📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হানযালা ইবন আবি আমীর ؓ: ফেরেশতারা গোসল দিল যাকে

📄 হানযালা ইবন আবি আমীর ؓ: ফেরেশতারা গোসল দিল যাকে


আনসারী সাহাবি হানযালা, উহুদের যুদ্ধের আগের রাতেই তাঁর বিয়ে হয়। যুদ্ধের সময়টাতে সাধারণত মুজাহিদরা ক্যাম্পে অবস্থান করেন। কিন্তু হানযালা রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে অনুমতি চাইলেন স্ত্রীর সাথে রাত কাটাবার। রাসূলুল্লাহ অনুমতি দিলেন। হানযালা রাতে স্ত্রীর সাথে থাকলেন। ভোরে ফিরে এসে সাহাবিদের সাথে ফজরের সালাহ আদায় করলেন। এরপর স্ত্রীর জামিলাহর কাছে ফিরে এলেন বিদায় নিতে। কিন্তু জামিলাহ তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন, তাঁরা মিলিত হলেন।
এদিকে বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই ফরয গোসল না করেই হানযালা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দুঃসাহসী হানযালা ঘোড়ার পিঠে বসে শত্রুপক্ষের নেতা আবু সুফিয়ানকে টার্গেট করলেন। হানযালা এগিয়ে গিয়ে আবু সুফিয়ানের ঘোড়াকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। আবু সুফিয়ান ঘোড়া থেকে পড়ে চিৎকার করে উঠলো। হানযালা আবু সুফিয়ানকে শেষ করে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই এক মুশরিক এসে পড়লো। সে হানযালাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো। তাঁর বুক ভেদ করে বর্শা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু হানযালা থামবার পাত্র নন। তিনি আবু সুফিয়ানকে আবার আঘাত করতে উদ্যত হলেন। সেই মুশরিক তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করলো। হানযালা শহীদ হলেন।
হানযালাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখেন! তিনি বলেন, 'আমি হানযালাকে দেখেছি ঠিক আসমান আর জমিনের মাঝে। ফেরেশতারা তাকে জান্নাতী রুপার পাত্রে রাখা আল-মুযনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছে!' রাসূলুল্লাহ হানযালার খবর নিতে তার স্ত্রী জামিলাহর কাছে লোক পাঠালেন। জামিলাহ ছিলেন মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মেয়ে। কিন্তু তিনি বাবার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুত্তাক্বী মুসলিমাহ। লোকেরা জামিলার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'যাবার আগে তিনি গোসল করার সময় পাননি, যুনুব (অপবিত্র) অবস্থাতেই তিনি চলে যান।' রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এজন্যই তাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়ে দিচ্ছিল!'
আরও একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটে। জামিলাহ যখন হানযালার সাথে থেকেছিলেন, তিনি চারজন সাক্ষী ডেকে বিষয়টা জানান। এ অদ্ভুত কাজটা তিনি কেন করলেন? সাধারণত স্বামী বা স্ত্রীর একান্ত গোপন কথা অন্যদের জানবার কথা নয়। জামিলাহ বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আকাশ খুলে গেল আর তার ভেতর দিয়ে হানযালা চলে গেলেন, এরপর আকাশ আবার বন্ধ হয়ে গেল। তাই আমার মনে হলো যে হানযালা শহীদ হয়ে যাবেন।' স্বামী পরদিন মারা যাবে জানলে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক না করাটাই 'স্বাভাবিক'। কারণ তাহলে সে নারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা সহজ হবে। কিন্তু কীসের আশায় জামিলাহ জেনে শুনে স্বামীর সাথে মিলিত হলেন? কেন সবাইকে বিষয়টা জানালেন? কেন তিনি সেই পুরুষের সন্তান চাইলেন যে কিনা পরদিনই শহীদ হয়ে যাবে?
আসলে সাহাবিদের মানসিকতা আমাদের মতো ছিল না। তাঁরা দুনিয়াকে অন্যভাবে দেখতেন, তাঁরা দুনিয়াকে দেখতেন ওয়াহীর আলো দিয়ে। হানযালা শহীদ হবেন-এটি জেনেশুনেই জামিলাহ তাঁর সন্তান গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন। জামিলাহর জন্য এটাই ছিল আনন্দের ব্যাপার যে তাঁর স্বামী হবে একজন শহীদ! হয়তো তাঁর জন্য পৃথিবীটা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো কষ্ট আর দুর্দশা তাঁর ওপর চেপে বসবে, কিন্তু শহীদের স্ত্রী হবার মধ্যে যে মর্যাদা আছে, সে মর্যাদা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি জামিলাহ। তিনি যা-ই করেছেন, আল্লাহর জন্য করেছেন। আর আল্লাহ তাআলাই তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন।
জামিলার সাথে এরপর সাবিত ইবন কাইসের বিয়ে হয়। জামিলার গর্ভে জন্ম নেওয়া হানযালার সন্তানের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আর সাবিতের সংসারে জন্ম নেয় মুহাম্মাদ। এই মুহাম্মাদই ছিল আবদুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। বাবা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ঠিকই তার সৎ বাবা ও ভাইয়ের থেকে আদর-স্নেহ-মমতা পেয়েছিল, ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। নিশ্চয়ই তাকওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ উত্তম কিছুই দান করবেন।
আল্লাহ তাআলার প্রতি সাহাবিদের ভালবাসার আরেকটি নিদর্শন এই ঘটনা। সদ্যবিবাহিত হানযালা গোসল না করে ময়দানে ছুটে যান। পদাতিক সৈন্য হয়েও তিনি পাল্লা দেন ঘোড়সওয়ারির সাথে। যেসব ভাই ও বোনেরা বিয়ে করেছেন, তারা জানেন বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে দুনিয়ার প্রতি কী প্রবল মায়া কাজ করে! সেই তীব্র বন্ধন উপেক্ষা করে ময়দানে যুদ্ধ যাওয়া কতই না কঠিন! আর সেটাই করেছিলেন হানযালা, আর তাই 'ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে!'

আনসারী সাহাবি হানযালা, উহুদের যুদ্ধের আগের রাতেই তাঁর বিয়ে হয়। যুদ্ধের সময়টাতে সাধারণত মুজাহিদরা ক্যাম্পে অবস্থান করেন। কিন্তু হানযালা রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে অনুমতি চাইলেন স্ত্রীর সাথে রাত কাটাবার। রাসূলুল্লাহ অনুমতি দিলেন। হানযালা রাতে স্ত্রীর সাথে থাকলেন। ভোরে ফিরে এসে সাহাবিদের সাথে ফজরের সালাহ আদায় করলেন। এরপর স্ত্রীর জামিলাহর কাছে ফিরে এলেন বিদায় নিতে। কিন্তু জামিলাহ তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন, তাঁরা মিলিত হলেন।

