📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 অবরোধের সিদ্ধান্ত

📄 অবরোধের সিদ্ধান্ত


খন্দকের যুদ্ধ শেষ। ক্লান্তিকর অনেকগুলো দিন পার করে আল্লাহর রাসূল ঘরে ফিরে এসেছেন। অস্ত্রশস্ত্র রেখে বের হলেন গোসল করতে। যুহরের ওয়াক্ত চলছে। এমন সময় ধূলি-ধূসরিত বেশে তড়িঘড়ি করে জিবরীল হাজির হলেন। বললেন,
- ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি অস্ত্র নামিয়ে রেখেছেন! কিন্তু আমরা ফেরেশতারা এখনো অস্ত্র নামাইনি। আপনি এখনই ওদের ধাওয়া করুন!
- কোন দিকে?
- এই দিকে, জিবরীল বনু কুরায়যার দিকে ইঙ্গিত করলেন।

খন্দকের রেশ তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে বনু কুরায়যাকে শায়েস্তা করার নির্দেশ চলে এল। রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়তে আদেশ করলেন। বলে দিলেন তারা যেন বনু কুরাইযার এলাকায় পৌঁছে তবেই আসরের সালাত আদায় করে। মদীনায় ইবন উম্ম মাকতুমকে অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হলো। সাহাবিরা যখন বনু কুরায়যার এলাকায় পৌঁছলেন তখন আসরের ওয়াক্ত শেষ, তবে একদল আগেই পথিমধ্যে আসর পড়ে নিয়েছিলেন। সবার আগে পৌঁছলেন আলী। দেখতে পেলেন বনু কুরায়যা একেবারে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করছে। গালিগালাজ করা হচ্ছে রাসূলুল্লাহকে।

রাসূলুল্লাহ বনু কুরায়যাকে অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

“কিতাবিদের মধ্যে যারা (এ যুদ্ধে) তাদেরকে সাহায্য করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ হতে অবতরণ করতে বাধ্য করলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন, এখন তোমরা তাদের কাউকে করেছো হত্যা এবং কাউকে করেছো বন্দী। এবং তোমাদেরকে অধিকারী করলেন তাদের ভূমি, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমি যা তোমরা এখনো পদানত করোনি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২৬- ২৭)

প্রায় পঁচিশ দিন অবরোধ করে রাখা হলো। বনু কুরায়যা বুঝতে পারছিল সময় শেষ হয়ে আসছে। নেতা কা'ব ইবন আসাদ একদিন সবাইকে ডাক দিয়ে বললো,
- তোমরা নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছো পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমি তোমাদের তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি, তোমাদের যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারো। প্রথম প্রস্তাব, আমরা মুহাম্মাদের আনুগত্য করবো এবং তাঁকে সত্য বলে মেনে নেব। আল্লাহর কসম, তোমরা ভালো করেই জানো মুহাম্মাদ একজন নবী। তাওরাতে তোমরা যে নবীর বর্ণনা পেয়েছ, ইনিই সেই লোক। যদি তোমরা তাঁর ওপর ঈমান আনো, তাহলে বেঁচে যাবে। সেই সাথে তোমাদের জান-মাল-স্ত্রী-পুত্র সবকিছুই রক্ষা পাবে।

উত্তর এল,
- না, আমরা কখনোই তাওরাতের বিধান ত্যাগ করবো না। তাওরাত বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিধান আমরা মানবো না।

কা'ব বললো,
- ঠিক আছে, তাহলে আমার দ্বিতীয় প্রস্তাবটা দিই—আমরা আমাদের সন্তান ও নারীদের হত্যা করবো এবং তারপর খোলা তরবারি নিয়ে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বো। তাহলে আমাদের আর কোনো পিছুটান থাকবে না। এরপর ততক্ষণ লড়াই করবো যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের আর তাদের মাঝে একটা ফয়সালা করে দেন। যদি হেরে যাই, তো এমনভাবে মরবো যখন আমাদের কোনো বংশধর বেঁচে নেই। কাজেই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করারও কিছু থাকবে না। আর যদি জিতে যাই, তাহলে নারী আর শিশুর অভাব আমাদের কখনোই হবে না।

উত্তর এল,
- এই অসহায় নারী-শিশুদের শুধু শুধু মেরে ফেলবো? এদের যদি মেরেই ফেলি তাহলে আমাদের বেঁচে থেকে লাভটা কী?

কা'ব তখন শেষ প্রস্তাবটি দিল।
- ঠিক আছে, তোমরা যদি এটাও মানতে না চাও তাহলে অন্য একটা প্রস্তাব দিতে পারি। আজকে শনিবারেত রাত, আমরা যে শনিবারে যুদ্ধ করি না তারা নিশ্চয়ই এটা জানে। এটা ভেবে হয়তো মুহাম্মাদ আর তাঁর সঙ্গীরা কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকবে। এই সুযোগে আসো তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে শেষ করে দিই।

উত্তর এল,
- আরে! তুমি কি পবিত্র শনিবারের পবিত্রতা নষ্ট করে দিতে চাও? তুমি কি জানো না এই শনিবারের অমর্যাদা করে আমাদের পূর্বপুরুষদের কী ভীষণ শাস্তি হয়েছিল?

