📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হামযাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব ؓ

📄 হামযাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব ؓ


দু'জন নয়, চারজন নয়, উহুদের যুদ্ধে মাত্র একদিনে ৭০ জন মুসলিম শাহাদাৎ লাভ করেন। উহুদের যুদ্ধকে ঘিরে শাহাদাহ সম্পর্কিত অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়। উহুদ ছিল মুসলিম সমাজে শাহাদাতের সংস্কৃতির সূচনা। যিনি এ সংস্কৃতির বীজ রোপণ করে যান তিনি হলেন শহীদদের সর্দার, রাসূলুল্লাহর চাচা হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব। "মারা যাওয়া" বা "মৃত্যু" এ শব্দগুলো শহীদদের জন্য যথার্থ নয়, যদিও বোঝানোর জন্য এমনটি বলা হয়। তবে মনে রাখতে হবে একজন শহীদ কুরআনের দৃষ্টিতে কখনোই মৃত নন, শহীদরা জীবিত।
উহুদের দিনে হামযাহ তাঁর যোগ্যতার প্রতি সুবিচার করেছিলেন। প্রচণ্ড সাহসিকতার সাথে তিনি পতাকাবাহী গোত্র বনু আব্দুদ-দারের মুশরিকদের হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু হামযাকে হত্যা করেছিল এমন এক ব্যক্তি, যাকে এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ বলা চলে। তার নাম ওয়াহশী। সে ছিল এক আবিসিনিয়ান দাস। এই যুদ্ধে সে এসেছিল তার মুক্তির আশায়। কুরাইশদের জয়-পরাজয়ে তার কিছুই আসে যায় না। তার একটাই লক্ষ্য, হামযাকে হত্যা করা, আর তাহলেই সে মুক্তি পাবে। কাহিনীটা তার মুখেই শোনা যাক।
'তখন আমি ছিলাম জুবাইর ইবন মুতইমের দাস। বদরের যুদ্ধে হামযা মুতইমের চাচা তুআইমাহ ইবন আদীকে হত্যা করে। কুরাইশদের উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতিকাল চলার সময় তুআইমার ভাতিজা জুবাইর আমাকে এসে বললো, শোনো ওয়াহশী, তুমি যদি আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হামযাকে হত্যা করো, তাহলে তোমাকে আমি মুক্ত করে দেবো।
আমি রাজি হলাম, বেরিয়ে পড়লাম যুদ্ধবাহিনীর সাথে। আমি আবিসিয়ান, তাই খুব ভালো বর্শা ছুঁড়তে পারতাম। বর্শা ছুঁড়েছি অথচ লক্ষ্যভেদ হয়নি-- এমন ঘটনা আমার সাথে কমই ঘটেছে। ময়দানে দু' দল লড়ছে, আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার লক্ষ্যকে। তুমুল লড়াইয়ের মাঝে দেখতে পেলাম হামযা! এক প্রকাণ্ড উটের মতো তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমাদের লোকদের ওপর তাঁর তরবারি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছুই তাঁকে থামাতে পারছে না। ঝোপঝাড় আর পাথরের আড়ালে লুকিয়ে আমি একটু একটু করে তাঁর দিকে এগোচ্ছি। কিন্তু সিবাআ আমার আগেই তাঁর কাছে পৌঁছে গেল। হামযা তাকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, 'এই যে সিবাআ, উম্ম আম্মারের ছেলে, ব্যাটা মেয়েদের খতনা করিস! তুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাস?' এই বলে হামযা এত জোরে সিবাআকে আঘাত করলেন যে মুহূর্তের মধ্যে সিবাআ অতীতের অংশ হয়ে গেল।
আমি আমার বর্শাটা খুব সাবধানে হামযার দিকে তাক করলাম, লক্ষ্য নিশ্চিত করে ছুঁড়ে মারলাম তাঁর দিকে। বর্শাটা ঠিক নাভীর নিচে দিয়ে ঢুকে দু'পায়ের মাঝ দিয়ে বের হয়ে আসলো। তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। মারা যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। এরপর বর্শা ছুটিয়ে আনতে মৃতদেহর কাছে গেলাম। বর্শাটা ছাড়িয়ে তাঁবুতে ফিরে এলাম। হামযাকে মারা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ ছিল না। মুক্তির আশাতেই আমি উনাকে হত্যা করি।'
চাচা হামযা ছিলেন রাসূলুল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। এই মৃত্যুর খবর শুনে রাসূলুল্লাহ প্রচণ্ড কষ্ট পান। তিনি বললেন, 'কেউ কি আমার চাচার মৃতদেহ দেখেছে? তিনি এখন কোথায়?' এক সাহাবি বললেন তিনি দেখেছেন। সেই সাহাবিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ হামযার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচার মৃতদেহ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, কাঁদতে শুরু করলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ ইবন উতবার নির্দেশে হামযার শরীর বিকৃত করা হয়েছিল। তাঁর পেট কেটে কলিজা বের করে আনা হয়। রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচা হামযাকে সেরকম বিকৃত অবস্থাতে দেখেন। তাঁর জন্য এটা ছিল খুবই হৃদয় বিদারক ঘটনা। ওয়াহশীর বর্ণনায় ফেরা যাক,
