📄 জোটবাহিনীর প্রস্থান
অবরোধের ক্লান্তি, হতাশা, কোন্দল আর সবশেষে ঝড়ো বাতাস সব মিলিয়ে কুরাইশরা মানসিকভাবে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা যেন আর কিছুই ভাবতে পারছিল না। রাসূলুল্লাহ তাঁদের অবস্থা ও কৌশল বোঝার জন্য একজন সাহাবিকে শত্রু ক্যাম্পে নজরদারি করার জন্য পাঠাতে চাইলেন। সবাইকে ডেকে বললেন, 'কে আছে যে আমাকে শত্রুর ব্যাপারে তথ্য এনে দেবে? যে এই কাজ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সাথে স্থান দেবেন।'
চারদিকে পিনপতন নীরবতা।
রাসূলুল্লাহ আবার ডাকলেন। কেউ সাড়া দিল না। তারপর আবার।
সাহাবিরা সাধারণত ভালো কাজের সুযোগ পেলেই লুফে নিতেন। আল্লাহর রাসূলের আদেশ মানতে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউই জবাব দিল না। হিমশীতল রাত। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। সারাদিনের ধকলের পর সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। এর মধ্যে শত্রুশিবিরের একেবারে ভেতরে গিয়ে খবর নিয়ে আসার মতো বিপজ্জনক মিশনে যাওয়ার অবস্থা কারোরই নেই।
রাসূলুল্লাহ আর অপেক্ষা করলেন না। তাঁর দক্ষ নজরে বেছে নিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত সৈনিকটিকে। হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামানের নাম ধরে ডেকে বললেন, 'হুযাইফা, তুমি যাও, শত্রুদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে আনো। কিন্তু এমন কিছু করে তাদের উসকে দিও না যাতে করে তারা আমাদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে নেমে পড়ে।'
এতক্ষণ বিষয়টা ছিল ঐচ্ছিক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ যখন সরাসরি আদেশ করলেন, হুযাইফাকে তাই যেতেই হলো। হুযাইফা ছিলেন বুদ্ধিমান, চোখ-কান খোলা, প্রত্যুৎপন্নমতি, পরিস্থিতি চট করে সামাল দিতে সক্ষম। হুযাইফা বের হলেন। বাইরে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, কিন্তু হুযাইফা তার কিছুই টের পেলেন না। সবই আল্লাহর সাহায্য! সেই অন্ধকার রাত্রিতে হুযাইফার অভিজ্ঞতা তাঁর মুখেই শোনা যাক,
'আমি বের হয়ে এলাম, মনে হলো যেন উষ্ণ পানির ওপর হাঁটছি। সুযোগ বুঝে শত্রুদের ক্যাম্পে ঢুকে পড়লাম। গিয়ে দেখি লণ্ডভণ্ড অবস্থা। আবু সুফিয়ান আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে গা গরম করছে। তাকে দেখেই আমি আমার ধনুকে তীর বসিয়ে ফেললাম। তাকে হত্যা করতে যাবো, এমন সময় হঠাৎ মনে পড়ল, আল্লাহ রাসুল তো আমাকে নিষেধ করেছেন যেন উসকানিমূলক কোনো কাজ না করি। এই ভেবে আর কিছু করলাম না। কিন্তু আমি যদি চাইতাম, সেদিনই তাকে হত্যা করতে পারতাম।'
গভীর রাত। ঘুটঘুট অন্ধকার। আবু সুফিয়ানের হঠাৎ সন্দেহ হলো এই অন্ধকারের মাঝে শত্রুপক্ষের কেউ তো চাইলে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে! সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো, 'কুরাইশরা, তোমরা দেখে নাও তোমাদের পাশে কে আছে। সবাই সবার পাশের জনের পরিচয় জেনে নাও।'
হুযাইফা এ কথা শোনার পর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। ঝট করে তাঁর ডান পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অ্যাই, তুমি কে?' উত্তর এল, 'আমি মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান।' ডান পাশের জনকে জিজ্ঞেস করেই সঙ্গে সঙ্গে বাম দিকে ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে?' বাম পাশ থেকে উত্তর এল, 'আমি আমর ইবন আল-আস।' হুযাইফা এত বুদ্ধিমত্তার সাথে পুরো ঘটনা ঘটালেন যে পাশের দুইজন সন্দেহই করলো না হুযাইফা বাইরের কেউ। তারা তাকে কিছু জিজ্ঞেসই করলো না।
'আমি আমার কাজ শেষ করে চলে এলাম। আসার সময় আবারও মনে হলো উষ্ণ পানির ওপর দিয়ে হাঁটছি। রাসূলুল্লাহর কাছে যখন ফিরে গেলাম, তখন বেশ ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। আমি যা যা দেখে এসেছি তা রাসূলুল্লাহকে জানালাম (শত্রুরা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে)। তিনি তখন আমাকে তাঁর শরীর থেকে চাদর খুলে আমাকে জড়িয়ে দিলেন। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো ফজরের সময়ে, আল্লাহর রাসূল আমাকে ডাকছেন, এই যে ঘুমকাতুরে! ওঠো!'
