📄 ১) আল-কারতার অভিযান
নজদের বনু বাকর ইবন কিলাব গোত্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ। ত্রিশ জনের একটি দল নিয়ে তিনি বনু বাকরের শাখাগোত্র বনু আল-কারতাহর ওপর হামলা চালান। তাদের দশ জন মারা যায়। গনিমত নিয়ে ফিরে আসার সময় সুমামাহ ইবন উসাল নামের লোককে গ্রেপ্তার করেন। সে ছিল বনু হানিফা গোত্রের নেতা। বন্দীত্বের তিনদিনের মাথায় সে মন পরিবর্তন করে। গোসল করে মসজিদে এসে শাহাদাহ পাঠ করে, উমরা করার অনুমতি চায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পেয়ে তাকে অনুমতি দিলেন। সে মক্কায় গেল উমরা করতে, পথিমধ্যে মক্কার এক লোক তাকে বললো,
- এই, তুই নাকি মুরতাদ হয়ে গেছিস?
- না, আমি মুহাম্মাদের দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল-ইয়ামামা থেকে যেন এক দানা শস্যও তোদের মক্কায় রাসূলুল্লাহর অনুমতি ছাড়া না ঢুকে সেই ব্যবস্থা করছি।
সুমামাহর এই কথা ফাঁকা বুলি ছিল না। সে তার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সত্যি সত্যি ইয়ামামা থেকে মক্কায় শস্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তখন মক্কার নেতারা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করেন যেন তিনি সুমামাহকে সামলে রাখেন। রাসুলুল্লাহ তাদের অনুরোধ রাখেন। ইসলাম মানুষকে যখন সত্যিই বদলে দেয়, তখন আমূলে বদলে দেয়। সে নিজের বুদ্ধিমত্তা, ক্ষমতা সবকিছু দিয়ে ইসলামের খেদমত করার চেষ্টা করে, সুমামাহ তেমনই এক উদাহরণ।
টিকাঃ
66 আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২০৩।
নজদের বনু বাকর ইবন কিলাব গোত্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ। ত্রিশ জনের একটি দল নিয়ে তিনি বনু বাকরের শাখাগোত্র বনু আল-কারতাহর ওপর হামলা চালান। তাদের দশ জন মারা যায়। গনিমত নিয়ে ফিরে আসার সময় সুমামাহ ইবন উসাল নামের লোককে গ্রেপ্তার করেন। সে ছিল বনু হানিফা গোত্রের নেতা। বন্দীত্বের তিনদিনের মাথায় সে মন পরিবর্তন করে। গোসল করে মসজিদে এসে শাহাদাহ পাঠ করে, উমরা করার অনুমতি চায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পেয়ে তাকে অনুমতি দিলেন। সে মক্কায় গেল উমরা করতে, পথিমধ্যে মক্কার এক লোক তাকে বললো,
- এই, তুই নাকি মুরতাদ হয়ে গেছিস?
- না, আমি মুহাম্মাদের দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল-ইয়ামামা থেকে যেন এক দানা শস্যও তোদের মক্কায় রাসূলুল্লাহর অনুমতি ছাড়া না ঢুকে সেই ব্যবস্থা করছি।
সুমামাহর এই কথা ফাঁকা বুলি ছিল না। সে তার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সত্যি সত্যি ইয়ামামা থেকে মক্কায় শস্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তখন মক্কার নেতারা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করেন যেন তিনি সুমামাহকে সামলে রাখেন। রাসুলুল্লাহ তাদের অনুরোধ রাখেন। ইসলাম মানুষকে যখন সত্যিই বদলে দেয়, তখন আমূলে বদলে দেয়। সে নিজের বুদ্ধিমত্তা, ক্ষমতা সবকিছু দিয়ে ইসলামের খেদমত করার চেষ্টা করে, সুমামাহ তেমনই এক উদাহরণ।
টিকাঃ
66 আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২০৩।
📄 ২) আল-খাবত অভিযান
এটি মাছের অভিযান নামেও পরিচিত। তিনশো সৈনিকের এ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবায়দাহ ইবন আল-যাররাহ। কুরাইশদের অর্থনীতির বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সিরিজ হামলার মধ্যে এটি একটি। কারো মতে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল জুহাইনাহ গোত্র। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এই অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু যাত্রাপথে মুসলিমদের রসদ প্রায় ফুরিয়ে যায়। খাবার বাঁচিয়ে রাখার জন্য আবু উবায়দাহ দিনে প্রত্যেক মুজাহিদের ভাগে একটি করে খেজুর খেতে দেন। দিনগুলি ছিল খুবই কষ্টের! সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'যখন সব খেজুর শেষ হয়ে গেল, দিনে একটা খেজুরের মর্ম যে কী আমরা তখন বুঝতে পেরেছি!'
কাইস ইবন সাদ ইবন উবাদাহ ছিলেন এই অভিযানে অংশ নেওয়া এক সৈনিক। এই অবস্থা দেখে তিনি ধার করে এনে নয়টি উট জবাই করে সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মানুষ সাধারণত ধনী অবস্থায় বেশি সাদাকাহ করে, কিন্তু কাইস এমন ছিলেন না। তিনি ছিলেন আনসারী সাহাবি সাদ ইবন উবাদার সন্তান। এ পরিবার ছিল উদারতার জন্য বিখ্যাত।
এই অভিযান 'মাছের অভিযান' নামে পরিচিত হওয়ার কারণ ছিল। রসদের সব খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর মুসলিমরা সাগরের তীরে এক বিশাল তিমি মাছ পড়ে থাকতে দেখতে পেলেন। প্রথমে তারা ভাবলেন সেই মাছ খাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আবু উবায়দা বললেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের সাহাবি। আল্লাহর রাস্তায় ভ্রমণ করছি। আমাদের যেহেতু প্রয়োজন, কাজেই তোমরা খেতে পারো।' (উল্লেখ্য, মরা পশু খাওয়া জায়েয না হলেও মরা মাছ খাওয়া জায়েয।)
তারা ছিলেন আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ। তাই আল্লাহই তাদের জন্য রিযিক পাঠিয়ে দেন। বিশাল আকৃতির এক তিমি। এতই বিশাল যে, তিনশো মুজাহিদ আঠারো দিন ভরপেট খেয়েও শেষ করতে পারেননি। অভিযান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রাসূলকে এই ঘটনা বলা হলো। রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এই মাছ ছিল তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো রিযিক।' তারা ফিরে আসার সময় সেই মাছের কিছু অংশ নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহর রাসূল আগ্রহ ভরে সেই রিযিক খেয়ে দেখলেন।
টিকাঃ
67 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৯২।
এটি মাছের অভিযান নামেও পরিচিত। তিনশো সৈনিকের এ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবায়দাহ ইবন আল-যাররাহ। কুরাইশদের অর্থনীতির বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সিরিজ হামলার মধ্যে এটি একটি। কারো মতে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল জুহাইনাহ গোত্র। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এই অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু যাত্রাপথে মুসলিমদের রসদ প্রায় ফুরিয়ে যায়। খাবার বাঁচিয়ে রাখার জন্য আবু উবায়দাহ দিনে প্রত্যেক মুজাহিদের ভাগে একটি করে খেজুর খেতে দেন। দিনগুলি ছিল খুবই কষ্টের! সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'যখন সব খেজুর শেষ হয়ে গেল, দিনে একটা খেজুরের মর্ম যে কী আমরা তখন বুঝতে পেরেছি!'
