📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কী ছিল তাদের অপরাধ?

📄 কী ছিল তাদের অপরাধ?


উকবা ইবন আবি মুয়াইত কাবার পাশে নামাজরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর ঘাড়ে পা দিয়ে চেপে ধরে। রাসূলুল্লাহ বলেন, ওই মুহূর্তে তাঁর মনে হচ্ছিল যেন উনার চোখ কোটর থেকে বের হয়ে আসবে আর তিনি মারা যাবেন। এই একই লোক অন্য আরেকদিন রাসূলুল্লাহর রুকুরত অবস্থায় তাঁর উপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয়। ফাতিমা এসে সেগুলো সরান। কুরাইশদের মধ্যে উকবা ছিল জঘন্য এক শয়তান। তাই তার শাস্তি ছিল কঠোর।

নষর ইবনে হারিস রাসূলুল্লাহর গায়ে হাত দেয়নি কিংবা মুসলিমদেরকে নির্যাতন করেনি। তার অপরাধ ছিল সে ইসলামের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। সে যুগে সাহিত্য চর্চা হতো মুখে মুখে। সে পারস্য থেকে ইসবান্দিয়া আর রুস্তমের গল্প শিখে মক্কায় ফিরে এসে সে সব গল্পের আসর বসায় আর দাবি করতে থাকে তার গল্প মুহাম্মদের গল্পের চেয়ে সেরা। সে মানুষদের বলতো: 'মুহাম্মদের কী এমন আছে যে সে নবী হয়ে গেল? আমি নযর ইবনে হারিসও তো তার মতো করে গল্প বলতে পারি!' এভাবে করে সে মানুষকে রাসূলুল্লাহর মজলিস থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানারকম কারসাজি করতো।

সকল যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কেবল এই দুইজনকে হত্যা করা হয় আর বাকিদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাহাবাদের বিশেষভাবে নির্দেশ দেন, 'যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদয় আচরণ করো।' মুসআব ইবন উমাইরের ভাই আবু আযীয বলেন, 'আনসারদের এক দল আমাকে বদর থেকে নিয়ে ফিরছিল। দুপুর ও রাতের খাবারের সময় হলে তারা রাসূলুল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আমাকে রুটি দিয়ে আপ্যায়ন করলো আর নিজেরা খেজুর খেল। তাদের হাতে যতগুলো রুটির টুকরা ছিল সেগুলোর সবকটি তারা আমাকে খেতে দেয়। আমি খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম। রুটিগুলো তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু তারা সেগুলো স্পর্শও করেনি, আমাকেই আবার ফিরিয়ে দেয়।' রুটি ছিল খেজুরের থেকে ভালো মানের খাবার আর আনসাররা রুটি না খেয়ে খেজুর দিয়ে ভোজ সারছিলেন অথচ বন্দীদেরকে রুটি দিচ্ছিলেন।

এ ব্যাপারে ইবনে হিশাম মন্তব্য করেন, 'এই আবু আযীয ছিল বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের পতাকাবাহক।' সে কোনো সাধারণ পদাতিক সৈন্য ছিল না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাহাবাদেরকে এই ধরনের মানুষের সাথেও ভালো ব্যবহারের আদেশ করেন।

আরেক যুদ্ধবন্দী আল-ওয়ালিদ ইবন মুঘীরাও প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছে, 'আমরা চড়তাম ঘোড়ার পিঠে আর তারা হাঁটতো।' অনেক বন্দী মুসলিমদের কাছ থেকে এরকম ভালো আচরণ পেয়ে মুসলিম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহর যুদ্ধ জীবনে এটা ছিল সাধারণ ঘটনা। অনেক যুদ্ধবন্দী মুসলিমদের কাছ থেকে ভালো আচরণ পেয়ে মুসলিম হয়ে তাদের সাথে থেকে যায়।

কোনো কোনো যুদ্ধবন্দী ইসলাম গ্রহণ করে বিষয়টা গোপন রাখতো। তারা মুসলিমদের সাথে না থেকে ইচ্ছে করেই নিজ গোত্রের কাছে ফিরে যেতো আর তারপর রাসূলুল্লাহ এর কাছে ফিরে এসে মুসলিম হতো। তারা নিজ গোত্রকে এটা দেখাতে চাইতো যে, তারা তরবারির ভয়ে মুসলিম হয়নি। যেমনটা হয়েছিল আবু আযীযের ক্ষেত্রে। সে ভালো আচরণ পেয়ে মুসলিম হয়েছে। কাজেই উত্তম চরিত্র প্রদর্শন করাটা জরুরি, হোক সেটা শত্রুর সাথে। মুসলিমদের উচিত শত্রুদের ক্ষেত্রে যথাযথ সম্মানের সাথে আচরণ করা। একজন মুসলিম নিষ্ঠুর, অসৎ কিংবা প্রতারক হবে না। সে সততা ও সম্মান দিয়ে সকলের সাথে আচরণ করবে। তার মধ্যে কোনো লুকোছাপা থাকবে না। সে খোলাখুলি কথা বলবে। তবে যারা নির্দয় আচরণ পাবার যোগ্য তারা ব্যতিক্রম; এদের সাথে ভালো আচরণ করার কোনো কারণ নেই। এদের সাথে নম্রভাবে আচরণ করা হলো বোকামি। কেননা এরা সত্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং মুসলিমদের ক্ষতি করে।

