📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 গাতফানের সাথে চুক্তি ও নুআইমের ঘটনা থেকে শিক্ষা

📄 গাতফানের সাথে চুক্তি ও নুআইমের ঘটনা থেকে শিক্ষা


১) রাসূলুল্লাহ চাচ্ছিলেন গাতফানকে জোট থেকে আলাদা করে দিতে। এটা হিকমাহর পরিচায়ক। কারণ সবার সাথে একসাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যদি শত্রুদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা যায় কিম্বা একটি অংশকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়, তবে সেটাই উত্তম। কেননা তাতে শত্রুকে দুর্বল করে ফেলা যায়।

২) নেতার উচিত তার প্রত্যেকটা সৈনিক এবং উপকরণের উপযুক্ত ব্যবহার করা। সবাইকেই ময়দানের সৈনিক হতে হবে এমন নয়। রাসূল নুআইমের হাতে তরবারি তুলে দেননি। তিনি জানতেন কী কাজে তাঁকে ব্যবহার করা সর্বোত্তম। প্রত্যেককে তার উপযুক্ত কাজে উপযুক্ত পরিবেশে নিয়োগ করা উচিত।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বিতীয় সাহায্যঃ ঝড়ো বাতাস

📄 আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বিতীয় সাহায্যঃ ঝড়ো বাতাস


আল্লাহ আযযা ওয়া জাল প্রথমে মুসলিমদের সাহায্য করেছেন নুআইম ইবন মাসউদের মাধ্যমে। এর পরপরই তিনি পাঠান প্রচণ্ড ঝড়ো ঠান্ডা বাতাস আর ফেরেশতাদের বাহিনী, যা শত্রুদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

"হে মু'মিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিআমতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৯)

এই হিমশীতল হাওয়ায় কুরাইশরা ধ্বংস হয়নি সত্যি, কিন্তু ভয়ানক বাতাসের তোড়ে তাদের মনে একটা ত্রাস সৃষ্টি হয়। ভয়াবহ সেই বাতাস, ভয়ানক সে বাতাসের জোর। তাঁবুর রশি ছিড়ে গেছে, রান্নার পাতিলগুলো উল্টে পড়ে কোথায় উড়ে গেছে। আলো নিভে গেছে, ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে গেছে। সেই সাথে ফেরেশতারা চারপাশ থেকে চিৎকার করে বলে ওঠেন, আল্লাহু আকবার!

সব মিলিয়ে শত্রু শিবিরে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, গোত্রের নেতারা সব চিৎকার করে উঠলো, 'কে আছো! জলদি আসো! আমাকে বাঁচাও! বাঁচাও আমাকে!' প্রচণ্ড ভয়ে তাদের মনে হচ্ছিল তারা বুঝি মারাই যাবে। যুদ্ধ করার মতো মনোবল বা সাহস কিছুই আর অবশিষ্ট থাকলো না।

অদ্ভুত বিষয় হলো, এতকিছু হয়ে গেল অথচ মুসলিমরা কিছু টেরও পায়নি। এই বাতাস শুধু শত্রুশিবিরেই আক্রমণ করেছিল। আল-কুরতুবির মতে, এই বাতাস ছিল নবীজির একটি মু'জিযা।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 জোটবাহিনীর প্রস্থান

📄 জোটবাহিনীর প্রস্থান


অবরোধের ক্লান্তি, হতাশা, কোন্দল আর সবশেষে ঝড়ো বাতাস সব মিলিয়ে কুরাইশরা মানসিকভাবে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা যেন আর কিছুই ভাবতে পারছিল না। রাসূলুল্লাহ তাঁদের অবস্থা ও কৌশল বোঝার জন্য একজন সাহাবিকে শত্রু ক্যাম্পে নজরদারি করার জন্য পাঠাতে চাইলেন। সবাইকে ডেকে বললেন, 'কে আছে যে আমাকে শত্রুর ব্যাপারে তথ্য এনে দেবে? যে এই কাজ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সাথে স্থান দেবেন।'

চারদিকে পিনপতন নীরবতা।
রাসূলুল্লাহ আবার ডাকলেন। কেউ সাড়া দিল না। তারপর আবার।

সাহাবিরা সাধারণত ভালো কাজের সুযোগ পেলেই লুফে নিতেন। আল্লাহর রাসূলের আদেশ মানতে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউই জবাব দিল না। হিমশীতল রাত। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। সারাদিনের ধকলের পর সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। এর মধ্যে শত্রুশিবিরের একেবারে ভেতরে গিয়ে খবর নিয়ে আসার মতো বিপজ্জনক মিশনে যাওয়ার অবস্থা কারোরই নেই।

