📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দুই বাহিনীর পরিসংখ্যান

📄 দুই বাহিনীর পরিসংখ্যান


বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সঠিক সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। রাসূলুল্লাহর হিসাব প্রায় ঠিক ছিল। মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৩০০ জনের একটু বেশি, অর্থাৎ মুসলিমরা ছিল কুরাইশদের ৩ ভাগের ১ ভাগ। তাদের মধ্যে ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির, ৬১ জন ছিলেন আল আওস গোত্রের আর ১৭০ জন ছিলেন আল খাযরাজের। আল আউস গোত্রের বাসস্থান ছিল মদীনার উপরিভাগে। আর রাসূলুল্লাহ সেনা সংগ্রহ করার সময় বলেছিলেন, যাদের বাহন প্রস্তুত আছে শুধু তাঁরা সেনাদলে যোগদান করতে পারবে। তাই আল আউস গোত্রের লোকেরা একটু দূরে বসবাস করায় তাদের অল্পসংখ্যক লোক এই যুদ্ধে যোগদান করতে পেরেছে।

বুখারি থেকে বর্ণিত, আল বারা ইবন আযিব বর্ণনা করেন, 'আমরা, রাসূলুল্লাহর সাহাবারা যখন বদরের কথা আলোচনা করতাম, তখন আমরা বলতাম – বদরে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের সংখ্যা আর তালুতের যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুজাহিদ, যারা নদীর পানিপান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল তাদের সংখ্যা সমান। আর যারা এতে সফল হয়েছিল তাঁরা ছিল মু'মিন, তাঁরা ৩১০ জনের একটু বেশি ছিল।'

বদরের মুসলিম আর বনী ইসরাইলদের যারা তালুতের সাথে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে একটা মিল ছিল। আল বারা এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তা হলো, বনী ইসরাঈলের যেসব মু'মিন তালুতের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছিল তারাই ছিল তাদের যুগে সেরা। আর বদরে যেসব মু'মিন যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা ছিলেন তাদের যুগের সেরা। তাঁরা দুনিয়াবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তাই তাঁরাই ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ।

এই যুদ্ধে মুসলিমদের ছিল নিজস্ব ব্যানার, পতাকা, স্লোগান আর রণধ্বনি। যুদ্ধে উৎসাহ ও উদ্দীপনা ধরে রাখাই ছিল এসবের উদ্দেশ্য। বদরের যুদ্ধের ব্যানার ছিল সাদা। এটি ছিল মুসআব ইবনে উমাইরের হাতে। রাসূলুল্লাহ দুটি কালো পতাকা বহন করিয়েছিলেন; একটির নাম ছিল আল উকবা, এটি ছিল আলী ইবনে আবি তালিবের হাতে এবং অপর কালো পতাকাটি আনসারদের একজনের হাতে দেওয়া হয়েছিল।

পুরো বাহিনীর মাত্র ২টি ঘোড়া ছিল। একটি ছিল যুবাইরের আর অন্যটি আল মিকদাদ ইবন আসওয়াদের হাতে। মুসলিমদের উট ছিল ৭০টি; প্রতিটি উট ৩ জনকে পালাক্রমে ভাগাভাগি করে চড়তে হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ নিজের উটটি আলী ইবনে আবি তালিব এবং মারসাদ ইবনে মারসাদ আল ঘানাওয়ীর সাথে ভাগাভাগি করেছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রণক্ষেত্রে অবস্থান

📄 রণক্ষেত্রে অবস্থান


যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর রাসূল দাঁড়িয়ে। তিনি ভাবছেন কোন অবস্থানে থেকে যুদ্ধ করলে কৌশলগত সুবিধা হবে। তিনি ভেবেচিন্তে একটি অবস্থান নির্বাচন করলেন। তখন একজন আনসারী সাহাবি, আল হাব্বাব ইবন আল মুনযির রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ কি আপনাকে ওয়াহীর মাধ্যমে এই জায়গা নির্ধারণ করতে আদেশ দিয়েছেন নাকি আপনি কৌশলগত কারণে জায়গাটি পছন্দ করেছেন?

