📄 হঠাৎ বিপর্যয়
মুসলিম বাহিনীর হামলায় কুরাইশরা বিপর্যস্ত হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যেতে থাকে। মুসলিম শিবিরে তখন বিজয়ের সুবাস। কিন্তু যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল কুরাইশরা আর প্রতিরোধ বা পাল্টা আক্রমণ গড়তে সক্ষম হবে না। আর সেটা ভেবেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন ক'জন সাহাবি।
সেই সাহাবিরা ছিলেন তীরন্দাজ বাহিনী। তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ পাহাড়ের ওপর থাকতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। যখন তীরন্দাজ সাহাবিরা দেখলেন মুসলিমরা গনিমতের মাল সংগ্রহ করছে, তখন তাঁদেরও ইচ্ছে হলো নিচে নেমে সবার সাথে এই কাজে যোগ দিতে। সম্ভবত যুদ্ধের উদ্দীপনায় তাঁরা আবেগী হয়ে পড়েছিলেন আর দায়িত্বকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আমীর আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর উত্তেজনায় গা ভাসাননি। তিনি বললেন, 'তোমরা কি আল্লাহর রাসূলের আদেশ ভুলে গেছো? তোমাদের কি মনে নেই যে তাঁর নির্দেশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের নিচে যাওয়া ঠিক হবে না?' কিন্তু তাঁরা বললো, 'যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে।' এই বলে পঞ্চাশ জনের মাঝে চল্লিশ জনই রাসূলুল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করে চলে যায়।
শত্রুদের ক্যাম্পে একজন তখনো যুদ্ধে অংশ নেন নেননি। তিনি হলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন কুরাইশদের অশ্ববাহিনীর প্রধান। মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী পাহাড় থেকে নেমে যাওয়া মাত্র, তিনি আর আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা মুসলিম বাহিনীর দুর্বল অবস্থানটি লক্ষ করলেন। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তাঁরা এতটুকু দেরি করলেন না। তাঁরা তাঁদের একশো থেকে দেড়শো সৈন্যের অশ্ব বাহিনীকে আইনান পাহাড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে নিলেন আর আচমকাই মুসলিমদেরকে পেছন থেকে আক্রমণ করে বসলেন। আচমকা আক্রমণে মুসলিম বাহিনী হতভম্ব হয়ে পড়ে। কুরাইশদের মূল সেনাদল এ দৃশ্য দেখে সাহস ফিরে পায়। তারা পালানো ফেলে এবার সামনের দিক থেকে মুসলিমদেরকে আক্রমণ করা শুরু করে। দু'দিক থেকে হামলা আসায় মুসলিম বাহিনী তাল হারিয়ে ফেলে।
খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাঁর বাহিনীকে নিয়ে এমন দিক থেকে হামলা চালান যে মুসলিম বাহিনী কার্যত দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগ ছিল তাঁর বাম পাশে। এরা গনিমাহ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল। আর ডান পাশে ছিল রাসূলুল্লাহর ক্যাম্প। আকস্মিক আক্রমণে মুসলিম মুজাহিদদের সারি ভেঙে যায়। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এটা ছিল একটা ছোটখাটো হত্যাযজ্ঞ। দিশেহারা হয়ে বন্ধু-শত্রুকে চিহ্নিত করতেও ভুল হয়ে যায়, নিজেরাই নিজের দলের লোককে মেরে ফেলে। এরকমই একটি আত্মঘাতী আক্রমণে মারা যান হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামানের বাবা ইয়ামান। ওদিকে মুশরিকরা মুসলিম বাহিনীর ভেতরে ঢুকে পড়ে সমানে হত্যা করতে থাকে।
কুরাইশদের উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা। হামলার এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহর ক্যাম্পের খুব কাছাকাছি চলে আসে। রাসূলুল্লাহকে ঘিরে তখন মাত্র নয়জন সাহাবি। এটা ছিল রাসূলুল্লাহর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের একটি। তিনি কী করবেন এখন? নয়জন সাহাবিকে সাথে নিয়ে নিরাপদ দুরত্বে চলে গিয়ে নিজের জীবন বাঁচাবেন? নাকি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ডাক দেবেন? যদি তিনি নিজের জান বাঁচান, তাহলে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ মুসলিমদের হত্যা করে শেষ করে ফেলবে। আর যদি তিনি ডাক দেন, তাহলে একটা প্রতিরোধ গড়ার সম্ভাবনা থাকলেও শত্রুরা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে তাঁর অবস্থান জেনে যাবে আর তাঁর ওপর হামলা চালাবে। কী করবেন তিনি?
রাসূলুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও মুসলিমদের ময়দানে ফিরিয়ে আনবেন। তিনি ডেকে উঠলেন, 'আল্লাহর বান্দারা! তোমরা এগিয়ে আসো!' আর যা হওয়ার তাই হলো, সেই ডাক শুনে ফেলে কুরাইশ বাহিনীও। কাফিরদের একটি দল রাসূলুল্লাহর অবস্থান আন্দাজ করে মুসলিমরা এগিয়ে আসার আগেই সেদিকে হামলা চালিয়ে বসলো।
রাসূলুল্লাহর জীবনে এতটা অনিশ্চয়তাঘেরা, এতটা সংকটাচ্ছন্ন, এতটা বিপদগ্রস্ত মুহূর্ত আর কখনো আসেনি। তাইফের লোকেরা তাঁকে পাথর ছুঁড়ে তাড়া করেছিল, কিন্তু তাঁকে হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। হিজরতের রাতে কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু এতটা কাছাকাছি আর কখনো আসতে পারেনি। হিজরতের সময় সুরাকা ইবন মালিক রাসূলুল্লাহকে বন্দী করতে চেয়েছিল। কিন্তু উহুদের ময়দানে কুরাইশরা মরিয়া হয়ে চাইছিল যেকোনো মূল্যে রাসূলুল্লাহকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে।
সেই প্রচেষ্টায় উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহর গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারে। সেই ধাক্কায় রাসূলুল্লাহ মাটিতে পড়ে যান। তাঁর ঠোঁট কেটে যায়। দ্বিতীয় মারাত্মক আঘাতটিও হানে উতবা। এই আঘাতটি ছিল একটি তীরের আঘাত। রাসূলুল্লাহর বর্মকে টার্গেট করে। এই আঘাতে রাসূলুল্লাহর দাঁত ভেঙে যায়। আর তৃতীয় আরেকটি আঘাত হানে ইবন কামিয়াহ। সে ঘোড়ায় চড়ে এসে তরবারি দিয়ে রাসূলুল্লাহর মুখে আঘাত করার চেষ্টা করে। তালহা তাঁর ঢাল দিয়ে সেই আঘাতকে রুখে দিতে চাইলেন, কিন্তু পুরোপুরি পারলেন না, রাসূলুল্লাহর শিরস্ত্রাণে ইবন কামিয়ার তরবারি আঘাত করে। রাসূলুল্লাহ যেভাবে করে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে সাহাবিদের বাঁচানোর জন্য আহবান করেছিলেন, সেভাবে করে সাহাবিরা এবার নিজের জীবন বিপন্ন করে এগিয়ে এলেন রাসূলুল্লাহকে বাঁচানোর জন্য।
মুসলিম বাহিনীর হামলায় কুরাইশরা বিপর্যস্ত হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যেতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল কুরাইশরা আর প্রতিরোধ গড়তে পারবে না। আর সেটা ভেবেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন তীরন্দাজ সাহাবিরা। তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ পাহাড়ের ওপর থাকতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। যখন তীরন্দাজ সাহাবিরা দেখলেন মুসলিমরা গনিমতের মাল সংগ্রহ করছে, তখন তাঁদেরও ইচ্ছে হলো নিচে নেমে যোগ দিতে। আমীর আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর তাঁদের মনে করিয়ে দিলেন রাসূলুল্লাহর নির্দেশের কথা, কিন্তু পঞ্চাশ জনের মাঝে চল্লিশ জনই নির্দেশ উপেক্ষা করে চলে যায়।