কাইস ইবন সাদ ইবন উবাদাহ ছিলেন এই অভিযানে অংশ নেওয়া এক সৈনিক। এই অবস্থা দেখে তিনি ধার করে এনে নয়টি উট জবাই করে সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মানুষ সাধারণত ধনী অবস্থায় বেশি সাদাকাহ করে, কিন্তু কাইস এমন ছিলেন না। তিনি ছিলেন আনসারী সাহাবি সাদ ইবন উবাদার সন্তান। এ পরিবার ছিল উদারতার জন্য বিখ্যাত।
এই অভিযান 'মাছের অভিযান' নামে পরিচিত হওয়ার কারণ ছিল। রসদের সব খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর মুসলিমরা সাগরের তীরে এক বিশাল তিমি মাছ পড়ে থাকতে দেখতে পেলেন। প্রথমে তারা ভাবলেন সেই মাছ খাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আবু উবায়দা বললেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের সাহাবি। আল্লাহর রাস্তায় ভ্রমণ করছি। আমাদের যেহেতু প্রয়োজন, কাজেই তোমরা খেতে পারো।' (উল্লেখ্য, মরা পশু খাওয়া জায়েয না হলেও মরা মাছ খাওয়া জায়েয।)
তারা ছিলেন আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ। তাই আল্লাহই তাদের জন্য রিযিক পাঠিয়ে দেন। বিশাল আকৃতির এক তিমি। এতই বিশাল যে, তিনশো মুজাহিদ আঠারো দিন ভরপেট খেয়েও শেষ করতে পারেননি। অভিযান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রাসূলকে এই ঘটনা বলা হলো। রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এই মাছ ছিল তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো রিযিক।' তারা ফিরে আসার সময় সেই মাছের কিছু অংশ নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহর রাসূল আগ্রহ ভরে সেই রিযিক খেয়ে দেখলেন।
টিকাঃ
67 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৯২।
📄 ৩) আবু রাফে: পাঁচ সাহাবির ؓ দুঃসাহসী অপারেশন
এক আনসারি সাহাবির ভাষায়, 'আওস ও খাযরাজ গোত্রের উদাহরণ হলো দুই তেজী ঘোড়ার মতো যারা রাসূলুল্লাহর সামনে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।' একটি গোত্রের কেউ যখন নবীজির সেবায় কিছু করতো, অন্য গোত্রও সেরকম কিছু করে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করতো। এই প্রতিযোগিতা দুনিয়ার সাফল্যের জন্য ছিল না, তাদের প্রতিযোগিতা ছিল আখিরাতকেন্দ্রিক। সাফল্য বলতে আজকের পশ্চিমা স্তবাদী পুঁজিবাদী বিশ্ব বোঝে অর্থ, ক্ষমতা আর মর্যাদা। কিন্তু ইসলামে সাফল্য বলতে বোঝায় আল্লাহর নৈকট্য।
আওস গোত্রের সাহাবিরা কা'ব ইবন আশরাফকে হত্যা করেছিল। এটা ছিল তাদের জন্য বিরাট একটা অর্জন। খাযরাজ গোত্রও পেছনে পড়ে থাকতে চায়নি। তারাও চাইলো ইসলামের খেদমতে এরকম একটা কিছু করতে। এজন্য তারা বেছে নিলো কা'ব ইবন আশরাফের মতো আরেক ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিকে। তার নাম হলো সালাম ইবন আবী আল-হুকাইক। সে পরিচিত ছিল আবু রাফে বা আবু রাফে নামে।
আবু রাফে ছিল একজন জনপ্রিয় কবি। আর সে যুগে কবি মানেই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। আবু রাফে তার এই কাব্যিক 'প্রতিভা' কাজে লাগিয়েছিল রাসূলুল্লাহর ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক কবিতা লেখার কাজে। ইসলাম ও মুসলিমদের অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গ করা ছিল তার কবিতার মূল উপজীব্য। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিডিয়া-যুদ্ধে অংশ নেওয়া ছাড়াও সে ছিল খন্দক যুদ্ধের অন্যতম কারিগর। খন্দকের অর্থায়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গাতফান গোত্র যখন খন্দকের সামরিক জোটে অংশ নেয়, সে তখন গাতফানকে মোটা অংশের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
খাযরাজের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর কাছে এই আবু রাফের নাম প্রস্তাব করা হয়। আবু রাফেকে হত্যা করা হলে নিশ্চিতভাবেই ইসলামের বড় একটা শত্রুকে শেষ করা হবে। রাসূলুল্লাহ অনুমোদন দেন। পাঁচ জনের একটা দলকে পাঠানো হয় আবু রাফেকে হত্যা করার মিশনে। এর নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন আতিক। এই দলে আরও ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উনাইস, গুপ্ত হত্যায় তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল।
আবু রাফে ছিল ইহুদি। সে থাকতো খাইবারের নিরাপদ একটা দুর্গের মধ্যে। আবদুল্লাহ ইবন আতিকের নেতৃত্বে পাঁচ সাহাবির ছোট্ট দলটি যখন খাইবারে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা নেমেছে। সবাই পশুপাল নিয়ে বাড়ির পথে। দুর্গে ঢুকতে হলে এখনই ঢুকে পড়তে হবে, কারণ সন্ধ্যার পর দুর্গের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবন আতিক তার সঙ্গীদের অপেক্ষা করতে বলে একাই দুর্গের দিকে যেতে লাগলেন। উদ্দেশ্য, পাহারাদারের চোখ এড়িয়ে কোনোভাবে দুর্গের মাঝে ঢুকে পড়া।
তিনি চট করে একটা কাজ করলেন। একটা চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে এমন একটা ভান করলেন যেন মনে হয় দুর্গের দেওয়ালের পাশেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য বসেছেন। মানুষ দেখলে ভাববে, তিনি এই দুর্গেই থাকেন, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হয়েছেন। সে যুগে এটা স্বাভাবিক ছিল। আর হলোও ঠিক তাই। তাকে দেখে প্রহরী বলে উঠলো, 'এই যে আল্লাহর বান্দা, ভেতরে যেতে চাইলে এখনই যাও। আমি কিন্তু দরজা লাগিয়ে দিচ্ছি।'
আবদুল্লাহ ইবন আতিক এই সুযোগটাই খুঁজছিলেন। টুপ করে দুর্গের ভেতর ঢুকে পড়লেন। এরপরের কাহিনী ইতিহাস! আবদুল্লাহ ইবন আতিকের মুখেই শোনা যাক সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী,
'আমি দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলাম। সবাই ভেতরে চলে এসেছে ভেবে প্রহরী দরজা লাগিয়ে দিল। আর চাবিটা একটা খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখল। বেশ খানিকক্ষণ পর চারদিক সুনসান নীরব হয়ে যাওয়ার পর আমি উঠে গিয়ে চাবিটা নিলাম, আর দরজা খুলে দিলাম (যেন দলের বাকি সদস্যরা যোগ দিতে পারে)।
আবু রাফে থাকতো দোতলার একটা ঘরে। দেখলাম সেখানে কিছু লোক গল্পগুজবে মত্ত। আমি তাদের যাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটা গাধার খোঁয়াড়ে বসে আছি। এক সময় লোকগুলো চলে গেল। তখন আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ভেতর থেকে দরজাটা দিলাম বন্ধ করে। ভাবলাম, তারা যদি আমার উপস্থিতি টেরও পায়, তবুও আমাকে ধরার আগেই আমি আবু রাফেকে মেরে ফেলতে পারবো।
আবু রাফের ঘরে পৌঁছে গেলাম। সেখানে সে তার তার পরিবার-পরিজন নিয়ে শুয়ে আছে। ঘরটা ছিল অন্ধকার। আবু রাফে ঠিক কোথায় আছে বোঝা যাচ্ছিল না। তাই তাকে ডাক দিলাম,
- আবু রাফে!
