📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হত্যাচেষ্টা

📄 হত্যাচেষ্টা


ইহুদিরা রাসূলুল্লাহকে অভ্যর্থনা জানালো, অভিনয় করলো রাসূলুল্লাহর আগমনে তারা খুব খুশি। রাসূলুল্লাহ একটি দেওয়ালের পাশে বসে বললেন, 'বনু আমরের দুই লোককে ভুলক্রমে হত্যা করা হয়েছে। তাদের রক্তপণ পরিশোধের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য কামনা করছি।' তারা রাজি হবার ভান করলো। টাকা নিয়ে আসার কথা বলে ভেতরে গেল। ভেতরে গিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করলো কীভাবে রাসূলুল্লাহকে মেরে ফেলা যায়। একজন বললো, 'এমন সুযোগ আর কক্ষণো পাবো না। উনি আজকে দেওয়ালের ঠিক পাশেই বসেছেন! ছাদে উঠে একটা পাথর ফেললেই খেল খতম! আহ! তারপর সারাজীবনের মুক্তি!'

ইহুদিরা সবসময়ই এমন--মুখে এক আর মনে আরেক। কিন্তু তাদের দুরভিসন্ধির কথা জিবরীল রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেন। তিনি কাউকে কিছু না বলে তৎক্ষণাৎ উঠে পড়েন এবং মদীনায় চলে যান। সাহাবিরা তাঁর জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, পরে তাঁরাও মদীনা ফিরে আসলেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন,

“হে মু'মিনগণ, তোমরা স্মরণ করো তোমাদের ওপর আল্লাহর সেই নিআমত, যখন একটি জনগোষ্ঠী তোমাদের ওপর হাত ওঠাতে উদ্যত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদের হাতকে তোমাদের থেকে নিবৃত্ত রাখলেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আল্লাহর ওপরই মু'মিনরা যেন তাওয়াক্কল করে।” (সূরা মায়িদা, ৫:১১)

এর আগেও ইহুদিরা বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করে এসেছে। এর আগে তারা আহলুস-সুফফার এক মুসলিমকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তাদের নেতা মূসা ইবন উকবাহ উহুদের যুদ্ধে কুরাইশদের গোপনে সাহায্য করেছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা মুসলিমদের বদর এবং উহুদে সাহায্য করেনি। উল্টো তাদের নেতা সালাম ইবন মিশকাম মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের পরিচালিত একটি সামরিক অভিযানে তাদের স্পর্শকাতর তথ্য দিয়ে সাহায্য করে এবং আবু সুফিয়ানকে আতিথেয়তা করে।

এসব কিছু সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ তাদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেননি। যদিও এগুলো ছিল মদীনা সনদের লঙ্ঘন। কিন্তু এবারের ষড়যন্ত্র সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাসূলুল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল, বরং তারচেয়েও মারাত্মক। রাসূলুল্লাহ এবার কঠোর পদক্ষেপ নিলেন। বনু নাযির গোত্রকে দশ দিনের আল্টিমেটাম দেন। তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

'আমি আল্লাহর প্রেরিত নবী। তিনি আদেশ করেছেন তোমরা আমার শহর ছেড়ে চলে যাও, কারণ তোমরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আমার সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেছো। আমি তোমাদের চলে যাওয়ার জন্য দশ দিন সময় দিচ্ছি। এরপর যদি কাউকে দেখা যায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।'

রাসূলুল্লাহর এই কথাগুলো বনু নাযিরের কাছে পৌঁছে দেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ। কিছুদিন আগেও জাহিলিয়াতের যুগে এই মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহই ছিলেন বনু নাযির গোত্রের বন্ধু। তারা তাকে দেখে অবাক! 'আমরা ভাবতেই পারি না যে তুমি আমাদের কাছে এই রকম একটা খবর আনতে পারো।' জবাবে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বলেন, 'এখন আর সেই দিন নেই। ইসলাম আমাদের বদলে দিয়েছে। অতীতের সমস্ত বন্ধুত্ব আর মিত্রতা বাতিল হয়ে গেছে।' তার কাছে এখন ইসলামই সব। তার সমস্ত আনুগত্য এখন আল্লাহর জন্য। কে আগে বন্ধু ছিল, কে মিত্র ছিল, সেসব দেখার সময় নেই। তারচেয়ে অনেক বড় হলো রাসূলুল্লাহর মর্যাদা আর আল্লাহর সাথে করা ওয়াদা।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দশ দিন পর...

📄 দশ দিন পর...


