📄 কুরআনের চোখে উহুদের বিপর্যয়
"নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে যারা পিছু হটে গিয়েছিল সেইদিন, যেদিন দুদল মুখোমুখি হয়েছিল, শয়তানই তাদের কিছু কৃতকর্মের ফলে তাদেরকে পদস্খলিত করেছিল। আর অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, সহনশীল।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৫)
অর্থাৎ উহুদের দিনে মুসলিমদের পদস্খলনের কারণ হলো শয়তান। আল্লাহ উহুদের যুদ্ধের মাধ্যমে মুনাফিকদের চেহারাও প্রকাশ করে দিলেন।
"তিনি দুঃখের পরে তোমাদের উপর শান্তি অবতরণ করলেন, তা ছিল তন্দ্রা, যা তোমাদের একদলকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে দেয়, আর আরেকদল নিজেরাই নিজেদের উদ্বিগ্ন করে রেখেছিল। তারা তাদের জাহেলী যুগের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অন্যায় ধারণা করতে থাকে। (এক পর্যায়ে) তারা এও বলতে শুরু করে, এ কাজে কি আমাদের কোনো ভূমিকা আছে?
(হে নবী, তাদের) বলুন, (এ ব্যাপারে আমারও কোনো ভূমিকা নেই) নিশ্চয়ই সব বিষয় আল্লাহর হাতে। তারা তাদের অন্তরে লুকিয়ে রাখে এমন বিষয় যা তোমার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে, যদি (যুদ্ধের) এ কাজে আমাদের কোনো ভূমিকা থাকতো, তাহলে আমাদেরকে এখানে হত্যা করা হতো না।
বলো, যদি তোমরা আজ ঘরের ভেতরও থাকতে, তবু নিহত হওয়া যাদের অবধারিত ছিল, তারা তাদের মরণের বিছানার দিকে বের হয়ে আসতো। আর এভাবেই মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিষয়সমূ্যের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করেন এবং এ ঘটনার (মাঝ) দিয়ে তিনি তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরিশুদ্ধ করেন। তোমাদের মনের কথা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পূর্ণ জ্ঞাত।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৪)
মুনাফিকরা বলে, যুদ্ধ করে বিপদ আর মৃত্যু ডেকে আনার কী দরকার? আল্লাহ আযযা ওয়া জাল জবাব দিয়েছেন, মুসলিমদের মৃত্যুর কারণ জিহাদ নয়, তারা মারা গেছে কারণ তাদের মৃত্যুর সময় এসে উপস্থিত হয়েছে। যদি তারা জিহাদে না গিয়ে ঘরের মধ্যেও বসে থাকতো, তবুও যাদের মারা যাওয়ার, তারা মারা যেতোই। অর্থাৎ মুসলিমদের মৃত্যুর জন্য জিহাদকে দায়ী করা ভুল। মৃত্যুর বিষয়টি আল্লাহর হাতে, আল্লাহ তাআলা যখন যার মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন, সে ঠিক তখনই মারা যাবে। হোক সে ঘরের বাইরে থাকুক বা ভেতরে, মৃত্যুর সময়ের কোনো নড়চড় নেই। উহুদের যুদ্ধ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। মুসলিমদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে উহুদের যুদ্ধকে দায়ী করা যাবে না।
“... পরে যখন তোমরা সাহস ও (মনোবল) হারিয়ে ফেললে এবং (আল্লাহর রাসূলের) নির্দেশ সম্পর্কে মতপার্থক্য করলে, এমনকি, আল্লাহর রাসূল যখন তোমাদেরকে সেই ভালোবাসার জিনিস (আসন্ন বিজয়) দেখিয়ে দিলেন, তারপরও তোমরা তাঁর কথা অমান্য করে (তাঁর দেখিয়ে দেওয়া স্থান ছেড়ে) চলে গেলে। তোমাদের মধ্যে কিছু লোক তখন দুনিয়াবি ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত হয় পড়লো আর কেউ আখিরাতের কল্যাণ চাইতে থাকলো। আল্লাহ এর দ্বারা তোমাদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চাইলেন এবং তোমাদের অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মু'মিনদের উপর অনুগ্রহশীল।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫২)
