📄 কাব ইবন আশরাফ: কাফির মিডিয়ার মুখপাত্র
মদীনায় কিছু লোক মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিডিয়া যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এরা রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে আজেবাজে কথা বলতো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে লোকদের ক্ষেপিয়ে তুলতো। এই লোকগুলো কিছু ক্ষেত্রে ইসলামের সরাসরি শত্রু থেকেও ভয়ঙ্কর; এদেরকে রাসূলুল্লাহ ছেড়ে দেননি। শাইখ ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আস-সারিম আল-মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল' কিতাবে এ প্রসঙ্গে বলেন:
"মুহারাবাহ, অর্থাৎ, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দুই প্রকারে হতে পারে: অস্ত্রের যুদ্ধ এবং কথার যুদ্ধ। কথা দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হতে পারে অস্ত্রের যুদ্ধ থেকেও ভয়ংকর। আমরা দেখেছি, যারা মুখের কথা দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে হত্যা করেছেন, কিন্তু যারা কেবল অস্ত্র দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়েছে, তাদের কাউকে কাউকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর পর এই আইনটিকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কথা ও কাজ -- দুভাবেই ফিতনা বা অশান্তি ছড়াতে পারে। কিন্তু কথার ফিতনা, কাজের ফিতনা থেকেও বহুগুণ বেশি ভয়ংকর। আবার অন্যদিকে কথার মাধ্যমে যে কল্যাণ অর্জিত হয়, তা কাজের মাধ্যমে অর্জিত কল্যাণ থেকে অনেক গুণে বেশি। এটা প্রমাণিত যে, আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে কথা দিয়ে যুদ্ধ করা অধিকতর নিকৃষ্ট অপরাধ। দ্বীনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যত প্রচেষ্টা আছে, সেগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে কার্যকরী।"
মদীনায় এরকম বেশ কিছু লোককে শায়েস্তা করা হয়, যারা আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে আজেবাজে বকতো। একাধিক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা হলো কা'ব ইবন আশরাফের ঘটনা।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথার কারণে যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল কা'ব ইবন আল-আশরাফের গুপ্তহত্যা। কা'ব ছিল জাতিগতভাবে আরব। বনু নাযিরের এক ইহুদি মহিলাকে বিয়ে করে সে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে। তার ধনদৌলতের কমতি ছিল না। একাধারে সে ভালো কবি আর বাকপটু। আরবরা তাকে বেশ সম্মান করতো। মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ক্যাম্পেইনে সে ছিল সবচেয়ে সরব। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ তৈরিতে তার ছিল সক্রিয় ভূমিকা।
বদর যুদ্ধে মুসলিমদের জয়ে শোকাহত কবি কা'ব ইবন আশরাফ অস্ত্র হিসেবে বেছে নিল কবিতার ভাষা। সে বলে বেড়াতে থাকে, মহান কুরাইশদের এভাবে পরাজিত হওয়ার চাইতে মরে যাওয়াই ভালো ছিল। কবিতার মাধ্যমে সে রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলতো। মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের সাথে সময় কাটাতো, তাদের দুঃখের সঙ্গী হতো, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতো। মক্কায় বসেই রাসূলুল্লাহকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে সে বহু কবিতা লেখে। তার কবিতায় আরও এমন সব কথা থাকতো যা সহ্য করার মতো নয়। নাম উল্লেখ করে সে সাহাবিদের স্ত্রী ও তাঁদের সৌন্দর্য নিয়ে নোংরা কবিতা লেখা শুরু করে।