এদিকে বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই ফরয গোসল না করেই হানযালা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দুঃসাহসী হানযালা ঘোড়ার পিঠে বসে শত্রুপক্ষের নেতা আবু সুফিয়ানকে টার্গেট করলেন। হানযালা এগিয়ে গিয়ে আবু সুফিয়ানের ঘোড়াকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। আবু সুফিয়ান ঘোড়া থেকে পড়ে চিৎকার করে উঠল। হানযালা আবু সুফিয়ানকে শেষ করে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই এক মুশরিক এসে পড়ল। সে হানযালাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করল। তাঁর বুক ভেদ করে বর্শা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু হানযালা থামবার পাত্র নন। তিনি আবু সুফিয়ানকে আবার আঘাত করতে উদ্যত হলেন। সেই মুশরিক তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করল। হানযালা শহীদ হলেন।

হানযালাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখেন! তিনি বলেন, 'আমি হানযালাকে দেখেছি ঠিক আসমান আর জমিনের মাঝে। ফেরেশতারা তাকে জান্নাতী রুপার পাত্রে রাখা আল-মুযনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছে!' রাসূলুল্লাহ হানযালার খবর নিতে তার স্ত্রী জামিলাহর কাছে লোক পাঠালেন। জামিলাহ ছিলেন মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মেয়ে। কিন্তু তিনি বাবার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুত্তাক্বী মুসলিমাহ। লোকেরা জামিলার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'যাবার আগে তিনি গোসল করার সময় পাননি, যুনুব (অপবিত্র) অবস্থাতেই তিনি চলে যান।' রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এজন্যই তাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়ে দিচ্ছিল!'

আরও একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটে। জামিলাহ যখন হানযালার সাথে থেকেছিলেন, তিনি চারজন সাক্ষী ডেকে বিষয়টা জানান। এ অদ্ভুত কাজটা তিনি কেন করলেন? সাধারণত স্বামী বা স্ত্রীর একান্ত গোপন কথা অন্যদের জানবার কথা নয়। জামিলাহ বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আকাশ খুলে গেল আর তার ভেতর দিয়ে হানযালা চলে গেলেন, এরপর আকাশ আবার বন্ধ হয়ে গেল। তাই আমার মনে হল যে হানযালা শহীদ হয়ে যাবেন।' স্বামী পরদিন মারা যাবে জানলে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক না করাটাই 'স্বাভাবিক'। কারণ তাহলে সে নারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা সহজ হবে। কিন্তু কীসের আশায় জামিলাহ জেনে শুনে স্বামীর সাথে মিলিত হলেন? কেন সবাইকে বিষয়টা জানালেন? কেন তিনি সেই পুরুষের সন্তান চাইলেন যে কিনা পরদিনই শহীদ হয়ে যাবে?

আসলে সাহাবিদের মানসিকতা আমাদের মতো ছিল না। তাঁরা দুনিয়াকে অন্যভাবে দেখতেন, তাঁরা দুনিয়াকে দেখতেন ওয়াহীর আলো দিয়ে। হানযালা শহীদ হবেন-এরা জেনেশুনেই জামিলাহ তাঁর সন্তান গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন। জামিলাহর জন্য এটাই ছিল আনন্দের ব্যাপার যে তাঁর স্বামী হবে একজন শহীদ! হয়তো তাঁর জন্য পৃথিবীটা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো কষ্ট আর দুর্দশা তাঁর ওপর চেপে বসবে, কিন্তু শহীদের স্ত্রী হবার মধ্যে যে মর্যাদা আছে, সে মর্যাদা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি জামিলাহ। তিনি যা-ই করেছেন, আল্লাহর জন্য করেছেন। আর আল্লাহ তাআলাই তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন।

জামিলার সাথে এরপর সাবিত ইবন কাইসের বিয়ে হয়। জামিলার গর্ভে জন্ম নেওয়া হানযালার সন্তানের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আর সাবিতের সংসারে জন্ম নেয় মুহাম্মাদ। এই মুহাম্মাদই ছিল আবদুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। বাবা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ঠিকই তার সৎ বাবা ও ভাইয়ের থেকে আদর-স্নেহ-মমতা পেয়েছিল, ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। নিশ্চয়ই তাকওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ উত্তম কিছুই দান করবেন।

আল্লাহ তাআলার প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসার আরেকটি নিদর্শন এই ঘটনা। সদ্যবিবাহিত হানযালা গোসল না করে ময়দানে ছুটে যান। পদাতিক সৈন্য হয়েও তিনি পাল্লা দেন ঘোড়সওয়ারির সাথে। যেসব ভাই ও বোনেরা বিয়ে করেছেন, তারা জানেন বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে দুনিয়ার প্রতি কী প্রবল মায়া কাজ করে! সেই তীব্র বন্ধন উপেক্ষা করে ময়দানে যুদ্ধ যাওয়া কতই না কঠিন! আর সেটাই করেছিলেন হানযালা, আর তাই 'ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে!'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম ؓ

📄 আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম ؓ


আবদুল্লাহ ইবন আমর তাঁর ছেলে জাবিরকে উহুদের আগে ডেকে বললেন,
'বাবা শোনো, রাসূলুল্লাহর পর এই দুনিয়ায় তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। যদি তোমার বোনদের দেখাশোনা করতে না হতো, আমার ঋণ পরিশোধের বিষয়টি না থাকতো, তাহলে আমি চাইতাম তুমিও যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাও। নিজের ব্যাপারে আমি আশা করি, আমি প্রথম সারির শহীদ সাহাবিদের একজন হবো। তোমার কাছে ওসিয়ত এই যে, তুমি আমার ঋণ পরিশোধ করে দিও আর তোমার বোনদের দেখে রেখো।'
আবদুল্লাহ ইবন আমরের স্বপ্ন সত্য হয়েছিল, তিনি উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা তাঁর জন্যে কাঁদো বা না-কাঁদো, জেনে রেখো, তোমার বাবাকে ফেরেশতারা ঠিকই ছায়া দিয়ে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা তাকে দাফনের জন্য ওঠাচ্ছো।'
জাবির তার বাবার লাশ দেখে খুব কাঁদছিলেন। জাবিরকে ডেকে নবীজি বলেন, 'তুমি ভেঙে পড়ছো কেন জাবির?' জাবির জানালেন তার বোনদের দেখাশোনা আর তার বাবার রেখে যাওয়া ঋণের কথা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমি কি তোমাকে একটা সুসংবাদ দেবো? শোনো, আল্লাহ তাআলা কোনো পর্দা ছাড়া কারো সাথে কথা বলেন না, কিন্তু তিনি তোমার বাবা আবদুল্লাহর সাথে কথা বলেছেন সরাসরি! জানতে চেয়েছেন, আবদুল্লাহ তুমি কী চাও? আর আবদুল্লাহ উত্তর দিয়েছেন, হে আমার রব! আমাকে দুনিয়াতে ফেরত পাঠাও, যেন তোমার জন্য যুদ্ধ করে আবার শহীদ হতে পারি!'
মৃত্যুর পর শহীদ ছাড়া আর কোনো মানুষ দুনিয়াতে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু শহীদের কাছে তার মৃত্যুর অভিজ্ঞতা এতই সুখকর যে, সে দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে আবারও সেই মুহূর্তটি উপভোগ করতে চায়।