হার-জিত, সুখ-দুঃখ, দুঃসময়-সুসময় সবকিছু দিয়েই আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করেন। বদরের যুদ্ধে তিনি জয় দিয়ে মুসলিমদের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। উহুদের দিনে পরীক্ষা করেন পরাজয়ের মাধ্যমে। ইবন ইসহাক সেই দিনের বর্ণনায় বলেন, 'উহুদের দিন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে কষ্ট ও পরীক্ষার একটি দিন। এই দিনে আল্লাহ তাআলা কিছু মুসলিমকে শহীদের মর্যাদা দান করেন। সেই দিন একটি পর্যায়ে শত্রুরা রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছতেও সক্ষম হয়। তাদের ছুঁড়ে মারা পাথরের আঘাতে নবীজি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর দাঁত ভেঙে যায়, মুখে সজোরে আঘাত লাগে, ঠোঁট কেটে যায়।'
"নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে যারা পিছু হটে গিয়েছিল সেইদিন, যেদিন দুদল মুখোমুখি হয়েছিল, শয়তানই তাদের কিছু কৃতকর্মের ফলে তাদেরকে পদস্খলিত করেছিল। আর অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, সহনশীল।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৫)
অর্থাৎ উহুদের দিনে মুসলিমদের পদস্খলনের কারণ হলো শয়তান। আল্লাহ উহুদের যুদ্ধের মাধ্যমে মুনাফিকদের চেহারাও প্রকাশ করে দিলেন। মুনাফিকরা বলে, যুদ্ধ করে মৃত্যু ডেকে আনার কী দরকার? আল্লাহ জবাব দিয়েছেন যে মৃত্যুর সময় নির্ধারিত, ঘরে বসে থাকলেও যাদের মৃত্যু হওয়ার তাদের হতোই। উহুদের যুদ্ধ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মিনদের পরীক্ষার একটি মাধ্যম।
“... পরে যখন তোমরা সাহস ও (মনোবল) হারিয়ে ফেললে এবং (আল্লাহর রাসূলের) নির্দেশ সম্পর্কে মতপার্থক্য করলে, এমনকি, আল্লাহর রাসূল যখন তোমাদেরকে সেই ভালোবাসার জিনিস (আসন্ন বিজয়) দেখিয়ে দিলেন, তারপরও তোমরা তাঁর কথা অমান্য করে (তাঁর দেখিয়ে দেওয়া স্থান ছেড়ে) চলে গেলে। তোমাদের মধ্যে কিছু লোক তখন দুনিয়াবি ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর কেউ আখিরাতের কল্যাণ চাইতে থাকল। আল্লাহ এর দ্বারা তোমাদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চাইলেন এবং তোমাদের অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মু'মিনদের ওপর অনুগ্রহশীল।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫২)
হার-জিত সবকিছুর মাধ্যমেই আল্লাহ পরীক্ষা করেন। ইবন ইসহাক বলেন, উহুদের দিন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে কষ্ট ও পরীক্ষার দিন, যেখানে তিনি কিছু মুসলিমকে শহীদের মর্যাদা দান করেন। সেই দিন শত্রুরা রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছতেও সক্ষম হয় এবং তাঁর দাঁত ভেঙে যায় ও মুখে আঘাত লাগে।
📄 ওয়াহাব আল মুযানি ؓ এবং তাঁর ভাতিজা ؓ
ওয়াহাব আল মুযানী ছিলেন একজন রাখাল। তিনি মদীনার স্থানীয় নন, এসেছিলেন মদীনার বাইরে মুযাইনা নামের এক গোত্র থেকে। তাঁর আত্মীয়স্বজনও ছিল রাখাল। রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করার জন্য একদিন তারা সবাই মদীনায় এল। তাদের ভেড়াগুলিও সাথে ছিল। কিন্তু মদীনায় এসে দেখলো সেখানে কেউ নেই! সবাই যুদ্ধ করার জন্য উহুদের ময়দানে গেছে। এ কথা শুনে ওয়াহাব ভেড়ার পাল মদীনাতেই ফেলে রেখে ভাতিজাকে সাথে নিয়ে যুদ্ধের জন্য রওনা দিলেন।
