📄 বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সামরিক কর্মকাণ্ড
১) গাযওয়াহ আল কুদর: বদর যুদ্ধের মাত্র সাত দিন পরেই এই অভিযান সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহর গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারে যে, বনু সালিম গোত্র মুসলিমদের ওপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করছে। তাই রাসূলুল্লাহ আকস্মিকভাবে তাদেরকে আগেভাগে আক্রমণ করে বসেন। এ অভিযানে তেমন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বনু সালিম গোত্র পাঁচশো উট রেখে পালিয়ে যায়। উটগুলো মুসলিমদের মাঝে গনিমত হিসেবে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেকের ভাগে দুটো করে উট পড়ে।
২) গাযওয়াহ আস-সাউয়ীক: বদরের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার লজ্জা মোচন করতে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের কাছে যায়। বনু নাযির গোত্রের প্রধান সাল্লাম ইবন মিশকামের বাসাতেই মেহমান হিসেবে ওঠে। মদীনার উপকণ্ঠে কীভাবে আকস্মিক আক্রমণ করতে হবে সে বিষয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়। ইহুদিদের কাছ থেকে কুরাইশরা অনেক মূল্যবান তথ্য লাভ করে। আবু সুফিয়ান ঠিক করলো, আকস্মিক আক্রমণ করে মুসলিমদের ভড়কে দেবে। সে কিছু সৈন্য নিয়ে মদীনার উপকণ্ঠে উরাইদ নামের এক স্থানে অতর্কিতে আক্রমণ করে দুইজন মুসলিমকে হত্যা করে। এরপর একটা খেজুর বাগানে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ দুইশো সৈন্য নিয়ে তাদের তাড়া করেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তার সৈন্যসমেত পালিয়ে যায়। পালাবার সময় নিজেদের খাবার ফেলে চলে যায়। তবে কোনো সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
৩) গাযওয়াহ যি আমর: রাসূলুল্লাহর গোয়েন্দা বিভাগ এবারও খবর পেয়ে যায় সালাবা এবং মুহারিব -- এ দুটি গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি সাড়ে চারশো মুজাহিদের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী নিয়ে গোত্র দুটোর দিকে অগ্রসর হন। পথে হুবার নামে শত্রুপক্ষের এক লোককে গ্রেপ্তার করা হলো। তাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হলে সে মুসলিম হয়ে যায়। ওদিকে রাসূলুল্লাহর সেনাবাহিনী আসছে খবর পেয়ে গোত্র দুটো আশেপাশের পাহাড়ী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পালিয়ে যায়। এরপরও রাসূলুল্লাহ সেখানে এক মাস অবস্থান করেন। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দেরকে দাপট দেখানো আর বেদুইনদের সন্ত্রস্ত করে রাখা। এ অভিযানে একটি মজার ঘটনা ঘটে, একটি মু'জিযা। যখন মুসলিমরা সেখানে পৌঁছালো, তখন বৃষ্টি হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহর কাপড় ভিজে চুপসে একাকার। তিনি বর্ম খুলে গায়ের কাপড় একটা গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় গাছের নিচেই শুয়ে পড়লেন। কখন যেন চোখ লেগে গেল। এমন সময় শত্রুপক্ষের মুহারিব গোত্রপ্রধান দাসুর ইবন আল-হারিস চুপিচুপি সেখানে চলে এল, হাতে খোলা তরবারি! রাসূলুল্লাহর ওপর দাঁড়িয়ে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে জিজ্ঞেস করল, 'এই যে মুহাম্মাদ! কে তোমাকে এখন আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' রাসূলুল্লাহ এই অকস্মাৎ আক্রমণে একটুও না ভড়কে আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিলেন, 'আল্লাহ আমায় রক্ষা করবেন।' আর এ কথা বলার সাথে সাথে দাসুরের হাত থেকে তার তরবারি পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ তরবারিটি কুড়িয়ে নিয়ে দাসুরের সামনে দাঁড়ালেন, 'দাসুর! তোমাকে এখন কে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে?' মুহূর্তের মাঝে দৃশ্যপট বদলে গেল। দাসুর ভড়কে যায়। রাসূলুল্লাহর কাছে নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে থাকে, আল্লাহর রাসূলও তাকে মাফ করে দিলেন। দাসুর এরপর মুসলিম হয়ে যায়। এই কাহিনী গিয়ে তার গোত্রকে শোনায়, 'জানো কী হয়েছে? এক ইয়া লম্বা লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো আর আমার বুকে ধাক্কা দিল।' এই লম্বা লোকটি ছিলেন আসলে জিবরীল। ঘটনাটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মু'জিযা। দাসুর তার গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিলে অনেকেই মুসলিম হয়ে যায়।
৪) সারিয়াহ আল কারদাহ: ক্রমাগত সামরিক অভিযানের মুখে কুরাইশরা আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। এছাড়া মক্কা থেকে সিরিয়াগামী যে বাণিজ্যপথ ছিল তাও হুমকির মুখে। হন্যে হয়ে কুরাইশরা ভিন্ন একটি পথে তাদের ব্যবসায়িক পণ্য বহনের চিন্তা করে। নজদ হয়ে এরপর সিরিয়া প্রবেশের একটি পথ বেছে নেওয়া হয়, যদিও সেটাও ছিল বেশ খরচসাপেক্ষ। তাদের এই নতুন পথে হানা দিতে রাসূলুল্লাহ যাইদ ইবন হারিসের নেতৃত্বে একশো মুসলিম বিশিষ্ট সারিয়া প্রেরণ করেন। তাঁরা সফলভাবে কুরাইশ কাফেলা আক্রমণ করেন। কাফেলার প্রহরীরা পালিয়ে যায় আর মুসলিমরা কাফেলা দখল করে নেয়।