📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আবু লাহাবের মৃত্যু

📄 আবু লাহাবের মৃত্যু


কুরাইশদের মধ্যে যারা যুদ্ধে যায়নি, তাদের মধ্যে একজন ছিল আবু লাহাব। তবে সে তার বদলে অন্য একজনকে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছিল। বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের খবর শুনে কুরাইশদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা আবু লাহাবের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বর্ণনা করেছেন মক্কার এক মুসলিম, রাফি। রাফি ছিলেন আল আব্বাসের একজন দাস, সে পরিবারের সবাই ছিল মুসলিম। রাফি, আল আব্বাস, আল আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফাদল - তারা প্রত্যেকেই মুসলিম ছিলেন। রাফির কাজ ছিল তীর বানানো। একদিন সে কাবার উঠানে বসে তীরে ধার দিচ্ছিল, আবু লাহাব তার সামনে পিঠ দিয়ে বসা। কুরাইশদের এক যোদ্ধাকে আসতে দেখে আবু লাহাব তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'এসো, যুদ্ধে কী ঘটেছে আমাদেরকে জানাও'। লোকটি বললো, 'যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমরা নিজেদেরকে তাদের হাতে মরার জন্য আর বন্দী হওয়ার জন্য তুলে দিলাম। কিন্তু আমি আসলে এজন্য কাউকে দোষারোপ করবো না, কারণ আমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করছিলাম তারা ছিল আকাশ ও যমীনের মাঝে ঘোড়ায় সওয়ারী সাদা পোশাক পরা কিছু পুরুষ। তাদের সাথে মোকাবেলায় আমরা কিছুতেই টিকতে পারছিলাম না।'

এই সৈন্য বলতে চাচ্ছিল যে, হ্যাঁ এটি সত্য যে কুরাইশরা হেরেছে কিন্তু এখানে মুসলিমদের কোনো কৃতিত্ব নেই। কৃতিত্ব হলো আকাশ থেকে ঘোড়ায় চড়ে আসা সাদা পোশাকধারী সেই লোকদের। তাদেরকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। এই বর্ণনা শুনে রাফি নিজের আনন্দ চেপে রাখতে পারলো না। মনের অজান্তেই সে আবু লাহাবের সামনে বলে বসলো, 'আল্লাহর কসম! তাঁরা ছিলেন মালাইকা!' আবু লাহাব সে কথা শুনে রাফির মুখে ঘুষি মেরে বসলো। বদলা নিতে রাফিও এগিয়ে গেল। কিন্তু আবু লাহাব তাঁর চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিল। সে রাফির উপরে বসে তাকে মারতে লাগলো। তখন উম্মুল ফাদল লাঠি দিয়ে আবু লাহাবের মাথায় জোরে আঘাত করে তাকে সরিয়ে দিয়ে বললো, 'কী মনে করেছো তুমি? তার মনিব নেই বলে তুমি তাকে যেভাবে খুশি মারতে পারবে?'

আবু লাহাব চলে গেল। এক সপ্তাহ পরের ঘটনা, আবু লাহাব এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। তার মাথায় আঘাতের স্থান থেকে সারা শরীরে ঘা হয়ে যায়। এই রোগটি এমনই ভয়ানক ছিল যে, এই রোগের রোগীর কাছেও কেউ যেতো না। আবু লাহাব মারা গেল, কিন্তু কেউ তাকে কবর দিতে আসলো না। তিন দিন পার হয়ে গেল, তার শরীর পঁচতে শুরু করলো। আবু লাহাবের দুই ছেলেকে ডেকে বলা হলো, 'লজ্জা লাগে না তোদের? তিন দিন ধরে তোদের বাপ ঘরে মরে পড়ে আছে আর তোরা কেউ তাকে কবরও দিচ্ছিস না!' তারা বললো তারা ওই রোগের ভয়ে কাছে যেতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত তারা কোনোমতে আবু লাহাবের লাশ টেনে-হিঁচড়ে মক্কার বাইরে একটি দেওয়ালের কাছে ফেলে রাখলো এবং দূর থেকে পাথর ছুঁড়ে তার মৃতদেহ ঢেকে দিল। তারা আবু লাহাবের জন্য কবর পর্যন্ত খোঁড়েনি। অপমানের সাথে সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শোক পালনে নিষেধাজ্ঞা

📄 শোক পালনে নিষেধাজ্ঞা


মুসলিমদের বিজয়ের উল্লাসে ভাটা দিতে কুরাইশরা আইন জারি করলো পরাজয়ের দুঃখে মক্কায় কেউ প্রকাশ্যে কান্নাকাটি করতে পারবে না। কারো স্বজন হারানোর দুঃখে বিলাপ করতে পারবে না। তারা মুক্তিপণের বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেও সবাইকে নিষেধ করে দেয়, যেন মুক্তিপণের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া না হয়। ইবনে কাসির এ ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'আমি মনে করি, যারা মরেছে তারা তো শাস্তি পেয়েছেই, উপরন্তু যারা জীবিত ছিল তাদেরও আল্লাহ শাস্তি দিলেন কাঁদতে না দেওয়ার মাধ্যমে। কেননা কান্না বেদনার্ত অন্তরকে শান্ত করে।' অর্থাৎ বিলাপের এই নিষেধাজ্ঞা জীবিত কুরাইশদের জন্য এক প্রকার শাস্তি হিসেবে কাজ করে।

এরপর ইবনে কাসির বলেন যে, ইবন ইসহাক বলেছেন, 'মক্কার আল আসওয়াদ ইবনে আবদুল মুত্তালিব বদরের যুদ্ধে তার তিন পুত্রকে হারায়। এই লোকটি ছিল অন্ধ এবং বৃদ্ধ। তিন পুত্রকে হারিয়ে সে প্রবল শোকাহত। কিন্তু এই মানুষটিকেও ছেলের মৃত্যুতে কাঁদার অনুমতি দেওয়া হয়নি। একরাতে এক মহিলার কান্নার আওয়াজ শুনে সে বললো, 'যাও খোঁজ নিয়ে আসো কাঁদার উপর নিষেধাজ্ঞা এখনো আছে কি না। কুরাইশরা কি তাদের নিহত স্বজনদের জন্য কাঁদবে না? তাহলে আমি আমার বড় ছেলে আবু হাকিমের জন্য কাঁদতাম, কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।' খোঁজ নিয়ে জানা গেল সেই মহিলা তার উট হারানোর দুঃখে কাঁদছে। এরপর আল আসওয়াদ কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো,
মহিলা কাঁদছে হায় উট হারালো তাই,
উটের শোকে তার বুঝি চোখে ঘুম নাই।
উটের জন্য কাঁদিসনে যদিও তা হারিয়েছে,
বদরের কথা ভেবে কাঁদ, ওরে কপাল পুড়েছে।

এই বৃদ্ধ লোকটি তার তিন সন্তানদের জন্য কাঁদারও অনুমতি পায়নি কারণ কাফিররা চাচ্ছিল না মুসলিমরা জানুক যে কাফিররা দুঃখ করছে। তারা ভাব ধরছিল যে তারা নিহত স্বজন বা মুক্তিপণ বা বন্দীদের ব্যাপারে কোনো পরোয়াই করছে না।

টিকাঃ
১১৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px