- কে রে, কে কথা বলে? আবু রাফে জিজ্ঞেস করলো।
আমি তার গলার আওয়াজ শুনে সে কোথায় আছে আন্দাজ করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তলোয়ার দিয়ে দিলাম এক কোপ। আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে ছিলাম তাই আঘাতটা ঠিক জায়গামতো লাগলো না। আবু রাফে চিৎকার করে উঠলো। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। একটু পর আবারও তার ঘরে ঢুকলাম। এবার ঢুকলাম বন্ধুর বেশে। ভান করলাম যেন তাকে সাহায্য করতে এসেছি। গলার স্বর পরিবর্তন করে বললাম,
- আবু রাফে! কী হয়েছে আপনার?
- তোমার মায়ের জীবন বরবাদ হোক! দেখছো না কী হয়েছে! এক লোক এইমাত্র আমাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেছে!
এবার আমি সুযোগ বুঝে তার কাছে গিয়ে তাকে আবার কোপ মারলাম। এবারও খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। তার স্ত্রী চিৎকার করে উঠলো। আমি আবারও গলার স্বর পরিবর্তন করে সাহায্যকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলাম। দেখলাম আবু রাফে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। এবার তার পেট বরাবর তলোয়ার চালালাম। এরপর তলোয়ার বাঁকিয়ে ধরলাম। তলোয়ার তার পিঠ পর্যন্ত ঢুকে গেল, হাড় ভাঙার মচমচ আওয়াজ শুনতে পেলাম। নিশ্চিত হলাম, এবার তাকে হত্যা করতে পেরেছি।
তারপর দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। একটার পর একটা দরজা খুলছি আর বেরোচ্ছি, এভাবে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামছি, একদম নিচে পৌঁছে গেছি ভেবে যে-ই না পা ফেলেছি, ওমনি পিছলে পড়ে গেলাম।
সেদিন ছিল জোৎস্না রাত। আমার পা ভেঙে গেছে। পাগড়ি খুলে পা বাঁধলাম। (ভাঙা পা নিয়ে) সামনে এগোতে থাকলাম। দরজা পর্যন্ত এসে বসে পড়লাম। ভাবলাম, আবু রাফেকে হত্যা করতে পেরেছি কি না এটা নিশ্চিত না হয়ে এখান থেকে যাবো না।
সকাল হলো। মোরগের ডাক শুনতে পেলাম। কেউ একজন ঘোষণা করলো, হে হিজাজের অধিবাসী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু রাফে নিহত হয়েছেন। আমার মনে হলো, এর চাইতে মধুর কোনো কথা আমি কখনো শুনিনি।
ঘোষণা শোনার পর সঙ্গীদের কাছে চলে এলাম। বললাম, আমাদের এখন যেতে হবে। আল্লাহ আবু রাফেকে হত্যা করেছেন। এরপর আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম, তাকে সমস্ত ঘটনা শোনালাম। তিনি বললেন, দেখি তো তোমার পা'টা বাড়িয়ে দাও। আমি আমার পা বাড়িয়ে দিলাম। তিনি আমার পা'টা তাঁর হাত দিয়ে শুধু ছুঁয়ে দিলেন। অমনি আমার পা একদম সুস্থ হয়ে গেল! মনে হলো যেন এই পায়ে কখনোই কিছু হয়নি।'
টিকাঃ
68 সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ৮৬, ৮৭।
69 সীরাহ ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৭।
এক আনসারি সাহাবির ভাষায়, 'আওস ও খাযরাজ গোত্রের উদাহরণ হলো দুই তেজী ঘোড়ার মতো যারা রাসূলুল্লাহর সামনে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।' একটি গোত্রের কেউ যখন নবীজির সেবায় কিছু করতো, অন্য গোত্রও সেরকম কিছু করে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করতো। এই প্রতিযোগিতা দুনিয়ার সাফল্যের জন্য ছিল না, তাদের প্রতিযোগিতা ছিল আখিরাতকেন্দ্রিক। সাফল্য বলতে আজকের পশ্চিমা স্তবাদী পুঁজিবাদী বিশ্ব বোঝে অর্থ, ক্ষমতা আর মর্যাদা। কিন্তু ইসলামে সাফল্য বলতে বোঝায় আল্লাহর নৈকট্য।
আওস গোত্রের সাহাবিরা কা'ব ইবন আশরাফকে হত্যা করেছিল। এটা ছিল তাদের জন্য বিরাট একটা অর্জন। খাযরাজ গোত্রও পেছনে পড়ে থাকতে চায়নি। তারাও চাইলো ইসলামের খেদমতে এরকম একটা কিছু করতে। এজন্য তারা বেছে নিলো কা'ব ইবন আশরাফের মতো আরেক ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিকে। তার নাম হলো সালাম ইবন আবী আল-হুকাইক। সে পরিচিত ছিল আবু রাফে বা আবু রাফে নামে।
আবু রাফে ছিল একজন জনপ্রিয় কবি। আর সে যুগে কবি মানেই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। আবু রাফে তার এই কাব্যিক 'প্রতিভা' কাজে লাগিয়েছিল রাসূলুল্লাহর ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক কবিতা লেখার কাজে। ইসলাম ও মুসলিমদের অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গ করা ছিল তার কবিতার মূল উপজীব্য। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিডিয়া-যুদ্ধে অংশ নেওয়া ছাড়াও সে ছিল খন্দক যুদ্ধের অন্যতম কারিগর। খন্দকের অর্থায়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গাতফান গোত্র যখন খন্দকের সামরিক জোটে অংশ নেয়, সে তখন গাতফানকে মোটা অংশের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
খাযরাজের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর কাছে এই আবু রাফের নাম প্রস্তাব করা হয়। আবু রাফেকে হত্যা করা হলে নিশ্চিতভাবেই ইসলামের বড় একটা শত্রুকে শেষ করা হবে। রাসূলুল্লাহ অনুমোদন দেন। পাঁচ জনের একটা দলকে পাঠানো হয় আবু রাফেকে হত্যা করার মিশনে। এর নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন আতিক। এই দলে আরও ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উনাইস, গুপ্ত হত্যায় তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল।
আবু রাফে ছিল ইহুদি। সে থাকতো খাইবারের নিরাপদ একটা দুর্গের মধ্যে। আবদুল্লাহ ইবন আতিকের নেতৃত্বে পাঁচ সাহাবির ছোট্ট দলটি যখন খাইবারে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা নেমেছে। সবাই পশুপাল নিয়ে বাড়ির পথে। দুর্গে ঢুকতে হলে এখনই ঢুকে পড়তে হবে, কারণ সন্ধ্যার পর দুর্গের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবন আতিক তার সঙ্গীদের অপেক্ষা করতে বলে একাই দুর্গের দিকে যেতে লাগলেন। উদ্দেশ্য, পাহারাদারের চোখ এড়িয়ে কোনোভাবে দুর্গের মাঝে ঢুকে পড়া।
তিনি চট করে একটা কাজ করলেন। একটা চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে এমন একটা ভান করলেন যেন মনে হয় দুর্গের দেওয়ালের পাশেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য বসেছেন। মানুষ দেখলে ভাববে, তিনি এই দুর্গেই থাকেন, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হয়েছেন। সে যুগে এটা স্বাভাবিক ছিল। আর হলোও ঠিক তাই। তাকে দেখে প্রহরী বলে উঠলো, 'এই যে আল্লাহর বান্দা, ভেতরে যেতে চাইলে এখনই যাও। আমি কিন্তু দরজা লাগিয়ে দিচ্ছি।'