আল হাব্বাবের প্রশ্নের ধরনটি লক্ষণীয়। তিনি জানতে চাইছেন সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি পছন্দ করার কারণ কী। যদি এটি আল্লাহর তরফ থেকে ওয়াহী হয়, তাহলে আল হাব্বাব তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতেন, কিন্তু যদি যুদ্ধের কোনো কৌশল হয় তাহলে তাঁর কিছু বলার আছে। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, 'না, এটা ওয়াহী নয়, এটা নিছক যুদ্ধের কৌশল। আল মুনযির তখন প্রস্তাব করলেন যে, তাদের উচিত বদরের কুয়া পর্যন্ত পৌঁছানো এবং কুয়াকে পেছনে রেখে একটি জলাধার তৈরি করে কুয়ার সামনে অবস্থান নেওয়া। তিনি এর পেছনে যুক্তিও দেখালেন। মুসলিমরা যদি এই অবস্থানে থাকে তাহলে কুরাইশরা পানির নাগাল পাবে না কিন্তু মুসলিমদের দখলে প্রচুর পানি থাকবে। রাসূলুল্লাহ তাঁর এই প্রস্তাব খুবই পছন্দ করলেন এবং সে অনুযায়ী যুদ্ধের অবস্থান বেছে নিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের বৃষ্টিপাত

📄 আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের বৃষ্টিপাত


যুদ্ধের আগের রাতে রাসূলুল্লাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আল্লাহ তাদের মনে স্বপ্নের মাধ্যমে শক্তি যোগান। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ দেখলেন যে বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্যের সংখ্যা খুবই কম। কেন আল্লাহ আযযা ওয়াজাল, রাসূলুল্লাহ কে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কম দেখালেন? আল্লাহ আযযা ওয়াজাল চেয়েছিলেন মু'মিনদের অন্তর দৃঢ় রাখতে। কুরাইশ বাহিনী ছিল মুসলিম বাহিনীর তিনগুণ। এটা মুসলিমদের মনোবল দুর্বল হওয়ার কারণ হতে পারে। যদি কোনো সৈন্য এটা ভেবে যুদ্ধের ময়দানে যায় যে, তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাহলে সে যুদ্ধের ময়দানে ভেঙে পড়বে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে দেখান যেন মুসলিমরা হতোদ্যম হয়ে না পড়ে।

“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ স্বপ্নে আপনাকে সেসব কাফেরের পরিমাণ অল্প করে দেখালেন - বেশি করে দেখালে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলতে এবং এ বিষয় নিয়ে তোমরা একে অপরের সাথে বিতর্ক শুরু করে দিতে - কিন্তু আল্লাহ (এটা হতে না দিয়ে) তোমাদের রক্ষা করেছেন। মানুষের অন্তরে যা কিছু লুকিয়ে রয়েছে, তা তিনি জানেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৪৩)

আরবে তখন বৃষ্টির মৌসুম ছিল না, কিন্তু তবু পরদিন সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। ইবনে ইসহাক বলেছেন যে, উপত্যকাটি ছিল নরম আর বাদামী; আকাশ থেকে পানি মাটিকে এমনভাবে আর্দ্র করে দিয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর বাহিনীর অগ্রসর হতে কোনো কষ্ট হয়নি। অপরদিকে কুরাইশদের উপর এতই বৃষ্টি হয়েছিল যে, তাঁরা ঠিক মতো সামনে এগুতেই পারছিল না।

এই বৃষ্টি দুপক্ষের উপরেই বর্ষিত হয়েছিল; মুসলিম আর কাফিরদের উপর, কিন্তু মুসলিমদের জন্য মাটি হয়েছিল আর্দ্র আর নমনীয়। অথচ একই বৃষ্টি কুরাইশদের জন্য মাটিকে করে দিয়েছিল কর্দমাক্ত আর দুঃসাধ্য। এটা তাদের সেনাবাহিনীকে বিপাকে ফেলে দেয়। একই বৃষ্টি - কিন্তু দুপক্ষের উপর দু'রকম প্রভাব, এটি ছিল আল্লাহ আযযা ওয়া জালের পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য। সেই সকালে কিছু মুসলিম স্বপ্নদোষের কারণে অপবিত্র অবস্থায় ঘুম থেকে উঠেছিলেন। শয়তান মুসলিমদের মনে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছিল, 'কীভাবে তোমরা অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধ করবে?” তাই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ওই মুসলিমদের অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পানি বর্ষণ করে তাদের পবিত্র করে দিয়েছিলেন।

“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের নিরাপত্তা আর স্বস্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছেন এবং তোমাদের ওপর তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি নাযিল করেছেন – উদ্দেশ্য ছিল এ পানি দ্বারা তিনি তোমাদের পবিত্র করবেন, তোমাদের মন থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করবেন, তোমাদের মনে বৃদ্ধি করবেন সাহস এবং (সর্বোপরি যুদ্ধের ময়দানে) তিনি এর মাধ্যমে তোমাদের পদক্ষেপ মজমুত করবেন।” (সূরা আনফাল, ৮: ১১)

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধের পূর্বরাত্রি

📄 যুদ্ধের পূর্বরাত্রি


আলী ইবনে আবি তালিব যুদ্ধের আগের রাতের ব্যাপারে বলেছেন, সকল মুসলিমরা ঘুমিয়ে ছিল। এই ঘুম আল্লাহর পক্ষ থেকে বারাকাহ, আল্লাহ বলেছেন, “তিনি আরোপ করেছিলেন তোমাদের উপর তন্দ্রাচ্ছন্নতা…” সাধারণত যুদ্ধের আগের রাতে সবাই খুব উদ্বিগ্ন, চিন্তিত, ভীত অবস্থায় থাকে। কিন্তু সাহাবারা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছিলেন! এর উপর ভিত্তি করে আলিমরা বলেছেন, যুদ্ধের আগে ঘুমানো হচ্ছে ঈমানের লক্ষণ, আর নামাজে ঘুমানো হচ্ছে নিফাকের লক্ষণ, কেননা অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল বলেছেন, যখন মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়। যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধের সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব হলো ঈমানের লক্ষণ, কারণ এটি অন্তরে থাকা আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে।

কিন্তু একজন মানুষ সেই রাতে ঘুমাননি। সারা রাত জেগে ছিলেন। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ। তিনি সারারাত দাঁড়িয়ে থেকে আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন।

“যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকট প্রান্তে, তারা ছিল দূর প্রান্তে, আর কুরাইশ কাফেলা ছিল তোমাদের তুলনায় নিম্নভূমিতে। (যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে) তোমরা যদি পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হতে, তবে তোমরা সে ওয়াদা পালন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তা-ই ঘটাতে চেয়েছিলেন যা হওয়ারই ছিল। (এ জন্যেই তিনি উভয় দলকে রণক্ষেত্রে মুখোমুখি করালেন) যাতে করে – যে দলটি ধ্বংস হওয়ার, তারা যেন ধ্বংস হয় সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর – আর যে দলটি বেঁচে থাকবে, তারাও যেন বেঁচে থাকে সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর। আর নিশ্চিতই আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ।” (সূরা আনফাল, ৮: ৪২)

মুসলিমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হয়নি। কাফিররাও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়নি, ময়দানে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে তাদের পারস্পরিক কোনো অঙ্গীকার ছিল না। মুসলিমরা কুরাইশদের মুখোমুখি হতে চায়নি, আর না কুরাইশরা মুসলিমদের। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিমরা কুরাইশদের মুখোমুখি হোক। আবু সুফিয়ানসহ আরও কিছু কুরাইশ যুদ্ধে জড়াতে চাইছিল না। এমনকি কিছু সংখ্যক কুরাইশ ভয় পাচ্ছিল এই ভেবে যে, তারা যুদ্ধ করছে আল্লাহর একজন নবীর সাথে। কিন্তু তাদের মনের ভেতরে ছিল ঔদ্ধত্য। তাই তারা রাসূলুল্লাহর অনুসরণ করেনি। এধরনের কুফরকে বলা হয় কুফর আল ইস্তিকবার, ঔদ্ধত্য থেকে কুফরি। অন্যদিকে অনেক মুসলিমও যুদ্ধ করতে চাননি, কারণ তাঁরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন কাফেলা আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে, যুদ্ধে অংশ নিতে নয়। "যে দল ধ্বংস হওয়ার, তারা যেন সত্যমিথ্যা স্পষ্ট হওয়ার পর ধ্বংস হয়, যে দল বেঁচে থাকার, তারাও যেন সত্যাসত্য স্পষ্ট হওয়ার পর বেঁচে থাকে” এই যুদ্ধ ছিল ঈমান আর কুফরের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

এদিকে সাদ ইবন মুয়ায একটি পরামর্শ নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন। তিনি দাবি করলেন যেন রাসূলুল্লাহর জন্য একটি তাঁবু বানানো হয় আর তাঁর নিরাপত্তার জন্য প্রহরী প্রস্তুত করা হয়। সাদ বলেছিলেন, 'আমরা আশা করি মুসলিমরাই এই যুদ্ধে জিতে যাবে। কিন্তু যদি মুসলিমরা পরাজিত হয় তাহলে রাসূলুল্লাহর উচিত মদীনায় ফিরে যাওয়া। কেননা মদীনার মুসলিমরা আল্লাহর রাসূলকে সেভাবে চায় যেভাবে আমরা তাঁকে চাই। আর তাঁরা যদি জানতো আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি, তাহলে তাঁরা বসে থাকত না। তাদেরকে নিয়ে আল্লাহর রাসূল তাঁর মিশন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন - এটাই আমি বিশ্বাস করি।' সাদ এখানে সম্ভবত আল আওস গোত্রের কথা বলছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সাথে যোগদান করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।

রাসূলুল্লাহ সা'দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর জন্য দুআ করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহর জন্য একটি তাঁবু বানানো হয়। তিনি সেখানেই থাকেন। আবু বকর ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px