📄 সংকটের কালো মেঘের ঘনঘটা: মুনাফিকদের পিছুটান
মদীনার উত্তরে দশ হাজার বহিরাগত সৈন্য, আর মদীনার অভ্যন্তরে বনু কুরায়যার বিদ্রোহ। এ পরিস্থিতিতে কী ছিল মুসলিমদের মনের অবস্থা? খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের মনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
"যখন তারা তোমাদের ওপর থেকে, তোমাদের নিচ থেকে তোমাদের ওপর হামলা করার জন্য আসছিল, যখন (ভয়ে) তোমাদের চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে পড়েছিল, প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত, আর (আল্লাহর সাহায্যে বিলম্ব দেখে) তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে। সে সময়ে মু'মিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ১০-১১)
সবার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। চাপের মুখে তাদের মনে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা আসতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে — আল্লাহ যদি আমাদের জয়ী না করেন? ইসলাম কি আসলে সত্য দ্বীন? আল্লাহ কি আসলেই আছেন? কিন্তু এই পরীক্ষা সত্যিকারের মু'মিনদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়।
"যখন মু'মিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখলো, তখন বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২২)
এই কঠিন পরিস্থিতিতে, এই অস্থিরতার মাঝে সত্যিকারের মুসলিমদের ঈমান ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি আনুগত্যবোধ আরও বেড়ে গিয়েছিল। তারা জানতেন এটা আল্লাহ তাআলার একটা পরীক্ষা। তারা ভয় পেয়েছিলেন সত্যি। ভয় পেয়েছিল মুনাফিকরাও, কিন্তু পার্থক্য ছিল তাদের প্রতিক্রিয়ায়। মুনাফিকরা হাল ছেড়ে দিল, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু মু'মিনরা হাল ছাড়লেন না। মু'আত্তাব ইবন কুশাইর নামের এক মুনাফিক তো রাখঢাক না রেখে বলেই বসলো, 'মুহাম্মাদ তো আমাদের কিসরা আর সিজারের ধনদৌলতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আর পরিস্থিতি এখন এমন যে, শান্তিতে পায়খানায় যাওয়ার অবস্থা পর্যন্ত নেই!'
হতাশা, ভীরুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, দোষারোপ ও নিন্দা করা— এগুলো মুনাফিকদের ট্রেডমার্ক। সামান্য বিপদে পড়লে তারা ভেঙে পড়ে, হাল ছেড়ে দেয়। শত্রুদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চায় এবং মুজাহিদদের দোষারোপ করা শুরু করে। সেই যুদ্ধে মুনাফিকদের মনোভাব, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন।
"এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, (আজ শত্রুবাহিনীর সামনে) দাঁড়াবার মতো কোনো জায়গা নেই। কাজেই, তোমরা ফিরে চলো। তাদের একটি অংশ তোমার কাছে এই বলে অনুমতি চাইছিল যে, আমাদের বাড়ি-ঘরগুলো সব অরক্ষিত। অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না, পলায়ন করাই ছিল ওদের ইচ্ছা।
যদি শত্রুপক্ষ চারদিক থেকে শহরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করতো, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করতো এবং তারা মোটেই বিলম্ব করতো না। অথচ এই লোকেরাই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। (তাদের জানা উচিত,) আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন করতে চাও, তবে এ পলায়ন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে।
বলুন! কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন অথবা তোমাদের প্রতি অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যদাতা পাবে না। আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা (অন্যদের যুদ্ধে যেতে) বাধা দেয় এবং তাদের ভাইদের বলে, আমাদের কাছে এসো। ওদের অল্পসংখ্যক লোকই যুদ্ধ করে।
তোমাদের বিজয়ে তারা কুণ্ঠিত বোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। এরপর যখন বিপদ টলে যায় তখন তারা গনিমতের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী শুরু করে। তারা মু'মিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।