📄 হুযাইফার ؓ ইন্টেলিজেন্স অপারেশন থেকে শিক্ষা
১) হুযাইফার শৃঙ্খলাবোধ: হুযাইফা চাইলেই আবু সুফিয়ানকে হত্যা করতে পারতেন।⁴⁶ আবু সুফিয়ান তখন মক্কার নেতা। কিন্তু রাসূলুল্লাহর আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এটা ছিল একটা ইন্টেলিজেন্স অপারেশন, গুপ্তহত্যার অপারেশন নয়। তাই হুযাইফা সুযোগ পেয়েও হত্যা করেননি।
২) আল্লাহর সাহায্য: যতক্ষণ মিশনে ছিলেন, ততক্ষণ তিনি একেবারেই ঠান্ডা অনুভব করেননি। যখন তিনি ফিরে এসেছেন, তখন তাঁর ঠান্ডা লাগতে শুরু করে। এটা ছিল একটা কারামাত।
৩) সাহাবিদের প্রতি রাসূলুল্লাহর স্নেহ: আল্লাহর রাসূল তাঁর সাহাবিদের সাহসিকতা আর আনুগত্যের কদর করতে কখনো ভুলেননি। এই দুঃসাহসী অপারেশন শেষে হুযাইফা ফিরে আসার পর যখন তাঁর ঠান্ডা লাগতে শুরু করে, তখন রাসূলুল্লাহ নিজের শরীর থেকে চাদর খুলে হুযাইফার গায়ে জড়িয়ে দেন। নিজে গিয়ে তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। স্নেহমাখা কণ্ঠে বলেন—এই যে ঘুমকাতুরে! স্বয়ং আল্লাহর রাসূল ঘুম থেকে ডাকতে এসেছেন!
৪) সাহাবিদের শ্রেষ্ঠত্ব: এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটা অনেক পরের, হুযাইফা তখন বৃদ্ধ। কুফার এক লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'আপনি কি রাসূলুল্লাহকে দেখেছেন? আপনি কি তাঁর সাহাবি ছিলেন?' এই লোকটি ছিল তাবেয়িদের একজন, অর্থাৎ সাহাবিদের পরের প্রজন্ম। হুযাইফা বলেন, 'হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখেছি। আমরা তাঁর সাহাবি ছিলাম।' তাবেয়ি তখন জিজ্ঞেস করলেন 'আপনারা তাঁকে কেমন কদর করতেন?' হুযাইফা বললেন, 'তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী। তাঁকে যথাযথ কদর করা খুব কঠিন ছিল। তবুও আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।' সেই তাবেয়ি তখন বললো, 'আল্লাহর শপথ, যদি আমরা তাঁর সময়ে বেঁচে থাকতাম তাহলে আমরা তাঁর পায়ে একটা ধুলোও লাগতে দিতাম না। আমরা তাঁকে মাথায় করে রাখতাম।'
হুযাইফা সেই তরুণ তাবেয়িকে একটা শিক্ষা দেওয়া জরুরি মনে করলেন। তাঁকে শোনালেন খন্দকের সেই রাতের কাহিনী। তিনি তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে মুখে বলা অনেক সহজ, কিন্তু করে দেখানো খুব কঠিন। পরিস্থিতি কতটা কঠিন হলে রাসূলুল্লাহ তিন তিনবার ডাকার পরেও কেউ সাড়া না দিয়ে থাকে! শেষ পর্যন্ত তিনি হুযাইফাকে আদেশ করে এই মিশনে পাঠান।
সাহাবিদের পরবর্তী প্রজন্মকে সাহাবিদের সেই কষ্ট-ত্যাগ-সংগ্রামের কিছুই করতে হয়নি। তাদেরকে সাহাবিদের মতো নিজ বাবা-চাচা-ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়নি। খন্দকের যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। দুনিয়াতে আসার সাথে সাথেই তারা সাহাবিদের মিশনের সুফল উপভোগ করতে শুরু করেছেন। তাই তাদের জন্য এটা বলা খুব সহজ যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে আরও বেশি কদর করতেন। রাসূলুল্লাহর যমানায় জন্ম নিয়ে অনেকেই কাফির হিসেবে মারা গেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে সে ফিতনায় পড়তে হয়নি। সাহাবিদের যুগ ছিল শিরক, মূর্তিপূজা আর জাহিলিয়াতের যুগ। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার সময়ে তাদের ইসলামকে চিনে নিতে হয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম সেসবের কিছুই দেখেনি। তারা জন্মের পর থেকেই ইসলামের শাসন, ন্যায় আর নিরাপত্তা উপভোগ করতে পেরেছে। এ সবই অর্জিত হয়েছে সাহাবিদের রক্ত দিয়ে। কোনো প্রজন্মই সাহাবিদের সমান হতে পারবে না। আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'
টিকাঃ
৪৬. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১২২।
📄 খন্দকের যুদ্ধে অলৌকিক ঘটনা
১) মু'জিযা - এক বকরিতে আটশো লোকের খাওয়া!
এই মজার ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন জাবিতর ইবন আবদুল্লাহ,
'তখন পরিখা খনন করা হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি ভীষণ ক্ষুধার্ত। আমি আমার স্ত্রীর কাছে গেলাম। জানতে চাইলাম, ঘরে কি কোনো খাবার আছে? রাসূলুল্লাহকে এত ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখে আর সহ্য হচ্ছে না! তোমার কাছে কোনো খাবার-টাবার কিছু আছে? সে বললো, খাবার বলতে আছে অল্প কিছু যব আর একটা বকরির বাচ্চা। আমি তখন বকরিটাকে জবাই করলাম। ওদিকে স্ত্রী যব পিষতে শুরু করে দিল। গোশত ডেকচিতে দিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে এলাম। বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার বাড়িতে সামান্য কিছু খাবার আছে। আপনি দু-একজনকে সাথে নিয়ে চলে আসুন না! তিনি জানতে চাইলেন, কী পরিমাণ খাবার আছে? আমি বললাম কী কী আছে। শুনে তিনি বললেন, বাহ! বেশ ভালোই তো আছে! তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বলো, আমি না আসা পর্যন্ত যেন সে চুলা থেকে গোশত না নামায়।'
এর পরের ঘটনাটার জন্য জাবির একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। জাবিরকে হতবাক করে দিয়ে নবীজি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'মুহাজির আর আনসাররা শোনো সবাই! জাবির আজ তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করেছে। সবাই চলো।' জাবির পড়লেন মহাচিন্তায়, যাকে বলে অতল সমুদ্রে। এত অল্প খাবার দিয়ে এতজনের আপ্যায়ন করবেন কীভাবে! বাড়ি গিয়ে স্ত্রীকে বললেন,
- আল্লাহর রাসূল তো মুহাজির, আনসার আর তাদের সব সঙ্গীসাথীকে নিয়ে চলে এসেছেন!
- আল্লাহর রাসূল কি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন খাবারের পরিমাণ কেমন?
- হ্যাঁ জানতে চেয়েছিলেন। তুমি আমাকে যা বলেছো আমি ঠিক তা-ই তাঁকে বলেছি।
- আচ্ছা, তাহলে চিন্তার কিছুই নেই। নিশ্চয়ই তিনি আমাদের থেকে ভালো জানেন।
জাবিরের স্ত্রী পরম নির্ভরতার সাথে জবাব দিলেন। তাঁর মধ্যে কোনো উদ্বেগের ছাপ দেখা গেল না!
