📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান

📄 বনু কায়নুকার বিরুদ্ধে অভিযান


ইহুদি গোত্র বনু কায়নুকা মদীনা সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না। ক্রমাগত হুমকি-ধামকি, প্রকাশ্য শত্রুতা আর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তারা। মুসলিমদের সাথে তাদের বিরোধ হয়ে পড়ে অবশ্যম্ভাবী। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে একটি ঘটনা ঘটে:
বদর যুদ্ধের পর। একদিন এক মুসলিম মহিলা বাজারে গেলেন। মদীনায় অলংকারের ব্যবসা ছিল ইহুদিদের হাতে। সেই মুসলিম মহিলা অলংকার কেনা বা বেচার জন্য বাজারে গিয়েছিলেন। বাজারে এক দোকানের পাশে মেঝেতে বসলেন, ইহুদি দোকান মালিকের হাতে অলংকার দিলেন। সেখানে আরও কিছু ইহুদি লোক ছিল। তারা তাঁর মুখের পর্দা সরানোর জন্য পটাতে চাইলো। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। এর মধ্যে দোকানের মালিক চুপিচুপি তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাপড়ের নিচ দিকটা পেরেক দিয়ে মাটির সাথে গেঁথে দিলো। মহিলা এসব খেয়াল করেননি। যখনই উঠে দাঁড়াতে গেলেন, পেরেকের টান খেয়ে তাঁর শরীর থেকে কাপড় সরে গেল। তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। একজন মুসলিম নারীকে এভাবে অপদস্থ হতে দেখে বাজারেরই এক মুসলিম পুরুষ প্রচণ্ড রেগে গেলেন। তিনি ইহুদি দোকানদারকে আক্রমণ করে মেরে ফেললেন। আর তার পরপরই ইহুদি মাস্তানগুলোও মুসলিম লোকটার ওপর চড়াও হলো। তাঁকে মারতে মারতে তারা মেরেই ফেললো। এর জের ধরে নিহত মুসলিম ব্যক্তির গোত্রের সাথে বনু কায়নুকার মারামারি বেঁধে গেল।
এই সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে রাসূলুল্লাহর কাছে প্রেরণ করা হলে তিনি মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে সেনাদল প্রস্তুত করে অভিযানে নামলেন। ঘটনাটি দ্বিতীয় হিজরী বছরের শাওয়াল মাসে। মদীনার অস্থায়ী গভর্নর ছিলেন আবু লুবাবাহ ইবন আল-মুনযির। রাসূলুল্লাহ তাদের দুর্গ আক্রমণ করে অবরোধ করলেন। তাদের জানিয়ে দিলেন, তাদের সাথে চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে।
১৫ দিনের জন্য তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখা হলো। আর এই ইহুদিরা, যারা কিনা দু'দিন আগেও নিজেদের যুদ্ধ দক্ষতা নিয়ে আস্ফালন করছিল, তারা তখন দুর্গের মধ্যে ভয়ে কেঁপে অস্থির! উপায় না দেখে তারা আত্মসমর্পণ করতেও রাজি হয়ে গেল; কোনো প্রতিরোধ গড়লো না। রাসূলুল্লাহ আল মুনযির ইবন কুদামাহকে আদেশ দিলেন বনু কায়নুকার ইহুদিদের বেঁধে রাখতে।
ইহুদিদের বন্ধু, মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই খুব কষ্ট পাচ্ছিল। ইহুদিদের এই করুণ পরাজয়ের দৃশ্য তাকে খুব পীড়া দিচ্ছিল। সে আল মুনযিরকে আদেশের স্বরেই বললো,
- ওদের ছেড়ে দাও! কী! ছেড়ে দেবো মানে? আল্লাহর রাসূল আদেশ করেছেন এদের বেঁধে রাখতে আর তুমি বলছো এদের ছেড়ে দিতে? যে এদেরকে বাঁধন খুলে দেবে, আমি তাকে হত্যা করবো।