(অবরোধ প্রত্যাহার সত্ত্বেও) তারা মনে করে শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রুবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা মরুভূমির বেদুঈনদের সাথে থেকে যেতে পারতো আর সেখানে বসে তোমাদের খবর নিতে পারতো। যদিও ওরা এখনো তোমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু এরা খুব কমই যুদ্ধে অংশ নেয়।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ১৩-২০)
এই আয়াতগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১) দ্বীনের জন্য কষ্ট স্বীকার করতে মুনাফিকরা রাজি থাকে না। কঠিন পরিস্থিতিতে তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে না, বরং তারা আল্লাহ সম্পর্কে উদ্ভট সব কথা বলতে থাকে। কাফিরদের সামান্য চাপে তারা ইসলাম থেকে ছিটকে পড়ে।
২) মুনাফিকরা স্বার্থপর প্রকৃতির হয়। যে সময়টাতে মুসলিমদের এক হয়ে পরস্পরকে সাহায্য করা জরুরি ছিল, সেই সময় মুনাফিকরা নিজেদের গা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মৃত্যুভয়ে অস্থির হয়ে যায়। বিপদের সময় তারা চোখ উল্টে ফেলে। যখন বিপদ কেটে যায় তখন গনিমতের মালের হিসাব করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৩) মৃত্যু নির্ধারিত। সুতরাং এই মৃত্যু থেকে মানুষ পালানোর যত চেষ্টাই করুক না কেন—কোনো লাভ নেই। মুনাফিকরা ভুল জায়গা থেকে সাহায্য আশা করছিল। তারা কাফিরদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন যে, শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে রক্ষা করতে পারেন এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন।
৪) জিহাদে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে মুনাফিকদের অনীহা কাজ করে। মুনাফিকরা চাইছিল মদীনার অদূরে বসে সেখান থেকে সব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে, কিন্তু নিজেরা 'ঝামেলা' থেকে দূরে থাকবে। তারা নিজেরাও জিহাদে অংশ নিচ্ছিল না, অন্যদেরকেও জিহাদে যেতে অনুৎসাহিত করছিল।
📄 একের পর এক আক্রমণ
কুরাইশ ও গাতফানের সামরিক জোট মদীনার ব্যূহ ভেঙে ঢুকে পড়তে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যায়। প্রতি রাতে তারা পরিখার এক মাথা থেকে আরেক মাথা টহল দিয়ে অরক্ষিত জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। একবার খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাঁর ঘোড়সওয়ারি দল নিয়ে পরিখা অতিক্রম করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদেরকে থামিয়ে দেয় উসাইদ ইবন হুদাইরের ২০০ সেনার একটি দল। সেই খণ্ডযুদ্ধে তুফাইল ইবন আন-নুমান শহীদ হন। তাঁকে বর্শা ছুঁড়ে হত্যা করে হামযার হত্যাকারী ওয়াহশি। এই যুদ্ধে হাব্বান ইবন আল-আরিকাহর তীরের আঘাতে সাদ ইবন মুআয আহত হন। হামলা-পাল্টাহামলা-প্রতিরোধ এভাবে কেটে যায় প্রায় বিশটি দিন।
📄 কূটনৈতিক যুদ্ধ
রাসূলুল্লাহ তাঁর শত্রুদের কার কী উদ্দেশ্য তা খুব ভালোই জানতেন। শত্রু বলতে তখন তিনটি ভিন্ন দল। বহিরাগত শত্রু মক্কার কুরাইশ আর গাতফান তো আছেই, সাথে যুক্ত হলো অভ্যন্তরীণ শত্রু ইহুদি গোত্র বনু কুরায়যা।
কুরাইশ আর ইহুদিদের সাথে মুসলিমদের বিরোধ ছিল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিরোধ। তারা নিছক অর্থ-সম্পদের জন্য লড়ছিল না। তারা জানতো মুসলিমদের দমন করতে না পারলে আরবে তাদের আদর্শ, প্রভাব, প্রতিপত্তি সবই বিলীন হয়ে যাবে। তাদের কাছে এটা টাকা-পয়সা থেকেও গুরুতর বিষয়। ইসলামের উত্থান মানে তাদের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে গাতফানের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কীভাবে নিজেদের পকেট ভারী করা যায় সেটাই তাদের একমাত্র চিন্তা। হোক তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিংবা অন্য কারো বিরুদ্ধে। সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হচ্ছিল শত্রুপক্ষের একটি অংশের সাথে চুক্তি করে তাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে এই অবরোধকে দুর্বল করে দেওয়া সহজ হবে। চুক্তির জন্য আল্লাহর রাসূল বেছে নিলেন গাতফান গোত্রকে।
