📄 বনু কুরায়যার ঘটনা থেকে শিক্ষা
১) শাস্তির ভয়াবহতা: বনু কুরায়যার অপরাধ ছিল—বিশ্বাসঘাতকতা। আধুনিক আইনের ভাষায় একে বলা হয়—রাষ্ট্রদ্রোহ। তারা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তারা একটি বহিঃশত্রুর সাথে ষড়যন্ত্র করেছিল মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালাতে। অপরাধের অনুপাতে শাস্তির মাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল।
২) তিরস্কারকারীদের তিরস্কার: সাদ ইবন মুআযকে তাঁর গোত্র অনুরোধ করেছিল তিনি যেন উদারতা দেখান। কিন্তু তিনি জানতেন, এ ক্ষেত্রে উদারতা দেখানো মানে দুর্বলতা। সাদ ইবন মুআয রায় দেওয়ার আগে বলেছিলেন তিনি এই ব্যাপারে তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভয় পাবেন না। সীরাহ থেকে শিক্ষা হলো, শত্রুদের সাথে পরিস্থিতিভেদে কখনো উদারতা দেখাতে হবে, আর কখনো কঠোরতা।
৩) একজন মুসলিমের জীবন-মরণ শুধুই আল্লাহর জন্য: সাদ ইবন মুয়ায আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন যেন কুরাইশদের সাথে শেষ যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকতে পারেন এবং বনু কুরায়যার পরিণতি দেখে অন্তর শান্ত করতে পারেন। জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ ছাড়া তাঁর বেঁচে থাকার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল নেই।
৪) আবু লুবাবাহর তাওবাহ: আবু লুবাবাহ বনু কুরায়যার কাছে ঈশারায় ইঙ্গিত করেছিলেন যে তাদের মেরে ফেলা হবে। কাজটা করার সাথে সাথেই তিনি বুঝলেন তিনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মসজিদে নববীর এক খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলে বললেন, 'আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করা না পর্যন্ত আমি নিজেকে মুক্ত করবো না।' এভাবে ছয়দিন পার হয়ে গেল। সপ্তম রাতে আল্লাহর রাসূল তাঁর তাওবাহ কবুলের খবর পান। আবু লুবাবাহর এই ঘটনা আল্লাহর সাথে সততার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।⁵⁷
৫) অন্তরের কাঠিন্য: হুয়াই ইবন আখতাব এবং কা'ব ইবন আসাদ জীবনের শেষ মুহূর্তেও নিজেদের ভুলের ওপর অটল ছিল। তারা জানতো তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে। তবুও শেষ মুহূর্তে এসেও তাদের হৃদয় গলেনি।
৬) মতভেদ বা ইখতিলাফের ধারণা: রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের আদেশ করেছিলেন যেন তারা বনু কুরাইযার এলাকায় গিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন। পথে সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে একদল পথেই সালাত পড়ে নেয়, আর অন্যদল গন্তব্যে গিয়ে আদায় করে। রাসূলুল্লাহ কাউকেই ভুল বলেননি। এতে প্রমাণিত হয় ইসলামী শরীয়াহ ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়।
টিকাঃ
৫৭. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৪।
📄 সাদ ইবন মুয়াযের ؓ মর্যাদা
আল্লাহর রাসূল সাদ ইবন মুয়াযের সম্মানে বলেছিলেন, 'তোমরা তোমাদের নেতার সম্মানার্থে উঠে দাঁড়াও।'⁵⁸ সাদ ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যার জন্য সাহাবিদের উঠে দাঁড়াতে বলেন। আল্লাহর রাসূল জানতে পারলেন সাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। তিনি রীতিমতো ছুটে গেলেন। পৌঁছে দেখা গেল সাদকে গোসল দেওয়া হচ্ছে।⁵⁹
সাদ ইবন মুয়াযের লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় সাহাবিরা বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! এত হালকা লাশ এর আগে কখনো বহন করিনি।' রাসূল বললেন, 'কেনই বা হবে না বলো? এমন সব ফেরেশতারা আজ জমিনে এসে সাদের লাশ বহন করছেন যারা এর আগে আর কখনো পৃথিবীতে আসেননি।' এক বর্ণনায় আছে, সাদের লাশ বহন করতে সত্তর হাজার ফেরেশতা আসমান থেকে জমিনে নেমে আসে।
সাদ ইবন মুআয আল্লাহর কত প্রিয় ছিলেন তা একটি হাদিস থেকে বোঝা যায়। বলা হয় যে, তাঁর মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল!⁶⁰ সাদের মৃত্যুর অনেক দিন পরের কথা, রাসূলুল্লাহর কাছে উপহার হিসেবে একটা চাদর আসলে তিনি বলেন, 'জান্নাতে সাদ ইবন মুয়াযের যে রুমালটা আছে তা এই চাদরের চাইতেও উত্তম আর কোমল।'⁶¹
সাদ ইবন মুআযকে কবরে রাখার পর রাসূলুল্লাহর চেহারা বদলে যায়। তিনি তিনবার তাসবীহ ও তিনবার তাকবীর পড়লেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কবর সাদকে চাপ দিয়ে ধরেছিল। যদি কেউ কবরের চাপ থেকে মুক্তি পেত সে হতো সাদ। এরপর কবর আবার প্রশস্ত হয়ে গেল।'
সাদ ইবন মুআয যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাঁইত্রিশ বছর। দ্বীনের জন্য একজন মুসলিম যুবক কীভাবে নিজের জীবন দিয়ে দেয়, তার উৎকৃষ্ট নমুনা সাদ ইবন মুয়াযের জীবন।
টিকাঃ
৫৮. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় আদাব, হাদীস ৪৪৩।
৫৯. সুনান নাসাঈ, অধ্যায় জানাযা, হাদীস ২৩৯।
৬০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ১৪৭।
৬১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ১৪৬।