📄 স্নায়ু যুদ্ধ: হামরা আল-আসাদ
উভয় পক্ষ ময়দান ত্যাগ করলেও যুদ্ধের রেশ তখনো কাটেনি। রাসূলুল্লাহ হার মেনে যাওয়ার মানুষ নন। শত্রুপক্ষের মনস্তত্ত্বও তিনি বুঝতেন। তিনি ধারণা করলেন, কুরাইশরা যেহেতু এই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তাই তারা আবার মদীনায় হামলা চালাতে পারে। তাঁর ধারণা সত্যি হলো। কুরাইশরা প্রথমে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পথিমধ্যে তারা মত বদলালো। ইকরিমাহ ইবন আবি জাহল সবাইকে বলে বেড়াতে থাকে, 'কী করেছো তোমরা? না পারলে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে, না পারলে তাদের নারীদের দাসী বানাতে! ছি! কিছুই তো পারলে না।' তার উসকানিমূলক কথায় কুরাইশরা মদীনায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল।
তবে এ খবর রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় এতটুকু আঁচড় কাটতে পারেনি। তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না, বরং কুরাইশদের মোকাবেলা করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন ইসহাক, তিনি বর্ণনা করেছেন,
'উহুদের যুদ্ধ মধ্য শাওয়ালের এক শনিবারে সংঘটিত হয়, আর ঠিক তার পরদিনই রাসূলুল্লাহর মুয়াজ্জিন ঘোষণা দেন তারা শত্রুদের ধাওয়া করবে। তিনি বললেন, আগের দিন যারা যুদ্ধ করেছে, কেবল তারাই এই অভিযানে অংশ নেবে। কুরাইশদের বুকে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহর রাসূল তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। উদ্দেশ্য -- তাদের জানান দেওয়া যে, মুসলিমরা মোটেও দুর্বল হয়নি। তারা এখনো শত্রুদের মোকাবেলা করতে সক্ষম।'
মুসলিমরা তখন সবে মাত্র ময়দান থেকে ফিরেছে। আর পরদিন সকালেই বলা হলো, অস্ত্র তুলে নাও আর শত্রুদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়ো! মুজাহিদরা ক্লান্ত, আহত, শরীর তাদের ক্ষত-বিবিক্ষত। আগের দিনই তারা ৭০ জন সঙ্গীকে হারিয়েছে! আর এমনই কঠিন পরিস্থিতিতে পরের দিনই তাদের বলা হলো আরেকটি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে।
ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যদিকে মুনাফিকরা স্বভাববশত মুসলিমদের মনে ভয় ছড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সাফ কথা, 'আমরা বের হবো এবং শত্রুদের মোকাবেলা করবো।' শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে ভয় দেখানো; তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মুসলিম বাহিনী এখনও হেরে যায়নি। তাদের কাছে এই ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দেওয়া যে, যুদ্ধে পরাজয় মুসলিমদেরকে একটুও দুর্বল করতে পারেনি। এমন বিপদ আর সংকটের মুখেও রাসূলুল্লাহ অপরিসীম ধৈর্য, দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। হেরে গেলেও উজ্জীবিত থাকা, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উদ্যম থাকা, আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আস্থা রাখা মুজাহিদদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষত-বিবিক্ষত শরীর নিয়ে আহত সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলের আহবানে সাড়া দেন; বেরিয়ে পড়েন জিহাদে। তারা হামরা আল-আসাদে যুদ্ধের তাঁবু গাড়েন। কুরাইশরা অবাক দৃষ্টিতে দেখছে আর ভাবছে, 'আমরা কি আসলেই তাদের হারিয়েছি!' তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না যারা গতকাল তাদের সাথে যুদ্ধে 'হেরে' গেছে, তারা কী করে ঠিক তার পরদিন যুদ্ধে নামার সাহস পেল!
এর মধ্যে ঘটে গেল একটি ঘটনা। খুযাআ গোত্রের একজন মুশরিক মা'বাদের সাথে রাসূলুল্লাহর দেখা হলো আর সে মুসলিম হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাকে আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠালেন যেন সে মুসলিমদের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। মা'বাদকে দেখে আবু সুফিয়ান বলে উঠলো, ওদিকটার খবর কী মা'বাদ, জানো কিছু?
- মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে তোমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এমন বাহিনী আমি জীবনেও দেখিনি! তারা তোমাদের বিরুদ্ধে মহা ক্ষ্যাপা! উহুদের যুদ্ধে যারা আসেনি, তারাও এবার যোগ দিয়েছে। আগেরবার আসতে পারেনি দেখে ওদের অনুশোচনার শেষ নেই।
মা'বাদ ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে কথা বলছিল। আবু সুফিয়ান বললো,
- আচ্ছা তোমার কী মনে হয়? আমাদের এখন কী করা উচিত? কসম করে বলছি, তোমরা এখান থেকে পালাবার আগেই তাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী এসে পড়বে!
- কিন্তু আমরা তো চাচ্ছিলাম তাদের পুরোপুরি শেষ করে দিতে!
- সত্যি বলতে, আমি মনে করি এই পরিকল্পনা মাথা থেকে বাদ দিলেই ভালো। কসম আল্লাহর! তুমি জানো, আমি ওদের দেখে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম যে একটা কবিতাও রচনা করে ফেলেছি!
আবু সুফিয়ান তার কবিতাটা শুনতে চাইলে, মা'বাদ বলে, 'দের আওয়াজে পাহাড় যেন লজ্জায় মুখ লুকোয়, টগবগ করে ছোটা সারিবাঁধা সুঠাম অশ্বের ঝংকারে ধ্বনিত হয় পৃথিবী- ঘোড়সওয়ারিরা, তারা তো এক একটা মস্ত সিংহ। এই সৈনিকেরা যুদ্ধকে ডরায় না, অস্ত্রের অভাব নেই তাদের আমি দেখে দৌড়ে পালাই, মনে হয় যেন ধরণী কাঁপছে! তাদের আছে এমন নেতা যাকে কেউ কোনোদিন একা ফেলে যাবে না।'
মা'বাদ এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করলেন। শত্রুর মনোবল ভেঙে দিলেন। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আবু সুফিয়ান তবু আক্রমণ করার মিথ্যা হুমকি দিয়ে মুসলিমদের ভয় দেখানোর শেষ চেষ্টা করলো। কিন্তু মুসলিমদের এতটুকু টলানো গেল না। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"যারা আহত হয়ে পড়ার পরেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও পরহেযগার, তাদের জন্য রয়েছে মহান পুরস্কার। মুনাফিক্বরা যাদেরকে বলেছিল, নিঃসন্দেহে তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, অতএব তাদের ভয় করো। কিন্তু তাদের ঈমান বেড়ে গেল, আর তারা বললো, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি অতি উত্তম রক্ষাকর্তা। সুতরাং তারা ফিরে এল আল্লাহর কাছ থেকে নিআমত ও করুণাভাণ্ডার নিয়ে, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি, বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষণ করেছিল। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত বিশাল। নিঃসন্দেহ শয়তানই তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো,-- যদি তোমরা ঈমানদার হও।” (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭২-১৭৫)
শয়তান মু'মিনদের ভয় দেখায়, 'দেখো, শত্রুরা অনেক শক্তিশালী, ওদের অনেক ক্ষমতা! ওদের অস্ত্রশস্ত্রের দিকে তাকাও, ওদের সংখ্যা গুনো, ওদের সহায়-সম্পদ দেখো! ওদের সাথে লড়তে যেও না।' এসব বলে শয়তান মনের মধ্যে ভয় ঢোকাতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ সবই শয়তানের দেওয়া ওয়াসওয়াসা। আমরা যদি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি, তাহলে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাদেরকেই বিজয়ী করবেন।