মুসলিমদের কাছে নারীদের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাদের একান্ত গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেওয়া ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। কা'ব ইবন আশরাফের মিডিয়া যুদ্ধের মোকাবেলায় রাসূলুল্লাহ প্রথমে বেছে নিলেন এই কাজের যোগ্য সাহাবি কবি হাসসান ইবন সাবিতকে। তিনি ছিলেন মুসলিমদের মাঝে সেরা কবি। হাসসান ইবন সাবিত এমন সব কবিতা লিখলেন যে মক্কার লোকেরা একে একে সবাই কা'ব ইবন আশরাফকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিল। তৎকালীন আরবে কবিতাই ছিল মিডিয়া। একটি তীক্ষ্ণ, সাহিত্যরসময় কবিতা মুহূর্তের মাঝে পুরো আরবে ছড়িয়ে পড়তো; অনেকটা যেভাবে আজকাল কোনো একটি লেখা বা ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। কবিতা যেমন কাউকে সম্মান এনে দিত, তেমনি এই কবিতাই ছিল কারো ইজ্জতহানি করার মোক্ষম অস্ত্র।
আজকের দিনের মিডিয়াও সেরকম। মিডিয়া মানুষকে যা বলে তা-ই মানুষ বিশ্বাস করে। মিডিয়া চাইলে যে কাউকে হিরো বানাতে পারে, আবার যে কাউকে বানাতে পারে সন্ত্রাসী। আন্তর্জাতিক মিডিয়া গোটা পৃথিবীর মানুষের চিন্তা প্রভাবিত করতে পারে, জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কা'ব ইবন আল-আশরাফও ঠিক একই কাজ করছিল, সে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে একটি মিডিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল এবং সামরিক যুদ্ধের প্রভাবক হিসেবে কাজ করছিল।
মক্কা থেকে বিতাড়িত কা'ব মদীনায় ফিরে আসতে বাধ্য হলো। ফলে সে আবার মুসলিমদের হাতের নাগালের ভেতর চলে এল। রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ক্ষতি করেছে যে পাপিষ্ঠ, সেই কা'ব ইবন আল-আশরাফের হাত থেকে আমাদেরকে মুক্তি দিতে পারে এমন কে আছে?' এগিয়ে এলেন আনসারী সাহাবি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা।
- আল্লাহর রাসূল, আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?
- হ্যাঁ, চাই।
- তাহলে আমাকে কিছু (মিথ্যা) কথা বলার অনুমতি দিন।
- ঠিক আছে, অনুমতি দেওয়া হলো।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ একা একাই কাবের কাছে গেলেন। বললেন, 'দেখো, কষ্টের কথা আর তোমাকে কী বলবো, এই মুহাম্মাদ লোকটা আমাদের কাছে সাদাকা (দান) চায় অথচ আমাদের নিজেদের পেটেই ঠিকমতো দানাপানি পড়ে না। তোমার কাছে এসেছি কিছু ঋণের জন্য।' মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা এসব কথা বলে কা'ব ইবন আশরাফের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
কাব বললো, 'সবে তো শুরু। আল্লাহর কসম, ঐ লোক তোমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলবে!'
- 'হুম, তার শেষ আমি দেখে ছাড়বো। তবে যেহেতু তাকে মেনে চলছি, এখনই তার সঙ্গত্যাগ করা মনে হয় ঠিক হবে না। সে যাই হোক, আমি তোমার কাছে কিছু খাবার ধার চাই। এই ধরো, দু-এক ওয়াসাক হলেই চলবে।'
- ঠিক আছে, কিছু একটা বন্ধক রাখো আমার কাছে।
- কী চাও তুমি?
- তোমাদের নারীদের বন্ধক রাখো।
- কী যে বলো তুমি! এটা কী করে হয়! তুমি হলে আরবের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ!
- আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে তোমাদের ছেলেদের বন্ধক রাখো।
- না না, সেটাই বা কীভাবে করি! এটা খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। লোকে আমাদের ব্যাপারে বলাবলি করবে। সামান্য কিছু খাবারের জন্য আমরা আমাদের সন্তানকে বন্ধক দিয়েছি! তারচেয়ে বরং তোমার কাছে কিছু অস্ত্র বন্ধক রাখি।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তা-ই করো।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ অস্ত্র আনতে চলে গেলেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনায়, আরেকজন সাহাবি, কাবের দুধ ভাই আবু নাইলাও কাবের কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহর ব্যাপারে একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগলেন, 'এই এক লোক মুহাম্মাদ! তার কারণে আজ আমাদের যত দুর্ভোগ! আরবরা আজ আমাদের বিরুদ্ধে এক হয়েছে। আমাদের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজন ধ্বংস হতে চলেছে। জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়েরা দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।'
কাব বললো, 'আল-আশরাফের ছেলে আমি। পরিস্থিতি যে এই পর্যায়ে গড়াবে তা কি আমি তোমাদের বলিনি?'
রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে এসব কথাবার্তা বলে আবু নাইলা কাবের কাছে বিশ্বস্ত হবার চেষ্টা করছিলেন। তিনিও কাবের সাথে কিছু অস্ত্রের বিনিময়ে খাবার কেনার চুক্তি করলেন। সেইসাথে আরও কিছু বন্ধুকে নিয়ে আসতে চাইলেন। বললেন যে তারাও অস্ত্র বন্ধক রেখে কিছু খাবার নিতে চায়। কা'ব রাজি হলো। সেদিনের মতো তিনি চলে গেলেন। ফিরে এল পাঁচ জনের একটি দল। দিনটি ছিল ৩য় হিজরী, ১৪ রবিউল আউয়াল। রাসূলুল্লাহ তাঁদেরকে বাকী আল-গারকাদ পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। তাদের মিশন সফল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন।
আবু নাইলা কাবের বাসায় এসে তাকে ডাক দিলেন। কা'ব তখন মাত্র বিয়ে করেছে। তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী রাতের অন্ধকারে আবু নাইলার ডাক শুনে ভয় পেয়ে গেল। স্বামীকে বললো, 'কোথায় যাচ্ছো তুমি?'
কাব বললো, 'আমার ভাই আবু নাইলা আমাকে ডাকছে।'
- তুমি যেও না! আমি এই ডাকে রক্তের গন্ধ পাচ্ছি!
- আরে চিন্তা কোরো না, ও আমার ভাই আবু নাইলা। যার পৌরুষ আছে, সে বর্শার লড়াইয়ে সাড়া দিতেও ভয় করে না।
নতুন স্ত্রীর কাছে নিজেকে সাহসী প্রমাণ করে কা'ব নিচে নেমে এল। তাঁরা প্রস্তাব দিলেন, 'এক কাজ করি, চলো আজুজ ঘাঁটির দিকে যাই।' কা'ব রাজি হলো। তারা তাকে তার দুর্গ থেকে সরিয়ে দূরে নিতে চাচ্ছিলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে, আবু নাইলা অথবা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা দুজনের একজন কাবের চুলে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাহ! তোমার শরীর থেকে কী সুন্দর ঘ্রাণ আসছে!' কা'ব বললো এই সুঘ্রাণ তার স্ত্রীর থেকে এসেছে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, আমি কি তোমার এই সুঘ্রাণ নিতে পারি?'
'অবশ্যই পারো!' কা'ব বললো।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা কাবের চুল ধরে সুঘ্রাণ নিলেন। দলের অন্য সদস্যদের তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন, তিনি সংকেত দেওয়া মাত্র যেন তাঁরা একযোগে কাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আবার গন্ধ শুঁকে দেখতে চাইলেন, কা'ব এবারও রাজি হলো। এইবার তিনি সুযোগমতো তার মাথা জাপটে ধরলেন, অন্যদের ডেকে বললেন, 'আসো তোমরা!' বাকিরাও এগিয়ে এলেন আর তরবারি দিয়ে কাবকে কোপাতে লাগলেন। কিন্তু শরীরে বর্ম থাকায় হত্যা করলে পারলেন না। কা'ব চিৎকার করে উঠলো, সাথে সাথে দুর্গের আলো জ্বলে উঠলো। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা বুঝলেন সময় কম। একটা ছুরি বের করে কাবের তলপেটে সজোরে চালিয়ে দিলেন। কা'ব শেষ হয়ে গেল।
সবাই চলে এলেন। ধস্তাধস্তির সময় এলোপাতাড়ি তরবারি চালনার ফলে পাঁচ জনের একজন আহত হয়েছিলেন। তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাঁকে কোলে করে মদীনায় নিয়ে আসতে হয়। মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছেই তাঁরা দেখা পেলেন রাসূলুল্লাহর। রাসূলুল্লাহ মিশন সাফল্য দেখে খুশিতে বললেন, 'এই মুখগুলো উজ্জ্বল হোক!' আর তাঁরাও বললেন, 'আপনার চেহারাও উজ্জ্বল হোক, ইয়া রাসূলুল্লাহ!' রাসূলুল্লাহ এগিয়ে এসে আহত সাহাবির ক্ষতস্থানে হাত রাখলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে গেলেন।
কা'ব ইবন আল-আশরাফের হত্যা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা:
১) সাহাবিদের নিবেদিত আত্মা। রাসূলুল্লাহর যেকোনো আদেশ সাহাবিরা খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতেন। কা'ব ইবন আশরাফকে হত্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা দুশ্চিন্তায় তিন দিন কিছু খেতে পারেননি। এই খবর রাসূলুল্লাহর পৌঁছলে তিনি বললেন, 'মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা, কী হয়েছে তোমার?' তিনি জবাব দিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি, কিন্তু জানি না সে কথা রাখতে পারবো কিনা।'