জিহাদ যুদ্ধক্ষেত্রের ইবাদত বটে, কিন্তু কেবল সামরিক শক্তিই সবকিছু নয়। জিহাদকে সফল করতে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক পারদর্শিতা। গাতফানের সাথে চুক্তি করার বিষয়টা আল্লাহর রাসূলের অসাধারণ কূটনৈতিক পারদর্শিতাই প্রমাণ করে।
গাতফানের নেতাদের প্রস্তাব করা হলো, যদি তারা কুরাইশ-ইহুদির সম্মিলিত জোট ভেঙে চলে যায় আর মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করে তাহলে মদীনার এক বছরে যত ফসল হয় তার তিন ভাগের এক ভাগ তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। যুদ্ধ না করেই এতগুলো শস্য পেয়ে যাওয়া কম কথা নয়! তারা অনায়াসে রাজি হয়ে গেল। চুক্তিপত্র লেখা হলো, বাকি থাকলো স্বাক্ষর করে চূড়ান্ত করা।
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে রাসূলুল্লাহ আনসারদের সাথে আলাপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কেননা মদীনার সিংহভাগ ফসলের মালিক ছিল এই আনসাররাই। তিনি আনসারদের দুই নেতা, সাদ ইবন মুআয এবং সাদ ইবন উবাদাহকে গাতফানের সাথে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি জানালেন।
সাদ ইবন মুআয মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। এরপর বললেন,
- হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন এই চুক্তি করতে চান? এটা কি আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নাকি আল্লাহর আদেশ? আল্লাহ তাআলার আদেশ হলে তো মানা অবশ্য কর্তব্য, আর আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা হলেও আমরা মাথা পেতে নেব। তবে আপনি যদি আমাদের ভালোর কথা ভেবে এই চুক্তি করতে চেয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি আছে।
রাসূলুল্লাহ উত্তর দিলেন,
- আমি তোমাদের স্বার্থেই এই চুক্তিটি করতে চাই। আরবরা সবাই তোমাদের বিরুদ্ধে এক হয়েছে, সবদিক থেকে তোমার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এই চুক্তি করা হলে তোমাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আমি মনে করি।
কঠিন এক মুহূর্ত। দীর্ঘ বিশ দিন ধরে শত্রুরা মদীনা অবরোধ করে রেখেছে। মুসলিমরা ক্লান্ত। এ অবস্থায় কতদিন নিজেদের মনোবল ধরে রাখা সম্ভব, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। দশ হাজার সেনাদল যদি মদীনায় ঢুকে পড়ে, হয়তো মৃত্যুই হবে মুসলিমদের পরিণতি। অন্যদিকে এই ধরনের একটা চুক্তিতে নিশ্চিতভাবে মুসলিমরা উপকৃত হবে। তবুও সেই বিপদের ঘনঘটায় অবিচল সাদ দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা একটা সময় মুশরিক ছিলাম। গাতফানরাও মুশরিক। আমরা আল্লাহর ইবাদত করতাম না, মূর্তিপূজা করতাম। আল্লাহ যে কে—সেটাই তখন জানতাম না। সেই (জাহিলিয়াতের) সময়ের কথা বলছি, এই গাতফানের লোকেরা আমাদের কাছ থেকে একটা খেজুর কেড়ে নেবার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। হয় তারা আমাদের অতিথি হিসেবে এসে আমাদের খেজুর খেতে পেরেছে, নয়ত নিজের পয়সা দিয়ে কিনে খেয়েছে। আর আজকে আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলাম দিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন, আমাদের হিদায়াত দিয়েছেন, আপনাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়ে আমাদের সম্মানিত করেছেন -- আজ কি না আমরা আমাদের সম্পত্তি ওদের হাতে তুলে দেবো? এমন চুক্তির আমাদের প্রয়োজন নেই, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম করে বলছি, ওদের আমরা কিচ্ছু দেবো না। ওদের জন্য আমাদের তরবারিগুলো উঁচিয়ে ধরবো -- যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাদের আর ওদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'⁴²
উত্তরে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'ঠিক আছে, তোমরা যা ভালো মনে করো।' সাদ ইবন মুআয তখন রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে চুক্তিপত্রের দলিল নিয়ে লেখাগুলো মুছে ফেললেন। বললেন, 'এবার তারা আমার সাথে লড়াই করুক।'
টিকাঃ
৪২. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২২।