টিকাঃ
15 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৩২।

আবদুল্লাহ ইবন আমর তাঁর ছেলে জাবিরকে উহুদের আগে ডেকে বললেন,

'বাবা শোনো, রাসূলুল্লাহর পর এই দুনিয়ায় তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। যদি তোমার বোনদের দেখাশোনা করতে না হত, আমার ঋণ পরিশোধের বিষয়টি না থাকত, তাহলে আমি চাইতাম তুমিও যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাও। নিজের ব্যাপারে আমি আশা করি, আমি প্রথম সারির শহীদ সাহাবিদের একজন হব। তোমার কাছে ওসিয়ত এই যে, তুমি আমার ঋণ পরিশোধ করে দিও আর তোমার বোনদের দেখে রেখো।'

আবদুল্লাহ ইবন আমরের স্বপ্ন সত্য হয়েছিল, তিনি উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা তাঁর জন্যে কাঁদো বা না-কাঁদো, জেনে রেখো, তোমার বাবাকে ফেরেশতারা ঠিকই ছায়া দিয়ে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা তাকে দাফনের জন্য ওঠাচ্ছো।'

জাবির তার বাবার লাশ দেখে খুব কাঁদছিলেন। জাবিরকে ডেকে নবীজি বলেন, 'তুমি ভেঙে পড়ছো কেন জাবির?' জাবির জানালেন তার বোনদের দেখাশোনা আর তার বাবার রেখে যাওয়া ঋণের কথা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমি কি তোমাকে একটা সুসংবাদ দেবো? শোনো, আল্লাহ তাআলা কোনো পর্দা ছাড়া কারো সাথে কথা বলেন না, কিন্তু তিনি তোমার বাবা আবদুল্লাহর সাথে কথা বলেছেন সরাসরি! জানতে চেয়েছেন, আবদুল্লাহ তুমি কী চাও? আর আবদুল্লাহ উত্তর দিয়েছেন, হে আমার রব! আমাকে দুনিয়াতে ফেরত পাঠাও, যেন তোমার জন্য যুদ্ধ করে আবার শহীদ হতে পারি!'

মৃত্যুর পর শহীদ ছাড়া আর কোনো মানুষ দুনিয়াতে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু শহীদের কাছে তার মৃত্যুর অভিজ্ঞতা এতই সুখকর যে, সে দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে আবারও সেই মুহূর্তটি উপভোগ করতে চায়।

টিকাঃ
১৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৩২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শাদাদাতের মর্যাদা

