📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধের অব্যবহিত পর

📄 যুদ্ধের অব্যবহিত পর


আল্লাহর রাসূল বদরের যুদ্ধে নিহত ২৪ নেতার লাশকে একটি নোংরা পরিত্যক্ত কুয়ায় ফেলে দেওয়ার আদেশ করেন। এরপর সেই ২৪ জন নেতার লাশ ওই জায়গায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

এ যুদ্ধে নিহত হয় কাফিরদের বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতা। তাদের মধ্যে একজন ছিল উতবা ইবন রাবি'য়াহ। তার লাশ টেনে নিয়ে যাওয়ার সময়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারই পুত্র আবু হুযাইফা। তিনি বিমর্ষ মুখে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে দেখে বুঝলেন তাঁর মন বেশ খারাপ। রাসূলুল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি তাঁর পিতার পরিণতি দেখে দুঃখ পেয়েছেন কি না। আবু হুযাইফা জবাবে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি রাসূলুল্লাহ, আমার পিতার পরিণতিতে কোনো দুঃখ নেই। কিন্তু আমি তাঁর মাঝে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা এবং ভালো কিছু দেখে ভেবেছিলাম হয়তো এগুলো তাকে একদিন ইসলামের ছায়ায় নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন তাঁর পরিণাম দেখে, কুফরির উপর তাঁর জীবন শেষ হতে দেখে খুব কষ্ট লাগছে।' রাসূলুল্লাহ আবু হুযাইফার জন্য দুআ করলেন।

হিদায়াতের বিষয়টি আল্লাহর হাতে, কেউ এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবু হুযাইফা বলছিলেন তাঁর পিতা ছিলেন প্রজ্ঞাবান, যুক্তিবাদী, ভালো মানুষ আর দূরদর্শী ব্যক্তি। কিন্তু এসকল গুণ থাকা সত্ত্বেও সে ঈমান আনেনি, যেমনটা আবু হুযাইফা আশা করেছিলেন। আবু তালিবের ক্ষেত্রেও একই রকম ব্যাপার হয়েছিল। আবু তালিবের মধ্যে অসাধারণ কিছু গুণ ছিল। রাসূলুল্লাহকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, কিন্তু তবু আবু তালিব মুসলিম হননি। আবু তালিব সারাজীবন আল্লাহর নবীকে আশ্রয় দিয়ে কাফির অবস্থায় মারা গেছেন, আর আবু সুফিয়ান দীর্ঘদিন আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ অবধি মারা যান মুসলিম হিসেবে। অন্যদিকে উমার ইবন খাত্তাব প্রাথমিক যুগে ইসলামের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও পরে মুসলিম হয়েছেন। অথচ উমার ইসলাম গ্রহণ করবেন এমনটা কেউ আশাও করেনি। তিনি যে শুধু মুসলিম হয়েছিলেন তা নয়, তিনি শ্রেষ্ঠ মুসলিমদের একজন হয়েছিলেন।

ভালোবাসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে হওয়া চাই। আবু হুযাইফা তাঁর পিতার পরিণতিতে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু এজন্য তিনি দুঃখে ইসলাম ছেড়ে যাননি বা কাউকে দোষারোপও করেননি। তিনি আল্লাহর ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছিলেন। ইসলামের অবস্থান পরিবার, সমাজ- সবকিছুর উপরে। যদি কারো কাছে সুন্দর করে দাওয়াহ পৌছানোর পরেও সে মুসলিম না হয় তাহলে অস্থির হওয়া উচিত নয়, কেননা এটা আল্লাহরই ইচ্ছা। আর যদি তারা মুসলিম হয় তাহলে সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি তাদের পথ দেখিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ কোনো গোত্র বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করলে সে স্থানের উপকণ্ঠে তিনদিন অবস্থান করতেন। বদর প্রান্তরে অবস্থানের পর তৃতীয় দিন তিনি তাঁর উট প্রস্তুত করতে আদেশ দেন। এরপর তিনি হাঁটতে থাকেন। সাহাবারা তাকে বরাবরের মতো অনুসরণ করলেন। রাসূলুল্লাহ গিয়ে দাঁড়ালেন আল-কালীবের সেই কুয়ার কিনারায়। কুয়ায় নিক্ষিপ্ত ওই নিহত ব্যক্তিদের নাম ও তাদের পিতার নাম ধরে তিনি ডাকতে শুরু করলেন। তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
'হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে, সেটাই কি তোমাদের জন্য ভালো হতো না? আমাদের রব আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তা সত্য পেয়েছি, তোমাদের রব তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তোমরা তা সত্য পেয়েছ কি?'