মুসলিমরা তখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তাঁরা পৌঁছেই যুদ্ধে যোগ দিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন খালিদ ইবন ওয়ালিদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন এল ওয়াহাব আল মুযানীর পালা। রাসূলুল্লাহ দেখতে পেলেন যে শত্রুদের একটি দল জড়ো হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি বলে ওঠেন, 'কে আছে এদের বিরুদ্ধে লড়বে?' ওয়াহাব আল মুযানী বলে ওঠেন, 'আমি লড়বো!' এই বলে তিনি এগিয়ে যান, তাদের ওপর ক্রমাগত তীর ছুঁড়ে তাদের পিছু হটিয়ে দেন। শত্রুপক্ষের আরও একটি দল এগিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আছে এদের থামাবে?' 'আমি থামাবো! ইয়া রাসূলুল্লাহ!' বলে আল মুযানী তরবারি নিয়ে এবারো শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন আর পিছু হটতে বাধ্য করেন।
এরপর শত্রুদের বেশ বড়সড় একটি দল এগুতে থাকে। রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন ওয়াহাবের জীবনের শেষ মুহূর্ত চলে এসেছে। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে বললেন, 'এগিয়ে যাও! জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো!' এ কথা শুনে ওয়াহাব আল মুযানী এই বিশাল দলটির সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ তাঁকে এগিয়ে যেতে দেখে বলেন, 'হে আল্লাহ! তাঁর ওপর রহম করো!' ওয়াহাব আল মুযানীর দেহ তরবারির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি লড়াই করতেই থাকেন। তাঁর ভাতিজাও একইভাবে শহীদ হন। যখন তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গেল, তাঁর শরীরে তখন বিশটি মারাত্মক জখমের চিহ্ন!
ওয়াহাব আল-মুযানীর ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে উমার বলেছিলেন, 'এর থেকে চমৎকার মৃত্যু তো আমি কল্পনাও করতে পারি না!' ওয়াহাব আল মুযানীর এই মৃত্যু ছিল উমারের কাছে 'স্বপ্নের মৃত্যু!' তেরো বছর পরের কথা। কাদিসিয়ার যুদ্ধের পর সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাসের সাথে মুযাইনা গোত্রের এক লোকের দেখা হলো। লোকটার নাম বিলাল। তার আত্মীয়রা গনিমতের মালের অংশ পায়নি। কথাপ্রসঙ্গে সাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, তুমি কি ওয়াহাব আল-মুযানীর আত্মীয়?' সে বললো, 'জ্বী, আমি তার ভাতিজা।' সাদ বলে উঠলেন,
'তাই! তোমার চাচার কাহিনী জানো তো? উহুদের দিনে যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো স্বেচ্ছাসেবকের জন্য ডাক দিচ্ছিলেন, প্রতিবারই তোমার চাচা এগিয়ে গিয়ে শত্রুদের হামলা করেন। তৃতীয় বারে আমিও তাঁর সাথে যোগ দিলাম। আশা ছিল যে, তাঁর সমান পুরস্কার যদি পেয়ে যাই! কারণ রাসূলুল্লাহ তখন বলছিলেন, জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমার চাচা শহীদ হয়ে গেলেন, আমিও খুব করে চাচ্ছিলাম তাঁর সাথে শহীদ হই। কিন্তু আমার সময় তখনও আসেনি। আমি ভাবি, ইশ! আমি যদি মুযানীর মতো শহীদ হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম!'