📄 শাদাদাতের মর্যাদা


১) সবুজ পাখির অন্তরে
শাহাদাতের মর্যাদার কথা অসংখ্য হাদীসে এসেছে, এর মধ্যে একটি চমৎকার হাদীস হলো সবুজ পাখির হাদীস। এটি বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস। রাসূলুল্লাহ বলেন,
উহুদের যুদ্ধে যখন তোমাদের ভাইদের হত্যা করা হয়, আল্লাহ তখন তাদের রুহকে সবুজ পাখির অন্তরে স্থাপন করেন। তারা তখন সবুজ পাখি হয়ে জান্নাতের নদীর ওপর উড়ে বেড়ায়, সেখানকার ফল খায়, মহান রবের আরশের ছায়ায় রাখা সোনার প্রদীপে যেয়ে বাসা বাঁধে। জান্নাতের সুস্বাদু খাবার, মজাদার পানীয়, শান্তিময় নিবাস উপভোগের পর তারা বলতে থাকে, কে আমাদের ভাইদের যেয়ে জানাতে পারবে যে আমরা জান্নাতে জীবিত আছি, আমাদের রবের রিযিক প্রাপ্ত হয়েছি -- তারা যেন জিহাদ থেকে বিমুখ না হয়ে যায়, যুদ্ধ থেকে পালিয়ে না যায়। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেন, আমি তাদেরকে তোমাদের এ কথা জানিয়ে দেবো। এরপর তিনি নাযিল করেন সূরা আলে-ইমরানের এ আয়াত (১৬৯-১৭১):
আর যাদের আল্লাহর পথে হত্যা করা হয়েছে তাদের মৃত ভেবো না, বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার কাছে জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাঁর করুণাভাণ্ডার থেকে তাদের যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কেননা তাদের উপরে কোনো ভয় নেই আর তারা অনুতাপও করবে না। তারা আনন্দ করবে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের জন্য এবং করুণাভাণ্ডারের জন্য, আর নিঃসন্দেহ আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রাপ্য বিনষ্ট করেন না।
অর্থাৎ, শহীদেরা চাইছিলেন তাদের দুনিয়ার ভাইদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে, যেন তারা জিহাদ থেকে পিছু না হটে। আল্লাহ তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন, তাই তিনি সূরা আলে-ইমরানের আয়াতগুলো নাযিল করেন।
এই হাদীস থেকে আমরা দুটো জিনিস জানতে পারি। এক, শহীদেরা জীবিত, এবং দুই, তাঁরা চান যে, তাদের ভাইয়েরা জিহাদ অব্যাহত রাখুক। ভ্রাতৃত্বের এই বন্ধন মুজাহিদদের মাঝে এতই মজবুত যে, মৃত্যুর পরেও তাঁরা তাঁদের মুজাহিদ ভাইদের কাছে বার্তা পাঠাতে চেয়েছেন। তাঁদের এই আন্তরিক ইচ্ছার কারণে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁদের হয়ে বার্তাটি পৌঁছে দেন।
এই ব্যাপারে আরও একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন মাসরুক। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম কুরআনের এই আয়াতটির অর্থ কী: 'যাদের আল্লাহর পথে হত্যা করা হয়েছে তাদের মৃত ভেবো না, বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত এবং জীবিকাপ্রাপ্ত...' তিনি বললেন, আমরা এই আয়াতের অর্থ রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন,
'শহীদদের আত্মাকে স্থাপন করা হবে সবুজ পাখিদের দেহে। মহান আল্লাহর আরশের নিচে ঝুলন্ত ঝাড়বাতির মাঝে তারা বাসা বাঁধবে। জান্নাতের ফল থেকে যা ইচ্ছা খাবে, এরপর আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসবে। একবার আল্লাহ তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কী চাও? তারা জবাব দিলো, আমরা আর কী চাইতে পারি? আমরা তো যেখান থেকে খুশি জান্নাতের ফল খেতে পারছি!
তাদের রব তাদেরকে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন। তারা যখন বুঝতে পারল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করতেই থাকবেন, তখন বললো, হে আমাদের রব, আমাদের ইচ্ছা হয় যে আপনি আমাদেরকে আবার দুনিয়ার জীবনে ফেরত পাঠান আর আমরা আবারো আপনার জন্যে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যাই!
আল্লাহ তাআলা যখন দেখলেন তাদের আর কোনো চাওয়া নেই, তিনি তাদেরকে জান্নাতের আনন্দ উপভোগের জন্য ছেড়ে দিলেন।
২) সালামের জবাব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যদি কেউ উহুদ যুদ্ধের শহীদদের কবর যিয়ারত করে তাদেরকে সালাম প্রদান করে, তবে তারা প্রত্যেকের সালামের জবাব দেবে।' এ প্রসঙ্গে ইবন আবি দুনিয়ার বলা একটি ঘটনা আততাফ ইবন খালিদ বর্ণনা করেছেন। আবি দুনিয়া বলেন যে তাঁর চাচী প্রায়ই শহীদদের কবরে যেয়ে হামযার জন্য দু'আ করতেন। তাঁর চাচী বলেন,
'একদিন আমি গোরস্থানে গেলাম। সেখানে আমার উটের লাগাম টেনে ধরার লোকটি ছাড়া আর কেউ-ই উপস্থিত ছিল না। আমি হামযার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুআ করলাম। দুআ শেষ করে আমি তাকে সালাম দিয়ে বিদায় জানালাম। আর ঠিক তখনই মাটির নিচ থেকে আমি আমার সালামের জবাব শুনতে পেলাম! এই ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাকে সৃষ্টি করেছেন- এ নিয়ে আমার যেমন কোনো সন্দেহ নেই; রাত আর দিনের তফাত নিয়ে যেমন করে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না, তেমন এই বিষয়টা নিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমি সালামের উত্তর শুনেছি। আর তা শোনার সাথে সাথে আমার গায়ের প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে গেল!
৩) সুগন্ধী কবর
আল ওয়াক্বিদী বলেন, 'মুআবিয়া একবার পরিখা (গর্ত) খুঁড়তে গেলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যাদের আত্মীয় উহুদের যুদ্ধে শাহাদাহ লাভ করেছে, তারা যেন গর্ত খোঁড়ার আগে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেয়। কেননা পরিখা কাটতে গেলে শহীদদের কবর বের হয়ে পড়তে পারে। তাই তিনি শহীদদের আত্মীয়দেরকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলেন যেন তারা কবরগুলো চিহ্নিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে সরিয়ে নিতে পারে। জাবাবির ইবন আবদুল্লাহ সে ঘটনা সম্পর্কে বলেন,
'এক লোক আমাকে জানালো, জাবির, মুআবিয়ার লোকেরা পরিখা খোঁড়ার সময় তোমার বাবার কবরও খুলে ফেলেছে। উনার কিছু অংশ কবরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এ কথা শুনে জাবির বাবার কবর খুঁড়তে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি বলেন, আমরা তাঁদের কবরগুলো খনন করতে গিয়ে দেখি আমার বাবার শরীরটা অবিকল আগের মতোই আছে, একটুও বদলায়নি। তাঁকে দেখে মনে হলো তিনি ঘুমোচ্ছেন। কবর খুড়তে গিয়ে তাঁর আরেক সাথী আমর ইবন জামুহকেও দেখতে পেলাম। তাঁর হাত দিয়ে শরীরের একটি ক্ষতস্থান ঢাকা ছিল। হাতখানি সরিয়ে দেখলাম, ক্ষত থেকে গলগল করে তাজা রক্ত বেরোতে লাগলো! গর্ত খুড়তে গিয়ে হামযার পায়ে শাবলের আঘাত লাগে, এখান থেকেও টাটকা রক্ত ঝরতে শুরু হয়। তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি গতকালই তাঁদেরকে কবর দেওয়া হয়েছে!'
ইবন কাসির বলেন, 'তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! বলা হয়ে থাকে উহুদের শহীদদের প্রত্যেকের কবর থেকে মেশকের সুবাস ভেসে আসছিল।' এই মানুষগুলো শাহাদাহ লাভ করেছেন ৪৬ বছর আগে! অথচ তাঁদের দেহগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন এইমাত্র তাঁদের কবর দেওয়া হয়েছে।
৪) শহীদদের গোসল বা জানাযার প্রয়োজন নেই
বান্দা যেখানে শাহাদাহ লাভ করে, সেখানেই তাকে কবর দেওয়া সুন্নাহ। ক'জন সাহাবি উহুদের শহীদদের মৃতদেহ নিয়ে মদীনায় যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাদের দেখে বললেন, 'তাদের নিয়ে ফিরে যাও আর উহুদের ময়দানেই কবর দাও।' ময়দানই শহীদদের গোরস্থান। মদীনা উহুদের ময়দান থেকে বেশ কাছেই ছিল। দেহগুলোকে মদীনায় নেওয়া যেত। কিন্তু আল্লাহর রাসূল জিহাদের ময়দানেই শুহাদাদের কবর দিতে বলেন।
দাফন করার সময় আল্লাহর রাসূল উহুদ যুদ্ধের দুইজন শহীদের ওপর এক টুকরো কাপড় বিছিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, 'এ দুজনের মাঝে কার কুরআনের জ্ঞান বেশি ছিল?' যার কুরআনের জ্ঞান বেশি, তাকে তিনি আগে কবরে নামাতেন। শহীদদের কবরে রেখে দুআ করতেন, 'আমি কিয়ামতের দিনে ওদের জন্য সাক্ষ্য দিবো।' দু'জন শহীদের জন্য একটি কাপড় বরাদ্দ ছিল কারণ দাফনের যথেষ্ট কাপড় পর্যন্ত ছিল না।
অবশ্য আরেকটি কারণ হতে পারে, যুদ্ধ করে সবাই এত বেশি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল যে, কবর খোঁড়ার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। আর তাই দুজনের জন্য একটি করে কবর খুঁড়ে, যার কুরআনের জ্ঞান বেশি আছে তাকে প্রথমে, এরপরে দ্বিতীয়জনকে এভাবে করে কবর দেওয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ আদেশ দেন যেন শুহাদাদেরকে গোসল না দিয়ে শরীরের রক্ত সহ কবর দেওয়া হয়। শহীদদের জন্য জানাযার নামাজও আদায় করতে হয় না, কেননা তারা ‘মৃত নয় বরং জীবিত’। রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘হাশরের ময়দানে তাদের রক্ত ও ক্ষতগুলো থেকে মেশকের সুগন্ধ ছড়াতে থাকবে।’
৫) নবীজির সাক্ষ্য
উহুদ যুদ্ধের ধকলের কারণে নবীজি সেদিন বসে যোহরের সালাত আদায় করেন। এরপর তিনি সাহাবিদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে বলে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। ইমাম আহমেদ এই দুআটি বর্ণনা করেন,
‘হে আল্লাহ! সকল প্রশংসার মালিক একমাত্র তুমি। হে আল্লাহ, তুমি যা ধরে রাখতে চাও তা কেউ ছাড়িয়ে আনতে পারবে না। আর যা তুমি ছাড়িয়ে নিতে চাও, তা কেউ ধরে রাখতে পারবে না। যাকে তুমি পথভ্রষ্ট করো, কেউ তাকে হেদায়েত দিতে পারবে না, আর তুমি যাকে হেদায়েত দাও, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করার করতে পারবে না। যা তুমি দিতে চাও, তা বাধা দেওয়ার কেউ নেই, আর যা তুমি আটকে রেখেছো, তা ছাড়িয়ে নেবার সাধ্য কারো নেই। তুমি যা দূরে সরিয়ে দিতে চাও, তার কাছাকাছি কেউ যেতে পারবে না আর তুমি যা কাছে নিয়ে আসো তা দূরে ঠেলে দেওয়ার কেউ নেই।
হে আল্লাহ! আমাদের ওপর তোমার রহমত, করুণা ও দয়া বর্ষণ করো!
হে আল্লাহ! আমি তোমার সে রহমতের প্রত্যাশী যার কোনো কমতি নেই, যার কোনো শেষ নেই। হে আল্লাহ! আমি নিরাপত্তার সময় তোমার রহমত চাই, আমি তোমার রহমত চাই পরীক্ষা আর ভয়ভীতির সময়ে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের যা কিছু দিয়েছ, তার মন্দ থেকে, আর যা কিছু দাওনি, তার মন্দ থেকেও তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।
হে আল্লাহ, তাওফিক দাও যেন আমরা ঈমানকে তোমার রহমত হিসেবে দেখি। ঈমানকে তুমি আমাদের কাছে প্রিয় বানিয়ে দাও। হে আল্লাহ তাওফিক দাও যেন কুফর ও তোমার অবাধ্যতায় আমরা বিতৃষ্ণা অনুভব করি।
আমাদেরকে সরল পথপ্রাপ্তদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করো। ইয়া আল্লাহ, আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও আর মুসলিম হিসেবে পরকালে জীবন দান করো। আমাদেরকে সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও। অপদস্থ ও উন্মত্তদের অন্তর্ভুক্ত করে দিও না। হে আল্লাহ, সেই সকল কাফিরদের ধ্বংস করে দাও যারা তোমার রাসূলদের ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তাদের বিরোধিতা করে, অত্যাচার করে আর কষ্ট দেয়। হে আল্লাহ, হে সত্যের রব! সেইসব কাফিরদের ধ্বংস করে দাও যাদেরকে তুমি কিতাব দান করেছিলে।

