📄 নিয়তির টানে নিহত: উমাইয়া ইবন খালাফ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একটি ঘটনা বর্ণনা করেন, সাদ ইবন মুয়ায ছিলেন উমাইয়া ইবন খালাফের অন্তরঙ্গ বন্ধু। যখনই উমাইয়া মদীনায় ভ্রমণে যেতো, সে সা'দের সাথে থাকতো। আর সা'দ যখন মক্কায় যেতেন তখন উমাইয়ার সাথে থাকতেন। যখন আল্লাহর রাসূল মদীনায় পৌঁছালেন, সা'দ তখন মক্কায় উমরা করতে এসেছিলেন। মক্কায় তিনি উমাইয়ার বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি উমাইয়াকে বললেন, 'আচ্ছা উমাইয়া, কোন সময়ে কাবার চারপাশটা খালি থাকে? আমি কাবাঘর তাওয়াফ করতে চাই।' উমাইয়া তাকে নিয়ে দুপুরে বের হলো। তখন আবু জাহেলের সাথে দেখা। আবু জাহেল তাদের দেখে বললো, 'হে আবু সাফওয়ান! তোমার সাথে এই লোকটি কে?' সে বলেছিল, 'সে হচ্ছে সা'দ'।
আবু জাহেল সা'দ ইবন মুয়াযকে সম্বোধন করে বললো, 'বাহ! তুমি দেখি মক্কায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছো! অথচ তুমি মক্কার এমন লোকদের নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছো যারা তাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে! তুমি নাকি তাদের সবরকমের সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর! আল্লাহর কসম! আবু সাফওয়ান (উমাইয়া) যদি তোমার সাথে না থাকতো, তুমি তোমার পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যেতে পারতে না।'
সা'দ নিজেই ছিলেন একজন গোত্রনেতা। তিনি আবু জাহেলের হম্বিতম্বি পছন্দ করলেন না। তিনি গলা উঁচু করে বললেন, 'আল্লাহর শপথ! তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ করতে বাধা দিতে, তাহলে আমিও তোমাকে এমন কাজে বাধা দেব যা তোমার জন্য আরো খারাপ হবে। মদীনার উপকণ্ঠ দিয়ে তোমার বাণিজ্যিক কাফেলার যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেব।' এই কথা শুনে উমাইয়া সা'দকে বললো, 'সা'দ, আবুল হাকাম মক্কার নেতা। তার সাথে উচু গলায় কথা বোলো না।' সাদ জবাবে বললেন, 'উমাইয়া, থামো! আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি যে, তুমি মুসলিমদের হাতে মারা পড়বে।' উমাইয়া জিজ্ঞেস করলো, 'মক্কায়? সাদ বললেন, 'তা আমি জানি না।' উমাইয়া রাসূলুল্লাহর এ ভবিষ্যতবাণী শুনে খুবই ভয় পেয়ে গেল।
উমাইয়া তার পরিবারের কাছে গেল। তার স্ত্রীকে বললো, 'উম্মে সাফওয়ান! তুমি কি জানো সাদ আমাকে কী বলেছে?' সে জিজ্ঞেস করলো, 'কী বলেছে সে?' উমাইয়া বললো, 'সে দাবি করছে যে মুহাম্মাদ তার সাহাবাদেরকে বলেছে যে তারা নাকি আমাকে হত্যা করবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সেটা কি মক্কায় ঘটবে, সে বললো সে জানে না।' তারপর উমাইয়া নিজেই বললো, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনই মক্কার বাইরে যাবো না।' কিন্তু যখন বদরের দিন আসলো, আবু জাহেল সবাইকে যুদ্ধে যেতে আহ্বান করছিল এই বলে যে, 'যাও! তোমাদের কাফেলা রক্ষা করো।' কিন্তু উমাইয়া যেতে চাইলো না। সে ভয় পাচ্ছিল যদি সে মক্কার বাইরে গেলে মারা পড়ে। আবু জাহেল তার কাছে এসে বললো, 'দেখো আবু সাফওয়ান, তুমি একজন নেতা! তুমি যদি যুদ্ধে না যাও তাহলে অন্যেরাও বসে থাকবে।' আবু জাহেল তাকে চাপ দিতে লাগলো, একসময় উমাইয়া রাজি হলো। সে বললো, 'তুমি যেহেতু আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছো, আল্লাহর শপথ, আমি মক্কার সেরা উটে চড়ে যুদ্ধে যাবো।' সে তার স্ত্রীকে বললো, 'উম্মে সাফওয়ান, আমার যা যা লাগবে প্রস্তুত করো।' উম্ম সাফওয়ান তাকে বললো, 'তুমি কি ভুলে গেছ তোমার মদীনার ভাই তোমাকে কী বলেছে?' উমাইয়া বললো, 'না আমি ভুলিনি, কিন্তু আমি খুব বেশি দূর যাবো না।' রওনা হওয়ার পর সে রাস্তার যেখানেই কিছুক্ষণ অবস্থান করেছে, সেখানেই সে তার উট বেঁধে রেখেছে। গোটা পথ জুড়ে সে এমনটা করলো এবং শেষ পর্যন্ত বদরের প্রান্তরে সে আল্লাহর হুকুমে মারা গেল।
উমাইয়া ছিল একজন কাফির, কিন্তু মন থেকে ঠিকই সে বিশ্বাস করতো মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল। তাই সে মক্কা ছেড়ে বের হতে ভয় পাচ্ছিল। যখন বদর যুদ্ধের ডাক আসলো, সে যেতে চাইলো না। তাই আবু জাহেল তাকে অপমান করার জন্য তার হাতে "মাবখারা” ধরিয়ে দিল, মাবখারা হচ্ছে এক ধরনের চুলা। বয়স্ক মহিলারা এই ধরনের চুলা ব্যবহার করে। উমাইয়াকে সে বুঝাতে চাইলো, 'তোমার মতো কাপুরুষের উচিত মহিলাদের চুলা নিয়ে বসে থাকা।' আবু জাহেল উমাইয়াকে ক্ষেপিয়ে তুলে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইছিল। তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহর ভবিষ্যতবাণী মনে করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও সে ভয়ে ভয়ে যুদ্ধে গেল। প্রতিটি বিরতিতে তার মনে হলো, "আর সামনে এগোবো না", কিন্তু সে অগ্রসর হতে হতে একেবারে যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
যুদ্ধে উমাইয়া বন্দী হয়। উমাইয়া তার জাহেলিয়াতের পুরোনো বন্ধু আবদুর রাহমান ইবন আউফকে দেখে ডেকে ওঠেন, 'হে আব্দ আমর...!' কিন্তু আব্দুর রাহমান ইবন আউফ শুনেও না শোনার ভান করলেন। কারণ এটা ছিল তাঁর জাহেলিয়াত যুগের নাম। এদিকে উমাইয়াও তাঁকে তাঁর মুসলিম নাম "আব্দুর রহমান” ডাকতে চাচ্ছিল না। সে বললো, 'তোমাকে আব্দ আমর বলে ডাকলাম তুমি শুনলে না। আর আমিও তোমাকে আব্দুর রাহমান বলে ডাকবো না। এক কাজ করলে কেমন হয়, আমরা তোমার জন্য এমন একটা নাম ঠিক করি যে নাম শুধু আমাদের দু'জনের মধ্যে থাকবে?' আব্দুর রাহমান ইবন আউফ বললেন, 'ঠিক আছে, তুমিই একটি নাম ঠিক করো।' উমাইয়া তাঁর নাম দিলেন আবদুল্লাহ, যার অর্থ আল্লাহর বান্দা। আব্দুর রাহমান রাজি হলেন।
কথায় কথায় উমাইয়া আব্দুর রাহমানকে জিজ্ঞেস করলো, 'আচ্ছা, যুদ্ধে তোমাদের দলে একটা লোককে দেখলাম যার বুক উটপাখির পালক দিয়ে ঢাকা। সে কে ছিল?' আব্দুর রাহমান ইবন আউফ উত্তর দিলেন, 'তিনি হচ্ছেন হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব'। উমাইয়া ইবন খালাফ বললো, 'হুম, এই লোকই আমাদের সর্বনাশ করেছে'।
আব্দুর রাহমান আর উমাইয়া ছিলেন জাহেলিয়াতের বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আবদুর রাহমান ইবন আউফের সাথে উমাইয়া ইবন খালাফের এই মর্মে চুক্তি ছিল যে, আব্দুর রাহমান মদীনায় উমাইয়ার ব্যবসা ও সম্পদ দেখাশোনা আর উমাইয়া মক্কায় আব্দুর রাহমানের সম্পদ বা পরিবারের দেখাশোনা করবে। যাই হোক, যুদ্ধ শেষে আব্দুর রাহমান শত্রুদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া কিছু বর্ম নিয়ে হাঁটছিলেন। উমাইয়া তাঁকে বললো,
- আচ্ছা, তুমি কি তোমার হাতের ওই বর্মগুলো থেকে দামি কিছু চাও না?
