📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 শেষ ভালো যার, সব ভালো তার

📄 শেষ ভালো যার, সব ভালো তার


মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়। এমন একজন হলো কাযমান।

১) কাযমান
তার নাম কাযমান অথবা কুযমান। ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'

সাহাবিরা অবাক হলেন, কাযমান কীভাবে জাহান্নামী হতে পারে! সে তো মুসলিমদের পক্ষে বীরের মতো লড়ছে! কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। শরীরে আঘাতের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বললো, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।'

রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে। এ কারণে তার স্থান ছিল জাহান্নাম। কাজেই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করাটাই সব নয়। বরং যুদ্ধ হতে হবে সঠিক আক্বীদা বিশ্বাসের জন্য।

২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। যদিও রাসূলুল্লাহ তাদের কাছে কোনো সাহায্য চাননি। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বললো, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা বললো, 'আজকে তো শনিবার, আজকে আবার কীসের যুদ্ধ?' মুসলিমদের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ইহুদিদের গড়িমসি দেখে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা খরচ করবেন।'

এই বলে সে বেরিয়ে পড়লো। যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ।

মুখাইরিক মুসলিম ছিল নাকি অমুসলিম ছিল, তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁদের মতে, 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা', এই কথা দিয়ে আল্লাহর রাসূল জাতীয়তা বুঝিয়েছেন, দ্বীন বা ধর্ম বোঝাননি।

৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি, তার গোত্রের লোকদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে দেয়নি। সে ছিল মুশরিক। একদিন মদীনায় এসে বিভিন্ন লোকের খোঁজ করতে শুরু করছে, কিন্তু কেউই মদীনায় নেই!
- অমুক কোথায়? - উহুদে! - তমুক কোথায়? - সেও উহুদের ময়দানে!

উসাইরিম যার কথাই জানতে চায়, প্রত্যেকেই উহুদে! উসাইরিম বললো, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে তরবারি, বর্শা আর যুদ্ধ-সরঞ্জাম নিয়ে ঘোড়ায় চেপে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। মুসলিমরা তাকে দেখে অবাক! 'তুমি এখানে? চলে যাও তুমি!' উসাইরিম জবাব দিল, 'না, আমি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।

যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে, তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে খুব অবাক হলো। তারা বলাবলি করতে থাকলো, 'আরে উসাইরিম এখানে! সে তো কাফির ছিল বলেই জানতাম। সে এখানে কী করছে?' তারা উসাইরিমকে জিজ্ঞেস করলো,
- উসাইরিম, তুমি এখানে কীভাবে এলে? ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় নাকি স্বজাতির শক্তি বৃদ্ধিতে?
- আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। রাসূলুল্লাহর সমর্থনে যুদ্ধ করবো বলে হাতে তরবারি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। আমার অবস্থা তো তোমরা এখন দেখতেই পাচ্ছো।

এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! এই বিষয়টা নিয়ে আবু হুরায়রা সাহাবিদের কুইজ জিজ্ঞেস করতেন। উসাইরিম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ একটি চমৎকার কথা বলেছেন, 'তার আমল ছিল অল্প, কিন্তু যে পুরস্কার সে কামিয়ে নিয়েছে তা অসামান্য।' শাহাদাহ বা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া হলো এমন একটি কাজ যা মানুষকে জান্নাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বাদ বাকি সব আমল ছাড়াই মাত্র এই একটি আমলের মাধ্যমে সে জান্নাতে সবচেয়ে উঁচু অবস্থানে চলে যেতে পারবে। উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে, তাই সে জান্নাতে যাবে।

মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়।

১) কাযমান
ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'

যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বলল, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।' রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে।

২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বলল, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা Saturday/শনিবারের অযুহাত দিলে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ।'

যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হল ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি। একদিন মদীনায় এসে দেখল সবাই যুদ্ধ করার জন্য উহুদের ময়দানে গেছে। উসাইরিম বলল, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। যুদ্ধ করতে করতে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।

যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কীভাবে এলে? উসাইরিম বললেন, 'আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 উহুদের যুদ্ধে মু'জিযা

📄 উহুদের যুদ্ধে মু'জিযা


১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ: বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।

২. উবাই ইবন খালাফ: কুরাইশদের এই নেতা মাক্কী জীবনে নবীজিকে হুমকি দিত, 'এই যে মুহাম্মাদ, দেখো, দেখো! আমি এই ঘোড়াকে দিনে বারো মুঠো শস্য খাওয়াই। এর পিঠে চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করবো।' নবীজি তখন জবাব দিতেন, 'না, বরং আমিই তোকে হত্যা করবো!'

উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগলো। সাহাবিরা এগিয়ে গেলেন তাকে প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু নবীজি তাদের থামিয়ে দিলেন। একটি বর্শা হাতে নিয়ে সেটা ঝাঁকাতে শুরু করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। উবাই ইবন খালাফের সমস্ত দেহ ছিল বর্মে ঢাকা। একটা বর্শায় তাকে আক্রমণ করা অসম্ভব! কিন্তু নবীজির বর্শা আঘাত করলো ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে।

সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে তার লোকেদের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। তারা বললো, 'তোমার হয়েছেটা কী?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ আমাকে মেরে ফেলেছে!' তারা তার বর্ম খুললো কিন্তু গলার কাছে কোনো আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পেল না। এরপর বললো, 'তোমার তো কিছুই হয়নি। এত ভয় পাচ্ছো কেন?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ বলেছে সে আমাকে হত্যা করবে! সে যদি কিচ্ছু না করে শুধু আমার দিকে থুথু ছিটায়, তবুও আমি মারা যাব!' পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হলো উবাই ইবন খালাফ।

সীরাহ থেকে একটি বিষয় বার বার প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহর প্রতিটা কথায় এমনকি শত্রুরাও বিশ্বাস করতো! কুরাইশ কাফিররা অক্ষরে অক্ষরে রাসূলুল্লাহর কথা বিশ্বাস করতো। কিন্তু ঔদ্ধত্য আর অহংকারের কারণে তাঁকে নবী বলে মেনে নেয়নি। যেমন, এই ঘটনায় উবাই সামান্য একটু আঁচড় খেয়েই এত ভয় পেয়ে যায় যে, তার কাছে মনে হয় সে মারা গেছে। কারণ রাসূলুল্লাহ তাকে বহু আগে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিলেন। আর সেই হুমকি সত্য হওয়ার এই ঘটনা একটি মু'জিযাও বটে।

উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সে কেবলই পানি খেতে চাচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হলো সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। অনেক সময় কিছু মানুষ কাফিরদের প্রতি আল্লাহর আযাব, কিংবা মুসলিমদের আনন্দ ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করতে পারবে। এটা স্বপ্নেও হতে পারে অথবা সামনা-সামনিও হতে পারে। যেমন হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবন উমারের ক্ষেত্রে, তিনি সরাসরি শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।

টিকাঃ
20 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।

১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ
বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।

২. উবাই ইবন খালাফ
উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ ﷺ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। নবীজির বর্শা আঘাত করল ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে। সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হল উবাই ইবন খালাফ।

উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার রা. এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হল সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।

টিকাঃ
২০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা

📄 উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা


উম্মাহর জীবন থেকে জিহাদ অনুপস্থিত হয়ে পড়ায় মুসলিম নারীদের ভূমিকা অনেকাংশেই শুধুমাত্র পারিবারিক কাজে সীমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রথম যুগে বিষয়টা এমন ছিল না। সে সময়ে মুসলিম নারীরা জিহাদেও ভূমিকা রাখতেন। এ প্রসঙ্গে উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা নিয়ে না জানলেই নয়। মুসলিম ভাইদের জন্য যেমন আদর্শ প্রয়োজন, তেমনি মুসলিম বোনেরাও যেন আদর্শ হিসেবে সাহাবিয়াতদের অনুসরণ করতে পারেন সে জন্য এই আলোচনা জরুরি। বর্তমান যুগে মুসলিম নারী এবং পুরুষ উভয়েই এমনভাবে জীবন যাপন করছে যার সাথে সাহাবিদের জীবনযাত্রার কোনো মিল-ই নেই। অথচ এই সাহাবিরাই ইসলামকে সবচেয়ে সঠিকভাবে বুঝতেন। কাজেই আমরা যদি ইসলামের অনুসরণ করতে চাই, আমাদের সাহাবিদের দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে তারা কী করেছেন, কী করেননি। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু যুদ্ধের আনুষঙ্গিক কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

১) যোদ্ধাদের পানি সরবরাহ ও চিকিৎসা
উহুদের যুদ্ধে পানি সরবরাহ ও চিকিৎসার কাজে মুসলিম নারীরা সরাসরি অংশ নেন। আনাস ইবন মালিকের ভাষায়, 'সেদিন আমি দেখতে পেলাম আইশা বিনত আবু বকর আর উম্ম সুলাইম তাদের কাপড় গুটিয়ে কাজ করছেন। তাদের গোড়ালি দেখা যাচ্ছিল (এটা হিজাবের বিধান আসার আগের কথা)। তাঁরা নিজেদের কাঁধে পানির বালতি নিয়ে এক এক করে মুজাহিদ ভাইদের কাছে যাচ্ছেন আর তাদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছেন। বালতির পানি শেষ হয়ে গেলে তাঁরা ফিরে গিয়ে আবার বালতি ভরে আনছেন আর মুসলিম সৈন্যদের পানি সরবরাহ করছেন।' হামনাহ বিনতে আবি জাহশ এবং উম্ম আইমানও এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

এখানে দেখার মতো বিষয় হলো, সাহাবিদের জন্য জিহাদ কোনো ব্যক্তিগত কাজ ছিল না। এটা ছিল একটি পারিবারিক ও সামাজিক প্রচেষ্টা। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই জিহাদে নিজ নিজ ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছে। মুসলিমদের আমীর রাসূলুল্লাহর স্ত্রী হয়েও তারা মুসলিম সৈন্যদের সেবায় নিযুক্ত হয়েছেন।