আবদুল্লাহ ইবন আতিক এই সুযোগটাই খুঁজছিলেন। টুপ করে দুর্গের ভেতর ঢুকে পড়লেন। এরপরের কাহিনী ইতিহাস! আবদুল্লাহ ইবন আতিকের মুখেই শোনা যাক সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী,
'আমি দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলাম। সবাই ভেতরে চলে এসেছে ভেবে প্রহরী দরজা লাগিয়ে দিল। আর চাবিটা একটা খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখল। বেশ খানিকক্ষণ পর চারদিক সুনসান নীরব হয়ে যাওয়ার পর আমি উঠে গিয়ে চাবিটা নিলাম, আর দরজা খুলে দিলাম (যেন দলের বাকি সদস্যরা যোগ দিতে পারে)।
আবু রাফে থাকতো দোতলার একটা ঘরে। দেখলাম সেখানে কিছু লোক গল্পগুজবে মত্ত। আমি তাদের যাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটা গাধার খোঁয়াড়ে বসে আছি। এক সময় লোকগুলো চলে গেল। তখন আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ভেতর থেকে দরজাটা দিলাম বন্ধ করে। ভাবলাম, তারা যদি আমার উপস্থিতি টেরও পায়, তবুও আমাকে ধরার আগেই আমি আবু রাফেকে মেরে ফেলতে পারবো।
আবু রাফের ঘরে পৌঁছে গেলাম। সেখানে সে তার তার পরিবার-পরিজন নিয়ে শুয়ে আছে। ঘরটা ছিল অন্ধকার। আবু রাফে ঠিক কোথায় আছে বোঝা যাচ্ছিল না। তাই তাকে ডাক দিলাম,
- আবু রাফে!
- কে রে, কে কথা বলে? আবু রাফে জিজ্ঞেস করলো।
আমি তার গলার আওয়াজ শুনে সে কোথায় আছে আন্দাজ করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তলোয়ার দিয়ে দিলাম এক কোপ। আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে ছিলাম তাই আঘাতটা ঠিক জায়গামতো লাগলো না। আবু রাফে চিৎকার করে উঠলো। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। একটু পর আবারও তার ঘরে ঢুকলাম। এবার ঢুকলাম বন্ধুর বেশে। ভান করলাম যেন তাকে সাহায্য করতে এসেছি। গলার স্বর পরিবর্তন করে বললাম,
- আবু রাফে! কী হয়েছে আপনার?
- তোমার মায়ের জীবন বরবাদ হোক! দেখছো না কী হয়েছে! এক লোক এইমাত্র আমাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেছে!
এবার আমি সুযোগ বুঝে তার কাছে গিয়ে তাকে আবার কোপ মারলাম। এবারও খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। তার স্ত্রী চিৎকার করে উঠলো। আমি আবারও গলার স্বর পরিবর্তন করে সাহায্যকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলাম। দেখলাম আবু রাফে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। এবার তার পেট বরাবর তলোয়ার চালালাম। এরপর তলোয়ার বাঁকিয়ে ধরলাম। তলোয়ার তার পিঠ পর্যন্ত ঢুকে গেল, হাড় ভাঙার মচমচ আওয়াজ শুনতে পেলাম। নিশ্চিত হলাম, এবার তাকে হত্যা করতে পেরেছি।
তারপর দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। একটার পর একটা দরজা খুলছি আর বেরোচ্ছি, এভাবে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামছি, একদম নিচে পৌঁছে গেছি ভেবে যে-ই না পা ফেলেছি, ওমনি পিছলে পড়ে গেলাম।
সেদিন ছিল জোৎস্না রাত। আমার পা ভেঙে গেছে। পাগড়ি খুলে পা বাঁধলাম। (ভাঙা পা নিয়ে) সামনে এগোতে থাকলাম। দরজা পর্যন্ত এসে বসে পড়লাম। ভাবলাম, আবু রাফেকে হত্যা করতে পেরেছি কি না এটা নিশ্চিত না হয়ে এখান থেকে যাবো না।
সকাল হলো। মোরগের ডাক শুনতে পেলাম। কেউ একজন ঘোষণা করলো, হে হিজাজের অধিবাসী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু রাফে নিহত হয়েছেন। আমার মনে হলো, এর চাইতে মধুর কোনো কথা আমি কখনো শুনিনি।
ঘোষণা শোনার পর সঙ্গীদের কাছে চলে এলাম। বললাম, আমাদের এখন যেতে হবে। আল্লাহ আবু রাফেকে হত্যা করেছেন। এরপর আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম, তাকে সমস্ত ঘটনা শোনালাম। তিনি বললেন, দেখি তো তোমার পা'টা বাড়িয়ে দাও। আমি আমার পা বাড়িয়ে দিলাম। তিনি আমার পা'টা তাঁর হাত দিয়ে শুধু ছুঁয়ে দিলেন। অমনি আমার পা একদম সুস্থ হয়ে গেল! মনে হলো যেন এই পায়ে কখনোই কিছু হয়নি।'
টিকাঃ
68 সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ৮৬, ৮৭।
69 সীরাহ ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৭।
📄 ৪) আল-গাবার অভিযানঃ পদাতিক সৈনিক সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার বীরত্ব
এই অভিযানটি ছিল ষষ্ঠ হিজরিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিযান। আর অভিযানের মূল নায়ক ছিলেন সালামা ইবন আল-আকওয়া। এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচশো সাহাবি, কিন্তু সালামার বীরত্ব আর সাহসিকতা আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন মক্কা ছেড়ে আসা এক মুহাজির। পরিবার, সহায়-সম্পদ সবকিছু ছেড়েছুড়ে তিনি আল্লাহ ও তাঁর নবীর পথে হিজরত করেছিলেন। মদীনায় এসে তিনি তালহা ইবন উবায়দুল্লাহর চাকরি নেন। তাঁর ঘোড়া চড়ানো, তাঁকে খেদমত করা, এভাবেই দিন কাটতে থাকে।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা এভাবে, আবদুর রহমান উয়াইনা ইবন হিসন আল-ফিজারীর নেতৃত্বে গাতফানের কিছু লোক গাবাহ নামক স্থানে হামলা চালায়। গাবাহ মদীনার কাছেই একটা উর্বর জায়গা। সেখানে মুসলিমরা তাদের উট চড়ানোর জন্য পাঠাতো। একদিন আবদুর রহমান আল-ফিজারীর লোকেরা এসে মুসলিম মেষপালক যার ইবন আবি যারকে হত্যা করে। তার স্ত্রী লাইলাকে বন্দী করে এবং বিশটা উট লুট করে পালিয়ে যায়। উটগুলো ছিল আল্লাহর রাসূলের উট।
ঘটনাস্থলের কাছেই উপস্থিত ছিলেন সালামা ইবন আল আকওয়া এবং রাবাহ। তারা দুজনেই সেদিন উট চরাতে তৃণভূমিতে নিয়ে এসেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ভোর বেলায়। সালামা এই ঘটনা দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ রাবাহকে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেন। আর তিনি নিজে শত্রুদের দৌড়ে ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
"ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা!"
