📄 শুরু হলো যুদ্ধ
মূল যুদ্ধের আগে দ্বন্দ্বযুদ্ধ ছিল আরবদের প্রথা। উহুদেও তার ব্যতিক্রম হলো না। কুরাইশদের পতাকাবাহক তালহা ইবন উসমান মুসলিমদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, 'মুসলিমদের মধ্যে কে আছো আমার সাথে লড়বে? আসো, আসো, পারলে আমাকে দোজখে পাঠাও। নইলে নিজেই বেহেশতে জায়গা করে নাও!' তার ঔদ্ধত্যভরা কথা শুনে আলী শান্ত থাকতে পারলেন না। তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে গেলেন। তরবারির এক কোপে তালহার শরীর থেকে তার পা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তাকে সেভাবেই ফেলে রেখে চলে এলেন। তবে ভিন্ন বর্ণনায় এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে আলী নয়, যুবায়ের অংশ নিয়েছেন।
যুদ্ধের আগে রাসূলুল্লাহ একটি তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন,
- কে আছে আমার হাত থেকে এই তরবারি নিতে চায়?
- আমি নেব! আমি! - অনেক সাহাবি আগ্রহ দেখালেন।
- এই তরবারি নিতে চাইলে তার হক আদায় করা চাই। কে আছে এই তরবারির হক আদায়ের ক্ষমতা রাখে? রাসূলুল্লাহ শর্ত যোগ করলেন।
- কী এই তরবারির হক? জানতে চাইলেন আবু দুজানা।
- এর হক হচ্ছে এটা দিয়ে শত্রুকে এমনভাবে আঘাত হানতে হবে যেন এটা বেঁকে যায়!
শক্ত ধাতব তরবারি বাঁকিয়ে ফেলা যেনতেন কাজ নয়! সবাই যেন কিছুটা চুপসে গেল, কিন্তু এগিয়ে এলেন আবু দুজানা, 'আমি এই তরবারির হক আদায় করবো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ তরবারি আবু দুজানার হাতে তুলে দিলেন। আবু দুজানা তরবারি নিলেন, মাথায় বাঁধলেন একটি লাল পট্টি। আবু দুজানা যখনই যুদ্ধে যেতেন, মাথায় লাল পট্টি বেঁধে নিতেন, এটা ছিল তাঁর যুদ্ধের সাজ। এরপর শত্রুদলের সামনে দাপটের সাথে হেঁটে বেড়াতেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন শক্তি ঝরে পড়তো।
তাঁর এই বিশেষ হাঁটার ধরন দেখে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, 'এইভাবে দর্পভরে হাঁটা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। তবে এই পরিস্থিতির কথা ভিন্ন।', অর্থাৎ যুদ্ধের সময় শত্রুদের সামনে এভাবে হাঁটলে আল্লাহ তা পছন্দ করেন। একজন মুসলিম কখনই দাম্ভিক হবে না, তার মাঝে নম্রতা আর বিনয় থাকবে। কিন্তু নম্রতা থাকা মানেই দুর্বলতা নয়। তাই শত্রুদের সামনে হাঁটাচলায় কোনো দুর্বলতা দেখানো যাবে না। রাসূলুল্লাহর হাঁটায় দৃঢ়তা ও শক্তির ছাপ প্রকাশ পেত। আলী ইবন আবি তালিবের ভাষায়, 'তিনি যখন হাঁটতেন, দেখে মনে হতো যেন পাহাড় বেয়ে নামছেন।'
টিকাঃ
৯ সহীহ মুসলিম, অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১৮৩।
মূল যুদ্ধের আগে দ্বন্দ্বযুদ্ধ ছিল আরবদের প্রথা। উহুদেও তার ব্যতিক্রম হলো না। কুরাইশদের পতাকাবাহক তালহা ইবন উসমান মুসলিমদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, 'মুসলিমদের মধ্যে কে আছো আমার সাথে লড়বে? আসো, আসো, পারলে আমাকে দোজখে পাঠাও। নইলে নিজেই বেহেশতে জায়গা করে নাও!' তার ঔদ্ধত্যভরা কথা শুনে আলী শান্ত থাকতে পারলেন না। তরবারির এক কোপে তালহার শরীর থেকে তার পা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তাকে সেভাবেই ফেলে রেখে চলে এলেন। (ভিন্ন বর্ণনায় এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে যুবায়ের অংশ নিয়েছেন।)
