📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উহুদের যুদ্ধবন্দী

📄 উহুদের যুদ্ধবন্দী


উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের একমাত্র যুদ্ধবন্দী ছিল আবু আযযা। এই আবু আযযা বদর যুদ্ধেও বন্দী হয়েছিল। তখন সে অজুহাত দেখায়, সে খুব গরিব, তার মেয়েদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। রাসূলুলাহ সেবার কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেন। শুধু একটাই শর্ত জুড়ে দেন, তা হলো সে কখনই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আবু আযযা এ কথা মেনে নিয়ে মুক্তি পায়।

কিন্তু মক্কার কুরাইশরা উহুদের সময় আবারও তাকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নানাভাবে ফুসলাতে থাকে। আবু আযযা রাজি হলো না। আবু সুফিয়ান তাকে বললো, 'আরে! আমাদের এবার তিন হাজার সৈন্য, আমরা কীভাবে হারতে পারি! আর তোমার মেয়েদের কথা ভাবছো? শোনো, যদি তোমার কিছু হয়েও যায়, এই আমি আছি তোমার মেয়েদের দেখাশোনার জন্য।'

টাকার লোভে আবু আযযা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হলো। আর বন্দীও হলো। এবারেও আবু আযযা পুরোনো অজুহাত খাড়া করে ছাড়া পাবার চেষ্টা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে, তুমি মুহাম্মাদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছো -- সেটা আমি হতে দেবো না। মুসলিম এক গর্তে দু'বার দংশিত হয় না।' তিনি আবু আযযাকে হত্যার আদেশ দেন।

মুসলিমদের অতি সরলমনা হলে চলবে না। কেউ যেন বোকা বানাতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সহানুভূতিশীলতা এবং সতর্কতা-এ দুয়ের মাঝে হতে হবে আমাদের অবস্থান। সবকিছুকে অতি সরল মনে গ্রহণ করা বা মানুষকে খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলা যেমন এক ধরনের চরমপন্থা, তেমনি সারাক্ষণ চরম নৈরাশ্যবাদে নিমজ্জিত থাকা, সবচছুর মাঝে মন্দের আভাস খুঁজে পাওয়া আরেক ধরনের চরমপন্থা। উল্লেখিত দ্বিতীয় ধরনের চরমপন্থা একজন মানুষকে অন্যের প্রতি সদয় হতে নিরুৎসাহিত করে তোলে। তাই মুসলিমরা এ দুয়ের মাঝে এমন এক মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে যা হবে বাস্তবধর্মী।

উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের একমাত্র যুদ্ধবন্দী ছিল আবু আযযা। এই আবু আযযা বদর যুদ্ধেও বন্দী হয়েছিল। তখন সে অজুহাত দেখায়, সে খুব গরিব, তার মেয়েদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। রাসূলুলাহ সেবার কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেন। শুধু একটাই শর্ত জুড়ে দেন, তা হল সে কখনই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আবু আযযা এ কথা মেনে নিয়ে মুক্তি পায়।

কিন্তু মক্কার কুরাইশরা উহুদের সময় আবারও তাকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নানাভাবে ফুসলাতে থাকে। আবু সুফিয়ান তাকে বলল, 'অরে! আমাদের এবার তিন হাজার সৈন্য, আমরা কীভাবে হারতে পারি! আর তোমার মেয়েদের কথা ভাবছো? শোনো, যদি তোমার কিছু হয়েও যায়, এই আমি আছি তোমার মেয়েদের দেখাশোনার জন্য।'

টাকার লোভে আবু আযযা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হল। আর বন্দীও হল। এবারেও আবু আযযা পুরোনো অজুহাত খাড়া করে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে, তুমি মুহাম্মাদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছো -- সেটা আমি হতে দেবো না। মুসলিম এক গর্তে দু'বার দংশিত হয় না।' তিনি আবু আযযাকে হত্যার আদেশ দেন।

মুসলিমদের অতি সরলমনা হলে চলবে না। কেউ যেন বোকা বানাতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সহানুভূতিশীলতা এবং সতর্কতা-এ দুয়ের মাঝে হতে হবে আমাদের অবস্থান। মুসলিমরা এ দুয়ের মাঝে এমন এক মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে যা হবে বাস্তবধর্মী।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শেষ ভালো যার, সব ভালো তার

📄 শেষ ভালো যার, সব ভালো তার


মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়। এমন একজন হলো কাযমান।

১) কাযমান
তার নাম কাযমান অথবা কুযমান। ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'

