📄 সামরিক অভিযানের শুরু: গাযওয়া ও সারিয়া
আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে জিহাদের অনুমতি পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ পাঠানো শুরু করলেন 'সারিয়া'। সীরাহর বইগুলোতে দু'ধরনের যুদ্ধের কথা এসেছে, একটি হলো সারিয়া ও অপরটি হলো গাযওয়া। বদর বা উহুদের যুদ্ধকে বলা হয় গাযওয়ায়ে বদর বা গাযওয়ায়ে উহুদ; অন্যদিকে আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে সামরিক অভিযানকে বলা হয়েছে সারিয়ায়ে আবু উবাইদাহ। পার্থক্য হলো, যেসব অভিযানে রাসূলুল্লাহ অংশগ্রহণ করেননি সেগুলোকে সারিয়া বলা হয় আর রাসূলুল্লাহ নিজে যেসব অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে বলা হয় গাযওয়া। গাযওয়া বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় সেসব যুদ্ধ যেগুলোতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে সেনাদল পাঠানো হয় আর সারিয়া বলতে বোঝানো হয় সেনা অভিযান (Military Raid)।
রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম যে গাযওয়ায় অংশ নিয়েছেন সেটি হলো গাযওয়াত উল আবওয়া। এই গাযওয়াতে কোনো যুদ্ধ হয়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাইদাহ ইবন হারিসের নেতৃত্বে সারিয়া পাঠান। এ দলে ৬০ জন মুহাজির ছিলেন। তাঁরা সবাই পায়ে হেঁটে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা রাতে হাঁটতেন আর দিনে লুকিয়ে থাকতেন। এ অভিযানে তীর ছোঁড়াছুড়ি হয়েছিল কিন্তু কেউ মারা যায়নি। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিমদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যিনি তীর ছুঁড়েছিলেন তিনি হলেন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস। তিনি বলেছেন, 'আমিই সেই জন যে আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তীর নিক্ষেপ করি।'
এরপর হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে আরেকটি সারিয়া পাঠানো হয়। এ অভিযানে ৩০ জন মুহাজিরকে পাঠানো হয়। এবার তাঁরা উটে চড়ে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা কুরাইশদের একটি কাফেলা আক্রমণ করার জন্য গিয়েছিলেন। এ কাফেলাতে কুরাইশদের প্রচুর সম্পদ ছিল এবং এর সাথে অনেক রক্ষক ছিল। শেষপর্যন্ত এ অভিযানেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কেননা সে এলাকায় এক গোত্রনেতার সাথে রাসূলুল্লাহ এবং কুরাইশদের চুক্তি ছিল। কোনো ধরনের মারামারি যাতে না হয় সে ব্যাপারে তিনি লক্ষ্য রেখেছিলেন। এ ঘটনার পর আবু জাহেল তার লোকদের কাছে গিয়ে সতর্ক করে বললো যে, মুহাম্মাদ 'ক্রুদ্ধ সিংহের' ন্যায় তাদের পেছনে লেগেছে, কেননা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবু জাহেল তার লোকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বললো যে, মুহাম্মাদ তাদের কাফেলা ও তাদের উপর আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করছে।
আরো একটি গাযওয়া সংঘটিত হয়েছিল যার নাম গাযওয়ায়ে বুয়াত। কুরাইশদের একটি কাফেলা দখল করার জন্য এই অভিযান পরিচালিত হয় কিন্তু কাফেলাটি পাওয়া যায়নি।
গাযওয়াত আল আশিরাতেও একটি কাফেলা আটক করার জন্য সেনাদল পাঠানো হয় কিন্তু সেটিও পাওয়া যায়নি। এরপরে ঘটে সারিয়ায়ে সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং গাযওয়ায়ে বদর উলা। হিজরতের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।
📄 সারিয়ায়ে নাখলা
ইসলামের ইতিহাসে এই সারিয়া বেশ তাৎপর্য বহন করে। এই সারিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন জাহশ। এই সারিয়াতে অল্পসংখ্যক সাহাবীকে তাঁর সাথে পাঠানো হয়, উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের একটি কাফেলা আক্রমণ করা। অভিযানের আগে রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবন জাহশের হাতে একটি চিঠি দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে দুইদিন পর চিঠিটি পড়ার নির্দেশ দিলেন।
