📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আর-রাজীর মিশন: একটি মর্মান্তিক ঘটনা

📄 আর-রাজীর মিশন: একটি মর্মান্তিক ঘটনা


এই মিশনে আল্লাহর রাসূল ﷺ রাযী নামক একটি স্থানে দশজনের একটি ছোট্ট দল প্রেরণ করেন। কারো কারো মতে, এই দলটি পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল শত্রুদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা। তবে আল ওয়াক্বিদী বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, আল্লাহর রাসূল এই দলটি পাঠিয়েছিলেন 'কাররাহ' এবং 'আদুল' এই দুই গোত্রের অনুরোধে। তারা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বলেছিল, 'আমরা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। আপনি আমাদের কাছে কয়েকজন সাহাবিকে পাঠিয়ে দিন। আমরা তাদের কাছে দ্বীন বুঝবো, কুরআন শিখবো এবং ইসলামের হুকুম আহকাম সম্পর্কে জানতে পারবো।' রাসূলুল্লাহ ﷺ আসিম ইবন সাবিত আল-আকলাহর নেতৃত্বে দশ জন সাহাবির একটি ছোট্ট দল তাদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
কিন্তু 'কাররাহ' ও 'আদুল' গোত্রদুটো মিথ্যে বলেছিল। আল-ওয়াক্বিদীর মতে, খালিদ ইবন সুফিয়ানকে হত্যা করার পর হুযাইল গোত্রের একটি উপগোত্র বনু লায়হান প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। তারা এই দুটি গোত্রকে ঘুষের বিনিময়ে রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে প্রতারণা করে কিছু সাহাবিকে আটক করার প্রস্তাব দেয় যেন তারা এই সাহাবিদেরকে কুরাইশদের কাছে বেচে দিতে পারে। কাররাহ ও আদুল গোত্রদুটো প্রস্তাবে রাজি হয়।
আসিম ইবন সাবিতের নেতৃত্বে দশ জনের দলটি উসফান ও মক্কার মাঝামাঝি বনু লাইহান গোত্রের ভূমিতে যখন পৌঁছলো, তখন প্রায় ১০০ জনের তীরন্দাজ বাহিনী তাদের ঘিরে ধরে। আসিম ইবন সাবিত বুঝতে পারলেন তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। জান বাঁচানোর জন্য একটি ছোট পাহাড়ে তারা পালিয়ে গেলেন। মুশরিকদের পক্ষ থেকে তাদের বলা হলো, 'যদি তোমরা আত্মসমর্পণ করো, তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।'
মুসলিমদের আমীর আসিম বুঝতে পারলেন তারা মিথ্যা বলছে। যদি ছেড়েই দেওয়া হয়, তাহলে আটক করা কেন? আসিম ইবন সাবিত তাদের কথায় টললেন না, বললেন, 'মুশরিকদের অঙ্গীকারে আমি বিশ্বাস করি না!' আর এই বলে আসিম একের পর এক তীর ছুঁড়তে লাগলেন। একে একে সবগুলো তীর শেষ হয়ে গেল, রয়ে গেল কেবল একটি তলোয়ার। এরপর আসিম আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, 'জীবিত থাকতে তোমার জন্য লড়েছি হে আল্লাহ! মরে যাওয়ার পর তুমি আমার দেহকে সুরক্ষিত রেখো!' এরপর তিনি তলোয়ার হাতে লড়ে গেলেন শত্রুদের সাথে। দুজনকে হত্যা করলেন, একজনকে আহত করলেন। যুদ্ধ করতে করতে একসময় তার তরবারি ভেঙে গেল, বনু লায়হানের লোকেরা তাকে হত্যা করলো। ইসলামের এক নির্ভীক সৈনিক শহীদ হলেন।
কেন তিনি আল্লাহর কাছে তার দেহকে সুরক্ষিত করার জন্য দুআ করেছিলেন? কারণ বনু লাইহানের লোকেরা মুসলিমদের হত্যা করে তাদের দেহ বিবস্ত্র করছিল। তাছাড়া আসিমের প্রতি সেই গোত্রের এক মহিলার ছিল তীব্র বিদ্বেষ, কারণ তার দুই ছেলেকে তিনি হত্যা করেছিলেন। সেই মহিলা শপথ করেছিল কেউ যদি আসিমের কাটা মাথা তার কাছে নিয়ে আসতে পারে তবে সেই আসিমের খুলিতে মদ পান করবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আসিমের দুআ কবুল করেছিলেন। তার মৃতদেহ রক্ষার জন্য এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠালেন। যখনই কেউ তাঁর মৃতদেহের কাছে যেতে চাচ্ছিল, তখনই সেই মৌমাছির দল তাদের ওপর চড়াও হচ্ছিল। তারা ভাবলো পরের দিন এসে লাশ নিয়ে যাবে। কিন্তু সে রাতেই প্রবল বৃষ্টিতে তাঁর মৃতদেহ ভেসে যায়। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে মর্যাদাহানি থেকে রক্ষা করলেন এবং তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করলেন। আল্লাহ চাইলে কী না হয়! বৃষ্টির পানি, অবুঝ মৌমাছিও মু'মিনের জন্য বন্ধু হয়ে যায়!