'ওয়া সুবহা' ছিল সে যুগের বিপদ সংকেত। সালামার চিৎকার মদীনা থেকেও শোনা গেল। সাহাবিরা দ্রুত রাসূলুল্লাহর কাছে এসে জমা হলেন। এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই হবে। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাৎ পাঁচশো সৈনিকের দল প্রস্তুত করলেন।
এদিকে সালামা সৈন্যবাহিনী আসার অপেক্ষা না করে একাই উয়াইনা আর তার দলবলের পিছু নেওয়ার জন্য ছুটে গেলেন। কিন্তু তার কাছে তখন না আছে কোনো ঘোড়া, না আছে কোনো উট, ছিল শুধু দুটো পা। সেই পা দুটোকে পুঁজি করেই লুটেরাদের ধরার জন্য দৌড়াতে লাগলেন। সালামার ভাষায়,
'আমি লুটেরাদের তাড়া দিতে বেরিয়ে পড়লাম। তাদের দিকে একের পর এক তীর ছুঁড়ছি আর ছন্দ মিলিয়ে হুংকার দিচ্ছি,
এই দ্যাখ! আমি হলাম আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
যাকেই হাতের নাগালে পাচ্ছি, এমনভাবে তীর ছুঁড়ে মারছি যে কাঁধ ছেদ করে তীরের মাথা বেরিয়ে আসছে। তাদের কেউ যখন আমার দিকে পিছু ফিরতো, আমি গাছের গোড়ায় বসে পড়তাম আর আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে তাকে কিংবা তার পশুকে ঘায়েল করতে লাগলাম!'
লুটেরাদের সবাই ছিল ঘোড়ায় আর সালামা ইবন আল আকওয়া পদাতিক একজন সৈনিক মাত্র। অথচ সালামার ধাওয়া খেয়ে তাদের রীতিমতো পাগল হওয়ার মতো অবস্থা! তারা কোনোরকমে একটা পাহাড়ের পাশে সরু গিরিপথের মতো জায়গায় আশ্রয় নিল। সালামা এরপর সেই পাহাড়ে উঠে ওপর থেকে তাদের ওপর একের পর এক পাথর মারতে লাগলেন। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তারা লুট করা সবগুলো উট ছেড়ে দিয়ে ক্ষান্ত হলো।
শত্রুরা ক্ষান্ত হলেও সালামা ইবন আল আকওয়া মোটেও ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাদের ধাওয়া করতেই থাকলেন। ধাওয়া খেতে খেতে শত্রুদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম! কোনোমতে ত্রিশটা জোব্বা আর ত্রিশটা বর্শা ফেলে নিজেদের বোঝা হালকা করে পড়িমরি করে পালাতে লাগলো। ফেলে যাওয়া জিনিসগুলোও সালামা চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। জিনিসগুলোর ওপর সালামা একটা করে নিশানা রেখে দিতে দিতে এগোচ্ছিলেন যেন জিনিসগুলো পরে খুঁজে পেতে সমস্যা না হয় আর রাসূলুল্লাহর পাঠানো বাহিনীও যেন এই চিহ্ন দেখে পথ চিনে নেয়। সালামা বর্ণনা করেন,
'শেষ পর্যন্ত লুটেরার দল এক সরু পাহাড়ি পথে গিয়ে থামলো। সেখানে তারা বদর আল ফাজারির ছেলের সাথে মিলিত হলো। সবাই মিলে সকালের নাস্তা খেতে বসেছে, আমি তখন একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো। আমাকে দেখিয়ে ফাজারি বললো, এই লোকটা কে? তারা বললো, এই লোক-ই তো আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। সেই ভোর থেকে আমাদের পিছু ছাড়েনি! তীর মারতে মারতে আমাদের থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ফাজারি বললো, তোমরা তাকে তাড়া করছো না কেন! যাও, চার জন গিয়ে এখনই এই লোককে শেষ করে দাও।
তাদের মধ্যে চারজন পাহাড়ে উঠে আমার কাছাকাছি এল। আমি বললাম,
- তোরা চিনিস আমাকে?
- না, চিনি না। কে তুমি?