যুদ্ধের আগে রাসূলুল্লাহ একটি তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আছে আমার হাত থেকে এই তরবারি নিতে চায়?' অনেকে সাহাবি আগ্রহ দেখালেন। রাসূলুল্লাহ শর্ত যোগ করলেন, 'এই তরবারি নিতে চাইলে তার হক আদায় করা চাই। কে আছে এই তরবারির হক আদায়ের ক্ষমতা রাখে?' আবু দুজানা জানতে চাইলেন হক কী। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এর হক হচ্ছে এটা দিয়ে শত্রুকে এমনভাবে আঘাত হানতে হবে যেন এটা বেঁকে যায়!' আবু দুজানা বললেন, 'আমি এই তরবারির হক আদায় করবো, ইয়া রাসূলাল্লাহ!' তিনি তরবারি নিলেন এবং মাথায় একটি লাল পট্টি বাঁধলেন। এরপর শত্রুদলের সামনে দাপটের সাথে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর এই বিশেষ হাঁটার ধরন দেখে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, 'এইভাবে দর্পভরে হাঁটা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। তবে এই পরিস্থিতির কথা ভিন্ন।' অর্থাৎ যুদ্ধের সময় শত্রুদের সামনে কোনো দুর্বলতা দেখানো যাবে না। আলী ইবন আবি তালিবের ভাষায়, 'তিনি যখন হাঁটতেন, দেখে মনে হতো যেন পাহাড় বেয়ে নামছেন।'
টিকাঃ
৯. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১৮৩।
📄 যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিমরাই ছিল এগিয়ে
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিমদের আক্রমণের সামনে কুরাইশ বাহিনী দাঁড়াতেই পারেনি, বরং ময়দান ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল। পড়িমড়ি করে তারা পালাতে থাকে, তাদের নারীদের পর্যন্ত পায়ের নূপুর দেখা যাচ্ছিলো। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দকে দেখা গেল পালিয়ে পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নিতে। কুরাইশদের বিপর্যয় এতটাই সাংঘাতিক ছিল যে তাদের নারীদের প্রতিরক্ষা দেওয়ার মতো কোনো পুরুষ অবশিষ্ট ছিল না। যে যেভাবে পেরেছে, নিজের জান নিয়ে পালিয়েছে।
তবু কুরাইশদের মধ্যে কিছু লোক ছিল মরিয়া। সেদিন যে পরিবারের হাতে কুরাইশ বাহিনীর পতাকা ছিল তারা হলো বনু আব্দুদ দার। আবু সুফিয়ান তাদের আগেই বলে দিয়েছিল, 'দেখো, বদরের দিনেও তোমরা পতাকা বহন করেছ আর সেবার কী ঘটেছে নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে। যদি এই পতাকার মর্যাদা রাখতে না পারো, তবে এই দায়িত্ব ছেড়ে দাও।'
যুদ্ধক্ষেত্রে পতাকা মানে বিশাল কিছু! পতাকার জন্য সৈনিকরা লড়ে যায়, পতাকা তাদের সাহস যোগায়, পতাকা তাদের প্রেরণার উৎস। পতাকা সমুন্নত থাকার অর্থ যুদ্ধ এখনও জারি আছে, এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যদি কোনো দলের পতাকা পড়ে যায়, তার প্রতীকি অর্থ দলটি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে।
উহুদের যুদ্ধে বনু আব্দুদ দারের লোকেরা পতাকার সম্মান রক্ষার্থে বীরের মতো লড়ে যায়। একে একে সেই পরিবারের সাত জন লোক নিজের জান দিয়ে দেয়। প্রথমে একজন পতাকা ধরে, তাকে হত্যা করা হয়, এরপর দ্বিতীয় জন, তাকেও হত্যা করা হয়, এমনি করে সাত-সাত জন পতাকা ধরে রাখতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে। এরপর তাদের এক আবিসিনিয়ান দাস পতাকা উঁচু করে ধরে। তার হাতে মারাত্মক আঘাত পাবার পরেও সে পতাকাটি কোনোরকমে তুলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়, ঐ কঠিন মুহূর্তেও বলতে থাকে, 'আমি কি আমার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করেছি?' তারপর পতাকা মাটিতে পড়ে যায়, আর তখনই কুরাইশরা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। কুরআনের পর্দায় উহুদের যুদ্ধের এই পর্যায়কে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন,
"আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তাঁর নির্দেশ..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫২)
রাসূলুল্লাহর সীরাতে যুদ্ধের বর্ণনাকে ঠিক ধারাভাষ্যের ঢঙে বর্ণনা করা যায় না। কারণ ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা আকারে যুদ্ধের বর্ণনাগুলো এসেছে। উহুদের যুদ্ধে এমনই একটি ঘটনা হলো আবু দুজানার বীরত্ব। উহুদের দিন যেন আবু দুজানার দিন! আবু দুজানা তরবারি নিয়ে সোজা মুশরিক বাহিনীর মাঝে ঢুকে গেলেন। তরবারি চালিয়ে তছনছ করে দিলেন শত্রুবাহিনীকে যতক্ষণ না তার তরবারি বেঁকে যায়। আয যুবাইর ইবন আউয়াম সেদিনের 'হিরো' আবু দুজানার কাহিনী নিজ চোখে দেখলেন। তিনি বলেন,
'আল্লাহর রাসুল যখন আমাকে তরবারি না দিয়ে আবু দুজানাকে দিলেন, আমি মনে মনে বেশ দুঃখ পেলাম। ভাবলাম, দেখে নেব আবু দুজানা কী এমন বীরত্ব দেখায়! কিন্তু উহুদের সেই দিনে আবু দুজানা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তাঁর সামনে যে-ই পড়ছে, সে-ই মারা পড়ছে। অপরদিকে কুরাইশদের মাঝেও ছিল তেমনি এক মুশরিক সৈনিক, সামনে যাকে পেয়েছে, তাকেই হত্যা করছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেই মুশরিক যোদ্ধা আর আবু দুজানা -- দুজনেই দুজনের বেশ কাছাকাছি চলে এল। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকলাম যেন তারা দুজন পরস্পরের মুখোমুখি হয়, আর আল্লাহর ইচ্ছায় হলোও তা-ই! দুজন লড়াই শুরু করলো! দুজন একে অপরকে তরবারি দ্বারা আঘাত-পাল্টা আঘাত করছে। সেই মুশরিক আবু দুজানাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করতে গেলে আবু দুজানা তৎক্ষণাৎ তাঁর ঢাল দিয়ে সে আঘাত প্রতিরোধ করলেন। কিন্তু তরবারি আটকে গেল আবু দুজানার ঢালে, আর সেই সুযোগে আবু দুজানা তাকে তরবারি চালিয়ে হত্যা করলেন!'
কাব ইবন মালিক উহুদের একইরকম আরেকটি কাহিনী উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনায়,
'আমি এক মুশরিককে সেদিন দেখেছি সে মুসলিমদের উদ্দেশ্যে বলছিল, কোথায় আছিস ভেড়ার দল, জবাই হতে চাস বুঝি! এরপর দেখলাম আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা এক মুসলিম যোদ্ধা সেই মুশরিকের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে এগিয়ে এলেন। আমি মনে মনে দুজনের মধ্যে তুলনা করতে লাগলাম--সেই মুশরিক সৈনিক পোশাক, অস্ত্রসজ্জা সবদিক দিয়েই বেশি এগিয়ে। দুজন কখন মুখোমুখি হবে আমি সেই অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক সময় ঠিকই তারা সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হলো, আপাদমস্তক ঢাকা সেই মুসলিম যোদ্ধা তাঁর তরবারি দিয়ে মুশরিক যোদ্ধার কাঁধে এত জোরে আঘাত হানলেন যে, তরবারি তার শরীর চিরে পায়ের কাছে উরু পর্যন্ত চলে এল! এরপর সেই মুসলিম নিজের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন উপভোগ করলে কাব? আমি হচ্ছি আবু দুজানা!'
