📄 বিপদের প্রথম কালো মেঘ: ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতা
পরিখা খনন করে রাখায় সামরিক জোট খুব বেশি সুবিধা করতে পারছিল না। এদিকে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে মুসলিমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মদীনা অবরোধ করে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোটবাহিনীর ছিল না। তাই তারা মদীনার অভ্যন্তরে বনু কুরায়যাকে দিয়ে মদীনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করানোর পরিকল্পনা করে যেন মুসলিমরা ভেতরে-বাহিরে দু'দিকেই বিপদে পড়ে। এ উদ্দেশ্যে বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাব বনু কুরায়যার নেতা কা'ব ইবন আসাদের সাথে দেখা করতে যায়।⁴⁰
হুয়াইকে দেখে তার দুরভিসন্ধির আঁচ করতে পেরে কা'ব দরজা বন্ধ করে দেয়। হুয়াই কড়া নাড়তে নাড়তে বলে,
- কা'ব! তোমার কী হলো! দরজা খোলো!
- তুমি একটা আস্ত অলক্ষুণে লোক! মুহাম্মাদের সাথে আমার চুক্তি আছে। আমি সেই চুক্তি কিছুতেই ভাঙবো না। সে সবসময় ওয়াদা রক্ষা করেছে। কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তুমি আমাকে এসবের মাঝে টেনো না।
- ধেত্তেরি! আগে তুমি দরজা খোলো তো! তোমার সাথে আমার কথা আছে!
- খুলবো না আমি দরজা।
- হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি। তোমার খাবারে আমি ভাগ বসাবো সেই ভয়ে তুমি দরজা খুলছো না।
কথাটা কা'বের খুব গায়ে লাগলো, সে ক্ষেপে গেল। সে দরজা খুলে দিলো। হুয়াই বললো,
- শোনো কা'ব! তোমার জন্য আমি এসেছি বিরল সম্মান আর অতল সাগরের সন্ধান নিয়ে, আর আমার সাথে তুমি এই আচরণ করছো! তুমি কি জানো আমি কুরাইশদের সব নেতৃস্থানীয় লোকদের নিয়ে এসেছি? রুমার স্রোত-সংযোগস্থলে তাদের মোতায়েন করেছি। গাতফানের নেতা আর লোকদেরকেও নিয়ে এসেছি। তারা আছে উহুদের পাদদেশে নাকমা পাহাড়ে। ওরা আমার সাথে অঙ্গীকার করেছে, মুহাম্মাদ ও তার দলবলকে উৎখাত না করে তারা এবার ছাড়বে না।
- তুমি কোনো খুশির খবর আনোনি হুয়াই। তুমি এনেছো আমার লাঞ্ছনা আর অপমানের খবর। তুমি এনেছ এক পানিশূন্য মেঘ, যা শুধু চমকে আর গর্জে, বর্ষে না মোটেও। তুমি আমাকে এর মধ্যে টেনো না, আমি এসবের মাঝে নেই।
কিন্তু হুয়াই তাকে ফুসলাতে লাগলো। একপর্যায়ে কা'ব কিছুটা নরম হলো। কা'বের মনে মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সাহস করতে পারছিল না। কিন্তু হুয়াই এর চাপাচাপিতে সে উৎসাহ বোধ করলো এবং চুক্তিভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিল।
রাসূলুল্লাহ বিষয়টি টের পেলেন। তিনি এই খবরের সত্যতা যাচাই করার জন্য আয-যুবাইর ইবন আওয়্যামকে পাঠান। যুবাইর ফিরে এসে জানান, বনু কুরায়যা তাদের দুর্গগুলো প্রস্তুত করছে, রাস্তাঘাট খালি করছে আর তাদের গবাদিপশু জড়ো করছে। এগুলো ছিল যুদ্ধের প্রস্তুতির লক্ষণ। শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাদ ইবন মুআয, সাদ ইবন উবাদাহ, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এবং খাওয়াত ইবন যুবাইর -- এই চারজন সাহাবিকে খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠান। তাদেরকে বলে দিলেন, 'যদি বনু কুরাইযা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সিদ্ধান্ত নেয় তবে আমাকে তা গোপনে জানাবে। আর যদি তেমন কিছু না হয় তাহলে সবাইকে জানাতে সমস্যা নেই।' এই চারজনের প্রতিনিধি দল বনু কুরায়যার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন তারা যা আশঙ্কা করছিলেন, অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। বনু কুরায়যা বলাবলি করছে, 'মুহাম্মাদ! সে আবার কে! তার সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই!'⁴¹
