📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


#১ কাফিরদের মনে ত্রাস

এই যুদ্ধের প্রসঙ্গে একটি পুরো সূরা নাযিল হয়েছিল যার নাম সূরা হাশর। ইবন আব্বাস একে 'বনু নাযিরের' সূরা বলেও অভিহিত করতেন।

"আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মতো। তোমরা ধারণাও করোনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তারা দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসলো যা তারা কল্পনাও করেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ী-ঘর আপন হাতে ও মু'মিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করল। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।” (সূরা হাশর, ৫৯: ২)

কি মুসলিম কি ইহুদি, কোনো পক্ষই আশা করেনি ইহুদিরা চলে যেতে বাধ্য হবে। মুসলিমরা ভেবেছিল ইহুদিরা অনেক শক্তিশালী, ইহুদিরাও ভেবেছিল মুসলিমরা তাদের হারাতে পারবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলিমরাই জয়ী হয় আর তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহে। আল্লাহ তাদের বহিষ্কার করে দেন। কোনো বাহিনী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের দুর্বলতা থাকবেই, আর কার দুর্বলতা কোথায় তা আল্লাহ তাআলা ভালোই জানেন। কোনো জাতি যদি নিজেদের খুব শক্তিশালী কিছু মনে করে, যদি মনে করে যে আমাদের কাছে পারমাণবিক শক্তি আছে, সবার চেয়ে বেশি মারণাস্ত্র আছে, আল্লাহ তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন -- আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হয় না। আল্লাহ তাদের এমন এক দুর্বল দিকে আঘাত করবেন যা তারা কল্পনাও করে না। আল্লাহ তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেবেন। একবার যখন মনে ভয় ঢুকে যায়, তখন অস্ত্রশস্ত্র বা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কিছুই কাজে আসে না। সাহাবিদের অন্তরে ছিল ঈমান। এই ঈমান তাদের আল্লাহর পথে অটল-অবিচল রেখেছিল। আর আল্লাহর শত্রুদের মনে ছিল দুনিয়াপ্রীতি, আর একারণেই তারা হেরে গিয়েছিল।

#২ জিহাদের নিয়মে ব্যতিক্রম

"তোমরা যে সব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন।” (সূরা হাশর, ৫৯: ৫)

ইসলামে গাছ কাটা নিষেধ, তবুও কেন রাসূলুল্লাহ গাছ কাটার আদেশ দিয়েছিলেন? এর উত্তরে বলা যায়, প্রথমত, এটি করা হয়েছিল আল্লাহর অনুমতিতে। কিন্তু কেন? আল্লাহই তা ব্যাখ্যা করছেন। তা এজন্য যে, 'আল্লাহ পাপাচারীদের লাঞ্ছিত করবেন।' রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যুদ্ধের সময় গাছপালা কাটা যাবে না, মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধ লোকেদেরকে হত্যা করা যাবে না, আশ্রমে বসবাসরত সন্ন্যাসীদের হত্যা করা যাবে না। কিন্তু এই বিধানগুলির প্রত্যেকটিরই ব্যতিক্রম আমরা আল্লাহর রাসূলের জীবনে দেখি। যেমন, বনু নাযিরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ খেজুর গাছ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। তাইফের অভিযানে রাতের বেলা কাফিরদের বাসায় আক্রমণ করা এবং তাদের অধিবাসীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। ইসলাম সহনশীলতার দ্বীন। কিন্তু এই সহনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে শত্রুরা সুবিধা নেবে এবং মুসলিমদের ক্ষতি করবে -- সেই অনুমতি ইসলাম দেয় না।

#৩ নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন

"আল্লাহ তাদের (ইহুদিদের) নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফাই হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোনো ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করোনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কর্তৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।” (সূরা হাশর ৫৯: ৬)

