📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মক্কার পরিস্থিতি

📄 মক্কার পরিস্থিতি


রাসূলুল্লাহর ফুফু আতিকা বিনত আবদুল মুত্তালিব মক্কায় থাকতেন। তিনি সে রাতে একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখলেন যে, এক লোক উটে চড়ে দ্রুত মক্কার দিকে আসছে এবং সে মক্কার অধিবাসীদেরকে চিৎকার করে ডাকছে। তার উট প্রথমে কাবাঘরের উপর, তারপর মক্কার এক পাহাড়ের চূড়ার উপর গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সে কুরাইশদের সাবধান করে বললো, 'তিনদিনের মধ্যে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।' এ কথা বলে লোকটি একটি পাথর নিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে ছুঁড়ে মারলো। পাথরটি মক্কার ভূমিতে পড়ামাত্র বিস্ফোরিত হলো। মক্কার প্রতিটি ঘরে সেই বিস্ফোরণ থেকে ছিটকে আসা বস্তু আঘাত হানলো।

আতিকা এই স্বপ্ন দেখে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি তাঁর ভাই আল-আব্বাসকে স্বপ্নের কথা জানান এবং অন্য কাউকে এর কথা জানাতে নিষেধ করেন। আল-আব্বাস সব কিছু শুনে তাঁর বোনকে এ ব্যাপারে চুপ থাকতে বলেন। কিন্তু আল-আব্বাস নিজেই বন্ধু ওয়ালীদ ইবন উতবাকে এই স্বপ্নের কথা বলে দেন। আবার এও বলে দেন যেন সে অন্য কাউকে এই স্বপ্নের কথা না বলে। কিন্তু ওয়ালীদ তাঁর পিতাকে এই স্বপ্নের কথা জানিয়ে দেন। আর এভাবেই এই সংবাদ সারা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে। আল আব্বাস বলেছেন, 'আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে কাবা তাওয়াফ করতে গিয়ে দেখি সেখানে আবু জাহেল অন্যান্য কুরাইশ নেতাদের সাথে বসে আতিকার স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করছে।' আল-আব্বাসকে দেখে আবু জাহেল তাকে তাওয়াফ সেরে তাদের সাথে আলোচনায় বসতে বলে। তাওয়াফ শেষে আল-আব্বাস তাদের আলোচনায় যোগ দেয়। তখন আবু জাহেল তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'তা কতদিন ধরে তোমাদের পরিবারে এই মহিলা নবী আছে?' আব্বাস আবু জাহেলের কথা না বুঝার ভান করলেন। আবু জাহেল এরপর আতিকার স্বপ্নের প্রসঙ্গ তুলে প্রচণ্ড শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বললো, 'তোমরা যারা আবদুল মুত্তালিবের পরিবার, তোমাদের তো একটা পুরুষ নবী আছেই, তাতেও দেখি তোমরা খুশি নও, এখন দেখছি মহিলা নবীও বানিয়ে নিয়েছ!' এরপর আবু জাহেল বললো, 'আতিকা তিনদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে, তো আমরা ভাবছি এই তিনদিন অপেক্ষা করে দেখবো আদৌ কিছু হয় কি না! এর মধ্যে সে যা বলেছে তা সত্যি না হলে তোমাদেরকে আরবের সবচেয়ে বড় মিথ্যুক বলে ঘোষণা দেওয়া হবে।'

আবু জাহেল আবদুল মুত্তালিবের পরিবারের সদস্যদের খুব অপমান করলো। আল-আব্বাস বাড়িতে ফিরে এলে এবার তাঁকে পেল আবদুল মুত্তালিব পরিবারের মহিলা সদস্যরা। আব্বাসের নীরবতা দেখে তাঁরা তাঁর উপর খুব রেগে গেল এবং তাঁর উপর এক চোট নিল। তাঁরা তাঁকে বললো, 'তোমার মুখের উপর ওই বেয়াদব বুড়ো লোকটা তোমার পরিবারের পুরুষদের অপমান করলো, মহিলাদের অপমান করলো, আর তুমি কিছুই বললে না, শুধুই শুনে গেলে? তোমার কি এসব কথা গায়ে লাগে না?' আল-আব্বাস তখন বললেন, 'আমি অবশ্যই এসব মেনে নেওয়ার মতো মানুষ নই। কিন্তু সে আগে কখনো আমার সাথে এমনটা করেনি। তবে আমি কসম করে বলছি আমি তার কথার উচিত জবাব দিব। এরপর সে যদি আবার তোমাদের সম্পর্কে এরূপ কথা বলে তবে আমি তাকে ছাড়বো না।' তিনদিন পর আব্বাস হারামে গিয়ে আবু জাহেলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন যাতে আবু জাহেল তাঁকে ডাক দেয় আর এই সুযোগে তিনি আবু জাহেলের দুর্ব্যবহারের শোধ নিতে পারে।

আল আব্বাস বর্ণনা করেন, 'আতিকার স্বপ্ন দেখার তৃতীয় দিন সকালের কথা, এই ভেবে আমার মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যাচ্ছিল যে আমি কেন আবু জাহেলকে সেদিন কোনো কথা না শুনিয়ে ছেড়ে দিলাম। আমি মসজিদে গিয়ে আবু জাহেলকে দেখলাম। তাকে দেখে মনে মনে ভাবছি, আজকে তাকে কথা শুনিয়েই ছাড়বো, এই ভেবে আমি তার দিকে এগোচ্ছি। আবু জাহেল ছিল ঘাগু মানুষ। ধারালো চেহারা, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আর শাণিত তার চাহনি। কিন্তু তাকে মসজিদের দরজার দিকে দৌড়ে আসতে দেখে আমি মনে মনে ভাবলাম, এই লোকের আবার কী হলো? সে কি আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ভয়ে এরকম করছে? আসলে সে কিছু একটা শুনে ভয় পেয়েছিল যা আমি তখনও শুনতে পাইনি।

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তখন দামদাম ইবন আমর আল-ঘিফারী। এই লোককেই আবু সুফিয়ান জরুরি সংবাদসহ পাঠিয়েছিল। সে আতিকার স্বপ্নের তিনদিন পর মক্কায় এসে পৌঁছায়। সে মক্কায় এসে উট থেকে নেমে উটের নাক কেটে ফেলে এবং লাগামটি নিচে নামিয়ে নিজের জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে চিৎকার করে লোকজনকে ডেকে বলতে লাগলো, 'হে কুরাইশ! কাফেলা! কাফেলা! মুহাম্মাদ ও তাঁর লোকেরা আবু সুফিয়ানের কাছে রক্ষিত তোমাদের সম্পদ দখল করার জন্য আসছে। আমার মনে হয় না তোমরা তা রক্ষা করতে পারবে। সাহায্য! সাহায্য!'

তার এই কর্মকাণ্ড দেখে মক্কার সবার তখন দিশেহারা অবস্থা। আল-আব্বাস বলেন, 'এ কথা শোনার পর সবাই ব্যক্তিগত আক্রোশের কথা ভুলে গেল।' তখন সবাই মনোযোগ পড়লো কাফেলা রক্ষার দিকে। কাফেলা রক্ষা করার জন্য কুরাইশের লোকেরা একত্রিত হয়ে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিতে লাগল।

টিকাঃ
৯৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মদীনার ঘটনাক্রম

📄 মদীনার ঘটনাক্রম


রাসূলুল্লাহর অভিযানের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করতে বসলেন। আবু বকর ও উমার তাদের মতামত দিলেন কিন্তু তাদের বক্তব্য শোনার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ তেমন আগ্রহী ছিলেন না। সাদ ইবন উবাদা বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ আপনি কি আমাদের মতামত জানতে চান?’ রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হ্যাঁ, জানতে চাই।’ এরপর সাদ ইবন উবাদা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, যদি আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাহলে আমরাও আপনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ব, আর আপনি যদি বারক উল-ঘামাদ পর্যন্ত যান তাহলে আমরাও সেদিকে যাব।”