বনু কুরায়যার কাপুরুষতা আর সিদ্ধান্তহীনতা দেখে কা'ব ভীষণ বিরক্ত হলো। বললো, 'ধুর! তোমাদের মধ্যে একটা বাপের ব্যাটা নেই, যে মায়ের পেট থেকে বেরোনোর পর একটা রাত কোনো বিষয়ে মনস্থির করে ঘুমাতে গেছে।'⁵¹

এই অল্প কদিনের মধ্যেই বনু কুরায়যা একেবারে ভেঙে পড়ে। লড়াই করার মানসিক শক্তিটুকু পর্যন্ত আর তাদের কারো মাঝে নেই। ভয়, সিদ্ধান্তহীনতা তাদের পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে। যত সাহস আর আস্ফালন, সব তলানিতে গিয়ে ঠেকলো। আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কিছুই তারা ভাবতে পারছিল না। তারা আবু লুবাবার কাছে পরামর্শ চাইলো। আবু লুবাবা জাহিলিয়াতের যুগে তাদের বন্ধু ছিলেন। তাঁকে দেখে নারী ও শিশুরা কান্নায় ভেঙে পড়লো। তাদের অবস্থা দেখে আবু লুবাবার মন একটু যেন দুর্বল হয়ে যায়। তারা আবু লুবাবাকে জিজ্ঞেস করলো, 'যদি আমরা আত্মসমর্পণ করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে—কোনো ধারণা করতে পারেন?' আবু লুবাবা হাত দিয়ে গলার দিকে ইঙ্গিত দেখালেন। বোঝালেন, যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে মৃত্যুই হবে পরিণতি।

কিন্তু বনু কুরায়যার অবস্থা ততদিনে এতটাই শোচনীয় যে আত্মসমর্পণের সম্ভাব্য পরিণতির কথা জেনেও তারা অগত্যা সেই পথই ধরে। আসলে খন্দকের যুদ্ধে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করার পর তারা আর প্রতিরোধ গড়ার কথা ভাবতে পারছিল না। বনু কুরায়যা আত্মসমর্পণের পথই বেছে নেয়। তাদের একটাই শর্ত, সাদ ইবন মুআয যেন তাদের বিচারক হয়। সাদ আওস গোত্রের লোক। আওস গোত্রের সাথে বনু কুরায়যার মিত্রতা ছিল। তাদের আশা ছিল সাদ ইবন মুআয নিশ্চয়ই তাদের প্রতি কঠোর হবেন না!

টিকাঃ
৫১. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাদ ইবন মুয়াযের ؓ দুআ

📄 সাদ ইবন মুয়াযের ؓ দুআ


এই ঘটনার কিছুদিন আগের কথা। খন্দকের যুদ্ধের সময় সাদ ইবন মুআয আহত হন। আহত অবস্থায় আল্লাহর কাছে একটি চমৎকার দুআ করলেন,

'হে আল্লাহ! যদি কুরাইশদের সাথে আমাদের আরও যুদ্ধ হয়, তাহলে সে যুদ্ধ পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রাখো। যারা তোমার রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে অস্বীকার করেছে, তাঁকে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করেছে; তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমি ভালোবাসি। আর যদি এই যুদ্ধই তাদের সাথে আমাদের শেষ যুদ্ধ হয়, তবে এই আঘাতের মাধ্যমেই আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও। কিন্তু বনু কুরায়যার ব্যাপারে আমার অন্তরের জ্বালা না মিটিয়ে আমাকে মৃত্যু দিও না।'⁵²

সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলকে নিজ প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। খন্দকের যুদ্ধের চরম দুর্যোগের মুহূর্তে বনু কুরায়যা প্রিয় রাসূলুল্লাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। সে কথা সাদ কী করে ভুলতে পারেন। তাঁর মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ, বনু কুরায়যার শেষ পরিণতি দেখেই তিনি মরতে চান।

এর আগে বনু কায়নুকার ভাগ্য খাযরাজের হাতে দেওয়া হয়েছিল। রাসূলুল্লাহকে তাই বনু আওস চাপাচাপি করছিল যেন তাদের হাতে বনু কুরায়যাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, 'যদি তোমাদের গোত্রের কেউ এই বিচার করে তোমরা খুশি তো?' বনু আওস এক কথায় রাজি। রাসূলুল্লাহ তাদের ইচ্ছে অনুসারে আওস গোত্রের নেতা সাদ ইবন মুয়াযের হাতে বনু কুরায়যার ভাগ্য ছেড়ে দিলেন। ইহুদিদেরও এটাই ইচ্ছা ছিল।