শত্রুদের ক্যাম্পে খালিদ ইবন ওয়ালিদ এবং ইকরিমা ইবন আবু জাহল মুসলিম বাহিনীর এই দুর্বল অবস্থানটি লক্ষ করলেন। তাঁরা তাঁদের অশ্ব বাহিনীকে আইনান পাহাড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে নিলেন আর আচমকাই মুসলিমদেরকে পেছন থেকে আক্রমণ করে বসলেন। কুরাইশদের মূল সেনাদল এ দৃশ্য দেখে পালানো ফেলে এবার সামনের দিক থেকে আক্রমণ করা শুরু করে। মুসলিম বাহিনী তাল হারিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দিশেহারা হয়ে বন্ধু-শত্রুকে চিহ্নিত করতেও ভুল হয়ে যায়, নিজেই নিজের দলের লোককে মেরে ফেলে। কুরাইশদের উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা। হামলার এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহর ক্যাম্পের খুব কাছাকাছি চলে আসে। রাসূলুল্লাহকে ঘিরে তখন মাত্র নয়জন সাহাবি। রাসূলুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও মুসলিমদের ময়দানে ফিরিয়ে আনবেন। তিনি ডেকে উঠলেন, 'আল্লাহর বান্দারা! তোমরা এগিয়ে আসো!' সেই ডাক শুনে ফেলে কুরাইশ বাহিনীও এবং সেদিকে হামলা চালিয়ে বসল।
মরিয়া কুরাইশরা চাইছিল রাসূলুল্লাহকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে। উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহর গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারে, এতে তাঁর ঠোঁট কেটে যায়। দ্বিতীয় মারাত্মক তীরের আঘাতে রাসূলুল্লাহর দাঁত ভেঙে যায়। তৃতীয় আরেকটি আঘাকে ইবন কামিয়াহ ঘোড়ায় চড়ে এসে তলোয়ার দিয়ে রাসূলুল্লাহর মুখে আঘাত করার চেষ্টা করে। তালহা তাঁর ঢাল দিয়ে সেই আঘাতকে রুখে দিতে চাইলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহর শিরস্ত্রাণে ইবন কামিয়ার তলোয়ার আঘাত করে।
📄 পাহাড়সম দৃঢ়তা!
কুরাইশদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। তারা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। মুসআবকে কাফিররা ঘিরে রেখেছে, আর মুসআব দেখলেন রাসূলুল্লাহকে কাফিররা ঘিরে রেখেছে। সংকটের সেই মুহূর্তে, বিপদের সেই ঘনঘটায়, মুসআব বলে উঠলেন,
'আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান, অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে কি পশ্চাদপসরণ করবে?'
এটাই তো ঈমান! মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মুসআবের বলা এই কথাগুলো আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নাযিল করেছেন।
"আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল! তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪৪)
মুসআব ইবন উমায়ের এই কথাগুলো বলার পর ইবন কামিয়াহ মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। মুসআব ছিলেন এই যুদ্ধের পতাকাবাহী। শত্রুরা তার ডান হাত কেটে ফেলে, তিনি বাম হাতে পতাকা জড়িয়ে ধরেন! শত্রুরা তার বাম হাতও কেটে ফেলে, এরপর দুই হাতের কাটা অংশ নিয়ে তিনি পতাকা জড়িয়ে ধরেন আর সেই অবস্থায় শহীদ হয়ে যান।
মুসআব ইবন উমায়েরের অবয়ব ছিল কিছুটা রাসূলুল্লাহর মতো। মুসআবের মৃত্যুর পর হঠাৎ গুজব রটলো -- রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন! মুসলিমরা একটা বড় ধাক্কা খেল। কেন লড়ছেন তারা? কীসের জন্য লড়ছেন? কার জন্য লড়ছেন?