রাসূলুল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবন জাহশ দুইদিন পরে চিঠিটি খুললেন। চিঠিতে রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন মক্কা ও তাইফের মধ্যবর্তী একটি জায়গায় যেতে। চিঠিতে আরো লেখা ছিল, অভিযানে প্রেরিত সাহাবীদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় যেতে চান তাঁরা যেন আবদুল্লাহ ইবন জাহশকে অনুসরণ করেন। অর্থাৎ এই সারিয়াতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল না, কেউ চাইলে অংশ না নেওয়ারও সুযোগ ছিল। সম্ভবত অভিযানটি বেশ বিপদজনক হওয়ায় এরূপ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশকে যে এলাকায় যেতে বলা হয়েছিল সেটি কাফেরদের ভূখণ্ডের কাছাকাছি ছিল। সেখানে একটি কুরাইশ কাফেলা পাওয়া যাবে, সেটি আক্রমণ করাই ছিল এই সারিয়ার উদ্দেশ্য। এর আগ পর্যন্ত যতগুলো সারিয়া পরিচালিত হয়েছে সেগুলো ছিল মদীনার কাছাকাছি, কিন্তু এবারের বিষয়টি ভিন্ন। মক্কা ও তাইফের মধ্যবর্তী এই জায়গাটি মদীনা থেকে বেশ দূরে হওয়ায় এ অভিযানটি বিপদজনক ছিল। আবদুল্লাহ ইবন জাহশ পত্রে যা লিখা ছিল তা দলের অন্যান্যদের জানিয়ে দিলেন এবং বললেন যে তিনি এই অভিযানে যাবেন এবং যার ইচ্ছা হয় তিনি যেন তাঁকে অনুসরণ করেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহশসহ দলের সবার জন্য এ অভিযানটি ঐচ্ছিক ছিল। দলের সবাই আবদুল্লাহ ইবন জাহশ এর সাথে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে কেউই দল থেকে বের হননি। তাদের এই অদম্য বাসনাই বলে দেয় তাঁরা দুনিয়ার জন্য যুদ্ধ করতেন না, বরং তাঁরা আল্লাহর জন্যই যুদ্ধ করতেন।
তাঁরা শেষ পর্যন্ত কুরাইশ কাফেলা খুঁজে পেলেন। কাফেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন একটা শক্তিশালী ছিল না, মাত্র চারজন লোক পাহারায় ছিল। তাঁরা কাফেলার খুব কাছাকাছি চলে আসলেন, তীরের সীমানার ভেতর কাফেলা চলে আসলো। কিন্তু তখন সাহাবারা একটি ব্যাপার নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। সেদিন ছিল রজব মাসের শেষ দিন আর চারটি পবিত্র আরবি মাসের একটি হলো রজব। আরবরা এই চারটি পবিত্র মাসে নিজেদেরকে যাবতীয় যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত রাখত। তাই তারা ভাবলেন, একদিন পরে আক্রমণ করলেই হয়, পবিত্র মাসে আর যুদ্ধ করতে হবে না। কিন্তু সমস্যা হলো তাঁরা যদি পরদিনের জন্য অপেক্ষা করেন তবে কাফেলা মক্কার পবিত্র সীমানার ভেতরে ঢুকে যাবে, পবিত্র সীমানার ভেতরেও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, হয় তাদেরকে পবিত্র মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে হবে, নতুবা মক্কার পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে হবে। অবশেষে তাঁরা সেদিনই অর্থাৎ রজব মাসে কাফেলা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের ছোঁড়া তীরের আঘাতে চারজন পাহারাদারের আলহাদরামি নামে একজন মারা গেল, আরেকজন পালিয়ে গেল আর বাকি দুইজনকে কারাবন্দী হিসেবে আটক করা হলো। পুরো কাফেলা মুসলিমদের হাতে চলে আসে। এরপর তাঁরা মদীনায় ফিরে এলেন। 92
এ ঘটনাটি সবার চায়ের কাপে ঝড় তুললো, সবার মুখে মুখে এই অভিযান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। কুরাইশরা এই সুযোগের হাতছাড়া করতে ভুল করলো না। তারা এই ঘটনাকে পুঁজি করে ব্যাপক হৈ-চৈ লাগিয়ে দিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালো। তারা খুব বড় করে এই কাহিনি প্রচার করতে লাগলো। তারা বলে বেড়ালো – মুহাম্মাদ আর তাঁর লোকেরা পবিত্র মাসের রীতি ভেঙেছে। তাঁরা পবিত্র মাসে রক্তপাত করেছে, আমাদের লোকদের বন্দী হিসেবে তুলে নিয়েছে। পবিত্র মাসে আমাদের সম্পদ চুরি করেছে, এই করেছে, সেই করেছে - এভাবে তারা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক শোরগোল তুললো। অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবীরা ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন, 'আমি তো তোমাদেরকে এই পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেইনি।' অন্যান্য মুসলিমরা তাদেরকে নিন্দা জানাতে লাগলেন- তোমরা এমন কাজ কীভাবে করলে? কার নির্দেশে করলে? 93
অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবীরা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। তাঁরা মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত বোধ করতে থাকলেন। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারটি কীভাবে বিচার করবেন তা নিয়ে তাঁরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ অভিযানে বন্দী ব্যক্তি ও কাফেলার কোনোকিছু গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে সারিয়ার সদস্যরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন, অথচ তাদের দখলকৃত কাফেলার সম্পদ কেউ গ্রহণ করছে না, বরং সবাই তাদের প্রতি নারাজ। অন্যদিকে কুরাইশরা এ ঘটনাটির সুযোগ নিচ্ছিল। এরপর সূরা বাকারাহর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়,
“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফিতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে”। (সূরা বাক্বারাহ, ২: ২১৭)
এই ঘটনার পর আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, 'সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করা কি ইসলামের বিধানে আছে?; আল্লাহ তাআলা এই প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিলেন, ;হ্যাঁ, আবদুল্লাহ ও তাঁর লোকেরা যে কাজ করেছেন অর্থাৎ পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা অনেক বড় পাপ।' কিন্তু এরপরেই আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে শিখিয়ে দিলেন কীভাবে এই সব ঘটনা সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হয়।
আল্লাহ তাআলা বললেন, এই সাহাবারা যা করেছেন তা ভীষণ গুনাহের কাজ কিন্তু এরপরই আল্লাহ তাআলা কুফফারদের দ্বারা সংঘটিত বড় বড় অপরাধগুলোর তালিকা তুলে ধরলেন।
প্রথমত, আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। কুরাইশের লোকেরা মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিত।
দ্বিতীয়ত, কুফরি করা, এটি হলো আরো একটি বড় গুনাহের কাজ যা কুরাইশের লোকেরা অনবরত করেই যাচ্ছিল।
তৃতীয়ত, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেওয়া। মুসলিমদেরকে তখন মক্কায় যেতে দেওয়া হতো না।
চতুর্থত, সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা- কুরাইশরা মুহাজিরদের মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল।
এই আয়াতটি সবাইকে পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে দেখতে শেখালো। আল্লাহ তাআলা বললেন, আবদুল্লাহ ইবন জাহশ যা করেছিলেন, তা ভুল ছিল, কিন্তু কুরাইশরা ১৩ বছর ধরে যা করে আসছে তা আরো অনেক গুণ বড় অপরাধ। আল্লাহ চাননি, কাফিরদের প্রচারণার প্রভাবে মুসলিমরা নিজেদের ভুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ুক আর কাফিরদের অপরাধগুলো ভুলে যাক।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ও তাঁর সঙ্গীরা যখন দেখলেন যে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের কৃতকর্মের উপর বেশি আলোকপাত করেছেন এবং এই ব্যাপারে সব কিছু পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন তখন তাঁরা স্বস্তি পেলেন। এখন তারা আশা করছেন স্বীকৃতির! এরপর আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারাহর নিচের আয়াতটি (২: ২১৮) অবতীর্ণ করেন:
"আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে লড়াই জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুণাময়।”
আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, যদিও আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ও তাঁর সঙ্গীরা ভুল করেছেন, তবুও তাঁরা আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করতেই পারেন। যেহেতু তাঁরা মুজাহিদ, কাজেই তাঁরা অবশ্যই জিহাদের পুরস্কারের আশা রাখবেন।
টিকাঃ
৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৯।
৯৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪১।
📄 সারিয়ায়ে নাখলা থেকে পাওয়া শিক্ষা
