📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের বৃষ্টিপাত

📄 আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের বৃষ্টিপাত


যুদ্ধের আগের রাতে রাসূলুল্লাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আল্লাহ তাদের মনে স্বপ্নের মাধ্যমে শক্তি যোগান। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ দেখলেন যে বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্যের সংখ্যা খুবই কম। কেন আল্লাহ আযযা ওয়াজাল, রাসূলুল্লাহ কে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কম দেখালেন? আল্লাহ আযযা ওয়াজাল চেয়েছিলেন মু'মিনদের অন্তর দৃঢ় রাখতে। কুরাইশ বাহিনী ছিল মুসলিম বাহিনীর তিনগুণ। এটা মুসলিমদের মনোবল দুর্বল হওয়ার কারণ হতে পারে। যদি কোনো সৈন্য এটা ভেবে যুদ্ধের ময়দানে যায় যে, তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাহলে সে যুদ্ধের ময়দানে ভেঙে পড়বে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে দেখান যেন মুসলিমরা হতোদ্যম হয়ে না পড়ে।

“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ স্বপ্নে আপনাকে সেসব কাফেরের পরিমাণ অল্প করে দেখালেন - বেশি করে দেখালে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলতে এবং এ বিষয় নিয়ে তোমরা একে অপরের সাথে বিতর্ক শুরু করে দিতে - কিন্তু আল্লাহ (এটা হতে না দিয়ে) তোমাদের রক্ষা করেছেন। মানুষের অন্তরে যা কিছু লুকিয়ে রয়েছে, তা তিনি জানেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৪৩)

আরবে তখন বৃষ্টির মৌসুম ছিল না, কিন্তু তবু পরদিন সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। ইবনে ইসহাক বলেছেন যে, উপত্যকাটি ছিল নরম আর বাদামী; আকাশ থেকে পানি মাটিকে এমনভাবে আর্দ্র করে দিয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর বাহিনীর অগ্রসর হতে কোনো কষ্ট হয়নি। অপরদিকে কুরাইশদের উপর এতই বৃষ্টি হয়েছিল যে, তাঁরা ঠিক মতো সামনে এগুতেই পারছিল না।

এই বৃষ্টি দুপক্ষের উপরেই বর্ষিত হয়েছিল; মুসলিম আর কাফিরদের উপর, কিন্তু মুসলিমদের জন্য মাটি হয়েছিল আর্দ্র আর নমনীয়। অথচ একই বৃষ্টি কুরাইশদের জন্য মাটিকে করে দিয়েছিল কর্দমাক্ত আর দুঃসাধ্য। এটা তাদের সেনাবাহিনীকে বিপাকে ফেলে দেয়। একই বৃষ্টি - কিন্তু দুপক্ষের উপর দু'রকম প্রভাব, এটি ছিল আল্লাহ আযযা ওয়া জালের পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য। সেই সকালে কিছু মুসলিম স্বপ্নদোষের কারণে অপবিত্র অবস্থায় ঘুম থেকে উঠেছিলেন। শয়তান মুসলিমদের মনে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছিল, 'কীভাবে তোমরা অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধ করবে?” তাই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ওই মুসলিমদের অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পানি বর্ষণ করে তাদের পবিত্র করে দিয়েছিলেন।

“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের নিরাপত্তা আর স্বস্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছেন এবং তোমাদের ওপর তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি নাযিল করেছেন – উদ্দেশ্য ছিল এ পানি দ্বারা তিনি তোমাদের পবিত্র করবেন, তোমাদের মন থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করবেন, তোমাদের মনে বৃদ্ধি করবেন সাহস এবং (সর্বোপরি যুদ্ধের ময়দানে) তিনি এর মাধ্যমে তোমাদের পদক্ষেপ মজমুত করবেন।” (সূরা আনফাল, ৮: ১১)

