📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ: বদর আল-মাউইদ

📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ: বদর আল-মাউইদ


বদর হয়েছিল হিজরী ২য় বর্ষে, আর উহুদের যুদ্ধ ৩য় বর্ষে। এর রেশ ধরে হিজরী চতুর্থ বছরে কাফিরদের নেতা আবু সুফিয়ান মুসলিমদের তৃতীয়বারের মতো চ্যালেঞ্জ করে। সে দুই হাজার সৈন্যের শক্তিশালী একটি দল নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে। কিন্তু কিছু পথ যাওয়ার পর সে মন পরিবর্তন করে। সবার উদ্দেশ্যে বলে, 'আমার মতে, স্বচ্ছলতার বছর ছাড়া যুদ্ধে অংশ নেওয়া সমীচীন হবে না। বরং যে বছর তৃপ্তির সাথে পশুদের ভালো ঘাসপাতা খাওয়াতে পারবে এবং নিজেরা ইচ্ছেমতো দুধপান করতে পারবে, সে বছরই যুদ্ধ করা ভালো হবে। এবার শুষ্ক মৌসুম। আমি ফিরে যাচ্ছি, তোমরাও ফিরে চলো।' হতে পারে এ কথাগুলো আবু সুফিয়ানের অজুহাত মাত্র।

কিন্তু রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় কোনো ফাটল ধরেনি। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত জায়গায় দেড় হাজার মুজাহিদ নিয়ে রাসূলুল্লাহ শিবির স্থাপন করলেন। সেখানে আট দিন অবস্থান করলেন। সেখানে অবস্থানকালে তাঁর সাথে দেখা হলো বনু দামরা গোত্রের মুখশীর সাথে। ইতিপূর্বে এই গোত্রের সাথে মুসলিমদের শান্তিচুক্তি ছিল। মুখশী রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো, 'আপনারা কি কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যই এখানে এসেছেন?' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা সেজন্যেই এসেছি। আর তোমরা যদি চাও তাহলে আমাদের সাথে যে চুক্তি ছিল তা প্রত্যাহার করতে পারো। সেক্ষেত্রে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো ততক্ষণ না আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করেন।' মুখশী জবাব দিল, সে বললো, 'নাহ, এমন কিছু করার কোনো প্রয়োজন দেখি না।'²⁹

রাসূলুল্লাহর এই কথাগুলো বলে মুখশীকে সূক্ষ্ম একটি ইঙ্গিত দিচ্ছেন; আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখি, সেই শক্তি আমাদের ভালোই আছে। চুক্তির সময়সীমা বাড়ানোর ব্যাপারে তোমাদের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের নেই।

টিকাঃ
২৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দাউমাতুল জান্দাল

📄 দাউমাতুল জান্দাল


বনু আসাদ ও গাতফান গোত্র থেকে আরও উত্তরে, গাসাসিনাহ সীমানার কাছেই কুদাআহ গোত্র। এই কুদাআহ গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান হলো দাউমাতুল জান্দাল। এরা মূলত রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ভুক্ত একটি গোত্র। অভিযানের নাম দাউমাতুল জান্দাল হওয়ার কারণ হলো সেখানে এই নামে একটি বিখ্যাত বাজার ছিল। তাদের এলাকাটি ছিল মদীনা থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার উত্তরে।

অন্য গোত্রগুলোর মতো এই গোত্রের পক্ষ থেকেও মদীনা আক্রমণের আশু কোনো সম্ভাবনা ছিল না, কিম্বা তারা সেভাবে মুসলিমদের প্রতি বৈরী আচরণ করেনি। তবুও কেন সাড়ে চারশো কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাদের দেশে রাসূলুল্লাহ অভিযান পরিচালনা করলেন? এর বেশ কিছু কারণ আছে:

#এক, কুদাআহ গোত্রটি তাদের সীমানা ঘেঁষে যাওয়া যেকোনো কাফেলাকে আক্রমণ করতো। মুসলিমদের কোনো কাফেলা বা মুসলিমদের কাছ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কোনো কাফেলা তাদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হলো মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। একটি বিশ্বজনীন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে মানুষের মন থেকে নিরাপত্তাহীনতার বোধটুকু নিশ্চিহ্ন করা জরুরি ছিল। সেই সাথে বাণিজ্যিক পথগুলোকে নিরাপদ রাখাও ছিল আরেকটি উদ্দেশ্য।

#দুই, আরবে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব সম্পর্কে কুরাইশদের একটি ধারণা দেওয়াও ছিল অভিযানের আরেকটি উদ্দেশ্য। কুদাআহ গোত্রের বাজারে কুরাইশদের যাতায়াত ছিল। তারা কাফেলা নিয়ে সেখানে যেত। এমন একটা স্থানে সামরিক শক্তির প্রদর্শনী দেখলে স্বাভাবিকভাবেই কুরাইশরা মুসলিমদের আরও সমীহের চোখে দেখবে। এই অভিযানের মাধ্যমে রোমানদের একটি সূক্ষ্ম আভাস দেওয়া হয়। রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী গোত্রে হামলা চালানো হলে রোমানদের টনক নড়বেই। তারা জানবে আরবে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে।

পঞ্চম হিজরীর এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এক হাজার সৈনিকের বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। তারা দিনের বেলা লুকিয়ে থাকতেন আর রাতের বেলা এগিয়ে যেতেন। দাউমাতুল জান্দালে পৌঁছে গেলে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। একজন ধরা পড়ে এবং মুসলিম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের অগ্রসর হওয়ার সামান্য সুযোগটুকুও দেননি। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় চলে আসেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 অভিযানে মুসলিমদের অর্জন

📄 অভিযানে মুসলিমদের অর্জন


১) এই অভিযান থেকে ফেরার পথে উয়াইনাহ নামের এক ব্যক্তির সাথে রাসূলুল্লাহর ﷺ দেখা হয়। সে মদীনা থেকে ছত্রিশ কিলোমিটার দূরের মাঠে তার উট আর ভেড়া চরানোর অনুমতি চায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ অনুমতি দিলেন। প্রতিবেশি গোত্রগুলোর ওপর মুসলিমদের কী পরিমাণ প্রভাব ছিল এই ছোট্ট ঘটনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

২) এ অভিযানের মাধ্যমে মুসলিমরা নতুন নতুন এলাকা সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করে। একটি সুদীর্ঘ সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা লাভ করে।

৩) এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়। এক সময় যে বন্ধন ও আনুগত্য ছিল নিজ গোত্র আর পরিবারের প্রতি, সে বন্ধন এখন মুসলিমদের সাথে, আর আনুগত্য আল্লাহ ও রাসূলের ﷺ প্রতি। তাদের পরিচয় এখন আর আওসী, খাযরাজি কিম্বা কুরাইশি নয়। তাদের পরিচয় তারা মুসলিম। অভিযান চলাকালীন সময়ে মদীনার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ছিলেন গিফার গোত্রের সিবা। এই গিফার গোত্র ছিল ডাকাতির জন্য বিখ্যাত। মদীনার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল শিক্ষা দিলেন, নেতার বংশমর্যাদা বা গোত্র যা-ই হোক, তার আনুগত্য করতে হবে। দেশ-গোত্র ভুলে মুসলিমদের পরস্পরকে আপন করে নিতে হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px