যুদ্ধ চলছে। মুসলিমদের দশ জনের মধ্যে সাত জন যোদ্ধা যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে গেলেন, বাকি থাকলেন তিন জন। পালিয়ে যাওয়া অথবা শত্রুদের সাথে পেরে ওঠা -- কোনোভাবেই তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই বাঁচবার আশায় তারা অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হলেন। কিন্তু অস্ত্র ফেলে দেওয়ার সাথে সাথে তাদেরকে আক্রমণ করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হলো।
আবদুল্লাহ ইবন তারিক বুঝতে পারলেন এবারও তাদেরকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে, তিনি কোনোভাবে দড়ির মধ্য থেকে তার হাত বের করে তলোয়ার হাতে নিয়ে শত্রুদের আক্রমণ করার চেষ্টা করলেন কিন্তু তারা ছিল নাগালের বাইরে। শত্রুরা এরপর তাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করলো। তিনিও শহীদ হয়ে গেলেন।
বাকি ছিল দুজন খুবাইব ইবন আদী এবং যাইদ ইবন আদদিসিনা তাদেরকে বনু লায়হান কুরাইশদের কাছে বিক্রি করে দিল।
কুরাইশরা তাদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। তবুও আবু সুফিয়ান তাদের টলাবার জন্যই যেন জিজ্ঞেস করলো, 'আচ্ছা, তোমাদের কি ইচ্ছে হয় না যে আজকে তোমাদের জায়গায় মুহাম্মাদ থাকতো, আর তোমরা তোমাদের পরিবারের সাথে নিরাপদে থাকতে?'
খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এমন চিন্তা করাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু তারা উত্তর দিলেন,
'না! আল্লাহর কসম করে বলছি, আমরা মরতে রাজি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলের গায়ে মদীনার একটি কাঁটা বিঁধতে দিতেও রাজি নই। আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকবো, আর আল্লাহর রাসূলের গায়ে একটা টোকা লাগবে, তা হতে দেবো না!'
এই কথা শুনে আবু সুফিয়ান যেন কিছুটা অভিভূত হলো। সে বললো,
'আমি এমন মানুষ আগে কখনো দেখিনি যারা তাদের নেতাকে এতটা ভালোবাসে...'
পাঠক, একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাববার সময় এসেছে। ভেবে দেখার সময় এসেছে রাসূলুল্লাহকে সাহাবিরা কতটা ভালোবাসতেন! শত্রুরাও পর্যন্ত এই ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে বারবার। ভালোবাসা মানে এই নয় যে দিন-রাত আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে শুধু কথা হবে, মিলাদ-মাহফিল হবে। আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসা মানে তাঁর দেখানো পথে চলা, যত কষ্টই হোক। সাহাবিরা শরীরের রক্ত দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন তাদের হৃদয়ে নবীজির জন্য কতটা গভীর ভালোবাসা ছিল। শত্রুরা পর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে মুহাম্মাদের প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা নজিরবিহীন।
খুবাইবকে কুরাইশরা নির্মমভাবে শুলে চড়িয়ে হত্যা করে। হত্যার আগে তাকে আল-হারিসের বাড়িতে রাখা হয়। সে সময়ে কোনো কারাগার ছিল না। খুবাইব বদরের যুদ্ধে আল হারিসকে হত্যা করেছিলেন। বন্দী খুবাইব আল-হারিসের মেয়েকে বললেন, 'আপনি কি আমার জন্য একটি ব্লেড এনে দিতে পারবেন? আমি নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করতে চাই।' খুবাইব নাভির নিম্নাংশ পরিষ্কার করতে চাচ্ছিলেন, এটি একটি সুন্নাহ। মহিলা তার বাচ্চাকে দিয়ে তাঁর কাছে একটি ব্লেড পাঠিয়ে দিল।
