৎ পাঁচশো সৈনিকের দল প্রস্তুত করলেন।
এদিকে সালামা সৈন্যবাহিনী আসার অপেক্ষা না করে একাই উয়াইনা আর তার দলবলের পিছু নেওয়ার জন্য ছুটে গেলেন। কিন্তু তার কাছে তখন না আছে কোনো ঘোড়া, না আছে কোনো উট, ছিল শুধু দুটো পা। সেই পা দুটোকে পুঁজি করেই লুটেরাদের ধরার জন্য দৌড়াতে লাগলেন। সালামার ভাষায়,
'আমি লুটেরাদের তাড়া দিতে বেরিয়ে পড়লাম। তাদের দিকে একের পর এক তীর ছুঁড়ছি আর ছন্দ মিলিয়ে হুংকার দিচ্ছি,
এই দ্যাখ! আমি হলাম আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
যাকেই হাতের নাগালে পাচ্ছি, এমনভাবে তীর ছুঁড়ে মারছি যে কাঁধ ছেদ করে তীরের মাথা বেরিয়ে আসছে। তাদের কেউ যখন আমার দিকে পিছু ফিরতো, আমি গাছের গোড়ায় বসে পড়তাম আর আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে তাকে কিংবা তার পশুকে ঘায়েল করতে লাগলাম!'
লুটেরাদের সবাই ছিল ঘোড়ায় আর সালামা ইবন আল আকওয়া পদাতিক একজন সৈনিক মাত্র। অথচ সালামার ধাওয়া খেয়ে তাদের রীতিমতো পাগল হওয়ার মতো অবস্থা! তারা কোনোরকমে একটা পাহাড়ের পাশে সরু গিরিপথের মতো জায়গায় আশ্রয় নিল। সালামা এরপর সেই পাহাড়ে উঠে ওপর থেকে তাদের ওপর একের পর এক পাথর মারতে লাগলেন। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তারা লুট করা সবগুলো উট ছেড়ে দিয়ে ক্ষান্ত হলো।
শত্রুরা ক্ষান্ত হলেও সালামা ইবন আল আকওয়া মোটেও ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাদের ধাওয়া করতেই থাকলেন। ধাওয়া খেতে খেতে শত্রুদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম! কোনোমতে ত্রিশটা জোব্বা আর ত্রিশটা বর্শা ফেলে নিজেদের বোঝা হালকা করে পড়িমরি করে পালাতে লাগলো। ফেলে যাওয়া জিনিসগুলোও সালামা চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। জিনিসগুলোর ওপর সালামা একটা করে নিশানা রেখে দিতে দিতে এগোচ্ছিলেন যেন জিনিসগুলো পরে খুঁজে পেতে সমস্যা না হয় আর রাসূলুল্লাহর পাঠানো বাহিনীও যেন এই চিহ্ন দেখে পথ চিনে নেয়। সালামা বর্ণনা করেন,
'শেষ পর্যন্ত লুটেরার দল এক সরু পাহাড়ি পথে গিয়ে থামলো। সেখানে তারা বদর আল ফাজারির ছেলের সাথে মিলিত হলো। সবাই মিলে সকালের নাস্তা খেতে বসেছে, আমি তখন একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো। আমাকে দেখিয়ে ফাজারি বললো, এই লোকটা কে? তারা বললো, এই লোক-ই তো আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। সেই ভোর থেকে আমাদের পিছু ছাড়েনি! তীর মারতে মারতে আমাদের থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ফাজারি বললো, তোমরা তাকে তাড়া করছো না কেন! যাও, চার জন গিয়ে এখনই এই লোককে শেষ করে দাও।
তাদের মধ্যে চারজন পাহাড়ে উঠে আমার কাছাকাছি এল। আমি বললাম,
- তোরা চিনিস আমাকে?
- না, চিনি না। কে তুমি?