আওসের লোকেরা সাদ ইবন মুআযকে খুব চাপাচাপি করতে থাকে যেন তিনি বনু কুরায়যার প্রতি সদয় হন। কেননা এর আগে খাযরাজ গোত্রের আবদুল্লাহ ইবন উবাই বনু কায়নুকার প্রতি সদয় হয়ে তাদের হত্যা না করে ছেড়ে দিয়েছিল। সাদ ইবন মুআয তাদের সব কথা আর উপদেশ চুপ করে শুনলেন। এরপর শুধু এতটুকুই বললেন, 'সাদের সময় এসেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির ব্যাপারে সে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না।'

টিকাঃ
৫২. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৫।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিচারের রায়

📄 বিচারের রায়


খন্দকের যুদ্ধে আহত সাদ ইবন মুআযকে রাখা হয়েছিল রাসূলুল্লাহর মসজিদের ভেতরে একটি তাঁবুতে। রুফাইদাহ আল-আসলামিয়্যাহ নামের এক আনসারী নারীকে আল্লাহর রাসূল সাদের দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। বিচারের দিন এল। কাঠগড়ায় ইহুদি গোত্র বনু কুরায়যা। বিচারক তাদের অতীতের বন্ধু সাদ ইবন মুআয। অপরপক্ষে আছে মদীনার মুসলিমরা। সাদ তখন অসুস্থ, তাঁকে বহন করে নিয়ে আসা হলো। তাঁর এক পাশে মুসলিম, আরেক পাশে ইহুদি।

আদালতে সাদের আগমন ঘটলো। সাদ ইবন মুআয ইহুদিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- তোমরা সবাই কি আমার ফয়সালা মেনে নিতে রাজি?
- জ্বী, আমরা রাজি।

এরপর তিনি মুসলিমদের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করলেন,
- তোমরা কি আমার ফায়সালা মেনে নেবে?

মুসলিমদের প্রশ্ন করার সময় সেদিকে তাকালেন না। কীভাবে তাকাবেন তিনি? মুসলিমদের মধ্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ উপস্থিত। যতবার মনে হচ্ছিল আল্লাহর রাসূল সেখানে আছেন, ততবার তিনি লজ্জত বোধ করছিলেন।
- হ্যাঁ, আমরা মেনে নেব, রাসূলুল্লাহ উত্তর দিলেন।

সাদ ইবন মুআয দৃঢ়কণ্ঠে রায় দিলেন—'আমি এই মর্মে রায় দিচ্ছি যে, বনু কুরায়যার সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে। তাদের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বণ্টন করে দেওয়া হবে আর তাদের নারী আর শিশুদের দাস হিসেবে গ্রহণ করা হবে।'

সবাই নিশ্চুপ। আল্লাহর রাসূল প্রথম কথা বললেন, 'তুমি ঠিক সেই রায় দিয়েছ, যা আল্লাহ সাত আসমানের ওপর ফায়সালা করে রেখেছিলেন।'⁵³

টিকাঃ
৫৩. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৪৯।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিশ্বাসঘাতক দুই ইহুদি শীর্ষনেতার শেষ মুহূর্ত

📄 বিশ্বাসঘাতক দুই ইহুদি শীর্ষনেতার শেষ মুহূর্ত


বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাব আন-নাযরীকে ধরে আনা হলো। রাসূলুল্লাহর মদীনার আগমনের প্রথম দিন থেকে সে রাসূলুল্লাহর শত্রু। বনু কুরায়যার বিদ্রোহের পেছনে মূল নায়কও ছিল হুয়াই। সে-ই কা'ব ইবন আসাদকে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে ফুঁসলে দিয়েছিল।

হুয়াই ইবন আখতাবের হাত বেঁধে টেনে টেনে আনা হলো। রাসূলুল্লাহকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো, 'তোমার সাথে শত্রুতা করে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যে আল্লাহকে ত্যাগ করে তার ধ্বংস অনিবার্য -- যা আজকে আমার সাথে হচ্ছে।' এ কথা বলে সে তার নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে বললো, 'আজকে যা হচ্ছে তা আল্লাহরই ফয়সালা। বনী ইসরাঈলের কপালে আল্লাহ এটাই লিখে রেখেছিলেন।'⁵⁴ এরপর তাকে হত্যা করা হয়।

ধরে আনা হলো বনু কুরায়যার নেতা কা'ব ইবন আসাদ আল-কুরায়যীকে। তাকে দেখে রাসূলুল্লাহ বললেন,
- তুমিই কি কা'ব ইবন আসাদ?
- জ্বী, আমিই কা'ব ইবন আসাদ।
- ইবন খুরাশ তোমাকে একটা ভালো উপদেশ দিয়েছিল, সেটা তুমি শুনলে না। সে কি তোমাকে বলেনি আমার অনুসরণ করতে?
- তাওরাতের কসম, এ কথাগুলো সে আমাকে বলেছিল আবুল কাসিম! সত্যি বলতে কী, আমি আপনার অনুসারী হতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা করলে আজ ইহুদিরা বলতো আমি কাপুরুষের মতো যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েছি। সে ভয়ে আর অনুসরণ করা হলো না। আজ তাই আমি ইহুদিদের ধর্মের ওপরেই অটল আছি।

এরপর রাসূলুল্লাহর আদেশে কা'বকেও হত্যা করা হলো।

টিকাঃ
৫৪. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px