আনাস ইবন মালিক বলেন, 'যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তিনি তাঁর সাথে উম্মে সালীম আর আনসারী কিছু নারীদেরকে নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা মুসলিম সৈনিকদের পানি খাওয়াতে পারেন আর আহতদের সেবা-শুশ্রুষা করতে পারেন।' আর-রুবায়া বিনত মু'আউইয বলেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথেই থাকতাম, যোদ্ধাদের পানি পান করাতাম, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতাম। আহত আর নিহত সৈনিকদের মদীনায় নিয়ে আসতাম।'

উমার ইবন খাত্তাবের খিলাফতকালের কথা। তিনি একবার মদীনার মহিলাদের জন্য কিছু উলের কাপড় বিতরণ করছেন। সবাইকে দেওয়ার পরও এক সেট কাপড় বাকি রয়ে গেল। কাপড়টি ছিল বেশ উন্নত মানের। কেউ একজন বললো, 'আমীরুল মুমিনীন, এই কাপড়টি আপনি আল্লাহর রাসূলের কন্যাকে দিয়ে দিন।' তারা আসলে আলীর কন্যা উম্মে কুলসুমের কথা বলছিল। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর নাতনি আর উমার ইবন খাত্তাবের স্ত্রী। উমার ইবন খাত্তাব বললেন, 'না! আনসারি সাহাবি উম্মে সালিত এই কাপড়ের বেশি হকদার। কারণ উহুদের যুদ্ধে তিনি ছোটাছুটি করে আমাদেরকে পানি এনে দিচ্ছিলেন।' উহুদের যুদ্ধের বহু বছর পরেও উমার এই আনসারী নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। উহুদের মতো গুরুত্ববহ সময়ে এই সাহাবিয়াতের ভূমিকা অবশ্যই স্বীকৃতি পাবার মতো একটি বিষয়। আর এই সাহাবিদের অপরিসীম ত্যাগের জন্যই তাদেরকে আল্লাহ 'আনসার' অর্থাৎ দীনের সাহায্যকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

নবীজির কন্যা ফাতিমাও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নবীজি যখন রক্তাক্ত, ফাতিমা নবীজির মুখের রক্ত ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যখন পানির কারণে রক্তের প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য খেজুর গাছের বাকল নিয়ে সেটা আগুনে পুড়িয়ে সেই ছাই আল্লাহ রাসূলের ক্ষতের ওপর চেপে ধরেন।

২) সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
উহুদে একজন নারীই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, নুসাইবাহ বিনত কা'ব আল মাযিনিয়‍্যাহ। শক্তিশালী এই নারী উহুদের যুদ্ধে ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আবু বকরের খিলাফতকালে ভ্রান্ত নবী মুসাইলামা আল-কাযযাবের বাহিনীর বিরুদ্ধেও তিনি যুদ্ধ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর নাতনি তাকে গোসল করিয়ে দেয়। সে বলে, 'আমি নানীর শরীরে ১৩টি ক্ষত দেখেছি, সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি ছিল উনার কাঁধে। সেখানে ইবন কামিয়ার তরবারির আঘাত লেগেছিল। ইবন কামিয়া যখন উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহকে আক্রমণ করে, তখন নুসাইবাহ নবীজিকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। ইবন কামিয়া তখন তাকে আঘাত করে।'

ইবনে কামিয়ার এই তরবারির আঘাত এত ভয়ানক ছিল যে, এক বছর পর্যন্ত নুসাইবাহর কাঁধে ব্যথা থাকে। অন্যান্য যুদ্ধের সময়েও তিনি আহত হয়েছেন। ভণ্ড নবী-দাবিদার মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তিনি মারাত্মক আহত হন। জখম সারানোর জন্য তাঁর ক্ষতস্থানে গরম তেল ঢালা হয়। সে যুগে জখম সারাবার পদ্ধতি ছিল জখমের ব্যথার চাইতেও কষ্টকর। এত ব্যথা, এত কষ্টকর জখমও তাকে যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

উহুদের যুদ্ধের পরদিন যখন নবীজি শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে হামরা আল আসাদে যেতে চাইলেন; সঙ্গে সঙ্গে নুসাইবাহ বিনত কা'বও সেখানে যেতে চাইলেন। কিন্তু উঠে দাঁড়ানো মাত্র তিনি ধপ করে পড়ে গেলেন। জখমের কারণে আর চলতে পারছিলেন না। উহুদে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরেও তাঁর উদ্যম বিন্দুমাত্র কমেনি। জিহাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল এতটাই প্রবল।

আল্লাহর রাসূলকে বাঁচাতে সাহাবিরা নির্দ্বিধায় শত্রুর তরবারির মুখে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাসূলুল্লাহ মানুষটাই ছিলেন এমন যার জন্য হাসতে হাসতে জান দিয়ে দেওয়া যায়। হামরা আল আসাদ থেকে ফিরে আসার পর এত উদ্বেগ, ব্যস্ততা, ক্লান্তির মধ্যেও নবীজি কারো কথা ভুলেননি। লোক পাঠিয়ে নুসাইবার খোঁজ নিলেন। সে নবীজিকে জানালো, 'এখন তাঁর শরীরের অবস্থা আগের থেকে কিছুটা ভালো।' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে ওঠেন। এ আনন্দ কোনো লোক-দেখানো অভিনয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ একজন বাবার মতোই সাহাবিদের ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন। তাদের খোঁজ-খবর নিতেন, তাদের কাছাকাছি থাকতেন, সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ রাখতেন। তাঁর মনে সবসময় সাহাবিদের চিন্তা লেগেই থাকতো।

টিকাঃ
21 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৯৫।

প্রথম যুগে মুসলিম নারীরা জিহাদেও ভূমিকা রাখতেন। বর্তমান যুগে মুসলিম নারী এবং পুরুষ উভয়েই এমনভাবে জীবন যাপন করছে যার সাথে সাহাবিদের জীবনযাত্রার কোনো মিল-ই নেই। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু যুদ্ধের আনুষঙ্গিক কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

১) যোদ্ধাদের পানি সরবরাহ ও চিকিৎসা
উহুদের যুদ্ধে পানি সরবরাহ ও চিকিৎসার কাজে মুসলিম নারীরা সরাসরি অংশ নেন। আনাস ইবন মালিকের ভাষায়, 'সেদিন আমি দেখতে পেলাম আইশা বিনত আবু বকর আর উম্ম সুলাইম তাদের কাপড় গুটিয়ে কাজ করছেন। তারা মুজাহিদ ভাইদের কাছে যাচ্ছেন আর তাদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছেন।' হামনাহ বিনতে আবি জাহশ এবং উম্ম আইমানও এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন। আনাস ইবন মালিক বলেন, 'যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তিনি তাঁর সাথে উম্মে সালীম আর আনসারী কিছু নারীদেরকে নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা মুসলিম সৈনিকদের পানি খাওয়াতে পারেন আর আহতদের সেবা-শুশ্রুষা করতে পারেন।'

উমার ইবন খাত্তাব উম্মে সালিতকে কাপড় দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন কারণ উহুদের যুদ্ধে তিনি ছোটাছুটি করে পানি এনে দিচ্ছিলেন। নবীজির কন্যা ফাতিমাও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নবীজি যখন রক্তাক্ত, ফাতিমা নবীজির মুখের রক্ত ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য খেজুর গাছের বাকল পুড়িয়ে সেই ছাই আল্লাহ রাসূলের ক্ষতের ওপর চেপে ধরেন।

২) সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
উহুদে একজন নারীই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, নুসাইবাহ বিনত কা'ব আল মাযিনিয়‍্যাহ। তিনি উহুদের যুদ্ধে ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইবন কামিয়া যখন উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহকে আক্রমণ করে, তখন নুসাইবাহ নবীজিকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। ইবন কামিয়া তখন তাকে আঘাত করে। জখম থাকা সত্ত্বেও তিনি পরের দিন হামরা আল আসাদে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জখমের কারণে আর চলতে পারছিলেন না। আল্লাহর রাসূল একজন বাবার মতোই সাহাবিদের ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন। হামরা আল আসাদ থেকে ফিরে আসার পর নবীজি লোক পাঠিয়ে নুসাইবার খোঁজ নিলেন।

টিকাঃ
২১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৯৫।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 উহুদের শিক্ষা

📄 উহুদের শিক্ষা


"নিশ্চয়ই তোমাদের আগে বহু জাতি গত হয়ে গেছে। অতএব পৃথিবীতে ভ্রমণ করো ও দেখো কেমন হয়েছিল মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম। এই (কুরআন) হচ্ছে মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং যারা ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৩৭-১৩৮)

উহুদের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য পরাজয়। কেউ কেউ মনে করেন, উহুদ ছিল 'ড্র ম্যাচ', কারণ কুরাইশরা অনেক মুসলিমকে হত্যা করতে পারলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মদীনা দখল করা, যেটা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্তু শাইখ ইবনুল কায়্যিম বলছেন, না, উহুদ ছিল মুসলিমদের জন্য বিজয়। এর কারণ হলো উহুদের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত অনন্য সব শিক্ষা। এই শিক্ষাগুলো অনুধাবন করতে না পারলে সীরাহ অধ্যয়নই বৃথা। এমনই কিছু শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