সাহাবিরা অবাক হলেন, কাযমান কীভাবে জাহান্নামী হতে পারে! সে তো মুসলিমদের পক্ষে বীরের মতো লড়ছে! কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। শরীরে আঘাতের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বললো, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।'

রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে। এ কারণে তার স্থান ছিল জাহান্নাম। কাজেই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করাটাই সব নয়। বরং যুদ্ধ হতে হবে সঠিক আক্বীদা বিশ্বাসের জন্য।

২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। যদিও রাসূলুল্লাহ তাদের কাছে কোনো সাহায্য চাননি। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বললো, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা বললো, 'আজকে তো শনিবার, আজকে আবার কীসের যুদ্ধ?' মুসলিমদের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ইহুদিদের গড়িমসি দেখে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা খরচ করবেন।'

এই বলে সে বেরিয়ে পড়লো। যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ।

মুখাইরিক মুসলিম ছিল নাকি অমুসলিম ছিল, তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁদের মতে, 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা', এই কথা দিয়ে আল্লাহর রাসূল জাতীয়তা বুঝিয়েছেন, দ্বীন বা ধর্ম বোঝাননি।

৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি, তার গোত্রের লোকদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে দেয়নি। সে ছিল মুশরিক। একদিন মদীনায় এসে বিভিন্ন লোকের খোঁজ করতে শুরু করছে, কিন্তু কেউই মদীনায় নেই!
- অমুক কোথায়? - উহুদে! - তমুক কোথায়? - সেও উহুদের ময়দানে!

উসাইরিম যার কথাই জানতে চায়, প্রত্যেকেই উহুদে! উসাইরিম বললো, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে তরবারি, বর্শা আর যুদ্ধ-সরঞ্জাম নিয়ে ঘোড়ায় চেপে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। মুসলিমরা তাকে দেখে অবাক! 'তুমি এখানে? চলে যাও তুমি!' উসাইরিম জবাব দিল, 'না, আমি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।

যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে, তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে খুব অবাক হলো। তারা বলাবলি করতে থাকলো, 'আরে উসাইরিম এখানে! সে তো কাফির ছিল বলেই জানতাম। সে এখানে কী করছে?' তারা উসাইরিমকে জিজ্ঞেস করলো,
- উসাইরিম, তুমি এখানে কীভাবে এলে? ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় নাকি স্বজাতির শক্তি বৃদ্ধিতে?
- আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। রাসূলুল্লাহর সমর্থনে যুদ্ধ করবো বলে হাতে তরবারি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। আমার অবস্থা তো তোমরা এখন দেখতেই পাচ্ছো।

এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! এই বিষয়টা নিয়ে আবু হুরায়রা সাহাবিদের কুইজ জিজ্ঞেস করতেন। উসাইরিম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ একটি চমৎকার কথা বলেছেন, 'তার আমল ছিল অল্প, কিন্তু যে পুরস্কার সে কামিয়ে নিয়েছে তা অসামান্য।' শাহাদাহ বা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া হলো এমন একটি কাজ যা মানুষকে জান্নাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বাদ বাকি সব আমল ছাড়াই মাত্র এই একটি আমলের মাধ্যমে সে জান্নাতে সবচেয়ে উঁচু অবস্থানে চলে যেতে পারবে। উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে, তাই সে জান্নাতে যাবে।

মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়।

১) কাযমান
ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'

যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বলল, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।' রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে।

২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বলল, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা Saturday/শনিবারের অযুহাত দিলে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ।'

যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হল ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি। একদিন মদীনায় এসে দেখল সবাই যুদ্ধ করার জন্য উহুদের ময়দানে গেছে। উসাইরিম বলল, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। যুদ্ধ করতে করতে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।

যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কীভাবে এলে? উসাইরিম বললেন, 'আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উহুদের যুদ্ধে মু'জিযা

📄 উহুদের যুদ্ধে মু'জিযা


১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ: বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।

২. উবাই ইবন খালাফ: কুরাইশদের এই নেতা মাক্কী জীবনে নবীজিকে হুমকি দিত, 'এই যে মুহাম্মাদ, দেখো, দেখো! আমি এই ঘোড়াকে দিনে বারো মুঠো শস্য খাওয়াই। এর পিঠে চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করবো।' নবীজি তখন জবাব দিতেন, 'না, বরং আমিই তোকে হত্যা করবো!'

উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগলো। সাহাবিরা এগিয়ে গেলেন তাকে প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু নবীজি তাদের থামিয়ে দিলেন। একটি বর্শা হাতে নিয়ে সেটা ঝাঁকাতে শুরু করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। উবাই ইবন খালাফের সমস্ত দেহ ছিল বর্মে ঢাকা। একটা বর্শায় তাকে আক্রমণ করা অসম্ভব! কিন্তু নবীজির বর্শা আঘাত করলো ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে।

সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে তার লোকেদের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। তারা বললো, 'তোমার হয়েছেটা কী?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ আমাকে মেরে ফেলেছে!' তারা তার বর্ম খুললো কিন্তু গলার কাছে কোনো আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পেল না। এরপর বললো, 'তোমার তো কিছুই হয়নি। এত ভয় পাচ্ছো কেন?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ বলেছে সে আমাকে হত্যা করবে! সে যদি কিচ্ছু না করে শুধু আমার দিকে থুথু ছিটায়, তবুও আমি মারা যাব!' পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হলো উবাই ইবন খালাফ।

সীরাহ থেকে একটি বিষয় বার বার প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহর প্রতিটা কথায় এমনকি শত্রুরাও বিশ্বাস করতো! কুরাইশ কাফিররা অক্ষরে অক্ষরে রাসূলুল্লাহর কথা বিশ্বাস করতো। কিন্তু ঔদ্ধত্য আর অহংকারের কারণে তাঁকে নবী বলে মেনে নেয়নি। যেমন, এই ঘটনায় উবাই সামান্য একটু আঁচড় খেয়েই এত ভয় পেয়ে যায় যে, তার কাছে মনে হয় সে মারা গেছে। কারণ রাসূলুল্লাহ তাকে বহু আগে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিলেন। আর সেই হুমকি সত্য হওয়ার এই ঘটনা একটি মু'জিযাও বটে।

উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সে কেবলই পানি খেতে চাচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হলো সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। অনেক সময় কিছু মানুষ কাফিরদের প্রতি আল্লাহর আযাব, কিংবা মুসলিমদের আনন্দ ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করতে পারবে। এটা স্বপ্নেও হতে পারে অথবা সামনা-সামনিও হতে পারে। যেমন হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবন উমারের ক্ষেত্রে, তিনি সরাসরি শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।

টিকাঃ
20 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।

১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ
বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।

২. উবাই ইবন খালাফ
উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ ﷺ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। নবীজির বর্শা আঘাত করল ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে। সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হল উবাই ইবন খালাফ।

উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার রা. এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হল সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।

টিকাঃ
২০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা

📄 উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা


উম্মাহর জীবন থেকে জিহাদ অনুপস্থিত হয়ে পড়ায় মুসলিম নারীদের ভূমিকা অনেকাংশেই শুধুমাত্র পারিবারিক কাজে সীমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রথম যুগে বিষয়টা এমন ছিল না। সে সময়ে মুসলিম নারীরা জিহাদেও ভূমিকা রাখতেন। এ প্রসঙ্গে উহুদের যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা নিয়ে না জানলেই নয়। মুসলিম ভাইদের জন্য যেমন আদর্শ প্রয়োজন, তেমনি মুসলিম বোনেরাও যেন আদর্শ হিসেবে সাহাবিয়াতদের অনুসরণ করতে পারেন সে জন্য এই আলোচনা জরুরি। বর্তমান যুগে মুসলিম নারী এবং পুরুষ উভয়েই এমনভাবে জীবন যাপন করছে যার সাথে সাহাবিদের জীবনযাত্রার কোনো মিল-ই নেই। অথচ এই সাহাবিরাই ইসলামকে সবচেয়ে সঠিকভাবে বুঝতেন। কাজেই আমরা যদি ইসলামের অনুসরণ করতে চাই, আমাদের সাহাবিদের দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে তারা কী করেছেন, কী করেননি। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু যুদ্ধের আনুষঙ্গিক কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

১) যোদ্ধাদের পানি সরবরাহ ও চিকিৎসা
উহুদের যুদ্ধে পানি সরবরাহ ও চিকিৎসার কাজে মুসলিম নারীরা সরাসরি অংশ নেন। আনাস ইবন মালিকের ভাষায়, 'সেদিন আমি দেখতে পেলাম আইশা বিনত আবু বকর আর উম্ম সুলাইম তাদের কাপড় গুটিয়ে কাজ করছেন। তাদের গোড়ালি দেখা যাচ্ছিল (এটা হিজাবের বিধান আসার আগের কথা)। তাঁরা নিজেদের কাঁধে পানির বালতি নিয়ে এক এক করে মুজাহিদ ভাইদের কাছে যাচ্ছেন আর তাদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছেন। বালতির পানি শেষ হয়ে গেলে তাঁরা ফিরে গিয়ে আবার বালতি ভরে আনছেন আর মুসলিম সৈন্যদের পানি সরবরাহ করছেন।' হামনাহ বিনতে আবি জাহশ এবং উম্ম আইমানও এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