- আমি হলাম সালামা ইবন আল-আকওয়া। সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, আমি চাইলে তোদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করে দিতে পারি কিন্তু তোরা কেউ আমার কিছুই করতে পারবি না।
এই কথা শুনে তাদের একজন বললো, আমার মনে হয় সে ঠিকই বলছে।
এরপর তারা চলে গেল। আল্লাহর রাসূলের ঘোড়সওয়ারিরা আসা পর্যন্ত আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। সবার আগে দেখতে পেলাম আখরাম আল-আসাদীকে। তার পেছনে পেছনে আসছে আবু কাতাদা আল-আনসারি, আর তারও পেছনে ছিল মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ। আমি আখরামের ঘোড়ার লাগাম টেনে বললাম, আখরাম, তুমি সতর্ক থাকো। ওরা একা পেলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
আখরাম আমাকে বললো, সালামা! যদি তুমি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তুমি যদি বিশ্বাস করে থাকো যে জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য -- তাহলে আমার আর শাহাদাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িও না।'
কারো কারো বুকের ভেতর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বাসনা কত যে তীব্র হয়! আখরামের অদম্য সাধ শহীদ হবেন। এরপর সালামাহ আর বাধা দিলেন না। পথ ছেড়ে দিলেন। আখরাম ছুটে গেলেন লুটেরাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হতে। উয়াইনার মুখোমুখি আখরাম। দু'জন প্রচণ্ড লড়াই করছেন। আখরামের আঘাতে উয়াইনার ঘোড়া আহত হলো, কিন্তু উয়াইনার পাল্টা আঘাতে আখরাম শহীদ হয়ে গেলেন। শাহাদাত। আখরামের কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত। আল্লাহর রাসূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষগুলো এভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বরণ করে নিতেন।
আখরামকে হত্যা করে উয়াইনাহ তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বসলো। এরপর দৃশ্যপটে আসলেন দ্বিতীয় বীরযোদ্ধা আবু কাতাদা। আবু কাতাদা উয়াইনাকে আক্রমণ করলেন, পাল্টা আঘাতে উয়াইনা আবু কাতাদার ঘোড়াকে মেরে ফেললো। কিন্তু আবু কাতাদা আল্লাহর ইচ্ছায় উয়াইনাকে হত্যা করলেন আর তার ঘোড়া নিজের দখলে নিয়ে সেটায় চড়ে বসলেন। সেটা আসলে আখরামের ঘোড়া ছিল। সালামা এরপর আবারও ডাকাতদলকে তাড়া করতে শুরু করলেন। আবার ফেরা যাক সালামার বর্ণনায়,
'সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখকে উজ্জ্বল করেছেন, আমি তখন এতটাই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ধাওয়া করছি যে পেছনে রাসূলুল্লাহর কোনো সাহাবিকেই দেখতে পেলাম না। এমনকি তাদের ঘোড়ার খুরের উড়ানো ধূলিও আমার চোখে পড়ল না। এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ডাকাতদল একটা গিরিপথে থামলো। সেখানে যি-কারদ নামে একটা ঝর্ণা ছিল। খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি খাবে, এরকম মুহূর্তে তারা আমাকে দেখে পানি খাওয়া ছেড়ে পড়িমরি করে পাহাড়ের ওপরে পালাতে শুরু করলো! আমি হুংকার দিয়ে বলে উঠলাম,
এই দ্যাখ! আমি আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
সারিবদিনের ছুটোছুটির পর লুটেরার দল তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত। তাদের আর চলার শক্তি বাকি নেই। সালামাকে দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না এই একটি লোক সেই ভোর থেকে দৌড়ে তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে তাদের একজন বললো,
- তুমিই কি সেই লোক যে ভোর থেকে আমাদের তাড়া করে ফিরছো!
- হ্যাঁ! আমিই তোদের জানের দুশমন! ভোরবেলার সেই আকওয়া!'
লুটেরার দল সারাদিন ঘোড়ায় করে পালিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের ঘোড়াগুলোও ছুটতে ছুটতে কাহিল হয়ে পড়েছে, শক্তির আর লেশমাত্র নেই। তারা দুটো ক্লান্ত ঘোড়া উপত্যকায় রেখে চলে গেল। সালামা বলেন,
'তারা যে দুটো ঘোড়া পেছনে ফেলে পালিয়েছিল আমি সেগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে ফেরত গেলাম। তিনি তখন সেই ঝর্ণার কাছে। সেখান থেকে সকালে মুশরিকদের পানি খেতে না দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে শত্রুদের ফেলে যাওয়া চাদর আর বর্শাগুলো রাসূলুল্লাহর হস্তগত হয়েছে। আর বিলালকে দেখলাম উদ্ধার করা উটগুলোর একটিকে জবাই করে সেটার কলিজা ভুনা করছেন। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে তাঁকে বললাম,
- ইয়া আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আপনার বাহিনী থেকে একশো জন লোক নিয়ে এই কাফিরদের ধাওয়া করবো। এমনভাবে তাদের হত্যা করবো যে তাদের খবর আনার মতো একটা লোকও থাকবে না।
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসলেন যে, আগুনের আলোয় আমি তাঁর দাঁত দেখতে পেলাম!
- তুমি আসলেই এই কাজ করতে পারবে তো সালামা?
- সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, অবশ্যই পারবো!'
গাতফানের এক লোক থেকে পরে সাহাবিরা জানতে পারেন যে, সেদিন তারা একটা উট জবাই করেছিল। এমন সময় তারা সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার আগমন টের পেয়ে জবাই করা উট ফেলেই পালিয়ে যায়। এই ছিল রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের কাজের নমুনা! শত্রুদলের লোকগুলো তাদের খাবার পর্যন্ত মুখে তোলার সুযোগ পায়নি।
পরদিন সকাল রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিলেন, 'আমাদের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী হলো আবু কাতাদা আর শ্রেষ্ঠ পদাতিক সৈন্য হলো সালামা।' রাসূলুল্লাহ সালামাকে পদাতিক এবং অশ্বারোহী দুটো ভাগেরই গনিমত দেন। যখন কোনো সাহাবি কৃতিত্বের কোনো কাজ করতেন, রাসূলুল্লাহ তাকে কদর করতে ভুলতেন না। তিনি সালামা ইবন আল আকওয়াকে তাঁর উট 'আদবা'র পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। দুজন একই উটের পিঠে চেপে একসাথে মদীনায় ফেরত আসলেন।
আল-গাবার অভিযান থেকে শিক্ষা
প্রথমত, শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার গুরুত্ব। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন সুস্থ-সমর্থ, শক্তিশালী একজন মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে অনায়াসে পরিশ্রম করে গেছেন। ঘোড়াও তার সাথে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তিনি ক্লান্ত হননি। সেই অভিযান থেকে আসার পথেও এক আনসারী সাহাবির সাথে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন। আজকের দিনের যুবকদের মধ্যে এমন ফিটনেস বিরল। সাহাবিরা ঘরের কোণে বসে থেকে বইপত্র বা কম্পিউটারে মাথা গুঁজে থাকার মানুষ ছিলেন না। দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর ছোঁড়া- এসব ছিল সাহাবিদের নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন। জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে তারা নিয়মিত এসব অনুশীলন করতেন।
দ্বিতীয়ত, লাইলার ঘটনা থেকে ইমাম নববী মহিলাদের একা ভ্রমণের ওপর একটি মাসআলা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'জরুরি প্রয়োজনে মুসলিম নারী নিজের স্বামী বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন। এরকম জরুরি প্রয়োজন উদ্ভূত হতে পারে যদি কোনো মহিলা দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করতে চায় কিংবা কেউ তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করাতে চায় বা এরকম কিছু। প্রয়োজন ছাড়া একাকী ভ্রমণ মুসলিম মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ।' অর্থাৎ প্রয়োজনে মুসলিম নারীদের একা ভ্রমণ করা জায়েয তবে প্রয়োজন বলতে কী বোঝায় সেটা ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়া চাই।
টিকাঃ
70 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় মানত, হাদীস ১১।
এই অভিযানটি ছিল ষষ্ঠ হিজরিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিযান। আর অভিযানের মূল নায়ক ছিলেন সালামা ইবন আল-আকওয়া। এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচশো সাহাবি, কিন্তু সালামার বীরত্ব আর সাহসিকতা আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন মক্কা ছেড়ে আসা এক মুহাজির। পরিবার, সহায়-সম্পদ সবকিছু ছেড়েছুড়ে তিনি আল্লাহ ও তাঁর নবীর পথে হিজরত করেছিলেন। মদীনায় এসে তিনি তালহা ইবন উবায়দুল্লাহর চাকরি নেন। তাঁর ঘোড়া চড়ানো, তাঁকে খেদমত করা, এভাবেই দিন কাটতে থাকে।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা এভাবে, আবদুর রহমান উয়াইনা ইবন হিসন আল-ফিজারীর নেতৃত্বে গাতফানের কিছু লোক গাবাহ নামক স্থানে হামলা চালায়। গাবাহ মদীনার কাছেই একটা উর্বর জায়গা। সেখানে মুসলিমরা তাদের উট চড়ানোর জন্য পাঠাতো। একদিন আবদুর রহমান আল-ফিজারীর লোকেরা এসে মুসলিম মেষপালক যার ইবন আবি যারকে হত্যা করে। তার স্ত্রী লাইলাকে বন্দী করে এবং বিশটা উট লুট করে পালিয়ে যায়। উটগুলো ছিল আল্লাহর রাসূলের উট।
ঘটনাস্থলের কাছেই উপস্থিত ছিলেন সালামা ইবন আল আকওয়া এবং রাবাহ। তারা দুজনেই সেদিন উট চরাতে তৃণভূমিতে নিয়ে এসেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ভোর বেলায়। সালামা এই ঘটনা দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ রাবাহকে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেন। আর তিনি নিজে শত্রুদের দৌড়ে ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,
"ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা! ওয়া সুবহা!"