সাহাবিরা আসা শুরু করলেন। সবাই ক্ষুধায় অস্থির। রাসূলুল্লাহ সবাইকে ধীরস্থির হতে বললেন। সাহাবিরা দশ জনের দলে ভাগ ভাগ হয়ে আসতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ রুটি টুকরো করে এর ওপর গোশত দিয়ে সাহাবিদের মাঝে বিতরণ করে দিলেন, তাঁরা খেয়ে গেলেন। এরপর আসলো আরেকটি দল। এভাবে প্রায় আটশো থেকে এক হাজার লোক তৃপ্তি সহকারে খেলেন। যখন সবার খাওয়া শেষ, তখনও গোশতের ডেকচিটা গোশতে পরিপূর্ণ। আর রুটিও তৈরি হচ্ছে সমান তালে। সবার খাওয়া শেষে আল্লাহর রাসূল জাবিরের স্ত্রীকে বললেন তিনি যেন নিজে খেয়ে নেন আর প্রতিবেশীদের মাঝে বাকি খাবারগুলো ভাগাভাগি করে দেন। আল্লাহর রাসূলের মু'জিযায় এক বকরি আর সামান্য যব দিয়েই আটশ'রও বেশি লোক সেদিন তৃপ্তি করে খেলো।⁴⁷
২) রাসূলুল্লাহর ভবিষ্যৎদ্বাণী
এটাও পরিখা খননের সময়ের একটা ঘটনা। পরিখা খনন করতে করতে এক বিশাল পাথর এসে পড়ে। সেটাকে কোনোভাবে ভাঙাও যাচ্ছিল না, সরানোও যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহকে বিষয়টি জানানো হলো। তিনি বিসমিল্লাহ বলে পাথরে আঘাত হানলেন। একটা স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ বলে উঠলেন,
'আল্লাহু আকবার! আমাকে শামের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর শপথ, আমি এখন শামের লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি!'
এরপর তিনি আবার আঘাত করলেন। আবারো একটি স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ বললেন,
'আল্লাহু আকবার! আমাকে দেওয়া হয়েছে পারস্যের চাবি! আমি পারস্যের শ্বেতশুভ্র প্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি!'
তৃতীয়বার আঘাত হানার পর পাথরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ আবারো বলেন,
'আল্লাহু আকবার! আমাকে ইয়েমেনের চাবি দেওয়া হয়েছে। আমি এই মুহূর্তে সানার দরজাগুলো দেখতে পাচ্ছি!'⁴⁸
ঠিক সেই মুহূর্তে মুসলিমদের অবস্থা খুবই করুণ। তারা তখন অবরুদ্ধ। ক্ষুধা, পিপাসা, আর অনিদ্রায় শরীর-মন অবসন্ন হয়ে আছে। এ অবস্থায় যদি এমন কেউ থাকতো, যার অন্তরে ঈমান নেই, সে নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহর কথাগুলোকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিত। কিন্তু সাহাবিদের দৃঢ় ঈমান। সেই কঠিন মুহূর্তেও তারা আল্লাহর রাসূলের কথাগুলোকে দিনের আলোর মতো বিশ্বাস করেছে। চরম দুর্দশার দিনে বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছে। এটাই হলো সত্যিকার ঈমানওয়ালার পরিচয়।
এ ঘটনার কয়েক বছর পর সত্যি সত্যিই মুসলিমরা এই জায়গাগুলো জয় করেছিল। শাম, পারস্য, ইয়েমেন। সব তখন মুসলিমদের হাতে। শোচনীয় অবস্থাতেই সুসংবাদ দিতে হয়। আমাদের এই সময়ে, যখন মুসলিমরা দুর্বল, ক্রমাগত মার খাচ্ছে, আমাদের জন্য সুসংবাদ কী? আমাদের জন্য সুসংবাদ হলো, শুধু শাম, পারস্য বা ইয়েমেন নয়, একটা সময় আসবে যখন মুসলিমরা সমগ্র বিশ্বকে পদানত করবে! নবীজি বলেছেন,
'দিন আর রাত যেখানে পৌঁছেছে, এই দ্বীনও সে সমস্ত স্থানে পৌঁছে যাবে।'⁴⁹
'আল্লাহ সমস্ত পৃথিবীকে ভাঁজ করে আমার সামনে রেখে দিয়েছেন। অতঃপর আমি এর পূর্ব দিগন্ত হতে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত দেখে নিয়েছি। পৃথিবীর যে পরিমাণ অংশ গুটিয়ে আমার সম্মুখে রাখা হয়েছিল সে পর্যন্ত আমার উম্মাতের রাজত্ব পৌঁছবে।'⁵⁰
কাজেই এই উম্মাহর অবস্থা এখন যতই খারাপ হোক না কেন, বিশ্বাস হারালে চলবে না। আল্লাহর রাসূল আমাদের যে বিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সে বিজয় অবশ্যই ঘটবে। আর আল্লাহ চাইলে খুব শীঘ্রই তা সম্ভব।
টিকাঃ
৪৭. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ১৪৫।
৪৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৩।
৪৯. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস ১৬৫০৯।
৫০. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ফিতান, হাদীস ২৪।
📄 খন্দকের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা
১) মুসলিমদের ব্যাপারে কাফিরদের দ্বিমুখী নীতি: ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইহুদিরা মুশরিকদের চাইতে মুসলিমদের অধিক নিকটবর্তী। সে হিসেবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাথে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু খন্দকের যুদ্ধে তাই হয়েছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখনও এমন ঘটছে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী দলগুলো সত্যের বিরুদ্ধে এক হতে মোটেই দ্বিধা করছে না।
২) কাফিরদের প্রযুক্তি গ্রহণে কোনো বাধা নেই: অনেক মুসলিম কাফিরদের প্রযুক্তিকে তাদের বিশ্বাস-সংস্কৃতির সাথে গুলিয়ে ফেলে। কাফিরদের আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি, লাইফস্টাইল এসব গ্রহণ না করা গেলেও তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বা তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিতে কোনো বাধা নেই। পরিখা খননের যে প্রস্তাব সালমান ফারিসী করেছিলেন সেটি ছিল কাফিরদের প্রযুক্তি। এ ধরনের কৌশলগত ব্যাপার বা কাফিরদের তৈরি প্রযুক্তির ব্যবহার ইসলামে জায়েজ।
৩) সামরিক শক্তি ও জিহাদ: এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা চাই যা সহজলভ্য। খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমরা যোজন-যোজন পিছিয়ে ছিল। কিন্তু তবুও তারা হাল ছাড়েনি। অনেকে মনে করে, আগে কাফিরদের সমপরিমাণ শক্তি ও প্রযুক্তি অর্জন করে তারপর জিহাদে অংশ নেব। সাহাবিরা কিন্তু বিষয়টা এভাবে দেখেননি। তারা তাদের হাতে যে প্রযুক্তি ছিল সেটা দিয়েই লড়ার চেষ্টা করেছেন।
৪) নেতৃত্বে আন্তরিকতা: লোক-দেখানো নেতারা অনেক বড় বড় কথা বলে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ-সামগ্রী বিতরণ করে, পরিদর্শনে বের হয়—তাদের উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। কিন্তু রাসূলুল্লাহর মধ্যে এসব মেকি আচরণ ছিল না। সাহাবিরা যা খেয়েছেন, তিনিও তা-ই খেয়েছেন। তাদের সাথে কাজ ভাগাভাগি করেছেন, কাদামাখা হয়ে গর্ত খুঁড়েছেন। এটা ছিল সত্যিকারের মমতা।
৫) সৈনিকদের দৃঢ়তা ধরে রাখা: বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি চারজনের দল পাঠিয়েছিলেন। তাদের তিনি বলে দিয়েছিলেন বনু কুরাইযা যদি চুক্তিভঙ্গ করে থাকে তবে সেটা যেন জনসমক্ষে না বলে ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহকে জানানো হয়। যখন তিনি খবরটি শুনলেন তখন বললেন, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো।' তিনি চাচ্ছিলেন মুসলিমরা ভেঙে না পড়ুক।
৬) জিহাদ হলো রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ:
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২১)
রাসূলুল্লাহর সুন্নাহর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে কুরআনের এই আয়াতটি সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত হয়। ইবন জারির আত-তাবারীর মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা জিহাদবিমুখদের তিরস্কার করেছেন। এরা জিহাদে অংশ না নিয়ে পেছনে রয়ে যায়, খন্দকের শিবিরে যোগ দেয়নি। ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেন, মুফাসসির আস সুদ্দী বলেছেন এই আয়াতের অর্থ হলো তোমরা রাসূলুল্লাহর সাথে থাকো এবং যুদ্ধ করো। জিহাদের প্রেক্ষাপটেই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজকাল লোকেরা সুন্নাহ নিয়ে প্রচুর কথা বললেও জিহাদের কথা অবজ্ঞা করে। অথচ এই জিহাদ আল্লাহর রাসূলেরই সুন্নাহ।