📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 পরিখা খনন

📄 পরিখা খনন


পরিখা খনন শুরুর আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাদের বনু হারিসার দুর্গে পাঠিয়ে দেন যেন তারা নিরাপদে থাকে। এরপর শুরু হলো পরিখা খনন। পরিখা খনন যেমন-তেমন কাজ না, কঠিন কাজ! আর সীমিত লোকবল নিয়ে এই কাজ করা তো রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। মানুষজন উত্তেজিত, উদভ্রান্ত। এমন সংকটের মুহূর্তে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চাওয়া সহজ নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহর অসাধারণ ব্যবস্থাপনায় পরিখা খননের কাজটি সহজ হয়ে গেল। সাহাবিদেরকে দশ জনের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দিলেন। প্রতিটি দলের ওপর দায়িত্ব ছিল চল্লিশ হাত খনন করা। এভাবে করে পুরো উত্তর দিকজুড়ে নিয়োজিত হলো সাহাবিদের অনেকগুলো দল। খননের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারলে এই পরিখাই মদীনাকে দেবে সুদৃঢ় নিরাপত্তা।

খননের কাজ শুরু হলো খুব প্রতিকূল আবহাওয়ায়। প্রচণ্ড শীত, কনকনে বাতাস। এরই মাঝে চলছে ঠুকঠুক করে মাটি খনন। রাসূলুল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো জায়গা থেকে সরার অনুমতি নেই। নয় জন মাটি কাটে, এক জন পাহারা দেয়। এভাবে পালাবদল করে কাজ চলতে থাকে। মাটি কাটার জন্য কোনো যন্ত্র নেই, নেই অত্যাধুনিক কোনো ব্যবস্থা। নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে সেগুলোকে বহন করে নিয়ে যেতে হচ্ছে। শারীরিক কষ্ট তো আছেই, তার ওপর যোগ হয়েছে প্রচণ্ড মানসিক চাপ আর শঙ্কা। যেকোনো মুহূর্তে শত্রুরা চলে আসতে পারে।

নেতা ও সামরিক কমান্ডাররা সাধারণত পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা আর নির্দেশ প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ নেতার আসনে বসে থাকেননি। নিজেই নেমে পড়লেন পরিখা খননে। পৃথিবীর কজন নেতা অনুসারীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছোটখাটো কাজ করে? রাসূলুল্লাহ করেছিলেন। সারা বিশ্বের নেতা হয়ে তিনি মাটি কেটেছেন। তাঁর চোখ-মুখ-গা ধুলোয় ধূসরিত হয়েছে।

শুধু গায়ের জোরে কতক্ষণ টেকা যায়? কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ চালাতে হলে চাই প্রচণ্ড মনোবল, তীব্র উৎসাহ আর উদ্দীপনা। রাসূলুল্লাহ পুরো সময়টা জুড়ে সাহাবিদের মনোবল চাঙ্গা রাখেন। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা কবিতা আবৃত্তি শুরু করেন। আনাস ইবন মালিক সেদিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

'আনসার ও মুহাজিরগণ একদিন ভোরে তীব্র শীতের মধ্যে পরিখা খনন করছিলেন। তাদের কোনো ক্রীতদাস ছিল না, যাদেরকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে নেবেন। রাসূলুল্লাহ বের হয়ে পরিখা খননের স্থানে উপস্থিত হলেন। সাহাবিদের ক্ষুধায় ক্লিষ্টতা ও কষ্ট দেখে বললেন, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আখিরাতের সুখই প্রকৃত সুখ। তুমি আনসার আর মুহাজিরদেরকে ক্ষমা করে দাও।

সাহাবিরা উত্তরে বললেন, আমরা তো সব বাইয়াত করেছি মুহাম্মাদের হাতে, জিহাদ করবো, লড়ে যাব, দেহে যতদিন প্রাণ থাকে।

সে সময় সাহাবিদের খাবার হিসেবে বরাদ্দ ছিল এক মুঠো যব। বাসি চর্বিতে মিশিয়ে সেই যব রান্না করা হতো। বড় বিস্বাদ সে খাবার, বড় দুর্গন্ধময়।'³⁹