এই ধাক্কা সইতে না পেরে মুসলিমদের এক দল মনোবল হারিয়ে হাত থেকে অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে মদীনার দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ পালিয়ে উহুদ পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। কেউ ভাবলো যুদ্ধ করে কী হবে, তার চাইতে বরং আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে ফিরে যাই। সে একটা সন্ধি করে আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুক।
কিন্তু একদল মুসলিম ব্যতিক্রম। তাঁরা ছিলেন অপরাজেয়। তারা ছিলেন হার-না-মানা মানুষ। তাঁদের ছিল সামর্থ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর গুজবে তাঁরা এতটুকু দমলেন না, দ্বিগুণ উৎসাহে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন শহীদ হবার আশায়। এমনই একজন ছিলেন আনাস ইবন নযর।
আনাস ইবন নযর অনেকদিন ধরেই বদরের যুদ্ধে অংশ নিতে না পারার যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি শুধু এতটুকুই বলেছিলেন, 'আল্লাহ যদি আর একটা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন তাহলে তিনি দেখবেন আমি কী করি!'। তিনি তাঁর কথা রাখলেন। উহুদের যুদ্ধে যখন সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-অধিক পালিয়ে যাচ্ছে, তিনি তখন এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, আজ তাঁর দিন! আজ তাঁর দেখানোর পালা! অস্ত্র রেখে পালিয়ে যাওয়া কিছু মুসলিমকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছো তোমরা?' তারা উত্তর দিল, 'মুহাম্মাদের মৃত্যু হয়েছে।' তিনি বললেন, 'তোমরা জেনে রাখো, মুহাম্মাদ যদি মারাও যান, তাঁর রবের মৃত্যু হয়নি। যে কারণে মুহাম্মাদ মারা গেছেন, তোমরাও সে কারণে মরে যাও!'
সাদ ইবন মুয়াজকে বললেন, 'সাদ! আমি তো উহুদের পাদদেশে জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি!' এই বলে অদম্য আনাস ছুটে গেলেন ময়দানে। ঢুকে পড়লেন শত্রুদের মাঝে। দুর্দান্তভাবে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন প্রবল সাহাসিকতার সাথে। তাঁর কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করলেন, তরবারি চালিয়ে গেলেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত।
যুদ্ধ শেষে একটি মৃতদেহ পড়ে ছিল ময়দানে। শরীরে ছিল আশিটি আঘাতের চিহ্ন, দেখে বোঝা যাচ্ছিল না এটা কার লাশ। এক মুসলিম নারী এলেন, লাশের শরীর দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না এত আঘাত পুরো দেহে। একটা আঙুল দেখে সনাক্ত করে বললেন, এটা তাঁর ভাই, আনাস ইবন নযরের লাশ। এই ছিলেন আনাস ইবন নযর, আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন,
"মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনোই পরিবর্তন করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)
এমন আরেক সাহাবি ছিলেন সাবিত ইবন দাহদাহ। তিনি বলে উঠলেন, 'নবীজিকে যদি হত্যা করা হয়েও থাকে, আল্লাহ তো জীবিত রয়েছেন! তিনি তো চিরঞ্জীব! কাজেই তোমরা দ্বীনের জন্য লড়ে যাও, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন, তোমাদের বিজয় দেবেন!'