'ওয়া সুবহা' ছিল সে যুগের বিপদ সংকেত। সালামার চিৎকার মদীনা থেকেও শোনা গেল। সাহাবিরা দ্রুত রাসূলুল্লাহর কাছে এসে জমা হলেন। এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই হবে। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাৎ পাঁচশো সৈনিকের দল প্রস্তুত করলেন।
এদিকে সালামা সৈন্যবাহিনী আসার অপেক্ষা না করে একাই উয়াইনা আর তার দলবলের পিছু নেওয়ার জন্য ছুটে গেলেন। কিন্তু তার কাছে তখন না আছে কোনো ঘোড়া, না আছে কোনো উট, ছিল শুধু দুটো পা। সেই পা দুটোকে পুঁজি করেই লুটেরাদের ধরার জন্য দৌড়াতে লাগলেন। সালামার ভাষায়,
'আমি লুটেরাদের তাড়া দিতে বেরিয়ে পড়লাম। তাদের দিকে একের পর এক তীর ছুঁড়ছি আর ছন্দ মিলিয়ে হুংকার দিচ্ছি,
এই দ্যাখ! আমি হলাম আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
যাকেই হাতের নাগালে পাচ্ছি, এমনভাবে তীর ছুঁড়ে মারছি যে কাঁধ ছেদ করে তীরের মাথা বেরিয়ে আসছে। তাদের কেউ যখন আমার দিকে পিছু ফিরতো, আমি গাছের গোড়ায় বসে পড়তাম আর আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে তাকে কিংবা তার পশুকে ঘায়েল করতে লাগলাম!'
লুটেরাদের সবাই ছিল ঘোড়ায় আর সালামা ইবন আল আকওয়া পদাতিক একজন সৈনিক মাত্র। অথচ সালামার ধাওয়া খেয়ে তাদের রীতিমতো পাগল হওয়ার মতো অবস্থা! তারা কোনোরকমে একটা পাহাড়ের পাশে সরু গিরিপথের মতো জায়গায় আশ্রয় নিল। সালামা এরপর সেই পাহাড়ে উঠে ওপর থেকে তাদের ওপর একের পর এক পাথর মারতে লাগলেন। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তারা লুট করা সবগুলো উট ছেড়ে দিয়ে ক্ষান্ত হলো।
শত্রুরা ক্ষান্ত হলেও সালামা ইবন আল আকওয়া মোটেও ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাদের ধাওয়া করতেই থাকলেন। ধাওয়া খেতে খেতে শত্রুদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম! কোনোমতে ত্রিশটা জোব্বা আর ত্রিশটা বর্শা ফেলে নিজেদের বোঝা হালকা করে পড়িমরি করে পালাতে লাগলো। ফেলে যাওয়া জিনিসগুলোও সালামা চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। জিনিসগুলোর ওপর সালামা একটা করে নিশানা রেখে দিতে দিতে এগোচ্ছিলেন যেন জিনিসগুলো পরে খুঁজে পেতে সমস্যা না হয় আর রাসূলুল্লাহর পাঠানো বাহিনীও যেন এই চিহ্ন দেখে পথ চিনে নেয়। সালামা বর্ণনা করেন,
'শেষ পর্যন্ত লুটেরার দল এক সরু পাহাড়ি পথে গিয়ে থামলো। সেখানে তারা বদর আল ফাজারির ছেলের সাথে মিলিত হলো। সবাই মিলে সকালের নাস্তা খেতে বসেছে, আমি তখন একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো। আমাকে দেখিয়ে ফাজারি বললো, এই লোকটা কে? তারা বললো, এই লোক-ই তো আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। সেই ভোর থেকে আমাদের পিছু ছাড়েনি! তীর মারতে মারতে আমাদের থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ফাজারি বললো, তোমরা তাকে তাড়া করছো না কেন! যাও, চার জন গিয়ে এখনই এই লোককে শেষ করে দাও।
তাদের মধ্যে চারজন পাহাড়ে উঠে আমার কাছাকাছি এল। আমি বললাম,
- তোরা চিনিস আমাকে?
- না, চিনি না। কে তুমি?
