📄 উতবার ঘটনা থেকে শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ উতবার ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন, 'কুরাইশদের কারো মাঝে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে, তবে তা উতবার মাঝেই রয়েছে। তারা যদি তার কথা শুনতো তবে তারা সঠিক কাজটাই করতো।' কাফিরদের মধ্যে দু'ধরনের লোক আছে। একটি দল হলো উগ্রপন্থী, ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী। তারা যুদ্ধ ও রক্তারক্তি পছন্দ করে। অপর দলটির জ্ঞান এবং বোধবুদ্ধি আছে, তারা মধ্যমপন্থায় বিশ্বাস করে। কিন্তু, যখনই ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে কাফিরদের বিরোধ হয়, তখন এই মধ্যমপন্থী কাফিরদের মতামত, উগ্রপন্থী কাফিরদের কুযুক্তি ও উত্তেজক বিবৃতির নিচে চাপা পড়ে যায়। ফলে এই উগ্রপন্থীরা যুদ্ধে চালকের আসনে আসীন হয়।
অনেক মুসলিম সরলমনে এমনটা আশা করে যে, কাফিরদের মধ্যেও যেহেতু কিছু যুদ্ধবিরোধী, মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোক আছে, নিশ্চয়ই তাদের কথা এসব 'উগ্রবাদী, জঙ্গী কাফির'দের উপর প্রাধান্য পাবে এবং কাফিররা যুদ্ধের পথ ছেড়ে দেবে। এক কুফর শক্তির সাথে আরেক কুফর শক্তির সংঘাতে এমনটা হলেও, যখন আল্লাহর দ্বীনের সাথে, আল্লাহর নবীদের সাথে বা নবীদের অনুসারীদের সাথে কুফরের সংঘাত হয় তখন শান্তিকামীদের কণ্ঠ উগ্রবাদীদের জোরালো মিডিয়া প্রপাগান্ডার নিচে চাপা পড়ে – এটাই বাস্তবতা।
যেমন, আবু সুফিয়ানের কথায় যুক্তি ছিল। সে কুরাইশ বাহিনীকে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ এড়াতে বলেছিল। বনু যাহরা গোত্রের নেতা ছিল আখনাস ইবন শুরাইক। তারা এ যুদ্ধে জড়ায়নি, তারা নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে লড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। একইভাবে উতবা এবং হাকিম ইবন হিযামও যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কথায় কুরাইশরা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হয়নি।
ইসলাম ও মুসলিমদের কোনো ব্যাপারে কাফিরদের আচরণ স্বাভাবিক থেকে ভিন্ন। যেমন আবু সুফিয়ানের ছেলেকে মুসলিমরা যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরে নিয়ে যায়। আবু সুফিয়ানকে বলা হয় সে যেন মুক্তিপণ দিয়ে তার ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিমরা তার এক ছেলেকে আগে হত্যা করেছিল। তাই সে জিদের বশে অপর ছেলেকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে প্রত্যাখ্যান করে। নিজের ছেলেকে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও সে ছাড়িয়ে আনেনি, বরং মুসলিমদের শিক্ষা দিতে সে কুরাইশদের দীর্ঘদিনের একটি প্রথা ভাঙে। কুরাইশরা হাজ্জযাত্রীদেরকে খুব সম্মান করতো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে তারা সকল হাজ্জযাত্রীকে আদর-আপ্যায়ন করতো। কিন্তু সেবার কোনো এক আরব মুসলিম গোত্রের এক সদস্য হাজ্জ করতে গেলে প্রতিশোধ স্বরুপ আবু সুফিয়ান তাকে গ্রেপ্তার করে বন্দী করে রাখে।
ইবনে ইসহাক বলেন, 'কুরাইশরা ঐতিহাসিকভাবে হাজীদের প্রতি অতিথিপরায়ণ ছিল। কিন্তু প্রথমবারের মতো তারা ওই রীতি ভঙ্গ করে। আবু সুফিয়ান ওই মুসলিমকে কারাবন্দী করে রাখে। কারাবন্দী মুসলিমের পরিবার রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বিষয়টি জানায়। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ানের ছেলেকে মুক্ত করে দেন। এরপর আবু সুফিয়ান সেই কারাবন্দী মুসলিমকে মুক্ত করে দেয়।'
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিমদের প্রতি কাফিরদের আচরণ স্বাভাবিক থেকে আলাদা। ইসলাম ও মুসলিম সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের নৈতিকতার মানদণ্ড পাল্টে যায়। সবার জন্য একই আইন, কিন্তু মুসলিমদের জন্য ভিন্ন। কাফিরদের মধ্যে কোনো প্রজ্ঞাবান, শান্তিকামী আর মধ্যমপন্থী মানুষ থাকলেও মুসলিমদের বিষয় আসলে তাদের চেহারা পাল্টে যায়। শয়তান তার অনুসারীদের মধ্যে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতে চায় যে, ইসলামের অনুসারীদেরকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