# মুসলিমদের চিরশ্রেষ্ঠত্ব
"আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু'মিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৩৯)
উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হবার পর, উপরের এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসলিমদেরকে এটাই বলছেন যে, তোমরা যদি আসলেই মু'মিন হয়ে থাকো, তাহলে বিজয় তোমাদেরই হবে।
"তোমরা মানবগোষ্ঠীর জন্য এক শ্রেষ্ঠ সমাজরূপে উত্থিত হয়েছো।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১১০)
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বদরের যুদ্ধে যখন মুসলিমরা বিস্ময়করভাবে জিতে গেল, কিংবা মুসলিমরা যখন পুরো মক্কা বিজয় করে নিল, কিংবা যখন পৃথিবীর বুকের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্র আধিপত্য বিস্তার করছে; তখন কিন্তু আয়াতটি নাযিল হয়নি। আয়াতটি এল উহুদ যুদ্ধের ঠিক পরে, যখন মুসলিমরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। এখান থেকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, মুসলিমরা দুর্বল হোক, অত্যাচারিত হোক, পরাজিত হোক -- তবুও তারা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। এটাই মুসলিমদের প্রকৃত পরিচয়, আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

# কষ্ট হলেও লড়তে হবে
"তোমরা যদি আহত হয়ে থাকো, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)
উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিমরা পরাজিত হলো, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনোবল তখন ভেঙে গেল, আশাভঙ্গ হলো। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তোমাদের সাথে উহুদের যুদ্ধে যা হয়েছে, কুরাইশদের সাথে বদরের সময় ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছে। তোমরা এখন জখমের কষ্ট ভোগ করছো, তারাও তখন জখমের কষ্ট ভোগ করেছে। কিন্তু এক বছর আগের বদরের পরাজয় তাদের আবার যুদ্ধ করা থেকে থামিয়ে রাখেনি। তারা আবারও প্রস্তুত হয়ে মাঠে নেমেছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, উহুদের পরাজয় যেন মুসলিমদেরকে তাদের লড়াই থেকে বিরত না রাখে। তারা যেন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তারা যেন আশা হারিয়ে না ফেলে, উদ্যম ও উদ্দীপনা ধরে রাখে। হয়ত কিছু মুসলিম মারা গেছে, তাতে ধৈর্য হারানোর কিছু নেই, পরাজয়ের মুখেও অটল-অবিচল থাকতে হবে।

# যুদ্ধে জয় ও পরাজয় দুটোই দরকার, তবে চূড়ান্ত বিজয় মুসলিমদের
"... আর (জয় ও পরাজয়ের) এই দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)
একদিন কুরাইশরা জিতলো, আর একদিন মুসলিমরা জিতলো, এটাই দুনিয়ার নিয়ম। ইবনুল কায়্যিম বলেন, 'আল্লাহ তাআলার অপরিসীম প্রজ্ঞা এবং তাঁর সুন্নাহ হলো, আল্লাহর নবী ও তাদের অনুসারীরা কখনো জিতবে, কখনো হারবে। তবে পরিশেষে তারাই বিজয়ী হবে। যদি মু'মিনরা সবসময় বিজয়ী হতো, তাহলে মু'মিন-মুনাফিক সবাই তাদের দলে ভিড়তো। তখন কে প্রকৃত ঈমানদার তা বোঝা যেত না।' দেখা যেত মানুষ দুনিয়াবি কারণে বা জেতার আশায় মুসলিমদের দলে যোগদান করছে। তাই জয়-পরাজয় দুটোই দরকার।
ইবনুল কায়্যিম আরও বলেন, 'আর যদি মুসলিমরা সবসময় পরাজিত হতে থাকে, তাহলে নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই পরিপূর্ণ হবে না।' দুনিয়াতে নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো ইসলামকে প্রচার করা, পুরো পৃথিবীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। যদি মুসলিমরা সবসময় হেরে যায় তাহলে এই দ্বীনের যাত্রা স্তিমিত হয়ে যাবে। তাই মুসলিমরা সবসময় জিতবে কিংবা সবসময় হারবে - এর কোনোটাই যথাযথ নয়। তাই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল হার জিতের মাধ্যমে দিনবদল করে যাচাই করেন কে মু'মিন আর কে মুনাফিক। পরাজয় মুনাফিকদের চেহারা প্রকাশ করে দিবে আর বিজয় আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। তবে যতই সময় লাগুক না কেন, শেষ পর্যন্ত মু'মিনরাই বিজয়ী হবে।
"আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু'মিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।”

# ঈমানের মাপকাঠি
“...আর এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার...” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)
ঈমান পরীক্ষা করার সবচাইতে উৎকৃষ্ট উপায় হলো আল্লাহর পথে জিহাদ করা। এই পরীক্ষা দিতে গেলেই মানুষের ঈমানের খেদগুলো স্পষ্ট হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন যখন আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে বলা হয়, তখনই বোঝা যায় দ্বীনের জন্য কার কতটা ভালোবাসা। তাই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল এভাবে পরীক্ষা নিয়ে মু'মিনদেরকে মুনাফিকদের দল থেকে আলাদা করে ফেলতে চান।

# জিহাদ হলো উচ্চ মর্যাদা লাভ করার একটি সুযোগ
"...এবং তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)
ইবনুল কায়্যিম বলেন, 'শাহাদাত হলো আল্লাহর নজরে সবচাইতে উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানের একটি। শহীদেরা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। শত্রুদের হাতে নিহত না হলে কীভাবে মুসলিমরা শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে?' শাহাদাত হলো বান্দার জীবনে সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ ঘটনা। আর সেটা একমাত্র একভাবেই সম্ভব যখন সে আল্লাহর ইচ্ছায় শত্রুদের হাতে নিহত হবে। উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের পেছনে এটাও একটি হিকমত। এই পরাজয় তো ছিল আল্লাহর বাহানা মাত্র। এর মাধ্যমে তিনি ৭০ জন বান্দাকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন।

# জিহাদ হলো একটি শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া
"আর এই কারণে যেন আল্লাহ ঈমানদারদেরকে পবিত্র করতে পারেন..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪১)
এ প্রসঙ্গে ইবনুল কায়্যিমের খুব চমকপ্রদ কিছু বক্তব্য আছে। তিনি বলেন, আল্লাহ আযযা ওয়া জাল তাঁর কিছু কিছু বান্দাকে এত ভালোবাসেন যে, তাদেরকে জান্নাতের উচ্চতর স্থানে স্থাপন করতে চান। কিন্তু দেখা যায়, জান্নাতের উঁচু স্থানে যাওয়ার জন্য সেই বান্দার যথেষ্ট পরিমাণ আমল নেই। তাহলে এই ব্যক্তি কীভাবে সেই উঁচু মর্যাদা হাসিল করবে? এটা সম্ভব হয় যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই পৃথিবীতে সেই বান্দার ওপর দুঃখ-দুর্দশা আপতিত করেন; আর এইসব দুঃখ-কষ্ট পার করার মধ্য দিয়ে তার গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়, জান্নাতে তার মর্যাদা বেড়ে যায়।
আল্লাহ আযযা ওয়া জাল সাহাবিদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের জন্য জান্নাতে যে উঁচু স্থান রেখেছিলেন, তাদের আমল সেই স্থানের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল তাদেরকে উহুদের যুদ্ধের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-শোক আর জখমের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলেন। তাদেরকে সহ্য করতে হলো রাসূলুল্লাহ মৃত্যু সংবাদের মতো ভয়ঙ্কর বেদনাদায়ক একটা সংবাদ। যদিও পরে জানা যায় যে তা একটি গুজব ছিল। তাদেরকে যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হলো। এত কষ্টের বিনিময়ে আসলে তাদের সওয়াবের পাল্লাটাই ভারী হচ্ছিল। কষ্ট হলে গুনাহ কাটা যায়, তাই কষ্টের সময়টা খারাপ লাগলেও আখিরাতের জন্য তা কল্যাণকর। ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, 'এটি হলো একটি শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া।'

# কাফিরদের খারাপের পাল্লা ভারী হতে দেওয়া
"...এবং কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দেন..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪১)
আল্লাহ তাআলা কিছু কাফিরদের এত ঘৃণা করেন যে, তিনি তাদের জন্য জাহান্নামে স্থান নির্ধারিত করে রাখেন। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল তাদেরকে তাদের আমল দিয়েই ধ্বংস করেন। সুতরাং, কাফিরদের হাতে মুসলিমদের পরাজয় এবং তাদের কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে সেই কাফিরদের ধ্বংস নিশ্চিত করা হয়। কাফিরদের মধ্যে ইবন কামিয়া আর উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহকে আঘাত করেছিল। এটা কি আসলে তাদের জন্য কোনো সাফল্য? রাসূলুল্লাহকে আক্রমণ করতে পারা কি সত্যিই কোনো খুশির বিষয়? সত্যি বলতে, এটা ছিল তাদের জীবনে করা নিকৃষ্টতম অপরাধ। আর এই একটা কাজের কারণে তারা আজীবনের জন্য জাহান্নামের অধিবাসী হয়ে যাবে।
আমরা অনেক সময় দেখি, কোনো কোনো কাফির জাতি অত্যন্ত দুঃসাহস দেখাচ্ছে, কোনোকিছু তোয়াক্কা করছে না। মুসলিমদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করছে। যখন খুশি বোমা মেরে, গুলি করে হত্যা করছে, ইচ্ছেমতো বন্দী করে নির্যাতন করছে, হেনস্থা ও লাঞ্ছিত করছে, কারাগারে বিনা বিচারে আটকে রাখছে বছরের পর বছর। তাদের এই কাজগুলো কি তাদের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে? না, কখনোই না। বরং তাদের এই কাজ থেকেই প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ। আর সে কারণেই তিনি তাদেরকে এই দুনিয়াতে স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে করে তারা নিজের হাতেই জাহান্নামের আগুন কিনে নিতে পারে।
ফিরআউন আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সে বছরের পর বছর ধরে বনী ইসরাঈলের জনসাধারণকে অত্যাচারে জর্জরিত করে এসেছে। এই কাজের পরিণতি কি ভালো কিছু ছিল? তার শেষ প্রাপ্তি কী ছিল? আসলে আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন তার বিরুদ্ধে মামলা তৈরি করতে, প্রমাণ দাঁড়া করাতে, আর তাই তাকে এসবের সুযোগ দিয়েছেন। এই মামলার নিষ্পত্তি হবে আখিরাতে, সেদিন সে জাহান্নাম থেকে কোনোক্রমেই নিষ্কৃতি পাবে না। আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরের ভেতরে কী আছে, সে সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু তিনি মানুষের কাজের মাধ্যমে সেটা প্রকাশ করে দেন, যেন শেষ বিচারের দিনে তারা নিজেদেরকে স্বপক্ষে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে না পারে।
অনেকে ভাবে, খারাপ লোকদের জন্যই তো জীবনটা আনন্দের! চুরি-বাটপারি-বদমাইশি করেই তারা বেশি ভালো আছে। সত্যি বলতে, দুনিয়াতে যারা স্বেচ্ছাচারিতা, জুলুম আর দুর্নীতির ওপর টিকে আছে, বছরের পর বছর খারাপ কাজ করার পরেও যাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না, আসলে তাদেরকে আল্লাহ আখিরাতের কঠোর শাস্তির জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছেন। ইবলিসকেও আল্লাহ একইভাবে অবকাশ দিয়ে রেখেছেন। পৃথিবীতে সে কত খারাপ কাজই না করছে প্রতিদিন! এসব জালিমের বিচার একদিন নিশ্চয়ই হবে। ফয়সালা হবে আখিরাতে।