একথা শুনে রাসূলুল্লাহ খুব খুশি হলেন। আনসাররা বাইয়াতের সময় রাসূলুল্লাহকে মদীনার অভ্যন্তরে নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তখন রাসূলুল্লাহ মদীনার বাইরে অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন তাই তিনি এ ব্যাপারে আনসারদের মতামত জানতে চাচ্ছিলেন। এ কারনেই তিনি আবু বকর ও উমারের কথা শোনার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। আনসাররা চাইলে বলতে পারতেন যে রাসূলুল্লাহর সাথে তাদের চুক্তি হয়েছিল শুধুমাত্র মদীনার অভ্যন্তরে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু তারা সেটা বলেননি, বরং তাঁরা উদগ্রীব ছিলেন রাসূলুল্লাহর জন্য যুদ্ধ করতে, হোক সেটা মদীনার ভিতরে বা বাইরে। রাসূলুল্লাহ সেটাই মনে মনে চাচ্ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ কাফেলার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। পথিমধ্যে তিনি কিছুসংখ্যক সাহাবাকে যুদ্ধ করার মতো বয়স না হওয়ার কারণে ফিরিয়ে দেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবন উমার ইবন খাত্তাব ও আল-বারাকে পাঠিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ শুধু তাদেরকেই সাথে নেন যারা জিহাদে যেতে প্রবলভাবে উৎসাহী ছিল। ইসলামের প্রথম যুগের এই যোদ্ধাদের একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তা হলো, তাঁরা আদর্শিকভাবে এতটাই অনুপ্রাণিত ছিলেন যে তাঁরা নিজ প্রেরণায় যুদ্ধে অংশ নিতে মুখিয়ে থাকতেন। অন্যদিকে, বর্তমান যুগের অধিকাংশ সেনাবাহিনীতে সৈন্যরা যুদ্ধ করে মূলত বিভিন্ন সেবা ও অর্থের আশায়। তারা যুদ্ধকে নিছক ‘চাকরি’ হিসেবে দেখে। সুযোগ পেলেই বা পরিস্থিতি একটু কঠিন হলেই তারা যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যায়।

টিকাঃ
৯৬. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ এবং সারিয়া, হাদীস ১০৩। কিছু বর্ণনায় এসেছে সাদ ইবন মুয়াযের নাম।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধের ঘনঘটা

📄 যুদ্ধের ঘনঘটা


রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ানের কাফেলা দখল করার জন্য বদর অভিমুখে যাচ্ছিলেন। আবু সুফিয়ান এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। সে নিজেই ওই স্থানে পায়চারি করে দেখছিল কোথায় কী আছে। সে বদরের কুয়াগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার লোকদের ডেকে জিজ্ঞেস করলো, 'আচ্ছা, কারা এই কুয়াগুলো থেকে পানি তুলেছে?' তাঁরা বললো যে, তারা দুইজন অপরিচিত লোককে দেখেছে। আবু সুফিয়ান উটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে করতে উটের বিষ্ঠা পেল। সে হাতে সেই বিষ্ঠা নিয়ে পিষে ফেললো। বিষ্ঠা দেখে সে বুঝতে পারল যে, সেগুলো খেজুরের বিষ্ঠা আর খেজুরগুলো মদীনার। তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মদীনা থেকে তার কাফেলার উপর নজরদারি চলছে। সে তৎক্ষণাৎ কাফেলার দিক পরিবর্তন করে উপকূলের দিকে প্রবল বেগে পালিয়ে গেল। ফলে সে মুসলিমদেরকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলো। সে মক্কার লোকদের চিঠি লিখে জানিয়ে দিল যে, কাফেলা এখন নিরাপদ, আর যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু আবু জাহেল তাতে রাজি হলো না। সে বললো, 'আল্লাহর কসম! বদরে পৌঁছানোর আগে আমরা ফিরে যাবো না।' তারা কাফেলা রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের বিরুদ্ধের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু কাফেলা নিরাপদ – এই খবর পাওয়ার পরও তারা যুদ্ধের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অটল থাকে। মুসলিমদের শেষ করে দেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

বদরে প্রতি বছর আরবরা মেলার আয়োজন করতো আর বেচাকেনা করতো। আবু জাহেল যেতে যেতে সবাইকে বলছিল, 'আমরা সেখানে যাব। তিন দিন ধরে উৎসব করবো, উট জবাই করব, মদ খাব আর গায়িকারা আমাদের জন্য গান বাজনা পরিবেশন করবে! বেদুইনরা আমাদের অভিযান ও উৎসব সম্পর্কে জানবে, তারা আমাদের সম্মান করবে। চলো আমরা এগিয়ে যাই।

টিকাঃ
৯৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৮।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুসলিমদের শুরা