ওয়াহাব আল মুযানীর দাফনের সময় নবীজি আহত-ক্লান্ত-বিধ্বস্ত; তবু তিনি দাফনের পুরোটা সময় জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হও, কারণ আমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট।' জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওয়াহাব আল মুযানী অসীম বীরত্ব আর সাহসিকতার সাথে লড়াই করে গেছেন। ওয়াহাব কিন্তু খুব নামকরা সাহাবি ছিলেন না, কিন্তু তার বীরত্বগাঁথা সাহাবিরা বহুদিন পর্যন্ত স্মরণ করেছেন।
ওয়াহাব আল মুযানী ছিলেন একজন রাখাল। তিনি মদীনার স্থানীয় নন, এসেছিলেন মদীনার বাইরে মুযাইনা নামের এক গোত্র থেকে। তাঁর আত্মীয়স্বজনও ছিল রাখাল। রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করার জন্য একদিন তারা সবাই মদীনায় এল। তাদের ভেড়াগুলিও সাথে ছিল। কিন্তু মদীনায় এসে দেখল সেখানে কেউ নেই! সবাই যুদ্ধ করার জন্য উহুদের ময়দানে গেছে। এ কথা শুনে ওয়াহাব ভেড়ার পাল মদীনাতেই ফেলে রেখে ভাতিজাকে সাথে নিয়ে যুদ্ধের জন্য রওনা দিলেন।
মুসলিমরা তখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তাঁরা পৌঁছেই যুদ্ধে যোগ দিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন খালিদ ইবন ওয়ালিদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন এল ওয়াহাব আল মুযানীর পালা। রাসূলুল্লাহ দেখতে পেলেন যে শত্রুদের একটি দল জড়ো হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি বলে ওঠেন, 'কে আছে এদের বিরুদ্ধে লড়বে?' ওয়াহাব আল মুযানী বলে ওঠেন, 'আমি লড়বো!' এই বলে তিনি এগিয়ে যান, তাদের ওপর ক্রমাগত তীর ছুঁড়ে তাদের পিছু হটিয়ে দেন। শত্রুপক্ষের আরও একটি দল এগিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আছে এদের থামাবে?' 'আমি থামাবো! ইয়া রাসূলুল্লাহ!' বলে আল মুযানী তরবারি নিয়ে এবারো শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন আর পিছু হটতে বাধ্য করেন।
এরপর শত্রুদের বেশ বড়সড় একটি দল এগুতে থাকে। রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন ওয়াহাবের জীবনের শেষ মুহূর্ত চলে এসেছে। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে বললেন, 'এগিয়ে যাও! জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো!' এ কথা শুনে ওয়াহাব আল মুযানী এই বিশাল দলটির সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ তাঁকে এগিয়ে যেতে দেখে বলেন, 'হে আল্লাহ! তাঁর ওপর রহম করো!' ওয়াহাব আল মুযানীর দেহ তরবারির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি লড়াই করতেই থাকেন। তাঁর ভাতিজাও একইভাবে শহীদ হন। যখন তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গেল, তাঁর শরীরে তখন বিশটি মারাত্মক জখমের চিহ্ন!
ওয়াহাব আল-মুযানীর ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে উমার বলেছিলেন, 'এর থেকে চমৎকার মৃত্যু তো আমি কল্পনাও করতে পারি না!' ওয়াহাব আল মুযানীর এই মৃত্যু ছিল উমারের কাছে 'স্বপ্নের মৃত্যু!' তেরো বছর পরের কথা। কাদিসিয়ার যুদ্ধের পর সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাসের সাথে মুযাইনা গোত্রের এক লোকের দেখা হল। লোকটার নাম বিলাল। তার আত্মীয়রা গনিমতের মালের অংশ পায়নি। কথাপ্রসঙ্গে সাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, তুমি কি ওয়াহাব আল-মুযানীর আত্মীয়?' সে বলল, 'জ্বী, আমি তার ভাতিজা।' সাদ বলে উঠলেন,
'তাই! তোমার চাচার কাহিনী জানো তো? উহুদের দিনে যখনই রাসূলুল্লাহ কোনো স্বেচ্ছাসেবকের জন্য ডাক দিচ্ছিলেন, প্রতিবারই তোমার চাচা এগিয়ে গিয়ে শত্রুদের হামলা করেন। তৃতীয় বারে আমিও তাঁর সাথে যোগ দিলাম। আশা ছিল যে, তাঁর সমান পুরস্কার যদি পেয়ে যাই! কারণ রাসূলুল্লাহকে তখন বলছিলেন, জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমার চাচা শহীদ হয়ে গেলেন, আমিও খুব করে চাচ্ছিলাম তাঁর সাথে শহীদ হই। কিন্তু আমার সময় তখনও আসেনি। আমি ভাবি, ইশ! আমি যদি মুযানীর মতো শহীদ হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম!'