এভাবে বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল। খুবাইবের সাথে বাচ্চাটির বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এতই ভাল যে, বাচ্চাটি তাঁর কোলে উঠে বসে থাকে। মহিলার হঠাৎ হুঁশ হলো তার বাচ্চার কোনো হদিস নেই। তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি ভেঙে এসে সে দেখলো তার বাচ্চা খুবাইবের কোলে বসা আর খুবাইবের হাতে একটি ব্লেড।
এই দৃশ্য দেখে মহিলা আতঙ্কে জমে গেল। তার বাবার হত্যাকারী খুবাইবের হাতে ব্লেড আর কোলে তার বাচ্চা! খুবাইব তাকে অভয় দিয়ে বললেন, 'ভয়ের কিছু নেই। আপনি যা আশঙ্কা করছেন, সেরকম কিছুই আমি করবো না ইনশা আল্লাহ।'
এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, খুবাইব জানতেন তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু এজন্য তিনি বাচ্চাটিকে হত্যা করে তার প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। যদিও তিনি চাইলেই তা করতে পারতেন। ইচ্ছে করে নিরপরাধ কাউকে হত্যা করা একজন মুসলিমের জন্য সংগত নয়। একজন মুসলিম কখনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে কোনো কাফিরকে হত্যা করে না। কারণ, জিহাদ কেবল আল্লাহর জন্যে। খুবাইবের এই আচরণে সেই মহিলা মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,
'উনার চাইতে ভালো কোনো কয়েদী আমি দেখিনি। আমি তাঁর রুমে গিয়ে দেখতাম তিনি প্লেট ভর্তি আঙুর খাচ্ছেন! অথচ মক্কার কোথাও তখন আঙুর পাওয়া যেত না। আমি নিশ্চিত ঐ আঙুরগুলো ফেরেশতাদের কাছ থেকে এসেছে।'
শূলে চড়ানোর আগে তিনি দুই রাকাত সালাত আদায় করতে চাইলেন। তাকে সে সুযোগ দেওয়া হলো। মৃত্যুর আগের শেষ কাজ। চাইলেই তিনি লম্বাচওড়া করে সালাত পড়ে মৃত্যুর সময়টা আরেকটু বিলম্ব করতে পারতেন। খুবাইব তা করেননি। সালাত শেষ করে তিনি তাদের দিকে ফিরে বললেন, 'শোনো, তোমরা আমাকে মৃত্যুভয়ে ভীত হওয়ার অপবাদ না দিলে আমি এই দু'রাকাত সালাত আরও দীর্ঘ করতাম।'
কেউ যদি মর্যাদা কী জিনিস তা বুঝতে চায়, তবে খুবাইব একজন উজ্জ্বল উদাহরণ। মৃত্যুর আগে দু'রাকাত সালাত আদায়ের এই সুন্নাহ খুবাইব প্রচলন করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি দুআ করে যান,
'হে আল্লাহ, এদের গুনে গুনে হত্যা করুন। একজনকেও ছাড়বেন না।'
আরেক বন্দী যাইদ ইবন আদদিসিনাকে কিনে নেয় সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাহ। পিতৃহত্যার প্রতিশোধে সে যাইদকে হত্যা করে। আর-রাযীর মিশনে দশজনের প্রত্যেকে মৃত্যুবরণ করলেন। মুনাফিক্বরা বলাবলি করতে লাগলো, 'আহারে, এদের ভাগ্যটাই খারাপ! না পারলো তারা পরিবারের সাথে থাকতে, না পারলো যুদ্ধে জিততে! এভাবে মরে গিয়ে লাভ কী?' ইনিয়ে বিনিয়ে এটাই বলতে চাচ্ছিল যে, এই দশজনের জীবন ব্যর্থ! অভিযান তো সফল হলোই না বরং তারা নিজেদের জীবনটাই হারালো। বাড়িতে বসে থাকলেই কাজের কাজ হতো। এই মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আয়াত নাযিল করেছেন,
"এবং মানুষের মধ্যের যারা পার্থিব জীবনের কথাবার্তায় আপনাকে মোহিত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ সাক্ষী রাখে, মূলত সে আপনার কঠোর বিরোধী।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: ২০৪)
আর সেই দশজনের প্রশংসায় আল্লাহ বললেন,
"আর অনেকেই রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিজের জীবন সমর্পণ করে দেয় এবং আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি দয়াবান।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: ২০৭)
এই আয়াতগুলো এই ঘটনার প্রসঙ্গে নাযিল হয়। আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলিমদের শিক্ষা দিচ্ছেন, যুদ্ধে জয় পরাজয় আসল কথা নয়, আসল কথা হলো এই, তারা আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আর আল্লাহই তাদেরকে পুরষ্কৃত করবেন।