নেতৃত্বের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত সেদিন রচিত হলো। আল্লাহর রাসূল কবিতা পড়ছেন, সাহাবিরাও সমবেত কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করে পরস্পরকে অনুপ্রাণিত করছে। এভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিখা খননের কাজ সহজ হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা এই আন্তরিক মানুষগুলোর ব্যাপারে আয়াত নাযিল করলেন,

"মু'মিন তো তারাই, যারা আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলের সাথে কোনো সমষ্টিগত কাজে শরীক হলে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ না করে চলে যায় না। যারা আপনার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। অতএব তারা আপনার কাছে তাদের কোনো কাজের জন্যে অনুমতি চাইলে আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।" (সূরা নূর, ২৪: ৬২)

জিহাদ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মু'মিন ও মুনাফিকদের আচরণে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। জিহাদের ব্যাপারে মুনাফিকদের কখনোই মু'মিনদের মতো উৎসাহ থাকবে না। খন্দকের যুদ্ধে জরুরি প্রয়োজনে মু'মিনরা রাসূলুল্লাহর অনুমতি নিয়ে কাজ থেকে বিরতি নিতেন। প্রয়োজন মেটাতে শহরের ভেতরে যেতেন এবং দ্রুত চলে আসতেন। অন্যদিকে মুনাফিকরা ছোটখাটো অজুহাত দিয়ে কাজে ফাঁকি দিতে থাকে। এমনকি অনুমতি না নিয়েই ভেতরে চলে যায়। আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,

"রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরকে আহবানের মতো গণ্য করো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” (সূরা নিসা, ২৪: ৬৩)

সাহাবিরা পরিখা খননের কাজ শেষ করলেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার কাছে চলে আসে। পরিখা দেখে তারা হতচকিত হয়ে যায়। তারা এরকম কিছু আশাই করেনি! তারা ভাবছিল দশ হাজার সৈন্য নিয়ে হামলা চালিয়ে খুব সহজে মদীনা দখল করে ফেলবে। তাদের মনোবলে কিছুটা ভাটা পড়ে গেল। কেননা তারা এসেছিল সর্বাত্মক হামলার প্রস্তুতি নিয়ে। মদীনাকে অবরোধ করে রাখা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ৬৪ মাঘাজি, হাদীস ১৪৪।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দ্বন্দ্বযুদ্ধ: আলী ؓ বনাম আমর ইবন আবদ আল-উদ

📄 দ্বন্দ্বযুদ্ধ: আলী ؓ বনাম আমর ইবন আবদ আল-উদ


খন্দকের যুদ্ধে বদর বা উহুদের মতো মুখোমুখি যুদ্ধ হয়নি, কিন্তু অনেকগুলো ছোট ছোট খণ্ডযুদ্ধ হয়। জোট বাহিনী বিভিন্নভাবে মদীনায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা চালায়, কিন্তু সেটা তারা করতে পারেনি।

আমর ইবন আব্দ আল-উদ ছিল কুরাইশদের এক জনপ্রিয় বীরযোদ্ধা। সে মুসলিমদের উদ্দেশ্যে দ্বৈতযুদ্ধের জন্য চ্যালেঞ্জ করে, 'কে আছে আমার সাথে লড়বে?'

আলী এগিয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'আমি যেতে চাই আল্লাহর রাসূল।'

রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি যেও না। ও হলো আমর ইবন আব্দ আল-উদ।' আমর ছিল বেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, তাই রাসূলুল্লাহ আলীকে নিরুৎসাহিত করলেন।

আমর তখন টিটকারি মেরে বলে উঠলো, 'কী হলো! তোমাদের কি একজনও নেই? কোথায় তোমাদের সেই জান্নাত যেখানে তোমরা শহীদ হলে যেতে পারবে?'

আলী আবার উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ না করলেন। আমর তৃতীয়বার চ্যালেঞ্জ জানালে আলী আবার অনুমতি চান। রাসূলুল্লাহ বললেন,
- আলী! বোঝার চেষ্টা করো। এটা হচ্ছে আমর ইবন আব্দ আল-উদ!
- হোক, তবুও আমি লড়বো।

এরপর রাসূলুল্লাহর অনুমতি পেয়ে আলী এগিয়ে গেলেন দ্বৈতযুদ্ধে। আমর আলীকে জিজ্ঞেস করলো,
- কে তুমি?
- আমি আলী।
- আবদ মানাফের ছেলে আলী?
- না, আমি আবু তালিবের ছেলে আলী।
- দেখো, ভাতিজা, তোমার চাচাগোছের কেউ নেই লড়াই করার জন্য? তোমার রক্ত ঝরানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
- কিন্তু আমার আছে! আল্লাহর কসম করে বলছি!