'আমি মক্কায় ফিরে এলাম। রাসূলুল্লাহর মক্কা বিজয়ের পর আমি তাইফে পালিয়ে গেলাম। যখন তাইফ থেকে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে দূত প্রেরিত হলো, আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করবো, কই যাবো। একবার ভাবলাম সিরিয়া চলে যাই, আবার ভাবলাম ইয়েমেন বা অন্য কোনো দেশ। খুব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। তখন কেউ একজন আমাকে বললো, এসব চিন্তা ছাড়ো। আমি কসম করে বলছি, যে লোক মুহাম্মাদের দ্বীন গ্রহণ করে আর ইসলামের সাক্ষ্য দেয়, তাদের তিনি হত্যা করেন না। এ কথা শুনে আমি সোজা মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে চলে গেলাম, তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে কালিমা পাঠ করে তাঁকে চমকে দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
- তুমি কি ওয়াহশী?
- জ্বী, আল্লাহর রাসূল।
- এখানে বসো। কীভাবে হামযাকে হত্যা করেছো সে কাহিনী আমাকে বলো।
আমি ঠিক সেভাবেই পুরো কাহিনীটি উনার কাছে বর্ণনা করলাম, যেভাবে আজ তোমাদের (উপস্থিত তাবেইনদের উদ্দেশ্যে) বলছি। আমি কাহিনী বলা থামতেই উনি বলে উঠলেন, ওয়াহশী, তুমি কি তোমার চেহারা আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিতে পারো?'
রাসূলুল্লাহ ওয়াহশীর চেহারা দেখতে চাচ্ছিলেন না। যতবার ওয়াহশীর দিকে তাকাচ্ছিলেন, প্রতিবারই তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রিয় চাচা হামযার মৃত্যুর করুণ চিত্র।
'এরপর থেকে আমি যতটা সম্ভব রাসূলুল্লাহকে এড়িয়ে চলতাম। উনি যেখানে যেতেন, আমি সেখানে যেতাম না পাছে উনার চোখে পড়ে যাই। আর এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উনাকে নিজের কাছেই তুলে নিলেন।'
ওয়াহশী বদলে যান, সত্যিকারের একজন মুসলিম হন। পরবর্তী জীবনে জিহাদে যোগ দেন। ভণ্ড নবী মুসাইলামা আল কাযযাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
'যে বর্শা দিয়ে আমি হামযাকে হত্যা করেছিলাম, সে বর্শা হাতে ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যখন দুই পক্ষ মিলিত হলো, আমি দেখতে পেলাম মুসাইলামা তরবারি হাতে দাঁড়ানো। আরেকজন মুসলিম যোদ্ধা তাকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। আমি আমার বর্শার লক্ষ্যস্থল ঠিক করতে থাকলাম, যখন মনে হলো ঠিকমতো লক্ষ্যস্থির করছি, বর্শা ছুঁড়ে মারলাম, বর্শা সোজা মুসাইলামাকে আঘাত করলো। ওদিকে সেই মুসলিম সেনাও তার তরবারি দিয়ে মুসাইলামাকে আক্রমণ করলো। মুসাইলামা মারা গেল।'
তরবারি দিয়ে আক্রমণ করা লোকটি হলেন উহুদ যুদ্ধের বীর, আবু দুজানা। ওয়াহশী বলতেন, 'যদি আমার আঘাতে সে মারা যেয়ে থাকে, তাহলে আমি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে মেরেছি আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষকেও আমি মেরেছি।' শ্রেষ্ঠ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন হামযাকে, আর নিকৃষ্ট বলে বুঝিয়েছেন মুসাইলামাকে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ওয়াহশীকে বলেছিলেন, 'আজ থেকে তুমি আল্লাহর পথে সেভাবে যুদ্ধ করো, যেভাবে তুমি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে।' ইসলামের বিষয়টি আসলে এমনই। কেউ যদি একটি গুনাহ করে থাকে, তাহলে একটি ভালো কাজের মাধ্যমে সেই গুনাহটি মোছার সুযোগ থাকে। ভাল কাজ খারাপ কাজগুলোকে মুছে ফেলে। আমাদের গুনাহগুলো মুছে ফেলার জন্য আমাদেরকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। উমার ইবন খাত্তাব রা. একবার রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে তর্ক করেন। তিনি বুঝতে পারলেন কাজটি ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, 'এরপর থেকে আমি রোজা রাখা, সাদাকা দেওয়া এবং রাতে সালাত (কিয়ামুল লাইল) আদায় করতেই থাকলাম।' সাহাবিরা তাঁদের গুনাহর জন্য নেক আমল করতেন। খারাপ কাজ করা হয়ে গেলে তার পরিবর্তে ভালো কাজ করা পাপমোচন বা অনুশোচনার একটি অংশ।

