📄 সারিয়ায়ে নাখলা থেকে পাওয়া শিক্ষা
১) কাফিরদের একটি কৌশল হলো, তারা মুসলিমদের একটি ভুল খুঁজে বের করবে এবং ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে ব্যাপক হৈ-চৈ করবে। তারা সত্যকে অসম্পূর্ণ কিংবা বিকৃতভাবে তুলে ধরবে। মুসলিমদেরকে খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করবে। মুসলিমদের কাফেরদের এই ধরনের অভ্যাসের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, তাকে পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সঠিকভাবে পরিস্থিতি বিচার করতে হবে। ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারাহর উপরোক্ত আয়াতের (২: ২১৭-২১৮) মাধ্যমে সবার কাছে সারিয়ার পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
সুতরাং আজকের দিনে যদি মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে অথবা ইসলামকে সহিংসতার ধর্ম বলে অভিযুক্ত করা হয় তবে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, ইরাকে এক মিলিয়নের বেশি মানুষকে খুন করা হয়েছে, ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে অত্যাচারিত হচ্ছে। কাশ্মীর, চেচনিয়া, চীনের মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে অন্যায়-অত্যাচারের স্বীকার হয়েছে। মুসলিমদের অত্যাচারিত হওয়ার এই তালিকা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। যদি মুসলিমরা কোনো ভুল করে ফেলে, তাহলে ইতিহাস থেকে এই ব্যাপারগুলো তুলে আনতে হবে আর এতে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে মুসলিমরা যদি ভুল কিছু করেও থাকে, তবুও তা মুসলিমদের উপর কাফেরদের কৃত অন্যায়-অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
পুরো পরিস্থিতিকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে... মুসলিমদের মিডিয়া ধোঁকার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে, মিডিয়া সত্যের পক্ষে নেই। আল্লাহ তাআলার শত্রুরা মুসলিমদের পক্ষে নেই।
একজন মুসলিমকে এসব ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। যেকোনো কিছু শোনামাত্র বিশ্বাস করা উচিত নয়। কুরাইশরা সেদিন মুসলিমদের সাথে যা করেছিল, আজকে ইসলামের শত্রুরা ঠিক তা-ই করছে। তারা সেসব দাঈদের হত্যা করছে যারা সত্যিকারের ইসলাম প্রচার করছেন, অথবা তাদেরকে কারাবন্দী করছে কিংবা হত্যার হুমকি দিচ্ছে। সত্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেই মুসলিমদের নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে, মুসলিমদের রক্ত হয়ে পড়েছে মূল্যহীন। এ অবস্থায় মুসলিমদের দিকে কাফিরদের আঙুল তোলার কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না, বরং মুসলিমদেরই উচিত কাফেরদের কৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধের তালিকা তাদের দিকে ছুঁড়ে মারা।
২) মুসলিমদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা থাকা খুব জরুরি। নবীজি দুইজন মুসলিমকে ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দী কাফিরদের ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ থেকে বোঝা যায়, মুসলিমদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা কতটা জরুরি।
📄 অন্যান্য সারিয়া থেকে পাওয়া শিক্ষা
১) ছোট ছোট এইসব সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল চারিদিকে রাসূলুল্লাহ এবং মুসলিমদের উপস্থিতি জানান দেওয়া। রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় সারিয়া পাঠিয়ে সবাইকে একটি বার্তা পাঠিয়ে দিলেন যে, মুসলিমদের একটি সামরিক শক্তি আছে এবং তারা তা ব্যবহার করতে সক্ষম। সেই যুগে আরবে গোত্রভিত্তিক ব্যবস্থায় যদি কোনো গোত্র দুর্বল হতো তবে শক্তিশালী কোনো গোত্র সেই দুর্বলতার সুযোগ নিত। তাই আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে মুসলিমদের শক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সারিয়া প্রেরণ করতেন। তখন পর্যন্ত কুরাইশরা আরব গোত্রগুলোর মাঝে বেশ উঁচু অবস্থানে ছিল। তাদের আরবের প্রধান হিসেবে গণ্য করা হতো। তারা ছিল কাবার রক্ষক। তাই আরবের অন্যান্য গোত্রদের মাঝে তাদের প্রতি বিশেষ ধরনের সম্মান ছিল। রাসূলুল্লাহ এই ধারণাটিকে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন এই অঞ্চলে কুরাইশদের একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুসলিমরা আছে।
