📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ সাথে জুয়াইরিয়্যাহর ؓ বিয়ে

📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ সাথে জুয়াইরিয়্যাহর ؓ বিয়ে


জুয়াইরিয়‍্যাহ ছিলেন বনু মুস্তালিকের গোত্রনেতা আল হারিসের মেয়ে। তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহর বিয়ে নিয়ে প্রবল ঈর্ষা আর দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন মা আইশা। মজার এই ঘটনাটি তাঁর মুখেই শোনা যাক:

'যখন আল্লাহর রাসূল বনু মুস্তালিকের বন্দী নারী ও শিশুদের বণ্টন করে দিলেন, তখন জুয়াইরিয়‍্যাহ পড়লেন সাবিত ইবন কাইসের ভাগে। তিনি সাবিতের সাথে মাকাতুবা (দাসমুক্তির চুক্তি) করলেন। জুয়াইরিয়‍্যাহ দেখতে ছিলেন খুবই মিষ্টি, আর অসম্ভব সুন্দরী! এতটাই সুন্দরী যে, যে-ই তাঁকে দেখবে, সে-ই তাঁর প্রেমে পড়ে যাবে! তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে দাসমুক্তির অর্থ পরিশোধে সাহায্য চাইলেন। আল্লাহর কসম! আমি যখন তাঁকে আমার দরজায় দেখলাম, (প্রচণ্ড ঈর্ষার কারণে) তাঁকে আমার একটুও ভালো লাগেনি। আমি জানতাম, যে রূপ আমি তাঁর মধ্যে দেখছি, তা আল্লাহর রাসূলের চোখ এড়াবে না।

জুয়াইরিয়‍্যাহ আসলেন, সরাসরি রাসূলুল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল-হারিসের মেয়ে জুয়াইরিয়‍্যাহ, আমার বাবা গোত্রের নেতা। আর এখন আমি হয়েছি সাবিতের দাসী। আমার কেমন লাগছে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমি নিজেকে মুক্ত করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। আপনি আমাকে চুক্তির অর্থ পরিশোধে সাহায্য করুন! আল্লাহর রাসূল বললেন,
- আচ্ছা, তোমাকে যদি এর থেকেও ভালো কিছু দেওয়া হয়?
- সেটি কী?
- আমি তোমার মুক্তিপণ পরিশোধ করবো আর তোমাকে বিয়ে করে নেব।
- হে আল্লাহর রাসূল, আমি অবশ্যই তা কবুল করবো।

রাসূলুল্লাহ জুয়াইরিয়‍্যাহকে বিয়ে করে নিলেন। সবাই তখন বলতে লাগলো, আরে! এরা তো রাসূলুল্লাহর শ্বশুরবাড়ির লোকজন, এদেরকে আমরা কী করে দাস বানিয়ে রাখি। তাই তারা তাদের ভাগের সকল বন্দীকে মুক্ত করে দিল। জুয়াইরিয়‍্যাহর মতো আর কেউ নিজ গোত্রের জন্য এত বরকত বয়ে এনেছে বলে আমাদের জানা নেই। এই এক নারীর কারণে বনু মুস্তালিকের একশো পরিবার আজাদ হয়ে যায়।'

এই ঘটনার পর বনু মুস্তালিক গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিজীবনে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তে পাল্টে যায় হাজারো মানুষের ভাগ্য।

টিকাঃ
৩২. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় দাসমুক্তি, হাদীস ৬।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুরাইসী থেকে ফেরার পথে: অনৈক্য তৈরির অপচেষ্টা

📄 মুরাইসী থেকে ফেরার পথে: অনৈক্য তৈরির অপচেষ্টা


উমার ইবন খাত্তাবের একজন মুহাজির কাজের লোক ছিলেন। একদিন এক আনসারী সাহাবির সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। বিষয়টা হাতাহাতির দিকে গড়ায়। আনসারী সাহাবি চিৎকার দিয়ে উঠলেন, 'আনসাররা সব কোথায়? সাহায্য করো আমায়!' মুহাজির সাহাবিও তখন চিৎকার দিয়ে মুহাজিরদের কাছে সাহায্য চাইতে লাগলেন। খবর কানে পৌঁছামাত্র রাসূলুল্লাহ ছুটে এলেন, 'কী হচ্ছে এসব! আমি তোমাদের মাঝে এখনো বেঁচে আছি, এখনই তোমরা জাহিলিয়াতের ডাক দিচ্ছ? ছাড়ো এসব!' তিনি দ্রুত তাঁদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে বিষয়টি শান্ত করে ফেলেন। এই ঘটনা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কানে পৌঁছলে তার প্রতিক্রিয়া হয় দেখার মতো। সে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তরুণ সাহাবি যাইদ ইবন আরকাম। তিনি ছিলেন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন:

'আমি আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে বলতে শুনলাম,
কী! মুহাজিররা এই কাজ করেছে! এরা আমাদের দেশে এসে, আমাদের খেয়ে-পরে আমাদের ওপর জারিজুরি ফলাচ্ছে! এই কুরাইশগুলোকে দেখলে আমার একটি কথাই শুধু মনে পড়ে -- দুধ কলা দিয়ে সাপ পোষো, আর সেই সাপই তোমাকে একদিন দংশন করবে! আল্লাহর কসম করে বলছি, মদীনায় গেলে আমাদের সম্মানী লোকেরা এই নিকৃষ্ট লোকগুলোকে বের করে দেবে। এই আপদ তো তোমরাই ডেকে এনেছো, নিজেদের শহরে জায়গা দিয়েছ, ধনসম্পদ ভাগাভাগি করেছো। খবরদার! মুহাজিরদের পেছনে আর টাকা নষ্ট কোরো না, তারা নিজেরাই অন্যত্র ভেগে যাবে।