উহুদের যুদ্ধে মাত্র একদিনে ৭০ জন মুসলিম শাহাদাৎ লাভ করেন। উহুদের যুদ্ধকে ঘিরে শাহাদাহ সম্পর্কিত অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়। উহুদ ছিল মুসলিম সমাজে শাহাদাতের সংস্কৃতির সূচনা। যিনি এ সংস্কৃতির বীজ রোপণ করে যান তিনি হলেন শহীদদের সর্দার, রাসূলুল্লাহর চাচা হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব। "মারা যাওয়া" বা "মৃত্যু" এ শব্দগুলো শহীদদের জন্য যথার্থ নয়, যদিও বোঝানোর জন্য এমনটি বলা হয়। তবে মনে রাখতে হবে একজন শহীদ কুরআনের দৃষ্টিতে কখনোই মৃত নন, শহীদরা জীবিত।

উহুদের দিনে হামযাহ তাঁর যোগ্যতার প্রতি সুবিচার করেছিলেন। প্রচণ্ড সাহসিকতার সাথে তিনি পতাকাবাহী গোত্র বনু আব্দুদ-দারের মুশরিকদের হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু হামযাকে হত্যা করেছিল এমন এক ব্যক্তি, যাকে এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ বলা চলে। তার নাম ওয়াহশী। সে ছিল এক আবিসিনিয়ান দাস। এই যুদ্ধে সে এসেছিল তার মুক্তির আশায়। কুরাইশদের জয়-পরাজয়ে তার কিছুই আসে যায় না। তার একটাই লক্ষ্য, হামযাকে হত্যা করা, আর তাহলেই সে মুক্তি পাবে। কাহিনীটা তার মুখেই শোনা যাক।

'তখন আমি ছিলাম জুবাইর ইবন মুতইমের দাস। বদরের যুদ্ধে হামযা মুতইমের চাচা তুআইমাহ ইবন আদীকে হত্যা করে। কুরাইশদের উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতিকাল চলার সময় তুআইমার ভাতিজা জুবাইর আমাকে এসে বলল, শোনো ওয়াহশী, তুমি যদি আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হামযাকে হত্যা করো, তাহলে তোমাকে আমি মুক্ত করে দেবো।

আমি রাজি হলাম, বেরিয়ে পড়লাম যুদ্ধবাহিনীর সাথে। আমি আবিসিয়ান, তাই খুব ভালো বর্শা ছুঁড়তে পারতাম। বর্শা ছুঁড়েছি অথচ লক্ষ্যভেদ হয়নি-- এমন ঘটনা আমার সাথে কমই ঘটেছে। ময়দানে দু' দল লড়ছে, আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার লক্ষ্যকে। তুমুল লড়াইয়ের মাঝে দেখতে পেলাম হামযা! এক প্রকাণ্ড উটের মতো তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমাদের লোকদের ওপর তাঁর তরবারি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছুই তাঁকে থামাতে পারছে না। ঝোপঝাড় আর পাথরের আড়ালে লুকিয়ে আমি একটু একটু করে তাঁর দিকে এগোচ্ছি। কিন্তু সিবাআ আমার আগেই তাঁর কাছে পৌঁছে গেল। হামযা তাকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, 'এই যে সিবাআ, উম্ম আম্মারের ছেলে, ব্যাটা মেয়েদের খতনা করিস! তুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাস?' এই বলে হামযা এত জোরে সিবাআকে আঘাত করলেন যে মুহূর্তের মধ্যে সিবাআ অতীতের অংশ হয়ে গেল।

আমি আমার বর্শাটা খুব সাবধানে হামযার দিকে তাক করলাম, লক্ষ্য নিশ্চিত করে ছুঁড়ে মারলাম তাঁর দিকে। বর্শাটা ঠিক নাভীর নিচে দিয়ে ঢুকে দু'পায়ের মাঝ দিয়ে বের হয়ে আসলো। তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। মারা যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। এরপর বর্শা ছুটিয়ে আনতে মৃতদেহর কাছে গেলাম। বর্শাটা ছাড়িয়ে তাঁবুতে ফিরে এলাম। হামযাকে মারা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ ছিল না। মুক্তির আশাতেই আমি উনাকে হত্যা করি।'

চাচা হামযা ছিলেন রাসূলুল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। এই মৃত্যুর খবর শুনে রাসূলুল্লাহ প্রচণ্ড কষ্ট পান। তিনি বললেন, 'কেউ কি আমার চাচার মৃতদেহ দেখেছে? তিনি এখন কোথায়?' এক সাহাবি বললেন তিনি দেখেছেন। সেই সাহাবিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ হামযার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচার মৃতদেহ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, কাঁদতে শুরু করলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ ইবন উতবার নির্দেশে হামযার শরীর বিকৃত করা হয়েছিল। তাঁর পেট কেটে কলিজা বের করে আনা হয়। রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচা হামযাকে সেরকম বিকৃত অবস্থাতে দেখেন। তাঁর জন্য এটা ছিল খুবই হৃদয় বিদারক ঘটনা। ওয়াহশীর বর্ণনায় ফেরা যাক,