অপরাজেয় সাহাবিদের একজন ছিলেন আনসারী। তাঁর নাম আমরা জানি না। এক মুহাজির সাহাবির ভাষায়, 'আমরা এক আনসারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তার সারা গা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তাকে বললাম, তুমি কি জানো মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে? সে বললো, ঠিক আছে, যদি মুহাম্মাদকে হত্যা করে হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর দ্বীন-প্রচারের মিশন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে! সুতরাং তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও দ্বীনের জন্য। তাঁর মতো করেই মৃত্যুর স্বাদ নিই, ইসলামের জন্য লড়াই করে শহীদ হয়ে যাই।'
এই সাহাবিরা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি যেতে সক্ষম হলেন। ইতিমধ্যে খবর এল, রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর খবরটি একটি গুজব। তখন মুসলিমরা আরও সাহস ফিরে পেলেন। মুসলিম বাহিনীর মাঝে শৃঙ্খলা ফিরে এল。
টিকাঃ
11 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২২।
কুরাইশদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। সংকটের সেই মুহূর্তে মুসআব বলে উঠলেন, 'আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান, অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে কি পশ্চাদপসরণ করবে?' এই কথাগুলো আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নাযিল করেছেন: "আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল! তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪৪)
মুসআব ছিলেন এই যুদ্ধের পতাকাবাহী। শত্রুরা তার ডান হাত কেটে ফেললে তিনি বাম হাতে পতাকা ধরেন, বাম হাতও কেটে ফেললে দুই হাতের কাটা অংশ নিয়ে পতাকা জড়িয়ে ধরেন এবং শহীদ হয়ে যান। মুসআবের মৃত্যুর পর গুজব রটল রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন! মুসলিমদের এক দল মনোবল হারিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একদল মুসলিম ছিল অপরাজেয়। তেমনই একজন ছিলেন আনাস ইবন নযর। তিনি পালিয়ে যাওয়া কিছু মুসলিমকে বললেন, 'মুহাম্মাদ যদি মারাও যান, তাঁর রবের মৃত্যু হয়নি। যে কারণে মুহাম্মাদ মারা গেছেন, তোমরাও সে কারণে মরে যাও!' তিনি সাদ ইবন মুয়াজকে বললেন, 'সাদ! আমি তো উহুদের পাদদেশে জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি!' ময়দানে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে তিনি শহীদ হলেন। শরীরে ছিল আশিটি আঘাতের চিহ্ন। আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন: "মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনোই পরিবর্তন করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)
সাবিত ইবন দাহদাহ এবং এক নাম-না-জানা আনসারী সাহাবিও একই রকম দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন। তাঁরা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করলেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য। এই সাহাবিরা শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি যেতে সক্ষম হলেন। ইতিমধ্যে খবর এল, রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর খবরটি একটি গুজব। তখন মুসলিম বাহিনীর মাঝে শৃঙ্খলা ফিরে এল।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২২।
📄 রাসূলুল্লাহকে ﷽ ঘিরে সাহসী সাহাবিরা
রাসূলুল্লাহর ওপর যখন কাফিররা হামলা চালালো, তখন তিনি বলে উঠলেন, 'যে আজ শত্রুদের রুখে দিতে পারবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে!' এই আহবান শুনে এগিয়ে গেলেন এক আনসার। শত্রুদের দিকে তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। এরপর এলেন আরও একজন আনসার, তিনিও শহীদ হলেন। এরপর আরও একজন, এভাবে সাত সাতজন আনসার সাহাবি রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে বীরের মতো লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন।