২) রাসূলুল্লাহ সব গোত্রের সাথে যুদ্ধে জড়াননি। কিছু গোত্রের সাথে তিনি সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন। রাসূলুল্লাহকে তখন মুশরিকদের সাথে সন্ধিচুক্তি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই সারিয়াগুলো সন্ধিচুক্তির পথ সুগম করে দেয়।
৩) সারিয়াগুলো প্রেরণ করা হতো মূলত অর্থনৈতিক কারণে। অধিকাংশ সারিয়া কুরাইশদের কাফেলা দখল করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ইসলামি ফিকহ অনুসারে, যখন মুসলিম রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধাবস্থায় থাকে, তখন শত্রুদের সম্পদ ও রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল হয়ে যায়। এসব সারিয়ার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ কুরাইশদের অর্থনীতিতে আঘাত করেন। এটি ছিল কুরাইশদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। বদর যুদ্ধের সূচনাই হয়েছিল আবু সুফিয়ানের অধীনস্থ একটি কাফেলা আক্রমণের মধ্য দিয়ে।
৪) এই অভিযানগুলো ছিল মুসলিমদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণস্বরূপ। তাঁরা এসব সারিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এসবের মাধ্যমে তাঁরা যুদ্ধের ময়দান পরিদর্শন, শত্রুপক্ষকে আচমকা আক্রমণে ছত্রভঙ্গ করা ইত্যাদি নানারকম সামরিক কায়দা-কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। একই সাথে তাঁরা আশেপাশের এলাকা ও গোত্রগুলোর শক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছিলেন। কুরাইশ ও মুসলিমদের এই বিরোধ চলাকালীন সময়ে যতগুলো সারিয়া প্রেরণ করা হয়েছে তার সবই করেছে মুসলিমরা। কুরাইশদের মধ্যে এই কৌশল প্রচলিত ছিল না, বলা যেতে পারে এটা পুরোপুরিই ইসলামি সমর সংস্কৃতির অংশ।
যদিও মদীনাতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু তবুও রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমরা মদীনাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন না। তাদের সংখ্যা কম ছিল। একরাতে রাসূলুল্লাহ কিছুতেই ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন কেউ যেন তাঁকে সারা রাত পাহারা দেয়। আ'ইশা এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন,
"আল্লাহর রাসূল এক রাতে বিছানায় শুয়ে বলছিলেন: মু'মিনদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে যে সারা রাত আমাকে পাহারা দেবে? আ'ইশা বললেন, 'আমরা অস্ত্রের আওয়াজ শুনতে পেলাম।' রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'কে তুমি?' তখন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি।' আ'ইশা বলেছেন, 'সেই রাতে রাসূলুল্লাহ এতটাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম।'" 94
ইবন হাজার এই হাদীসের ব্যাখ্যায় মন্তব্য করেছেন, নিরাপত্তার বিষয়ে মুসলিমদের উদাসীন বা অসতর্ক হওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ হুমকির আশংকা করছিলেন এবং তিনি এ ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন কেউ তাঁকে পাহারা দিক। এ থেকে বুঝা যায় যে, একজন মুসলিমের অসতর্ক হওয়া উচিত না। তিনি আরও বলেছেন যে, নেতা, কিংবা আলিমদের নিরাপত্তা দেওয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। তৃতীয় যে মন্তব্যটি তিনি করেছেন তা হলো, রাসূলুল্লাহ নিরাপত্তা চেয়েছেন এই কারণে যেন তাঁর উম্মাহ নিরাপত্তা ও সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে মনোযোগী হয়। এটা ছিল তাদের জন্য একটি শিক্ষা। তবে পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই নিজের হাতে নিয়েছিলেন, সে পর্যন্ত সাহাবীরা আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন।
"...আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন..." (সূরা মায়িদা, ৫:৬৭)
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা নবীজিকে বলে দিলেন যে, তাঁর কোনো পাহারাদারের দরকার নেই। আল্লাহ নিজেই তাঁর রাসূলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ বাইরে এসে সাদকে চলে যেতে বললেন।
টিকাঃ
৯৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ৬০।