উভয় পক্ষ ময়দান ত্যাগ করলেও যুদ্ধের রেশ তখনো কাটেনি। রাসূলুল্লাহ হার মেনে যাওয়ার মানুষ নন। শত্রুপক্ষের মনস্তত্ত্বও তিনি বুঝতেন। তিনি ধারণা করলেন, কুরাইশরা যেহেতু এই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তাই তারা আবার মদীনায় হামলা চালাতে পারে। তাঁর ধারণা সত্যি হল। কুরাইশরা প্রথমে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পথিমধ্যে তারা মত বদলাল। ইকরিমাহ ইবন আবি জাহল সবাইকে বলে বেড়াতে থাকে, 'কী করেছো তোমরা? না পারলে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে, না পারলে তাদের নারীদের দাসী বানাতে! ছি! কিছুই তো পারলে না।' তার উসকানিমূলক কথায় কুরাইশরা মদীনায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল।
তবে এ খবর রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় এতটুকু আঁচড় কাটতে পারেনি। তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না, বরং কুরাইশদের মোকাবেলা করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন ইসহাক, তিনি বর্ণনা করেছেন, 'উহুদের যুদ্ধ মধ্য শাওয়ালের এক শনিবারে সংঘটিত হয়, আর ঠিক তার পরদিনই রাসূলুল্লাহর মুয়াজ্জিন ঘোষণা দেন তারা শত্রুদের ধাওয়া করবে। তিনি বললেন, আগের দিন যারা যুদ্ধ করেছে, কেবল তারাই এই অভিযানে অংশ নেবে। কুরাইশদের বুকে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহর রাসূল তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। উদ্দেশ্য -- তাদের জানান দেওয়া যে, মুসলিমরা মোটেও দুর্বল হয়নি। তারা এখনো শত্রুদের মোকাবেলা করতে সক্ষম।'
মুসলিমরা তখন সবে মাত্র ময়দান থেকে ফিরেছে। আর পরদিন সকালেই বলা হল, অস্ত্র তুলে নাও আর শত্রুদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়ো! মুজাহিদরা ক্লান্ত, আহত, শরীর তাদের ক্ষত-বিগত। আগের দিনই তারা ৭০ জন সঙ্গীকে হারিয়েছে! আর এমনই কঠিন পরিস্থিতিতে পরের দিনই তাদের বলা হল আরেকটি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে।
ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যদিকে মুনাফিকরা স্বভাববশত মুসলিমদের মনে ভয় ছড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সাফ কথা, 'আমরা বের হব এবং শত্রুদের মোকাবেলা করব।' শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে ভয় দেখানো; তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মুসলিম বাহিনী এখনও হেরে যায়নি। হারের পরেও উজ্জীবিত থাকা, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উদ্যম থাকা, আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আস্থা রাখা মুজাহিদদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে আহত সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলের আহবানে সাড়া দেন; বেরিয়ে পড়েন জিহাদে। তারা হামরা আল-আসাদে যুদ্ধের তাঁবু গাড়েন। কুরাইশরা অবাক দৃষ্টিতে দেখছে আর ভাবছে, 'আমরা কি আসলেই তাদের হারিয়েছি!' তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না যারা গতকাল তাদের সাথে যুদ্ধে 'হেরে' গেছে, তারা কী করে ঠিক তার পরদিন যুদ্ধে নামার সাহস পেল!
এর মধ্যে ঘটে গেল একটি ঘটনা। খুযাআ গোত্রের একজন মুশরিক মা'বাদের সাথে রাসূলুল্লাহর দেখা হল আর সে মুসলিম হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাকে আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠালেন যেন সে মুসলিমদের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। মা'বাদকে দেখে আবু সুফিয়ান বলে উঠল, ওদিকটার খবর কী মা'বাদ, জানো কিছু?
- মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে তোমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এমন বাহিনী আমি জীবনেও দেখিনি! তারা তোমাদের বিরুদ্ধে মহা ক্ষ্যাপা! উহুদের যুদ্ধে যারা আসেনি, তারাও এবার যোগ দিয়েছে।
মা'বাদ ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে কথা বলছিল। আবু সুফিয়ান বলল, 'আচ্ছা তোমার কী মনে হয়? আমাদের এখন কী করা উচিত?' মা'বাদ এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করলেন। শত্রুর মনোবল ভেঙে দিলেন। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আবু সুফিয়ান তবুও আক্রমণ করার মিথ্যা হুমকি দিয়ে মুসলিমদের ভয় দেখানোর শেষ চেষ্টা করল। কিন্তু মুসলিমদের এতটুকু টলানো গেল না। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"যারা আহত হয়ে পড়ার পরেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও পরহেযগার, তাদের জন্য রয়েছে মহান পুরস্কার। মুনাফিক্বরা যাদেরকে বলেছিল, নিঃসন্দেহে তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, অতএব তাদের ভয় করো। কিন্তু তাদের ঈমান বেড়ে গেল, আর তারা বলল, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি অতি উত্তম রক্ষাকর্তা। সুতরাং তারা ফিরে এল আল্লাহর কাছ থেকে নিআমত ও করুণাভাণ্ডার নিয়ে, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি, বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষণ করেছিল। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত বিশাল। নিঃসন্দেহ শয়তানই তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো,-- যদি তোমরা ঈমানদার হও।” (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭২-১৭৫)
শয়তান মু'মিনদের ভয় দেখায়, 'দেখো, শত্রুরা অনেক শক্তিশালী, ওদের অনেক ক্ষমতা!' এসব বলে শয়তান মনের মধ্যে ভয় ঢোকাতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ সবই শয়তানের দেওয়া ওয়াসওয়াসা। আমরা যদি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি, তাহলে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাদেরকেই বিজয়ী করবেন।
📄 উহুদের যুদ্ধবন্দী
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের একমাত্র যুদ্ধবন্দী ছিল আবু আযযা। এই আবু আযযা বদর যুদ্ধেও বন্দী হয়েছিল। তখন সে অজুহাত দেখায়, সে খুব গরিব, তার মেয়েদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। রাসূলুলাহ সেবার কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেন। শুধু একটাই শর্ত জুড়ে দেন, তা হলো সে কখনই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আবু আযযা এ কথা মেনে নিয়ে মুক্তি পায়।
কিন্তু মক্কার কুরাইশরা উহুদের সময় আবারও তাকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নানাভাবে ফুসলাতে থাকে। আবু আযযা রাজি হলো না। আবু সুফিয়ান তাকে বললো, 'আরে! আমাদের এবার তিন হাজার সৈন্য, আমরা কীভাবে হারতে পারি! আর তোমার মেয়েদের কথা ভাবছো? শোনো, যদি তোমার কিছু হয়েও যায়, এই আমি আছি তোমার মেয়েদের দেখাশোনার জন্য।'
টাকার লোভে আবু আযযা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হলো। আর বন্দীও হলো। এবারেও আবু আযযা পুরোনো অজুহাত খাড়া করে ছাড়া পাবার চেষ্টা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে, তুমি মুহাম্মাদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছো -- সেটা আমি হতে দেবো না। মুসলিম এক গর্তে দু'বার দংশিত হয় না।' তিনি আবু আযযাকে হত্যার আদেশ দেন।
মুসলিমদের অতি সরলমনা হলে চলবে না। কেউ যেন বোকা বানাতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সহানুভূতিশীলতা এবং সতর্কতা-এ দুয়ের মাঝে হতে হবে আমাদের অবস্থান। সবকিছুকে অতি সরল মনে গ্রহণ করা বা মানুষকে খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলা যেমন এক ধরনের চরমপন্থা, তেমনি সারাক্ষণ চরম নৈরাশ্যবাদে নিমজ্জিত থাকা, সবচছুর মাঝে মন্দের আভাস খুঁজে পাওয়া আরেক ধরনের চরমপন্থা। উল্লেখিত দ্বিতীয় ধরনের চরমপন্থা একজন মানুষকে অন্যের প্রতি সদয় হতে নিরুৎসাহিত করে তোলে। তাই মুসলিমরা এ দুয়ের মাঝে এমন এক মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে যা হবে বাস্তবধর্মী।