টিকাঃ
22 সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১।
23 আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৮৪।
24 সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বীর মাউনার হত্যাকাণ্ড

📄 বীর মাউনার হত্যাকাণ্ড


নজদের বনু আমর গোত্রের নেতৃস্থানীয় এক মাথামোটা ব্যক্তির নাম আমীর ইবন আত-তুফাইল। তার না ছিল চিন্তাশক্তি, আর না ছিল সুবুদ্ধি। কিন্তু ঔদ্ধত্য ছিল আকাশছোঁয়া। সে সমগ্র আরবের রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। অথচ নিজের গোত্রের নেতাও সে নয়। সে রাসূলুল্লাহকে একবার প্রস্তাব দিল,
'হে মুহাম্মাদ! আমি আপনাকে তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি। প্রথম প্রস্তাব হচ্ছে, আপনি এই শহরের রাজা হবেন এবং আমি হবো বেদুইনদের শাসনকর্তা। দ্বিতীয় প্রস্তাব হচ্ছে, আপনি আমাকে আপনার মৃত্যুর পর খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করে যাবেন। আর শেষ প্রস্তাব হচ্ছে আমি বনু গাতফানের এক হাজার পুরুষ আর এক হাজার নারী নিয়ে আপনার ওপর হামলা করবো।'
বলা বাহুল্য, রাসূলুল্লাহ তাকে পাত্তাই দেননি। তার একটি প্রস্তাবেও রাজি হননি। এর সূত্র ধরে সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে একদিন সেই বনু আমর গোত্রের প্রধান নেতা আবু বারা আমীর ইবন মালিক রাসূলুল্লাহর কাছে উপহার নিয়ে আসে। সে বললো, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি যদি নজদের লোকদের মাঝে আপনার সাহাবিদের পাঠান, তাহলে আমার বিশ্বাস তারা ইসলাম গ্রহণ করবে।' সে নিজে মুসলিম না হলেও ইসলামের প্রতি বেশ আন্তরিক ও আগ্রহী ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের নজদে পাঠাতে ভরসা পেলেন না। কারণ তার কিছুদিন আগেই প্রতারণা করে দশ জন সাহাবিকে আর-রাজীতে হত্যা করা হয়েছে। আবু বারা তখন সেই সাহাবিদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলে রাসূলুল্লাহ রাজি হন। রাসূলুল্লাহ তখন ৭০ জন সাহাবি পাঠালেন। এদের বলা হতো আল-কুররা, অর্থাৎ 'কুরআন তিলাওয়াতকারী'। তারা দিনের বেলা কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন আর রাতের বেলা কিয়ামুল লাইলে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এটাই ছিল তাঁদের জীবনযাপনের ধরন। তাদেরকে নজদে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠানো হলো।
আমীর ইবন আত-তুফাইল ছিল গোত্রনেতা আবু বারার ভাতিজা। সাহাবিদের আগমনের খবর শুনে তার মাথা খারাপ হয়ে গেল। সে তার চাচার কথার বিরুদ্ধে গিয়ে বনু সুলাইম গোত্রের লোকদের নিয়ে সত্তর জন সাহাবির ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিল। একশোর ওপরে তীরন্দাজ যোগাড় করে সে বি'র মাউনা জলাশয়ের কাছে সাহাবিদের ওপর হামলা চালালো। সাহাবিরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করলেন। ৭০ জনের মধ্যে এক জন ছাড়া সবাই শহীদ হয়ে গেলেন।
শুধুমাত্র একজন কুরার জীবন বেঁচে গিয়েছিল। তিনি হলেন আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরি। তারা তাকে বন্দী করলেও মুযার গোত্রের হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়। আমীর ইবন তুফাইলের মা শপথ করেছিল যে, সে মুযার গোত্রের এক লোককে মুক্ত করবে। তাই মায়ের শপথ রক্ষার্থে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছালে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। সেই সমাজে সত্তর জন সাহাবির মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়ার মতো কোনো খবর ছিল না। তারা ছিলেন ইসলামের দাঈ। কিন্তু তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই সত্তর জন সাহাবি যেনতেন কেউ ছিলেন না। তারা কুরআন অধ্যয়ন করতেন। রাতের বেলা একসাথে বসে কুরআন নিয়ে পড়াশোনা করতেন। আর দিনের বেলা মসজিদে পানি নিয়ে আসতেন। কাঠ বিক্রি করে সেই টাকা আহলুস সুফফার জন্য ব্যয় করতেন। তারা ছিলেন সবাই উঁচু পর্যায়ের সাহাবি।