১) কাফিরদের একটি কৌশল হলো, তারা মুসলিমদের একটি ভুল খুঁজে বের করবে এবং ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে ব্যাপক হৈ-চৈ করবে। তারা সত্যকে অসম্পূর্ণ কিংবা বিকৃতভাবে তুলে ধরবে। মুসলিমদেরকে খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করবে। মুসলিমদের কাফেরদের এই ধরনের অভ্যাসের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, তাকে পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সঠিকভাবে পরিস্থিতি বিচার করতে হবে। ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারাহর উপরোক্ত আয়াতের (২: ২১৭-২১৮) মাধ্যমে সবার কাছে সারিয়ার পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
সুতরাং আজকের দিনে যদি মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে অথবা ইসলামকে সহিংসতার ধর্ম বলে অভিযুক্ত করা হয় তবে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, ইরাকে এক মিলিয়নের বেশি মানুষকে খুন করা হয়েছে, ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে অত্যাচারিত হচ্ছে। কাশ্মীর, চেচনিয়া, চীনের মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে অন্যায়-অত্যাচারের স্বীকার হয়েছে। মুসলিমদের অত্যাচারিত হওয়ার এই তালিকা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। যদি মুসলিমরা কোনো ভুল করে ফেলে, তাহলে ইতিহাস থেকে এই ব্যাপারগুলো তুলে আনতে হবে আর এতে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে মুসলিমরা যদি ভুল কিছু করেও থাকে, তবুও তা মুসলিমদের উপর কাফেরদের কৃত অন্যায়-অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
পুরো পরিস্থিতিকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে... মুসলিমদের মিডিয়া ধোঁকার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে, মিডিয়া সত্যের পক্ষে নেই। আল্লাহ তাআলার শত্রুরা মুসলিমদের পক্ষে নেই।
একজন মুসলিমকে এসব ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। যেকোনো কিছু শোনামাত্র বিশ্বাস করা উচিত নয়। কুরাইশরা সেদিন মুসলিমদের সাথে যা করেছিল, আজকে ইসলামের শত্রুরা ঠিক তা-ই করছে। তারা সেসব দাঈদের হত্যা করছে যারা সত্যিকারের ইসলাম প্রচার করছেন, অথবা তাদেরকে কারাবন্দী করছে কিংবা হত্যার হুমকি দিচ্ছে। সত্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেই মুসলিমদের নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে, মুসলিমদের রক্ত হয়ে পড়েছে মূল্যহীন। এ অবস্থায় মুসলিমদের দিকে কাফিরদের আঙুল তোলার কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না, বরং মুসলিমদেরই উচিত কাফেরদের কৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধের তালিকা তাদের দিকে ছুঁড়ে মারা।
২) মুসলিমদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা থাকা খুব জরুরি। নবীজি দুইজন মুসলিমকে ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দী কাফিরদের ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ থেকে বোঝা যায়, মুসলিমদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা কতটা জরুরি।
📄 অন্যান্য সারিয়া থেকে পাওয়া শিক্ষা
১) ছোট ছোট এইসব সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল চারিদিকে রাসূলুল্লাহ এবং মুসলিমদের উপস্থিতি জানান দেওয়া। রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় সারিয়া পাঠিয়ে সবাইকে একটি বার্তা পাঠিয়ে দিলেন যে, মুসলিমদের একটি সামরিক শক্তি আছে এবং তারা তা ব্যবহার করতে সক্ষম। সেই যুগে আরবে গোত্রভিত্তিক ব্যবস্থায় যদি কোনো গোত্র দুর্বল হতো তবে শক্তিশালী কোনো গোত্র সেই দুর্বলতার সুযোগ নিত। তাই আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে মুসলিমদের শক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সারিয়া প্রেরণ করতেন। তখন পর্যন্ত কুরাইশরা আরব গোত্রগুলোর মাঝে বেশ উঁচু অবস্থানে ছিল। তাদের আরবের প্রধান হিসেবে গণ্য করা হতো। তারা ছিল কাবার রক্ষক। তাই আরবের অন্যান্য গোত্রদের মাঝে তাদের প্রতি বিশেষ ধরনের সম্মান ছিল। রাসূলুল্লাহ এই ধারণাটিকে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন এই অঞ্চলে কুরাইশদের একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুসলিমরা আছে।