'আমি মক্কায় ফিরে এলাম। রাসূলুল্লাহর মক্কা বিজয়ের পর আমি তাইফে পালিয়ে গেলাম। যখন তাইফ থেকে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে দূত প্রেরিত হলো, আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করবো, কই যাবো। একবার ভাবলাম সিরিয়া চলে যাই, আবার ভাবলাম ইয়েমেন বা অন্য কোনো দেশ। খুব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। তখন কেউ একজন আমাকে বলল, এসব চিন্তা ছাড়ো। আমি কসম করে বলছি, যে লোক মুহাম্মাদের দ্বীন গ্রহণ করে আর ইসলামের সাক্ষ্য দেয়, তাদের তিনি হত্যা করেন না। এ কথা শুনে আমি সোজা মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে চলে গেলাম, তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে কালিমা পাঠ করে তাঁকে চমকে দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
- তুমি কি ওয়াহশী?
- জ্বী, আল্লাহর রাসূল।
- এখানে বসো। কীভাবে হামযাকে হত্যা করেছো সে কাহিনী আমাকে বলো।

আমি ঠিক সেভাবেই পুরো কাহিনীটি উনার কাছে বর্ণনা করলাম, যেভাবে আজ তোমাদের (উপস্থিত তাবেইনদের উদ্দেশ্যে) বলছি। আমি কাহিনী বলা থামতেই উনি বলে উঠলেন, ওয়াহশী, তুমি কি তোমার চেহারা আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিতে পারো?'

রাসূলুল্লাহ ওয়াহশীর চেহারা দেখতে চাচ্ছিলেন না। যতবার ওয়াহশীর দিকে তাকাচ্ছিলেন, প্রতিবারই তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রিয় চাচা হামযার মৃত্যুর করুণ চিত্র।

'এরপর থেকে আমি যতটা সম্ভব রাসূলুল্লাহকে এড়িয়ে চলতাম। উনি যেখানে যেতেন, আমি সেখানে যেতাম না পাছে উনার চোখে পড়ে যাই। আর এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উনাকে নিজের কাছেই তুলে নিলেন।'

ওয়াহশী বদলে যান, সত্যিকারের একজন মুসলিম হন। পরবর্তী জীবনে জিহাদে যোগ দেন। ভণ্ড নবী মুসাইলামা আল কাযযাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

'যে বর্শা দিয়ে আমি হামযাকে হত্যা করেছিলাম, সে বর্শা হাতে ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যখন দুই পক্ষ মিলিত হলো, আমি দেখতে পেলাম মুসাইলামা তরবারি হাতে দাঁড়ানো। আরেকজন মুসলিম যোদ্ধা তাকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। আমি আমার বর্শার লক্ষ্যস্থল ঠিক করতে থাকলাম, যখন মনে হলো ঠিকমতো লক্ষ্যস্থির করছি, বর্শা ছুঁড়ে মারলাম, বর্শা সোজা মুসাইলামাকে আঘাত করল। ওদিকে সেই মুসলিম সেনাও তার তরবারি দিয়ে মুসাইলামাকে আক্রমণ করল। মুসাইলামা মারা গেল।'

তরবারি দিয়ে আক্রমণ করা লোকটি হলেন উহুদ যুদ্ধের বীর, আবু দুজানা। ওয়াহশী বলতেন, 'যদি আমার আঘাতে সে মারা যেয়ে থাকে, তাহলে আমি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে মেরেছি আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষকেও আমি মেরেছি।' শ্রেষ্ঠ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন হামযাকে, আর নিকৃষ্ট বলে বুঝিয়েছেন মুসাইলামাকে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ওয়াহশীকে বলেছিলেন, 'আজ থেকে তুমি আল্লাহর পথে সেভাবে যুদ্ধ করো, যেভাবে তুমি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে।' ইসলামের বিষয়টি আসলে এমনই। কেউ যদি একটি গুনাহ করে থাকে, তাহলে একটি ভালো কাজের মাধ্যমে সেই গুনাহটি মোছার সুযোগ থাকে। ভাল কাজ খারাপ কাজগুলোকে মুছে ফেলে। আমাদের গুনাহগুলো মুছে ফেলার জন্য আমাদেরকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। উমার ইবন খাত্তাব রা. একবার রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে তর্ক করেন। তিনি বুঝতে পারলেন কাজটি ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, 'এরপর থেকে আমি রোজা রাখা, সাদাকা দেওয়া এবং রাতে সালাত (কিয়ামুল লাইল) আদায় করতেই থাকলাম।' সাহাবিরা তাঁদের গুনাহর জন্য নেক আমল করতেন। খারাপ কাজ করা হয়ে গেলে তার পরিবর্তে ভালো কাজ করা পাপমোচন বা অনুশোচনার একটি অংশ।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুসআব ইবন উমাইর ؓ