ওয়াহাব আল মুযানীর দাফনের সময় নবীজি আহত-ক্লান্ত-বিধ্বস্ত; তবু তিনি দাফনের পুরোটা সময় জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হও, কারণ আমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট।' জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওয়াহাব আল মুযানী অসীম বীরত্ব আর সাহসিকতার সাথে লড়াই করে গেছেন। ওয়াহাব কিন্তু খুব নামকরা সাহাবি ছিলেন না, কিন্তু তার বীরত্বগাঁথা সাহাবিরা বহু দিন পর্যন্ত স্মরণ করেছেন।
📄 আমর ইবন আল জামুহ ؓ
আমর ইবন আল জামূহ ছিলেন খোঁড়া। তাঁর ছিল চার ছেলে। প্রত্যেকেই সাহসী যোদ্ধা। উহুদের যুদ্ধের সময় এলে আমর জিহাদে যোগ দিতে চান কিন্তু ছেলেরা বাধ সাধে। তাদের যুক্তি, আমরের জন্য জিহাদে যাওয়া ফরয নয়। আমর তখন রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে অনুরোধ জানান, 'আমার ছেলেরা চায় না আমি আপনার সাথে জিহাদে যাই। কিন্তু আল্লাহর শপথ, আমার এই খোঁড়া পা আমি জান্নাতে ফেলতে চাই।' রাসূলুল্লাহ তাঁর ছেলেদের ডেকে বললেন,
'তোমাদের বাবা যদি জিহাদে যেতে চায়, যেতে দাও। তাকে বাধা দেওয়া তোমাদের দায়িত্ব নয়। হয়তোবা আল্লাহ তাআলা তাকে শাহাদাহ দান করবেন।' আমর যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি পেলেন। শাহাদাতের স্বপ্নে বিভোর আমর রাসূলুল্লাহর কাছে এসে এক ফাঁকে জানতে চাইলেন,
- আচ্ছা রাসূলুল্লাহ, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় মারা যাই, তাহলে আমি জান্নাতে সুস্থ-সবল পা নিয়ে হাঁটতে পারবো তো?
- অবশ্যই পারবে!
আমর ইবন আল জামূহ শহীদ হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেন। একজন অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তির জন্য কিতালে যাওয়া আবশ্যক না হলেও অনুমোদিত। তবে প্রতিটি ঘটনার অসাধারণ দিকটি হলো সাহাবিদের মাঝে শহীদ হিসেবে মারা যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা, অধীর আগ্রহ আর অদম্য স্পৃহা।
আমর ইবন আল জামূহ ছিলেন খোঁড়া। তাঁর ছিল চার ছেলে। প্রত্যেকেই সাহসী যোদ্ধা। উহুদের যুদ্ধের সময় এলে আমর জিহাদে যোগ দিতে চান কিন্তু ছেলেরা বাধ সাধে। তাদের যুক্তি, আমরের জন্য জিহাদে যাওয়া ফরয নয়। আমর তখন রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে অনুরোধ জানান, 'আমার ছেলেরা চায় না আমি আপনার সাথে জিহাদে যাই। কিন্তু আল্লাহর শপথ, আমার এই খোঁড়া পা আমি জান্নাতে ফেলতে চাই।' রাসূলুল্লাহ তাঁর ছেলেদের ডেকে বললেন,
'তোমাদের বাবা যদি জিহাদে যেতে চায়, যেতে দাও। তাকে বাধা দেওয়া তোমাদের দায়িত্ব নয়। হয়তোবা আল্লাহ তাআলা তাকে শাহাদাহ দান করবেন।' আমর যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি পেলেন। শাহাদাতের স্বপ্নে বিভোর আমর রাসূলুল্লাহর কাছে এসে এক ফাঁকে জানতে চাইলেন,
- আচ্ছা রাসূলুল্লাহ, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় মারা যাই, তাহলে আমি জান্নাতে সুস্থ-সবল পা নিয়ে হাঁটতে পারবো তো?