রাসূলুল্লাহ আর অপেক্ষা করলেন না। তাঁর দক্ষ নজরে বেছে নিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত সৈনিকটিকে। হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামানের নাম ধরে ডেকে বললেন, 'হুযাইফা, তুমি যাও, শত্রুদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে আনো। কিন্তু এমন কিছু করে তাদের উসকে দিও না যাতে করে তারা আমাদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে নেমে পড়ে।'

এতক্ষণ বিষয়টা ছিল ঐচ্ছিক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ যখন সরাসরি আদেশ করলেন, হুযাইফাকে তাই যেতেই হলো। হুযাইফা ছিলেন বুদ্ধিমান, চোখ-কান খোলা, প্রত্যুৎপন্নমতি, পরিস্থিতি চট করে সামাল দিতে সক্ষম। হুযাইফা বের হলেন। বাইরে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, কিন্তু হুযাইফা তার কিছুই টের পেলেন না। সবই আল্লাহর সাহায্য! সেই অন্ধকার রাত্রিতে হুযাইফার অভিজ্ঞতা তাঁর মুখেই শোনা যাক,

'আমি বের হয়ে এলাম, মনে হলো যেন উষ্ণ পানির ওপর হাঁটছি। সুযোগ বুঝে শত্রুদের ক্যাম্পে ঢুকে পড়লাম। গিয়ে দেখি লণ্ডভণ্ড অবস্থা। আবু সুফিয়ান আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে গা গরম করছে। তাকে দেখেই আমি আমার ধনুকে তীর বসিয়ে ফেললাম। তাকে হত্যা করতে যাবো, এমন সময় হঠাৎ মনে পড়ল, আল্লাহ রাসুল তো আমাকে নিষেধ করেছেন যেন উসকানিমূলক কোনো কাজ না করি। এই ভেবে আর কিছু করলাম না। কিন্তু আমি যদি চাইতাম, সেদিনই তাকে হত্যা করতে পারতাম।'

গভীর রাত। ঘুটঘুট অন্ধকার। আবু সুফিয়ানের হঠাৎ সন্দেহ হলো এই অন্ধকারের মাঝে শত্রুপক্ষের কেউ তো চাইলে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে! সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো, 'কুরাইশরা, তোমরা দেখে নাও তোমাদের পাশে কে আছে। সবাই সবার পাশের জনের পরিচয় জেনে নাও।'

হুযাইফা এ কথা শোনার পর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। ঝট করে তাঁর ডান পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অ্যাই, তুমি কে?' উত্তর এল, 'আমি মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান।' ডান পাশের জনকে জিজ্ঞেস করেই সঙ্গে সঙ্গে বাম দিকে ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে?' বাম পাশ থেকে উত্তর এল, 'আমি আমর ইবন আল-আস।' হুযাইফা এত বুদ্ধিমত্তার সাথে পুরো ঘটনা ঘটালেন যে পাশের দুইজন সন্দেহই করলো না হুযাইফা বাইরের কেউ। তারা তাকে কিছু জিজ্ঞেসই করলো না।

'আমি আমার কাজ শেষ করে চলে এলাম। আসার সময় আবারও মনে হলো উষ্ণ পানির ওপর দিয়ে হাঁটছি। রাসূলুল্লাহর কাছে যখন ফিরে গেলাম, তখন বেশ ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। আমি যা যা দেখে এসেছি তা রাসূলুল্লাহকে জানালাম (শত্রুরা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে)। তিনি তখন আমাকে তাঁর শরীর থেকে চাদর খুলে আমাকে জড়িয়ে দিলেন। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো ফজরের সময়ে, আল্লাহর রাসূল আমাকে ডাকছেন, এই যে ঘুমকাতুরে! ওঠো!'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুযাইফার ؓ ইন্টেলিজেন্স অপারেশন থেকে শিক্ষা

📄 হুযাইফার ؓ ইন্টেলিজেন্স অপারেশন থেকে শিক্ষা


১) হুযাইফার শৃঙ্খলাবোধ: হুযাইফা চাইলেই আবু সুফিয়ানকে হত্যা করতে পারতেন।⁴⁶ আবু সুফিয়ান তখন মক্কার নেতা। কিন্তু রাসূলুল্লাহর আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এটা ছিল একটা ইন্টেলিজেন্স অপারেশন, গুপ্তহত্যার অপারেশন নয়। তাই হুযাইফা সুযোগ পেয়েও হত্যা করেননি।