📄 মুসআব ইবন উমাইর ؓ


মুসআব ইবন উমাইর কেমন ছিলেন সে বিষয়ে সবচাইতে চমৎকার মন্তব্যটি করেছেন খাব্বাব রা.। তিনি বলেন,
'কিছু লোক দুনিয়ার বুকে পুরস্কার পায় না, সব পুরস্কার জমা করে রাখে আখিরাতের জন্য। মুসআব ইবন উমাইর তেমনই একজন। উহুদের দিনে তিনি মারা যান, রেখে যান শুধু গায়ে জড়ানোর এক টুকরো চাদর। সে চাদর দিয়ে যখন আমরা তাঁর মাথা ঢাকতে যাই, তাঁর পা বের হয়ে আসে। আর যখন পা ঢাকতে যাই, মাথা বের হয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাঁর মাথাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে পা দুটো যেন ইযকির ঘাস দিয়ে ঢেকে দিই।
অথচ এই মুসআব ইবন উমাইর ছিলেন জাহেলিয়াতের যুগে একজন 'সেলিব্রেটি'! কী ছিল না তাঁর! বাবা-মায়ের চোখের মণি, তরুণীদের ঘুম হরণকারী, দামী পোশাক আর সিরিয়ার সুগন্ধি ছাড়া যার চলতো না! অথচ ইসলাম মানুষটিকে আমূলে বদলে দিল। তিনি হয়ে গেলেন একেবারে সাদাসিধে। মৃত্যুর সময় তাঁর পুরো দেহ ঢাকার মতো এক টুকরো কাপড়ও তাঁর পরনে ছিল না।
অন্যদিকে আবদুর রহমান ইবন আওফ ছিলেন ধনী সাহাবিদের একজন। একদিন ইফতারের কথা, তাঁর সামনে কিছু খাবার আনা হলো। তিনি বললেন, 'মুসআব মারা গেছে, অথচ সে ছিল আমার চাইতে উত্তম, একটা ছোট্ট চাদর ছাড়া তাঁর আর কিছুই ছিল না। হামযা মারা গেছে, অথচ সেও আমার চেয়ে উত্তম। তাঁরা মারা গেছে অথচ আমরা এখনও দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ভোগ করে চলেছি।' এই বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন, আর কিছুই খেতে পারলেন না।
রাসূলুল্লাহ মুসআব ইবন উমাইরের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কুরআনের একটি আয়াত পড়লেন,
"মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ [যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে] তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ [শাহাদাত বরণের] প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তনই করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)
এই আয়াতের অর্থ হলো আল্লাহর সাথে আমাদের একটি ওয়াদা আছে, কিছু মানুষ আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে সেই ওয়াদা পূর্ণ করেছে। যেমন মুস'আব ইবন উমাইর। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এরাই হলো শহীদ। তোমরা আসো, তাদের দেখে যাও। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যারাই তাদেরকে সালাম দেবে তাদেরকে তারা সালামের উত্তর প্রদান করবে।'

টিকাঃ
13 তিরমিযী, অধ্যায় মানাকিব, হাদীস ৪২২৫ (আরবি রেফারেন্স)।
14 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জানাযা, হাদীস ৩৬।

মুসআব ইবন উমাইর কেমন ছিলেন সে বিষয়ে সবচাইতে চমৎকার মন্তব্যটি করেছেন খাব্বাব রা.। তিনি বলেন, 'কিছু লোক দুনিয়ার বুকে পুরস্কার পায় না, সব পুরস্কার জমা করে রাখে আখিরাতের জন্য। মুসআব ইবন উমাইর তেমনই একজন। উহুদের দিনে তিনি মারা যান, রেখে যান শুধু গায়ে জড়ানোর এক টুকরো চাদর। সে চাদর দিয়ে যখন আমরা তাঁর মাথা ঢাকতে যাই, তাঁর পা বের হয়ে আসে। আর যখন পা ঢাকতে যাই, মাথা বের হয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাঁর মাথাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে পা দুটো যেন ইযকির ঘাস দিয়ে ঢেকে দিই।

অথচ এই মুসআব ইবন উমাইর ছিলেন জাহেলিয়াতের যুগে একজন 'সেলিব্রেটি'! কী ছিল না তাঁর! বাবা-মায়ের চোখের মণি, তরুণীদের ঘুম হরণকারী, দামী পোশাক আর সিরিয়ার সুগন্ধি ছাড়া যার চলত না! অথচ ইসলাম মানুষটিকে আমূলে বদলে দিল। তিনি হয়ে গেলেন একেবারে সাদাসিধে। মৃত্যুর সময় তাঁর পুরো দেহ ঢাকার মতো এক টুকরো কাপড়ও তাঁর পরনে ছিল না।

