📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কুরআনের প্রতি ভালোবাসা: আব্বাদ ইবন বিশর ؓ

📄 কুরআনের প্রতি ভালোবাসা: আব্বাদ ইবন বিশর ؓ


সে রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আম্মার ইবন ইয়াসির ও আব্বাদ ইবন বিশরকে প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। দুজন পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছেন। আম্মারের ঘুমের পালা এল, আব্বাদ বসে না থেকে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিরাত পাঠ করছেন, এমন সময় শত্রুর একটি তীর এসে বিঁধলো। মুহূর্তের মধ্যে গলগল করে বেরিয়ে এল তাজা রক্ত। কিন্তু সেদিকে আব্বাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! তিলাওয়াত করছেন তো করছেন। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে তাঁর কিরাতের সুর।

শত্রু আবারও আঘাত হানল। গায়ে বিঁধলো আরেকটি তীর, এরপর আরও একটি। তিন নম্বর তীর বিদ্ধ হওয়ার পর আম্মারকে ঘুম থেকে ডাকলেন। আম্মার উঠে দেখলেন আব্বাদের শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছে।
- সুবহানাল্লাহ! আপনি এতক্ষণ আমাকে ঘুম থেকে ডাকলেন না কেন?
- সূরাটা শেষ না করে তিলাওয়াত থামাতে চাচ্ছিলাম না। আল্লাহর কসম, আজ যদি পাহারার দায়িত্বে না থাকতাম, তাহলে সূরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিলাওয়াত চালিয়ে যেতাম, মৃত্যু হলেও পরোয়া করতাম না।

কুরআনের প্রতি সাহাবিদের এ এক অদ্ভুত রকমের ভালোবাসা! একটা মানুষকে একের পর এক তীর বিদ্ধ করে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে তিলাওয়াতে। আবার তিলাওয়াতে বিভোর হয়েও মানুষটা তাঁর দায়িত্ব ভোলেনি, পাহারা দেওয়ার কথা তাঁর ঠিক মনে ছিল। এভাবেই সাহাবিরা তাদের দায়িত্বের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রাসূলুল্লাহ ﷽ যখন বন্ধুঃ একজন তরুণ সাহাবির সাথে রাসূলুল্লাহর ﷽ কথোপকথন

📄 রাসূলুল্লাহ ﷽ যখন বন্ধুঃ একজন তরুণ সাহাবির সাথে রাসূলুল্লাহর ﷽ কথোপকথন


জাবির ইবন আবদুল্লাহ ছিলেন একজন শহীদের সন্তান। তাঁর বাবা উহুদের শহীদ। এই অভিযানে রাসূলুল্লাহর সাথে তাঁর অনেক সময় একসাথে কাটানোর সুযোগ হয়। ঘটনাটি জাবিরের মুখে শোনা যাক:

'যাত আর-রিকার অভিযানে বেরিয়েছি একটা দুবলা পাতলা উট নিয়ে। বাকিরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমি পেছনে পড়ে যাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ আমাকে ডাক দিলেন,
- জাবির! কী হলো?
- উটটার কারণে বারবার পেছনে পড়ে যাচ্ছি রাসূলুল্লাহ।
- আচ্ছা তুমি উটটাকে বসাও তো। আর তোমার হাতের ছড়িটা আমাকে দাও নয়তো একটা ডাল ভেঙে আনো।

আমি হাতের ছড়িটা এগিয়ে দিলাম। তিনি ছড়ি দিয়ে উটকে কয়েকটা খোঁচা দিয়ে বললেন, উঠে পড়ো। উটের পিঠে উঠলাম, অবাক হয়ে দেখি আমার উট রীতিমতো দৌড়াচ্ছে। রাসূলুল্লাহর উটের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে! রাসূলুল্লাহর সাথে গল্প করতে করতে চলছি, হঠাৎ তিনি বললেন,
- জাবির, তোমার উটটা আমার কাছে বিক্রি করবে?
- নাহ, আমি আপনাকে এমনিই এটা দিয়ে দেবো, উপহার হিসেবে।
- না, না, আমি কিনতে চাই।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে কত দেবেন? এক দিরহাম দিলে হবে? (রাসূলুল্লাহ রসিকতা করলেন।)
- নাহ! তাহলে তো আমি ঠকে যাবো।
- ঠিক আছে তাহলে দুই দিরহাম দিলে চলবে?
- না, না, আরও চাই!

রাসূলুল্লাহ উটের দাম বাড়াতে লাগলেন, দাম এক উকিয়ায় (চল্লিশ দিরহাম) গিয়ে ঠেকলো। রাজি হয়ে গেলাম, বললাম,
- আপনি এই দামে খুশি তো?
- হ্যাঁ।
- ঠিক আছে এই উটের মালিক এখন আপনি!