এ কথা শুনে 'উমার অবাক হয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি এমন সব দেহের সাথে কি কথা বলছেন, যাদের রুহ নেই!' নবীজি বললেন, 'সেই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আমি যা বলছি তোমরা ওদের চাইতে বেশি শুনতে পাও না। কিন্তু ওরা জবাব দিতে পারে না।' আল্লাহ তাদেরকে অপমান ও তাচ্ছিল্য করতে, অনুশোচনা ও লজ্জা দিতে তাদের দেহে সাময়িকভাবে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। তাদের যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে দিতে আল্লাহ কথাগুলো তাদের শুনিয়েছিলেন।

টিকাঃ
১১১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মদীনায় বিজয়সংবাদ প্রেরণ

📄 মদীনায় বিজয়সংবাদ প্রেরণ


রাসূলুল্লাহ বদর বিজয়ের সংবাদ সবার কাছে পৌঁছে দিতে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এবং যাইদ ইবন হারিসাকে মদীনায় পাঠান। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা গেলেন মদীনার বহির্ভাগ আওয়ালিতে। সেখানে তিনি প্রত্যেক আনসারের বাড়িতে সংবাদ পৌঁছে দিলেন। আর যুদ্ধ জয়ের সংবাদ নিয়ে যাইদ ইবন হারিসা মদীনার একদম ভেতরে চলে গেলেন। যাইদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহর উটনীর পিঠে বসে নিহত কুরাইশ নেতাদের নাম ধরে ধরে বলতে লাগলেন 'উতবা ইবন রাবিয়াহ নিহত হয়েছে! আবু জাহেলও নিহত হয়েছে!' এভাবে ঘোষণা দিয়ে তিনি যখন উচ্ছ্বাসের সাথে মদীনায় প্রবেশ করছেন, তখন মদীনার মুনাফিক আর ইহুদিরা বলাবলি করতে লাগলো, 'এ লোক পাগল নাকি! সে যে কী বলছে সে তো নিজেই জানে না! তার মাথা ঠিক নেই, সে মনে হয় ভয়ে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তোমরা দেখেছ যাইদ কার উটের পিঠে চড়ে এসেছে? এটা মুহাম্মাদের উট, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ যুদ্ধে মারা গেছে। তা না হলে তার উট যাইদ পেল কী করে?' তারা এসব কথা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল।

উসামা এবং উসমান বদরের যুদ্ধে অংশ নেননি। নবীজি তাঁর কন্যা রুকাইয়ার দেখাশুনা করতে তাঁদের রেখে গিয়েছিলেন। উসামা তাঁর বাবা যাইদকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা! আপনি যে খবর দিলেন তা কি সত্যি?' যাইদ বললেন, 'হ্যাঁ সত্যি!' এরপর লোকেরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো যাইদ ইবন হারিসা যা বলছেন তা সত্য কি না। তিনিও বিজয়ের সংবাদ নিশ্চিত করলেন। তিনি জানালেন পরদিনই রাসূলুল্লাহ যুদ্ধবন্দীদের মদীনায় নিয়ে আসবেন।

মানুষজন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না কী ঘটেছে। ৩০০ জনের বাহিনী হাজার জনের বাহিনীকে পরাজিত করেছে, তাদের বড় বড় নেতাদের হত্যা করেছে – এটা এতই খুশির খবর যে তাদের ঠিক বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। পরের দিন রাসূলুল্লাহ বন্দীদের নিয়ে মদীনায় প্রবেশ করলেন। বন্দীদেরকে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হলো। রাসূলুল্লাহর স্ত্রী সাওদাহ, যুদ্ধে বন্দী বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা সুহাইল ইবন আমরকে দেখলেন তার হাত ঘাড়ের সাথে বাঁধা অবস্থায়। তাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, 'তুমি যুদ্ধ করে ইজ্জতের সাথে মরতে পারলে না সুহাইল?'

রাসূলুল্লাহ ওই কথা শুনে বললেন, 'সাওদাহ, তুমি কি তাদেরকে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলছো?' সুহাইলের মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্য সেদিন সেভাবে হাত বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা ছিল লজ্জা আর অবমাননার বিষয়। তাই দেখে সাওদাহ কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এভাবে অপদস্থ হওয়ার চেয়ে সাহাসিকতার সাথে যুদ্ধ করে মরে যাওয়াই সুহাইলের মতো নেতার জন্য সাজে। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মস্ত বড় অপরাধ, এর মাঝে কৃতিত্ব নেই। সাওদাহ তাঁর ভুল বুঝতে পেরে দুঃখিত হলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আসলে তার এ অবস্থা দেখে একথা না বলে থাকতে পারছিলাম না।'

টিকাঃ
১১২. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px