অর্থাৎ, তরবারির আঘাত এতটাই জোরালো ছিল যে তার পুরো দেহ ঘাড় থেকে উরু পর্যন্ত দুভাগ হয়ে যায়। যুদ্ধের এই পর্যায়ে রাসূলুল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ, তাঁর চাচা হামযা শহীদ হন। এই পর্যায়ে আরও শহীদ হন হানযালা।
টিকাঃ
10 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০।
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিমদের আক্রমণের সামনে কুরাইশ বাহিনী দাঁড়াতেই পারেনি, বরং ময়দান ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল। কুরাইশদের বিপর্যয় এতটাই সাংঘাতিক ছিল যে তাদের নারীদের প্রতিরক্ষা দেওয়ার মতো কোনো পুরুষ অবশিষ্ট ছিল না। তবু কুরাইশদের মধ্যে কিছু লোক ছিল মরিয়া। বনু আব্দুদ দার পরিবারের সাত জন লোক একে একে পতাকা ধরে রাখতে গিয়ে জান দিয়ে দেয়। এরপর তাদের এক আবিসিনিয়ান দাস পতাকা উঁচু করে ধরে। তার হাতে মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পরেও সে পতাকাটি তুলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়, আর তখনই কুরাইশরা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। কুরআনের পর্দায় উহুদের যুদ্ধের এই পর্যায়কে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন, "আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তাঁর নির্দেশে..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৫২)
উহুদের দিন যেন আবু দুজানার দিন! আবু দুজানা তরবারি নিয়ে সোজা মুশরিক বাহিনীর মাঝে ঢুকে তছনছ করে দিলেন। আয যুবাইর ইবন আউয়াম বলেন, 'আল্লাহর রাসুল যখন আমাকে তরবারি না দিয়ে আবু দুজানাকে দিলেন, আমি মনে মনে বেশ দুঃখ পেলাম। কিন্তু আবু দুজানা ছিলেন অপ্রতিোধ্য।' কাব ইবন মালিক এক মুশরিককে দেখেছিলেন যে মুসলিমদের দিকে তর্জন গর্জন করছিল। বর্মে ঢাকা এক মুসলিম যোদ্ধা (আবু দুজানা) এগিয়ে গিয়ে তরবারির এক আঘাতে সেই মুশরিকের পুরো দেহ ঘাড় থেকে উরু পর্যন্ত দুভাগ করে দিলেন। যুদ্ধের এই পর্যায়ে রাসূলুল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় চাচা হামযাহ এবং সাহাবী হানযালা শহীদ হন। উহুদের শহীদদের ঘটনায় এই দুজনের কাহিনী বর্ণনা করা হবে।
টিকাঃ
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০।
📄 হঠাৎ বিপর্যয়
মুসলিম বাহিনীর হামলায় কুরাইশরা বিপর্যস্ত হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যেতে থাকে। মুসলিম শিবিরে তখন বিজয়ের সুবাস। কিন্তু যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল কুরাইশরা আর প্রতিরোধ বা পাল্টা আক্রমণ গড়তে সক্ষম হবে না। আর সেটা ভেবেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন ক'জন সাহাবি।
সেই সাহাবিরা ছিলেন তীরন্দাজ বাহিনী। তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ পাহাড়ের ওপর থাকতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। যখন তীরন্দাজ সাহাবিরা দেখলেন মুসলিমরা গনিমতের মাল সংগ্রহ করছে, তখন তাঁদেরও ইচ্ছে হলো নিচে নেমে সবার সাথে এই কাজে যোগ দিতে। সম্ভবত যুদ্ধের উদ্দীপনায় তাঁরা আবেগী হয়ে পড়েছিলেন আর দায়িত্বকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আমীর আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর উত্তেজনায় গা ভাসাননি। তিনি বললেন, 'তোমরা কি আল্লাহর রাসূলের আদেশ ভুলে গেছো? তোমাদের কি মনে নেই যে তাঁর নির্দেশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের নিচে যাওয়া ঠিক হবে না?' কিন্তু তাঁরা বললো, 'যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে।' এই বলে পঞ্চাশ জনের মাঝে চল্লিশ জনই রাসূলুল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করে চলে যায়।