টিকাঃ
16 সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৪৪।
17 সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৮১।
18 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৮।
19 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮।

১) সবুজ পাখির অন্তরে
শাহাদাতের মর্যাদার কথা অসংখ্য হাদীসে এসেছে, এর মধ্যে একটি চমৎকার হাদীস হল সবুজ পাখির হাদীস। এটি বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস। রাসূলুল্লাহ বলেন, উহুদের যুদ্ধে যখন তোমাদের ভাইদের হত্যা করা হয়, আল্লাহ তখন তাদের রুহকে সবুজ পাখির অন্তরে স্থাপন করেন। তারা তখন সবুজ পাখি হয়ে জান্নাতের নদীর ওপর উড়ে বেড়ায়, সেখানকার ফল খায়, মহান রবের আরশের ছায়ায় রাখা সোনার প্রদীপে যেয়ে বাসা বাঁধে। জান্নাতের সুস্বাদু খাবার, মজাদার পানীয়, শান্তিময় নিবাস উপভোগের পর তারা বলতে থাকে, কে আমাদের ভাইদের যেয়ে জানাতে পারবে যে আমরা জান্নাতে জীবিত আছি, আমাদের রবের রিযিক প্রাপ্ত হয়েছি -- তারা যেন জিহাদ থেকে বিমুখ না হয়ে যায়, যুদ্ধ থেকে পালিয়ে না যায়। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেন, আমি তাদেরকে তোমাদের এ কথা জানিয়ে দেবো। এরপর তিনি নাযিল করেন সূরা আলে-ইমরানের এ আয়াত (১৬৯-১৭১):

আর যাদের আল্লাহর পথে হত্যা করা হয়েছে তাদের মৃত ভেবো না, বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার কাছে জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাঁর করুণাভাণ্ডার থেকে তাদের যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কেননা তাদের উপরে কোনো ভয় নেই আর তারা অনুতাপও করবে না। তারা আনন্দ করবে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের জন্য এবং করুণাভাণ্ডারের জন্য, আর নিঃসন্দেহ আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রাপ্য বিনষ্ট করেন না।

অর্থাৎ, শহীদেরা চাইছিলেন তাদের দুনিয়ার ভাইদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে, যেন তারা জিহাদ থেকে পিছু না হটে। আল্লাহ তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন, তাই তিনি সূরা আলে-ইমরানের আয়াতগুলো নাযিল করেন। এই হাদীস থেকে আমরা দুটো জিনিস জানতে পারি। এক, শহীদেরা জীবিত, এবং দুই, তাঁরা চান যে, তাদের ভাইয়েরা জিহাদ অব্যাহত রাখুক। ভ্রাতৃত্বের এই বন্ধন মুজাহিদদের মাঝে এতই মজবুত যে, মৃত্যুর পরেও তাঁরা তাঁদের মুজাহিদ ভাইদের কাছে বার্তা পাঠাতে চেয়েছেন। তাঁদের এই আন্তরিক ইচ্ছার কারণে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁদের হয়ে বার্তাটি পৌঁছে দেন।

এই ব্যাপারে আরও একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন মাসরুক। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম কুরআনের এই আয়াতটির অর্থ কী: 'যাদের আল্লাহর পথে হত্যা করা হয়েছে তাদের মৃত ভেবো না, বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত এবং জীবিকাপ্রাপ্ত...' তিনি বললেন, আমরা এই আয়াতের অর্থ রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন,

'শহীদদের আত্মাকে স্থাপন করা হবে সবুজ পাখিদের দেহে। মহান আল্লাহর আরশের নিচে ঝুলন্ত ঝাড়বাতির মাঝে তারা বাসা বাঁধবে। জান্নাতের ফল থেকে যা ইচ্ছা খাবে, এরপর আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসবে। একবার আল্লাহ তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কী চাও? তারা জবাব দিলো, আমরা আর কী চাইতে পারি? আমরা তো যেখান থেকে খুশি জান্নাতের ফল খেতে পারছি!

তাদের রব তাদেরকে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন। তারা যখন বুঝতে পারল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করতেই থাকবেন, তখন বলল, হে আমাদের রব, আমাদের ইচ্ছা হয় যে আপনি আমাদেরকে আবার দুনিয়ার জীবনে ফেরত পাঠান আর আমরা আবারো আপনার জন্যে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যাই!

আল্লাহ তাআলা যখন দেখলেন তাদের আর কোনো চাওয়া নেই, তিনি তাদেরকে জান্নাতের আনন্দ উপভোগের জন্য ছেড়ে দিলেন।'

২) সালামের জবাব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যদি কেউ উহুদ যুদ্ধের শহীদদের কবর যিয়ারত করে তাদেরকে সালাম প্রদান করে, তবে তারা প্রত্যেকের সালামের জবাব দেবে।' এ প্রসঙ্গে ইবন আবি দুনিয়ার বলা একটি ঘটনা আততাফ ইবন খালিদ বর্ণনা করেছেন। আবি দুনিয়া বলেন যে তাঁর চাচী প্রায়ই শহীদদের কবরে যেয়ে হামযার জন্য দু'আ করতেন। তাঁর চাচী বলেন,

'একদিন আমি গোরস্থানে গেলাম। সেখানে আমার উটের লাগাম টেনে ধরার লোকটি ছাড়া আর কেউ-ই উপস্থিত ছিল ছিল না। আমি হামযার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুআ করলাম। দুআ শেষ করে আমি তাকে সালাম দিয়ে বিদায় জানালাম। আর ঠিক তখনই মাটির নিচ থেকে আমি আমার সালামের জবাব শুনতে পেলাম! এই ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাকে সৃষ্টি করেছেন- এ নিয়ে আমার যেমন কোনো সন্দেহ নেই; রাত আর দিনের তফাত নিয়ে যেমন করে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না, তেমন এই বিষয়টা নিয়েও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমি সালামের উত্তর শুনেছি। আর তা শোনার সাথে সাথে আমার গায়ের প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে গেল!'