রাসূলুল্লাহ দুআ কুনূত পড়া শুরু করলেন। দুআ কুনুত পড়ার এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। ফজর, যুহর, আসর, মাগরিব ও ইশা -- সব ওয়াক্তের সালাতেই তিনি দুআটি পড়লেন। টানা কয়েক মাস ধরে প্রত্যেক সালাতে তিনি তাদের বিরুদ্ধে দুআ করলেন। তিনি দুআ করলেন সুলাইম গোত্রের বিভিন্ন উপগোত্র রা'ইল, যাকওয়ান এবং উসাইয়া গোত্রের বিরুদ্ধে। তারা এই মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করেছিল এবং তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছিল। রাসূলুল্লাহর দুআর ফল তারা পেয়েছিল। শত্রুদের সেই ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে আলোচনা হবে ষষ্ঠ হিজরির অংশে।
শিক্ষা
#১ রাসূলুল্লাহর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল অতর্কিতে আক্রমণ করে শত্রুকে অপ্রস্তুত ও ভীত-সন্ত্রস্ত করে ফেলা ছিল রাসূলুল্লাহর যুদ্ধের একটি নিয়মিত কৌশল। এভাবে তিনি শত্রুর মনে ভয় ধরিয়ে দিতেন এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দিতেন। বনু আসাদ গোত্র ভাবতেই পারেনি তারা আক্রমণ করার আগে মুসলিমরা তাদের ওপর এভাবে প্রচণ্ড হামলা চালাবে। অথচ এরাই কি না মাত্র উহুদে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছে। এই আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের সাথে চুক্তিতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
#২ গুপ্তহত্যার কারণ অনেক মানুষ বিশ্বাসই করতে চায় না রাসূলুল্লাহ এসব গুপ্তহত্যার আদেশ দিয়েছেন। আসলে এই ধরনের রাজনৈতিক গুপ্তহত্যাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল অহেতুক রক্তপাত বন্ধ করা। খালিদ ইবন সুফিয়ানের পুরো গোত্রের সাথে যুদ্ধ না করে শুধু তাদের নেতা খালিদকেই হত্যা করা হয়েছিল। তার গোত্রের অন্য লোকেরা রাসূলুল্লাহর সাথে যুদ্ধ করতে তেমন আগ্রহী ছিল না। কিন্তু খালিদ ইবন সুফিয়ান ছিল এতটাই শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি যে, তার কথায় বাকিরাও যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হতো। সে ছিল নাটের গুরু, যাবতীয় কলকাঠি সে-ই নাড়াচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন যদি তাকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তার পুরো গোত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। এবং তিনি তা-ই করেছিলেন। ফলে হুযাইল গোত্র যুদ্ধের চিন্তা ছেড়ে দেয়। সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক সময়ে হত্যা করার মাধ্যমে পুরো বিষয়টা মোটামুটি রক্তপাতহীনভাবে সমাধান হয়ে যায়।
#৩ সুন্নাহর প্রতি সাহাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবায়েব যখন কুরাইশদের হাতে বন্দী, মৃত্যু তখন তার দরজায় কড়া নাড়ছে। তিনি জানতেন আর কিছুদিন পরেই তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু তবুও তিনি রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ ছাড়তে চাননি। আর তাই নাভির নিম্নাংশ পরিষ্কার করার জন্য ব্লেড চেয়েছেন। সাহাবিরা কোনো সুন্নাহকে 'ছোটখাটো' মনে করতেন না। তারা সব সুন্নাহ পালনে সচেষ্ট ছিলেন।
#৪ 'কাবার রবের শপথ! আমি সফল হয়েছি!' বি'র মাউনার মিশনে মুসলিমদের আমীর ছিলেন হারাম ইবন মিলহান। তাকে হঠাৎ করে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি যখন দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, তখন আমীর ইবন আত-তুফাইল তার এক লোককে ইশারায় হত্যার নির্দেশ দেয়। যে লোকটিকে ইশারা করা হয়েছিল তার নাম জাব্বার। জাব্বার হঠাৎ করে হারামের পিছনে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো, বর্শার ফলা হারাম ইবন মিলহানের বুক ভেদ করে বের হয়ে এল। হারাম তখন বলে উঠলেন, 'কাবার রবের শপথ! নিশ্চয়ই আমি সফল হয়েছি!' ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই বিস্মিত। তাদের চোখেমুখে অবিশ্বাস! তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না একটা মানুষ মারা যাচ্ছে আর সে বলছে সে সফল!