আল মুনযিরের কড়া জবাব পেয়ে আবদুল্লাহ ইবন উবাই বুঝতে পারলো এই মদীনা আর তার মদীনা নয়। এই মদীনা এখন আল্লাহর রাসূলের মদীনা, এখানে তার কথা চলে না। বাধ্য হয়ে সে রাসূলুল্লাহর কাছে গেল। ইহুদিদেরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগলো। বললো, 'আমার মিত্রদের প্রতি একটু সদয় হোন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!' রাসূলুল্লাহ কোনো সাড়া দিলেন না। ইবন উবাই দ্বিতীয়বার একই কথা বললো, 'আমার মিত্রদের প্রতি সদয় হোন, আপনার দোহাই লাগে!' রাসূলুল্লাহ পেছনে ফিরলেন, কিন্তু এবারও কোনো সাড়া দিলেন না। ইবন উবাই মরিয়া হয়ে উঠলো, সে রাসূলুল্লাহর পকেটে আর বর্মের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল যেন রাসূলুল্লাহ তাকে উপেক্ষা করতে না পারেন।
'ছাড়ো আমাকে!' রাসূলুল্লাহকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি প্রচণ্ড রেগে গেছেন। তিনি বললেন, 'তোমার ওপর অভিশাপ পড়ুক! আমাকে যেতে দাও!' ইবনে উবাই তার হাতের মুষ্টি আরও শক্ত করে বললো, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আমার মিত্রদের প্রতি সদয় হবেন না, ততক্ষণ আমি আপনাকে ছাড়ব না। তাদের মাঝে ৭০০ জন যোদ্ধা আমাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, আর আপনি তাদের সবাইকে এক সকালে মেরে সাফ করতে চান? আমি তো আমার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বোধ করছি!'
'ঠিক আছে, তবে তারা তোমারই থাকবে।' ইবন উবাইয়ের চাপাচাপিতে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ছেড়ে দিলেন; হত্যা করলেন না। তবে মদীনা থেকে বের করার আদেশ দিলেন।
বনু কায়নুকার লোকজন এ যাত্রায় জানে বেঁচে গেল। মদীনা থেকে বের হয়ে শামের (সিরিয়া) দিকে যাত্রা করল। যাত্রার তদারকিতে ছিলেন উবাদা ইবন সামিত। মদীনা থেকে বেরোবার আগে তাদের কাছে থেকে যুদ্ধের গনিমত হিসেবে টাকা নেয়া হয়। এই টাকা মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
বনু কায়নুকার অভিযান থেকে শিক্ষা:
প্রথমত, বিচক্ষণতা। রাসূলুল্লাহ ইবন উবাইর সাথে সরাসরি শত্রুতা এড়িয়ে গিয়েছেন। বরং ধৈর্যের সাথে তাকে সামাল দিয়েছেন। নম্রতা দেখানোর কারণে সম্ভাবনা ছিল যে, সে সত্যিকারের মুসলিম হবে আর মদীনায় ঐক্য ফিরে আসবে, যদিও সেটা হয়নি। তবে সংঘাত এড়িয়ে লাভ হয়েছে এই যে, তার মুনাফিকী ধীরে ধীরে আপনিই প্রকাশ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে বেশিরভাগ লোকই তার আসল উদ্দেশ্য ধরতে পেরে তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম নারীর সম্মান। আল্লাহর রাসূল পুরো একটি গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন শুধু একজন মুসলিম নারীর সম্মান রক্ষার্থে। মুসলিম নারীর অধিকার ও ইজ্জত রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা রাসূলুল্লাহর এই একটি সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়। আজকে মুসলিম বিশ্বে কত বোন কেঁদে চলেছেন, অথচ সাড়া দেওয়ার কেউ নেই। যেন দুনিয়া থেকে পুরুষ মানুষ উঠে গেছে। অথচ কথা ছিল, মুসলিম পুরুষ মাত্রই তার বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। রাসূলুল্লাহও আমাদের সে শিক্ষাই দিয়েছেন। পরবর্তী যমানার খলিফারাও সেই সুন্নাতেরই অনুসরণ করেছেন। আব্বাসীয় খলিফা আল মু'তাসিমের সময়ে এক মহিলাকে রোমান এক সৈনিক লাঞ্ছিত করেছিল। আল-মু'তাসিম সেই বোনের আর্তিতে সাড়া দিয়ে তৎকালীন সুপারপাওয়ার রোমানদের বিরুদ্ধে পুরো একদল সৈন্য পাঠিয়ে দেন।