📄 সামরিক কৌশল
সামরিক কৌশল এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ এমন এক সামরিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন যার ব্যবহার আরবরা এর আগে করেনি। আল্লাহর রাসূল এই যুদ্ধে সারিবদ্ধ আক্রমণের পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তিনি সৈন্যদেরকে তাদের সংখ্যার ভিত্তিতে প্রথম সারি, দ্বিতীয় সারি, তৃতীয় সারি- এভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাতেন। প্রথম সারিতে তিনি রাখতেন বর্শাধারী সৈন্যদের, আর তার পেছনে রাখতেন তীরন্দাজদের। তীরন্দাজরা পিছন থেকে তীর ছুঁড়তো আর প্রথম সারির সৈন্যরা শত্রুদেরকে সামনে অগ্রসর হতে বাধা দিত। এটি ছিল আরবদের জন্য নতুন কৌশল। আল্লাহ বলেন,
“আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাগলানো প্রাচীর।” (সূরা আস-সাফ, ৬১: ৪)
যুদ্ধের এ সারিবদ্ধ কৌশলকে বলা হয় যাহফ। রোমান আর পারস্যরা এই কৌশল ব্যবহার করতো। এই পদ্ধতিতে একজন সেনাপ্রধানের পক্ষে তাঁর বাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ ছিল। এভাবেই নবীজি বেশিরভাগ যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
📄 মুজাহিদদের প্রতি রাসূলুল্লাহর ﷽ উৎসাহ প্রদান
মুজাহিদদের প্রতি রাসূলুল্লাহর উৎসাহ প্রদান বদরের ময়দান। ইসলামের প্রথম মুজাহিদ বাহিনী প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'যে কেউ তাদের সাথে বীরত্বের সাথে লড়াই করবে এবং পিছু না হটে সামনের দিকে অগ্রসর হবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'
সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, 'ছুটে যাও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আকাশ এবং পৃথিবীর সমান!' উমাইর ইবন আল হামাম জিজ্ঞেস করলেন, 'সত্যি! সত্যিই এত বড় জান্নাত আছে?', রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ! অবশ্যই আছে!' একথা শুনে উমাইর বলে উঠলেন, 'বাহ! বাহ!' রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাহ কেন বললে?' উমাইর উত্তর দিলেন, 'আমি ভাবছি, ইশ! আমি যদি জান্নাতে যেতে পারতাম!' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'অবশ্যই! তুমি জান্নাতীদেরই একজন!' এরপর উমাইর ইবন হামাম উঠে দাঁড়ালেন এবং কয়েকটি খেজুর বের করে খেতে শুরু করলেন। হঠাৎ উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলে বললেন, 'আরে! খেজুরগুলো খেতে তো অনেক সময় লেগে যাবে!'
উমাইর রাসূলুল্লাহর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহর পথে মারা যেতে রীতিমত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি শহীদ হওয়ার জন্য এতটা আকুল ছিলেন যে, তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল খেজুর খাওয়া শেষ করে যুদ্ধে যোগ দিতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই তিনি খেজুরগুলো ফেলে সাথে সাথে ময়দানে ছুটে যান।
রাসূল তাঁর বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, কারণ তা ছিল আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর প্রতি নির্দেশ।
“হে নবী, তুমি মু'মিনদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করো, যদি তোমাদের মধ্য থেকে বিশজন ধৈর্যশীল থাকে, তারা দু'শ জনকে পরাস্ত করবে, আর যদি তোমাদের মধ্যে একশো জন থাকে, তারা কাফিরদের এক হাজার জনকে পরাস্ত করবে। এর কারণ হচ্ছে, তারা এমন এক জাতি যারা (আল্লাহর শক্তি সম্পর্কে) কিছুই বোঝে না। (সূরা আনফাল, ৮: ৬৫)
টিকাঃ
১০১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৭।