সাদ ইবন মুআয খুব ক্ষেপে গেলেন। কিন্তু তারা বুঝলেন রাগারাগি করে লাভ নেই, অবস্থা বেগতিক। তারা রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে এসে সালাম দিলেন, আর শুধু দুটো শব্দ বললেন, 'আদুল এবং কাররাহ।'
রাসূলুল্লাহ যা বোঝার বুঝে নিলেন। আদুল এবং কাররাহ হচ্ছে আরবের দুই গোত্র। এরা ইতিপূর্বে মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এ দুটো গোত্রের নাম দিয়ে তারা বুঝিয়েছেন বনু কুরায়যাও এদের পথ ধরেছে। রাসূলুল্লাহ সালামাহ ইবন আসলামের নেতৃত্বে দুইশো এবং যাইদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে তিনশো সৈন্যের দুটো বাহিনী পাঠালেন বনু কুরায়যার এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল বনু কুরায়যাকে ইঙ্গিত দেওয়া: মুসলিমরা মোটেও ভেঙে পড়েনি, বরং তারা লড়াই করতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে জোটের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করতে বনু কুরায়যা ২০টি উট বোঝাই খাদ্যদ্রব্য জোটবাহিনীর কাছে পাঠানোর চেষ্টা করে কিন্তু মুসলিমরা সেগুলো আটক করে।
টিকাঃ
৪০. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২০।
৪১. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২১।
📄 সংকটের কালো মেঘের ঘনঘটা: মুনাফিকদের পিছুটান
মদীনার উত্তরে দশ হাজার বহিরাগত সৈন্য, আর মদীনার অভ্যন্তরে বনু কুরায়যার বিদ্রোহ। এ পরিস্থিতিতে কী ছিল মুসলিমদের মনের অবস্থা? খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের মনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
"যখন তারা তোমাদের ওপর থেকে, তোমাদের নিচ থেকে তোমাদের ওপর হামলা করার জন্য আসছিল, যখন (ভয়ে) তোমাদের চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে পড়েছিল, প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত, আর (আল্লাহর সাহায্যে বিলম্ব দেখে) তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে। সে সময়ে মু'মিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ১০-১১)
সবার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। চাপের মুখে তাদের মনে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা আসতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে — আল্লাহ যদি আমাদের জয়ী না করেন? ইসলাম কি আসলে সত্য দ্বীন? আল্লাহ কি আসলেই আছেন? কিন্তু এই পরীক্ষা সত্যিকারের মু'মিনদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়।
"যখন মু'মিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখলো, তখন বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২২)
এই কঠিন পরিস্থিতিতে, এই অস্থিরতার মাঝে সত্যিকারের মুসলিমদের ঈমান ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি আনুগত্যবোধ আরও বেড়ে গিয়েছিল। তারা জানতেন এটা আল্লাহ তাআলার একটা পরীক্ষা। তারা ভয় পেয়েছিলেন সত্যি। ভয় পেয়েছিল মুনাফিকরাও, কিন্তু পার্থক্য ছিল তাদের প্রতিক্রিয়ায়। মুনাফিকরা হাল ছেড়ে দিল, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু মু'মিনরা হাল ছাড়লেন না। মু'আত্তাব ইবন কুশাইর নামের এক মুনাফিক তো রাখঢাক না রেখে বলেই বসলো, 'মুহাম্মাদ তো আমাদের কিসরা আর সিজারের ধনদৌলতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আর পরিস্থিতি এখন এমন যে, শান্তিতে পায়খানায় যাওয়ার অবস্থা পর্যন্ত নেই!'