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধের পূর্বরাত্রি

📄 যুদ্ধের পূর্বরাত্রি


আলী ইবনে আবি তালিব যুদ্ধের আগের রাতের ব্যাপারে বলেছেন, সকল মুসলিমরা ঘুমিয়ে ছিল। এই ঘুম আল্লাহর পক্ষ থেকে বারাকাহ, আল্লাহ বলেছেন, “তিনি আরোপ করেছিলেন তোমাদের উপর তন্দ্রাচ্ছন্নতা…” সাধারণত যুদ্ধের আগের রাতে সবাই খুব উদ্বিগ্ন, চিন্তিত, ভীত অবস্থায় থাকে। কিন্তু সাহাবারা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছিলেন! এর উপর ভিত্তি করে আলিমরা বলেছেন, যুদ্ধের আগে ঘুমানো হচ্ছে ঈমানের লক্ষণ, আর নামাজে ঘুমানো হচ্ছে নিফাকের লক্ষণ, কেননা অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল বলেছেন, যখন মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়। যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধের সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব হলো ঈমানের লক্ষণ, কারণ এটি অন্তরে থাকা আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে।

কিন্তু একজন মানুষ সেই রাতে ঘুমাননি। সারা রাত জেগে ছিলেন। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ। তিনি সারারাত দাঁড়িয়ে থেকে আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন।

“যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকট প্রান্তে, তারা ছিল দূর প্রান্তে, আর কুরাইশ কাফেলা ছিল তোমাদের তুলনায় নিম্নভূমিতে। (যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে) তোমরা যদি পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হতে, তবে তোমরা সে ওয়াদা পালন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তা-ই ঘটাতে চেয়েছিলেন যা হওয়ারই ছিল। (এ জন্যেই তিনি উভয় দলকে রণক্ষেত্রে মুখোমুখি করালেন) যাতে করে – যে দলটি ধ্বংস হওয়ার, তারা যেন ধ্বংস হয় সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর – আর যে দলটি বেঁচে থাকবে, তারাও যেন বেঁচে থাকে সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর। আর নিশ্চিতই আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ।” (সূরা আনফাল, ৮: ৪২)

মুসলিমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হয়নি। কাফিররাও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়নি, ময়দানে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে তাদের পারস্পরিক কোনো অঙ্গীকার ছিল না। মুসলিমরা কুরাইশদের মুখোমুখি হতে চায়নি, আর না কুরাইশরা মুসলিমদের। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিমরা কুরাইশদের মুখোমুখি হোক। আবু সুফিয়ানসহ আরও কিছু কুরাইশ যুদ্ধে জড়াতে চাইছিল না। এমনকি কিছু সংখ্যক কুরাইশ ভয় পাচ্ছিল এই ভেবে যে, তারা যুদ্ধ করছে আল্লাহর একজন নবীর সাথে। কিন্তু তাদের মনের ভেতরে ছিল ঔদ্ধত্য। তাই তারা রাসূলুল্লাহর অনুসরণ করেনি। এধরনের কুফরকে বলা হয় কুফর আল ইস্তিকবার, ঔদ্ধত্য থেকে কুফরি। অন্যদিকে অনেক মুসলিমও যুদ্ধ করতে চাননি, কারণ তাঁরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন কাফেলা আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে, যুদ্ধে অংশ নিতে নয়। "যে দল ধ্বংস হওয়ার, তারা যেন সত্যমিথ্যা স্পষ্ট হওয়ার পর ধ্বংস হয়, যে দল বেঁচে থাকার, তারাও যেন সত্যাসত্য স্পষ্ট হওয়ার পর বেঁচে থাকে” এই যুদ্ধ ছিল ঈমান আর কুফরের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

এদিকে সাদ ইবন মুয়ায একটি পরামর্শ নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন। তিনি দাবি করলেন যেন রাসূলুল্লাহর জন্য একটি তাঁবু বানানো হয় আর তাঁর নিরাপত্তার জন্য প্রহরী প্রস্তুত করা হয়। সাদ বলেছিলেন, 'আমরা আশা করি মুসলিমরাই এই যুদ্ধে জিতে যাবে। কিন্তু যদি মুসলিমরা পরাজিত হয় তাহলে রাসূলুল্লাহর উচিত মদীনায় ফিরে যাওয়া। কেননা মদীনার মুসলিমরা আল্লাহর রাসূলকে সেভাবে চায় যেভাবে আমরা তাঁকে চাই। আর তাঁরা যদি জানতো আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি, তাহলে তাঁরা বসে থাকত না। তাদেরকে নিয়ে আল্লাহর রাসূল তাঁর মিশন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন - এটাই আমি বিশ্বাস করি।' সাদ এখানে সম্ভবত আল আওস গোত্রের কথা বলছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সাথে যোগদান করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।