আল্লাহু আকবার! এ কারণেই তাঁরা "আনসার”। আনসার মানে সাহায্যকারী। আনসাররা তাঁদের নামের প্রতি সুবিচার করেছিলেন। এ মর্যাদাময় খেতাব তাঁরা কিনেছিলেন জান, মাল ও রক্তের বিনিময়ে। সাত-সাত জন আনসার যুবাপুরুষ এক এক করে রাসূলুল্লাহর পায়ের কাছে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে এই ছিল তাঁদের আত্মত্যাগের নমুনা।
সাতজন সাহাবি শহীদ হয়ে যাবার পর রাসূলুল্লাহর সাথে ছিলেন আর মাত্র দু'জন—তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ এবং সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস। রাসূলুল্লাহকে আঘাত করেছিল উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস। আর রাসূলুল্লাহর প্রতিরক্ষায় দাঁড়িয়ে গেলেন তারই আপন ভাই সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস! তীরের পর তীর ছুঁড়তে থাকেন শত্রুদের লক্ষ্য করে। আলী ইবন আবি তালিব বলেন, 'আমি কখনো রাসূলুল্লাহকে তাঁর বাবা-মা উভয়ের নামে শপথ করতে শুনিনি। একমাত্র সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাসকে তিনি এমনটা বলেছিলেন। উহুদের ময়দানে আল্লাহর রাসূল বলে ওঠেন, 'তীর ছোঁড়ো, সাদ! আমার বাবা-মা তোমার জন্য কুরবান হোক!' সা'দ আল্লাহর রাসূলকে রক্ষা করেছিলেন আর সা'দকে রাসূলুল্লাহ এমন এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন যা আবু বকর আর উমারও লাভ করেননি।
তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ। অসাধারণ বীরত্ব দেখে রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তালহা তো জান্নাতের জন্য নিজেকে যোগ্য করে নিয়েছে!' তালহা সেদিন যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তা আর কোনো সাহাবি দেখাননি। রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে গিয়ে তরবারির আঘাতে তালহার কিছু আঙুল কাটা পড়ে। উহুদের সেই দিনে তালহা নিজের গায়ে অন্তত ৩৫টি আঘাত সয়ে নেন। শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহকে বাঁচানোর জন্য! তাঁর ডান হাত তীরের আঘাতে অবশ হয়ে যায়। তালহার সম্মানে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, 'যদি কেউ জমিনের বুকে কোনো জীবিত শহীদকে চলাফেরা করা অবস্থায় দেখতে চায়, সে যেন তালহাকে দেখে নেয়!'
আরেকজন বীরসেনা ছিলেন আনসারী সাহাবি আবু তালহা। রাসূলুল্লাহর একেবারে সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান আর সমানে তীর ছুঁড়তে থাকেন। নবীজি নিজেকে আবু তালহার পেছনে আড়াল করে রাখেন। আবু তালহা একটি একটি করে তীর ছোঁড়েন আর রাসূলুল্লাহ মাথা উঁচু করে দেখেন সেই তীর কোথায় আঘাত হানে। আবু তালহা তখন বললেন,
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না। একটি তীরও আপনাকে আঘাত করতে পারবে না, আমার বুকচিরে তবেই আপনাকে স্পর্শ করবে। আমি হাজির আছি রাসূলুল্লাহ। শুধু আমাকে বলুন আপনার জন্য কী করতে হবে। আপনার যেমন ইচ্ছা তেমন আমাকে আদেশ করুন!'
সেদিন রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য তীর-ধনুক আর তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসেন এক মুসলিম নারী। নুসাইবাহ বিনতে কা'ব। রাসূলুল্লাহকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য আবু দুজানা তাঁর পিঠকে ঢাল হিসেবে পেতে দেন।
আবু বকর এবং আবু উবাইদাও সেদিন রাসূলুল্লাহকে বাঁচাবার জন্য প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করে যান। শেষপর্যন্ত ত্রিশজন সাহাবির একটি দল বেষ্টনীর মতো তৈরি করে রাসূলুল্লাহকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে উহুদ পাহাড়ের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং মূল বাহিনীর সাথে মিলিত হন। সেই দলে ছিলেন কাতাদা, সাবিত, সাহল ইবন হুনাইফ, উমার ইবন আল খাত্তাব, আবদুর রাহমান ইবন আউফ, আয-যুবাইর ইবন আল-আওয়্যাম। আল্লাহ তাঁদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট হোন।