- আমি হলাম সালামা ইবন আল-আকওয়া। সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, আমি চাইলে তোদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করে দিতে পারি কিন্তু তোরা কেউ আমার কিছুই করতে পারবি না।
এই কথা শুনে তাদের একজন বললো, আমার মনে হয় সে ঠিকই বলছে।
এরপর তারা চলে গেল। আল্লাহর রাসূলের ঘোড়সওয়ারিরা আসা পর্যন্ত আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। সবার আগে দেখতে পেলাম আখরাম আল-আসাদীকে। তার পেছনে পেছনে আসছে আবু কাতাদা আল-আনসারি, আর তারও পেছনে ছিল মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ। আমি আখরামের ঘোড়ার লাগাম টেনে বললাম, আখরাম, তুমি সতর্ক থাকো। ওরা একা পেলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
আখরাম আমাকে বললো, সালামা! যদি তুমি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তুমি যদি বিশ্বাস করে থাকো যে জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য -- তাহলে আমার আর শাহাদাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িও না।'
কারো কারো বুকের ভেতর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বাসনা কত যে তীব্র হয়! আখরামের অদম্য সাধ শহীদ হবেন। এরপর সালামাহ আর বাধা দিলেন না। পথ ছেড়ে দিলেন। আখরাম ছুটে গেলেন লুটেরাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হতে। উয়াইনার মুখোমুখি আখরাম। দু'জন প্রচণ্ড লড়াই করছেন। আখরামের আঘাতে উয়াইনার ঘোড়া আহত হলো, কিন্তু উয়াইনার পাল্টা আঘাতে আখরাম শহীদ হয়ে গেলেন। শাহাদাত। আখরামের কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত। আল্লাহর রাসূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষগুলো এভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বরণ করে নিতেন।
আখরামকে হত্যা করে উয়াইনাহ তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বসলো। এরপর দৃশ্যপটে আসলেন দ্বিতীয় বীরযোদ্ধা আবু কাতাদা। আবু কাতাদা উয়াইনাকে আক্রমণ করলেন, পাল্টা আঘাতে উয়াইনা আবু কাতাদার ঘোড়াকে মেরে ফেললো। কিন্তু আবু কাতাদা আল্লাহর ইচ্ছায় উয়াইনাকে হত্যা করলেন আর তার ঘোড়া নিজের দখলে নিয়ে সেটায় চড়ে বসলেন। সেটা আসলে আখরামের ঘোড়া ছিল। সালামা এরপর আবারও ডাকাতদলকে তাড়া করতে শুরু করলেন। আবার ফেরা যাক সালামার বর্ণনায়,
'সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখকে উজ্জ্বল করেছেন, আমি তখন এতটাই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ধাওয়া করছি যে পেছনে রাসূলুল্লাহর কোনো সাহাবিকেই দেখতে পেলাম না। এমনকি তাদের ঘোড়ার খুরের উড়ানো ধূলিও আমার চোখে পড়ল না। এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ডাকাতদল একটা গিরিপথে থামলো। সেখানে যি-কারদ নামে একটা ঝর্ণা ছিল। খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি খাবে, এরকম মুহূর্তে তারা আমাকে দেখে পানি খাওয়া ছেড়ে পড়িমরি করে পাহাড়ের ওপরে পালাতে শুরু করলো! আমি হুংকার দিয়ে বলে উঠলাম,
এই দ্যাখ! আমি আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
সারিবদিনের ছুটোছুটির পর লুটেরার দল তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত। তাদের আর চলার শক্তি বাকি নেই। সালামাকে দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না এই একটি লোক সেই ভোর থেকে দৌড়ে তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে তাদের একজন বললো,
- তুমিই কি সেই লোক যে ভোর থেকে আমাদের তাড়া করে ফিরছো!
- হ্যাঁ! আমিই তোদের জানের দুশমন! ভোরবেলার সেই আকওয়া!'
লুটেরার দল সারাদিন ঘোড়ায় করে পালিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের ঘোড়াগুলোও ছুটতে ছুটতে কাহিল হয়ে পড়েছে, শক্তির আর লেশমাত্র নেই। তারা দুটো ক্লান্ত ঘোড়া উপত্যকায় রেখে চলে গেল। সালামা বলেন,
'তারা যে দুটো ঘোড়া পেছনে ফেলে পালিয়েছিল আমি সেগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে ফেরত গেলাম। তিনি তখন সেই ঝর্ণার কাছে। সেখান থেকে সকালে মুশরিকদের পানি খেতে না দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে শত্রুদের ফেলে যাওয়া চাদর আর বর্শাগুলো রাসূলুল্লাহর হস্তগত হয়েছে। আর বিলালকে দেখলাম উদ্ধার করা উটগুলোর একটিকে জবাই করে সেটার কলিজা ভুনা করছেন। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে তাঁকে বললাম,
- ইয়া আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আপনার বাহিনী থেকে একশো জন লোক নিয়ে এই কাফিরদের ধাওয়া করবো। এমনভাবে তাদের হত্যা করবো যে তাদের খবর আনার মতো একটা লোকও থাকবে না।
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসলেন যে, আগুনের আলোয় আমি তাঁর দাঁত দেখতে পেলাম!