আমর ক্ষেপে গিয়ে আলীর বর্মে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করলো। সেই আঘাতে বর্ম ভেঙে আলী মাথায় আঘাত পেয়ে যান। আমরের তলোয়ার আলীর বর্মে আটকে যায়। আলী তখন আমরের ঘাড়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিপদের প্রথম কালো মেঘ: ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতা

📄 বিপদের প্রথম কালো মেঘ: ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতা


পরিখা খনন করে রাখায় সামরিক জোট খুব বেশি সুবিধা করতে পারছিল না। এদিকে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে মুসলিমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মদীনা অবরোধ করে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোটবাহিনীর ছিল না। তাই তারা মদীনার অভ্যন্তরে বনু কুরায়যাকে দিয়ে মদীনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করানোর পরিকল্পনা করে যেন মুসলিমরা ভেতরে-বাহিরে দু'দিকেই বিপদে পড়ে। এ উদ্দেশ্যে বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাব বনু কুরায়যার নেতা কা'ব ইবন আসাদের সাথে দেখা করতে যায়।⁴⁰

হুয়াইকে দেখে তার দুরভিসন্ধির আঁচ করতে পেরে কা'ব দরজা বন্ধ করে দেয়। হুয়াই কড়া নাড়তে নাড়তে বলে,
- কা'ব! তোমার কী হলো! দরজা খোলো!
- তুমি একটা আস্ত অলক্ষুণে লোক! মুহাম্মাদের সাথে আমার চুক্তি আছে। আমি সেই চুক্তি কিছুতেই ভাঙবো না। সে সবসময় ওয়াদা রক্ষা করেছে। কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তুমি আমাকে এসবের মাঝে টেনো না।
- ধেত্তেরি! আগে তুমি দরজা খোলো তো! তোমার সাথে আমার কথা আছে!
- খুলবো না আমি দরজা।
- হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি। তোমার খাবারে আমি ভাগ বসাবো সেই ভয়ে তুমি দরজা খুলছো না।

কথাটা কা'বের খুব গায়ে লাগলো, সে ক্ষেপে গেল। সে দরজা খুলে দিলো। হুয়াই বললো,
- শোনো কা'ব! তোমার জন্য আমি এসেছি বিরল সম্মান আর অতল সাগরের সন্ধান নিয়ে, আর আমার সাথে তুমি এই আচরণ করছো! তুমি কি জানো আমি কুরাইশদের সব নেতৃস্থানীয় লোকদের নিয়ে এসেছি? রুমার স্রোত-সংযোগস্থলে তাদের মোতায়েন করেছি। গাতফানের নেতা আর লোকদেরকেও নিয়ে এসেছি। তারা আছে উহুদের পাদদেশে নাকমা পাহাড়ে। ওরা আমার সাথে অঙ্গীকার করেছে, মুহাম্মাদ ও তার দলবলকে উৎখাত না করে তারা এবার ছাড়বে না।
- তুমি কোনো খুশির খবর আনোনি হুয়াই। তুমি এনেছো আমার লাঞ্ছনা আর অপমানের খবর। তুমি এনেছ এক পানিশূন্য মেঘ, যা শুধু চমকে আর গর্জে, বর্ষে না মোটেও। তুমি আমাকে এর মধ্যে টেনো না, আমি এসবের মাঝে নেই।

কিন্তু হুয়াই তাকে ফুসলাতে লাগলো। একপর্যায়ে কা'ব কিছুটা নরম হলো। কা'বের মনে মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সাহস করতে পারছিল না। কিন্তু হুয়াই এর চাপাচাপিতে সে উৎসাহ বোধ করলো এবং চুক্তিভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিল।