রাসূলুল্লাহর মধ্যে নেতাসুলভ মেকি গাম্ভীর্য ছিল না। তরুণ সাহাবিদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে যেতেন। জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর বিয়ের কথা।
- আচ্ছা জাবির, তুমি কি বিবাহিত?
- হ্যাঁ রাসূলুল্লাহ, বিয়ে করেছি।
- কুমারী?
- না।
- কুমারী বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তো তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতে পারতে, সেও পারত।
- আসলে, আমার বাবা সাত মেয়ে রেখে মারা গেছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য অভিজ্ঞ মানুষ প্রয়োজন। তাই বয়স্ক একজনকে বিয়ে করেছি।
- ইনশা আল্লাহ, আমার মনে হয় তুমি ঠিক কাজই করেছো।

রাসূলুল্লাহ জাবিরের ওয়ালিমার আয়োজন করতে চাইলেন। বললেন, 'শোনো জাবির, আমরা যদি সিরারে পৌঁছতে পারি, তাহলে কিছু উট জবাই করবো। রাতটা সেখানেই কাটাবো। তোমরা আমাদের জন্য বালিশের ব্যবস্থা কোরো।' জাবির বললেন, 'আমাদের তো বালিশই নেই আল্লাহর রাসূল!' রাসূলুল্লাহ অভয় দিলেন, 'চিন্তা কোরো না, এখন না থাকলেও তখন থাকবে।'

সিরারে সেদিন জাবিরের বিয়ে উপলক্ষে উট জবাই করা হলো। রাসূলুল্লাহ জাবিরকে স্ত্রীর সাথে রাত কাটাতে বললেন। পরদিন সকালের কথা। জাবির বলেন,

'পরদিন সকালে সেই উটটা নিয়ে বের হলাম। রাসূলুল্লাহর ঘরের দরজার সামনে উটটাকে বেঁধে রেখে আসলাম। উটের ওপর চোখ পড়তেই আল্লাহর রাসূল জানতে চাইলেন,
- এটা কার উট?
- জাবির এই উট আপনার জন্য নিয়ে এসেছে। (উপস্থিত সাহাবিরা জবাব দিল।)
- জাবিরকে ডেকে পাঠাও।

আমি গেলাম। আমাকে বললেন, ভাতিজা শোনো, এই উট নিয়ে যাও, তোমার উট তোমারই থাকবে। বিলালকে ডেকে বললেন, যাও, জাবিরকে এক উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে আসো। আমি বিলালের সাথে গেলাম। তিনি আমাকে এক উকিয়া স্বর্ণ থেকেও কিছুটা বেশি দিলেন। আল্লাহর কসম! এরপর থেকে আমার আর্থিক অবস্থা ক্রমেই ভালো হতে থাকে, যতদিন না আমাদের ওপর ইয়াউম আল হাররার দুর্দশা আপতিত হয়।'

আসলে কিছু মানুষ দান করার সময় বুঝতেও দেয় না যে তারা দান করছে। রাসূলুল্লাহ চাচ্ছিলেন জাবিরকে সাহায্য করতে। উট কেনার কথা, দরদাম করা এসব ছিল বাহানা মাত্র। সাহাবিদের জন্য তাঁর মমতা পৃথিবীর কোনো দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যাবে না। তিনি তাঁদের ভালো-মন্দের খেয়াল রাখতেন, নিজে না খেয়ে তাঁদের খাওয়াতেন। মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত গুণ নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি।

টিকাঃ
২৭. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৬।
২৮. ইয়াউম আল হাররা অনেক দিন পরের একটি ঘটনা। এটি ছিল মদীনাবাসীর একটি দুর্যোগের দিন, সেদিন অনেকে নিহত হয়। মুসলিমদের অন্তর্কোন্দলের এ ঘটনাটি ঘটে হিজরী ৬৩ সালে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ: বদর আল-মাউইদ

📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ: বদর আল-মাউইদ


বদর হয়েছিল হিজরী ২য় বর্ষে, আর উহুদের যুদ্ধ ৩য় বর্ষে। এর রেশ ধরে হিজরী চতুর্থ বছরে কাফিরদের নেতা আবু সুফিয়ান মুসলিমদের তৃতীয়বারের মতো চ্যালেঞ্জ করে। সে দুই হাজার সৈন্যের শক্তিশালী একটি দল নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে। কিন্তু কিছু পথ যাওয়ার পর সে মন পরিবর্তন করে। সবার উদ্দেশ্যে বলে, 'আমার মতে, স্বচ্ছলতার বছর ছাড়া যুদ্ধে অংশ নেওয়া সমীচীন হবে না। বরং যে বছর তৃপ্তির সাথে পশুদের ভালো ঘাসপাতা খাওয়াতে পারবে এবং নিজেরা ইচ্ছেমতো দুধপান করতে পারবে, সে বছরই যুদ্ধ করা ভালো হবে। এবার শুষ্ক মৌসুম। আমি ফিরে যাচ্ছি, তোমরাও ফিরে চলো।' হতে পারে এ কথাগুলো আবু সুফিয়ানের অজুহাত মাত্র।