- তুমি আসলেই এই কাজ করতে পারবে তো সালামা?
- সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, অবশ্যই পারবো!'
গাতফানের এক লোক থেকে পরে সাহাবিরা জানতে পারেন যে, সেদিন তারা একটা উট জবাই করেছিল। এমন সময় তারা সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার আগমন টের পেয়ে জবাই করা উট ফেলেই পালিয়ে যায়। এই ছিল রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের কাজের নমুনা! শত্রুদলের লোকগুলো তাদের খাবার পর্যন্ত মুখে তোলার সুযোগ পায়নি।
পরদিন সকাল রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিলেন, 'আমাদের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী হলো আবু কাতাদা আর শ্রেষ্ঠ পদাতিক সৈন্য হলো সালামা।' রাসূলুল্লাহ সালামাকে পদাতিক এবং অশ্বারোহী দুটো ভাগেরই গনিমত দেন। যখন কোনো সাহাবি কৃতিত্বের কোনো কাজ করতেন, রাসূলুল্লাহ তাকে কদর করতে ভুলতেন না। তিনি সালামা ইবন আল আকওয়াকে তাঁর উট 'আদবা'র পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। দুজন একই উটের পিঠে চেপে একসাথে মদীনায় ফেরত আসলেন।
আল-গাবার অভিযান থেকে শিক্ষা
প্রথমত, শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার গুরুত্ব। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন সুস্থ-সমর্থ, শক্তিশালী একজন মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে অনায়াসে পরিশ্রম করে গেছেন। ঘোড়াও তার সাথে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তিনি ক্লান্ত হননি। সেই অভিযান থেকে আসার পথেও এক আনসারী সাহাবির সাথে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন। আজকের দিনের যুবকদের মধ্যে এমন ফিটনেস বিরল। সাহাবিরা ঘরের কোণে বসে থেকে বইপত্র বা কম্পিউটারে মাথা গুঁজে থাকার মানুষ ছিলেন না। দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর ছোঁড়া- এসব ছিল সাহাবিদের নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন। জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে তারা নিয়মিত এসব অনুশীলন করতেন।
দ্বিতীয়ত, লাইলার ঘটনা থেকে ইমাম নববী মহিলাদের একা ভ্রমণের ওপর একটি মাসআলা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'জরুরি প্রয়োজনে মুসলিম নারী নিজের স্বামী বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন। এরকম জরুরি প্রয়োজন উদ্ভূত হতে পারে যদি কোনো মহিলা দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করতে চায় কিংবা কেউ তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করাতে চায় বা এরকম কিছু। প্রয়োজন ছাড়া একাকী ভ্রমণ মুসলিম মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ।' অর্থাৎ প্রয়োজনে মুসলিম নারীদের একা ভ্রমণ করা জায়েয তবে প্রয়োজন বলতে কী বোঝায় সেটা ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়া চাই।
টিকাঃ
70 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় মানত, হাদীস ১১।
📄 ৫) উরাইনার রাখালদের কাহিনিঃ কুরয ইবন জারির আল-ফিহরীর অভিযান
উরাইনাহ গোত্র থেকে কিছু লোক রাসূলুল্লাহর কাছে এসেছিল। রাসূলুল্লাহর সাথে ইসলাম নিয়ে কথাবার্তা বলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। মদীনায় এসেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমবার মদীনায় আগতদের জন্য এটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। তারা তখন রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, 'আমরা তো মেষপালক, শহরেদের মতো এক জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত নই।' তারা আর মদীনায় থাকতে চাচ্ছিলো না। রাসূলুল্লাহ তখন তাদের কিছু উট দেন। একজন মেষপালককে তাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন আর অসুস্থতার চিকিৎসা হিসেবে উটের দুধ ও মূত্র পান করতে বলে দিলেন। লোকগুলো রাখালসহ উটগুলো নিয়ে মদীনার বাইরে চলে এল। আস্তে আস্তে সবাই সুস্থ হয়ে উঠলো।