শত্রুদের ক্যাম্পে একজন তখনো যুদ্ধে অংশ নেন নেননি। তিনি হলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন কুরাইশদের অশ্ববাহিনীর প্রধান। মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী পাহাড় থেকে নেমে যাওয়া মাত্র, তিনি আর আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা মুসলিম বাহিনীর দুর্বল অবস্থানটি লক্ষ করলেন। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তাঁরা এতটুকু দেরি করলেন না। তাঁরা তাঁদের একশো থেকে দেড়শো সৈন্যের অশ্ব বাহিনীকে আইনান পাহাড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে নিলেন আর আচমকাই মুসলিমদেরকে পেছন থেকে আক্রমণ করে বসলেন। আচমকা আক্রমণে মুসলিম বাহিনী হতভম্ব হয়ে পড়ে। কুরাইশদের মূল সেনাদল এ দৃশ্য দেখে সাহস ফিরে পায়। তারা পালানো ফেলে এবার সামনের দিক থেকে মুসলিমদেরকে আক্রমণ করা শুরু করে। দু'দিক থেকে হামলা আসায় মুসলিম বাহিনী তাল হারিয়ে ফেলে।
খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাঁর বাহিনীকে নিয়ে এমন দিক থেকে হামলা চালান যে মুসলিম বাহিনী কার্যত দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগ ছিল তাঁর বাম পাশে। এরা গনিমাহ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল। আর ডান পাশে ছিল রাসূলুল্লাহর ক্যাম্প। আকস্মিক আক্রমণে মুসলিম মুজাহিদদের সারি ভেঙে যায়। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এটা ছিল একটা ছোটখাটো হত্যাযজ্ঞ। দিশেহারা হয়ে বন্ধু-শত্রুকে চিহ্নিত করতেও ভুল হয়ে যায়, নিজেরাই নিজের দলের লোককে মেরে ফেলে। এরকমই একটি আত্মঘাতী আক্রমণে মারা যান হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামানের বাবা ইয়ামান। ওদিকে মুশরিকরা মুসলিম বাহিনীর ভেতরে ঢুকে পড়ে সমানে হত্যা করতে থাকে।
কুরাইশদের উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা। হামলার এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহর ক্যাম্পের খুব কাছাকাছি চলে আসে। রাসূলুল্লাহকে ঘিরে তখন মাত্র নয়জন সাহাবি। এটা ছিল রাসূলুল্লাহর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের একটি। তিনি কী করবেন এখন? নয়জন সাহাবিকে সাথে নিয়ে নিরাপদ দুরত্বে চলে গিয়ে নিজের জীবন বাঁচাবেন? নাকি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ডাক দেবেন? যদি তিনি নিজের জান বাঁচান, তাহলে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ মুসলিমদের হত্যা করে শেষ করে ফেলবে। আর যদি তিনি ডাক দেন, তাহলে একটা প্রতিরোধ গড়ার সম্ভাবনা থাকলেও শত্রুরা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে তাঁর অবস্থান জেনে যাবে আর তাঁর ওপর হামলা চালাবে। কী করবেন তিনি?
রাসূলুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও মুসলিমদের ময়দানে ফিরিয়ে আনবেন। তিনি ডেকে উঠলেন, 'আল্লাহর বান্দারা! তোমরা এগিয়ে আসো!' আর যা হওয়ার তাই হলো, সেই ডাক শুনে ফেলে কুরাইশ বাহিনীও। কাফিরদের একটি দল রাসূলুল্লাহর অবস্থান আন্দাজ করে মুসলিমরা এগিয়ে আসার আগেই সেদিকে হামলা চালিয়ে বসলো।
রাসূলুল্লাহর জীবনে এতটা অনিশ্চয়তাঘেরা, এতটা সংকটাচ্ছন্ন, এতটা বিপদগ্রস্ত মুহূর্ত আর কখনো আসেনি। তাইফের লোকেরা তাঁকে পাথর ছুঁড়ে তাড়া করেছিল, কিন্তু তাঁকে হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। হিজরতের রাতে কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু এতটা কাছাকাছি আর কখনো আসতে পারেনি। হিজরতের সময় সুরাকা ইবন মালিক রাসূলুল্লাহকে বন্দী করতে চেয়েছিল। কিন্তু উহুদের ময়দানে কুরাইশরা মরিয়া হয়ে চাইছিল যেকোনো মূল্যে রাসূলুল্লাহকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে।
সেই প্রচেষ্টায় উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহর গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারে। সেই ধাক্কায় রাসূলুল্লাহ মাটিতে পড়ে যান। তাঁর ঠোঁট কেটে যায়। দ্বিতীয় মারাত্মক আঘাতটিও হানে উতবা। এই আঘাতটি ছিল একটি তীরের আঘাত। রাসূলুল্লাহর বর্মকে টার্গেট করে। এই আঘাতে রাসূলুল্লাহর দাঁত ভেঙে যায়। আর তৃতীয় আরেকটি আঘাত হানে ইবন কামিয়াহ। সে ঘোড়ায় চড়ে এসে তরবারি দিয়ে রাসূলুল্লাহর মুখে আঘাত করার চেষ্টা করে। তালহা তাঁর ঢাল দিয়ে সেই আঘাতকে রুখে দিতে চাইলেন, কিন্তু পুরোপুরি পারলেন না, রাসূলুল্লাহর শিরস্ত্রাণে ইবন কামিয়ার তরবারি আঘাত করে। রাসূলুল্লাহ যেভাবে করে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে সাহাবিদের বাঁচানোর জন্য আহবান করেছিলেন, সেভাবে করে সাহাবিরা এবার নিজের জীবন বিপন্ন করে এগিয়ে এলেন রাসূলুল্লাহকে বাঁচানোর জন্য।
মুসলিম বাহিনীর হামলায় কুরাইশরা বিপর্যস্ত হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যেতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল কুরাইশরা আর প্রতিরোধ গড়তে পারবে না। আর সেটা ভেবেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন তীরন্দাজ সাহাবিরা। তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ পাহাড়ের ওপর থাকতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। যখন তীরন্দাজ সাহাবিরা দেখলেন মুসলিমরা গনিমতের মাল সংগ্রহ করছে, তখন তাঁদেরও ইচ্ছে হলো নিচে নেমে যোগ দিতে। আমীর আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর তাঁদের মনে করিয়ে দিলেন রাসূলুল্লাহর নির্দেশের কথা, কিন্তু পঞ্চাশ জনের মাঝে চল্লিশ জনই নির্দেশ উপেক্ষা করে চলে যায়।
শত্রুদের ক্যাম্পে খালিদ ইবন ওয়ালিদ এবং ইকরিমা ইবন আবু জাহল মুসলিম বাহিনীর এই দুর্বল অবস্থানটি লক্ষ করলেন। তাঁরা তাঁদের অশ্ব বাহিনীকে আইনান পাহাড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে নিলেন আর আচমকাই মুসলিমদেরকে পেছন থেকে আক্রমণ করে বসলেন। কুরাইশদের মূল সেনাদল এ দৃশ্য দেখে পালানো ফেলে এবার সামনের দিক থেকে আক্রমণ করা শুরু করে। মুসলিম বাহিনী তাল হারিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দিশেহারা হয়ে বন্ধু-শত্রুকে চিহ্নিত করতেও ভুল হয়ে যায়, নিজেই নিজের দলের লোককে মেরে ফেলে। কুরাইশদের উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা। হামলার এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহর ক্যাম্পের খুব কাছাকাছি চলে আসে। রাসূলুল্লাহকে ঘিরে তখন মাত্র নয়জন সাহাবি। রাসূলুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও মুসলিমদের ময়দানে ফিরিয়ে আনবেন। তিনি ডেকে উঠলেন, 'আল্লাহর বান্দারা! তোমরা এগিয়ে আসো!' সেই ডাক শুনে ফেলে কুরাইশ বাহিনীও এবং সেদিকে হামলা চালিয়ে বসল।
মরিয়া কুরাইশরা চাইছিল রাসূলুল্লাহকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে। উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহর গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারে, এতে তাঁর ঠোঁট কেটে যায়। দ্বিতীয় মারাত্মক তীরের আঘাতে রাসূলুল্লাহর দাঁত ভেঙে যায়। তৃতীয় আরেকটি আঘাকে ইবন কামিয়াহ ঘোড়ায় চড়ে এসে তলোয়ার দিয়ে রাসূলুল্লাহর মুখে আঘাত করার চেষ্টা করে। তালহা তাঁর ঢাল দিয়ে সেই আঘাতকে রুখে দিতে চাইলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহর শিরস্ত্রাণে ইবন কামিয়ার তলোয়ার আঘাত করে।
📄 পাহাড়সম দৃঢ়তা!
কুরাইশদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। তারা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। মুসআবকে কাফিররা ঘিরে রেখেছে, আর মুসআব দেখলেন রাসূলুল্লাহকে কাফিররা ঘিরে রেখেছে। সংকটের সেই মুহূর্তে, বিপদের সেই ঘনঘটায়, মুসআব বলে উঠলেন,
'আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান, অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে কি পশ্চাদপসরণ করবে?'
এটাই তো ঈমান! মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মুসআবের বলা এই কথাগুলো আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নাযিল করেছেন।
"আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল! তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪৪)
মুসআব ইবন উমায়ের এই কথাগুলো বলার পর ইবন কামিয়াহ মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। মুসআব ছিলেন এই যুদ্ধের পতাকাবাহী। শত্রুরা তার ডান হাত কেটে ফেলে, তিনি বাম হাতে পতাকা জড়িয়ে ধরেন! শত্রুরা তার বাম হাতও কেটে ফেলে, এরপর দুই হাতের কাটা অংশ নিয়ে তিনি পতাকা জড়িয়ে ধরেন আর সেই অবস্থায় শহীদ হয়ে যান।
মুসআব ইবন উমায়েরের অবয়ব ছিল কিছুটা রাসূলুল্লাহর মতো। মুসআবের মৃত্যুর পর হঠাৎ গুজব রটলো -- রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন! মুসলিমরা একটা বড় ধাক্কা খেল। কেন লড়ছেন তারা? কীসের জন্য লড়ছেন? কার জন্য লড়ছেন?
এই ধাক্কা সইতে না পেরে মুসলিমদের এক দল মনোবল হারিয়ে হাত থেকে অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে মদীনার দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ পালিয়ে উহুদ পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। কেউ ভাবলো যুদ্ধ করে কী হবে, তার চাইতে বরং আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে ফিরে যাই। সে একটা সন্ধি করে আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুক।
কিন্তু একদল মুসলিম ব্যতিক্রম। তাঁরা ছিলেন অপরাজেয়। তারা ছিলেন হার-না-মানা মানুষ। তাঁদের ছিল সামর্থ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর গুজবে তাঁরা এতটুকু দমলেন না, দ্বিগুণ উৎসাহে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন শহীদ হবার আশায়। এমনই একজন ছিলেন আনাস ইবন নযর।
আনাস ইবন নযর অনেকদিন ধরেই বদরের যুদ্ধে অংশ নিতে না পারার যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি শুধু এতটুকুই বলেছিলেন, 'আল্লাহ যদি আর একটা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন তাহলে তিনি দেখবেন আমি কী করি!'। তিনি তাঁর কথা রাখলেন। উহুদের যুদ্ধে যখন সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-অধিক পালিয়ে যাচ্ছে, তিনি তখন এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, আজ তাঁর দিন! আজ তাঁর দেখানোর পালা! অস্ত্র রেখে পালিয়ে যাওয়া কিছু মুসলিমকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছো তোমরা?' তারা উত্তর দিল, 'মুহাম্মাদের মৃত্যু হয়েছে।' তিনি বললেন, 'তোমরা জেনে রাখো, মুহাম্মাদ যদি মারাও যান, তাঁর রবের মৃত্যু হয়নি। যে কারণে মুহাম্মাদ মারা গেছেন, তোমরাও সে কারণে মরে যাও!'