৩) সুগন্ধী কবর
আল ওয়াক্বিদী বলেন, 'মুআবিয়া একবার পরিখা (গর্ত) খুঁড়তে গেলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যাদের আত্মীয় উহুদের যুদ্ধে শাহাদাহ লাভ করেছে, তারা যেন গর্ত খোঁড়ার আগে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেয়। কেননা পরিখা কাটতে গেলে শহীদদের কবর বের হয়ে পড়তে পারে। তাই তিনি শহীদদের আত্মীয়দেরকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলেন যেন তারা কবরগুলো চিহ্নিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে সরিয়ে নিতে পারে। জাবির ইবন আবদুল্লাহ সে ঘটনা সম্পর্কে বলেন,

'এক লোক আমাকে জানাল, জাবির, মুআবিয়ার লোকেরা পরিখা খোঁড়ার সময় তোমার বাবার কবরও খুলে ফেলেছে। উনার কিছু অংশ কবরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এ কথা শুনে জাবির বাবার কবর খুঁড়তে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি বলেন, আমরা তাঁদের কবরগুলো খনন করতে গিয়ে দেখি আমার বাবার শরীরটা অবিকল আগের মতোই আছে, একটুও বদলায়নি। তাঁকে দেখে মনে হল তিনি ঘুমোচ্ছেন। কবর খুড়তে গিয়ে তাঁর আরেক সাথী আমর ইবন জামুহকেও দেখতে পেলাম। তাঁর হাত দিয়ে শরীরের একটি ক্ষতস্থান ঢাকা ছিল। হাতখানি সরিয়ে দেখলাম, ক্ষত থেকে গলগল করে তাজা রক্ত বেরোতে লাগল! গর্ত খুড়তে গিয়ে হামযার পায়ে শাবলের আঘাত লাগে, এখান থেকেও টাটকা রক্ত ঝরতে শুরু হয়। তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি গতকালই তাঁদেরকে কবর দেওয়া হয়েছে!'

ইবন কাসির বলেন, 'তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! বলা হয়ে থাকে উহুদের শহীদদের প্রত্যেকের কবর থেকে মেশকের সুবাস ভেসে আসছিল।' এই মানুষগুলো শাহাদাহ লাভ করেছেন ৪৬ বছর আগে! অথচ তাঁদের দেহগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন এইমাত্র তাঁদের কবর দেওয়া হয়েছে।

৪) শহীদদের গোসল বা জানাযার প্রয়োজন নেই
বান্দা যেখানে শাহাদাহ লাভ করে, সেখানেই তাকে কবর দেওয়া সুন্নাহ। ক'জন সাহাবি উহুদের শহীদদের মৃতদেহ নিয়ে মদীনায় যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাদের দেখে বললেন, 'তাদের নিয়ে ফিরে যাও আর উহুদের ময়দানেই কবর দাও।' ময়দানই শহীদদের গোরস্থান। মদীনা উহুদের ময়দান থেকে বেশ কাছেই ছিল। দেহগুলোকে মদীনায় নেওয়া যেত। কিন্তু আল্লাহর রাসূল জিহাদের ময়দানেই শুহাদাদের কবর দিতে বলেন।

দাফন করার সময় আল্লাহর রাসূল উহুদ যুদ্ধের দুইজন শহীদের ওপর এক টুকরো কাপড় বিছিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, 'এ দুজনের মাঝে কার কুরআনের জ্ঞান বেশি ছিল?' যার কুরআনের জ্ঞান বেশি, তাকে তিনি আগে কবরে নামাতেন। শহীদদের কবরে রেখে দুআ করতেন, 'আমি কিয়ামতের দিনে ওদের জন্য সাক্ষ্য দিবো।' দু'জন শহীদের জন্য একটি কাপড় বরাদ্দ ছিল কারণ দাফনের যথেষ্ট কাপড় পর্যন্ত ছিল না।

অবশ্য আরেকটি কারণ হতে পারে, যুদ্ধ করে সবাই এত বেশি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল যে, কবর খোঁড়ার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। আর তাই দুজনের জন্য একটি করে কবর খুঁড়ে, যার কুরআনের জ্ঞান বেশি আছে তাকে প্রথমে, এরপরে দ্বিতীয়জনকে এভাবে করে কবর দেওয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ আদেশ দেন যেন শুহাদাদেরকে গোসল না দিয়ে শরীরের রক্ত সহ কবর দেওয়া হয়। শহীদদের জন্য জানাযার নামাজও আদায় করতে হয় না, কেননা তারা ‘মৃত নয় বরং জীবিত’। রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘হাশরের ময়দানে তাদের রক্ত ও ক্ষতগুলো থেকে মেশকের সুগন্ধ ছড়াতে থাকবে।’

৫) নবীজির সাক্ষ্য
উহুদ যুদ্ধের ধকলের কারণে নবীজি সেদিন বসে যোহরের সালাত আদায় করেন। এরপর তিনি সাহাবিদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে বলে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। ইমাম আহমেদ এই দুআটি বর্ণনা করেন,

‘হে আল্লাহ! সকল প্রশংসার মালিক একমাত্র তুমি। হে আল্লাহ, তুমি যা ধরে রাখতে চাও তা কেউ ছাড়িয়ে আনতে পারবে না। আর যা তুমি ছাড়িয়ে নিতে চাও, তা কেউ ধরে রাখতে পারবে না। যাকে তুমি পথভ্রষ্ট করো, কেউ তাকে হেদায়েত দিতে পারবে না, আর তুমি যাকে হেদায়েত দাও, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করার করতে পারবে না। যা তুমি দিতে চাও, তা বাধা দেওয়ার কেউ নেই, আর যা তুমি আটকে রেখেছো, তা ছাড়িয়ে নেবার সাধ্য কারো নেই। তুমি যা দূরে সরিয়ে দিতে চাও, তার কাছাকাছি কেউ যেতে পারবে না আর তুমি যা কাছে নিয়ে আসো তা দূরে ঠেলে দেওয়ার কেউ নেই।

হে আল্লাহ! আমাদের ওপর তোমার রহমত, করুণা ও দয়া বর্ষণ করো!