কথাগুলো হত্যাকারী জাব্বারের জন্য ছিল একটা বিরাট ধাক্কা। সে পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছিল। তার মুসলিম হওয়ার কাহিনী সে নিজেই বর্ণনা করেছে, 'আমি তাকে পিছন থেকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করলাম আর সে বলে উঠলো, 'কাবার রবের শপথ! আমি সফল হয়েছি!' আমি খুব অবাক হলাম, এই কথা সে কেন বললো? অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, এই কথা দিয়ে সে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে। তারা বললো, তিনি শহীদি মৃত্যু লাভ করেছেন তাই নিজেকে সফল বলছেন। তারা আমার কাছে বুঝিয়ে বললো শহীদ মানে কী। আমি সব শুনে বললাম, সে ঠিকই বলেছে। আসলেই সে সফল হয়েছে।' এই ঘটনার সূত্র ধরেই জাব্বার মুসলিম হয়ে যায়।
হারাম ইবন মিলহান ছিলেন একজন শহীদ এবং একই সাথে দাঈ। মৃত্যুর সময় তার বলা কথাগুলোও ছিল ইসলামের দিকে দাওয়াত। মৃত্যুর মুহূর্তেও তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করে গেছেন। আর তার বলা কথাগুলো অনুধাবন করতে পেরে খোদ তার হত্যাকারীই ইসলাম গ্রহণ করে।
#৫ আবদুল্লাহ ইবন উনাইসের সালাত থেকে শিক্ষা আবদুল্লাহ ইবন উনাইস ছিলেন একটি গুপ্তহত্যার অপারেশনে। তিনি ভয়ে কাঁপছেন, কিন্তু ঠিকই হেঁটে হেঁটে সালাত আদায় করেছেন। সালাতের ব্যাপারে সাহাবিদের এতটুকু ঢিলেমি ছিল না। সাহাবিদেরকে দাজ্জালের ব্যাপারে সাবধান করতে গিয়ে বলা হলো যে, সেসময়ের একেকটি দিন একেকটি বছরের সমান হবে। তখন তাদের প্রথম প্রশ্নটি ছিল, এক বছরের সমান দিনে তারা কীভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবেন। একটি দিন কীভাবে এক বছরের সমান হতে পারে, সেই আলোচনা বা কুতর্কে তারা যাওয়ার চেষ্টাই করেননি। অথচ এটাই আমরা সচরাচর করে থাকি। আমরা অতি সামান্য অজুহাতে, অসুস্থতায় সালাত ছেড়ে দিই বা কাযা করি। অথচ আবদুল্লাহ ইবন উনাইস এর চাইতেও শতগুণ কঠিন পরিস্থিতিতে সালাত আদায় করেছেন।
#৬ হাসসান ইবন সাবিতের মিডিয়া যুদ্ধ বি'র মাউনার হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা আমীর ইবন আত-তুফাইলের বিরুদ্ধে হাসসান ইবন সাবিত ব্যাপক মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করেন। তিনি বি'র মাউনার বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে একের পর এক কবিতা লেখেন। কবিতার মাধ্যমে বনু আমর গোত্রের নেতা আবু বারার ছেলে রাবীয়াহকে ক্ষেপিয়ে তোলেন যেন সে তার চাচাতো ভাই আমীর ইবন তুফাইলের ওপর প্রতিশোধ নেয়। কেননা এই আমীর ইবন তুফাইল তার বাবার বিরুদ্ধাচরণ করে মুসলিমদের হত্যা করেছে। পুরো বিষয়টা আবু বারার জন্য বেশ মানহানিকর ছিল। হাসসানের লেখা কবিতা আরবদের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। রাবীয়াহর মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। কীভাবে সে তার পিতার অপমানে চুপ থাকতে পারে? সে সিদ্ধান্ত নেয় আমীরকে মেরে হত্যা করবে। হত্যার উদ্দেশ্যে সে তলোয়ার নিয়ে আমীরকে আঘাতও করে। আমীর আহত হয়, তবে বিষয়টা আর বেশিদূর গড়ায়নি। আমীর পরবর্তীতে বাজে ধরনের প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়। একসময়ে যে আরব জয়ের স্বপ্ন দেখতো, সে আমীর একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। প্লেগ সংক্রমণের ভয়ে সবাই তাকে পরিত্যাগ করে। একাকি, ক্লান্ত আর হতাশ আমীর পাগল অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।
#৭ কষ্ট ছাড়া বিজয় আসে না আর রাযী এবং বি'র মাউনার হত্যাকাণ্ড থেকে এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। উহুদের পরাজয়, এরপর চারপাশে গোত্রের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা, আচমকা হামলার পরিকল্পনা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং অনেকগুলো মুসলিম প্রাণের ঝরে যাওয়া -- এগুলো কিছুই সাহাবিদের দমাতে পারেনি। তারা জানতেন, এই ত্যাগ, এই রক্তের মাধ্যমে বিজয় আসবে। সবকিছুরই একটি মূল্য আছে। আর বিজয়েরও মূল্য আছে। তাই ইসলামের ইতিহাসে পরাজয়গুলো হলো মূল্য। আর বিজয়গুলো হলো সেই মূল্যের বিনিময়ে প্রাপ্তি।