- আমি হলাম সালামা ইবন আল-আকওয়া। সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, আমি চাইলে তোদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করে দিতে পারি কিন্তু তোরা কেউ আমার কিছুই করতে পারবি না।
এই কথা শুনে তাদের একজন বললো, আমার মনে হয় সে ঠিকই বলছে।
এরপর তারা চলে গেল। আল্লাহর রাসূলের ঘোড়সওয়ারিরা আসা পর্যন্ত আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। সবার আগে দেখতে পেলাম আখরাম আল-আসাদীকে। তার পেছনে পেছনে আসছে আবু কাতাদা আল-আনসারি, আর তারও পেছনে ছিল মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ। আমি আখরামের ঘোড়ার লাগাম টেনে বললাম, আখরাম, তুমি সতর্ক থাকো। ওরা একা পেলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
আখরাম আমাকে বললো, সালামা! যদি তুমি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তুমি যদি বিশ্বাস করে থাকো যে জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য -- তাহলে আমার আর শাহাদাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িও না।'
কারো কারো বুকের ভেতর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বাসনা কত যে তীব্র হয়! আখরামের অদম্য সাধ শহীদ হবেন। এরপর সালামাহ আর বাধা দিলেন না। পথ ছেড়ে দিলেন। আখরাম ছুটে গেলেন লুটেরাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হতে। উয়াইনার মুখোমুখি আখরাম। দু'জন প্রচণ্ড লড়াই করছেন। আখরামের আঘাতে উয়াইনার ঘোড়া আহত হলো, কিন্তু উয়াইনার পাল্টা আঘাতে আখরাম শহীদ হয়ে গেলেন। শাহাদাত। আখরামের কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত। আল্লাহর রাসূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষগুলো এভাবেই মৃত্যুকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বরণ করে নিতেন।
আখরামকে হত্যা করে উয়াইনাহ তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বসলো। এরপর দৃশ্যপটে আসলেন দ্বিতীয় বীরযোদ্ধা আবু কাতাদা। আবু কাতাদা উয়াইনাকে আক্রমণ করলেন, পাল্টা আঘাতে উয়াইনা আবু কাতাদার ঘোড়াকে মেরে ফেললো। কিন্তু আবু কাতাদা আল্লাহর ইচ্ছায় উয়াইনাকে হত্যা করলেন আর তার ঘোড়া নিজের দখলে নিয়ে সেটায় চড়ে বসলেন। সেটা আসলে আখরামের ঘোড়া ছিল। সালামা এরপর আবারও ডাকাতদলকে তাড়া করতে শুরু করলেন। আবার ফেরা যাক সালামার বর্ণনায়,
'সেই সত্তার শপথ যিনি মুহাম্মাদের মুখকে উজ্জ্বল করেছেন, আমি তখন এতটাই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ধাওয়া করছি যে পেছনে রাসূলুল্লাহর কোনো সাহাবিকেই দেখতে পেলাম না। এমনকি তাদের ঘোড়ার খুরের উড়ানো ধূলিও আমার চোখে পড়ল না। এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ডাকাতদল একটা গিরিপথে থামলো। সেখানে যি-কারদ নামে একটা ঝর্ণা ছিল। খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি খাবে, এরকম মুহূর্তে তারা আমাকে দেখে পানি খাওয়া ছেড়ে পড়িমরি করে পাহাড়ের ওপরে পালাতে শুরু করলো! আমি হুংকার দিয়ে বলে উঠলাম,
এই দ্যাখ! আমি আকওয়ার পুত্র! আজকের দিন ইতরদের ধ্বংসের দিন!
সারিবদিনের ছুটোছুটির পর লুটেরার দল তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত। তাদের আর চলার শক্তি বাকি নেই। সালামাকে দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না এই একটি লোক সেই ভোর থেকে দৌড়ে তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে তাদের একজন বললো,
- তুমিই কি সেই লোক যে ভোর থেকে আমাদের তাড়া করে ফিরছো!
- হ্যাঁ! আমিই তোদের জানের দুশমন! ভোরবেলার সেই আকওয়া!'
লুটেরার দল সারাদিন ঘোড়ায় করে পালিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের ঘোড়াগুলোও ছুটতে ছুটতে কাহিল হয়ে পড়েছে, শক্তির আর লেশমাত্র নেই। তারা দুটো ক্লান্ত ঘোড়া উপত্যকায় রেখে চলে গেল। সালামা বলেন,
'তারা যে দুটো ঘোড়া পেছনে ফেলে পালিয়েছিল আমি সেগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে ফেরত গেলাম। তিনি তখন সেই ঝর্ণার কাছে। সেখান থেকে সকালে মুশরিকদের পানি খেতে না দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে শত্রুদের ফেলে যাওয়া চাদর আর বর্শাগুলো রাসূলুল্লাহর হস্তগত হয়েছে। আর বিলালকে দেখলাম উদ্ধার করা উটগুলোর একটিকে জবাই করে সেটার কলিজা ভুনা করছেন। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে তাঁকে বললাম,
- ইয়া আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আপনার বাহিনী থেকে একশো জন লোক নিয়ে এই কাফিরদের ধাওয়া করবো। এমনভাবে তাদের হত্যা করবো যে তাদের খবর আনার মতো একটা লোকও থাকবে না।
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসলেন যে, আগুনের আলোয় আমি তাঁর দাঁত দেখতে পেলাম!
- তুমি আসলেই এই কাজ করতে পারবে তো সালামা?
- সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, অবশ্যই পারবো!'
গাতফানের এক লোক থেকে পরে সাহাবিরা জানতে পারেন যে, সেদিন তারা একটা উট জবাই করেছিল। এমন সময় তারা সালামাহ ইবন আল-আকওয়ার আগমন টের পেয়ে জবাই করা উট ফেলেই পালিয়ে যায়। এই ছিল রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের কাজের নমুনা! শত্রুদলের লোকগুলো তাদের খাবার পর্যন্ত মুখে তোলার সুযোগ পায়নি।
পরদিন সকাল রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিলেন, 'আমাদের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী হলো আবু কাতাদা আর শ্রেষ্ঠ পদাতিক সৈন্য হলো সালামা।' রাসূলুল্লাহ সালামাকে পদাতিক এবং অশ্বারোহী দুটো ভাগেরই গনিমত দেন। যখন কোনো সাহাবি কৃতিত্বের কোনো কাজ করতেন, রাসূলুল্লাহ তাকে কদর করতে ভুলতেন না। তিনি সালামা ইবন আল আকওয়াকে তাঁর উট 'আদবা'র পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। দুজন একই উটের পিঠে চেপে একসাথে মদীনায় ফেরত আসলেন।
আল-গাবার অভিযান থেকে শিক্ষা
প্রথমত, শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার গুরুত্ব। সালামা ইবন আল-আকওয়া ছিলেন সুস্থ-সমর্থ, শক্তিশালী একজন মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে অনায়াসে পরিশ্রম করে গেছেন। ঘোড়াও তার সাথে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তিনি ক্লান্ত হননি। সেই অভিযান থেকে আসার পথেও এক আনসারী সাহাবির সাথে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন। আজকের দিনের যুবকদের মধ্যে এমন ফিটনেস বিরল। সাহাবিরা ঘরের কোণে বসে থেকে বইপত্র বা কম্পিউটারে মাথা গুঁজে থাকার মানুষ ছিলেন না। দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর ছোঁড়া- এসব ছিল সাহাবিদের নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন। জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে তারা নিয়মিত এসব অনুশীলন করতেন।
দ্বিতীয়ত, লাইলার ঘটনা থেকে ইমাম নববী মহিলাদের একা ভ্রমণের ওপর একটি মাসআলা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'জরুরি প্রয়োজনে মুসলিম নারী নিজের স্বামী বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন। এরকম জরুরি প্রয়োজন উদ্ভূত হতে পারে যদি কোনো মহিলা দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করতে চায় কিংবা কেউ তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করাতে চায় বা এরকম কিছু। প্রয়োজন ছাড়া একাকী ভ্রমণ মুসলিম মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ।' অর্থাৎ প্রয়োজনে মুসলিম নারীদের একা ভ্রমণ করা জায়েয তবে প্রয়োজন বলতে কী বোঝায় সেটা ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়া চাই।
টিকাঃ
70 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় মানত, হাদীস ১১।