📄 আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম সাহায্য: নুআইম ইবন মাসউদ ؓ
পরিস্থিতির এই পর্যায় পর্যন্ত মুসলিমরা আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখেছে, তাঁর ওপর ভরসা করে এসেছে এবং দ্বীন ইসলামের আদর্শে অটল থেকেছে। ঈমানের পরীক্ষায় মুসলিমরা বিজয়ী হয়েছে, তাই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সাহায্য করবেন। বাহ্যিক বিবেচনায় মুসলিমদের এই যুদ্ধে হেরে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অপ্রত্যাশিতভাবে সাহায্য করেন। তিনি পাঠালেন নুআইম ইবন মাসউদ নামের এক ব্যক্তিকে।
নুআইম ইবন মাসউদ ছিলেন গাতফান গোত্রের। তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। কিন্তু আমার গোত্রের লোকজন তা জানে না। আপনি আমাকে যা খুশি আদেশ করুন।' গাতফান মুসলিমদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুসলিমরা টিকে থাকবে কি না কোনো ঠিক নেই। এমন সময়ে কেউ ইসলাম গ্রহণ করবে ভাবাই যায় না। কিন্তু এটাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ চেয়েছিলেন তাকে আল্লাহর সৈনিক বানাবেন, তাই উপযুক্ত সময়ে তাকে বের করে এনেছেন।
রাসূলুল্লাহ নুআইমকে বললেন, 'তুমি একা একজন মানুষ, যদি আমাদের সেনাদলে যোগ দাও, তাতে পরিস্থিতি খুব বেশি হেরফের হবে না। কাজেই এমন কিছু করো যাতে শত্রুদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। একটা কথা মনে রেখো, যুদ্ধ মানেই ধোঁকা।'
নুআইম ছিলেন বুদ্ধিমান লোক। তিনি জানতেন কে কার আদর্শিক শত্রু এবং কে কার কৌশলগত মিত্র। এই সহজ সমীকরণটি আবিষ্কার করে তিনি প্রথমে বনু কুরাইযার ইহুদিদের কাছে গেলেন। তাদের বললেন,
'দেখো তোমরাও আমাকে এতদিন ধরে চেনো, আমিও তোমাদের চিনি। আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তোমরা ভালো করেই জানো, আমি যদি তোমাদের কোনো উপদেশ দিই, সেটা তোমাদের ভালোর জন্যই। তোমরা আসলে বেশ বড়সড় একটা ভুল করেছ। মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধে নামতে চাচ্ছো, অথচ তোমরা থাকো কিন্তু এই মদীনাতেই। এখানে তোমাদের স্ত্রী-সন্তান আছে, সহায়-সম্পত্তি আছে। কুরাইশ আর গাতফানের অবস্থা কিন্তু তোমাদের মতো না, এটা তাদের দেশ না। তারা পরিবার-পরিজন সব ঠিকঠাক রেখে যুদ্ধে এসেছে। এখন যুদ্ধের সুযোগ পেয়ে যেমন এসেছে, তেমনি অবস্থা বেগতিক দেখলেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফেরত যাবে। তখন তোমাদের কী হবে ভেবেছো? তোমরা থাকবে মুহাম্মাদের হাতের মুঠোয়। তার সঙ্গে লড়ে তোমরা সুবিধা করতে পারবে না। তারচেয়ে বরং তোমাদের একটা বুদ্ধি দিই, শোনো: তোমরা কুরাইশদের নেতাদের থেকে কিছু লোককে বন্ধক হিসেবে তোমাদের কাছে রাখো। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে যুদ্ধ কোরো না। তাদের সাথে তোমরা যে চুক্তি করলে, তার নিশ্চয়তাস্বরূপ তাদের কিছু লোক তোমাদের জিম্মায় থাকুক, যুদ্ধ শেষ হলে তারপর ছেড়ে দেবে।'⁴³
তখনকার দিনে এভাবে কাউকে জিম্মি রাখা অস্বাভাবিক কোনো রীতি ছিল না। তাই বনু কুরায়যা নুআইমকে সন্দেহ করলো না। আর তার কথায় যুক্তিও ছিল, তাই তারা রাজি হয়ে গেল। এরপর নুআইম গেলেন কুরাইশদের কাছে, তাদের বললেন,
'তোমাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব নিয়ে আশা করি নতুন করে কিছু বলতে হবে না। তোমরা তো আমাকে চেনোই। আমি তোমাদের ভালোর জন্যই উপদেশ দেবো, সেটাও তোমরা জানো। আমার কানে একটা খবর এসেছে। তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তোমাদের সেটা জানানো কর্তব্য বলে মনে করি। তোমরা হয়তো টের পাওনি, আমি শুনেছি, মুহাম্মাদের সাথে চুক্তি বাতিল করে ইহুদিরা এখন অনুতপ্ত। তারা তাঁর সাথে আবার পুরোনো চুক্তিতে ফিরে যেতে চায়। তারা যে আসলেই অনুতপ্ত সেটা প্রমাণ করার জন্য তারা মুহাম্মাদের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে এই বলে যে: আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত। এই কাজের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ যদি আমরা কুরাইশ ও গাতফানদের কিছু নেতাকে আপনার হাতে তুলে দিই আর আপনি তাদের হত্যা করতে পারেন -- আপনি কি তাতে খুশি?