রাসূলুল্লাহর চাচা আল আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব মুক্তিপণ দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে অনুরোধ করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো মুসলিম।' রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, 'কুরাইশ বাহিনীর সাথে আপনার অবস্থান থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আপনি আমাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। আপনার অন্তর ইসলাম গ্রহণ করেছে কি না তা আল্লাহই ভালো জানেন।' রাসূলুল্লাহ এখানে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শিক্ষা দিচ্ছেন। একটা মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখেই তাকে বিচার করতে হবে। কার হৃদয়ে কী আছে তা এক আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ছাড়া কেউ জানে না। মুসলিমরা এটাই দেখেছে যে, আল-আব্বাস কুরাইশদের পক্ষ হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি শত্রুবাহিনীর সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছেন, কাজেই তাঁকে শত্রু হিসেবেই বিচার করা হয়েছে, মুখের কথার উপরে নয়। খলিফা হওয়ার পর উমার ইবন খাত্তাব সবাইকে উদ্দেশ্য করে একদিন বললেন,

'আল্লাহর রাসূলের যুগে আল্লাহর পক্ষ হতে ওয়াহী নাযিল হয়ে কখনো কখনো জানিয়ে দেওয়া হতো কার হৃদয়ে কী আছে। সে হিসেবে তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানের কথা ভিন্ন, এখন আমরা কাউকে প্রকাশ্যে যা করতে দেখি তার উপর ভিত্তি করে বিচার করবো। যাকে আমরা ভালো কাজ করতে দেখি তাকে আমরা বিশ্বাস করবো এবং প্রাধান্য দেব। গোপন কাজের জন্য আমরা কাউকে পাকড়াও করবো না, সে বিচার আল্লাহ করবেন। কিন্তু আমরা এমন কাউকে বিশ্বাস করবো না যে প্রকাশ্যে খারাপ কিছু দেখায়, যদিও সে দাবি করে তার নিয়ত ভালো।'

এটি ইসলামের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। কার হৃদয়ে কী চলছে তার উপর ভিত্তি করে কোনো মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। আমরা তাদের কাজকর্ম দেখে বিচার করব।

আল-আব্বাসের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হলে তিনি বললেন, 'আমার কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আপনি মাটির নিচে যে টাকা রেখেছেন সেটার কী হলো? আপনি আপনার স্ত্রী উম্মে ফাদলকে বলে রেখেছেন, 'যদি আমি মারা যাই, তাহলে এই অর্থ খরচ করবে।" আল-আব্বাস বললেন, 'আমি সাক্ষী এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি এবং আমার স্ত্রী ছাড়া এই গুপ্তধনের কথা কেউ জানে না।' এরপর আল-আব্বাস তাঁর মুক্তিপণ পরিশোধ করলেন। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল আয়াতটি প্রকাশ করেছেন।

"হে নবী, যারা আপনার হাতে বন্দী হয়ে আছে তাদেরকে বলে দিন, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কোনো রকম মঙ্গলচিন্তা রয়েছে বলে জানেন, তবে তোমাদেরকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী দান করবেন যা তোমাদের কাছ থেকে বিনিময়ে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া তোমাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। আর যদি তারা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায় (তাহলে আপনি ভাববেন না), এরা তো এর আগে আল্লাহর সাথেও ইতিপূর্বে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অতঃপর তিনি তাদের উপর তোমাদের বিজয় দান করেছেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত, সুকৌশলী।” (সূরা আনফাল, ৮: ৭০)

যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করেছিল এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা বলছেন, যদি তারা আসলেই মুসলিম হয়, তাহলে তাদের থেকে আল্লাহর রাসূল যা কিছু মুক্তিপণ হিসেবে নিয়েছেন, আল্লাহ তার থেকে বেশি কিছু তাদের ফিরিয়ে দেবেন। আল-আব্বাস বললেন, 'আমি আমার মুক্তিপণের জন্য ২০ উকিয়া স্বর্ণ পরিশোধ করেছিলাম, কিন্তু আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার আরো অনেক বেশি।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান

📄 যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান


যুদ্ধবন্দীদের ভাগ্য কী হবে তা নির্ভর করবে মুসলিম ইমামের সিদ্ধান্তের উপর। তিনি চারটি কাজের যেকোনো একটি করতে পারেন। ১) তিনি তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন ২) তাদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দিতে পারেন ৩) মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তিদান করতে পারেন ৪) যুদ্ধবন্দীদের দাস বানাতে পারেন

যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে মুসলিমদের নিজস্ব শরীআহ আছে। এই ব্যাপারে পার্থিব মানবরচিত আইন মানতে মুসলিমরা বাধ্য নয়। মুসলিমরা কেবল তাদের নিজস্ব শরীআহ মানতে বাধ্য, জেনেভা কনভেনশান নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px