তৃতীয়ত, আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা। এ প্রসঙ্গে উবাদা ইবন সামিতের ঘটনা উল্লেখ্য। রাসূলুল্লাহর সাহাবি উবাদা ইবন সামিত জাহিলিয়াতের সময় ইহুদিদের বন্ধু ছিলেন। এ ঘটনার পর তিনি নিজ থেকে গিয়ে রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার আনুগত্য তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল আর মু'মিনদের প্রতি। আমি ঐসব কাফিরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলাম। যত যাই হোক, তাদেরকে আমি আর সমর্থন করবো না।' আবদুল্লাহ ইবন উবাই ঠিক সেই মুহূর্তে এসে উবাদাকে বললো, 'তুমি কী করে পারলে এই লোকগুলোকে ভুলে যেতে? এরা কি তোমাকে অমুক-অমুক সময়ে সাহায্য করেনি?' জবাবে উবাদা দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
'সেই দিন আর নেই আবদুল্লাহ, আমার অন্তর বদলে গেছে। ইসলাম আগের সকল বন্ধুত্বকে মুছে দিয়েছে। তুমি আজকে এমন কিছুকে আঁকড়ে ধরে আছো, যা আগামীকাল ভুল হিসেবে জানবে।'
বনু কায়নুকাকে মদীনা ছেড়ে যাওয়ার জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। তারা উবাদাকে তাদের অতীত জীবনের বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করে যেন তাদের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তিনি তাদের বলেন, 'না, একটা ঘণ্টাও বাড়ানো হবে না। যেদিন থেকে তোমরা আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ, সেদিন থেকে তোমরা আর আমার বন্ধু নও।'
ইবনে উবাই আর উবাদা দুটি মানুষ, দু'জনেই জাহিলিয়াতে ইহুদিদের বন্ধু ছিলেন, দুজনেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম পেয়ে উবাদা বদলে যান। আর ইবন উবাই যা ছিলো তাই রয়ে যায়। ইসলাম কিছু মানুষকে আপন করে, কিছু মানুষকে করে পর। জাহিলিয়াতে ইহুদিরা উবাদার বন্ধু হলেও ইসলাম গ্রহণের পর তারা উবাদার শত্রুতে পরিণত হয়। ইসলাম বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও মিত্রতার নতুন সংজ্ঞা শেখায়। এ ঘটনায় কুরআনের আয়াত নাযিল হয়।
"হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা (কখনো) ইহুদি-খ্রিস্টানদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। (কেননা) এরা নিজেরা (সব সময়ই) একে অপরের বন্ধু; তোমাদের মধ্যে কেউ যদি (কখনো) এদের কাউকে বন্ধু বানিয়ে নেয় তাহলে সে তাদেরই দলভুক্ত হয়ে যাবে; আর আল্লাহ তাআলা কখনো জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। অতপর যাদের অন্তরে (মুনাফিক্বীর) ব্যাধি রয়েছে তাদের তুমি দেখবে, তারা দৌড়ে গিয়ে তাদের সাথে এই বলে মিলিত হচ্ছে যে, 'আমাদের আশংকা হচ্ছে, কোনো বিপর্যয় এসে আমাদের ওপর আপতিত হবে।' পরে হয়তো আল্লাহ তাআলা (তোমাদের কাছে) বিজয় নিয়ে আসবেন কিংবা তার কাছ থেকে অন্য কিছু (অনুগ্রহ তিনি দান করবেন), তখন (তা দেখে এ) লোকেরা নিজেদের মনের ভেতর যে কপটতা লুকিয়ে রেখেছিল, তার জন্যে ভীষণ অনুতপ্ত হবে।” (সূরা মায়িদা, ৫: ৫১, ৫২)
দ্বিতীয় আয়াতে ইবন উবাইয়ের কথা বলা হয়েছে। সে আশঙ্কা করছিল, যদি তার মিত্র ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, তাহলে সে বিপদে পড়বে। সে ধরেই নিয়েছিল ইহুদিদের সাথে থাকলেই সে নিরাপদে থাকবে। মুনাফিকরা সাধারণত কাফিরদের কাছেই আশ্রয় ও নিরাপত্তা খোঁজে, এটাই তাদের স্বভাব। আয়াতের বাকি অংশে আল্লাহ বলেন তিনি মু'মিনদের বিজয় দেবেন। এর ফলে মু'মিনরা মুনাফিকদের প্রভু আর রক্ষক কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করবে।
