📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 গুপ্তহত্যার চেষ্টা

📄 গুপ্তহত্যার চেষ্টা


উমাইর ইবনে ওয়াহাব ছিল কুরাইশদের মধ্যে অন্যতম নিকৃষ্ট লোক। একদিন সে সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে কাবার পাশে বসে বলছিল, 'যদি আমার এত ঋণ না থাকত, যদি বাচ্চাকাচ্চাদের দেখাশোনা করতে না হতো, তাহলে আমি নিজেই মুহাম্মদকে গুপ্তহত্যা করতাম।' সাফওয়ান এই কথার সুযোগ নিয়ে বললো, 'তুমি চিন্তা কোরো না, আমি আছি। যদি তোমার কিছু হয়, আমি তোমার ঋণ শোধ করে দেব আর তোমার বাচ্চাদেরও দেখাশোনা করবো।'

উমাইর ইবনে ওয়াহাব সাফওয়ানের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করলো যে, সে রাসূলুল্লাহকে হত্যা করতে মদীনায় যাবে। উমাইর তার তরবারী বিষের মধ্যে ভালো করে চুবিয়ে বিষ মাখিয়ে নিল। তারপর সেটি নিয়ে মদীনায় গেল। মদীনার রাস্তায় সে হাঁটছে, পথিমধ্যে পড়লো একটি ছোটখাট সমাবেশ। সেখানে উমার ইবন খাত্তাব কিছু লোকের সাথে বদর যুদ্ধ নিয়ে গল্প করছিলেন। মুসলিমদের মাঝে তখনও বদরের রেশ কাটেনি, সবার মুখে বদর নিয়ে কথা। যারা বদরে অংশ নেয়নি তারা আগ্রহভরে উমারের মুখে বদরের কথা শুনছে।

উমাইর ইবনে ওয়াহাবকে দেখে উমার রাঃ বলে উঠলেন, 'আল্লাহর দুশমন উমাইর ইবনে ওয়াহাব ভালো কোনো উদ্দেশ্যে এখানে আসেনি।' এই বলে উমার রাঃ সেখান থেকে উঠে গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন আর খাপ থেকে তরবারী বের করে তার গলায় ঠেকালেন। তারপর তাকে ধরে রাসূলুল্লাহ ﷺ কাছে নিয়ে গেলেন আর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর এই শত্রু এখানে কোনো ভালো উদ্দেশ্যে আসেনি!' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'উমার, তাকে ছেড়ে দাও, আমি দেখছি বিষয়টা।' উমার রাঃ তাকে ছেড়ে দিলেন কিন্তু অন্যান্য সাহাবাদের রাঃ বলে দিলেন তারা উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে যেন চোখে চোখে রাখে এবং রাসূলুল্লাহকে ﷺ পাহারা দিয়ে রাখে।

উমায়ের ইবন ওয়াহাব রাসূলুল্লাহকে ﷺ সম্ভাষণ জানাল, 'শুভ সকাল', রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আল্লাহ আমাদেরকে এই কথার পরিবর্তে একটি উত্তম সম্ভাষণ শিখিয়েছেন – আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ।' উমাইর ইবনে ওয়াহাব বললো, 'খুব বেশী দিন হয়নি আপনি এই সম্ভাষণ ব্যবহার করছেন।' রাসূলুল্লাহ ﷺ এ নিয়ে কথা বাড়ালেন না। তিনি আসল কথায় চলে গেলেন, 'তুমি কেন এসেছ বলোতো।' সে বললো, 'আমি এসেছি আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে।' তার ছেলের নাম ওয়াহাব। সে বদরে যুদ্ধবন্দী হয়েছিল সত্যি, কিন্তু এটা ছিল তার মদীনায় ঢোকার অজুহাত মাত্র। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'সত্যি করে বলো, কেন তুমি এসেছ?'

উমায়ের জোর দিয়ে বললো সে তার ছেলেকে মুক্ত করতেই এসেছে। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আচ্ছা, তাহলে তুমি তরবারী কেন বহন করছ?' উমায়ের জবাব দিল, 'চুলোয় যাক এই তরবারি! এই তরবারি আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি!' রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'না, তুমি মিথ্যা বলছো, তুমি এসেছ আমাকে হত্যা করতে। তুমি কাবার পাশে বসে সাফওয়ানের সাথে পরামর্শ করেছো। তুমি তাকে বলেছো যে, যদি তুমি ঋণে জর্জরিত না হতে, তোমার বাচ্চাকাচ্চাকে দেখাশোনা করতে না হতো, তাহলে তুমি আমাকে হত্যা করতে। এরপর সাফওয়ান তোমাকে বলেছে, 'যদি তোমার কিছু হয়, তখন আমি তোমার দেনা শোধ করে দেব আর আমি তোমার বাচ্চাদের দেখাশোনা করব'। এরপর তুমি সাফওয়ানের সাথে এই মর্মে রাজি হয়েছ যে, তুমি এই ব্যাপারটি গোপন রাখবে এবং তুমি কাউকে এ কথা জানাবে না।'

উমায়ের বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল! সে বললো, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল! আর কেউ আমার ও সাফওয়ানের এই কথোপকথন আড়ি পেতে শুনেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল আপনাকে এই কথোপকথনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমাদের এই ভাইকে তোমরা সাহায্য করো। তাকে কুরআন শিক্ষা দাও এবং তার ছেলেকে মুক্ত করে দাও।' এভাবে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব মুসলিম হয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন।

ওদিকে সাফওয়ান মক্কার লোকেদের আশ্বস্ত করছিলেন, 'শীঘ্রই তোমরা এমন খবর শুনবে যা তোমাদেরকে বদরের দুঃখ ভুলিয়ে দেবে।' কিন্তু সাফওয়ানের আশায় গুড়েবালি ঢেলে দিয়ে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব মক্কায় ফিরে ইসলামের ঘোষণা দিলেন। সাফওয়ান প্রচণ্ড রেগে গেল। সে পণ করলো আর কখনো উমায়েরের সাথে কথা বলবে না। উমাইর ইবনে ওয়াহাব, যিনি কুরাইশদের মধ্যে একজন খুব জঘন্য ধরনের লোক ছিলেন, তিনিই তখন ইসলামের একজন দাঈতে পরিণত হলেন, মুসলিমদের উপর নিপীড়ন করার পরিবর্তে এবার তিনি সেসব মানুষকে পীড়া দিতে থাকলেন যারা মুসলিমদের পীড়া দিত। অনেক লোক উমাইর ইবনে ওয়াহাবের দাওয়াতের ফলে মুসলিম হয়েছিল।

টিকাঃ
১১৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px