- হ্যাঁ চাই, কিন্তু সেটা কী? আব্দুর রাহমান ইবন আউফ জিজ্ঞেস করলেন।
- আমি আর আমার ছেলে, তুমি আমাদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে বন্দী করো।
উমাইয়া নিজের জান বাঁচানোর জন্য আব্দুর রাহমান ইবন আউফের হাতে বন্দী হতে চাইলো। উমাইয়া ছিল বেশ ধনী। তাই তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করলে আবদুর রাহমানও ভালো অংকের মুক্তিপণ লাভ করবেন, দু'জনেরই লাভ। আবদুর রাহমান ইবন আউফ তখন বর্মগুলো ফেলে দিয়ে বাপ-ছেলেকে আটক করলেন।
কিন্তু এমন একজন মানুষ উমাইয়াকে দেখে ফেললেন যে উমাইয়াকে শায়েস্তা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি হলেন বিলাল ইবনে রাবাহ, উমাইয়ার সাবেক দাস। উমাইয়ার সাথে আব্দুর রাহমান ইবন আউফের শত্রুতা খুব বেশিদিনের নয়। তার আগে তাঁরা বন্ধু ছিলেন, কিন্তু বিলালের সাথে উমাইয়ার সম্পর্ক ছিল প্রচণ্ড তেতো। জাহিলিয়াতের যুগে বিলাল ছিলেন উমাইয়ার দাস। উমাইয়া তাঁকে নির্মমভাবে অত্যাচার করতো।
উমাইয়াকে দেখে বিলালের দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়ে গেল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, 'উমাইয়া! কাফিরদের সর্দার!' আব্দুর রাহমান বললেন, 'বিলাল শোনো! সে আমার কয়েদি, আমার অধীনে আছে।' আব্দুর রাহমান বিলালকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যেন সে উমাইয়ার সাথে কিছু না করে কারণ সে যুদ্ধবন্দী। বিলাল বুঝলেন আব্দুর রাহমান ইবন আউফ উমাইয়াকে তাঁর হাতে ছাড়বেন না। তখন তিনি আনসারদের কাছে গিয়ে বললেন, 'ওই লোক হলো উমাইয়া! কুরাইশদের নেতা! হয় সে বেঁচে থাকবে না হয় আমি। আমি তাকে ছাড়বো না।' বিলালের কথা শুনে আনসাররা ততক্ষণে ঘটনাস্থলে চলে এসেছে। আব্দুর রাহমান আশঙকা করছিলেন যে তারা তাঁর ধরা যুদ্ধবন্দীদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে। তাই তিনি উমাইয়ার পুত্র আলিকে তাদের জন্য ছেড়ে দিলেন যেন আলিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আনসাররা আলিকে হত্যা করে আবার উমাইয়াকে ধরার জন্য ছুটে গেলেন। উমাইয়া ছিল মোটাসোটা। আব্দুর রাহমান তাকে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসিয়ে নিজ শরীরকে ঢাল বানিয়ে উমাইয়াকে রক্ষা করার জন্য তার উপর শুয়ে পড়লেন। কিন্তু আনসাররা তাদের তরবারি আব্দুর রাহমানের শরীরের নিচে দিয়ে ঢুকিয়ে উমাইয়াকে হত্যা করলেন। ধস্তাধস্তির মধ্যে কোনো এক আনসারি সাহাবীর তরবারি আব্দুর রাহমানের পায়ে লেগে জখম হয়।
আব্দুর রাহমান বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বিলালের উপর রহম করুন। আমার বর্মগুলো, আমার গ্রেফতার করা বন্দী দুটোই গেল। '
টিকাঃ
১০৭. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ২।
১০৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০১।
📄 অন্যান্য কুরাইশ নেতাদের মৃত্যু