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। ভয় পাচ্ছিলেন এমনটা নয়। বরং রাসূলুল্লাহর দেওয়া মিশন সফলতার সাথে সম্পন্ন করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। চিন্তায়, উদ্বেগে তিন দিনের জন্য তার খাওয়া-দাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়। এটাই বলে দেয়, সাহাবিরা তাদের কাজের ব্যাপারে কতটা নিবেদিত ছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ কোনো আদেশকে হালকাভাবে নিতেন না। যদি কথা দিতেন, তবে সেটা করেই ছাড়তেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে শান্ত ও নির্ভার করতে বললেন, 'তুমি তোমার সাধ্যের সর্বোচ্চটা করো, ফলাফল আল্লাহর হাতে।' অর্থাৎ তুমি সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দাও, তাহলেই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল তোমার আমলকে কবুল করবেন। তোমার কাজের পরিণতির জন্য তুমি দায়ী থাকবে না, দায়ী থাকবে কেবল সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছো কিনা সে ব্যাপারে। এরপর ফলাফল যা হওয়ার সেটাই হবে। ভালো কাজে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। যাই করি না কেন, যেনতেনভাবে না করে তা সুন্দর ও সুচারুরূপে করা চাই। এবং একই সাথে দরকার নিজেদের করা প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া। কথা না রাখা মুনাফিকের লক্ষণ।
২) ঘটনার প্রতিক্রিয়া। আবু দাউদের একটি বর্ণনা অনুসারে, এই ঘটনার পর ইহুদি এবং মুশরিকরা খুব ভয় পেয়ে যায়। তারা পরদিন সকালে রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বলে, 'গতকাল রাতে আমাদের নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।' তখন রাসূলুল্লাহ তাদেরকে কা'বকে কেন হত্যা করা হয়েছে সে কথা উল্লেখ করেন। এরপর তাদের সাথে কৃত চুক্তি নবায়ন করেন বা তাদেরকে একটি অঙ্গীকারনামা লিখে নিয়ে আসতে বলেন যেখানে তারা এই ধরনের কাজ দ্বিতীয়বার না করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
৩) হত্যার কারণ। কাবকে কেন এবং কোন পন্থায় হত্যা করা হয়েছিল সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে শাইখ ইবন তাইমিয়্যার বিখ্যাত কিতাব আস-সারিম আল-মাসলুল আলা শাতিম আর-রাসূল। সেখানে আল-ওয়াকীদির একটি বর্ণনা এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে,
'পরদিন সকালে ইহুদিরা মুশরিকদের সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, আমাদের নেতাকে গত রাতে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। অথচ আমরা জানি সে কোনো অপরাধ করেনি। তখন রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, যদি সে অন্যদের মতো চুপ থাকতো, তাহলে তাকে হত্যা করা হতো না। কিন্তু সে আমাদের কষ্ট দিয়েছে, তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের ব্যঙ্গ করেছে। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি একই রকম কাজ করে, তাহলে তরবারি দিয়েই আমরা তার সাথে বোঝাপড়া করবো।"
অর্থাৎ, ইহুদি ও মুশরিকদের অভিযোগ ছিল, কেন রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে অতর্কিতে কা'বকে হত্যা করা হয়েছে। তারা এই হত্যাকাণ্ডকে চুক্তিবিরোধী এবং বিচারবহির্ভূত হিসেবে সাব্যস্ত করতে চাইছিল। রাসূলুল্লাহ তখন তাদের বলেন, কা'বের মতো অনেকেই আছে যাদের অন্তরে ইসলামবিদ্বেষ আছে। কিন্তু কেবল কা'বকেই হত্যা করা হয়েছে কারণ সে কথার মাধ্যমে মুসলিমদের কষ্ট দিয়েছে এবং ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছে।
কেন কা'ব ইবন আশরাফকে হত্যা করা হয়েছে, সে আলোচনায় শাইখ ইবন তাইমিয়্যা মন্তব্য করেন,