২) রাসূলুল্লাহ সব গোত্রের সাথে যুদ্ধে জড়াননি। কিছু গোত্রের সাথে তিনি সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন। রাসূলুল্লাহকে তখন মুশরিকদের সাথে সন্ধিচুক্তি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই সারিয়াগুলো সন্ধিচুক্তির পথ সুগম করে দেয়।
৩) সারিয়াগুলো প্রেরণ করা হতো মূলত অর্থনৈতিক কারণে। অধিকাংশ সারিয়া কুরাইশদের কাফেলা দখল করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ইসলামি ফিকহ অনুসারে, যখন মুসলিম রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধাবস্থায় থাকে, তখন শত্রুদের সম্পদ ও রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল হয়ে যায়। এসব সারিয়ার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ কুরাইশদের অর্থনীতিতে আঘাত করেন। এটি ছিল কুরাইশদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। বদর যুদ্ধের সূচনাই হয়েছিল আবু সুফিয়ানের অধীনস্থ একটি কাফেলা আক্রমণের মধ্য দিয়ে।
৪) এই অভিযানগুলো ছিল মুসলিমদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণস্বরূপ। তাঁরা এসব সারিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এসবের মাধ্যমে তাঁরা যুদ্ধের ময়দান পরিদর্শন, শত্রুপক্ষকে আচমকা আক্রমণে ছত্রভঙ্গ করা ইত্যাদি নানারকম সামরিক কায়দা-কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। একই সাথে তাঁরা আশেপাশের এলাকা ও গোত্রগুলোর শক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছিলেন। কুরাইশ ও মুসলিমদের এই বিরোধ চলাকালীন সময়ে যতগুলো সারিয়া প্রেরণ করা হয়েছে তার সবই করেছে মুসলিমরা। কুরাইশদের মধ্যে এই কৌশল প্রচলিত ছিল না, বলা যেতে পারে এটা পুরোপুরিই ইসলামি সমর সংস্কৃতির অংশ।
যদিও মদীনাতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু তবুও রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমরা মদীনাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন না। তাদের সংখ্যা কম ছিল। একরাতে রাসূলুল্লাহ কিছুতেই ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন কেউ যেন তাঁকে সারা রাত পাহারা দেয়। আ'ইশা এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন,
"আল্লাহর রাসূল এক রাতে বিছানায় শুয়ে বলছিলেন: মু'মিনদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে যে সারা রাত আমাকে পাহারা দেবে? আ'ইশা বললেন, 'আমরা অস্ত্রের আওয়াজ শুনতে পেলাম।' রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'কে তুমি?' তখন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি।' আ'ইশা বলেছেন, 'সেই রাতে রাসূলুল্লাহ এতটাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম।'" 94
ইবন হাজার এই হাদীসের ব্যাখ্যায় মন্তব্য করেছেন, নিরাপত্তার বিষয়ে মুসলিমদের উদাসীন বা অসতর্ক হওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ হুমকির আশংকা করছিলেন এবং তিনি এ ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন কেউ তাঁকে পাহারা দিক। এ থেকে বুঝা যায় যে, একজন মুসলিমের অসতর্ক হওয়া উচিত না। তিনি আরও বলেছেন যে, নেতা, কিংবা আলিমদের নিরাপত্তা দেওয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। তৃতীয় যে মন্তব্যটি তিনি করেছেন তা হলো, রাসূলুল্লাহ নিরাপত্তা চেয়েছেন এই কারণে যেন তাঁর উম্মাহ নিরাপত্তা ও সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে মনোযোগী হয়। এটা ছিল তাদের জন্য একটি শিক্ষা। তবে পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই নিজের হাতে নিয়েছিলেন, সে পর্যন্ত সাহাবীরা আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন।
"...আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন..." (সূরা মায়িদা, ৫:৬৭)
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা নবীজিকে বলে দিলেন যে, তাঁর কোনো পাহারাদারের দরকার নেই। আল্লাহ নিজেই তাঁর রাসূলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ বাইরে এসে সাদকে চলে যেতে বললেন।
টিকাঃ
৯৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ৬০।