অন্যদিকে আবদুর রহমান ইবন আওফ ছিলেন ধনী সাহাবিদের একজন। একদিন ইফতারের কথা, তাঁর সামনে কিছু খাবার আনা হল। তিনি বললেন, 'মুসআব মারা গেছে, অথচ সে ছিল আমার চাইতে উত্তম, একটা ছোট্ট চাদর ছাড়া তাঁর আর কিছুই ছিল না। হামযা মারা গেছে, অথচ সেও আমার চেয়ে উত্তম। তাঁরা মারা গেছে অথচ আমরা এখনও দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ভোগ করে চলেছি।' এই বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন, আর কিছুই খেতে পারলেন না।

রাসূলুল্লাহ মুসআব ইবন উমাইরের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কুরআনের একটি আয়াত পড়লেন,

"মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ [যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে] তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ [শাহাদাত বরণের] প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তনই করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)

এই আয়াতের অর্থ হল আল্লাহর সাথে আমাদের একটি ওয়াদা আছে, কিছু মানুষ আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে সেই ওয়াদা পূর্ণ করেছে। যেমন মুস'আব ইবন উমাইর। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এরাই হল শহীদ। তোমরা আসো, তাদের দেখে যাও। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যারাই তাদেরকে সালাম দেবে তাদেরকে তারা সালামের উত্তর প্রদান করবে।'

টিকাঃ
১৩. তিরমিযী, অধ্যায় মানাকিব, হাদীস ৪২২৫ (আরবি রেফারেন্স)।
১৪. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জানাযা, হাদীস ৩৬।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাদ ইবন আর-রাবী ؓ

📄 সাদ ইবন আর-রাবী ؓ


সাদ ইবন আর-রাবীর সাথে রাসূলুল্লাহ যুদ্ধের আগে পরামর্শ করছিলেন। সে কথা আগেই বর্ণনা করা হয়ে হয়েছে। যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ তাঁর অবস্থা জানতে চাইলেন। বললেন, 'কে আমাকে সাদ ইবন রাবীর খবর দিতে পারবে? সে কি বেঁচে আছে না মারা গেছে? যদি তাঁকে জীবিত দেখতে পাও আমার সালাম পৌঁছে দিও।' একজন আনসারী সাহাবি, উবাই ইবন কাব, সাদের খোঁজে বেরিয়ে গেলেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সাদকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় খুঁজে পেলেন। তাঁকে পেয়ে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ তোমার অবস্থা জানতে চেয়ে আমাকে পাঠিয়েছেন। কী অবস্থা এখন তোমার?' সাদ বললেন,
'রাসূলুল্লাহর প্রতি সালাম এবং তোমাকেও। রাসূলুল্লাহকে আমার পক্ষ থেকে বলে দিও, আমি জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি। আল্লাহ তাঁকে সকল নবীর চাইতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পুরষ্কৃত করুক। আর আনসারদেরকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানিয়ে বলে দিও, সাদ ইবন রাবী তাদের বলেছে, তোমরা বেঁচে থাকতে যদি তোমাদের নবীর উপর একটা আঁচড়ও আসে, তবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার মতো কোনো অজুহাত তোমাদের থাকবে না। যতদিন তোমাদের চোখের পাতা নড়বে, ততদিন পর্যন্ত তোমরা নবীকে রক্ষা করে যাবে।'
মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও সাদ রাসূলুল্লাহর জন্য শ্রেষ্ঠ বিনিময় কামনা করছেন। অথচ এই রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে গিয়েই আজ সাদ নিজের জীবনের শেষ প্রান্তে। আজকের মুসলিমরা তো এতই স্বার্থপর, এতই কৃপণ মনের অধিকারী হয়ে গেছে যে তারা দ্বীন ইসলামের জন্য জান ও মাল বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। যখন বিপদ আসে, উল্টো ভাবতে থাকে যে ইসলামের জন্যই আজ তাদের এ দুর্দশা। প্রয়োজনে তারা তাদের দুনিয়ার নিরাপত্তা, সুখ, শান্তি বজায় রাখার জন্য দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে দেয়।
একটু তুলনা করে দেখা যাক-- শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূলকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে আনসারীদের জীবনে কী বিপর্যয় নেমে আসে! তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের পরিবার-পরিজনকে কষ্ট সহ্য করতে হয়, যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়াতে হয়, পুরো আরব তাদের শত্রু হয়ে যায়। কিন্তু এরপরেও সাদ ইবন আর-রাবী এতটুকু বিরক্ত নন। বরং তিনি নবীজির পুরষ্কারের জন্য দুআ করছেন। শুধু তাই নয়, সাদ তাঁর আনসারী ভাইবোনের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী পাঠিয়েছেন এই বলে, তাদের মাঝে যতক্ষণ একবিন্দু প্রাণ আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা যেন নবীজিকে রক্ষা করে যায়। তাদের জীবদ্দশায় যদি নবীজির গায়ে একটি কাঁটাও লাগে, তাহলেও তারা এর জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবে, তাদের কোনো কৈফিয়ত শোনা হবে না। রাসূলুল্লাহর সাহায্যকারী আনসাররা দ্বীন ইসলামকে এভাবেই বুঝতেন।