- অবশ্যই পারবে!
আমর ইবন আল জামূহ শহীদ হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেন। একজন অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তির জন্য কিতালে যাওয়া আবশ্যক না হলেও অনুমোদিত। তবে প্রতিটি ঘটনার অসাধারণ দিকটি হল সাহাবিদের মাঝে শহীদ হিসেবে মারা যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা, অধীর আগ্রহ আর অদম্য স্পৃহা।
📄 হানযালা ইবন আবি আমীর ؓ: ফেরেশতারা গোসল দিল যাকে
আনসারী সাহাবি হানযালা, উহুদের যুদ্ধের আগের রাতেই তাঁর বিয়ে হয়। যুদ্ধের সময়টাতে সাধারণত মুজাহিদরা ক্যাম্পে অবস্থান করেন। কিন্তু হানযালা রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে অনুমতি চাইলেন স্ত্রীর সাথে রাত কাটাবার। রাসূলুল্লাহ অনুমতি দিলেন। হানযালা রাতে স্ত্রীর সাথে থাকলেন। ভোরে ফিরে এসে সাহাবিদের সাথে ফজরের সালাহ আদায় করলেন। এরপর স্ত্রীর জামিলাহর কাছে ফিরে এলেন বিদায় নিতে। কিন্তু জামিলাহ তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন, তাঁরা মিলিত হলেন।
এদিকে বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই ফরয গোসল না করেই হানযালা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দুঃসাহসী হানযালা ঘোড়ার পিঠে বসে শত্রুপক্ষের নেতা আবু সুফিয়ানকে টার্গেট করলেন। হানযালা এগিয়ে গিয়ে আবু সুফিয়ানের ঘোড়াকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। আবু সুফিয়ান ঘোড়া থেকে পড়ে চিৎকার করে উঠলো। হানযালা আবু সুফিয়ানকে শেষ করে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই এক মুশরিক এসে পড়লো। সে হানযালাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো। তাঁর বুক ভেদ করে বর্শা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু হানযালা থামবার পাত্র নন। তিনি আবু সুফিয়ানকে আবার আঘাত করতে উদ্যত হলেন। সেই মুশরিক তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করলো। হানযালা শহীদ হলেন।
হানযালাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখেন! তিনি বলেন, 'আমি হানযালাকে দেখেছি ঠিক আসমান আর জমিনের মাঝে। ফেরেশতারা তাকে জান্নাতী রুপার পাত্রে রাখা আল-মুযনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছে!' রাসূলুল্লাহ হানযালার খবর নিতে তার স্ত্রী জামিলাহর কাছে লোক পাঠালেন। জামিলাহ ছিলেন মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মেয়ে। কিন্তু তিনি বাবার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুত্তাক্বী মুসলিমাহ। লোকেরা জামিলার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'যাবার আগে তিনি গোসল করার সময় পাননি, যুনুব (অপবিত্র) অবস্থাতেই তিনি চলে যান।' রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এজন্যই তাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়ে দিচ্ছিল!'
আরও একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটে। জামিলাহ যখন হানযালার সাথে থেকেছিলেন, তিনি চারজন সাক্ষী ডেকে বিষয়টা জানান। এ অদ্ভুত কাজটা তিনি কেন করলেন? সাধারণত স্বামী বা স্ত্রীর একান্ত গোপন কথা অন্যদের জানবার কথা নয়। জামিলাহ বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আকাশ খুলে গেল আর তার ভেতর দিয়ে হানযালা চলে গেলেন, এরপর আকাশ আবার বন্ধ হয়ে গেল। তাই আমার মনে হলো যে হানযালা শহীদ হয়ে যাবেন।' স্বামী পরদিন মারা যাবে জানলে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক না করাটাই 'স্বাভাবিক'। কারণ তাহলে সে নারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা সহজ হবে। কিন্তু কীসের আশায় জামিলাহ জেনে শুনে স্বামীর সাথে মিলিত হলেন? কেন সবাইকে বিষয়টা জানালেন? কেন তিনি সেই পুরুষের সন্তান চাইলেন যে কিনা পরদিনই শহীদ হয়ে যাবে?