সাদ ইবন মুয়াজকে বললেন, 'সাদ! আমি তো উহুদের পাদদেশে জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি!' এই বলে অদম্য আনাস ছুটে গেলেন ময়দানে। ঢুকে পড়লেন শত্রুদের মাঝে। দুর্দান্তভাবে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন প্রবল সাহাসিকতার সাথে। তাঁর কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করলেন, তরবারি চালিয়ে গেলেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত।
যুদ্ধ শেষে একটি মৃতদেহ পড়ে ছিল ময়দানে। শরীরে ছিল আশিটি আঘাতের চিহ্ন, দেখে বোঝা যাচ্ছিল না এটা কার লাশ। এক মুসলিম নারী এলেন, লাশের শরীর দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না এত আঘাত পুরো দেহে। একটা আঙুল দেখে সনাক্ত করে বললেন, এটা তাঁর ভাই, আনাস ইবন নযরের লাশ। এই ছিলেন আনাস ইবন নযর, আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন,
"মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনোই পরিবর্তন করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)
এমন আরেক সাহাবি ছিলেন সাবিত ইবন দাহদাহ। তিনি বলে উঠলেন, 'নবীজিকে যদি হত্যা করা হয়েও থাকে, আল্লাহ তো জীবিত রয়েছেন! তিনি তো চিরঞ্জীব! কাজেই তোমরা দ্বীনের জন্য লড়ে যাও, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন, তোমাদের বিজয় দেবেন!'
অপরাজেয় সাহাবিদের একজন ছিলেন আনসারী। তাঁর নাম আমরা জানি না। এক মুহাজির সাহাবির ভাষায়, 'আমরা এক আনসারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তার সারা গা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তাকে বললাম, তুমি কি জানো মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে? সে বললো, ঠিক আছে, যদি মুহাম্মাদকে হত্যা করে হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর দ্বীন-প্রচারের মিশন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে! সুতরাং তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও দ্বীনের জন্য। তাঁর মতো করেই মৃত্যুর স্বাদ নিই, ইসলামের জন্য লড়াই করে শহীদ হয়ে যাই।'
এই সাহাবিরা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি যেতে সক্ষম হলেন। ইতিমধ্যে খবর এল, রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর খবরটি একটি গুজব। তখন মুসলিমরা আরও সাহস ফিরে পেলেন। মুসলিম বাহিনীর মাঝে শৃঙ্খলা ফিরে এল。
টিকাঃ
11 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২২।
কুরাইশদের অতর্কিত হামলায় মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা মুসআব ইবন উমায়েরকে হত্যা করে। সংকটের সেই মুহূর্তে মুসআব বলে উঠলেন, 'আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান, অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে কি পশ্চাদপসরণ করবে?' এই কথাগুলো আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নাযিল করেছেন: "আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল! তাঁর আগে নিশ্চয়ই অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪৪)
মুসআব ছিলেন এই যুদ্ধের পতাকাবাহী। শত্রুরা তার ডান হাত কেটে ফেললে তিনি বাম হাতে পতাকা ধরেন, বাম হাতও কেটে ফেললে দুই হাতের কাটা অংশ নিয়ে পতাকা জড়িয়ে ধরেন এবং শহীদ হয়ে যান। মুসআবের মৃত্যুর পর গুজব রটল রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন! মুসলিমদের এক দল মনোবল হারিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একদল মুসলিম ছিল অপরাজেয়। তেমনই একজন ছিলেন আনাস ইবন নযর। তিনি পালিয়ে যাওয়া কিছু মুসলিমকে বললেন, 'মুহাম্মাদ যদি মারাও যান, তাঁর রবের মৃত্যু হয়নি। যে কারণে মুহাম্মাদ মারা গেছেন, তোমরাও সে কারণে মরে যাও!' তিনি সাদ ইবন মুয়াজকে বললেন, 'সাদ! আমি তো উহুদের পাদদেশে জান্নাতের সুবাস পাচ্ছি!' ময়দানে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে তিনি শহীদ হলেন। শরীরে ছিল আশিটি আঘাতের চিহ্ন। আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন: "মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনোই পরিবর্তন করেনি।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩)
সাবিত ইবন দাহদাহ এবং এক নাম-না-জানা আনসারী সাহাবিও একই রকম দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন। তাঁরা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করলেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য। এই সাহাবিরা শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর কাছাকাছি যেতে সক্ষম হলেন। ইতিমধ্যে খবর এল, রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর খবরটি একটি গুজব। তখন মুসলিম বাহিনীর মাঝে শৃঙ্খলা ফিরে এল।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২২।