রাসূলুল্লাহ সা'দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর জন্য দুআ করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহর জন্য একটি তাঁবু বানানো হয়। তিনি সেখানেই থাকেন। আবু বকর ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 অবশ্যম্ভাবী সংঘাত এড়ানোর প্রচেষ্টা

📄 অবশ্যম্ভাবী সংঘাত এড়ানোর প্রচেষ্টা


ইবনে ইসহাক্ব বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ দেখলেন কুরাইশরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে আকানকাল পাহাড়ের পেছনে বালুময় উপত্যকার কাছে জড়ো হচ্ছে। তাদের দেখে তিনি বলে উঠলেন,
'হে আল্লাহ! কুরাইশরা আজ নেমে এসেছে অহংকার আর দম্ভভরে – তোমার বিরোধিতায় আর তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে। হে আল্লাহ! আজ তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্যের বড় বেশি প্রয়োজন। হে আল্লাহ! তুমি আজ ওদেরকে ছিন্ন ভিন্ন করে দাও।'

কুরাইশ কাফির বাহিনীর মাঝে লাল উটে আরোহিত এক কাফিরকে দেখে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'কুরাইশদের কারো মাঝে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে, তবে এ লাল উটের আরোহীর মাঝেই রয়েছে। অন্যেরা যদি তাঁর কথা মেনে নিত, তাহলে সঠিক পথ পেত। ' লাল উটের এই আরোহী ছিল কুরাইশদের অন্যতম নেতা উতবাহ ইবন রাবিয়াহ। কুরাইশরা মুসলিম বাহিনীর সামরিক শক্তি আর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য উমার ইবনে ওয়াহাবকে পাঠিয়েছিল। উমার ফিরে গিয়ে বলে, 'কুরাইশরা, তোমরা শোনো! আমি তাদের উটের পিঠে সাক্ষাৎ মৃত্যু দেখেছি। তাদের মধ্যে কারো অস্ত্র আর সম্বল শুধু তাদের তরবারি। আল্লাহর শপথ! তোমাদেরকে না মেরে তারা মরবে না। তাদের প্রত্যেকে যদি আমাদের একজনকেও হত্যা করে, তাহলে আমাদের বেঁচে থেকে কী লাভ? কাজেই কুরাইশরা, তোমরা যা কিছু করবে, ভেবে চিন্তে কোরো।'

উমার ইবনে ওয়াহাব দেখেছিল যে, মুসলিম বাহিনী সংখ্যায় বেশ কম। কিন্তু তাদের দেখে তার মনে হয়েছে তাঁরা মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে এসেছে। তাঁরা এসেছে মারতে এবং মরতে। হাকিম ইবনে হিযাম লাল উটের আরোহী সে কুরাইশ নেতার কাছে গিয়ে বললো,
- আমি কি আপনাকে এমন পরামর্শ দিব যা গ্রহণ করলে সারাজীবন লোকেদের মুখে আপনার প্রশংসা থাকবে।
- হ্যাঁ, বলো সেটা কী? উতবা জানতে চাইলো।
- আপনি সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে মক্কায় ফেরত যান। হাদরামির রক্তপণ আপনিই পরিশোধ করে দিন, এই মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সবাইকে এর মধ্যে জড়াবেন না।
- ঠিক আছে, হাদরামির রক্তমূল্য আমি নিজে থেকে পুষিয়ে দিতে রাজি আছি। তুমি এক কাজ করো। তুমি আবু জাহেলের কাছে যাও, তাকে বোঝাও। সে-ই সবাইকে যুদ্ধের ব্যাপারে উসকানি দিয়ে উত্তেজিত করছে।

উতবা হাকিমের প্রস্তাবে রাজি হলো, সে যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে চাইলো। এই যুদ্ধের একটা অন্যতম কারণ ছিল হাদরামি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া। হাদরামি নিহত হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে পরিচালিত সারিয়ায়ে নাখলার অভিযানে। উতবা ছিল হাদরামির মিত্র, তাই হাকিম তাকে এই যুদ্ধকে এড়ানোর জন্য বিকল্প পন্থা হিসাবে হাদরামির রক্তপণ দিয়ে দিতে অনুরোধ করে। এই প্রস্তাবটি উতবার পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু তাদের নেতা ছিল আবু জাহেল, তাই তার অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। উতবা দাঁড়িয়ে কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বললো,
'শোনো, মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে লড়াইয়ে আমাদের তেমন কোনো অর্জন নেই। যদি তোমরা তাঁকে মেরে ফেলো তাহলে এমন সব মানুষ মারা পড়বে যাদের নিহত চেহারা দেখতে তোমাদের কারোই ভালো লাগবে না। তোমরা তো তোমাদের চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই অথবা গোত্রের কাউকেই হত্যা করবে। তোমরা ফিরে চলো এবং মুহাম্মাদকে আরবের অন্য গোত্রগুলোর হাতে ছেড়ে দাও। যদি তারা মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের মেরে ফেলে তবে তোমাদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। আর যদি মুহাম্মাদ বিজয়ী হয়, তাহলে সে আমাদের উপর প্রতিশোধ নেবে না।'