টিকাঃ
25 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ইমারাহ, হাদীস ২১২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কুরআনের প্রতি ভালোবাসা: আব্বাদ ইবন বিশর ؓ

📄 কুরআনের প্রতি ভালোবাসা: আব্বাদ ইবন বিশর ؓ


সে রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আম্মার ইবন ইয়াসির ও আব্বাদ ইবন বিশরকে প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। দুজন পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছেন। আম্মারের ঘুমের পালা এল, আব্বাদ বসে না থেকে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিরাত পাঠ করছেন, এমন সময় শত্রুর একটি তীর এসে বিঁধলো। মুহূর্তের মধ্যে গলগল করে বেরিয়ে এল তাজা রক্ত। কিন্তু সেদিকে আব্বাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! তিলাওয়াত করছেন তো করছেন। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে তাঁর কিরাতের সুর।

শত্রু আবারও আঘাত হানল। গায়ে বিঁধলো আরেকটি তীর, এরপর আরও একটি। তিন নম্বর তীর বিদ্ধ হওয়ার পর আম্মারকে ঘুম থেকে ডাকলেন। আম্মার উঠে দেখলেন আব্বাদের শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছে।
- সুবহানাল্লাহ! আপনি এতক্ষণ আমাকে ঘুম থেকে ডাকলেন না কেন?
- সূরাটা শেষ না করে তিলাওয়াত থামাতে চাচ্ছিলাম না। আল্লাহর কসম, আজ যদি পাহারার দায়িত্বে না থাকতাম, তাহলে সূরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিলাওয়াত চালিয়ে যেতাম, মৃত্যু হলেও পরোয়া করতাম না।

কুরআনের প্রতি সাহাবিদের এ এক অদ্ভুত রকমের ভালোবাসা! একটা মানুষকে একের পর এক তীর বিদ্ধ করে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে তিলাওয়াতে। আবার তিলাওয়াতে বিভোর হয়েও মানুষটা তাঁর দায়িত্ব ভোলেনি, পাহারা দেওয়ার কথা তাঁর ঠিক মনে ছিল। এভাবেই সাহাবিরা তাদের দায়িত্বের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রাসূলুল্লাহ ﷽ যখন বন্ধুঃ একজন তরুণ সাহাবির সাথে রাসূলুল্লাহর ﷽ কথোপকথন

📄 রাসূলুল্লাহ ﷽ যখন বন্ধুঃ একজন তরুণ সাহাবির সাথে রাসূলুল্লাহর ﷽ কথোপকথন


জাবির ইবন আবদুল্লাহ ছিলেন একজন শহীদের সন্তান। তাঁর বাবা উহুদের শহীদ। এই অভিযানে রাসূলুল্লাহর সাথে তাঁর অনেক সময় একসাথে কাটানোর সুযোগ হয়। ঘটনাটি জাবিরের মুখে শোনা যাক:

'যাত আর-রিকার অভিযানে বেরিয়েছি একটা দুবলা পাতলা উট নিয়ে। বাকিরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমি পেছনে পড়ে যাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ আমাকে ডাক দিলেন,
- জাবির! কী হলো?
- উটটার কারণে বারবার পেছনে পড়ে যাচ্ছি রাসূলুল্লাহ।
- আচ্ছা তুমি উটটাকে বসাও তো। আর তোমার হাতের ছড়িটা আমাকে দাও নয়তো একটা ডাল ভেঙে আনো।

আমি হাতের ছড়িটা এগিয়ে দিলাম। তিনি ছড়ি দিয়ে উটকে কয়েকটা খোঁচা দিয়ে বললেন, উঠে পড়ো। উটের পিঠে উঠলাম, অবাক হয়ে দেখি আমার উট রীতিমতো দৌড়াচ্ছে। রাসূলুল্লাহর উটের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে! রাসূলুল্লাহর সাথে গল্প করতে করতে চলছি, হঠাৎ তিনি বললেন,
- জাবির, তোমার উটটা আমার কাছে বিক্রি করবে?
- নাহ, আমি আপনাকে এমনিই এটা দিয়ে দেবো, উপহার হিসেবে।
- না, না, আমি কিনতে চাই।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে কত দেবেন? এক দিরহাম দিলে হবে? (রাসূলুল্লাহ রসিকতা করলেন।)
- নাহ! তাহলে তো আমি ঠকে যাবো।
- ঠিক আছে তাহলে দুই দিরহাম দিলে চলবে?
- না, না, আরও চাই!