এখানে দেখার মতো বিষয় হলো, সাহাবিদের জন্য জিহাদ কোনো ব্যক্তিগত কাজ ছিল না। এটা ছিল একটি পারিবারিক ও সামাজিক প্রচেষ্টা। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই জিহাদে নিজ নিজ ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছে। মুসলিমদের আমীর রাসূলুল্লাহর স্ত্রী হয়েও তারা মুসলিম সৈন্যদের সেবায় নিযুক্ত হয়েছেন।

আনাস ইবন মালিক বলেন, 'যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তিনি তাঁর সাথে উম্মে সালীম আর আনসারী কিছু নারীদেরকে নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা মুসলিম সৈনিকদের পানি খাওয়াতে পারেন আর আহতদের সেবা-শুশ্রুষা করতে পারেন।' আর-রুবায়া বিনত মু'আউইয বলেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথেই থাকতাম, যোদ্ধাদের পানি পান করাতাম, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতাম। আহত আর নিহত সৈনিকদের মদীনায় নিয়ে আসতাম।'

উমার ইবন খাত্তাবের খিলাফতকালের কথা। তিনি একবার মদীনার মহিলাদের জন্য কিছু উলের কাপড় বিতরণ করছেন। সবাইকে দেওয়ার পরও এক সেট কাপড় বাকি রয়ে গেল। কাপড়টি ছিল বেশ উন্নত মানের। কেউ একজন বললো, 'আমীরুল মুমিনীন, এই কাপড়টি আপনি আল্লাহর রাসূলের কন্যাকে দিয়ে দিন।' তারা আসলে আলীর কন্যা উম্মে কুলসুমের কথা বলছিল। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর নাতনি আর উমার ইবন খাত্তাবের স্ত্রী। উমার ইবন খাত্তাব বললেন, 'না! আনসারি সাহাবি উম্মে সালিত এই কাপড়ের বেশি হকদার। কারণ উহুদের যুদ্ধে তিনি ছোটাছুটি করে আমাদেরকে পানি এনে দিচ্ছিলেন।' উহুদের যুদ্ধের বহু বছর পরেও উমার এই আনসারী নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। উহুদের মতো গুরুত্ববহ সময়ে এই সাহাবিয়াতের ভূমিকা অবশ্যই স্বীকৃতি পাবার মতো একটি বিষয়। আর এই সাহাবিদের অপরিসীম ত্যাগের জন্যই তাদেরকে আল্লাহ 'আনসার' অর্থাৎ দীনের সাহায্যকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

নবীজির কন্যা ফাতিমাও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নবীজি যখন রক্তাক্ত, ফাতিমা নবীজির মুখের রক্ত ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যখন পানির কারণে রক্তের প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য খেজুর গাছের বাকল নিয়ে সেটা আগুনে পুড়িয়ে সেই ছাই আল্লাহ রাসূলের ক্ষতের ওপর চেপে ধরেন।

২) সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
উহুদে একজন নারীই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, নুসাইবাহ বিনত কা'ব আল মাযিনিয়‍্যাহ। শক্তিশালী এই নারী উহুদের যুদ্ধে ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আবু বকরের খিলাফতকালে ভ্রান্ত নবী মুসাইলামা আল-কাযযাবের বাহিনীর বিরুদ্ধেও তিনি যুদ্ধ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর নাতনি তাকে গোসল করিয়ে দেয়। সে বলে, 'আমি নানীর শরীরে ১৩টি ক্ষত দেখেছি, সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি ছিল উনার কাঁধে। সেখানে ইবন কামিয়ার তরবারির আঘাত লেগেছিল। ইবন কামিয়া যখন উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহকে আক্রমণ করে, তখন নুসাইবাহ নবীজিকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। ইবন কামিয়া তখন তাকে আঘাত করে।'

ইবনে কামিয়ার এই তরবারির আঘাত এত ভয়ানক ছিল যে, এক বছর পর্যন্ত নুসাইবাহর কাঁধে ব্যথা থাকে। অন্যান্য যুদ্ধের সময়েও তিনি আহত হয়েছেন। ভণ্ড নবী-দাবিদার মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তিনি মারাত্মক আহত হন। জখম সারানোর জন্য তাঁর ক্ষতস্থানে গরম তেল ঢালা হয়। সে যুগে জখম সারাবার পদ্ধতি ছিল জখমের ব্যথার চাইতেও কষ্টকর। এত ব্যথা, এত কষ্টকর জখমও তাকে যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