অন্যদিকে উমার ইবন খাত্তাব অন্যদের সহযোগিতায় খালিদ ইবন ওয়ালিদের বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হন। মুসলিমরা পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নেন। পাহাড়ে চড়তে রাসূলুল্লাহর খুব কষ্ট হচ্ছিল, তাই তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ তাঁকে বহন করে নিয়ে যান। আলী রাসূলুল্লাহর ক্ষতস্থানে পানি ঢেলে দেন, জখমগুলো পরিষ্কার করে দেন। কিন্তু পানি ঢালায় রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাচ্ছিল। তখন ফাতিমা এক টুকরো কয়লা নিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে ছাইগুলো ক্ষতস্থানে ঢেলে দিলেন, ফলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। আর কয়লার উত্তাপে ক্ষতগুলো জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়。
টিকাঃ
12 সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ৩৭।
রাসূলুল্লাহর ওপর যখন কাফিররা হামলা চালাল, তখন তিনি বলে উঠলেন, 'যে আজ শত্রুদের রুখে দিতে পারবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে!' সাত জন আনসার সাহাবি এক এক করে রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে বীরের মতো লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। এ মর্যাদাময় খেতাব তাঁরা কিনেছিলেন জান, মাল ও রক্তের বিনিময়ে। সাতজন সাহাবি শহীদ হয়ে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহর সাথে ছিলেন তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ এবং সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস। সা'দ শত্রুদের লক্ষ্য করে তীরের পর তীর ছুঁড়তে থাকেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, 'তীর ছোঁড়ো, সাদ! আমার বাবা-মা তোমার জন্য কুরবান হোক!' সা'দকে রাসূলুল্লাহ এমন এক বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন যা অন্য কেউ লাভ করেননি।
তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ অসাধারণ বীরত্ব দেখালেন। রাসূলুল্লাহকে বাঁচাতে গিয়ে তলোয়ারের আঘাতে তালহার কিছু আঙুল কাটা পড়ে। তিনি নিজের গায়ে অন্তত ৩৫টি আঘাত সয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, 'যদি কেউ জমিনের বুকে কোনো জীবিত শহীদকে চলাফেরা করা অবস্থায় দেখতে চায়, সে যেন তালহাকে দেখে নেয়!' আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়তে থাকলেন এবং রাসূলুল্লাহকে মাথা নিচু রাখতে বললেন যেন কোনো তীর তাঁর গায়ে না লাগে। সেদিন রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য নুসাইবাহ বিনতে কা'ব তলোয়ার হাতে এগিয়ে আসেন। আবু দুজানা তাঁর পিঠকে ঢাল হিসেবে পেতে দেন রাসূলুল্লাহকে তীরের আঘাত থেকে বাঁচাতে। আবু বকর, আবু উবাইদা এবং আরও ত্রিশজন সাহাবির একটি দল রাসূলুল্লাহকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে উহুদ পাহাড়ের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। উমার ইবন খাত্তাব অন্যদের সহযোগিতায় খালিদ ইবন ওয়ালিদের বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হন। পাহাড়ে চড়ার সময় তালহা রাসূলুল্লাহকে বহন করে নিয়ে যান। ফাতেমা এবং আলী রাসূলুল্লাহর ক্ষত পরিষ্কার করেন এবং ছাই ঢেলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন।
টিকাঃ
১২. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ৩৭।
📄 যুদ্ধপরবর্তী বাক্যযুদ্ধ
যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলো। কুরাইশরা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মুসলিমদের ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও মদীনা আক্রমণ করার মতো সামর্থ্য বা সাহস কোনোটাই তাদের ছিল না। তারা চেয়েছে এই ধরনের একটি হামলা চালিয়ে মুসলিমদের সর্বোচ্চ পরিমাণ ক্ষতি করতে। আর তাদের মূল বাহিনী যুদ্ধের প্রথমভাগে অনেকটাই পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল।
কুরাইশরা তাই পাহাড়ে উঠে মুসলিমদের পিছু নেওয়ার সাহস পায়নি। যখন রাসূলুল্লাহ ও বাকি মুসলিমরা উহুদ পর্বতের ওপরে, আবু সুফিয়ান তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
'মুহাম্মাদ কি জীবিত?'
কেউ কোনো উত্তর দিল না। সে এরপর জিজ্ঞেস করলো,
'আবু বকর বেঁচে আছে?'