আসলে সাহাবিদের মানসিকতা আমাদের মতো ছিল না। তাঁরা দুনিয়াকে অন্যভাবে দেখতেন, তাঁরা দুনিয়াকে দেখতেন ওয়াহীর আলো দিয়ে। হানযালা শহীদ হবেন-এটি জেনেশুনেই জামিলাহ তাঁর সন্তান গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন। জামিলাহর জন্য এটাই ছিল আনন্দের ব্যাপার যে তাঁর স্বামী হবে একজন শহীদ! হয়তো তাঁর জন্য পৃথিবীটা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো কষ্ট আর দুর্দশা তাঁর ওপর চেপে বসবে, কিন্তু শহীদের স্ত্রী হবার মধ্যে যে মর্যাদা আছে, সে মর্যাদা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি জামিলাহ। তিনি যা-ই করেছেন, আল্লাহর জন্য করেছেন। আর আল্লাহ তাআলাই তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন।
জামিলার সাথে এরপর সাবিত ইবন কাইসের বিয়ে হয়। জামিলার গর্ভে জন্ম নেওয়া হানযালার সন্তানের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আর সাবিতের সংসারে জন্ম নেয় মুহাম্মাদ। এই মুহাম্মাদই ছিল আবদুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। বাবা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ঠিকই তার সৎ বাবা ও ভাইয়ের থেকে আদর-স্নেহ-মমতা পেয়েছিল, ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। নিশ্চয়ই তাকওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ উত্তম কিছুই দান করবেন।
আল্লাহ তাআলার প্রতি সাহাবিদের ভালবাসার আরেকটি নিদর্শন এই ঘটনা। সদ্যবিবাহিত হানযালা গোসল না করে ময়দানে ছুটে যান। পদাতিক সৈন্য হয়েও তিনি পাল্লা দেন ঘোড়সওয়ারির সাথে। যেসব ভাই ও বোনেরা বিয়ে করেছেন, তারা জানেন বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে দুনিয়ার প্রতি কী প্রবল মায়া কাজ করে! সেই তীব্র বন্ধন উপেক্ষা করে ময়দানে যুদ্ধ যাওয়া কতই না কঠিন! আর সেটাই করেছিলেন হানযালা, আর তাই 'ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে!'
আনসারী সাহাবি হানযালা, উহুদের যুদ্ধের আগের রাতেই তাঁর বিয়ে হয়। যুদ্ধের সময়টাতে সাধারণত মুজাহিদরা ক্যাম্পে অবস্থান করেন। কিন্তু হানযালা রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে অনুমতি চাইলেন স্ত্রীর সাথে রাত কাটাবার। রাসূলুল্লাহ অনুমতি দিলেন। হানযালা রাতে স্ত্রীর সাথে থাকলেন। ভোরে ফিরে এসে সাহাবিদের সাথে ফজরের সালাহ আদায় করলেন। এরপর স্ত্রীর জামিলাহর কাছে ফিরে এলেন বিদায় নিতে। কিন্তু জামিলাহ তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন, তাঁরা মিলিত হলেন।
এদিকে বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই ফরয গোসল না করেই হানযালা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দুঃসাহসী হানযালা ঘোড়ার পিঠে বসে শত্রুপক্ষের নেতা আবু সুফিয়ানকে টার্গেট করলেন। হানযালা এগিয়ে গিয়ে আবু সুফিয়ানের ঘোড়াকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। আবু সুফিয়ান ঘোড়া থেকে পড়ে চিৎকার করে উঠল। হানযালা আবু সুফিয়ানকে শেষ করে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই এক মুশরিক এসে পড়ল। সে হানযালাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করল। তাঁর বুক ভেদ করে বর্শা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু হানযালা থামবার পাত্র নন। তিনি আবু সুফিয়ানকে আবার আঘাত করতে উদ্যত হলেন। সেই মুশরিক তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করল। হানযালা শহীদ হলেন।
হানযালাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখেন! তিনি বলেন, 'আমি হানযালাকে দেখেছি ঠিক আসমান আর জমিনের মাঝে। ফেরেশতারা তাকে জান্নাতী রুপার পাত্রে রাখা আল-মুযনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছে!' রাসূলুল্লাহ হানযালার খবর নিতে তার স্ত্রী জামিলাহর কাছে লোক পাঠালেন। জামিলাহ ছিলেন মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মেয়ে। কিন্তু তিনি বাবার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুত্তাক্বী মুসলিমাহ। লোকেরা জামিলার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'যাবার আগে তিনি গোসল করার সময় পাননি, যুনুব (অপবিত্র) অবস্থাতেই তিনি চলে যান।' রাসূলুল্লাহ শুনে বললেন, 'এজন্যই তাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়ে দিচ্ছিল!'