“(তখন) ঈমানদার লোকেরা বলবে, এরাই কি ছিল সেসব মানুষ, যারা আল্লাহ তাআলার নামে বড় বড় শপথ করতো (যে), তারা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে আছে? (এই আচরণের ফলে) তাদের কার্যকলাপ বিনষ্ট হয়ে গেল, অতপর তারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হে মানুষ, তোমরা যারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছো, তোমাদের মধ্যে কোনো লোক যদি নিজের দ্বীন (ইসলাম) থেকে (মুরতাদ হয়ে) ফিরে আসে, (তাতে আল্লাহ তাআলার কোনো ক্ষতি নেই) তবে আল্লাহ তাআলা অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটাবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন, তারাও তাঁকে ভালোবাসবে। তারা হবে মু'মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তারা করবে না। (মূলত) এ (সাহসটুকু) হচ্ছে আল্লাহর একটি অনুগ্রহ, যাকে চান তাকেই তিনি তা দান করেন। আল্লাহ তাআলা প্রাচুর্যময় ও প্রজ্ঞার আধার।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫: ৫৩, ৫৪)
মিডিয়া বা কাফিররা কী বলছে বিজয়ী দল কখনো তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহ আযযা ওয়া জালকে সন্তুষ্ট রাখবে ততক্ষণ তা-ই যথেষ্ট।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সামরিক কর্মকাণ্ড

📄 বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সামরিক কর্মকাণ্ড


১) গাযওয়াহ আল কুদর: বদর যুদ্ধের মাত্র সাত দিন পরেই এই অভিযান সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহর গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারে যে, বনু সালিম গোত্র মুসলিমদের ওপর আক্রমণের ষড়যন্ত্র করছে। তাই রাসূলুল্লাহ আকস্মিকভাবে তাদেরকে আগেভাগে আক্রমণ করে বসেন। এ অভিযানে তেমন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বনু সালিম গোত্র পাঁচশো উট রেখে পালিয়ে যায়। উটগুলো মুসলিমদের মাঝে গনিমত হিসেবে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেকের ভাগে দুটো করে উট পড়ে।
২) গাযওয়াহ আস-সাউয়ীক: বদরের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার লজ্জা মোচন করতে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের কাছে যায়। বনু নাযির গোত্রের প্রধান সাল্লাম ইবন মিশকামের বাসাতেই মেহমান হিসেবে ওঠে। মদীনার উপকণ্ঠে কীভাবে আকস্মিক আক্রমণ করতে হবে সে বিষয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়। ইহুদিদের কাছ থেকে কুরাইশরা অনেক মূল্যবান তথ্য লাভ করে। আবু সুফিয়ান ঠিক করলো, আকস্মিক আক্রমণ করে মুসলিমদের ভড়কে দেবে। সে কিছু সৈন্য নিয়ে মদীনার উপকণ্ঠে উরাইদ নামের এক স্থানে অতর্কিতে আক্রমণ করে দুইজন মুসলিমকে হত্যা করে। এরপর একটা খেজুর বাগানে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ দুইশো সৈন্য নিয়ে তাদের তাড়া করেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তার সৈন্যসমেত পালিয়ে যায়। পালাবার সময় নিজেদের খাবার ফেলে চলে যায়। তবে কোনো সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