আমি কথাগুলো চাচাকে জানালাম, চাচা রাসূলুল্লাহকে জানালেন। রাসূলুল্লাহ আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের মুখে যা যা শুনেছি বললাম। রাসূলুল্লাহ এরপর ইবন উবাই আর তার সঙ্গীদের তলব করলেন। তারা মুখের ওপর সবকিছু অস্বীকার করলো। রাসূলুল্লাহ তাদের কথা বিশ্বাস করলেন, কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। এটা দেখে আমার যে কী কষ্ট হলো, জীবনে এত কষ্ট আমি কখনো পাইনি। এরপর কুরআনে আয়াত নাযিল হলো:

"মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” (সূরা মুনাফিকুন, ৬৩: ১)

রাসূলুল্লাহ এরপর খবর পাঠালেন, আমাকে এই আয়াত শুনিয়ে বললেন, যাইদ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে বিশ্বাস করেছেন।'

এই ঘটনার পর যাইদের কান ধরে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এটা হলো সেই কান যে কানকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন!' মুনাফিকদের সমালোচনায় আল্লাহ তাআলা বলেন,

"ওরা এমন লোক যারা বলে, আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের জন্য কিছু ব্যয় করো না, তাহলে ওরা সরে পড়বে। প্রকৃতপক্ষে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর ধনভাণ্ডার সমূহ তো আল্লাহরই কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না। ওরা বলে, আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে সেখান থেকে আমরা হীন তুচ্ছদের/দুর্বলদের (মুসলমানদের) বহিষ্কৃত করবোই। কিন্তু প্রকৃত শক্তি যে কেবল আল্লাহরই, তাঁর রাসূলের ও বিশ্বাসীদের। তবে মুনাফিকরা তা জানে না। (সূরা মুনাফিকুন, ৬৩: ৭-৮)

শিক্ষা:
১) ভালো কাজে ব্যস্ত থাকা। এই ঘটনার পর নবীজি তাঁর সৈন্যদের প্রায় দু'দিন ধরে টানা মার্চ করান। তারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। দুদিন আগে কী ঘটেছে সেটা নিয়ে চিন্তা করার কোনো সময়ই পেল না। ভালো কাজে ব্যস্ত না থাকলে মানুষ আজেবাজে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

২) মুসলিমদের সুনাম বজায় রাখা। উমার ইবন খাত্তাব যখন ইবন উবাইকে হত্যা করার জন্য রাসূলুল্লাহর অনুমতি চান, রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, 'দেখো উমর, যদি তাকে হত্যা করি আর মানুষ বলে: মুহাম্মাদ তার অনুসারীদের হত্যা করে। তখন বিষয়টা কেমন হবে ভেবে দেখেছো?' রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের সুনামের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতেন। রাসূলুল্লাহর বিচক্ষণতার কারণে ইবন উবাইয়ের আসল চরিত্র সবার কাছে প্রকাশিত হতে থাকে। উমার ইবন খাত্তাব পরবর্তীতে বলেছিলেন, 'আপনি ঠিক বলেছেন রাসূলুল্লাহ। আমি এখন বুঝতে পারছি যে, আপনার সিদ্ধান্ত আমার সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রজ্ঞাময়।'³⁴

৩) জাতীয়তাবাদ একটি ইসলামবিরোধী চেতনা। মুহাজির ও আনসার-- এ দুটো শব্দ রাসূলুল্লাহর খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু যখন এই নাম দুটো ধরে তারা নিজেদের দলকে ডাক দিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ এই ডাককে অভিহিত করলেন 'জাহিলিয়াতের ডাক' বলে। কারণ এই ডাকের পেছনে ছিল জাতীয়তাবাদের চেতনা। 'আমি আমার গোত্রের পক্ষে থাকবো। আমার জাতিই সেরা জাতি'- এমন অযৌক্তিক বিশ্বাসের কোনো স্থান ইসলামে নেই।

৪) ঈমান সবার আগে। মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবন উবাইয়ের ছেলে আবদুল্লাহ ছিলেন সত্যিকারের মুসলিম। তিনি যখন জানতে পারলেন তাঁর পিতাকে হত্যা করা হতে পারে, তখন নিজেই নবীজির কাছে গিয়ে বললেন, 'আমি শুনেছি আপনি আমার পিতাকে হত্যা করতে চান। যদি তা-ই করেন, আমাকে নির্দেশ দিন, আমিই তাঁকে হত্যা করবো। শয়তান আমাকে পিতার হত্যাকারীকে হত্যার জন্য ফুসলাতে পারে, আর আমি তখন একজন কাফিরের বদলায় একজন মু'মিনকে হত্যা করে বসতে পারি।' নবীজি বললেন, 'না, আমরা তাকে হত্যা করবো না। এ দুনিয়ায় আমরা তাঁকে সঙ্গ দেবো।'³⁵

টিকাঃ
৩৩. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৯। তিরমিযী, অধ্যায় তাফসীর, হাদীস ৩৬২৯ (আরবি রেফারেন্স)।
৩৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৬।
৩৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px