'কা'বকে হত্যা করা হয়েছে তার কবিতার জন্য, যা সে মক্কায় যাওয়ার আগেই লিখেছিল... কা'ব যা (অপকর্ম) করেছে সেগুলো করেছে জবান দিয়ে। কাফিরদের মৃত্যুতে তার রচিত শোকগাঁথা, (মুসলিমদের সাথে) যুদ্ধে (কুরাইশদের) উৎসাহ দেওয়া, তার অভিশাপবাণী, মানহানিকর কথাবার্তা, দ্বীন ইসলামকে ছোট করা এবং কাফিরদের দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া সবকিছুই সে করেছে জবান দ্বারা। সে মুসলিমদের সাথে শারীরিকভাবে যুদ্ধ করেনি, বরং সে মুসলিমদের ক্ষতি করেছে তার জবান দিয়ে। এটা তাদের জন্য প্রমাণ, যারা (কা'বকে কেন হত্যা করা হয়েছে) এই বিষয়ে তর্ক করে। আর এটা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত যে, যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কবিতা এবং সম্মানহানির মাধ্যমে কষ্ট দেবে, তার জান-মালের কোনো নিরাপত্তা থাকে না।
৪) সামরিক অপারেশনে ধোঁকা দেওয়ার বৈধতা। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার কাছে মনে হয়েছিল মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে শত্রুর আস্থাভাজন হতে পারলে এই অপারেশনটি সফলভাবে করা যাবে। তাই তিনি মিথ্যা বলার অনুমতি চেয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সেটার অনুমতি দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ যদি তার এ মিশন সফল করার জন্য কুফরি করার অনুমতি পান, তাহলে একজন মুসলিম এ ধরনের কাজ সম্পন্ন করার জন্য নিদেনপক্ষে কুফরি থেকে ছোট কাজ করার অনুমতি রাখে। উদাহরণস্বরূপ, যদি শত্রুবাহিনীর মধ্যে একজন মুসলিমকে গোয়েন্দাগিরি করতে হয়, সেক্ষেত্রে আলিমরা বলেছেন যে, সে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে না পারলে বসে পড়বে এবং বসে পড়তে না পারলে আঙুলের ইশারায় নামায পড়বে। সেটাও সম্ভব না হলে চোখের ইশারায় নামায পড়বে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ নবীজি সম্পর্কে কটূক্তি করেছিলেন। সাধারণ অবস্থায় এটা ভয়াবহ কুফরি। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সেটা অনুমোদিত ছিল। অর্থাৎ, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম আছে।
৫) ইহুদিদের সাথে শত্রুতা জাতিগত কারণে নয়। ধর্মবিশ্বাসে কা'ব ইহুদি হলেও জাতিগতভাবে ছিল আরব। এটিই প্রমাণ করে, ইহুদিদের প্রতি মুসলিমদের যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তা জাতিগত কারণে নয়। হিটলারের আদর্শ ছিল জাতীয়তাকেন্দ্রিক। সে ভাবতো, ইহুদি জাতি থেকে জার্মান জাতি উত্তম। আমরা সেরকমটা মনে করি না। জাতিপরিচয় নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমাদের আপত্তি মনমানসিকতা নিয়ে। ইহুদিরা তাদের হীন মনমানসিকতার জন্যই মুহাম্মাদ এবং মুসলিমদের নামে কটূক্তি করে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং ধোঁকা দেয়। তাদের পরিচয় নয়, বরং তাদের কাজই তাদেরকে মুসলিমদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়।
৬) সব যুদ্ধ ময়দানে হয় না। অনেক সময় গুপ্তহত্যার মাধ্যমে আল্লাহর দুশমনদের অনেক বেশি ক্ষতি করা সম্ভব। কা'ব ইবন আল-আশরাফের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। তাকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ইসলামবিদ্বেষীদের মিডিয়া প্রোপাগান্ডার জবাব কেবল মিডিয়া দিয়েই দিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, আল্লাহর রাসূল হাসসান ইবন সাবিতকে দিয়ে যেমন কা'ব ইবন আশরাফকে মিডিয়ার ময়দানে মোকাবেলা করেছেন, তেমনি তিনি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহকে পাঠিয়েছেন তাকে হত্যা করার জন্য। আল্লাহর রাসূলকে গালি দেওয়া কুফরি, আর এই কাজের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
টিকাঃ
¹ আস-সারিম আল মাসলুল ১/৩৯২ (শামেলা সংস্করণ)
2 সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৩৮, ২৩৯; অধ্যায় বন্ধক, হাদীস ৩; অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ৮৪। কিতাবুল সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস ১৪৬। সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস ২৯২।
3 আবু দাউদ, অধ্যায় কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে, হাদীস ৭৩।
4 আস-সারিম আল-মাসলুল, পৃষ্ঠা ১৫২
5 আস সারিম আল মাসলুল, ১/৮৪ (শামেলা সংস্করণ)।