এবারেও কেউ কোনো কথা বললো না।
'উমার বেঁচে আছে?'
কোনো সাড়া নেই। আবু সুফিয়ান জানতো আবু বকর আর উমার হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর দুই সহকারী। আবু সুফিয়ান খুশিতে আত্মহারা! সে তার লোকেদের বলতে লাগলো, 'সব কটা শেষ!'
উমার আর সহ্য করতে পারলেন না, বলে উঠলেন, 'তুমি যাদের নাম নিয়েছো, তোমার জ্বালা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সেই তিনজনই জীবিত আছেন।'
জবাবে আবু সুফিয়ান বলে, 'তোমাদের অনেকের মৃতদেহ বিকৃত করা হয়েছে। যদিও আমি এ কাজের আদেশ দেইনি। জেগে ওঠো হুবাল! তুমি জেগে ওঠো!'
রাসূলুল্লাহ এ কথা শুনে বলেন, 'তোমরা কি এ কথার জবাব দেবে না?'
'কী জবাব দেবো আমরা?' সাহাবিদের প্রশ্ন।
তিনি বললেন, 'বলো, আল্লাহ তারচেয়েও মহান এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ!'
আরবিতে এ কথাটির ছন্দ আবু সুফিয়ানের কথার সাথে মিলে যাচ্ছিলো। তখন আবু সুফিয়ান বলে ওঠে,
- আমাদের উযযা আছে, তোমাদের উযযা নেই!
- আল্লাহ আমাদের মাওলা, তোমাদের কোনো মাওলা নেই! - মুসলিমরা জবাব দিল।
- বদরের প্রতিশোধ নিলাম আজ, এভাবেই যুদ্ধের বদলা হয়।
- না! সমান নয়! আমাদের নিহতরা জান্নাতে, আর তোমাদের নিহতরা তো জাহান্নামে!
- সত্যি করে বলো তো উমার, মুহাম্মাদকে কি আমরা হত্যা করতে পেরেছি?
- নাহ! আল্লাহর কসম, তোমরা পারোনি! তিনি তোমাদের কথা ঠিকই শুনছেন।
- উমার, আমি তোমাকে ইবন কামিয়ার চাইতে বেশি বিশ্বাস করি।
এ কথা বলে কুরাইশরা পরের বছর আবার বদর প্রান্তে মুখোমুখি হবার চ্যালেঞ্জ জানালো। রাসূলুল্লাহ তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। দুই বাহিনী ফিরে গেল।
যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলো। কুরাইশরা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মুসলিমদের ক্ষতি করতে পারলেও মদীনা আক্রমণ করার মতো সামর্থ্য বা সাহস ছিল না। যখন রাসূলুল্লাহ ও বাকি মুসলিমরা উহুদ পর্বতের ওপরে, আবু সুফিয়ান চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল মুহাম্মাদ, আবু বকর ও উমার জীবিত কি না। কেউ উত্তর না দেওয়ায় সে খুশিতে বলল, 'সব কটা শেষ!' উমার আর সহ্য করতে না পেরে বললেন, 'তুমি যাদের নাম নিয়েছো, তারা সবাই জীবিত আছেন।' জবাবে আবু সুফিয়ান বলল, 'তোমাদের অনেকের মৃতদেহ বিকৃত করা হয়েছে। জেগে ওঠো হুবাল!'
রাসূলুল্লাহর নির্দেশে সাহাবিরা জবাব দিলেন, 'আল্লাহ তারচেয়েও মহান এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ!' আবু সুফিয়ান বলল, 'আমাদের উযযা আছে, তোমাদের উযযা নেই!' মুসলিমরা জবাব দিলেন, 'আল্লাহ আমাদের মাওলা, তোমাদের কোনো মাওলা নেই!' কথোপকথন শেষে কুরাইশরা পরের বছর আবার বদর প্রান্তে মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানাল এবং রাসূলুল্লাহ তা গ্রহণ করলেন। দুই বাহিনী ফিরে গেল।