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের একমাত্র যুদ্ধবন্দী ছিল আবু আযযা। এই আবু আযযা বদর যুদ্ধেও বন্দী হয়েছিল। তখন সে অজুহাত দেখায়, সে খুব গরিব, তার মেয়েদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। রাসূলুলাহ সেবার কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেন। শুধু একটাই শর্ত জুড়ে দেন, তা হল সে কখনই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আবু আযযা এ কথা মেনে নিয়ে মুক্তি পায়।
কিন্তু মক্কার কুরাইশরা উহুদের সময় আবারও তাকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নানাভাবে ফুসলাতে থাকে। আবু সুফিয়ান তাকে বলল, 'অরে! আমাদের এবার তিন হাজার সৈন্য, আমরা কীভাবে হারতে পারি! আর তোমার মেয়েদের কথা ভাবছো? শোনো, যদি তোমার কিছু হয়েও যায়, এই আমি আছি তোমার মেয়েদের দেখাশোনার জন্য।'
টাকার লোভে আবু আযযা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হল। আর বন্দীও হল। এবারেও আবু আযযা পুরোনো অজুহাত খাড়া করে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে, তুমি মুহাম্মাদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছো -- সেটা আমি হতে দেবো না। মুসলিম এক গর্তে দু'বার দংশিত হয় না।' তিনি আবু আযযাকে হত্যার আদেশ দেন।
মুসলিমদের অতি সরলমনা হলে চলবে না। কেউ যেন বোকা বানাতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সহানুভূতিশীলতা এবং সতর্কতা-এ দুয়ের মাঝে হতে হবে আমাদের অবস্থান। মুসলিমরা এ দুয়ের মাঝে এমন এক মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে যা হবে বাস্তবধর্মী।
📄 শেষ ভালো যার, সব ভালো তার
মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়। এমন একজন হলো কাযমান।
১) কাযমান
তার নাম কাযমান অথবা কুযমান। ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'
সাহাবিরা অবাক হলেন, কাযমান কীভাবে জাহান্নামী হতে পারে! সে তো মুসলিমদের পক্ষে বীরের মতো লড়ছে! কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। শরীরে আঘাতের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বললো, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।'
রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে। এ কারণে তার স্থান ছিল জাহান্নাম। কাজেই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করাটাই সব নয়। বরং যুদ্ধ হতে হবে সঠিক আক্বীদা বিশ্বাসের জন্য।
২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। যদিও রাসূলুল্লাহ তাদের কাছে কোনো সাহায্য চাননি। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বললো, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা বললো, 'আজকে তো শনিবার, আজকে আবার কীসের যুদ্ধ?' মুসলিমদের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ইহুদিদের গড়িমসি দেখে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা খরচ করবেন।'
এই বলে সে বেরিয়ে পড়লো। যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ।
মুখাইরিক মুসলিম ছিল নাকি অমুসলিম ছিল, তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁদের মতে, 'মুখাইরিক হলো ইহুদিদের মধ্যে সেরা', এই কথা দিয়ে আল্লাহর রাসূল জাতীয়তা বুঝিয়েছেন, দ্বীন বা ধর্ম বোঝাননি।
৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি, তার গোত্রের লোকদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে দেয়নি। সে ছিল মুশরিক। একদিন মদীনায় এসে বিভিন্ন লোকের খোঁজ করতে শুরু করছে, কিন্তু কেউই মদীনায় নেই!
- অমুক কোথায়? - উহুদে! - তমুক কোথায়? - সেও উহুদের ময়দানে!
উসাইরিম যার কথাই জানতে চায়, প্রত্যেকেই উহুদে! উসাইরিম বললো, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে তরবারি, বর্শা আর যুদ্ধ-সরঞ্জাম নিয়ে ঘোড়ায় চেপে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। মুসলিমরা তাকে দেখে অবাক! 'তুমি এখানে? চলে যাও তুমি!' উসাইরিম জবাব দিল, 'না, আমি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।
যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে, তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে খুব অবাক হলো। তারা বলাবলি করতে থাকলো, 'আরে উসাইরিম এখানে! সে তো কাফির ছিল বলেই জানতাম। সে এখানে কী করছে?' তারা উসাইরিমকে জিজ্ঞেস করলো,
- উসাইরিম, তুমি এখানে কীভাবে এলে? ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় নাকি স্বজাতির শক্তি বৃদ্ধিতে?
- আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। রাসূলুল্লাহর সমর্থনে যুদ্ধ করবো বলে হাতে তরবারি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। আমার অবস্থা তো তোমরা এখন দেখতেই পাচ্ছো।
এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! এই বিষয়টা নিয়ে আবু হুরায়রা সাহাবিদের কুইজ জিজ্ঞেস করতেন। উসাইরিম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ একটি চমৎকার কথা বলেছেন, 'তার আমল ছিল অল্প, কিন্তু যে পুরস্কার সে কামিয়ে নিয়েছে তা অসামান্য।' শাহাদাহ বা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া হলো এমন একটি কাজ যা মানুষকে জান্নাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বাদ বাকি সব আমল ছাড়াই মাত্র এই একটি আমলের মাধ্যমে সে জান্নাতে সবচেয়ে উঁচু অবস্থানে চলে যেতে পারবে। উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে, তাই সে জান্নাতে যাবে।
মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময়টিই বলে দেয় তাদের আখিরাত কেমন হবে। উহুদের যুদ্ধে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের জীবনের গতিপথকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়।
১) কাযমান
ছিল মদীনার সাধারণ এক বাসিন্দা, ইসলাম নিয়ে তার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। উহুদের যুদ্ধে সে প্রথমে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার গোত্রের মহিলারা তার কাপুরুষত্ব নিয়ে তাকে খোঁচা দিলে সে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিংহের মতো যুদ্ধ করে সাত-সাত জন মুশরিককে হত্যা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সামনে তার নাম উচ্চারণ করা হলেই তিনি বলতেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী।'
যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আহত হয়। সবাই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেয়, অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাযমান তখন বলল, 'তোমরা আমাকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমি তো ইসলামের জন্য লড়াই করিনি, আমি আমার গোত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি।' রাসূলুল্লাহ তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই লোকটা জাহান্নামী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদ লোকদের দ্বারাও তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেন।' কাযমান 'জিহাদ' করেছিল সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সে জিহাদ করেনি। সে জিহাদ করেছে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে।
২) মুখাইরিক
মদীনা সনদ অনুসারে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্য করা ইহুদিদের দায়িত্ব ছিল। তাদের মধ্য থেকে এগিয়ে এল এক ইহুদি, নাম তার মুখাইরিক। সে তার লোকদেরকে ডেকে বলল, 'ইহুদিরা শোনো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা তোমাদের দায়িত্ব।' তারা Saturday/শনিবারের অযুহাত দিলে মুখাইরিক রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের জীবনে যেন আর কোনোদিন শনিবার না আসে। শোনো, আমি একাই যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমার সব সম্পদের মালিক মুহাম্মাদ।'
যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ব্যাপারে বললেন, 'মুখাইরিক -- খাইরাল ইয়াহুদ', অর্থাৎ 'মুখাইরিক হল ইহুদিদের মধ্যে সেরা।' রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ওয়াকফ হিসেবে নির্ধারিত করলেন। সেটিই ছিল মদীনার প্রথম ওয়াকফ। বেশিরভাগ উলামার মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
৩) উসাইরিম
আওস গোত্রের এক লোক ছিল উসাইরিম। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করেনি। একদিন মদীনায় এসে দেখল সবাই যুদ্ধ করার জন্য উহুদের ময়দানে গেছে। উসাইরিম বলল, 'যদি এরা সবাই উহুদে যুদ্ধ করে, তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেবো।' এই বলে সে রওনা দিল। পৌঁছে গেল উহুদের প্রান্তরে। যুদ্ধ করতে করতে মুশরিকদের হাতে বেশ কয়েকস্থানে আহত হলেন।
যুদ্ধ তখন শেষ, ক্লান্ত উসাইরিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। তার কিছু আত্মীয় তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কীভাবে এলে? উসাইরিম বললেন, 'আমি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।' এই বলে উসাইরিম মৃত্যুবরণ করলেন। উসাইরিম পরবর্তীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় না করেই জান্নাতে চলে গেছেন! উসাইরিম নামাজ পড়েনি, রোজা রাখেনি, কিছুই করেনি। সে শুধু ঈমান এনেছে আর তারপরেই আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে গেছে।
📄 উহুদের যুদ্ধে মু'জিযা
১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ: বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।
২. উবাই ইবন খালাফ: কুরাইশদের এই নেতা মাক্কী জীবনে নবীজিকে হুমকি দিত, 'এই যে মুহাম্মাদ, দেখো, দেখো! আমি এই ঘোড়াকে দিনে বারো মুঠো শস্য খাওয়াই। এর পিঠে চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করবো।' নবীজি তখন জবাব দিতেন, 'না, বরং আমিই তোকে হত্যা করবো!'
উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগলো। সাহাবিরা এগিয়ে গেলেন তাকে প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু নবীজি তাদের থামিয়ে দিলেন। একটি বর্শা হাতে নিয়ে সেটা ঝাঁকাতে শুরু করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। উবাই ইবন খালাফের সমস্ত দেহ ছিল বর্মে ঢাকা। একটা বর্শায় তাকে আক্রমণ করা অসম্ভব! কিন্তু নবীজির বর্শা আঘাত করলো ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে।
সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে তার লোকেদের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। তারা বললো, 'তোমার হয়েছেটা কী?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ আমাকে মেরে ফেলেছে!' তারা তার বর্ম খুললো কিন্তু গলার কাছে কোনো আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পেল না। এরপর বললো, 'তোমার তো কিছুই হয়নি। এত ভয় পাচ্ছো কেন?' সে বললো, 'মুহাম্মাদ বলেছে সে আমাকে হত্যা করবে! সে যদি কিচ্ছু না করে শুধু আমার দিকে থুথু ছিটায়, তবুও আমি মারা যাব!' পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হলো উবাই ইবন খালাফ।
সীরাহ থেকে একটি বিষয় বার বার প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহর প্রতিটা কথায় এমনকি শত্রুরাও বিশ্বাস করতো! কুরাইশ কাফিররা অক্ষরে অক্ষরে রাসূলুল্লাহর কথা বিশ্বাস করতো। কিন্তু ঔদ্ধত্য আর অহংকারের কারণে তাঁকে নবী বলে মেনে নেয়নি। যেমন, এই ঘটনায় উবাই সামান্য একটু আঁচড় খেয়েই এত ভয় পেয়ে যায় যে, তার কাছে মনে হয় সে মারা গেছে। কারণ রাসূলুল্লাহ তাকে বহু আগে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিলেন। আর সেই হুমকি সত্য হওয়ার এই ঘটনা একটি মু'জিযাও বটে।
উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সে কেবলই পানি খেতে চাচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হলো সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। অনেক সময় কিছু মানুষ কাফিরদের প্রতি আল্লাহর আযাব, কিংবা মুসলিমদের আনন্দ ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করতে পারবে। এটা স্বপ্নেও হতে পারে অথবা সামনা-সামনিও হতে পারে। যেমন হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবন উমারের ক্ষেত্রে, তিনি সরাসরি শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।
টিকাঃ
20 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।
১. কাতাদাহ ইবন আন-নুমানের চোখ
বদরের যুদ্ধের অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের ব্যাপারেও এই কাহিনীটি বলা হয়ে থাকে। কারণ আলিমদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই ঘটনা বদরের যুদ্ধে ঘটেছে নাকি উহুদের যুদ্ধে।
২. উবাই ইবন খালাফ
উহুদের দিনে উবাই ইবন খালাফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবীজির পেছনে ধাওয়া করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ ﷺ উবাই ইবন খালাফের দিকে বর্শা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন। নবীজির বর্শা আঘাত করল ঠিক তার বর্ম আর মাথার হেলমেটের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকে। সেই লোহার বর্মের ফাঁক গলে বর্শা খুব একটা ভেতরেও ঢুকতে পারেনি। কিন্তু উবাই ইবন খালাফ এতটুকু আঘাতেই ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। পরবর্তীতে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মক্কার কাছে সারাফ নামক স্থানে সে সত্যি মারা যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে মাত্র একজন লোককেই হত্যা করেছেন। সে হল উবাই ইবন খালাফ।
উবাই ইবন খালাফকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমার রা. এক রাতে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে আমি আগুনের হলকা দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম একটা লোককে শিকল বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর তাকে বলা হচ্ছে, 'এই লোককে পানি দিও না, এ হল সেই লোক যাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ হত্যা করেছে।' আবদুল্লাহ ইবন উমার আসলে উবাই ইবন খালাফের শাস্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু মানুষকে গায়েবের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়।
টিকাঃ
২০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭।