📄 গোপন তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ
রাসূলুল্লাহ কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছিলেন। বদরের কাছাকাছি তিনি তাঁর এক সাহাবির সাথে থামলেন। ইবনে হিশাম বলেছেন, এই সাহাবি ছিলেন আবু বকর। তাঁরা এক বৃদ্ধ বেদুইনকে থামিয়ে তার কাছে কুরাইশ এবং মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইলেন। বুড়ো লোকটি বললো,
- আপনারা নিজেদের পরিচয় না দেওয়ার আগে আমি কিছুই বলবো না।
- আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি যদি আমাদেরকে তথ্য দেন তাহলে আমরা কারা সেটা আপনাকে বলবো, রাসূলুল্লাহ বললেন।
- আচ্ছা আমি তথ্য দিলে তোমরাও দেবে, তাই তো?
- হ্যাঁ।
- আমি শুনেছি, মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাহাবিরা অমুক দিন বের হয়েছে। যদি তা সত্য হয় তবে আজ তাদের অমুক জায়গায় থাকার কথা, (বৃদ্ধ ঠিক ঠিক সে জায়গার কথাই বললো, যেখানে রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর সাহাবিরা অবস্থান করছিলেন) আর আমি শুনেছি কুরাইশরা অমুক দিন বের হয়েছে। আর এটি যদি সত্য হয়, তবে তাদের আজকে অমুক জায়গায় থাকার কথা। এবার তোমরা বলো তোমরা কোথা থেকে এসেছ।
- আমরা 'মা' থেকে এসেছি।'
এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ সেখান থেকে চলে আসছিলেন আর বৃদ্ধ লোকটি জিজ্ঞেস করছিলো 'মা থেকে মানে কী? এটা কি ইরাকের পানি থেকে?' কিন্তু রাসূলুল্লাহ কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন যেন লোকটি আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না পায়। আসলে রাসূলুল্লাহ বলতে চেয়েছিলেন 'আমরা মা অর্থাৎ পানি থেকে এসেছি।' কারণ আল্লাহ আযযা ওয়াজাল কুরআনে বলেন 'মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পানি থেকে'। কথার কৌশলে আল্লাহর রাসূল বুড়ো লোকটিকে এড়িয়ে গেলেন এবং তাকে কোনো তথ্য দিলেন না।
মুহাম্মাদ কুরাইশদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে গেলেন। এই বৃদ্ধ লোকটির তথ্য বেশ নির্ভরযোগ্য ছিল, কারণ সে মুহাম্মাদ আর তাঁর সাহাবিদের অবস্থান সঠিকভাবে আন্দাজ করেছিল। রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের কাছে ফিরে গেলেন। তিনি কুরাইশদের সম্পর্কে আরো খবর আনতে আলী ইবনে আবি তালিব, আয যুবাইর এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের সাথে কিছু সাহাবিদের পাঠালেন। তাঁরা কুরাইশদের বাহিনীর এক ক্রীতদাসকে দেখতে পেয়ে আটক করে নিয়ে আসেন। তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কাদের লোক?' সে বললো 'আমি কুরাইশ বাহিনীর লোক।' সাহাবারা তাকে প্রহার করে আবু সুফিয়ানের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কিন্তু সেই ক্রীতদাসটি আবু সুফিয়ান কোথায় আছে তা জানতো না। সাহাবারা তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি আর কাদের সম্পর্কে জানো?' সে বললো, 'আমি আবু জাহেল, আবু উমাইয়্যা ইবন খালাফ, উতবা ইবন রাবিয়া এবং কুরাইশ বাহিনীর বিখ্যাত লোকদের সম্পর্কে জানি।' কিন্তু তাঁরা তাকে আবু সুফিয়ান সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য মারতে শুরু করলেন। এরপর সে বললো, 'ঠিক আছে আমি বলছি আবু সুফিয়ান কোথায়।' এ কথা বলার পর সাহাবারা তাকে প্রহার করা বন্ধ করলেন। তখন সে বললো, 'আমি জানি না আবু সুফিয়ান কোথায়।' রাসূলুল্লাহ তখন সালাত শেষ করে বললেন, 'যখন সে সত্য বলেছিল তখন তোমরা তাকে প্রহার করেছো, আর যখন মিথ্যা বলেছে তখন তোমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছ।' এরপর রাসূলুল্লাহ নিজেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।
- আচ্ছা, কুরাইশদের লোকবল কেমন?
- অনেক হবে।
- তাদের সংখ্যা কতো?
- ঠিক বলতে পারছি না।
- আচ্ছা, তারা প্রতিদিন কয়টি উট জবাই করে তা জানো?
- তারা একদিন ১০টি উট জবাই করে আর পরের দিন জবাই করে ৯টি।
- হুম, তাহলে তাদের সংখ্যা ৯০০ থেকে ১০০০ জন।
টিকাঃ
৯৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৬।
📄 দুই বাহিনীর পরিসংখ্যান
বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সঠিক সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। রাসূলুল্লাহর হিসাব প্রায় ঠিক ছিল। মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৩০০ জনের একটু বেশি, অর্থাৎ মুসলিমরা ছিল কুরাইশদের ৩ ভাগের ১ ভাগ। তাদের মধ্যে ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির, ৬১ জন ছিলেন আল আওস গোত্রের আর ১৭০ জন ছিলেন আল খাযরাজের। আল আউস গোত্রের বাসস্থান ছিল মদীনার উপরিভাগে। আর রাসূলুল্লাহ সেনা সংগ্রহ করার সময় বলেছিলেন, যাদের বাহন প্রস্তুত আছে শুধু তাঁরা সেনাদলে যোগদান করতে পারবে। তাই আল আউস গোত্রের লোকেরা একটু দূরে বসবাস করায় তাদের অল্পসংখ্যক লোক এই যুদ্ধে যোগদান করতে পেরেছে।
বুখারি থেকে বর্ণিত, আল বারা ইবন আযিব বর্ণনা করেন, 'আমরা, রাসূলুল্লাহর সাহাবারা যখন বদরের কথা আলোচনা করতাম, তখন আমরা বলতাম – বদরে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের সংখ্যা আর তালুতের যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুজাহিদ, যারা নদীর পানিপান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল তাদের সংখ্যা সমান। আর যারা এতে সফল হয়েছিল তাঁরা ছিল মু'মিন, তাঁরা ৩১০ জনের একটু বেশি ছিল।'
বদরের মুসলিম আর বনী ইসরাইলদের যারা তালুতের সাথে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে একটা মিল ছিল। আল বারা এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তা হলো, বনী ইসরাঈলের যেসব মু'মিন তালুতের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছিল তারাই ছিল তাদের যুগে সেরা। আর বদরে যেসব মু'মিন যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা ছিলেন তাদের যুগের সেরা। তাঁরা দুনিয়াবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তাই তাঁরাই ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ।
এই যুদ্ধে মুসলিমদের ছিল নিজস্ব ব্যানার, পতাকা, স্লোগান আর রণধ্বনি। যুদ্ধে উৎসাহ ও উদ্দীপনা ধরে রাখাই ছিল এসবের উদ্দেশ্য। বদরের যুদ্ধের ব্যানার ছিল সাদা। এটি ছিল মুসআব ইবনে উমাইরের হাতে। রাসূলুল্লাহ দুটি কালো পতাকা বহন করিয়েছিলেন; একটির নাম ছিল আল উকবা, এটি ছিল আলী ইবনে আবি তালিবের হাতে এবং অপর কালো পতাকাটি আনসারদের একজনের হাতে দেওয়া হয়েছিল।
পুরো বাহিনীর মাত্র ২টি ঘোড়া ছিল। একটি ছিল যুবাইরের আর অন্যটি আল মিকদাদ ইবন আসওয়াদের হাতে। মুসলিমদের উট ছিল ৭০টি; প্রতিটি উট ৩ জনকে পালাক্রমে ভাগাভাগি করে চড়তে হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ নিজের উটটি আলী ইবনে আবি তালিব এবং মারসাদ ইবনে মারসাদ আল ঘানাওয়ীর সাথে ভাগাভাগি করেছিলেন।
📄 রণক্ষেত্রে অবস্থান
যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর রাসূল দাঁড়িয়ে। তিনি ভাবছেন কোন অবস্থানে থেকে যুদ্ধ করলে কৌশলগত সুবিধা হবে। তিনি ভেবেচিন্তে একটি অবস্থান নির্বাচন করলেন। তখন একজন আনসারী সাহাবি, আল হাব্বাব ইবন আল মুনযির রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ কি আপনাকে ওয়াহীর মাধ্যমে এই জায়গা নির্ধারণ করতে আদেশ দিয়েছেন নাকি আপনি কৌশলগত কারণে জায়গাটি পছন্দ করেছেন?
আল হাব্বাবের প্রশ্নের ধরনটি লক্ষণীয়। তিনি জানতে চাইছেন সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি পছন্দ করার কারণ কী। যদি এটি আল্লাহর তরফ থেকে ওয়াহী হয়, তাহলে আল হাব্বাব তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতেন, কিন্তু যদি যুদ্ধের কোনো কৌশল হয় তাহলে তাঁর কিছু বলার আছে। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, 'না, এটা ওয়াহী নয়, এটা নিছক যুদ্ধের কৌশল। আল মুনযির তখন প্রস্তাব করলেন যে, তাদের উচিত বদরের কুয়া পর্যন্ত পৌঁছানো এবং কুয়াকে পেছনে রেখে একটি জলাধার তৈরি করে কুয়ার সামনে অবস্থান নেওয়া। তিনি এর পেছনে যুক্তিও দেখালেন। মুসলিমরা যদি এই অবস্থানে থাকে তাহলে কুরাইশরা পানির নাগাল পাবে না কিন্তু মুসলিমদের দখলে প্রচুর পানি থাকবে। রাসূলুল্লাহ তাঁর এই প্রস্তাব খুবই পছন্দ করলেন এবং সে অনুযায়ী যুদ্ধের অবস্থান বেছে নিলেন।
📄 আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের বৃষ্টিপাত
যুদ্ধের আগের রাতে রাসূলুল্লাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আল্লাহ তাদের মনে স্বপ্নের মাধ্যমে শক্তি যোগান। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ দেখলেন যে বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্যের সংখ্যা খুবই কম। কেন আল্লাহ আযযা ওয়াজাল, রাসূলুল্লাহ কে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কম দেখালেন? আল্লাহ আযযা ওয়াজাল চেয়েছিলেন মু'মিনদের অন্তর দৃঢ় রাখতে। কুরাইশ বাহিনী ছিল মুসলিম বাহিনীর তিনগুণ। এটা মুসলিমদের মনোবল দুর্বল হওয়ার কারণ হতে পারে। যদি কোনো সৈন্য এটা ভেবে যুদ্ধের ময়দানে যায় যে, তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাহলে সে যুদ্ধের ময়দানে ভেঙে পড়বে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে দেখান যেন মুসলিমরা হতোদ্যম হয়ে না পড়ে।
“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ স্বপ্নে আপনাকে সেসব কাফেরের পরিমাণ অল্প করে দেখালেন - বেশি করে দেখালে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলতে এবং এ বিষয় নিয়ে তোমরা একে অপরের সাথে বিতর্ক শুরু করে দিতে - কিন্তু আল্লাহ (এটা হতে না দিয়ে) তোমাদের রক্ষা করেছেন। মানুষের অন্তরে যা কিছু লুকিয়ে রয়েছে, তা তিনি জানেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৪৩)
আরবে তখন বৃষ্টির মৌসুম ছিল না, কিন্তু তবু পরদিন সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। ইবনে ইসহাক বলেছেন যে, উপত্যকাটি ছিল নরম আর বাদামী; আকাশ থেকে পানি মাটিকে এমনভাবে আর্দ্র করে দিয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর বাহিনীর অগ্রসর হতে কোনো কষ্ট হয়নি। অপরদিকে কুরাইশদের উপর এতই বৃষ্টি হয়েছিল যে, তাঁরা ঠিক মতো সামনে এগুতেই পারছিল না।
এই বৃষ্টি দুপক্ষের উপরেই বর্ষিত হয়েছিল; মুসলিম আর কাফিরদের উপর, কিন্তু মুসলিমদের জন্য মাটি হয়েছিল আর্দ্র আর নমনীয়। অথচ একই বৃষ্টি কুরাইশদের জন্য মাটিকে করে দিয়েছিল কর্দমাক্ত আর দুঃসাধ্য। এটা তাদের সেনাবাহিনীকে বিপাকে ফেলে দেয়। একই বৃষ্টি - কিন্তু দুপক্ষের উপর দু'রকম প্রভাব, এটি ছিল আল্লাহ আযযা ওয়া জালের পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য। সেই সকালে কিছু মুসলিম স্বপ্নদোষের কারণে অপবিত্র অবস্থায় ঘুম থেকে উঠেছিলেন। শয়তান মুসলিমদের মনে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছিল, 'কীভাবে তোমরা অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধ করবে?” তাই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ওই মুসলিমদের অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পানি বর্ষণ করে তাদের পবিত্র করে দিয়েছিলেন।
“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের নিরাপত্তা আর স্বস্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছেন এবং তোমাদের ওপর তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি নাযিল করেছেন – উদ্দেশ্য ছিল এ পানি দ্বারা তিনি তোমাদের পবিত্র করবেন, তোমাদের মন থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করবেন, তোমাদের মনে বৃদ্ধি করবেন সাহস এবং (সর্বোপরি যুদ্ধের ময়দানে) তিনি এর মাধ্যমে তোমাদের পদক্ষেপ মজমুত করবেন।” (সূরা আনফাল, ৮: ১১)