আরও একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটে। জামিলাহ যখন হানযালার সাথে থেকেছিলেন, তিনি চারজন সাক্ষী ডেকে বিষয়টা জানান। এ অদ্ভুত কাজটা তিনি কেন করলেন? সাধারণত স্বামী বা স্ত্রীর একান্ত গোপন কথা অন্যদের জানবার কথা নয়। জামিলাহ বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আকাশ খুলে গেল আর তার ভেতর দিয়ে হানযালা চলে গেলেন, এরপর আকাশ আবার বন্ধ হয়ে গেল। তাই আমার মনে হল যে হানযালা শহীদ হয়ে যাবেন।' স্বামী পরদিন মারা যাবে জানলে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক না করাটাই 'স্বাভাবিক'। কারণ তাহলে সে নারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা সহজ হবে। কিন্তু কীসের আশায় জামিলাহ জেনে শুনে স্বামীর সাথে মিলিত হলেন? কেন সবাইকে বিষয়টা জানালেন? কেন তিনি সেই পুরুষের সন্তান চাইলেন যে কিনা পরদিনই শহীদ হয়ে যাবে?
আসলে সাহাবিদের মানসিকতা আমাদের মতো ছিল না। তাঁরা দুনিয়াকে অন্যভাবে দেখতেন, তাঁরা দুনিয়াকে দেখতেন ওয়াহীর আলো দিয়ে। হানযালা শহীদ হবেন-এরা জেনেশুনেই জামিলাহ তাঁর সন্তান গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন। জামিলাহর জন্য এটাই ছিল আনন্দের ব্যাপার যে তাঁর স্বামী হবে একজন শহীদ! হয়তো তাঁর জন্য পৃথিবীটা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো কষ্ট আর দুর্দশা তাঁর ওপর চেপে বসবে, কিন্তু শহীদের স্ত্রী হবার মধ্যে যে মর্যাদা আছে, সে মর্যাদা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি জামিলাহ। তিনি যা-ই করেছেন, আল্লাহর জন্য করেছেন। আর আল্লাহ তাআলাই তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন।
জামিলার সাথে এরপর সাবিত ইবন কাইসের বিয়ে হয়। জামিলার গর্ভে জন্ম নেওয়া হানযালার সন্তানের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আর সাবিতের সংসারে জন্ম নেয় মুহাম্মাদ। এই মুহাম্মাদই ছিল আবদুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। বাবা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ঠিকই তার সৎ বাবা ও ভাইয়ের থেকে আদর-স্নেহ-মমতা পেয়েছিল, ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। নিশ্চয়ই তাকওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ উত্তম কিছুই দান করবেন।
আল্লাহ তাআলার প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসার আরেকটি নিদর্শন এই ঘটনা। সদ্যবিবাহিত হানযালা গোসল না করে ময়দানে ছুটে যান। পদাতিক সৈন্য হয়েও তিনি পাল্লা দেন ঘোড়সওয়ারির সাথে। যেসব ভাই ও বোনেরা বিয়ে করেছেন, তারা জানেন বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে দুনিয়ার প্রতি কী প্রবল মায়া কাজ করে! সেই তীব্র বন্ধন উপেক্ষা করে ময়দানে যুদ্ধ যাওয়া কতই না কঠিন! আর সেটাই করেছিলেন হানযালা, আর তাই 'ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে!'