হতাশা, ভীরুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, দোষারোপ ও নিন্দা করা— এগুলো মুনাফিকদের ট্রেডমার্ক। সামান্য বিপদে পড়লে তারা ভেঙে পড়ে, হাল ছেড়ে দেয়। শত্রুদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চায় এবং মুজাহিদদের দোষারোপ করা শুরু করে। সেই যুদ্ধে মুনাফিকদের মনোভাব, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন।
"এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, (আজ শত্রুবাহিনীর সামনে) দাঁড়াবার মতো কোনো জায়গা নেই। কাজেই, তোমরা ফিরে চলো। তাদের একটি অংশ তোমার কাছে এই বলে অনুমতি চাইছিল যে, আমাদের বাড়ি-ঘরগুলো সব অরক্ষিত। অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না, পলায়ন করাই ছিল ওদের ইচ্ছা।
যদি শত্রুপক্ষ চারদিক থেকে শহরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করতো, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করতো এবং তারা মোটেই বিলম্ব করতো না। অথচ এই লোকেরাই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। (তাদের জানা উচিত,) আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন করতে চাও, তবে এ পলায়ন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে।
বলুন! কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন অথবা তোমাদের প্রতি অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যদাতা পাবে না। আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা (অন্যদের যুদ্ধে যেতে) বাধা দেয় এবং তাদের ভাইদের বলে, আমাদের কাছে এসো। ওদের অল্পসংখ্যক লোকই যুদ্ধ করে।
তোমাদের বিজয়ে তারা কুণ্ঠিত বোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। এরপর যখন বিপদ টলে যায় তখন তারা গনিমতের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী শুরু করে। তারা মু'মিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।
(অবরোধ প্রত্যাহার সত্ত্বেও) তারা মনে করে শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রুবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা মরুভূমির বেদুঈনদের সাথে থেকে যেতে পারতো আর সেখানে বসে তোমাদের খবর নিতে পারতো। যদিও ওরা এখনো তোমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু এরা খুব কমই যুদ্ধে অংশ নেয়।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ১৩-২০)
এই আয়াতগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১) দ্বীনের জন্য কষ্ট স্বীকার করতে মুনাফিকরা রাজি থাকে না। কঠিন পরিস্থিতিতে তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে না, বরং তারা আল্লাহ সম্পর্কে উদ্ভট সব কথা বলতে থাকে। কাফিরদের সামান্য চাপে তারা ইসলাম থেকে ছিটকে পড়ে।
২) মুনাফিকরা স্বার্থপর প্রকৃতির হয়। যে সময়টাতে মুসলিমদের এক হয়ে পরস্পরকে সাহায্য করা জরুরি ছিল, সেই সময় মুনাফিকরা নিজেদের গা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মৃত্যুভয়ে অস্থির হয়ে যায়। বিপদের সময় তারা চোখ উল্টে ফেলে। যখন বিপদ কেটে যায় তখন গনিমতের মালের হিসাব করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৩) মৃত্যু নির্ধারিত। সুতরাং এই মৃত্যু থেকে মানুষ পালানোর যত চেষ্টাই করুক না কেন—কোনো লাভ নেই। মুনাফিকরা ভুল জায়গা থেকে সাহায্য আশা করছিল। তারা কাফিরদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন যে, শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে রক্ষা করতে পারেন এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন।
৪) জিহাদে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে মুনাফিকদের অনীহা কাজ করে। মুনাফিকরা চাইছিল মদীনার অদূরে বসে সেখান থেকে সব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে, কিন্তু নিজেরা 'ঝামেলা' থেকে দূরে থাকবে। তারা নিজেরাও জিহাদে অংশ নিচ্ছিল না, অন্যদেরকেও জিহাদে যেতে অনুৎসাহিত করছিল।
📄 একের পর এক আক্রমণ
কুরাইশ ও গাতফানের সামরিক জোট মদীনার ব্যূহ ভেঙে ঢুকে পড়তে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যায়। প্রতি রাতে তারা পরিখার এক মাথা থেকে আরেক মাথা টহল দিয়ে অরক্ষিত জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। একবার খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাঁর ঘোড়সওয়ারি দল নিয়ে পরিখা অতিক্রম করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদেরকে থামিয়ে দেয় উসাইদ ইবন হুদাইরের ২০০ সেনার একটি দল। সেই খণ্ডযুদ্ধে তুফাইল ইবন আন-নুমান শহীদ হন। তাঁকে বর্শা ছুঁড়ে হত্যা করে হামযার হত্যাকারী ওয়াহশি। এই যুদ্ধে হাব্বান ইবন আল-আরিকাহর তীরের আঘাতে সাদ ইবন মুআয আহত হন। হামলা-পাল্টাহামলা-প্রতিরোধ এভাবে কেটে যায় প্রায় বিশটি দিন।
📄 কূটনৈতিক যুদ্ধ
রাসূলুল্লাহ তাঁর শত্রুদের কার কী উদ্দেশ্য তা খুব ভালোই জানতেন। শত্রু বলতে তখন তিনটি ভিন্ন দল। বহিরাগত শত্রু মক্কার কুরাইশ আর গাতফান তো আছেই, সাথে যুক্ত হলো অভ্যন্তরীণ শত্রু ইহুদি গোত্র বনু কুরায়যা।