ইহুদিরা বরাবরের মতোই ছিল কাপুরুষ প্রজাতির। আল্টিমেটাম পেয়ে প্রথমে তারা চলে যেতে রাজি হয়। কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ালো তাদের 'আধ্যাত্মিক ভাই', মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই। সে বললো,

'তোমরা দৃঢ় থাকো! প্রতিরোধ গড়ে তোলো! আমরা তোমাদের সাথেই আছি। তোমাদের আক্রমণ করা হলে আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবো! তোমাদের বহিষ্কার করা হলে আমরাও তোমাদের সাথে চলে যাবো! আমার সাথে আমার গোত্রের ও আরবের অন্যান্য গোত্র থেকে আরও দুহাজার লোক আছে যারা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। শত্রুরা তোমাদের আক্রমণ করলে তারা তোমাদের জন্য জান দিতে প্রস্তুত!'

লক্ষণীয়, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইসলাম গ্রহণের আগে ছিল মুশরিক আর বনু নাযির গোত্র হচ্ছে ইহুদি। কিন্তু মুসলিমদের বিরোধিতায় তারা একেবারে গলায় গলায় ভাই হয়ে গেল। আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের আশ্বাস পেয়ে বনু নাযিরের ইহুদিরা কিছুটা সাহস পেল, বলা চলে একরকম ঝোঁকের মাথায় প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।

আল্টিমেটামের দশ দিন শেষ। রাসূলুল্লাহ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে বনু নাযির গোত্রের দুর্গ অবরোধ করলেন। বনু নাযির গোত্র ততদিনে বেশ ধনী হয়েছে। তাদের নিজেদের দুর্গ আছে। দুর্গের বাইরে প্রচুর আবাদি জমি, বিশাল খেজুরের বাগান। এগুলোর ওপরই তাদের জীবিকা নির্ভর করতো। তারা আশা করছিল মুসলিমরা অবরোধ করতে করতে একসময় ক্লান্ত, বিরক্ত হয়ে চলে যাবে। অবরুদ্ধ অবস্থাতেও অনেক দিন টিকে থাকার মতো অবস্থা তাদের ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এমন এক কৌশল অবলম্বন করলেন যা তাদেরকে পুরোপুরি হতবুদ্ধি করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ তাদের খেজুর বাগানে আগুন লাগিয়ে দিলেন। এই দৃশ্য দেখে তো তারা আতঙ্কে অস্থির। মদীনাতে তাদের আছেই হলো এই জমি। সেই জমিই যদি আগুনে পুড়ে যায় তাহলে মদীনায় থেকে কী লাভ! এদিকে আবদুল্লাহ ইবন উবাই বনু নাযীরের সাহায্যার্থে একটি আঙুলও তুললো না। বনু নাযীর হতাশ হয়ে গেল।

মরার আগে মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, তেমনি শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়াতে লাগলো, 'এই মুহাম্মাদ লোকটাই তো ফিতনা-ফাসাদ আর বিশৃঙ্খলা করতে নিষেধ করতো! গাছ কাটতে নিষেধ করতো! আর এখন তো সে নিজেই এই কাজ করছে! আমাদের খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলছে, পুড়িয়ে ফেলছে!' কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদের এই প্রোপাগান্ডায় কোনো পাত্তা দিলেন না। তারা পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়লো।

বনু নাযির আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। রাসূলুল্লাহকে অনুরোধ করলো যেন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যেতে সম্মত হলো, সহায় সম্পদ নিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইল। রাসূলুল্লাহ রাজি হলেন, তবে কয়েকটি শর্ত দিলেন। এক, সাথে কোনো অস্ত্র নেওয়া যাবে না। দুই, একটা উটের পিঠে যতটুকু মাল বহন করা যায় শুধু ততটুকু মালামালই নেওয়া যাবে। তিন, প্রতি তিন জনের জন্য একটি করে উট বরাদ্দ।

পুরো ব্যাপারটি দেখভাল করার দায়িত্ব পড়ে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহর ওপর। ইহুদিরা ছিল পয়সার পাগল। একটা উটের পিঠে যে যত পারছে ভরছে। কেউ কেউ তো ঘরের দরজার চৌকাঠ ভেঙে উটের পিঠে তুলে নিল! দেখার মতো দৃশ্য। টাকার কুমীর ইহুদি সাল্লাম ইবন আবি হুক্কাইক ষাঁড়ের চামড়া সোনা রূপা দিয়ে ভরে ফেলে। যাওয়ার সময় আবার দম্ভভরে বলে, 'হুম! এভাবেই আমরা নিজেদের পৃথিবীর যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছি। এখানে খেজুর বাগান ছেড়ে যাচ্ছি তো কী হয়েছে, খাইবারে গিয়ে আবার তা ফিরে পাবো।'

হেরে গিয়েও কত গর্ব, কত ভান! কিছুই যেন হয়নি। ইহুদি গোত্রগুলোর চোখে বনু নাযির অনেক সম্মানিত গোত্র, সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত। তারা চাচ্ছিল তাদের এ লজ্জাজনক নির্বাসনে কেউ তাদের নিয়ে হাসাহাসি না করুক। মুসলিমরা যেন তাদের এই পলায়ন উপভোগ করতে না পারে এজন্য তারা তাদের বহরের পেছনে গায়িকাদের দিয়ে গান-বাজনা করাতে করাতে ভেগে গেল।

কাপুরুষ পরাজিত বনু নাযির গোত্রের একটি অংশ চলে গেল শামে, আরেকটি অংশ গেল খাইবারে। খাইবারে তাদের বরণ করা হয় বীরের মতো করে। তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে মহিলা আর কমবয়সী বাচ্চারা নেমে আসে। উপহার দিয়ে, খঞ্জনী আর বাঁশি বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে গর্ব আর অহংকারের সাথে তাদেরকে বরণ করে নেওয়া হয়। সে যুগে আর কোনো পরাজিত গোত্রকে এভাবে সংবর্ধনা দেওয়ার দৃষ্টান্ত নেই।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


#১ কাফিরদের মনে ত্রাস

এই যুদ্ধের প্রসঙ্গে একটি পুরো সূরা নাযিল হয়েছিল যার নাম সূরা হাশর। ইবন আব্বাস একে 'বনু নাযিরের' সূরা বলেও অভিহিত করতেন।

"আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মতো। তোমরা ধারণাও করোনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তারা দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসলো যা তারা কল্পনাও করেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ী-ঘর আপন হাতে ও মু'মিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করল। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।” (সূরা হাশর, ৫৯: ২)

কি মুসলিম কি ইহুদি, কোনো পক্ষই আশা করেনি ইহুদিরা চলে যেতে বাধ্য হবে। মুসলিমরা ভেবেছিল ইহুদিরা অনেক শক্তিশালী, ইহুদিরাও ভেবেছিল মুসলিমরা তাদের হারাতে পারবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলিমরাই জয়ী হয় আর তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহে। আল্লাহ তাদের বহিষ্কার করে দেন। কোনো বাহিনী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের দুর্বলতা থাকবেই, আর কার দুর্বলতা কোথায় তা আল্লাহ তাআলা ভালোই জানেন। কোনো জাতি যদি নিজেদের খুব শক্তিশালী কিছু মনে করে, যদি মনে করে যে আমাদের কাছে পারমাণবিক শক্তি আছে, সবার চেয়ে বেশি মারণাস্ত্র আছে, আল্লাহ তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন -- আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হয় না। আল্লাহ তাদের এমন এক দুর্বল দিকে আঘাত করবেন যা তারা কল্পনাও করে না। আল্লাহ তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেবেন। একবার যখন মনে ভয় ঢুকে যায়, তখন অস্ত্রশস্ত্র বা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কিছুই কাজে আসে না। সাহাবিদের অন্তরে ছিল ঈমান। এই ঈমান তাদের আল্লাহর পথে অটল-অবিচল রেখেছিল। আর আল্লাহর শত্রুদের মনে ছিল দুনিয়াপ্রীতি, আর একারণেই তারা হেরে গিয়েছিল।

#২ জিহাদের নিয়মে ব্যতিক্রম

"তোমরা যে সব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন।” (সূরা হাশর, ৫৯: ৫)

ইসলামে গাছ কাটা নিষেধ, তবুও কেন রাসূলুল্লাহ গাছ কাটার আদেশ দিয়েছিলেন? এর উত্তরে বলা যায়, প্রথমত, এটি করা হয়েছিল আল্লাহর অনুমতিতে। কিন্তু কেন? আল্লাহই তা ব্যাখ্যা করছেন। তা এজন্য যে, 'আল্লাহ পাপাচারীদের লাঞ্ছিত করবেন।' রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যুদ্ধের সময় গাছপালা কাটা যাবে না, মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধ লোকেদেরকে হত্যা করা যাবে না, আশ্রমে বসবাসরত সন্ন্যাসীদের হত্যা করা যাবে না। কিন্তু এই বিধানগুলির প্রত্যেকটিরই ব্যতিক্রম আমরা আল্লাহর রাসূলের জীবনে দেখি। যেমন, বনু নাযিরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ খেজুর গাছ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। তাইফের অভিযানে রাতের বেলা কাফিরদের বাসায় আক্রমণ করা এবং তাদের অধিবাসীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। ইসলাম সহনশীলতার দ্বীন। কিন্তু এই সহনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে শত্রুরা সুবিধা নেবে এবং মুসলিমদের ক্ষতি করবে -- সেই অনুমতি ইসলাম দেয় না।

#৩ নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন

"আল্লাহ তাদের (ইহুদিদের) নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফাই হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোনো ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করোনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কর্তৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।” (সূরা হাশর ৫৯: ৬)

যুদ্ধের পর সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব মালামাল লাভ করে, সেগুলোকে বলা হয় ‘গনিমাহ’। আর কাফিরদের যে সম্পদ তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়াই মুসলিমরা লাভ করে সেটাকে বলা হয় 'ফাই'। বনু নাযিরের অবরোধের পর মুসলিমরা লাভ করে 'ফাই'। কারণ বনু নাযিরের সাথে কোনো যুদ্ধ হয়নি। অস্ত্র প্রয়োগ ছাড়াই মুসলিমরা এসব সম্পদ লাভ করেছে। এই সম্পদের পাঁচ ভাগের চার ভাগ যোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার যে নীতি -- সেটি ছিল গনিমাহ এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বনু নাযিরের এই সম্পদের মালিকানা ছিল রাসূলুল্লাহর একার। তিনি আনসারদের ডেকে প্রস্তাব দিলেন এবং তাদের সম্মতিক্রমে এই সম্পত্তি মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন যেন তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। মদীনার নেতার মেয়ের বিয়ের মোহর ছিল সামান্য একটি বর্ম। রাসূলুল্লাহ নিজে যেমন অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন, তেমনি নিজ পরিবারকেও সাদামাটা জীবনে উৎসাহ দেন।

#৪ মুনাফিকরা হলো মিথ্যাবাদী আর কাফিররা হলো কাপুরুষ

"তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি যারা আহলে কিতাবের মধ্য হতে তাদের কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমাদেরকে বের করে দেওয়া হলে আমরাও তোমাদের সাথে অবশ্য বেরিয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনোই কারো আনুগত্য করবো না। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করবো। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা হাশর, ৫৯: ১২)

কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুনাফিক ও ইহুদিদেরকে 'ভাই' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই মুনাফিকরা ছিল মিথ্যাবাদী। এটাই মুনাফিকদের আসল চরিত্র। তারা কাফিরদের পক্ষে থাকে, তাদের থেকে সাহায্য কামনা করে এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।

"প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে আল্লাহ অপেক্ষা তোমাদেরই ভয় বেশি; এটা এই জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। তারা সম্মিলিতিভাবে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না, (যদি করেও, সেটা তারা করবে) কোনো সুরক্ষিত জনপদের ভেতরে বসে অথবা দুর্গ প্রাচীরের অন্তরাল থেকে। তুমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে করছো, অথচ তাদের অন্তর শতধা বিচ্ছিন্ন। এটা এই জন্যে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।” (সূরা হাশর, ৫৯: ১৩-১৪)

কাপুরুষতা কাফির সেনাদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সুরক্ষিত অবস্থা ছাড়া তারা যুদ্ধ করে না। তাদের এই চারিত্রিক দিকটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ বলছেন, 'তাদের অন্তর শতধা বিভক্ত।' কাফির, মুশরিক, মুনাফিকের দল যদিও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ।

#৫ ইসলাম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না

জাহিলিয়াতের সময় মদীনার আরবদের মাঝে একটি কুসংস্কার ছিল, কারো সন্তান যদি জন্মের পর না বাঁচে, তখন পরবর্তী সন্তানকে ইহুদি বানালে তাদের সন্তানরা বেঁচে থাকবে। এভাবে তাদের অনেকের সন্তানই ইহুদি হিসেবে বড় হচ্ছিল। যখন বনু নাযির গোত্রকে বহিষ্কার করা হলো তখন কিছু লোক রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের কিছু সন্তান ও ভাই তো তাদের সাথে রয়েছে। আমরা এখন কী করবো?' রাসূলুল্লাহ এ ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হওয়া পর্যন্ত কোনো জবাব দিলেন না। অবতীর্ণ হলো সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'তোমাদের ভাই ও সন্তানদের যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বলো। তারা যদি তোমাদের পছন্দ করে তাহলে তারা তোমাদের সাথে থাকবে। আর যদি তারা ইহুদিদের সাথে থাকতে চায়, তাহলে তাদের চলে যেতে দাও।' অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যায় না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px