রাসূলুল্লাহ বিষয়টি টের পেলেন। তিনি এই খবরের সত্যতা যাচাই করার জন্য আয-যুবাইর ইবন আওয়্যামকে পাঠান। যুবাইর ফিরে এসে জানান, বনু কুরায়যা তাদের দুর্গগুলো প্রস্তুত করছে, রাস্তাঘাট খালি করছে আর তাদের গবাদিপশু জড়ো করছে। এগুলো ছিল যুদ্ধের প্রস্তুতির লক্ষণ। শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাদ ইবন মুআয, সাদ ইবন উবাদাহ, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এবং খাওয়াত ইবন যুবাইর -- এই চারজন সাহাবিকে খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠান। তাদেরকে বলে দিলেন, 'যদি বনু কুরাইযা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সিদ্ধান্ত নেয় তবে আমাকে তা গোপনে জানাবে। আর যদি তেমন কিছু না হয় তাহলে সবাইকে জানাতে সমস্যা নেই।' এই চারজনের প্রতিনিধি দল বনু কুরায়যার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন তারা যা আশঙ্কা করছিলেন, অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। বনু কুরায়যা বলাবলি করছে, 'মুহাম্মাদ! সে আবার কে! তার সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই!'⁴¹

সাদ ইবন মুআয খুব ক্ষেপে গেলেন। কিন্তু তারা বুঝলেন রাগারাগি করে লাভ নেই, অবস্থা বেগতিক। তারা রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে এসে সালাম দিলেন, আর শুধু দুটো শব্দ বললেন, 'আদুল এবং কাররাহ।'

রাসূলুল্লাহ যা বোঝার বুঝে নিলেন। আদুল এবং কাররাহ হচ্ছে আরবের দুই গোত্র। এরা ইতিপূর্বে মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এ দুটো গোত্রের নাম দিয়ে তারা বুঝিয়েছেন বনু কুরায়যাও এদের পথ ধরেছে। রাসূলুল্লাহ সালামাহ ইবন আসলামের নেতৃত্বে দুইশো এবং যাইদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে তিনশো সৈন্যের দুটো বাহিনী পাঠালেন বনু কুরায়যার এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল বনু কুরায়যাকে ইঙ্গিত দেওয়া: মুসলিমরা মোটেও ভেঙে পড়েনি, বরং তারা লড়াই করতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে জোটের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করতে বনু কুরায়যা ২০টি উট বোঝাই খাদ্যদ্রব্য জোটবাহিনীর কাছে পাঠানোর চেষ্টা করে কিন্তু মুসলিমরা সেগুলো আটক করে।

টিকাঃ
৪০. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২০।
৪১. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সংকটের কালো মেঘের ঘনঘটা: মুনাফিকদের পিছুটান

📄 সংকটের কালো মেঘের ঘনঘটা: মুনাফিকদের পিছুটান


মদীনার উত্তরে দশ হাজার বহিরাগত সৈন্য, আর মদীনার অভ্যন্তরে বনু কুরায়যার বিদ্রোহ। এ পরিস্থিতিতে কী ছিল মুসলিমদের মনের অবস্থা? খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের মনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।

"যখন তারা তোমাদের ওপর থেকে, তোমাদের নিচ থেকে তোমাদের ওপর হামলা করার জন্য আসছিল, যখন (ভয়ে) তোমাদের চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে পড়েছিল, প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত, আর (আল্লাহর সাহায্যে বিলম্ব দেখে) তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে। সে সময়ে মু'মিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ১০-১১)

সবার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। চাপের মুখে তাদের মনে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা আসতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে — আল্লাহ যদি আমাদের জয়ী না করেন? ইসলাম কি আসলে সত্য দ্বীন? আল্লাহ কি আসলেই আছেন? কিন্তু এই পরীক্ষা সত্যিকারের মু'মিনদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়।

"যখন মু'মিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখলো, তখন বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২২)

এই কঠিন পরিস্থিতিতে, এই অস্থিরতার মাঝে সত্যিকারের মুসলিমদের ঈমান ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি আনুগত্যবোধ আরও বেড়ে গিয়েছিল। তারা জানতেন এটা আল্লাহ তাআলার একটা পরীক্ষা। তারা ভয় পেয়েছিলেন সত্যি। ভয় পেয়েছিল মুনাফিকরাও, কিন্তু পার্থক্য ছিল তাদের প্রতিক্রিয়ায়। মুনাফিকরা হাল ছেড়ে দিল, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু মু'মিনরা হাল ছাড়লেন না। মু'আত্তাব ইবন কুশাইর নামের এক মুনাফিক তো রাখঢাক না রেখে বলেই বসলো, 'মুহাম্মাদ তো আমাদের কিসরা আর সিজারের ধনদৌলতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আর পরিস্থিতি এখন এমন যে, শান্তিতে পায়খানায় যাওয়ার অবস্থা পর্যন্ত নেই!'