২) আল্লাহর সাহায্য: যতক্ষণ মিশনে ছিলেন, ততক্ষণ তিনি একেবারেই ঠান্ডা অনুভব করেননি। যখন তিনি ফিরে এসেছেন, তখন তাঁর ঠান্ডা লাগতে শুরু করে। এটা ছিল একটা কারামাত।

৩) সাহাবিদের প্রতি রাসূলুল্লাহর স্নেহ: আল্লাহর রাসূল তাঁর সাহাবিদের সাহসিকতা আর আনুগত্যের কদর করতে কখনো ভুলেননি। এই দুঃসাহসী অপারেশন শেষে হুযাইফা ফিরে আসার পর যখন তাঁর ঠান্ডা লাগতে শুরু করে, তখন রাসূলুল্লাহ নিজের শরীর থেকে চাদর খুলে হুযাইফার গায়ে জড়িয়ে দেন। নিজে গিয়ে তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। স্নেহমাখা কণ্ঠে বলেন—এই যে ঘুমকাতুরে! স্বয়ং আল্লাহর রাসূল ঘুম থেকে ডাকতে এসেছেন!

৪) সাহাবিদের শ্রেষ্ঠত্ব: এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটা অনেক পরের, হুযাইফা তখন বৃদ্ধ। কুফার এক লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'আপনি কি রাসূলুল্লাহকে দেখেছেন? আপনি কি তাঁর সাহাবি ছিলেন?' এই লোকটি ছিল তাবেয়িদের একজন, অর্থাৎ সাহাবিদের পরের প্রজন্ম। হুযাইফা বলেন, 'হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখেছি। আমরা তাঁর সাহাবি ছিলাম।' তাবেয়ি তখন জিজ্ঞেস করলেন 'আপনারা তাঁকে কেমন কদর করতেন?' হুযাইফা বললেন, 'তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী। তাঁকে যথাযথ কদর করা খুব কঠিন ছিল। তবুও আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।' সেই তাবেয়ি তখন বললো, 'আল্লাহর শপথ, যদি আমরা তাঁর সময়ে বেঁচে থাকতাম তাহলে আমরা তাঁর পায়ে একটা ধুলোও লাগতে দিতাম না। আমরা তাঁকে মাথায় করে রাখতাম।'

হুযাইফা সেই তরুণ তাবেয়িকে একটা শিক্ষা দেওয়া জরুরি মনে করলেন। তাঁকে শোনালেন খন্দকের সেই রাতের কাহিনী। তিনি তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে মুখে বলা অনেক সহজ, কিন্তু করে দেখানো খুব কঠিন। পরিস্থিতি কতটা কঠিন হলে রাসূলুল্লাহ তিন তিনবার ডাকার পরেও কেউ সাড়া না দিয়ে থাকে! শেষ পর্যন্ত তিনি হুযাইফাকে আদেশ করে এই মিশনে পাঠান।

সাহাবিদের পরবর্তী প্রজন্মকে সাহাবিদের সেই কষ্ট-ত্যাগ-সংগ্রামের কিছুই করতে হয়নি। তাদেরকে সাহাবিদের মতো নিজ বাবা-চাচা-ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়নি। খন্দকের যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। দুনিয়াতে আসার সাথে সাথেই তারা সাহাবিদের মিশনের সুফল উপভোগ করতে শুরু করেছেন। তাই তাদের জন্য এটা বলা খুব সহজ যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে আরও বেশি কদর করতেন। রাসূলুল্লাহর যমানায় জন্ম নিয়ে অনেকেই কাফির হিসেবে মারা গেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে সে ফিতনায় পড়তে হয়নি। সাহাবিদের যুগ ছিল শিরক, মূর্তিপূজা আর জাহিলিয়াতের যুগ। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার সময়ে তাদের ইসলামকে চিনে নিতে হয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম সেসবের কিছুই দেখেনি। তারা জন্মের পর থেকেই ইসলামের শাসন, ন্যায় আর নিরাপত্তা উপভোগ করতে পেরেছে। এ সবই অর্জিত হয়েছে সাহাবিদের রক্ত দিয়ে। কোনো প্রজন্মই সাহাবিদের সমান হতে পারবে না। আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'

টিকাঃ
৪৬. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১২২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية