📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উম্ম সালামার ؓ সাথে বিয়ে

📄 উম্ম সালামার ؓ সাথে বিয়ে


উম্ম সালামা ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু মাখযুম গোত্রের। তার আসল নাম হিন্দ বিনত আবু উমাইয়্যা। ইনি-ই সেই উম্ম সালামা যার কাছ থেকে হিজরতের সময় স্বামী-সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি ছিলেন আবু সালামার স্ত্রী। তাঁরা ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের দম্পতি। দ্বীন ইসলামে আবু সালামার ছিল 'বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার'। খুব অল্প ক'জন সাহাবি প্রথমে হাবাশায় এবং পরে মদীনায় - এই দুই হিজরতের সুযোগ পান। আবু সালামাহ তাদের একজন। তিনি বদরে অংশ নেন, উহুদে আহত হন। উহুদের যুদ্ধে শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষতটি ভালো হয়ে উঠতে শুরু করে। এরপর তিনি বনু আসাদের অভিযানে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু এই অভিযানে সেই ক্ষতস্থান গুরুতর আকার ধারণ করে এবং এতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই দম্পতির মাঝে ছিল চমৎকার ভালোবাসার সম্পর্ক। একটা সময় তারা দু'জন অনেক কষ্টের সময় পার করেছিলেন। হয়তো সে কারণে তাদের মধ্যে গাঢ় সম্পর্ক তৈরি হয়। কেমন ছিল তাদের ভালোবাসা? একদিন উম্ম সালামা তাঁর স্বামীকে বলেন,
'শোনো, আমি রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে একটা কথা শুনেছি। যদি কোনো মহিলার স্বামী মারা যায়, আর তখন সে মহিলা যদি আর বিয়ে না করে, আর তার স্বামী যদি জান্নাতে যায়, তাহলে আল্লাহ তাদের দু'জনকে জান্নাতে একত্রিত করবেন। তাই আমি চাই আমি মারা গেলে তুমি আর কোনো বিয়ে করবে না। আর তুমি মারা গেলে আমিও বিয়ে করবো না।'
আবু সালামা বললেন, 'আমি তোমাকে যেটা বলি সেটা শুনবে? আমি যদি মারা যাই, তুমি আরেকটা বিয়ে করে নিও।' এরপর তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার চাইতে ভালো কারো সাথে উম্ম সালামার বিয়ে দিও, যে তাকে কষ্ট দিবে না, তার কোনো ক্ষতি করবে না।' যখন আবু সালামাহ মারা গেলেন, তখন উম্ম সালামা বলতেন, 'আবু সালামার চেয়ে ভালো মানুষ আমি আর কোথায় পাবো?' এই মৃত্যুর কিছুদিন পরেই উম্ম সালামার দরজায় কড়া নাড়লো আবু সালামা থেকেও উত্তম একজনের প্রস্তাব। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ।
উম্মে সালামাকে বিয়ের জন্য আবু বকরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন। উমার ইবন খাত্তাবের প্রস্তাবও উম্ম সালামা ফিরিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহর প্রস্তাবে তিনি খুশি মনে রাজি হলেন, কিন্তু বললেন, 'খুবই উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু আমার মধ্যে অনেক ঈর্ষা কাজ করে। তাছাড়া আমার ছোট ছোট সন্তান আছে আর আমার অভিভাবকদের কেউ তো উপস্থিত নেই।' উম্ম সালামা নিজের ব্যক্তিত্ব ও অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে ধারণা দিতে চাইছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন, তিনি কিছুটা 'অভিমানী' গোছের, তাই রাসূলুল্লাহর অন্য স্ত্রীদের নিয়ে তার মধ্যে ঈর্ষা কাজ করতে পারে। এছাড়া তার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রয়েছে যাদের দেখাশোনা করা রাসুলুল্লাহর জন্য বোঝা হতে পারে। রাসুলুল্লাহ সব শুনে বললেন, 'তুমি বলেছ তোমার ছেলে মেয়ে রয়েছে, আল্লাহই তাদের দেখাশোনা করবেন। তুমি ঈর্ষার কথা বলেছো, আল্লাহর কাছে আমি দুআ করি তিনি যেন তা দূর করে দেন। আর তোমার ওয়ালিরা অনুপস্থিত হলেও তাদের কেউই আমাকে প্রত্যাখ্যান করতেন না।'
বিয়ের পর উম্মে সালামাকে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আমি তোমাকে সে পরিমাণ আসবাবপত্র দেবো যতটুকু যাইনাবকে দিয়েছি। তোমাকে আমি দুটো যাঁতাকল, দুটো মাটির কলস আর একটি পাতা দিয়ে ঠাসা চামড়ার বালিশ দেবো।' রাসূলুল্লাহ ছিলেন তখন একটি রাষ্ট্রের অধিপতি। চাইলে বিভিন্ন যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের মালের একটা বড় অংশ তার পরিবারের জন্য ব্যয় করতে পারতেন, কারো কিছু বলার থাকতো না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর নবী হিসেবে 'আরামদায়ক জীবনযাপন' তো তারই প্রাপ্য। কিন্তু তিনি একান্তই সাদামাটা, ছিমছাম জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
বিয়ে হলো। কিন্তু উম্ম সালামার কোলে তখন আবু সালামার সন্তান বাররাহ। তার নাম পরে বদলে রাখা হয় যাইনাব। বাররাহ তখন দুধের শিশু, তাই নববধূর সাথে রাসূলুল্লাহ একান্তে সময় কাটাতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহ ছিলেন লাজুক, মুখ ফুটে বিষয়টা বলতেও পারছিলেন না। বিষয়টি খেয়াল করলেন তাঁরই সাহাবি আম্মার ইবন ইয়াসির। তিনি ছিলেন উম্ম সালামার দুধ ভাই। তিনি বোনের কাছ থেকে বাররাহকে নিয়ে অন্য এক মহিলার কাছে রেখে আসলেন যেন রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীর সাথে সময় কাটাতে পারেন। রাসূলুল্লাহ যেমন করে সাহাবিদের দিকে খেয়াল রাখতেন, সাহাবিরাও রাসূলুল্লাহর সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ রাখতেন।
এরপর নবীজি উম্ম সালামার সাথে তিন দিন কাটালেন। তিনি বলেছেন, 'নতুন স্ত্রী যদি কুমারী হয় তাহলে সাতদিন, আর যদি তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা হয়, তাহলে তিন দিন।' অর্থাৎ কেউ যদি একের অধিক বিয়ে করে, তাহলে নতুন স্ত্রী যদি কুমারী হয় তাহলে তার সাথে প্রথমে সাতদিন কাটাবে, আর বিধবা হলে তিনদিন। এরপর থেকে সব স্ত্রীর সাথে পালা করে সমান সময় দিতে হবে।
উম্ম সালামা ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী নারী। তার বুদ্ধিমত্তার ছাপ পাওয়া যায় হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়। তিনি রাসূলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন প্রায় ৩৮৮টি হাদীস। এগুলো অনেকগুলোই নবীজির একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের টুকিটাকি ঘটনা। এগুলো পুরুষ সাহাবিদের জানার কোনো সুযোগ ছিল না। এই বিয়ে ছিল স্বামী-হারা উম্ম সালামার জন্য একটা আশ্রয়স্থল। এই বিয়ের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ শিক্ষা দিচ্ছেন যেন আমরা আমাদের শহীদ ভাইদের পরিবারকে ভুলে না যাই। তাদের দেখাশোনা করি ও দায়িত্ব নিই।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইমাম হাসানের জন্ম

