📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিশ্বাসঘাতক দুই ইহুদি শীর্ষনেতার শেষ মুহূর্ত

📄 বিশ্বাসঘাতক দুই ইহুদি শীর্ষনেতার শেষ মুহূর্ত


বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাব আন-নাযরীকে ধরে আনা হলো। রাসূলুল্লাহর মদীনার আগমনের প্রথম দিন থেকে সে রাসূলুল্লাহর শত্রু। বনু কুরায়যার বিদ্রোহের পেছনে মূল নায়কও ছিল হুয়াই। সে-ই কা'ব ইবন আসাদকে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে ফুঁসলে দিয়েছিল।

হুয়াই ইবন আখতাবের হাত বেঁধে টেনে টেনে আনা হলো। রাসূলুল্লাহকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো, 'তোমার সাথে শত্রুতা করে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যে আল্লাহকে ত্যাগ করে তার ধ্বংস অনিবার্য -- যা আজকে আমার সাথে হচ্ছে।' এ কথা বলে সে তার নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে বললো, 'আজকে যা হচ্ছে তা আল্লাহরই ফয়সালা। বনী ইসরাঈলের কপালে আল্লাহ এটাই লিখে রেখেছিলেন।'⁵⁴ এরপর তাকে হত্যা করা হয়।

ধরে আনা হলো বনু কুরায়যার নেতা কা'ব ইবন আসাদ আল-কুরায়যীকে। তাকে দেখে রাসূলুল্লাহ বললেন,
- তুমিই কি কা'ব ইবন আসাদ?
- জ্বী, আমিই কা'ব ইবন আসাদ।
- ইবন খুরাশ তোমাকে একটা ভালো উপদেশ দিয়েছিল, সেটা তুমি শুনলে না। সে কি তোমাকে বলেনি আমার অনুসরণ করতে?
- তাওরাতের কসম, এ কথাগুলো সে আমাকে বলেছিল আবুল কাসিম! সত্যি বলতে কী, আমি আপনার অনুসারী হতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা করলে আজ ইহুদিরা বলতো আমি কাপুরুষের মতো যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েছি। সে ভয়ে আর অনুসরণ করা হলো না। আজ তাই আমি ইহুদিদের ধর্মের ওপরেই অটল আছি।

এরপর রাসূলুল্লাহর আদেশে কা'বকেও হত্যা করা হলো।

টিকাঃ
৫৪. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৮।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু কুরায়যার পরিণতি

📄 বনু কুরায়যার পরিণতি


অল্প কজন ছাড়া প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক ইহুদি পুরুষকে হত্যা করা হয়। যাদের লোম গজায়নি (নাবালেগ), তারা ছাড়া পেল। আর যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে তাদের প্রায় সবাইকে এক এক করে হত্যা করা হয়। সেদিনের এক নাবালেগ প্রত্যক্ষদর্শী আতিয়া বলেন, 'সেদিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে হত্যা করা হয়। আমি সে সময় কিশোর, তাই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।'

নিহতদের মধ্যে একজন মহিলাও ছিল। যখন বনু কুরায়যার পুরুষদের নাম ধরে ডাকা হচ্ছিল তখন এক মহিলা পুরো সময় জুড়ে হা হা করে হাসতে থাকে। আইশা রা. অবাক হয়ে সে মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার হয়েছেটা কী? তোমার নাম কেন ডাকা হলো?' সে বললো, 'কারণ আমাকে এখন হত্যা করা হবে।' আইশা রা. পরবর্তীতে সেই মহিলার অপরাধের কথা জানতে পারেন। সে যাঁতা ছুঁড়ে খাল্লাদ ইবন সুওয়াইদকে হত্যা করেছিল।

মদীনার বাজারে সেদিন কয়েকশো ইহুদির ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আত্মসমর্পণের আগে কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

১) রাসূলুল্লাহর সাহাবি সাবিত ইবন কায়িস রা. রাসূলুল্লাহর কাছে এসে অনুরোধ করলেন যেন এক ইহুদিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জাহিলিয়াতের যুগে সেই লোক তাঁর উপকার করেছিল। সেই ইহুদির নাম ছিল আয-যুবাইর ইবন বাতা। রাসূলুল্লাহ সাবিতের অনুরোধ রাখলেন। এরপর সাবিতের অনুরোধে আয-যুবাইরের স্ত্রী-সন্তান ও সম্পত্তিও ফিরিয়ে দেওয়া হলো। সাবিত আয-যুবাইরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বললেন। আয-যুবাইর তখন বনু কুরায়যার অন্য নেতাদের খবর জানতে চাইলো। যখন শুনলো তারা মারা গেছে, সে বললো, 'সাবিত, তুমি আমাকে আমার প্রিয় মানুষগুলোর কাছে যেতে দাও। তাদের থেকে বিচ্ছেদ আমি সহ্য করতে পারছি না।' এ কথা শুনে সাবিত নিজেই আয-যুবাইরের গর্দান উড়িয়ে দেন। আবু বকর মন্তব্য করেন, 'আল্লাহর শপথ, এই লোক তার বন্ধুদের সাথেই মিলিত হবে। তবে সেটা হবে জাহান্নামে।'⁵⁵