যুদ্ধের পর সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব মালামাল লাভ করে, সেগুলোকে বলা হয় ‘গনিমাহ’। আর কাফিরদের যে সম্পদ তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়াই মুসলিমরা লাভ করে সেটাকে বলা হয় 'ফাই'। বনু নাযিরের অবরোধের পর মুসলিমরা লাভ করে 'ফাই'। কারণ বনু নাযিরের সাথে কোনো যুদ্ধ হয়নি। অস্ত্র প্রয়োগ ছাড়াই মুসলিমরা এসব সম্পদ লাভ করেছে। এই সম্পদের পাঁচ ভাগের চার ভাগ যোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার যে নীতি -- সেটি ছিল গনিমাহ এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বনু নাযিরের এই সম্পদের মালিকানা ছিল রাসূলুল্লাহর একার। তিনি আনসারদের ডেকে প্রস্তাব দিলেন এবং তাদের সম্মতিক্রমে এই সম্পত্তি মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন যেন তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। মদীনার নেতার মেয়ের বিয়ের মোহর ছিল সামান্য একটি বর্ম। রাসূলুল্লাহ নিজে যেমন অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন, তেমনি নিজ পরিবারকেও সাদামাটা জীবনে উৎসাহ দেন।

#৪ মুনাফিকরা হলো মিথ্যাবাদী আর কাফিররা হলো কাপুরুষ

"তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি যারা আহলে কিতাবের মধ্য হতে তাদের কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমাদেরকে বের করে দেওয়া হলে আমরাও তোমাদের সাথে অবশ্য বেরিয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনোই কারো আনুগত্য করবো না। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করবো। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা হাশর, ৫৯: ১২)

কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুনাফিক ও ইহুদিদেরকে 'ভাই' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই মুনাফিকরা ছিল মিথ্যাবাদী। এটাই মুনাফিকদের আসল চরিত্র। তারা কাফিরদের পক্ষে থাকে, তাদের থেকে সাহায্য কামনা করে এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।

"প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে আল্লাহ অপেক্ষা তোমাদেরই ভয় বেশি; এটা এই জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। তারা সম্মিলিতিভাবে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না, (যদি করেও, সেটা তারা করবে) কোনো সুরক্ষিত জনপদের ভেতরে বসে অথবা দুর্গ প্রাচীরের অন্তরাল থেকে। তুমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে করছো, অথচ তাদের অন্তর শতধা বিচ্ছিন্ন। এটা এই জন্যে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।” (সূরা হাশর, ৫৯: ১৩-১৪)

কাপুরুষতা কাফির সেনাদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সুরক্ষিত অবস্থা ছাড়া তারা যুদ্ধ করে না। তাদের এই চারিত্রিক দিকটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ বলছেন, 'তাদের অন্তর শতধা বিভক্ত।' কাফির, মুশরিক, মুনাফিকের দল যদিও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ।

#৫ ইসলাম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না

জাহিলিয়াতের সময় মদীনার আরবদের মাঝে একটি কুসংস্কার ছিল, কারো সন্তান যদি জন্মের পর না বাঁচে, তখন পরবর্তী সন্তানকে ইহুদি বানালে তাদের সন্তানরা বেঁচে থাকবে। এভাবে তাদের অনেকের সন্তানই ইহুদি হিসেবে বড় হচ্ছিল। যখন বনু নাযির গোত্রকে বহিষ্কার করা হলো তখন কিছু লোক রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের কিছু সন্তান ও ভাই তো তাদের সাথে রয়েছে। আমরা এখন কী করবো?' রাসূলুল্লাহ এ ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হওয়া পর্যন্ত কোনো জবাব দিলেন না। অবতীর্ণ হলো সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'তোমাদের ভাই ও সন্তানদের যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বলো। তারা যদি তোমাদের পছন্দ করে তাহলে তারা তোমাদের সাথে থাকবে। আর যদি তারা ইহুদিদের সাথে থাকতে চায়, তাহলে তাদের চলে যেতে দাও।' অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যায় না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px