# জান্নাতের জন্য কষ্ট করা চাই
“তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল?” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪২)
জিহাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিহাদ না করেই জান্নাতে চলে যাওয়ার আশা করা যায় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই আয়াতে মুসলিমদের বলছেন, জান্নাতের পথে অনেকগুলো ধাপ আছে। আর মুসলিমদেরকে একে একে প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহর পথে জিহাদ না করেই কেউ নিজেকে জান্নাতের দাবিদার বলতে পারে না। জিহাদের মাধ্যমেই আল্লাহর পথে দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। ইসলাম কোনো আধ্যাত্মিক ধর্ম নয়, যেখানে কেবল কিছু ধার্মিক আচার-প্রথা পালনের মধ্য দিয়েই আমরা জাদুবলে জান্নাতে পৌঁছে যাবো। ইসলামের অনুসারীদেরকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পরীক্ষা করবেন। জান্নাত বিনামূল্যে অথবা অল্প শ্রমে লাভ করার জিনিস নয়। জান্নাতের জন্য কষ্ট করা চাই। মানুষের আমল জান্নাতে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট নয়। এমনকি আল্লাহর দয়া ছাড়া নবীজি পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। আল্লাহর রহমত ও দয়ার কারণেই একজন মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে, কিন্তু তার জন্য চেষ্টা করতে হবে। আন্তরিক চেষ্টাই আল্লাহর রহমত ও দয়ার দরজা খুলতে পারে।
বদরের যুদ্ধে মুসলিমরা অবিশ্বাস্য রকমের বিজয় অর্জন করে। যেসব মুসলিম বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তারা উহুদের যুদ্ধে যোগদান করার জন্য উম্মুখ হয়ে ছিল। অনেকের শহীদ হয়ে যাবার জন্য দুআ চাইছিল। কিন্তু তাদের এই সব আবেগ-অনুভূতি ও ইচ্ছাগুলো মনের মধ্যেই ছিল। এই নিয়্যতগুলো কতখানি সত্য তা যাচাই করার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রের দরকার। আর তাই জিহাদের প্রয়োজন ছিল যাতে করে এর মাধ্যমে তাদের নিয়্যতের সত্যতা যাচাই করা যায়।
হতে পারে, তাদের মাঝে অনেকেই এমন ছিল, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার আগ পর্যন্ত নিজে কী চায়, তা নিয়ে সন্দিহান ছিল। এখনও দেখা যায় যে, আমাদের মাঝে অনেকেই অন্তরে শহীদ হওয়ার ইচ্ছা রাখে। কিন্তু সত্যিই কি আমরা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করবো এবং জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বো? একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সে কথা ভালো জানেন। আর তাই তিনি আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে আমাদের অন্তরের খবর প্রকাশিত হয়ে যায়।

# উহুদের যোদ্ধাদের আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন
উহুদের যুদ্ধে কিছু সাহাবি ভুল করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের ভুলের ব্যাপারে কী বলেছেন? মুসলিমদের বিজয়ের জন্য আল্লাহ তাআলা কখনোই তাদের প্রশংসা করেননি, কৃতিত্ব দেননি। বদরের যুদ্ধের পরে আল্লাহ এমন কোনো আয়াত নাযিল করেননি, যেখানে তিনি মুসলিম বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। বরং তিনি বলেছেন,
"বস্তুতঃ এটা তো আল্লাহ তোমাদের সুসংবাদ দান করলেন, যাতে তোমাদের মনে এতে সান্ত্বনা আসতে পারে। আর বিজয় শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকেই আসে।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১২৬)
বদরের যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে যখন মতভেদ হলো, তখন আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের সাথে কঠিন ভাষা ব্যবহার করলেন।
"যদি আল্লাহর তরফ থেকে বিধান না থাকতো যা আগেই উল্লেখ হয়েছে, তবে তোমরা যা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলে সেজন্য তোমাদের উপরে এসে পড়তো এক বিরাট শাস্তি।” (সূরা আনফাল, ৮: ৬৮)
মুসলিমরা যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে মুক্তিপণ আদায়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটার কারণে তাদের ওপর আল্লাহর আযাব এসে পৌঁছাতে পারতো! কেননা আল্লাহ তাআলা এই সিদ্ধান্তের সাথে সম্মত নন। মুসলিমরা যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা না করে, তাদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেওয়া আল্লাহ পছন্দ করেননি।
এই আয়াতগুলো থেকে একটি শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে। বদরের যুদ্ধের পর, আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের অন্তরগুলোকে সর্বপ্রকার কলুষতা ও অন্তরের ব্যাধি থেকে পবিত্র রাখতে চেয়েছেন। বদরের যুদ্ধের অসামান্য সাফল্যের পর তাদের মাঝে গর্ব, অহংকার ইত্যাদি অনুভূতি কাজ করা অসম্ভব নয়। তাই আল্লাহ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, বিজয় কেবলমাত্র আল্লাহ চেয়েছেন, সেজন্যই এসেছে।
কিন্তু উহুদের যুদ্ধে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। মুসলিমদের মনোবল কমে গেছে, তারা কষ্টের মধ্যে অবস্থান করছে। তাই আল্লাহ তাআলা তখন তাদের সান্ত্বনা দিলেন, তাদের উদ্বুদ্ধ করলেন, ক্ষমা করে দিয়ে তাদের প্রতি করুণা দেখালেন। মুসলিমরা নবীজির আদেশ অমান্য করে গুনাহ করেছিল। এই দুনিয়ার তুচ্ছ সম্পদের জন্য পাহাড় থেকে নেমে মারাত্মক অপরাধ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের মাফ করে দিয়েছেন।

# ইলমচর্চা এবং জিহাদ
"আর আরো কত নবী যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ছিল বহু আলিম..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৬)
আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলছেন, আগের নবীরা যুদ্ধ করেছেন, আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন অনেক আলেম। এখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। আলিমদের কাজ ঘরে বসে থাকা নয়, তাদেরকেও ময়দানে যুদ্ধ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সমাজে আলিমদের একটি বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে। লোকেরা সবাই তাদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তারা সবার চাইতে আলাদা কাপড় পরে, অন্যভাবে চলাফেরা করে। সৈনিকদের মতো তাদেরকে মাঠে-ময়দানে যেতে হচ্ছে না, আল্লাহর রাস্তার ধুলোবালি তাদের স্পর্শ করে না। মুজাহিদদের মতো শক্ত মাটিতে শুয়ে থাকতে হচ্ছে না, কাটাতে হচ্ছে না শত্রুর অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত। ব্যথা-বেদনা-কষ্ট কী তারা একসময় ভুলে যান। এভাবে চলতে চলতে একসময় তাদের মনে হতেই পারে যে, তারা সবার মতো নন। শয়তান তখন তাদের বুঝায়, 'তোমার তো এতকিছু করার দরকার নেই। তোমার ইলম আছে। তুমি শুধু ঘরে বসে সবাইকে শিখাবে। এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট।' কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন, সৎকর্মশীল আলেমদের বৈশিষ্ট্য তা নয়। নেককার আলেমগণ নবীদের সাথে ময়দানে নেমে যুদ্ধ করতেন।
"আর আল্লাহর পথে তাদের যা কষ্ট হয়েছিল, তার জন্য তারা হতাশ হয়নি, আর তারা ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৬)
এই আলিমরা পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। পরাজয় যেন আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে, আমাদেরকে হতাশ করে না দেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মু'মিনদেরকে সর্বদাই দৃঢ় থাকা চাই।
"তারা বললো, হে আমাদের রব! ক্ষমা করো আমাদের সব অপরাধ এবং যা কিছু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে আমাদের কাজকর্মে।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৭)
আয়াতের এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করবে আল্লাহর উপর ভরসা করে। নিজেদের প্রস্তুতি কিংবা সাজ-সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে নয়। মুসলিমদেরকে আল্লাহর কাছে থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। মুজাহিদদের তাদের রবের সামনে বিনয়ী হতে হবে, কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে বিনয় দেখতে পছন্দ করেন। তাই আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আগেকার যুগের মুজাহিদদের পথ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এটাই ছিল তাদের পথ। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতো। হেরে গেলেও বিমুখ হতো না। আর আল্লাহর কাছে তারা নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতো। তারা বলতো,
"আর দৃঢ় করো আমাদের পদক্ষেপ, এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। কাজেই আল্লাহ তাদের দিয়েছিলেন ইহজীবনের পুরস্কার, আর পরলোকের পুরস্কার আরো চমৎকার! আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৭)