রাসূলুল্লাহ উটের দাম বাড়াতে লাগলেন, দাম এক উকিয়ায় (চল্লিশ দিরহাম) গিয়ে ঠেকলো। রাজি হয়ে গেলাম, বললাম,
- আপনি এই দামে খুশি তো?
- হ্যাঁ।
- ঠিক আছে এই উটের মালিক এখন আপনি!

রাসূলুল্লাহর মধ্যে নেতাসুলভ মেকি গাম্ভীর্য ছিল না। তরুণ সাহাবিদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে যেতেন। জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর বিয়ের কথা।
- আচ্ছা জাবির, তুমি কি বিবাহিত?
- হ্যাঁ রাসূলুল্লাহ, বিয়ে করেছি।
- কুমারী?
- না।
- কুমারী বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তো তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতে পারতে, সেও পারত।
- আসলে, আমার বাবা সাত মেয়ে রেখে মারা গেছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য অভিজ্ঞ মানুষ প্রয়োজন। তাই বয়স্ক একজনকে বিয়ে করেছি।
- ইনশা আল্লাহ, আমার মনে হয় তুমি ঠিক কাজই করেছো।

রাসূলুল্লাহ জাবিরের ওয়ালিমার আয়োজন করতে চাইলেন। বললেন, 'শোনো জাবির, আমরা যদি সিরারে পৌঁছতে পারি, তাহলে কিছু উট জবাই করবো। রাতটা সেখানেই কাটাবো। তোমরা আমাদের জন্য বালিশের ব্যবস্থা কোরো।' জাবির বললেন, 'আমাদের তো বালিশই নেই আল্লাহর রাসূল!' রাসূলুল্লাহ অভয় দিলেন, 'চিন্তা কোরো না, এখন না থাকলেও তখন থাকবে।'

সিরারে সেদিন জাবিরের বিয়ে উপলক্ষে উট জবাই করা হলো। রাসূলুল্লাহ জাবিরকে স্ত্রীর সাথে রাত কাটাতে বললেন। পরদিন সকালের কথা। জাবির বলেন,

'পরদিন সকালে সেই উটটা নিয়ে বের হলাম। রাসূলুল্লাহর ঘরের দরজার সামনে উটটাকে বেঁধে রেখে আসলাম। উটের ওপর চোখ পড়তেই আল্লাহর রাসূল জানতে চাইলেন,
- এটা কার উট?
- জাবির এই উট আপনার জন্য নিয়ে এসেছে। (উপস্থিত সাহাবিরা জবাব দিল।)
- জাবিরকে ডেকে পাঠাও।

আমি গেলাম। আমাকে বললেন, ভাতিজা শোনো, এই উট নিয়ে যাও, তোমার উট তোমারই থাকবে। বিলালকে ডেকে বললেন, যাও, জাবিরকে এক উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে আসো। আমি বিলালের সাথে গেলাম। তিনি আমাকে এক উকিয়া স্বর্ণ থেকেও কিছুটা বেশি দিলেন। আল্লাহর কসম! এরপর থেকে আমার আর্থিক অবস্থা ক্রমেই ভালো হতে থাকে, যতদিন না আমাদের ওপর ইয়াউম আল হাররার দুর্দশা আপতিত হয়।'

আসলে কিছু মানুষ দান করার সময় বুঝতেও দেয় না যে তারা দান করছে। রাসূলুল্লাহ চাচ্ছিলেন জাবিরকে সাহায্য করতে। উট কেনার কথা, দরদাম করা এসব ছিল বাহানা মাত্র। সাহাবিদের জন্য তাঁর মমতা পৃথিবীর কোনো দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যাবে না। তিনি তাঁদের ভালো-মন্দের খেয়াল রাখতেন, নিজে না খেয়ে তাঁদের খাওয়াতেন। মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত গুণ নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি।

টিকাঃ
২৭. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৬।
২৮. ইয়াউম আল হাররা অনেক দিন পরের একটি ঘটনা। এটি ছিল মদীনাবাসীর একটি দুর্যোগের দিন, সেদিন অনেকে নিহত হয়। মুসলিমদের অন্তর্কোন্দলের এ ঘটনাটি ঘটে হিজরী ৬৩ সালে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px