📄 মুসলিমদের শুরা


কুরাইশদের যুদ্ধে বের হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তাদের কাফেলা ইতোমধ্যেই নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে যায়, কিন্তু তবু তারা নিজেদের ঔদ্ধত্য আর অহংকার প্রকাশের জন্য বের হয়েছিল। তারা তাদের শক্তি সামর্থ্য নিয়ে দম্ভ করছিল। রাসূল বুঝতে পারলেন যে, কাফেলাটি অন্যদিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু কুরাইশরা ব্যাপক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি ভেবেছিলেন তাদেরকে কাফেলার ৪০ জনের সাথে মোকাবেলা করতে হবে কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, ১০০০ জনের বিশাল বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ শূরা ডাকলেন আর সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন তাঁরা এ ব্যাপারে কে কী ভাবছেন। আবু বকর দাঁড়িয়ে কিছু কথা বললেন, উমারও একই কথা বললেন। এরপর দাঁড়ালেন মিকদাদ ইবন আসওয়াদ, তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল আপনাকে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন আপনি তার জন্য অগ্রসর হোন। বনী ইসরাঈল তাদের নবী মূসাকে বলেছিল, মূসা, তুমি তোমার রবকে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখান থেকে নড়ছি না। কিন্তু আমরা আপনাকে কখনোই এমন কথা বলব না। আমরা যুদ্ধ করবো আপনার সামনে থেকে, আপনার পেছন থেকে, আপনার ডানে দাঁড়িয়ে এবং আপনার বামে দাঁড়িয়ে। আপনি আপনার রবকে নিয়ে যুদ্ধে অগ্রসর হোন, আমরাও আপনার সাথে আছি।

একথা শুনে আল্লাহর রাসূলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। তিনি উৎসাহের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। মিকদাদের এই কথাগুলো ছিল সাহাবাদের জন্য প্রেরণা। কিন্তু সবাই এ যুদ্ধে অংশ নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ তাঁরা মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন কাফেলা আক্রমণ করতে, বিশাল বাহিনীর সাথে লড়বার জন্য নয়। তাদের এই মনের কথা তাঁরা গোপন রাখলেও, আল্লাহ তা কুরআনে প্রকাশ করে দেন। কুরআনে এই যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয় ইতিহাসগ্রন্থেও। কিন্তু পার্থক্য হলো এই যে, একজন ইতিহাসবেত্তা শুধু তা-ই লেখেন যা তিনি উপলব্ধি করছেন, বাইরে থেকে দেখছেন। কিন্তু কার মনে কী আছে তা তিনি জানেন না। কিন্তু আল্লাহ তা জানেন, তাই বদরের যুদ্ধের প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
“যেমন করে আপনাকে আপনার রব ঘর থেকে বের করেছেন ন্যায় ও সৎকাজের জন্য, অথচ ঈমানদারদের একটি দল (তাতে) সম্মত ছিল না।” (সূরা আনফাল, ৮:৫)

কিছু কিছু সাহাবী এই যুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা ছিলেন মু'মিন। তাঁরাই ছিলেন সে সময়ের সেরা মুসলিমদের একেকজন। যুদ্ধ স্বাভাবিকভাবেই একটি অপছন্দনীয় বিষয়। আর মুসলিম বাহিনী হিসাবে এটিই ছিল প্রথম।
"তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২: ২১৬)

আল্লাহ আযযা ওয়াজাল এরপর বলেন,
"তারা আপনার সাথে বিতর্ক করছে সত্য ও ন্যায় বিষয়ে, তা প্রকাশিত হওয়ার পর। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে। স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে দু'টি দলের মধ্য হতে একটি সম্বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ওটা তোমাদের করতলগত হবে। তোমরা এই আশা ছিল যেন নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তে এসে পড়ে। অথচ আল্লাহ চাচ্ছিলেন তাঁর 'কথা' দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফেরদের মূল কেটে দেবেন যাতে করে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দেন, যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আনফাল, ৮:৬-৮)

আল্লাহ মুসলিমদের মনের কথা জানিয়ে দিচ্ছেন, 'আর তোমরা চাইছিলে যে কণ্টকহীন, বাধা বিপত্তিহীন কাফেলাটি যেন তোমাদের ভাগে আসে'। অর্থাৎ, লোকেরা কাফেলা চেয়েছিল। সেটা আক্রমণ করা ছিল তুলনামূলক সহজ, সেটিতে মুহাজিরদের অর্থ ছিল। এটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা।

কিন্তু আল্লাহরও পরিকল্পনা ছিল, আর আল্লাহর পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হয়। মুসলিমরা চেয়েছিল নিছক কাফেলা আক্রমণ করে সম্পদ নিয়ে যেতে, তারা বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। কিন্তু আল্লাহ চাননি এই যুদ্ধ হোক নিছক মুহাজিরদের সম্পদ ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ, তিনি চেয়েছেন আরো বড় কিছু। তিনি চেয়েছেন এই যুদ্ধে হক ও বাতিলের আদর্শ মুখোমুখি হোক আর তিনি হক্ককে জয়ী করেন এবং মিথ্যাকে পরাজিত করেন। তিনি পরিস্থিতিকে এমনভাবে বদলে দেন যে, মুসলিমদের এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আর একারণে এই দিনকে বলা হয় ফুরক্বানের দিন বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন।

টিকাঃ
৯৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px