সাদ ইবন আর-রাবীর সাথে রাসূলুল্লাহ যুদ্ধের আগে পরামর্শ করছিলেন। যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ তাঁর অবস্থা জানতে চাইলেন। বললেন, 'কে আমাকে সাদ ইবন রাবীর খবর দিতে পারবে? সে কি বেঁচে আছে না মারা গেছে? যদি তাঁকে জীবিত দেখতে পাও আমার সালাম পৌঁছে দিও।' একজন আনসারী সাহাবি, উবাই ইবন কাব, সাদের খোঁজে বেরিয়ে গেলেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সাদকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় খুঁজে পেলেন। তাঁকে পেয়ে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ তোমার অবস্থা জানতে চেয়ে আমাকে পাঠিয়েছেন। কী অবস্থা এখন তোমার?' সাদ বললেন,

'রাসূলুল্লাহর প্রতি সালাম এবং তোমাকেও। রাসূলুল্লাহকে আমার পক্ষ থেকে বলে দিও, আমি জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি। আল্লাহ তাঁকে সকল নবীর চাইতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পুরষ্কৃত করুক। আর আনসারদেরকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানিয়ে বলে দিও, সাদ ইবন রাবী তাদের বলেছে, তোমরা বেঁচে থাকতে যদি তোমাদের নবীর ওপর একটা আঁচড়ও আসে, তবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার মতো কোনো অজুহাত তোমাদের থাকবে না। যতদিন তোমাদের চোখের পাতা নড়বে, ততদিন পর্যন্ত তোমরা নবীকে রক্ষা করে যাবে।'

মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও সাদ রাসূলুল্লাহর জন্য শ্রেষ্ঠ বিনিময় কামনা করছেন। অথচ এই রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে গিয়েই আজ সাদ নিজের জীবনের শেষ প্রান্তে। আজকের মুসলিমরা তো এতই স্বার্থপর, এতই কৃপণ মনের অধিকারী হয়ে গেছে যে তারা দ্বীন ইসলামের জন্য জান ও মাল বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। যখন বিপদ আসে, উল্টো ভাবতে থাকে যে ইসলামের জন্যই আজ তাদের এ দুর্দশা। প্রয়োজনে তারা তাদের দুনিয়ার নিরাপত্তা, সুখ, শান্তি বজায় রাখার জন্য দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে দেয়।

একটু তুলনা করে দেখা যাক-- শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূলকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে আনসারীদের জীবনে কী বিপর্যয় নেমে আসে! তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের পরিবার-পরিজনকে কষ্ট সহ্য করতে হয়, যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়াতে হয়, পুরো আরব তাদের শত্রু হয়ে যায়। কিন্তু এরপরেও সাদ ইবন আর-রাবী এতটুকু বিরক্ত নন। বরং তিনি নবীজির পুরষ্কারের জন্য দুআ করছেন। শুধু তাই নয়, সাদ তাঁর আনসারী ভাইবোনের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী পাঠিয়েছেন এই বলে, তাদের মাঝে যতক্ষণ একবিন্দু প্রাণ আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা যেন নবীজিকে রক্ষা করে যায়। তাদের জীবদ্দশায় যদি নবীজির গায়ে একটি কাঁটাও লাগে, তাহলেও তারা এর জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবে, তাদের কোনো কৈফিয়ত শোনা হবে না। রাসূলুল্লাহর সাহায্যকারী আনসাররা দ্বীন ইসলামকে এভাবেই বুঝতেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ؓ