কিন্তু রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় কোনো ফাটল ধরেনি। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত জায়গায় দেড় হাজার মুজাহিদ নিয়ে রাসূলুল্লাহ শিবির স্থাপন করলেন। সেখানে আট দিন অবস্থান করলেন। সেখানে অবস্থানকালে তাঁর সাথে দেখা হলো বনু দামরা গোত্রের মুখশীর সাথে। ইতিপূর্বে এই গোত্রের সাথে মুসলিমদের শান্তিচুক্তি ছিল। মুখশী রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো, 'আপনারা কি কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যই এখানে এসেছেন?' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা সেজন্যেই এসেছি। আর তোমরা যদি চাও তাহলে আমাদের সাথে যে চুক্তি ছিল তা প্রত্যাহার করতে পারো। সেক্ষেত্রে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো ততক্ষণ না আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করেন।' মুখশী জবাব দিল, সে বললো, 'নাহ, এমন কিছু করার কোনো প্রয়োজন দেখি না।'²⁹

রাসূলুল্লাহর এই কথাগুলো বলে মুখশীকে সূক্ষ্ম একটি ইঙ্গিত দিচ্ছেন; আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখি, সেই শক্তি আমাদের ভালোই আছে। চুক্তির সময়সীমা বাড়ানোর ব্যাপারে তোমাদের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের নেই।

টিকাঃ
২৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দাউমাতুল জান্দাল

📄 দাউমাতুল জান্দাল


বনু আসাদ ও গাতফান গোত্র থেকে আরও উত্তরে, গাসাসিনাহ সীমানার কাছেই কুদাআহ গোত্র। এই কুদাআহ গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান হলো দাউমাতুল জান্দাল। এরা মূলত রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ভুক্ত একটি গোত্র। অভিযানের নাম দাউমাতুল জান্দাল হওয়ার কারণ হলো সেখানে এই নামে একটি বিখ্যাত বাজার ছিল। তাদের এলাকাটি ছিল মদীনা থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার উত্তরে।

অন্য গোত্রগুলোর মতো এই গোত্রের পক্ষ থেকেও মদীনা আক্রমণের আশু কোনো সম্ভাবনা ছিল না, কিম্বা তারা সেভাবে মুসলিমদের প্রতি বৈরী আচরণ করেনি। তবুও কেন সাড়ে চারশো কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাদের দেশে রাসূলুল্লাহ অভিযান পরিচালনা করলেন? এর বেশ কিছু কারণ আছে:

#এক, কুদাআহ গোত্রটি তাদের সীমানা ঘেঁষে যাওয়া যেকোনো কাফেলাকে আক্রমণ করতো। মুসলিমদের কোনো কাফেলা বা মুসলিমদের কাছ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কোনো কাফেলা তাদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হলো মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। একটি বিশ্বজনীন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে মানুষের মন থেকে নিরাপত্তাহীনতার বোধটুকু নিশ্চিহ্ন করা জরুরি ছিল। সেই সাথে বাণিজ্যিক পথগুলোকে নিরাপদ রাখাও ছিল আরেকটি উদ্দেশ্য।

#দুই, আরবে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব সম্পর্কে কুরাইশদের একটি ধারণা দেওয়াও ছিল অভিযানের আরেকটি উদ্দেশ্য। কুদাআহ গোত্রের বাজারে কুরাইশদের যাতায়াত ছিল। তারা কাফেলা নিয়ে সেখানে যেত। এমন একটা স্থানে সামরিক শক্তির প্রদর্শনী দেখলে স্বাভাবিকভাবেই কুরাইশরা মুসলিমদের আরও সমীহের চোখে দেখবে। এই অভিযানের মাধ্যমে রোমানদের একটি সূক্ষ্ম আভাস দেওয়া হয়। রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী গোত্রে হামলা চালানো হলে রোমানদের টনক নড়বেই। তারা জানবে আরবে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে।

পঞ্চম হিজরীর এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এক হাজার সৈনিকের বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। তারা দিনের বেলা লুকিয়ে থাকতেন আর রাতের বেলা এগিয়ে যেতেন। দাউমাতুল জান্দালে পৌঁছে গেলে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। একজন ধরা পড়ে এবং মুসলিম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের অগ্রসর হওয়ার সামান্য সুযোগটুকুও দেননি। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় চলে আসেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px