কুরাইশ আর ইহুদিদের সাথে মুসলিমদের বিরোধ ছিল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিরোধ। তারা নিছক অর্থ-সম্পদের জন্য লড়ছিল না। তারা জানতো মুসলিমদের দমন করতে না পারলে আরবে তাদের আদর্শ, প্রভাব, প্রতিপত্তি সবই বিলীন হয়ে যাবে। তাদের কাছে এটা টাকা-পয়সা থেকেও গুরুতর বিষয়। ইসলামের উত্থান মানে তাদের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে গাতফানের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কীভাবে নিজেদের পকেট ভারী করা যায় সেটাই তাদের একমাত্র চিন্তা। হোক তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিংবা অন্য কারো বিরুদ্ধে। সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হচ্ছিল শত্রুপক্ষের একটি অংশের সাথে চুক্তি করে তাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে এই অবরোধকে দুর্বল করে দেওয়া সহজ হবে। চুক্তির জন্য আল্লাহর রাসূল বেছে নিলেন গাতফান গোত্রকে।
জিহাদ যুদ্ধক্ষেত্রের ইবাদত বটে, কিন্তু কেবল সামরিক শক্তিই সবকিছু নয়। জিহাদকে সফল করতে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক পারদর্শিতা। গাতফানের সাথে চুক্তি করার বিষয়টা আল্লাহর রাসূলের অসাধারণ কূটনৈতিক পারদর্শিতাই প্রমাণ করে।
গাতফানের নেতাদের প্রস্তাব করা হলো, যদি তারা কুরাইশ-ইহুদির সম্মিলিত জোট ভেঙে চলে যায় আর মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করে তাহলে মদীনার এক বছরে যত ফসল হয় তার তিন ভাগের এক ভাগ তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। যুদ্ধ না করেই এতগুলো শস্য পেয়ে যাওয়া কম কথা নয়! তারা অনায়াসে রাজি হয়ে গেল। চুক্তিপত্র লেখা হলো, বাকি থাকলো স্বাক্ষর করে চূড়ান্ত করা।
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে রাসূলুল্লাহ আনসারদের সাথে আলাপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কেননা মদীনার সিংহভাগ ফসলের মালিক ছিল এই আনসাররাই। তিনি আনসারদের দুই নেতা, সাদ ইবন মুআয এবং সাদ ইবন উবাদাহকে গাতফানের সাথে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি জানালেন।
সাদ ইবন মুআয মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। এরপর বললেন,
- হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন এই চুক্তি করতে চান? এটা কি আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নাকি আল্লাহর আদেশ? আল্লাহ তাআলার আদেশ হলে তো মানা অবশ্য কর্তব্য, আর আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা হলেও আমরা মাথা পেতে নেব। তবে আপনি যদি আমাদের ভালোর কথা ভেবে এই চুক্তি করতে চেয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি আছে।
রাসূলুল্লাহ উত্তর দিলেন,
- আমি তোমাদের স্বার্থেই এই চুক্তিটি করতে চাই। আরবরা সবাই তোমাদের বিরুদ্ধে এক হয়েছে, সবদিক থেকে তোমার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এই চুক্তি করা হলে তোমাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আমি মনে করি।
কঠিন এক মুহূর্ত। দীর্ঘ বিশ দিন ধরে শত্রুরা মদীনা অবরোধ করে রেখেছে। মুসলিমরা ক্লান্ত। এ অবস্থায় কতদিন নিজেদের মনোবল ধরে রাখা সম্ভব, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। দশ হাজার সেনাদল যদি মদীনায় ঢুকে পড়ে, হয়তো মৃত্যুই হবে মুসলিমদের পরিণতি। অন্যদিকে এই ধরনের একটা চুক্তিতে নিশ্চিতভাবে মুসলিমরা উপকৃত হবে। তবুও সেই বিপদের ঘনঘটায় অবিচল সাদ দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা একটা সময় মুশরিক ছিলাম। গাতফানরাও মুশরিক। আমরা আল্লাহর ইবাদত করতাম না, মূর্তিপূজা করতাম। আল্লাহ যে কে—সেটাই তখন জানতাম না। সেই (জাহিলিয়াতের) সময়ের কথা বলছি, এই গাতফানের লোকেরা আমাদের কাছ থেকে একটা খেজুর কেড়ে নেবার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। হয় তারা আমাদের অতিথি হিসেবে এসে আমাদের খেজুর খেতে পেরেছে, নয়ত নিজের পয়সা দিয়ে কিনে খেয়েছে। আর আজকে আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলাম দিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন, আমাদের হিদায়াত দিয়েছেন, আপনাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়ে আমাদের সম্মানিত করেছেন -- আজ কি না আমরা আমাদের সম্পত্তি ওদের হাতে তুলে দেবো? এমন চুক্তির আমাদের প্রয়োজন নেই, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম করে বলছি, ওদের আমরা কিচ্ছু দেবো না। ওদের জন্য আমাদের তরবারিগুলো উঁচিয়ে ধরবো -- যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাদের আর ওদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'⁴²
উত্তরে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'ঠিক আছে, তোমরা যা ভালো মনে করো।' সাদ ইবন মুআয তখন রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে চুক্তিপত্রের দলিল নিয়ে লেখাগুলো মুছে ফেললেন। বললেন, 'এবার তারা আমার সাথে লড়াই করুক।'
টিকাঃ
৪২. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২২।