কিন্তু শরীর সুস্থ হলেও তাদের হৃদয় ছিল অসুস্থ। বেদুইন এই লোকগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের অকৃতজ্ঞ। কঠোর তাদের হৃদয়। সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পরেই তারা ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেল। খুব নৃশংসভাবে রাসূলুল্লাহর মেষপালককে হত্যা করে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে গেল।
এই খবর আল্লাহর রাসূলের কাছে পৌঁছলো। রাসূলুল্লাহ দুআ করলেন যেন তাদের পথ সংকুচিত হয়ে যায়, হলোও তাই। তারা পথ হারিয়ে ফেললো। কুরয ইবন জারির বিশ জন মুসলিমকে সাথে নিয়ে তাদের খুঁজতে বেরোলেন। ভরদুপুরে কুরয ইবন জারির বিশ্বাসঘাতকদের ধরে নিয়ে রাসুলের শহরে ঢুকলেন। জালিমদের শাস্তি এবার বাস্তবায়িত হবে।
রাসূলুল্লাহ আদেশ করলেন তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে, লোহার গরম শিক দিয়ে তাদের চোখ উপড়ে ফেলা হবে। ঠিক যেভাবে করে তারা রাসূলুল্লাহর মেষচালককে হত্যা করেছিল। এটাই ছিল লোকগুলোর অপরাধের শাস্তি। এরপর তাদেরকে না মেরে মদীনার আল-হুররাহ পাহাড়ের কাছে ফেলে রাখা হয়। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত হয়ে তারা পানি চাইতে থাকে, কিন্তু তাদেরকে এক ফোঁটা পানিও খেতে দেওয়া হয়নি। এভাবেই তাদের কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা হয়।
শিক্ষা
১) এই ঘটনায় আমরা দেখেছি রাসূলুল্লাহ বেদুইনদেরকে উটের মূত্রকে ওষুধ হিসেবে খাবার পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে এটা বিতর্কিত একটা ব্যাপার। ইসলাম বিদ্বেষীরা এই হাদীসকে নিয়ে মুসলিমদের ওপর এক চোট নেয়। অমুসলিমদের উচিত ইসলামের বিষয়গুলো সততার সাথে বোঝার চেষ্টা করা। ইসলাম বিরোধিতার হুজুগে গা ভাসানো উচিত নয়। আর আমাদের মুসলিমদের উচিত হচ্ছে যখনই আমরা দেখব কোনো ঘটনা সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত, তখনই আমরা একে সত্য বলে ধরে নেব। রাসূল বলেছেন, তাই আমরা তাতে বিশ্বাস রাখি। এটাই হচ্ছে ঈমান।
২) দ্বিতীয় বিষয়টি হলো শাস্তির তীব্রতা। রাহমাতাল্লিল আলামিন রাসূলুল্লাহর গোটা সীরাতে এরকম কঠোরভাবে শত্রুদের শাস্তি দেওয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কেন এত কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হলো? সে সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু কিলাবা। তার মতে, 'এই লোকগুলো হত্যা করেছে, চুরি করেছে, আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং জমিনের বুকে ফাসাদ সৃষ্টি করেছে।' তাদের দ্বারা সংঘটিত সবগুলো অপরাধই মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। তারা শুধু ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদই হয়নি, তারা হারাবা করেছিল অর্থাৎ অস্ত্রসহ ডাকাতি করেছিল।
এই ধরনের অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের সূরা মায়িদায় আছে তাদের একহাত এবং এক পা কেটে ফেলতে হবে। লোকগুলোর চোখ উপড়ে ফেলা সম্পর্কে মুসলিম শরীফে বলা হয়েছে তারা মেষপালকের চোখ উপড়ে ফেলেছিল, তাই তাদের সাথেও একই রকম কাজ করা হয়েছে। এটা হলো কিসাস।
টিকাঃ
71 সহীহ বুখারি, অধ্যায় যাকাত, হাদীস ১০২।