হতাশা, ভীরুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, দোষারোপ ও নিন্দা করা— এগুলো মুনাফিকদের ট্রেডমার্ক। সামান্য বিপদে পড়লে তারা ভেঙে পড়ে, হাল ছেড়ে দেয়। শত্রুদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চায় এবং মুজাহিদদের দোষারোপ করা শুরু করে। সেই যুদ্ধে মুনাফিকদের মনোভাব, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন।

"এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, (আজ শত্রুবাহিনীর সামনে) দাঁড়াবার মতো কোনো জায়গা নেই। কাজেই, তোমরা ফিরে চলো। তাদের একটি অংশ তোমার কাছে এই বলে অনুমতি চাইছিল যে, আমাদের বাড়ি-ঘরগুলো সব অরক্ষিত। অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না, পলায়ন করাই ছিল ওদের ইচ্ছা।

যদি শত্রুপক্ষ চারদিক থেকে শহরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করতো, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করতো এবং তারা মোটেই বিলম্ব করতো না। অথচ এই লোকেরাই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। (তাদের জানা উচিত,) আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন করতে চাও, তবে এ পলায়ন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে।

বলুন! কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন অথবা তোমাদের প্রতি অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যদাতা পাবে না। আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা (অন্যদের যুদ্ধে যেতে) বাধা দেয় এবং তাদের ভাইদের বলে, আমাদের কাছে এসো। ওদের অল্পসংখ্যক লোকই যুদ্ধ করে।

তোমাদের বিজয়ে তারা কুণ্ঠিত বোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। এরপর যখন বিপদ টলে যায় তখন তারা গনিমতের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী শুরু করে। তারা মু'মিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।

(অবরোধ প্রত্যাহার সত্ত্বেও) তারা মনে করে শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রুবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা মরুভূমির বেদুঈনদের সাথে থেকে যেতে পারতো আর সেখানে বসে তোমাদের খবর নিতে পারতো। যদিও ওরা এখনো তোমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু এরা খুব কমই যুদ্ধে অংশ নেয়।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ১৩-২০)

এই আয়াতগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১) দ্বীনের জন্য কষ্ট স্বীকার করতে মুনাফিকরা রাজি থাকে না। কঠিন পরিস্থিতিতে তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে না, বরং তারা আল্লাহ সম্পর্কে উদ্ভট সব কথা বলতে থাকে। কাফিরদের সামান্য চাপে তারা ইসলাম থেকে ছিটকে পড়ে।
২) মুনাফিকরা স্বার্থপর প্রকৃতির হয়। যে সময়টাতে মুসলিমদের এক হয়ে পরস্পরকে সাহায্য করা জরুরি ছিল, সেই সময় মুনাফিকরা নিজেদের গা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মৃত্যুভয়ে অস্থির হয়ে যায়। বিপদের সময় তারা চোখ উল্টে ফেলে। যখন বিপদ কেটে যায় তখন গনিমতের মালের হিসাব করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৩) মৃত্যু নির্ধারিত। সুতরাং এই মৃত্যু থেকে মানুষ পালানোর যত চেষ্টাই করুক না কেন—কোনো লাভ নেই। মুনাফিকরা ভুল জায়গা থেকে সাহায্য আশা করছিল। তারা কাফিরদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন যে, শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে রক্ষা করতে পারেন এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন।
৪) জিহাদে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে মুনাফিকদের অনীহা কাজ করে। মুনাফিকরা চাইছিল মদীনার অদূরে বসে সেখান থেকে সব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে, কিন্তু নিজেরা 'ঝামেলা' থেকে দূরে থাকবে। তারা নিজেরাও জিহাদে অংশ নিচ্ছিল না, অন্যদেরকেও জিহাদে যেতে অনুৎসাহিত করছিল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px