২) সালমাহ ইবন কাইস ছিলেন রাসূলুল্লাহর একজন খালা। বনু কুরায়যা আত্মসমর্পণ করার পরে রিফাআহ ইবন সামাআল নামের এক ইহুদি তাঁর কাছে আশ্রয় চায়। রাসূলুল্লাহ তাঁর অনুরোধে রিফাআহকে ছেড়ে দেন। রিফাআ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে।

৩) আমর ইবন সুদা নামের এক ইহুদি বনু কুরায়যার বিশ্বাসঘাতকতায় অংশ নেয়নি, বরং সে এর প্রতিবাদ করেছিল। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ তাকে ছেড়ে দেন।

টিকাঃ
৫৫. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৮।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু কুরায়যার সম্পদ বণ্টন

📄 বনু কুরায়যার সম্পদ বণ্টন


সাদ ইবন মুয়াযের রায় অনুসারে বনু কুরায়যার সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। মুসলিমরা এই অভিযান থেকে দেড় হাজার তরবারি, দু'হাজার বর্শা, তিনশো শিরস্ত্রাণ, হাজার দেড়েক বর্ম এবং অসংখ্য উট আর ভেড়া লাভ করে। এই সম্পদের পাঁচ ভাগের চারভাগ মুজাহিদদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। মুসলিমরা বিপুল পরিমাণ মদও লাভ করে কিন্তু হারাম হওয়ার কারণে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়।

যেসব সম্পদ বহনযোগ্য ছিল না, যেমন বনু কুরায়যার বাড়িঘর, সেগুলো পুরোপুরি দিয়ে দেওয়া হয় মুহাজিরদেরকে। আল্লাহর রাসূল তাদের আদেশ করলেন তারা যেন আনসারদের থেকে পাওয়া সকল খেজুর বাগান আর জমি আনসারদের ফিরিয়ে দেন।

রায়হানাহ বিনত আমর ইবন খুনাফাহ নামের একজন মহিলাকে রাসূলুল্লাহর কাছে দাসী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। রাসূল তাঁকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। পরে তিনি মুসলিম হয়ে যান। রাসূল তখন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু রায়হানা দাসী হিসেবেই থাকতে চাইলেন।⁵⁶ শেষ পর্যন্ত তিনি দাসী হিসেবেই থেকে যান।

টিকাঃ
৫৬. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু কুরায়যার ঘটনা থেকে শিক্ষা

📄 বনু কুরায়যার ঘটনা থেকে শিক্ষা


১) শাস্তির ভয়াবহতা: বনু কুরায়যার অপরাধ ছিল—বিশ্বাসঘাতকতা। আধুনিক আইনের ভাষায় একে বলা হয়—রাষ্ট্রদ্রোহ। তারা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তারা একটি বহিঃশত্রুর সাথে ষড়যন্ত্র করেছিল মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালাতে। অপরাধের অনুপাতে শাস্তির মাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল।

২) তিরস্কারকারীদের তিরস্কার: সাদ ইবন মুআযকে তাঁর গোত্র অনুরোধ করেছিল তিনি যেন উদারতা দেখান। কিন্তু তিনি জানতেন, এ ক্ষেত্রে উদারতা দেখানো মানে দুর্বলতা। সাদ ইবন মুআয রায় দেওয়ার আগে বলেছিলেন তিনি এই ব্যাপারে তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভয় পাবেন না। সীরাহ থেকে শিক্ষা হলো, শত্রুদের সাথে পরিস্থিতিভেদে কখনো উদারতা দেখাতে হবে, আর কখনো কঠোরতা।

৩) একজন মুসলিমের জীবন-মরণ শুধুই আল্লাহর জন্য: সাদ ইবন মুয়ায আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন যেন কুরাইশদের সাথে শেষ যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকতে পারেন এবং বনু কুরায়যার পরিণতি দেখে অন্তর শান্ত করতে পারেন। জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ ছাড়া তাঁর বেঁচে থাকার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল নেই।

৪) আবু লুবাবাহর তাওবাহ: আবু লুবাবাহ বনু কুরায়যার কাছে ঈশারায় ইঙ্গিত করেছিলেন যে তাদের মেরে ফেলা হবে। কাজটা করার সাথে সাথেই তিনি বুঝলেন তিনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মসজিদে নববীর এক খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলে বললেন, 'আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করা না পর্যন্ত আমি নিজেকে মুক্ত করবো না।' এভাবে ছয়দিন পার হয়ে গেল। সপ্তম রাতে আল্লাহর রাসূল তাঁর তাওবাহ কবুলের খবর পান। আবু লুবাবাহর এই ঘটনা আল্লাহর সাথে সততার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।⁵⁷

৫) অন্তরের কাঠিন্য: হুয়াই ইবন আখতাব এবং কা'ব ইবন আসাদ জীবনের শেষ মুহূর্তেও নিজেদের ভুলের ওপর অটল ছিল। তারা জানতো তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে। তবুও শেষ মুহূর্তে এসেও তাদের হৃদয় গলেনি।

৬) মতভেদ বা ইখতিলাফের ধারণা: রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের আদেশ করেছিলেন যেন তারা বনু কুরাইযার এলাকায় গিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন। পথে সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে একদল পথেই সালাত পড়ে নেয়, আর অন্যদল গন্তব্যে গিয়ে আদায় করে। রাসূলুল্লাহ কাউকেই ভুল বলেননি। এতে প্রমাণিত হয় ইসলামী শরীয়াহ ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়।

টিকাঃ
৫৭. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px