উরাইনাহ গোত্র থেকে কিছু লোক রাসূলুল্লাহর কাছে এসেছিল। রাসূলুল্লাহর সাথে ইসলাম নিয়ে কথাবার্তা বলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। মদীনায় এসেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমবার মদীনায় আগতদের জন্য এটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। তারা তখন রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, 'আমরা তো মেষপালক, শহরেদের মতো এক জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত নই।' তারা আর মদীনায় থাকতে চাচ্ছিলো না। রাসূলুল্লাহ তখন তাদের কিছু উট দেন। একজন মেষপালককে তাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন আর অসুস্থতার চিকিৎসা হিসেবে উটের দুধ ও মূত্র পান করতে বলে দিলেন। লোকগুলো রাখালসহ উটগুলো নিয়ে মদীনার বাইরে চলে এল। আস্তে আস্তে সবাই সুস্থ হয়ে উঠলো।
কিন্তু শরীর সুস্থ হলেও তাদের হৃদয় ছিল অসুস্থ। বেদুইন এই লোকগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের অকৃতজ্ঞ। কঠোর তাদের হৃদয়। সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পরেই তারা ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেল। খুব নৃশংসভাবে রাসূলুল্লাহর মেষপালককে হত্যা করে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে গেল।
এই খবর আল্লাহর রাসূলের কাছে পৌঁছলো। রাসূলুল্লাহ দুআ করলেন যেন তাদের পথ সংকুচিত হয়ে যায়, হলোও তাই। তারা পথ হারিয়ে ফেললো। কুরয ইবন জারির বিশ জন মুসলিমকে সাথে নিয়ে তাদের খুঁজতে বেরোলেন। ভরদুপুরে কুরয ইবন জারির বিশ্বাসঘাতকদের ধরে নিয়ে রাসুলের শহরে ঢুকলেন। জালিমদের শাস্তি এবার বাস্তবায়িত হবে।
রাসূলুল্লাহ আদেশ করলেন তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে, লোহার গরম শিক দিয়ে তাদের চোখ উপড়ে ফেলা হবে। ঠিক যেভাবে করে তারা রাসূলুল্লাহর মেষচালককে হত্যা করেছিল। এটাই ছিল লোকগুলোর অপরাধের শাস্তি। এরপর তাদেরকে না মেরে মদীনার আল-হুররাহ পাহাড়ের কাছে ফেলে রাখা হয়। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত হয়ে তারা পানি চাইতে থাকে, কিন্তু তাদেরকে এক ফোঁটা পানিও খেতে দেওয়া হয়নি। এভাবেই তাদের কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা হয়।
শিক্ষা
১) এই ঘটনায় আমরা দেখেছি রাসূলুল্লাহ বেদুইনদেরকে উটের মূত্রকে ওষুধ হিসেবে খাবার পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে এটা বিতর্কিত একটা ব্যাপার। ইসলাম বিদ্বেষীরা এই হাদীসকে নিয়ে মুসলিমদের ওপর এক চোট নেয়। অমুসলিমদের উচিত ইসলামের বিষয়গুলো সততার সাথে বোঝার চেষ্টা করা। ইসলাম বিরোধিতার হুজুগে গা ভাসানো উচিত নয়। আর আমাদের মুসলিমদের উচিত হচ্ছে যখনই আমরা দেখব কোনো ঘটনা সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত, তখনই আমরা একে সত্য বলে ধরে নেব। রাসূল বলেছেন, তাই আমরা তাতে বিশ্বাস রাখি। এটাই হচ্ছে ঈমান।
২) দ্বিতীয় বিষয়টি হলো শাস্তির তীব্রতা। রাহমাতাল্লিল আলামিন রাসূলুল্লাহর গোটা সীরাতে এরকম কঠোরভাবে শত্রুদের শাস্তি দেওয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কেন এত কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হলো? সে সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু কিলাবা। তার মতে, 'এই লোকগুলো হত্যা করেছে, চুরি করেছে, আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং জমিনের বুকে ফাসাদ সৃষ্টি করেছে।' তাদের দ্বারা সংঘটিত সবগুলো অপরাধই মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। তারা শুধু ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদই হয়নি, তারা হারাবা করেছিল অর্থাৎ অস্ত্রসহ ডাকাতি করেছিল।
এই ধরনের অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের সূরা মায়িদায় আছে তাদের একহাত এবং এক পা কেটে ফেলতে হবে। লোকগুলোর চোখ উপড়ে ফেলা সম্পর্কে মুসলিম শরীফে বলা হয়েছে তারা মেষপালকের চোখ উপড়ে ফেলেছিল, তাই তাদের সাথেও একই রকম কাজ করা হয়েছে। এটা হলো কিসাস।