মুশরিকদের অন্যতম বিখ্যাত যোদ্ধা ছিল আবুল কিরশ। সে ছিল বেশ মোটাসোটা, ভুঁড়িওয়ালা, আগাগোড়া লোহার বর্মে আচ্ছাদিত। তার দুটি চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। যুবাইর ইবনুল আওয়াম ছিলেন কৌশলী ও সাহসী যোদ্ধা। তিনি তাঁর বর্শা ছুঁড়ে প্রথম চেষ্টাতেই সরাসরি আবুল কিরশের চোখে আঘাত করতে সমর্থ হন। বর্শা আবুল কিরশের চোখ হয়ে মাথায় ঢুকে যায়, আবুল কিরশ মাটিতে পড়ে যায় এবং মারা যায়। বর্মের ছিদ্র এতই ছোট ছিল যে সেটাকে বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। আয যুবাইর তখন আবুল কিরশের শরীরের উপর দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে টেনে বর্শাটিকে বর্মের ছিদ্র থেকে বের করে আনেন। সেটা করতে গিয়ে বর্শার দুই মাথাই বেঁকে যায়। রাসূলুল্লাহ এই বর্শাটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নিজের জন্য রেখে দেন। আল্লাহর রাসূলের ইন্তেকালের পর আবু বকর এই বর্শা নিজের কাছে রেখে দেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তা যায় উমারের কাছে। তাঁর মৃত্যুর পর যুবাইর তা ফিরে পান। কিন্তু উসমান আবার এটি চেয়ে বসলে যুবাইর তা খলিফার কাছে দিয়ে দেন। উসমানের মৃত্যুর পর সেই বর্শা ছিল আলির কাছে। আলীর মৃত্যুর পর যুবাইরের ছেলে আবদুল্লাহ বর্শাটি পান।
কুরাইশদের মধ্যে কিছু মহৎ ব্যক্তিত্ব ছিল। তার মধ্যে একজন হলো আবুল বাখতারি। কাফির হলেও মুসলিমদের প্রতি সে নিষ্ঠুর ছিল না। শেবে আবু তালিবে যখন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে তিন বছর ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় তখন এই অবরোধের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন এই আবুল বাখতারি। রাসূলুল্লাহ তাঁর এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি তার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। তিনি মুসলিমদেরকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, 'যদি আবুল বাখতারিকে যুদ্ধের মাঠে দেখো তাহলে তাকে হত্যা কোরো না।'
কোনো কাফির যদি মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তাহলে মুসলিমদেরও উচিত তার প্রতি সদয় হওয়া। একজন আনসার সাহাবী সেদিন ময়দানে আবুল বাখতারিকে দেখে তাকে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন তাকে যেন হত্যা করা না হয়। সে জিজ্ঞেস করলো, 'আর আমার সাথীদের কী হবে?' আনসার উত্তর দিলেন যে, 'তোমাকে আমরা ছেড়ে দেব, কিন্তু তোমার সাথীদের ছাড়বো না।' আবুল বাখতারি বললো, 'আমি আমার সাথীদের রক্ষা করতে লড়াই করে যাবো।' সেই আনসারী সাহাবি বাধ্য হয়ে আল বাখতারির সাথে লড়াই করলেন। লড়াইয়ে আবুল বাখতারি নিহত হন।
ওই আনসারী সাহাবি রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বলেন, 'সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন। আমি তাকে বন্দী করে আপনার কাছে নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছি কিন্তু সে জোরপূর্বক আমার সাথে লড়াই করে। তাই আমি পাল্টা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেছি।'
টিকাঃ
১০৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৮।
১১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০০।
📄 যুদ্ধের অব্যবহিত পর
আল্লাহর রাসূল বদরের যুদ্ধে নিহত ২৪ নেতার লাশকে একটি নোংরা পরিত্যক্ত কুয়ায় ফেলে দেওয়ার আদেশ করেন। এরপর সেই ২৪ জন নেতার লাশ ওই জায়গায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।