উহুদের যুদ্ধের পরদিন যখন নবীজি শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে হামরা আল আসাদে যেতে চাইলেন; সঙ্গে সঙ্গে নুসাইবাহ বিনত কা'বও সেখানে যেতে চাইলেন। কিন্তু উঠে দাঁড়ানো মাত্র তিনি ধপ করে পড়ে গেলেন। জখমের কারণে আর চলতে পারছিলেন না। উহুদে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরেও তাঁর উদ্যম বিন্দুমাত্র কমেনি। জিহাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল এতটাই প্রবল।

আল্লাহর রাসূলকে বাঁচাতে সাহাবিরা নির্দ্বিধায় শত্রুর তরবারির মুখে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাসূলুল্লাহ মানুষটাই ছিলেন এমন যার জন্য হাসতে হাসতে জান দিয়ে দেওয়া যায়। হামরা আল আসাদ থেকে ফিরে আসার পর এত উদ্বেগ, ব্যস্ততা, ক্লান্তির মধ্যেও নবীজি কারো কথা ভুলেননি। লোক পাঠিয়ে নুসাইবার খোঁজ নিলেন। সে নবীজিকে জানালো, 'এখন তাঁর শরীরের অবস্থা আগের থেকে কিছুটা ভালো।' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে ওঠেন। এ আনন্দ কোনো লোক-দেখানো অভিনয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ একজন বাবার মতোই সাহাবিদের ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন। তাদের খোঁজ-খবর নিতেন, তাদের কাছাকাছি থাকতেন, সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ রাখতেন। তাঁর মনে সবসময় সাহাবিদের চিন্তা লেগেই থাকতো।

টিকাঃ
21 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৯৫।

প্রথম যুগে মুসলিম নারীরা জিহাদেও ভূমিকা রাখতেন। বর্তমান যুগে মুসলিম নারী এবং পুরুষ উভয়েই এমনভাবে জীবন যাপন করছে যার সাথে সাহাবিদের জীবনযাত্রার কোনো মিল-ই নেই। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু যুদ্ধের আনুষঙ্গিক কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

১) যোদ্ধাদের পানি সরবরাহ ও চিকিৎসা
উহুদের যুদ্ধে পানি সরবরাহ ও চিকিৎসার কাজে মুসলিম নারীরা সরাসরি অংশ নেন। আনাস ইবন মালিকের ভাষায়, 'সেদিন আমি দেখতে পেলাম আইশা বিনত আবু বকর আর উম্ম সুলাইম তাদের কাপড় গুটিয়ে কাজ করছেন। তারা মুজাহিদ ভাইদের কাছে যাচ্ছেন আর তাদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছেন।' হামনাহ বিনতে আবি জাহশ এবং উম্ম আইমানও এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন। আনাস ইবন মালিক বলেন, 'যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো যুদ্ধের জন্য বের হতেন, তিনি তাঁর সাথে উম্মে সালীম আর আনসারী কিছু নারীদেরকে নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা মুসলিম সৈনিকদের পানি খাওয়াতে পারেন আর আহতদের সেবা-শুশ্রুষা করতে পারেন।'

উমার ইবন খাত্তাব উম্মে সালিতকে কাপড় দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন কারণ উহুদের যুদ্ধে তিনি ছোটাছুটি করে পানি এনে দিচ্ছিলেন। নবীজির কন্যা ফাতিমাও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নবীজি যখন রক্তাক্ত, ফাতিমা নবীজির মুখের রক্ত ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য খেজুর গাছের বাকল পুড়িয়ে সেই ছাই আল্লাহ রাসূলের ক্ষতের ওপর চেপে ধরেন।

২) সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
উহুদে একজন নারীই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, নুসাইবাহ বিনত কা'ব আল মাযিনিয়‍্যাহ। তিনি উহুদের যুদ্ধে ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইবন কামিয়া যখন উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহকে আক্রমণ করে, তখন নুসাইবাহ নবীজিকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। ইবন কামিয়া তখন তাকে আঘাত করে। জখম থাকা সত্ত্বেও তিনি পরের দিন হামরা আল আসাদে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জখমের কারণে আর চলতে পারছিলেন না। আল্লাহর রাসূল একজন বাবার মতোই সাহাবিদের ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন। হামরা আল আসাদ থেকে ফিরে আসার পর নবীজি লোক পাঠিয়ে নুসাইবার খোঁজ নিলেন।

টিকাঃ
২১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৯৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px