উতবা কুরাইশদেরকে এসব কথা বলছিল। অন্যদিকে হাকিম ইবনে হিযাম, আবু জাহেলকে এসব ব্যাপার বুঝানোর চেষ্টা করছিল। আবু জাহেল তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাকে খোঁচা দিয়ে বললো, 'উতবা কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পাঠানোর মতো পেল না!' হাকিম বললো, 'হ্যাঁ, হয়তো সে অন্য কাউকে পাঠাতে পারতো, কিন্তু মানুষটা উতবা বলেই আমি তার বার্তাবাহক হয়েছি, অন্য কারো হয়ে আমি কথা বলতে আসতাম না।'

এরপর আবু জাহেল বললো, 'আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের দেখে ভয়ে উতবার বুক শুকিয়ে গেছে। আমরা কক্ষনো মক্কায় ফিরে যাবো না, যতক্ষণ আল্লাহ, মুহাম্মাদ আর আমাদের মধ্যে একটি ফয়সালা না করেন। সে ভয় পাচ্ছে আমরা মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের কচুকাটা করবো। তার ছেলে তো তাদের সাথেই আছে। ছেলেকে বাঁচাতেই সে মুসলিমদের ব্যাপারে তোমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে।'

কুরাইশদেরকে উত্তেজিত করার জন্য এরপর আবু জাহেল আমর ইবন হাদরামির ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললো, 'ভাবতে পারো! তোমারই বন্ধু, তোমারই আশ্রয়দাতা উতবা চায় মক্কায় ফিরে যেতে! তুমি যাও, গিয়ে সবাইকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ প্রদান করো।' আমর ইবন হাদরামির ভাই তার মৃত ভাইয়ের স্মৃতিকে তরতাজা করতে কুরাইশ বাহিনীর সামনে গিয়ে বলতে থাকে, 'হায় আমর, হায় আমর'! এভাবে সে নানাভাবে তাদেরকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।

আবু জাহেল শুধু তার বাহিনীকে মুসলিমদের উপর উত্তেজিত করেনি, সে উতবাকেও ক্ষেপিয়ে দিতে সফল হয়। উতবা যখন শুনলো আবু জাহেল তাকে ছোট করার জন্য বলেছে, 'উতবার বুক শুকিয়ে গেছে', তখন সে নিজের পৌরুষ দেখানোর জন্য বলে ওঠে, 'ঠিক আছে, দেখা যাবে, কার বুক শুকিয়ে গেছে, আমার না তার!' আবু জাহেলের কথাকে ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে বদরের দ্বন্দ্বযুদ্ধে সে সবার আগে এগিয়ে যায়। আবু জাহেলের ব্যক্তিত্বই ছিল এমন। সে উসকানি দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিতে পারত। সে একাই পুরো কুরাইশ বাহিনীকে যুদ্ধের দিকে ধাবিত করতে সক্ষম হয়।

টিকাঃ
১০০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 উতবার ঘটনা থেকে শিক্ষা

📄 উতবার ঘটনা থেকে শিক্ষা


রাসূলুল্লাহ উতবার ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন, 'কুরাইশদের কারো মাঝে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে, তবে তা উতবার মাঝেই রয়েছে। তারা যদি তার কথা শুনতো তবে তারা সঠিক কাজটাই করতো।' কাফিরদের মধ্যে দু'ধরনের লোক আছে। একটি দল হলো উগ্রপন্থী, ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী। তারা যুদ্ধ ও রক্তারক্তি পছন্দ করে। অপর দলটির জ্ঞান এবং বোধবুদ্ধি আছে, তারা মধ্যমপন্থায় বিশ্বাস করে। কিন্তু, যখনই ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে কাফিরদের বিরোধ হয়, তখন এই মধ্যমপন্থী কাফিরদের মতামত, উগ্রপন্থী কাফিরদের কুযুক্তি ও উত্তেজক বিবৃতির নিচে চাপা পড়ে যায়। ফলে এই উগ্রপন্থীরা যুদ্ধে চালকের আসনে আসীন হয়।

অনেক মুসলিম সরলমনে এমনটা আশা করে যে, কাফিরদের মধ্যেও যেহেতু কিছু যুদ্ধবিরোধী, মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোক আছে, নিশ্চয়ই তাদের কথা এসব 'উগ্রবাদী, জঙ্গী কাফির'দের উপর প্রাধান্য পাবে এবং কাফিররা যুদ্ধের পথ ছেড়ে দেবে। এক কুফর শক্তির সাথে আরেক কুফর শক্তির সংঘাতে এমনটা হলেও, যখন আল্লাহর দ্বীনের সাথে, আল্লাহর নবীদের সাথে বা নবীদের অনুসারীদের সাথে কুফরের সংঘাত হয় তখন শান্তিকামীদের কণ্ঠ উগ্রবাদীদের জোরালো মিডিয়া প্রপাগান্ডার নিচে চাপা পড়ে – এটাই বাস্তবতা।

যেমন, আবু সুফিয়ানের কথায় যুক্তি ছিল। সে কুরাইশ বাহিনীকে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ এড়াতে বলেছিল। বনু যাহরা গোত্রের নেতা ছিল আখনাস ইবন শুরাইক। তারা এ যুদ্ধে জড়ায়নি, তারা নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে লড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। একইভাবে উতবা এবং হাকিম ইবন হিযামও যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কথায় কুরাইশরা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হয়নি।

ইসলাম ও মুসলিমদের কোনো ব্যাপারে কাফিরদের আচরণ স্বাভাবিক থেকে ভিন্ন। যেমন আবু সুফিয়ানের ছেলেকে মুসলিমরা যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরে নিয়ে যায়। আবু সুফিয়ানকে বলা হয় সে যেন মুক্তিপণ দিয়ে তার ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিমরা তার এক ছেলেকে আগে হত্যা করেছিল। তাই সে জিদের বশে অপর ছেলেকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে প্রত্যাখ্যান করে। নিজের ছেলেকে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও সে ছাড়িয়ে আনেনি, বরং মুসলিমদের শিক্ষা দিতে সে কুরাইশদের দীর্ঘদিনের একটি প্রথা ভাঙে। কুরাইশরা হাজ্জযাত্রীদেরকে খুব সম্মান করতো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে তারা সকল হাজ্জযাত্রীকে আদর-আপ্যায়ন করতো। কিন্তু সেবার কোনো এক আরব মুসলিম গোত্রের এক সদস্য হাজ্জ করতে গেলে প্রতিশোধ স্বরুপ আবু সুফিয়ান তাকে গ্রেপ্তার করে বন্দী করে রাখে।

ইবনে ইসহাক বলেন, 'কুরাইশরা ঐতিহাসিকভাবে হাজীদের প্রতি অতিথিপরায়ণ ছিল। কিন্তু প্রথমবারের মতো তারা ওই রীতি ভঙ্গ করে। আবু সুফিয়ান ওই মুসলিমকে কারাবন্দী করে রাখে। কারাবন্দী মুসলিমের পরিবার রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বিষয়টি জানায়। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ানের ছেলেকে মুক্ত করে দেন। এরপর আবু সুফিয়ান সেই কারাবন্দী মুসলিমকে মুক্ত করে দেয়।'

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিমদের প্রতি কাফিরদের আচরণ স্বাভাবিক থেকে আলাদা। ইসলাম ও মুসলিম সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের নৈতিকতার মানদণ্ড পাল্টে যায়। সবার জন্য একই আইন, কিন্তু মুসলিমদের জন্য ভিন্ন। কাফিরদের মধ্যে কোনো প্রজ্ঞাবান, শান্তিকামী আর মধ্যমপন্থী মানুষ থাকলেও মুসলিমদের বিষয় আসলে তাদের চেহারা পাল্টে যায়। শয়তান তার অনুসারীদের মধ্যে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতে চায় যে, ইসলামের অনুসারীদেরকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px