এ যুদ্ধে নিহত হয় কাফিরদের বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতা। তাদের মধ্যে একজন ছিল উতবা ইবন রাবি'য়াহ। তার লাশ টেনে নিয়ে যাওয়ার সময়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারই পুত্র আবু হুযাইফা। তিনি বিমর্ষ মুখে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে দেখে বুঝলেন তাঁর মন বেশ খারাপ। রাসূলুল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি তাঁর পিতার পরিণতি দেখে দুঃখ পেয়েছেন কি না। আবু হুযাইফা জবাবে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি রাসূলুল্লাহ, আমার পিতার পরিণতিতে কোনো দুঃখ নেই। কিন্তু আমি তাঁর মাঝে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা এবং ভালো কিছু দেখে ভেবেছিলাম হয়তো এগুলো তাকে একদিন ইসলামের ছায়ায় নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন তাঁর পরিণাম দেখে, কুফরির উপর তাঁর জীবন শেষ হতে দেখে খুব কষ্ট লাগছে।' রাসূলুল্লাহ আবু হুযাইফার জন্য দুআ করলেন।
হিদায়াতের বিষয়টি আল্লাহর হাতে, কেউ এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবু হুযাইফা বলছিলেন তাঁর পিতা ছিলেন প্রজ্ঞাবান, যুক্তিবাদী, ভালো মানুষ আর দূরদর্শী ব্যক্তি। কিন্তু এসকল গুণ থাকা সত্ত্বেও সে ঈমান আনেনি, যেমনটা আবু হুযাইফা আশা করেছিলেন। আবু তালিবের ক্ষেত্রেও একই রকম ব্যাপার হয়েছিল। আবু তালিবের মধ্যে অসাধারণ কিছু গুণ ছিল। রাসূলুল্লাহকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, কিন্তু তবু আবু তালিব মুসলিম হননি। আবু তালিব সারাজীবন আল্লাহর নবীকে আশ্রয় দিয়ে কাফির অবস্থায় মারা গেছেন, আর আবু সুফিয়ান দীর্ঘদিন আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ অবধি মারা যান মুসলিম হিসেবে। অন্যদিকে উমার ইবন খাত্তাব প্রাথমিক যুগে ইসলামের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও পরে মুসলিম হয়েছেন। অথচ উমার ইসলাম গ্রহণ করবেন এমনটা কেউ আশাও করেনি। তিনি যে শুধু মুসলিম হয়েছিলেন তা নয়, তিনি শ্রেষ্ঠ মুসলিমদের একজন হয়েছিলেন।
ভালোবাসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে হওয়া চাই। আবু হুযাইফা তাঁর পিতার পরিণতিতে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু এজন্য তিনি দুঃখে ইসলাম ছেড়ে যাননি বা কাউকে দোষারোপও করেননি। তিনি আল্লাহর ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছিলেন। ইসলামের অবস্থান পরিবার, সমাজ- সবকিছুর উপরে। যদি কারো কাছে সুন্দর করে দাওয়াহ পৌছানোর পরেও সে মুসলিম না হয় তাহলে অস্থির হওয়া উচিত নয়, কেননা এটা আল্লাহরই ইচ্ছা। আর যদি তারা মুসলিম হয় তাহলে সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি তাদের পথ দেখিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ কোনো গোত্র বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করলে সে স্থানের উপকণ্ঠে তিনদিন অবস্থান করতেন। বদর প্রান্তরে অবস্থানের পর তৃতীয় দিন তিনি তাঁর উট প্রস্তুত করতে আদেশ দেন। এরপর তিনি হাঁটতে থাকেন। সাহাবারা তাকে বরাবরের মতো অনুসরণ করলেন। রাসূলুল্লাহ গিয়ে দাঁড়ালেন আল-কালীবের সেই কুয়ার কিনারায়। কুয়ায় নিক্ষিপ্ত ওই নিহত ব্যক্তিদের নাম ও তাদের পিতার নাম ধরে তিনি ডাকতে শুরু করলেন। তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
'হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে, সেটাই কি তোমাদের জন্য ভালো হতো না? আমাদের রব আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তা সত্য পেয়েছি, তোমাদের রব তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তোমরা তা সত্য পেয়েছ কি?'