হে আল্লাহ! আমি তোমার সে রহমতের প্রত্যাশী যার কোনো কমতি নেই, যার কোনো শেষ নেই। হে আল্লাহ! আমি নিরাপত্তার সময় তোমার রহমত চাই, আমি তোমার রহমত চাই পরীক্ষা আর ভয়ভীতির সময়ে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের যা কিছু দিয়েছ, তার মন্দ থেকে, আর যা কিছু দাওনি, তার মন্দ থেকেও তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।

হে আল্লাহ, তাওফিক দাও যেন আমরা ঈমানকে তোমার রহমত হিসেবে দেখি। ঈমানকে তুমি আমাদের কাছে প্রিয় বানিয়ে দাও। হে আল্লাহ তাওফিক দাও যেন কুফর ও তোমার অবাধ্যতায় আমরা বিতৃষ্ণা অনুভব করি।

আমাদেরকে সরল পথপ্রাপ্তদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করো। ইয়া আল্লাহ, আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও আর মুসলিম হিসেবে পরকালে জীবন দান করো। আমাদেরকে সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও। অপদস্থ ও উন্মত্তদের অন্তর্ভুক্ত করে দিও না। হে আল্লাহ, সেই সকল কাফিরদের ধ্বংস করে দাও যারা তোমার রাসূলদের ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তাদের বিরোধিতা করে, অত্যাচার করে আর কষ্ট দেয়। হে আল্লাহ, হে সত্যের রব! সেইসব কাফিরদের ধ্বংস করে দাও যাদেরকে তুমি কিতাব দান করেছিলে।

টিকাঃ
১৬. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৪৪।
১৭. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৮১।
১৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৮।
১৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 স্নায়ু যুদ্ধ: হামরা আল-আসাদ

📄 স্নায়ু যুদ্ধ: হামরা আল-আসাদ


উভয় পক্ষ ময়দান ত্যাগ করলেও যুদ্ধের রেশ তখনো কাটেনি। রাসূলুল্লাহ হার মেনে যাওয়ার মানুষ নন। শত্রুপক্ষের মনস্তত্ত্বও তিনি বুঝতেন। তিনি ধারণা করলেন, কুরাইশরা যেহেতু এই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তাই তারা আবার মদীনায় হামলা চালাতে পারে। তাঁর ধারণা সত্যি হলো। কুরাইশরা প্রথমে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পথিমধ্যে তারা মত বদলালো। ইকরিমাহ ইবন আবি জাহল সবাইকে বলে বেড়াতে থাকে, 'কী করেছো তোমরা? না পারলে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে, না পারলে তাদের নারীদের দাসী বানাতে! ছি! কিছুই তো পারলে না।' তার উসকানিমূলক কথায় কুরাইশরা মদীনায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল।

তবে এ খবর রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় এতটুকু আঁচড় কাটতে পারেনি। তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না, বরং কুরাইশদের মোকাবেলা করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন ইসহাক, তিনি বর্ণনা করেছেন,
'উহুদের যুদ্ধ মধ্য শাওয়ালের এক শনিবারে সংঘটিত হয়, আর ঠিক তার পরদিনই রাসূলুল্লাহর মুয়াজ্জিন ঘোষণা দেন তারা শত্রুদের ধাওয়া করবে। তিনি বললেন, আগের দিন যারা যুদ্ধ করেছে, কেবল তারাই এই অভিযানে অংশ নেবে। কুরাইশদের বুকে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহর রাসূল তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। উদ্দেশ্য -- তাদের জানান দেওয়া যে, মুসলিমরা মোটেও দুর্বল হয়নি। তারা এখনো শত্রুদের মোকাবেলা করতে সক্ষম।'

মুসলিমরা তখন সবে মাত্র ময়দান থেকে ফিরেছে। আর পরদিন সকালেই বলা হলো, অস্ত্র তুলে নাও আর শত্রুদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়ো! মুজাহিদরা ক্লান্ত, আহত, শরীর তাদের ক্ষত-বিবিক্ষত। আগের দিনই তারা ৭০ জন সঙ্গীকে হারিয়েছে! আর এমনই কঠিন পরিস্থিতিতে পরের দিনই তাদের বলা হলো আরেকটি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে।

ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যদিকে মুনাফিকরা স্বভাববশত মুসলিমদের মনে ভয় ছড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সাফ কথা, 'আমরা বের হবো এবং শত্রুদের মোকাবেলা করবো।' শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে ভয় দেখানো; তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মুসলিম বাহিনী এখনও হেরে যায়নি। তাদের কাছে এই ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দেওয়া যে, যুদ্ধে পরাজয় মুসলিমদেরকে একটুও দুর্বল করতে পারেনি। এমন বিপদ আর সংকটের মুখেও রাসূলুল্লাহ অপরিসীম ধৈর্য, দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। হেরে গেলেও উজ্জীবিত থাকা, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উদ্যম থাকা, আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আস্থা রাখা মুজাহিদদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষত-বিবিক্ষত শরীর নিয়ে আহত সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলের আহবানে সাড়া দেন; বেরিয়ে পড়েন জিহাদে। তারা হামরা আল-আসাদে যুদ্ধের তাঁবু গাড়েন। কুরাইশরা অবাক দৃষ্টিতে দেখছে আর ভাবছে, 'আমরা কি আসলেই তাদের হারিয়েছি!' তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না যারা গতকাল তাদের সাথে যুদ্ধে 'হেরে' গেছে, তারা কী করে ঠিক তার পরদিন যুদ্ধে নামার সাহস পেল!

এর মধ্যে ঘটে গেল একটি ঘটনা। খুযাআ গোত্রের একজন মুশরিক মা'বাদের সাথে রাসূলুল্লাহর দেখা হলো আর সে মুসলিম হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাকে আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠালেন যেন সে মুসলিমদের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। মা'বাদকে দেখে আবু সুফিয়ান বলে উঠলো, ওদিকটার খবর কী মা'বাদ, জানো কিছু?
- মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে তোমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এমন বাহিনী আমি জীবনেও দেখিনি! তারা তোমাদের বিরুদ্ধে মহা ক্ষ্যাপা! উহুদের যুদ্ধে যারা আসেনি, তারাও এবার যোগ দিয়েছে। আগেরবার আসতে পারেনি দেখে ওদের অনুশোচনার শেষ নেই।
মা'বাদ ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে কথা বলছিল। আবু সুফিয়ান বললো,
- আচ্ছা তোমার কী মনে হয়? আমাদের এখন কী করা উচিত? কসম করে বলছি, তোমরা এখান থেকে পালাবার আগেই তাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী এসে পড়বে!
- কিন্তু আমরা তো চাচ্ছিলাম তাদের পুরোপুরি শেষ করে দিতে!
- সত্যি বলতে, আমি মনে করি এই পরিকল্পনা মাথা থেকে বাদ দিলেই ভালো। কসম আল্লাহর! তুমি জানো, আমি ওদের দেখে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম যে একটা কবিতাও রচনা করে ফেলেছি!
আবু সুফিয়ান তার কবিতাটা শুনতে চাইলে, মা'বাদ বলে, 'দের আওয়াজে পাহাড় যেন লজ্জায় মুখ লুকোয়, টগবগ করে ছোটা সারিবাঁধা সুঠাম অশ্বের ঝংকারে ধ্বনিত হয় পৃথিবী- ঘোড়সওয়ারিরা, তারা তো এক একটা মস্ত সিংহ। এই সৈনিকেরা যুদ্ধকে ডরায় না, অস্ত্রের অভাব নেই তাদের আমি দেখে দৌড়ে পালাই, মনে হয় যেন ধরণী কাঁপছে! তাদের আছে এমন নেতা যাকে কেউ কোনোদিন একা ফেলে যাবে না।'
মা'বাদ এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করলেন। শত্রুর মনোবল ভেঙে দিলেন। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আবু সুফিয়ান তবু আক্রমণ করার মিথ্যা হুমকি দিয়ে মুসলিমদের ভয় দেখানোর শেষ চেষ্টা করলো। কিন্তু মুসলিমদের এতটুকু টলানো গেল না। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"যারা আহত হয়ে পড়ার পরেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও পরহেযগার, তাদের জন্য রয়েছে মহান পুরস্কার। মুনাফিক্বরা যাদেরকে বলেছিল, নিঃসন্দেহে তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, অতএব তাদের ভয় করো। কিন্তু তাদের ঈমান বেড়ে গেল, আর তারা বললো, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি অতি উত্তম রক্ষাকর্তা। সুতরাং তারা ফিরে এল আল্লাহর কাছ থেকে নিআমত ও করুণাভাণ্ডার নিয়ে, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি, বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষণ করেছিল। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত বিশাল। নিঃসন্দেহ শয়তানই তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো,-- যদি তোমরা ঈমানদার হও।” (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭২-১৭৫)