# অবাধ্যতার খেসারত
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি কোনো বিষয়ে তোমরা মতভেদ করো তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে পেশ করো, যদি তোমরা আল্লাহ ও ক্বিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। (সূরা নিসা, ৪: ৫৯)
রাসূলুল্লাহর অবাধ্যতা ছিল উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের বিপর্যয় ও পরাজয়ের মূল কারণ। যদি কোনো বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী তা সমাধান করতে হবে। কেননা কুরআন আর নবীজির সুন্নাতই হলো মুসলিমদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

# দুনিয়াসক্তির পরিণতি ভয়াবহ
গনিমতের মাল নিয়ে মুসলিম উম্মাহর কাহিনী সত্যিই খুব দুঃখজনক। সেই বদরের যুদ্ধ থেকেই এর সূচনা। তখন আল্লাহ তাআলা সূরা আনফালের আয়াত নাযিল করেন। উবাদা ইবন আস-সামিত বলেন, 'আমরা গনিমতের মাল নিয়ে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলাম। আর আমাদের আচরণও শোভন ছিল না। তখন এই আয়াতগুলো নাযিল হয়।' উহুদের যুদ্ধেও গনিমতের মালের আশাতেই পাহাড়ের ওপর থেকে তীরন্দাজ সৈন্যরা নিচে নেমে এসেছিল। আর সেটাই যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গনিমতের মাল পাওয়ার জন্য তাদের ধৈর্যহীনতাই বড় বিপদ ডেকে এনেছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এই সমস্যা পরবর্তীতেও রয়ে যায়।
ইউরোপের পশ্চিমাংশে মুসলিমরা যখন জিহাদে একের পর এক জয় লাভ করতে থাকে, মনে হচ্ছিল সমগ্র ইউরোপ মুসলিমদের হাতে এসে যাবে। তাদের এই অগ্রযাত্রা শত্রুবাহিনী থামাতে ব্যর্থ হলেও দুনিয়ার প্রতি আকাঙ্ক্ষার কাছে মুসলিমরা হার মানে। স্পেন জয় করে মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আমীর আবদুর রাহমান আল-গাফিকী ফ্রান্সের প্যারিসের দিকে যাত্রা আরম্ভ করলেন। ফ্রান্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিমদের আয়ত্বে চলে এল। তারা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে। পুরো ফ্রান্স দখল করে নেওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু যখন তারা প্যারিসের সীমানায় গিয়ে পৌঁছালো, ততক্ষণে গনিমতের মাল দিয়ে তারা এতটা বোঝাই হয়ে গেল যে, শত্রুদের নিয়ে চিন্তা করার বদলে নিজেদের গনিমতের অংশ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। তারা যুদ্ধে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারলো না, যুদ্ধে পরাজিত হলো। এই যুদ্ধকে বলা হয়, 'বালাতুশ শুহাদা' বা 'শহীদদের প্রাঙ্গন'। কারণ এই যুদ্ধে বিশাল সংখ্যক মুসলিম নিহত হয়। মুসলিম সেনাবাহিনীর বীর মুজাহিদ আবদুর রহমান আল-গাফিকীও শহীদ হন। আর এরপর থেকেই মুসলিমদের অগ্রসর হওয়া থেমে যায়। পশ্চিম ইউরোপের সাথে মুসলিমরা আর কখনোই পেরে ওঠেনি। যুদ্ধ থেকে তাদেরকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর ইতিহাস এখান থেকেই অন্যদিকে মোড় নেয় শুধু একটি কারণে, গনিমতের প্রতি আসক্তি।
"তোমাদের মধ্যে কেউ ছিল যারা এই দুনিয়া চাচ্ছিল, আর তোমাদের মধ্যে কেউ ছিল যারা চাচ্ছিল পরকাল।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫২)
এই আয়াত শুনে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, 'আমি জানতাম না যে আমাদের মাঝে, অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের মাঝেও এমন লোক আছে যারা আখিরাতের চাইতে দুনিয়াকে বেশি প্রাধান্য দেয়!' মু'মিনদের মাঝে দুনিয়ার লোভ থাকতে পারে-- এ বিষয়টি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের কল্পনাতেও আসেনি। জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ হলো একটি পরীক্ষা। এর মাধ্যমে এমন সব বিষয় উন্মোচিত হয়, যা অন্য কোনোভাবে বোঝা যায় না।

# দ্বীনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা
মুহাম্মাদ এর মৃত্যু সংবাদের গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু পরাজিত মানসিকতার মুসলিম আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে ছুটে যেতে চাইল। তাদের ইচ্ছা ছিল সে যেন কুরাইশদের সাথে আপসের আলোচনায় বসে। কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়া জাল শিক্ষা দিয়েছেন ভিন্ন কিছু,
“আর মুহাম্মাদ একজন রাসুল বৈ তো কিছুই নয়! তাঁর আগেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ অচিরেই তাদের পুরষ্কৃত করবেন।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৪)
মুহাম্মাদ এর আগে বহু নবী-রাসূল পৃথিবীতে এসেছেন এবং তাঁরা মৃত্যু বরণ করেছেন। আল্লাহর রাসূলও তাঁদের থেকে ব্যতিক্রম নন, তিনিও মৃত্যুবরণ করবেন। আল্লাহ যেন মুসলিমদের জিজ্ঞেস করছেন,
'যদি তিনি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পিছিয়ে যাবে? এই দ্বীন ত্যাগ করে জাহিলিয়াতের জীবনে ফিরে যাবে? তোমরা কি ব্যক্তি মুহাম্মাদকে অনুসরণ করো নাকি নবী মুহাম্মাদকে?'
ইসলাম একটি দ্বীন যা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, ব্যক্তি বিশেষের উপর এই দ্বীন নির্ভরশীল নয়। কোনো ব্যক্তি যতই মহান এবং আদর্শবান হোক না কেন, ইসলাম কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে চলে না। কখনোই এমনটা ভাবা উচিত নয় যে, অমুক ব্যক্তি মারা গেছে দেখে ইসলামের অগ্রযাত্রা থেমে যাবে। বিজয় কোনো আমীরের কারণে আসে না। উমারের খিলাফতকালে খালিদ ইবন ওয়ালিদকে মুসলিম সেনাবাহিনীর আমীর পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। উমার তখন উম্মাহকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মুসলিমদের কোনো বিশেষ একজন নেতার ওপর ভরসা করা উচিত নয়। তারা একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করবে।
রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর পর আবু বকর তাই বলেছিলেন, 'যারা মুহাম্মদের ইবাদত করতে, জেনে রাখো, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, তারা শুনে নাও, আল্লাহ জীবন্ত, এবং তিনি কখনো মারা যাবেন না।'
'বস্তুত, কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না' -- আল্লাহ তাআলা এই অংশের মাধ্যমে আমাদের কাছে এটাও পরিষ্কার করে দিচ্ছেন যে, আমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আমাদেরই আল্লাহকে দরকার। কিন্তু তাঁর আমাদেরকে কোনো প্রয়োজন নেই।