৩) গাযওয়াহ যি আমর: রাসূলুল্লাহর গোয়েন্দা বিভাগ এবারও খবর পেয়ে যায় সালাবা এবং মুহারিব -- এ দুটি গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি সাড়ে চারশো মুজাহিদের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী নিয়ে গোত্র দুটোর দিকে অগ্রসর হন। পথে হুবার নামে শত্রুপক্ষের এক লোককে গ্রেপ্তার করা হলো। তাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হলে সে মুসলিম হয়ে যায়। ওদিকে রাসূলুল্লাহর সেনাবাহিনী আসছে খবর পেয়ে গোত্র দুটো আশেপাশের পাহাড়ী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পালিয়ে যায়। এরপরও রাসূলুল্লাহ সেখানে এক মাস অবস্থান করেন। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দেরকে দাপট দেখানো আর বেদুইনদের সন্ত্রস্ত করে রাখা। এ অভিযানে একটি মজার ঘটনা ঘটে, একটি মু'জিযা। যখন মুসলিমরা সেখানে পৌঁছালো, তখন বৃষ্টি হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহর কাপড় ভিজে চুপসে একাকার। তিনি বর্ম খুলে গায়ের কাপড় একটা গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় গাছের নিচেই শুয়ে পড়লেন। কখন যেন চোখ লেগে গেল। এমন সময় শত্রুপক্ষের মুহারিব গোত্রপ্রধান দাসুর ইবন আল-হারিস চুপিচুপি সেখানে চলে এল, হাতে খোলা তরবারি! রাসূলুল্লাহর ওপর দাঁড়িয়ে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে জিজ্ঞেস করল, 'এই যে মুহাম্মাদ! কে তোমাকে এখন আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' রাসূলুল্লাহ এই অকস্মাৎ আক্রমণে একটুও না ভড়কে আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিলেন, 'আল্লাহ আমায় রক্ষা করবেন।' আর এ কথা বলার সাথে সাথে দাসুরের হাত থেকে তার তরবারি পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ তরবারিটি কুড়িয়ে নিয়ে দাসুরের সামনে দাঁড়ালেন, 'দাসুর! তোমাকে এখন কে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে?' মুহূর্তের মাঝে দৃশ্যপট বদলে গেল। দাসুর ভড়কে যায়। রাসূলুল্লাহর কাছে নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে থাকে, আল্লাহর রাসূলও তাকে মাফ করে দিলেন। দাসুর এরপর মুসলিম হয়ে যায়। এই কাহিনী গিয়ে তার গোত্রকে শোনায়, 'জানো কী হয়েছে? এক ইয়া লম্বা লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো আর আমার বুকে ধাক্কা দিল।' এই লম্বা লোকটি ছিলেন আসলে জিবরীল। ঘটনাটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মু'জিযা। দাসুর তার গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিলে অনেকেই মুসলিম হয়ে যায়।
৪) সারিয়াহ আল কারদাহ: ক্রমাগত সামরিক অভিযানের মুখে কুরাইশরা আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। এছাড়া মক্কা থেকে সিরিয়াগামী যে বাণিজ্যপথ ছিল তাও হুমকির মুখে। হন্যে হয়ে কুরাইশরা ভিন্ন একটি পথে তাদের ব্যবসায়িক পণ্য বহনের চিন্তা করে। নজদ হয়ে এরপর সিরিয়া প্রবেশের একটি পথ বেছে নেওয়া হয়, যদিও সেটাও ছিল বেশ খরচসাপেক্ষ। তাদের এই নতুন পথে হানা দিতে রাসূলুল্লাহ যাইদ ইবন হারিসের নেতৃত্বে একশো মুসলিম বিশিষ্ট সারিয়া প্রেরণ করেন। তাঁরা সফলভাবে কুরাইশ কাফেলা আক্রমণ করেন। কাফেলার প্রহরীরা পালিয়ে যায় আর মুসলিমরা কাফেলা দখল করে নেয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px