এ কথা শুনে 'উমার অবাক হয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি এমন সব দেহের সাথে কি কথা বলছেন, যাদের রুহ নেই!' নবীজি বললেন, 'সেই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আমি যা বলছি তোমরা ওদের চাইতে বেশি শুনতে পাও না। কিন্তু ওরা জবাব দিতে পারে না।' আল্লাহ তাদেরকে অপমান ও তাচ্ছিল্য করতে, অনুশোচনা ও লজ্জা দিতে তাদের দেহে সাময়িকভাবে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। তাদের যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে দিতে আল্লাহ কথাগুলো তাদের শুনিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১১১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২।
📄 মদীনায় বিজয়সংবাদ প্রেরণ
রাসূলুল্লাহ বদর বিজয়ের সংবাদ সবার কাছে পৌঁছে দিতে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এবং যাইদ ইবন হারিসাকে মদীনায় পাঠান। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা গেলেন মদীনার বহির্ভাগ আওয়ালিতে। সেখানে তিনি প্রত্যেক আনসারের বাড়িতে সংবাদ পৌঁছে দিলেন। আর যুদ্ধ জয়ের সংবাদ নিয়ে যাইদ ইবন হারিসা মদীনার একদম ভেতরে চলে গেলেন। যাইদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহর উটনীর পিঠে বসে নিহত কুরাইশ নেতাদের নাম ধরে ধরে বলতে লাগলেন 'উতবা ইবন রাবিয়াহ নিহত হয়েছে! আবু জাহেলও নিহত হয়েছে!' এভাবে ঘোষণা দিয়ে তিনি যখন উচ্ছ্বাসের সাথে মদীনায় প্রবেশ করছেন, তখন মদীনার মুনাফিক আর ইহুদিরা বলাবলি করতে লাগলো, 'এ লোক পাগল নাকি! সে যে কী বলছে সে তো নিজেই জানে না! তার মাথা ঠিক নেই, সে মনে হয় ভয়ে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তোমরা দেখেছ যাইদ কার উটের পিঠে চড়ে এসেছে? এটা মুহাম্মাদের উট, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ যুদ্ধে মারা গেছে। তা না হলে তার উট যাইদ পেল কী করে?' তারা এসব কথা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল।
উসামা এবং উসমান বদরের যুদ্ধে অংশ নেননি। নবীজি তাঁর কন্যা রুকাইয়ার দেখাশুনা করতে তাঁদের রেখে গিয়েছিলেন। উসামা তাঁর বাবা যাইদকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা! আপনি যে খবর দিলেন তা কি সত্যি?' যাইদ বললেন, 'হ্যাঁ সত্যি!' এরপর লোকেরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো যাইদ ইবন হারিসা যা বলছেন তা সত্য কি না। তিনিও বিজয়ের সংবাদ নিশ্চিত করলেন। তিনি জানালেন পরদিনই রাসূলুল্লাহ যুদ্ধবন্দীদের মদীনায় নিয়ে আসবেন।
মানুষজন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না কী ঘটেছে। ৩০০ জনের বাহিনী হাজার জনের বাহিনীকে পরাজিত করেছে, তাদের বড় বড় নেতাদের হত্যা করেছে – এটা এতই খুশির খবর যে তাদের ঠিক বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। পরের দিন রাসূলুল্লাহ বন্দীদের নিয়ে মদীনায় প্রবেশ করলেন। বন্দীদেরকে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হলো। রাসূলুল্লাহর স্ত্রী সাওদাহ, যুদ্ধে বন্দী বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা সুহাইল ইবন আমরকে দেখলেন তার হাত ঘাড়ের সাথে বাঁধা অবস্থায়। তাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, 'তুমি যুদ্ধ করে ইজ্জতের সাথে মরতে পারলে না সুহাইল?'
রাসূলুল্লাহ ওই কথা শুনে বললেন, 'সাওদাহ, তুমি কি তাদেরকে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলছো?' সুহাইলের মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্য সেদিন সেভাবে হাত বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা ছিল লজ্জা আর অবমাননার বিষয়। তাই দেখে সাওদাহ কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এভাবে অপদস্থ হওয়ার চেয়ে সাহাসিকতার সাথে যুদ্ধ করে মরে যাওয়াই সুহাইলের মতো নেতার জন্য সাজে। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মস্ত বড় অপরাধ, এর মাঝে কৃতিত্ব নেই। সাওদাহ তাঁর ভুল বুঝতে পেরে দুঃখিত হলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আসলে তার এ অবস্থা দেখে একথা না বলে থাকতে পারছিলাম না।'
টিকাঃ
১১২. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৩।