# মুনাফিক আর গুনাহগার মু'মিন- কখনোই সমান নয়
"তারপর আল্লাহর করুণার ফলেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছিলেন। আর আপনি যদি রুক্ষ ও কঠোর-হৃদয় হতেন, তবে নিঃসন্দেহে তারা আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। আর কাজে কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুল-কারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫৯)
দাওয়াহ এবং ইসলামের বার্তা পৌঁছানোর কাজ সাধারণভাবে কোমলতার ভিত্তিতে হওয়া চাই। রাসূলুল্লাহর মধ্যে যদি তার অনুসারীদের প্রতি কঠোরতা থাকতো তাহলে তারা তাকে ছেড়ে চলে যেত। দিন শেষে যারা আল্লাহর রাসূলের আদেশ অমান্য করেছে, তারা তাঁরই অনুসারী। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে বলেছেন যেন তিনি তীরন্দাজ মুসলিম বাহিনীকে মাফ করে দেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অথচ এই তীরন্দাজ বাহিনীর ভুলের মাশুল গুনতে গিয়েই মুসলিমরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ নিজে আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন মুসলিম নিহত হয়েছে! কিন্তু এদেরকে যেন রাসূলুল্লাহ ক্ষমা করে দেন এবং তাদের জন্য দুআ করেন সেটাই আল্লাহ চেয়েছেন।
উহুদের যুদ্ধে কিছু মুসলিম মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্য খুবই উদগ্রীব হয়ে ছিল। হতে পারে এটা উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের একটি কারণ। কিন্তু তবু আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে পরামর্শ নিতে বারণ করেননি। কেননা শুরা হলো সুন্নাহ, এটাই সঠিক পথ। শুরা করে অর্থাৎ সবার সাথে পরামর্শ করে কাজ করা ইসলামে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।
"আর যেদিন দুদল সৈন্যের মোকাবিলা হয়েছে; সেদিন তোমাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তা আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং তা এজন্য যে, তাতে প্রকৃত ঈমানদার কারা তা জানা যায়। যাতে শনাক্ত করা যায় মুনাফিকদের। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা (অন্ততপক্ষে) শত্রুদেরকে প্রতিহত করো। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে, লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সে দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই, তারা নিজের মুখে সে কথাই বললো। বস্তুতঃ আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৬৬-১৬৭)
মুনাফিকদের শাস্তি দেওয়া হয়নি, এমনকি কিছু বলাও হয়নি। শুধু বলে দেওয়া হলো, তারা হলো মুনাফিক। তাদের আসল চেহারা সবার কাছে খুলে দেওয়া হলো।
এ প্রসঙ্গে একটি কথা এসেই যায়। উম্মাহর বিজয়ের শর্ত কী-- এই বিষয়ে অনেক মুসলিমের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। তারা মনে করে, উম্মাহর সবাই যখন আল্লাহর আদেশ মেনে চলবে এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকবে, তখনই একমাত্র এই উম্মাহ বিজয়ী হবে। সত্যি বলতে, কিছু মুসলিমই শুধু নয়, কয়েকটি ইসলামী আন্দোলনই এই ধারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তারা মনে করে, উম্মাহর বিজয় অর্জনের জন্য আমাদের সবাইকে শুধরাতে হবে, প্রত্যেককে ভালো মুসলিম হতে হবে। যতক্ষণ আমাদের মাঝে এমন মুসলিম থাকবে, যারা নামাজ পড়ে না, যারা গুনাহ করে, ততদিন আমরা জিততে পারবো না। যতদিন ফজরের সালাতে জুমুআর সালাতের সমপরিমাণ মুসল্লী হাজির না হচ্ছে, ততদিন আমাদের বিজয় অর্জিত হবে না।
এই কথাটি এসেছে আসলে এক ইহুদি পণ্ডিত থেকে। সে জেরুসালেমের মসজিদে বলেছিল, 'যেদিন মুসলিমদের জুম্মাহ এবং ফজরের জামাতে সমান সংখ্যক লোক নামাজ পড়বে, সেদিনই জেরুসালেম মুসলিমদের হাতে বিজিত হবে।' এটা একটা ইহুদি পণ্ডিতের কথা মাত্র, কিন্তু তারা এমনভাবে এই রাবীর ঘটনাকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে, যেন আল্লাহ তাআলা এই ব্যক্তির ওপর তাঁর আয়াত নাযিল করেছেন আর এই ইহুদি লোকটির সব ভবিষ্যদ্বাণী চিরায়ত সত্য!
সত্যি বলতে, এই চিন্তাধারা মোটেও সঠিক নয়! উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই ফজরের সালাতের চাইতে জুমুআর সালাতে বেশি মানুষ হবে। উম্মাহর মাঝে সবসময়ই কিছু গুনাহগার মুসলিম থাকবে। অনেকেই ইসলামের বিধিনিষেধ পুরোপুরি মেনে চলবে না। আমরা সবাই 'ভালো মুসলিম' হয়ে গেলেই কেবল বিজয় আসবে--এই ধারণা সঠিক নয়। এর প্রমাণ হলো উহুদের যুদ্ধ।
উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পুরো তিন ভাগের এক ভাগ ছিল মুনাফিক। কিন্তু তাদের কারণে মুসলিমরা হারেনি। কুরআন বা সুন্নাহতে কখনোই এক-তৃতীয়াংশ বাহিনীর পলায়নকে উহুদে পরাজয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কোনো আলিমও কখনো এমন মত দেননি।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই কিছু মুনাফিক থাকবে, কিন্তু ভালো ও মন্দের লড়াইয়ে মুনাফিকরা ফলাফল নির্ধারণ করে না। বরং যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয় আত-ত্বইফা আল-মানসুরাহ দ্বারা। আত-ত্বইফা আল-মানসুরাহ হচ্ছে মুসলিমদের কেন্দ্রীয় দল। একাধিক হাদীসে রাসূলুল্লাহ এই দলটকে নিয়ে কথা বলেছেন। এরা হচ্ছে সেই নাজাতপ্রাপ্ত দল, যারা সর্বদা হকের উপরে থাকবে। এই দলের মুসলিমরা যদি গুনাহতে লিপ্ত হয়, তারা যদি আল্লাহর অবাধ্য হয়, তাহলে মুসলিমরা পরাজিত হবে। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর বিজয় শুধু এই একটি দলের উপর নির্ভর করে, পুরো উম্মাহর উপরে নয়। উহুদের যুদ্ধ থেকে ৩০০ জনের পলায়নে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতিতে কিছু আসে যায়নি। বরং উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ সেই ৪০ জন, যারা আল্লাহর রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল।
“আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ ইতিপূর্বে তোমাদের কাছে তাঁর অঙ্গীকার পালন করেছিলেন, যখন তোমরা তাঁর ইচ্ছায় তাদের খতম করছিলে; যতক্ষণ না তোমরা দুর্বলচিত্ত হয়ে পড়লে, আর তোমরা আদেশ সম্বন্ধে বিরোধ করলে ও যা তোমরা ভালোবাসো তা তোমাদের দেখাবার পরে অবাধ্য হলে। তোমাদের মধ্যে কেউ ছিল যারা এই দুনিয়া চাচ্ছিল, আর তোমাদের মধ্যে কেউ ছিল যারা পরকাল চাচ্ছিল, তারপর তিনি তোমাদের তাদের (অর্থাৎ শত্রুদের) থেকে পলায়নপর করলেন যেন তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু নিশ্চয়ই তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করেছেন। আর আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫২)

# পরাজয় আশাবাদী মনকে নিরাশ করে না
স্বাভাবিকভাবে এমনটাই মনে হওয়ার কথা যে, উহুদ পর্বত দেখলেই নবীজির দুঃখের স্মৃতি জেগে উঠবে। এখানেই তিনি সাহাবিদের হারিয়েছেন, প্রিয় চাচা হামযাকে হারিয়েছেন, নিজে আহত হয়েছেন। মুসলিমরা এই যুদ্ধেই শত্রুদের হাতে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু নবীজি পরাজিত মানসিকতার মানুষ ছিলেন না, হতাশা তাঁর মধ্যে কখনই দেখা যায়নি। আমাদের রাসূল খুবই আশাবাদী এবং ইতিবাচক মানসিকতার একজন মানুষ। উহুদে হেরে গেলেও তিনি হার মানেননি। তিনি বলতেন, 'উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও উহুদকে ভালোবাসি।' তিনি বলতেন, 'উহুদ হলো জান্নাতের পাহাড়।' উহুদ পর্বতের সাথে তাঁর কষ্টের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, কিন্তু হতাশাকে নিজের মনে কখনো স্থান দেননি। এটাই ইসলামের শিক্ষা। দুঃখ, কষ্ট, হতাশা দূরে ঠেলে কাজ করে যেতে হবে। উহুদের পরাজয় মুসলিমদের বেদনাহত করবে, হতাশাচ্ছন্ন করবে না। মুসলিমরা আশাবাদী হবে, পরাজয়ের মধ্য থেকে ভালো দিকটা দেখার চেষ্টা করে। হতাশাবাদ মুসলিমদের স্বভাবের সাথে একেবারেই যায় না।

# বিজয়ের সূত্র
বিজ্ঞান যেমন কিছু সূত্র মেনে চলে, তেমনি জয় ও পরাজয় কিছু সূত্র মেনে চলে। এই চিরন্তন সূত্রগুলো কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখিত হয়েছে।
প্রথম নীতি, বিজয় একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে আসে।
“আর বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতে পারে না।” (সূরা আনফাল, ৮: ১০)
দ্বিতীয় নীতি, যদি আল্লাহ আমাদেরকে বিজয় দান করতে চান, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই যা তা থামাতে পারবে।
"যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তাহলে কেউ তোমাদের পরাভূত করতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন, তবে এমন কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করতে পারে? আর আল্লাহর ওপরই মু'মিনদের ভরসা করা উচিত।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৬০)
অর্থাৎ ভয় পাওয়ার একমাত্র যোগ্য সত্তা হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, আর কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা মূসাকে বিজয় দান করেছিলেন তৎকালীন 'সুপার-পাওয়ার' ফিরআউনের বিরুদ্ধে। কাজেই মুসলিমদের একমাত্র ভরসাস্থল আল্লাহ তাআলা। যদি তারা আল্লাহর ওপর ভরসা না করে অন্য কিছু বা অন্য কারো ওপর ভরসা করে, তাহলে তিনি মুসলিমদের পরিত্যাগ করবেন।
তৃতীয় নীতি, পরাজয়ের কারণ আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া
"আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তাঁর নির্দেশে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়ে গেলে এবং নির্দেশ সম্পর্কে বিবাদ করলে আর তোমরা অবাধ্য হলে তোমরা যা ভালবাসতে তা তোমাদেরকে দেখানোর পর। তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখিরাত। তারপর আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মু'মিনদের উপর অনুগ্রহশীল।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫২)
এই দুনিয়ার মোহ, আসক্তি, মায়া এবং আখিরাতের ওপরে দুনিয়াকে স্থান দেওয়া হলো মুসলিমদের অধঃপতনের কারণ। উহুদে তারা হেরেছিল কারণ তারা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহর অবাধ্য হওয়া এবং ঐক্য বজায় না রেখে দলছুট হয়ে যাওয়া ছিল তাদের পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক।
চতুর্থ নীতি, জয় বা পরাজয়ের সাথে সৈনিকদের সংখ্যার কোনো সম্পর্ক নেই।
"আর আল্লাহ ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয় দান করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাকো; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১২৩)
বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা অল্প হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাদের বিজয় দান করেছেন। আবার হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা অধিক হওয়ার পরেও তারা সাময়িক পরাজয়ের শিকার হয়েছিল।
"আল্লাহ ইতিমধ্যে বহুক্ষেত্রে তোমাদেরকে বিজয় দান করেছেন, আর হুনাইনের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের উৎফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি; এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর তোমরা পিঠ দেখিয়ে পলায়ন করেছিলে।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৫)
পঞ্চম নীতি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করা।
ষষ্ঠ নীতি, ঐক্যবদ্ধ থাকা।
সপ্তম নীতি, ধৈর্য ধারণ করা।
বিজয়ের জন্য এই তিনটি গুণের কথা আল্লাহ একই আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
"আর আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করো। আর তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। যদি তা করো, তবে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তি খতম হয়ে যাবে। এবং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রয়েছেন ধৈর্যশীলদের সাথে।" (সূরা আনফাল, ۸:৪৬)
অষ্টম নীতি, যুদ্ধের প্রস্তুতির মাধ্যমে বিজয় আসে না।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, কিন্তু এই প্রস্তুতি ও সাজ-সরঞ্জামই যুদ্ধজয়ের নিয়ামক এমনটা ভাবা যাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক এবং সামরিক সবভাবে প্রস্তুত হতে বলেছেন।
"আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা-ই কিছু সংগ্রহ করতে পারো নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন আল্লাহর শত্রুদের তথা তোমাদের শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারো, আর তাদেরকে ছাড়া অন্যদেরও যাদেরকে তোমরা চেনো না; (কিন্তু) আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। বস্তুতঃ যা কিছু তোমরা আল্লাহর রাহে ব্যয় করবে, তার প্রতিদান তোমাদের পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে এবং তোমাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।” (সূরা আনফাল, ৮: ৬০)
নবম নীতি, দৃঢ়পদ থাকা, এবং
দশম নীতি, আল্লাহকে স্মরণ করা।
শেষ এই দুটো বিষয় আল্লাহ তাআলা একই আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কোনো সৈন্যদলের সম্মুখীন হও, তখন দৃঢ়সংকল্প হও, আর আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো, যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আনফাল, ৮: ৪৫)
সুতরাং সফল হওয়ার জন্য মুসলিমদের দৃঢ়তার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে আর বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে।

# মু'মিনদের জিহাদে ছোটার প্রেরণা হলো ঈমান
রাফী ইবন খাদীয, সাম্রাহ ইবন জুনদুব, আবদুল্লাহ ইবন উমার এবং আল-বারাহ ইবন আযীবের মতো অল্প বয়স্ক ছেলেরা কেন উহুদের যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে এতটা উতলা ছিল? অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, সে যুগটাই যুদ্ধ-বিগ্রহের যুগ, তাই বাচ্চারাও যুদ্ধে যোগ দিতে উতলা থাকতো। কিন্তু এই একই যুদ্ধে দেখা গেছে ৩০০ প্রাপ্তবয়স্ক সৈনিক যুদ্ধ না করে পালিয়ে গেছে! যুদ্ধপ্রিয় সমাজ হলেই যে সবাই যুদ্ধকে ভালোবাসবে এমনটা নয়। এখানে মূল ব্যাপার হলো 'ঈমান' বা মুসলিমদের বিশ্বাস। যাদের ঈমান ছিল, তারা যুদ্ধে যোগদানের জন্য আগ্রহী ছিল। আর যাদের ঈমান ছিল না, তারা পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী ছিল। আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার অনুসারী তিনশো লোক উহুদের ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। এমনকি তাবুক, খন্দক ও আরও অনেক যুদ্ধেই তারা জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল।

# মুনাফিকদের জিহাদে ছোটার প্রেরণা হলো দুনিয়া
উহুদের যুদ্ধে অংশ না নিলেও মুনাফিকরা ঠিকই হামরা আল আসাদের অভিযানে অংশ নিতে চাইল। কিন্তু নবীজি তাদেরকে অনুমতি দেননি। তিনি কেবল তাদেরকেই সঙ্গে নিলেন, যারা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। হামরা আল-আসাদের অভিযানে মুনাফিকরা থাকতে চেয়েছে কারণ তারা মনে করছিল এই এই যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা প্রবল আর যুদ্ধে জেতার অর্থ হলো গনিমতের মালে ভাগ বসানো যাবে!
আরামের সময়, শুধুমাত্র সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় ইসলামকে মেনে চলা, আর যখন ত্যাগ স্বীকারের সময় আসে তখন ইসলাম থেকে সরে যাওয়া নিফাকের লক্ষণ। জিহাদ ছাড়াও আরও অনেক ক্ষেত্রেই এই কথাটি প্রযোজ্য। তাই সকলের উচিত নিজেদের নিয়তের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া। নিজেদের খতিয়ে দেখা, ইসলামী কাজের সাথে যখন দুনিয়াবি স্বার্থ মিশে থাকে, তখন আমরা খুব আগ্রহ পাচ্ছি আর কষ্টের কাজ হলে পিছিয়ে পড়ছি না তো?
যেমন, ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব-কর্তব্যের উপর গুরুত্ব দেয়, বাবা-মায়ের আনুগত্য করার কথা বলে। কিছু বাবা-মা এই কথাগুলো শুনলে খুব খুশি হন, এই সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীস তাদের মনের কথা বলে। কিন্তু যখন ঐ একই সন্তানের উপর ঐ একই ইসলাম জিহাদের কথা বলে, তখন তারা সেসব কথা শুনতে চান না। তাদের সন্তানদেরকেও তারা ইসলামের এই শিক্ষার দিকে মোটেও আকৃষ্ট করতে চান না। অর্থাৎ তারা ইসলামকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করছেন।
নিফাকের ব্যাপারে সাবধান হতে হবে, আমরা যেন মুনাফিকদের কাতারে পড়ে না যাই। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলেছেন দ্বীন ইসলামকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ যখন আনসারী সাহাবিদের থেকে বায়াত নিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ' তোমরা সহজ সময়েও আমার আনুগত্য করবে এবং কঠিন সময়েও আমার আনুগত্য করবে।'
ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'উহুদ যুদ্ধের একটি শিক্ষণীয় দিক হলো, সাহাবিরা যে সত্যিই আল্লাহর প্রতি অনুগত ছিলেন সে দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সহজ হোক, কঠিন হোক, সবরকম সময়েই তারা আল্লাহ আযযা ওয়া জালের ইবাদত করতে রাজি ছিলেন। সুসময়, দুঃসময় উভয় অবস্থাতেই দ্বীনের ওপর দৃঢ় এবং অবিচল থাকা প্রকৃত ঈমানের লক্ষণ। তারা সেসব লোকের মতো নন, যারা শুধুমাত্র সহজ অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত করে আর বাকি সময় ভুলে থাকে।'

# বিনয়
ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ আযযা ওয়া জাল তাদেরকে পরাজয় এবং লাঞ্ছনা দিয়ে পরীক্ষা করলেন, তাদের দুর্বল অবস্থার মাঝে রাখলেন। এভাবে তারা বিনয়ী হয়ে উঠলো। আর যখন তারা বিনয়াবনত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ কবুল করে নিলেন।' বিনয়ের সাথে করা দুআ আল্লাহ কবুল করেন।
"আর আল্লাহ ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয় দান করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাকো; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১২৩)

# উহুদ ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় বিপর্যয় মোকাবেলার প্রস্তুতি
ইবনুল কায়্যিম মন্তব্য করেছেন, 'উহুদের যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহকে সবচাইতে মারাত্মক দুর্যোগের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত করেছে।' এই ভয়ঙ্কর দুর্যোগ হলো রাসূলুল্লাহর মৃত্যু। এই ঘটনাটির ব্যাপকতা এত বিশাল যে, তার জন্য আগে থেকেই মুসলিমদেরকে প্রস্তুত করা জরুরি ছিল। রাসূলুল্লাহ ছিলেন সাহাবিদের সবকিছু। তিনি ছিলেন তাদের দ্বীন ইসলামের উৎস। তাদের বই-পুস্তক বা ইন্টারনেট ছিল না। ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য অন্য কোনো মাধ্যম ছিল না। রাসূলুল্লাহ তাদের পিতার মতো ছিলেন, তাঁর থেকেই সাহাবিরা সবকিছু শিখেছেন। নবীজিকে হারানো সাহাবিদের জন্য প্রচণ্ড কষ্টদায়ক একটা ব্যাপার ছিল। এই ঘটনা তাদেরকে চুরমার করে দিতে পারত, তাদের সমস্ত অগ্রগামিতা থামিয়ে দিতে যথেষ্ট ছিল। এই ঘটনা তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধসিয়ে দিতে পারত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন রাসূলুল্লাহর মৃত্যুতে সাহাবিরা যেন ভেঙে না পড়েন। সে জন্য উহুদের মাধ্যমে তাদের প্রস্তুত করে তুলেছেন। এই যুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল আল্লাহর রাসূল আর নেই। আর তখনই এই আয়াতটি নাযিল হয়,
"আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ তো কিছুই নন! তাঁর আগেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ অচিরেই তাদের পুরষ্কৃত করবেন।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৪)
রাসূলুল্লাহ মারা গেলেও কীভাবে তা সামলে উঠতে হবে সে ব্যাপারে এভাবেই মুসলিমরা শিক্ষা লাভ করে।

"নিশ্চয়ই তোমাদের আগে বহু জাতি গত হয়ে গেছে। অতএব পৃথিবীতে ভ্রমণ করো ও দেখো কেমন হয়েছিল মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম। এই (কুরআন) হচ্ছে মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং যারা ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৩৭-১৩৮)

উহুদের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য পরাজয়। কেউ কেউ মনে করেন, উহুদ ছিল 'ড্র ম্যাচ', কারণ কুরাইশরা অনেক মুসলিমকে হত্যা করতে পারলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মদীনা দখল করা, যেটা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু শাইখ ইবনুল কায়্যিম বলছেন, না, উহুদ ছিল মুসলিমদের জন্য বিজয়। এর কারণ হলো উহুদের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত অনন্য সব শিক্ষা। এই শিক্ষাগুলো অনুধাবন করতে না পারলে সীরাহ অধ্যয়নই বৃথা। এমনই কিছু শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

# মুসলিমদের চিরশ্রেষ্ঠত্ব
"আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু'মিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৩৯)

উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর, উপরের এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসলিমদেরকে এটাই বলছেন যে, তোমরা যদি আসলেই মু'মিন হয়ে থাকো, তাহলে বিজয় তোমাদেরই হবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বদরের যুদ্ধে যখন মুসলিমরা বিস্ময়করভাবে জিতে গেল, কিংবা মুসলিমরা যখন পুরো মক্কা বিজয় করে নিল, তখন কিন্তু আয়াতটি নাযিল হয়নি। আয়াতটি এল উহুদ যুদ্ধের ঠিক পরে। এখান থেকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, মুসলিমরা দুর্বল হোক, পরাজিত হোক -- তবুও তারা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি।