টিকাঃ
71 সহীহ বুখারি, অধ্যায় যাকাত, হাদীস ১০২।
📄 ৬) বনু কালবের বিরুদ্ধে অভিযান
আবদুর রহমান ইবন আউফকে পাঠানো হয় দাউমাতুল জান্দালে, বনু কালবের কাছে। এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্য নিকটবর্তী একটি খ্রিস্টান গোত্র। আবদুর রাহমান ইবন আউফ ছিলেন মুহাজির, রাসূলুল্লাহর খুব কাছের মানুষ। এই অভিযানে যাওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে তার মাথায় পাগড়ি বেঁধে দেন। এরপর সংক্ষিপ্ত কিন্তু মূল্যবান কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
'যুদ্ধ করো আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে। জিহাদ করো কাফিরদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্যায়ভাবে গনিমতের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না, চুক্তিভঙ্গ কোরো না, কোনো শিশুকে হত্যা কোরো না।'
জিহাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। মুসলিমরা জিহাদ করে শুধু আল্লাহর জন্য। নিজেদের দল নিয়ে গর্ব করাও জিহাদের নিয়ত হতে পারে না। এ বিষয়টি আল্লাহর রাসূল সবসময় তাঁর সৈনিকদের মনে করিয়ে দিতেন। যুদ্ধের উত্তেজনায় যেন তারা বাড়াবাড়ি না করে বসে।
নির্দেশ মোতাবেক আবদুর রহমান বনু কালবকে ইসলামের দাওয়াত দেন। প্রথমে তারা প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু তৃতীয় দিনে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর রাসূলুল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের নেতার মেয়ে তুমাদির বিনত আসবাগকে বিয়ে করে ফিরে আসেন। এর মাধ্যমে মদীনার বাইরের কোনো স্থানে সর্বপ্রথম ইসলামী আইন চালু হয়।
আবদুর রহমান ইবন আউফকে পাঠানো হয় দাউমাতুল জান্দালে, বনু কালবের কাছে। এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্য নিকটবর্তী একটি খ্রিস্টান গোত্র। আবদুর রাহমান ইবন আউফ ছিলেন মুহাজির, রাসূলুল্লাহর খুব কাছের মানুষ। এই অভিযানে যাওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে তার মাথায় পাগড়ি বেঁধে দেন। এরপর সংক্ষিপ্ত কিন্তু মূল্যবান কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
'যুদ্ধ করো আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে। জিহাদ করো কাফিরদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্যায়ভাবে গনিমতের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না, চুক্তিভঙ্গ কোরো না, কোনো শিশুকে হত্যা কোরো না।'
জিহাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। মুসলিমরা জিহাদ করে শুধু আল্লাহর জন্য। নিজেদের দল নিয়ে গর্ব করাও জিহাদের নিয়ত হতে পারে না। এ বিষয়টি আল্লাহর রাসূল সবসময় তাঁর সৈনিকদের মনে করিয়ে দিতেন। যুদ্ধের উত্তেজনায় যেন তারা বাড়াবাড়ি না করে বসে।
নির্দেশ মোতাবেক আবদুর রহমান বনু কালবকে ইসলামের দাওয়াত দেন। প্রথমে তারা প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু তৃতীয় দিনে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর রাসূলুল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের নেতার মেয়ে তুমাদির বিনত আসবাগকে বিয়ে করে ফিরে আসেন। এর মাধ্যমে মদীনার বাইরের কোনো স্থানে সর্বপ্রথম ইসলামী আইন চালু হয়।
📄 অন্যান্য কিছু অভিযান
ষষ্ঠ হিজরী মুসলিমদের জন্য ব্যস্ত একটি বছর ছিল। বড় কোনো যুদ্ধ সংঘটিত না হলেও পুরো সময় ধরে অনেকগুলো আক্রমণাত্মক অভিযানে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। এরকম আরও কিছু অভিযান সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
১) রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ উকাশাহ ইবন মিহসানের নেতৃত্বে চল্লিশ জনের একটি দলকে পাঠান বনু আসাদ গোত্রকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে। তারা বনু আসাদের এলাকায় যান। তাদের পানির কুয়া 'আল-গামর' দখল করে নেন এবং সেখানেই তাঁবু গাড়েন। শত্রুরা সবকিছু রেখে পালিয়ে যায়। তাদের রেখে যাওয়া দু'শোর মতো উট গনিমাহ হিসেবে নিয়ে উকাশাহ ফিরে আসেন।
২) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি বাহিনী পাঠানো হয় যিল-কিসসায়। উদ্দেশ্য ছিল বনু সালাবা এবং উওয়্যাল গোত্রকে ভয় দেখানো যেন গোত্র দুটি মুসলিমদের ভূমিতে অতর্কিত আক্রমণ করতে সাহস না পায়। তাদের লক্ষ্যস্থল ছিল মদীনা থেকে মাত্র চব্বিশ মাইল দূরে। রাতের বেলা সেখানে পৌঁছলে একশোর মতো লোক তাদের ঘিরে ধরে। তারা শত্রুদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। দশ জনের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ ছাড়া প্রত্যেকে শহীদ হয়ে যান। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ আহত অবস্থায় মদীনায় ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ তখন সাথে সাথে আবু উবায়দার নেতৃত্বে চল্লিশ সদস্যের একটি বাহিনী পাঠান। তাদের আগমন আঁচ করতে পেরে শত্রুরা পলায়ন করে। তাদের কিছু সম্পদ আর একজন লোককে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসা হয়।
৩) যায়িদ ইবন হারিসাকে পাঠানো হয় আল-ঈসে। জায়গাটি ছিল মদীনা থেকে চার রাতের দূরত্বে। মক্কার একটি কাফেলাকে আক্রমণ করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। তারা কাফেলা আটক করেন, কাফেলার সম্পদ জব্দ করেন এবং কিছু লোককে বন্দী করেন। বন্দীদের মধ্যে একজন ছিলেন রাসূলুল্লাহর কন্যা যাইনাবের স্বামী আবুল-আস।
৪) একই বছরে আলী ইবন আবি তালিবকে পাঠানো হয় বনু সাদ ইবন বকরের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে। গোত্রটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে খাইবারের ইহুদিদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছিল। আলীর বাহিনীর সাথে যুদ্ধ না করে গোত্রটি সেখান থেকে সরে পড়ে। একজন লোক বন্দী হয়। তার থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
অভিযানগুলো থেকে দুটো বিষয় লক্ষণীয়,
প্রথমত, চারপাশের কোথায় কী ঘটছে সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সজাগ ছিলেন। মুসলিমরা যুদ্ধের ময়দানেই কেবল শক্তিশালী ছিলেন না, বরং গোয়েন্দাগিরিতেও তারা ছিলেন সমান পারদর্শী। নজরদারি (Surveillance) এবং তথ্য সংগ্রহ (Intelligence) দুটো কাজে তাঁর গোয়েন্দা বাহিনী সবসময়ই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে এসেছে। রাসূলুল্লাহকে কখনই শত্রুরা চমকে দিতে পারেনি, বরং তিনিই সবসময় তাদেরকে চমকে দিতেন।
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহর যুদ্ধ কেবল কুরাইশদের বিরুদ্ধে সীমিত ছিল না। বরং যে বা যারা মুসলিমদের প্রকাশ্য শত্রুদের গোপনে বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে আসছিল, রাসূলুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন এবং অভিযান পরিচালনা করেছেন। যদি শুরু থেকেই তাদেরকে প্রতিহত করা না হতো, তাহলে অনেকেই মদীনার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস দেখাতে শুরু করতো। রাষ্ট্রপরিচালনার কাজটি সবসময়ই জটিল। কিতাবি জ্ঞান এই কাজের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং আরও প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি এবং তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ধারণা।
ষষ্ঠ হিজরী মুসলিমদের জন্য ব্যস্ত একটি বছর ছিল। বড় কোনো যুদ্ধ সংঘটিত না হলেও পুরো সময় ধরে অনেকগুলো আক্রমণাত্মক অভিযানে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। এরকম আরও কিছু অভিযান সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
১) রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ উকাশাহ ইবন মিহসানের নেতৃত্বে চল্লিশ জনের একটি দলকে পাঠান বনু আসাদ গোত্রকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে। তারা বনু আসাদের এলাকায় যান। তাদের পানির কুয়া 'আল-গামর' দখল করে নেন এবং সেখানেই তাঁবু গাড়েন। শত্রুরা সবকিছু রেখে পালিয়ে যায়। তাদের রেখে যাওয়া দু'শোর মতো উট গনিমাহ হিসেবে নিয়ে উকাশাহ ফিরে আসেন।
২) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি বাহিনী পাঠানো হয় যিল-কিসসায়। উদ্দেশ্য ছিল বনু সালাবা এবং উওয়্যাল গোত্রকে ভয় দেখানো যেন গোত্র দুটি মুসলিমদের ভূমিতে অতর্কিত আক্রমণ করতে সাহস না পায়। তাদের লক্ষ্যস্থল ছিল মদীনা থেকে মাত্র চব্বিশ মাইল দূরে। রাতের বেলা সেখানে পৌঁছলে একশোর মতো লোক তাদের ঘিরে ধরে। তারা শত্রুদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। দশ জনের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ ছাড়া প্রত্যেকে শহীদ হয়ে যান। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ আহত অবস্থায় মদীনায় ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ তখন সাথে সাথে আবু উবায়দার নেতৃত্বে চল্লিশ সদস্যের একটি বাহিনী পাঠান। তাদের আগমন আঁচ করতে পেরে শত্রুরা পলায়ন করে। তাদের কিছু সম্পদ আর একজন লোককে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসা হয়।
৩) যায়িদ ইবন হারিসাকে পাঠানো হয় আল-ঈসে। জায়গাটি ছিল মদীনা থেকে চার রাতের দূরত্বে। মক্কার একটি কাফেলাকে আক্রমণ করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। তারা কাফেলা আটক করেন, কাফেলার সম্পদ জব্দ করেন এবং কিছু লোককে বন্দী করেন। বন্দীদের মধ্যে একজন ছিলেন রাসূলুল্লাহর কন্যা যাইনাবের স্বামী আবুল-আস।
৪) একই বছরে আলী ইবন আবি তালিবকে পাঠানো হয় বনু সাদ ইবন বকরের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে। গোত্রটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে খাইবারের ইহুদিদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছিল। আলীর বাহিনীর সাথে যুদ্ধ না করে গোত্রটি সেখান থেকে সরে পড়ে। একজন লোক বন্দী হয়। তার থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
অভিযানগুলো থেকে দুটো বিষয় লক্ষণীয়,
প্রথমত, চারপাশের কোথায় কী ঘটছে সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সজাগ ছিলেন। মুসলিমরা যুদ্ধের ময়দানেই কেবল শক্তিশালী ছিলেন না, বরং গোয়েন্দাগিরিতেও তারা ছিলেন সমান পারদর্শী। নজরদারি (Surveillance) এবং তথ্য সংগ্রহ (Intelligence) দুটো কাজে তাঁর গোয়েন্দা বাহিনী সবসময়ই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে এসেছে। রাসূলুল্লাহকে কখনই শত্রুরা চমকে দিতে পারেনি, বরং তিনিই সবসময় তাদেরকে চমকে দিতেন।
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহর যুদ্ধ কেবল কুরাইশদের বিরুদ্ধে সীমিত ছিল না। বরং যে বা যারা মুসলিমদের প্রকাশ্য শত্রুদের গোপনে বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে আসছিল, রাসূলুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন এবং অভিযান পরিচালনা করেছেন। যদি শুরু থেকেই তাদেরকে প্রতিহত করা না হতো, তাহলে অনেকেই মদীনার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস দেখাতে শুরু করতো। রাষ্ট্রপরিচালনার কাজটি সবসময়ই জটিল। কিতাবি জ্ঞান এই কাজের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং আরও প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি এবং তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ধারণা।