শয়তান মু'মিনদের ভয় দেখায়, 'দেখো, শত্রুরা অনেক শক্তিশালী, ওদের অনেক ক্ষমতা! ওদের অস্ত্রশস্ত্রের দিকে তাকাও, ওদের সংখ্যা গুনো, ওদের সহায়-সম্পদ দেখো! ওদের সাথে লড়তে যেও না।' এসব বলে শয়তান মনের মধ্যে ভয় ঢোকাতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ সবই শয়তানের দেওয়া ওয়াসওয়াসা। আমরা যদি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি, তাহলে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাদেরকেই বিজয়ী করবেন।

উভয় পক্ষ ময়দান ত্যাগ করলেও যুদ্ধের রেশ তখনো কাটেনি। রাসূলুল্লাহ হার মেনে যাওয়ার মানুষ নন। শত্রুপক্ষের মনস্তত্ত্বও তিনি বুঝতেন। তিনি ধারণা করলেন, কুরাইশরা যেহেতু এই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তাই তারা আবার মদীনায় হামলা চালাতে পারে। তাঁর ধারণা সত্যি হল। কুরাইশরা প্রথমে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পথিমধ্যে তারা মত বদলাল। ইকরিমাহ ইবন আবি জাহল সবাইকে বলে বেড়াতে থাকে, 'কী করেছো তোমরা? না পারলে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে, না পারলে তাদের নারীদের দাসী বানাতে! ছি! কিছুই তো পারলে না।' তার উসকানিমূলক কথায় কুরাইশরা মদীনায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল।

তবে এ খবর রাসূলুল্লাহর দৃঢ়তায় এতটুকু আঁচড় কাটতে পারেনি। তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না, বরং কুরাইশদের মোকাবেলা করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন ইসহাক, তিনি বর্ণনা করেছেন, 'উহুদের যুদ্ধ মধ্য শাওয়ালের এক শনিবারে সংঘটিত হয়, আর ঠিক তার পরদিনই রাসূলুল্লাহর মুয়াজ্জিন ঘোষণা দেন তারা শত্রুদের ধাওয়া করবে। তিনি বললেন, আগের দিন যারা যুদ্ধ করেছে, কেবল তারাই এই অভিযানে অংশ নেবে। কুরাইশদের বুকে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহর রাসূল তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। উদ্দেশ্য -- তাদের জানান দেওয়া যে, মুসলিমরা মোটেও দুর্বল হয়নি। তারা এখনো শত্রুদের মোকাবেলা করতে সক্ষম।'

মুসলিমরা তখন সবে মাত্র ময়দান থেকে ফিরেছে। আর পরদিন সকালেই বলা হল, অস্ত্র তুলে নাও আর শত্রুদের ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়ো! মুজাহিদরা ক্লান্ত, আহত, শরীর তাদের ক্ষত-বিগত। আগের দিনই তারা ৭০ জন সঙ্গীকে হারিয়েছে! আর এমনই কঠিন পরিস্থিতিতে পরের দিনই তাদের বলা হল আরেকটি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে।

ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যদিকে মুনাফিকরা স্বভাববশত মুসলিমদের মনে ভয় ছড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু রাসূলুল্লাহর সাফ কথা, 'আমরা বের হব এবং শত্রুদের মোকাবেলা করব।' শত্রুদের ধাওয়া করার উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে ভয় দেখানো; তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মুসলিম বাহিনী এখনও হেরে যায়নি। হারের পরেও উজ্জীবিত থাকা, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উদ্যম থাকা, আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আস্থা রাখা মুজাহিদদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে আহত সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলের আহবানে সাড়া দেন; বেরিয়ে পড়েন জিহাদে। তারা হামরা আল-আসাদে যুদ্ধের তাঁবু গাড়েন। কুরাইশরা অবাক দৃষ্টিতে দেখছে আর ভাবছে, 'আমরা কি আসলেই তাদের হারিয়েছি!' তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না যারা গতকাল তাদের সাথে যুদ্ধে 'হেরে' গেছে, তারা কী করে ঠিক তার পরদিন যুদ্ধে নামার সাহস পেল!

এর মধ্যে ঘটে গেল একটি ঘটনা। খুযাআ গোত্রের একজন মুশরিক মা'বাদের সাথে রাসূলুল্লাহর দেখা হল আর সে মুসলিম হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাকে আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠালেন যেন সে মুসলিমদের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। মা'বাদকে দেখে আবু সুফিয়ান বলে উঠল, ওদিকটার খবর কী মা'বাদ, জানো কিছু?
- মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে তোমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এমন বাহিনী আমি জীবনেও দেখিনি! তারা তোমাদের বিরুদ্ধে মহা ক্ষ্যাপা! উহুদের যুদ্ধে যারা আসেনি, তারাও এবার যোগ দিয়েছে।

মা'বাদ ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে কথা বলছিল। আবু সুফিয়ান বলল, 'আচ্ছা তোমার কী মনে হয়? আমাদের এখন কী করা উচিত?' মা'বাদ এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করলেন। শত্রুর মনোবল ভেঙে দিলেন। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আবু সুফিয়ান তবুও আক্রমণ করার মিথ্যা হুমকি দিয়ে মুসলিমদের ভয় দেখানোর শেষ চেষ্টা করল। কিন্তু মুসলিমদের এতটুকু টলানো গেল না। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,

"যারা আহত হয়ে পড়ার পরেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও পরহেযগার, তাদের জন্য রয়েছে মহান পুরস্কার। মুনাফিক্বরা যাদেরকে বলেছিল, নিঃসন্দেহে তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, অতএব তাদের ভয় করো। কিন্তু তাদের ঈমান বেড়ে গেল, আর তারা বলল, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি অতি উত্তম রক্ষাকর্তা। সুতরাং তারা ফিরে এল আল্লাহর কাছ থেকে নিআমত ও করুণাভাণ্ডার নিয়ে, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি, বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষণ করেছিল। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত বিশাল। নিঃসন্দেহ শয়তানই তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো,-- যদি তোমরা ঈমানদার হও।” (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭২-১৭৫)

শয়তান মু'মিনদের ভয় দেখায়, 'দেখো, শত্রুরা অনেক শক্তিশালী, ওদের অনেক ক্ষমতা!' এসব বলে শয়তান মনের মধ্যে ভয় ঢোকাতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ সবই শয়তানের দেওয়া ওয়াসওয়াসা। আমরা যদি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি, তাহলে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাদেরকেই বিজয়ী করবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px