মুহাম্মাদ তাদের এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে বলেই জানি। কাজেই ইহুদিরা যদি তোমাদের কাউকে জিম্মি হিসেবে নিয়ে যেতে চায় তাহলে সাবধান! ভুলেও তোমাদের কাউকে তাদের হাতে দিও না।'⁴⁴
এরপর তিনি গাতফান গোত্রের কাছে গিয়ে একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন।
জোটের প্রত্যেকে নুআইমের কথা বিশ্বাস করলো আর তাদের নিজেদের মধ্যে জন্ম নিল অবিশ্বাস। কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে, নুআইম মুসলিম হয়ে এখন আল্লাহর রাসূলের পক্ষে কাজ করছে। এদিকে কুরাইশরাও অস্থির হয়ে ওঠে। তারা যে করেই হোক একটা দফারফা চাচ্ছিল। ইকরিমা ইবন আবু জাহলকে প্রতিনিধি হিসেবে তারা বনু কুরায়যার কাছে পাঠায়। সে বলে, 'দীর্ঘদিন অবরোধ করে আমরা বেশ ক্লান্ত। আমাদের ঘোড়া আর উটগুলো মারা যাচ্ছে। আমরা যুদ্ধের জন্য সরবরাহ চাই। তোমরা প্রস্তুতি নাও। আমরা আজকেই মুহাম্মাদের সাথে চিরতরে বোঝাপড়া করে ফেলি, তাকে খতম করে দিই।' ইহুদিরা বললো, 'আমরা তো শনিবারে যুদ্ধ করি না। আর তোমরা আদৌ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করবে কি না—সেটা নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। তাই জামানতস্বরূপ তোমাদের কিছু লোককে আমাদের কাছে দাও। মুহাম্মাদকে শেষ করা পর্যন্ত তারা আমাদের কাছেই থাকবে।'
ইকরিমা ফিরে এসে আবু সুফিয়ানকে এই খবর জানালে সে বলে, 'আরে! নুআইম তো ঠিক এই কথাটাই আমাদের বলেছিল।' আবু সুফিয়ান বনু কুরায়যার কাছে খবর পাঠায় যে, তারা ইহুদিদের কাছে কোনো কুরাইশিকে জিম্মি রাখবে না। সে কথা শুনে ইহুদিরা বললো, 'নুআইমের কথা দেখছি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে গেল! এই কুরাইশের লোকেরা মোটেও আন্তরিক নয়। বিপদে পড়লে ঠিকই আমাদের ছেড়ে পালাবে। কুরাইশ আর গাতফানকে সাফ জানিয়ে দাও আমাদের হাতে তাদের কাউকে জিম্মি না দিলে আমরা তাদের সাথে নেই।'
নবীজি তখন আল্লাহর কাছে একটা দুআ করেছিলেন,
'হে আল্লাহ, হে কিতাব নাযিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! ঐ সম্মিলিত বাহিনীকে পরাস্ত করে দিন! তাদের পরাজিত করে দিন, তাদের নড়বড়ে করে দিন!'⁴⁵
তাঁর এই দুআ কবুল হয়েছিল, একটি বিশাল সামরিক জোটকে আল্লাহ ভেঙে দিলেন একটি মাত্র মানুষকে ব্যবহার করে—নুআইম ইবন মাসউদ। মুসলিমরা ঈমান, ধৈর্য, অধ্যবসায় আর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহও তাদের সাহায্য করলেন।
টিকাঃ
৪৩. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৭।
৪৪. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৮।
৪৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায় দুআ, হাদীস ৮৭।