📄 ইমাম হাসানের জন্ম


একই বছর, চতুর্থ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন রাসূলুল্লাহর নাতি হাসান ইবন আলী ইবন আবি তালিব। এই খুশির খবরটি নিয়ে আলী নবীজির কাছে গেলেন। নবীজি জানতে চাইলেন তার সন্তানের নাম কী রাখা হয়েছে। আলী বললেন, 'হারব', হারব অর্থ যুদ্ধ। রাসূল বললেন, 'না! সে হাসান।' নামের অর্থে কাঠিন্য থাকা রাসূল পছন্দ করতেন না। রাসূলুল্লাহ নাতির কানে আজান দিলেন। মেয়ে ফাতিমাকে বললেন সন্তানের মাথা মুড়িয়ে দিতে, এরপর মুড়ানো চুলের ওজনের সমপরিমাণ রূপা সাদাকাহ করে দিতে। পরে আক্বীকার সময় তিনি দুটো ভেড়া কুরবানি করলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যাইদ ইবন সাবিতের ভাষাশিক্ষা

📄 যাইদ ইবন সাবিতের ভাষাশিক্ষা


একই বছরের ঘটনা, রাসুলুল্লাহ যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে বললেন, 'যাইদ, তুমি হিব্রু ভাষা শিখে ফেলো। আমি ইহুদিদের ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।' রাসূল যেসব চিঠি পেতেন, অথবা কারো কাছে লিখে পাঠাতেন সেগুলো ইহুদিরা তাকে পড়ে শুনাতো কারণ তাদের পড়াশোনা ছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য রাসূলুল্লাহ একজন বিশ্বস্ত মুসলিমকে নিয়োগ দিতে চাইলেন। কারণ ইহুদিদের ওপর থেকে তিনি ক্রমেই আস্থা হারিয়ে ফেলছিলেন। রাসূলুল্লাহর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে যায়িদ মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে হিব্রু ভাষা রীতিমতো রপ্ত করে ফেললেন!
সাহাবিরা রাসূলুল্লাহর যে কোনো আদেশে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। আরবি ভাষা শিখতে আগ্রহী ভাই বোনদের জন্য নিঃসন্দেহে এই ঘটনা একটা বড় অনুপ্রেরণা। কোনো কাজে পদক্ষেপ নিতে বছরের পর বছর সময় লাগিয়ে দেওয়া উচিত নয়। মুসলিমদের জন্য আরবি ভাষা শেখা অনেক জরুরি। আরবি ভাষা থেকে দূরত্বের কারণে ইসলাম থেকেও মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ইসলামী শরীয়াহর মূল দুটি উৎস, কুরআন এবং হাদীস; দুটোই আরবি। আরবি না জানলে এগুলো থেকে উপকৃত হওয়া কঠিন। যদি যায়িদ একটি বিদেশী ভাষা ১৫ দিনের মাথায় শিখে ফেলতে পারেন, তাহলে সে ভাষা শেখার ব্যাপারে কী অজুহাত থাকতে পারে যে ভাষা মুসলিমদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়?

ফন্ট সাইজ
15px
17px