# কষ্ট হলেও লড়তে হবে
"তোমরা যদি আহত হয়ে থাকো, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)

আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তোমাদের সাথে উহুদের যুদ্ধে যা হয়েছে, কুরাইশদের সাথে বদরের সময় ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছে। তোমরা এখন জখমের কষ্ট ভোগ করছো, তারাও তখন জখমের কষ্ট ভোগ করেছে। কিন্তু বদরের পরাজয় তাদের আবার যুদ্ধ করা থেকে থামিয়ে রাখেনি। তারা আবারও প্রস্তুত হয়ে মাঠে নেমেছে। সুতরাং পরাজয় যেন মুসলিমদেরকে লড়াই থেকে বিরত না রাখে।

# যুদ্ধে জয় ও পরাজয় দুটোই দরকার, তবে চূড়ান্ত বিজয় মুসলিমদের
"... আর (জয় ও পরাজয়ের) এই দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)

ইবনুল কায়্যিম বলেন, 'আল্লাহ তাআলার অপরিসীম প্রজ্ঞা এবং তাঁর সুন্নাহ হলো, আল্লাহর নবী ও তাদের অনুসারীরা কখনো জিতবে, কখনো হারবে। তবে পরিশেষে তারাই বিজয়ী হবে। যদি মু'মিনরা সবসময় বিজয়ী হতো, তাহলে মু'মিন-মুনাফিক সবাই তাদের দলে ভিড়তো। তখন কে প্রকৃত ঈমানদার তা বোঝা যেত না।' আল্লাহ আযযা ওয়া জাল হার জিতের মাধ্যমে দিনবদল করে যাচাই করেন কে মু'মিন আর কে মুনাফিক।

# ঈমানের মাপকাঠি
“...আর এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার...” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)

ঈমান পরীক্ষা করার সবচাইতে উৎকৃষ্ট উপায় হলো আল্লাহর পথে জিহাদ করা। মানুষের জীবন যখন আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে বলা হয়, তখনই বোঝা যায় দ্বীনের জন্য কার কতটা ভালোবাসা।

# জিহাদ হলো উচ্চ মর্যাদা লাভ করার একটি সুযোগ
"...এবং তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪০)

ইবনুল কায়্যিম বলেন, 'শাহাদাত হলো আল্লাহর নজরে সবচাইতে উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানের একটি। শহীদেরা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। শত্রুদের হাতে নিহত না হলে কীভাবে মুসলিমরা শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে?' উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের পেছনে এটাও একটি হিকমত।

# জিহাদ হলো একটি শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া
"আর এই কারণে যেন আল্লাহ ঈমানদারদেরকে পবিত্র করতে পারেন..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪১)

আল্লাহ আযযা ওয়া জাল সাহাবিদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের জন্য জান্নাতে যে উঁচু স্থান রেখেছিলেন, তাদের আমল সেই স্থানের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই আল্লাহ তাদেরকে উহুদের যুদ্ধের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা আর জখমের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলেন। কষ্টের বিনিময়ে আসলে তাদের সওয়াবের পাল্লাটাই ভারী হচ্ছিল। ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, 'এটি হলো একটি শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া।'

# কাফিরদের খারাপের পাল্লা ভারী হতে দেওয়া
"...এবং কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দেন..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪১)

আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কাফিরদেরকে তাদের আমল দিয়েই ধ্বংস করেন। কাফিরদের হাতে মুসলিমদের পরাজয় এবং তাদের কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে সেই কাফিরদের ধ্বংস নিশ্চিত করা হয়। আমরা অনেক সময় দেখি, কোনো কোনো কাফির জাতি অত্যন্ত দুঃসাহস দেখাচ্ছে, মুসলিমদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করছে। তাদের এই কাজগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ। আর সে কারণেই তিনি তাদেরকে এই দুনিয়াতে স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে করে তারা নিজের হাতেই জাহান্নামের আগুন কিনে নিতে পারে।

# জান্নাতের জন্য কষ্ট করা চাই
“তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল?” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪২)

জিহাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিহাদ না করেই জান্নাতে চলে যাওয়ার আশা করা যায় না। জান্নাত বিনামূল্যে লাভ করার জিনিস নয়। জান্নাতের জন্য কষ্ট করা চাই। মানুষের আমল জান্নাতে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট নয়, আল্লাহর রহমত ও দয়ার কারণেই একজন মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে, কিন্তু তার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

# উহুদের যোদ্ধাদের আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন
উহুদের যুদ্ধে কিছু সাহাবি ভুল করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের সান্ত্বনা দিলেন, ক্ষমা করে দিয়ে তাদের প্রতি করুণা দেখালেন। মুসলিমরা নবীজির আদেশ অমান্য করে গুনাহ করেছিল। এই দুনিয়ার তুচ্ছ সম্পদের জন্য পাহাড় থেকে নেমে মারাত্মক অপরাধ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের মাফ করে দিয়েছেন।

# ইলমচর্চা এবং জিহাদ
"আর আরো কত নবী যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ছিল বহু আলিম..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৬)

আলিমদের কাজ ঘরে বসে থাকা নয়, নবীদের সাথে এই আলিমরা পরাজিত হয়েছেন কিন্তু দমে যাননি। পরাজয় যেন আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে, আমাদেরকে হতাশ করে না দেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মু'মিনদেরকে সর্বদাই দৃঢ় থাকা চাই। তারা আল্লাহর কাছে নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতো।

# অবাধ্যতার খেসারত
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি কোনো বিষয়ে তোমরা মতভেদ করো তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে পেশ করো..." (সূরা নিসা, ৪: ৫৯)

রাসূলুল্লাহর অবাধ্যতা ছিল উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের বিপর্যয় ও পরাজয়ের মূল কারণ। যদি কোনো বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে তা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সমাধান করতে হবে।

# দুনিয়াসক্তির পরিণতি ভয়াবহ
গনিমতের মাল পাওয়ার জন্য সাহাবিদের ধৈর্যহীনতাই বড় বিপদ ডেকে এনেছে। উহুদের যুদ্ধে গনিমতের মালের আশাতেই তীরন্দাজ সৈন্যরা পাহাড় থেকে নিচে নেমে এসেছিল। এই দুনিয়ার মোহ, আসক্তি এবং আখিরাতের ওপরে দুনিয়াকে স্থান দেওয়া হলো মুসলিমদের অধঃপতনের কারণ।

# দ্বীনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা
মুহাম্মাদ ﷺ এর মৃত্যু সংবাদের গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু মুসলিম পরাজিত মানসিকতায় আব্দুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে যেতে চাইল। কিন্তু আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন—"আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ তো কিছুই নয়! তাঁর আগেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?" ইসলাম একটি দ্বীন যা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, ব্যক্তি বিশেষের ওপর এই দ্বীন নির্ভরশীল নয়। বিজয় কোনো আমীরের কারণে আসে না।

# মুনাফিক আর গুনাহগার মু'মিন- কখনোই সমান নয়
দাওয়া এবং ইসলামের বার্তা পৌঁছানোর কাজ সাধারণভাবে কোমলতার ভিত্তিতে হওয়া চাই। দিন শেষে যারা আল্লাহর রাসূলের আদেশ অমান্য করেছে, তারা তাঁরই অনুসারী। তাই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেছেন যেন তিনি তীরন্দাজ মুসলিম বাহিনীকে মাফ করে দেন। উম্মাহর বিজয় অর্জনের জন্য আমাদের সবাইকে শুধরাতে হবে—এই ধারণা সঠিক নয়। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ ছিল মুনাফিক, কিন্তু তাদের কারণে মুসলিমরা হারেনি। পরাজয়ের কারণ ছিল সেই ৪০ জন, যারা রাসূলুল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল।

# পরাজয় আশাবাদী মনকে নিরাশ করে না
উহুদ পর্বতের সাথে রাসূলুল্লাহর কষ্টের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, কিন্তু হতাশাকে নিজের মনে কখনো স্থান দেননি। তিনি বলতেন, 'উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও উহুদকে ভালোবাসি।' পরাজয়ের মধ্য থেকে ভালো দিকটা দেখার চেষ্টা করতে হবে।

# বিজয়ের সূত্র
বিজয় একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে আসে। যদি আল্লাহ সাহায্য করেন, তবে কেউ পরাভূত করতে পারবে না। পরাজয়ের বড় কারণ আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া। বিজয় বা পরাজয়ের সাথে সৈনিকদের সংখ্যার কোনো সম্পর্ক নেই; বদরে অল্প সংখ্যা সত্ত্বেও আল্লাহ বিজয় দিয়েছেন। বিজয়ের জন্য তিনটি গুণ প্রয়োজন—আল্লাহ ও রাসূলকে মান্য করা, ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করা।

# মু'মিনদের জিহাদে ছোটার প্রেরণা হলো ঈমান
যাদের ঈমান ছিল, তারা যুদ্ধে যোগদানের জন্য আগ্রহী ছিল। আর যাদের ঈমান ছিল না বা নিফাক ছিল, তারা পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী ছিল। মুনাফিকদের জিহাদে যাওয়ার প্রেরণা হলো দুনিয়া ও গনিমত। নিফাকের ব্যাপারে আমাদের সাবধান হতে হবে।

# উহুদ ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় বিপর্যয় মোকাবেলার প্রস্তুতি
ইবনুল কায়্যিম মন্তব্য করেছেন, 'উহুদের যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহকে সবচাইতে মারাত্মক দুর্যোগের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত করেছে।' এই দুর্যোগ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যু। রাসূলুল্লাহ মারা গেলেও কীভাবে তা সামলে উঠতে হবে সে ব্যাপারে এভাবেই মুসলিমরা শিক্ষা লাভ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00