📄 আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ؓ


উহুদ যুদ্ধের আগের কথা, আবদুল্লাহ ইবন জাহশ আর সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসের দেখা হলো। আবদুল্লাহ ইবন জাহশ বললেন, 'আসো, আমরা একসাথে আল্লাহর কাছে দুআ করি।' তাঁরা ঠিক করলেন, প্রথমে তাঁদের একজন দুআ করবেন, অপরজন বলবেন আমীন। এরপর অপরজন দুআ চাইবেন, তখন প্রথমজন বলবেন আমীন। প্রথমে সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস দুআ করলেন,
'হে আল্লাহ! আমি যদি শত্রুর দেখা পাই, তাহলে আমার সাথে এমন এক শত্রুর সাক্ষাৎ করিয়ে দাও যে হবে প্রচণ্ড শক্তিশালী। সে আমার সাথে লড়বে এবং আমি তার সাথে লড়বো। এরপর তুমি আমাকে তার ওপর লড়াইয়ে বিজয়ী করে দিও। আমি যেন তাকে হত্যা করে তার দেহ থেকে বর্ম ছিনিয়ে নিতে পারি।'
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ বললেন, 'আমীন'। সাদ বললেন, 'এবার তোমার পালা।' আবদুল্লাহ ইবন জাহশ দুআ করলেন,
'হে আল্লাহ! আমার সাথে একজন শক্তিশালী যোদ্ধার সাক্ষাৎ করিয়ে দাও, যে আমার বিরুদ্ধে লড়বে এবং আমি তার বিরুদ্ধে লড়বো। এরপর সে আমাকে হত্যা করবে আর আমার নাক ও কান কেটে নেবে। আমি যেদিন তোমার সাথে মিলিত হবো, সেদিন যেন তুমি আমায় জিজ্ঞেস করতে পারো, তোমার নাক ও কান কেন কাটা হয়েছে হে আবদুল্লাহ? আর আমি বলব, হে আল্লাহ! তোমার এবং তোমার রাসূলের জন্য। তখন তুমি বলবে, আবদুল্লাহ, তুমি সত্যি বলেছিলে!'
সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস এই দুআ শুনে বললেন, 'আমীন।' সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস তাঁর ছেলের কাছে যখন এ কাহিনীটি বলছিলেন, তিনি বলেন, 'শোনো বাবা, সেই দিন আমাদের দুজনের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন জাহশের দুআটাই বেশি ভালো ছিল। দিনশেষে দেখতে পেলাম, তাঁর নাক আর কান একটা দড়িতে বাঁধা।'
আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআটি সত্যিই কবুল করে নিয়েছিলেন! ঠিক সেভাবে কবুল করেছেন, যেভাবে তিনি চেয়েছেন! এই দুআ থেকে এটাও জানা যায় যে নিজের মৃত্যুকামনা করা জায়েয কেবলমাত্র তখনই, যখন আল্লাহর পথে মৃত্যুর দুআ হয়।

উহুদ যুদ্ধের আগের কথা, আবদুল্লাহ ইবন জাহশ আর সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসের দেখা হল। আবদুল্লাহ ইবন জাহশ বললেন, 'আসো, আমরা একসাথে আল্লাহর কাছে দুআ করি।' তাঁরা ঠিক করলেন, প্রথমে তাঁদের একজন দুআ করবেন, অপরজন বলবেন আমীন। এরপর অপরজন দুআ চাইবেন, তখন প্রথমজন বলবেন আমীন। প্রথমে সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস দুআ করলেন,

'হে আল্লাহ! আমি যদি শত্রুর দেখা পাই, তাহলে আমার সাথে এমন এক শত্রুর সাক্ষাৎ করিয়ে দাও যে হবে প্রচণ্ড শক্তিশালী। সে আমার সাথে লড়বে এবং আমি তার সাথে লড়বো। এরপর তুমি আমাকে তার ওপর লড়াইয়ে বিজয়ী করে দিও। আমি যেন তাকে হত্যা করে তার দেহ থেকে বর্ম ছিনিয়ে নিতে পারি।'

আবদুল্লাহ ইবন জাহশ বললেন, 'আমীন'। সাদ বললেন, 'এবার তোমার পালা।' আবদুল্লাহ ইবন জাহশ দুআ করলেন,

'হে আল্লাহ! আমার সাথে একজন শক্তিশালী যোদ্ধার সাক্ষাৎ করিয়ে দাও, যে আমার বিরুদ্ধে লড়বে এবং আমি তার বিরুদ্ধে লড়বো। এরপর সে আমাকে হত্যা করবে আর আমার নাক ও কান কেটে নেবে। আমি যেদিন তোমার সাথে মিলিত হব, সেদিন যেন তুমি আমায় জিজ্ঞেস করতে পারো, তোমার নাক ও কান কেন কাটা হয়েছে হে আবদুল্লাহ? আর আমি বলব, হে আল্লাহ! তোমার এবং তোমার রাসূলের জন্য। তখন তুমি বলবে, আবদুল্লাহ, তুমি সত্যি বলেছিলে!'

সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস এই দুআ শুনে বললেন, 'আমীন।' সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস তাঁর ছেলের কাছে যখন এ কাহিনীটি বলছিলেন, তিনি বলেন, 'শোনো বাবা, সেই দিন আমাদের দুজনের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন জাহশের দুআটাই বেশি ভালো ছিল। দিনশেষে দেখতে পেলাম, তাঁর নাক আর কান একটা দড়িতে বাঁধা।'

আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআটি সত্যিই কবুল করে নিয়েছিলেন! ঠিক সেভাবে কবুল করেছেন, যেভাবে তিনি চেয়েছেন! এই দুআ থেকে এটাও জানা যায় যে নিজের মৃত্যুকামনা করা জায়েয কেবলমাত্র তখনই, যখন আল্লাহর পথে মৃত্যুর দুআ হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px