📄 মুজাহিদ বাহিনী গঠন
মক্কায় যারা ঈমান এনেছিলেন তাদের উপর কাফেররা নানাভাবে অত্যাচার করতো তবুও তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখাটা আরবদের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না, কারণ তাদের গোত্রভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় যুদ্ধ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গোত্রের কেউ আক্রান্ত হলে কেউ ছেড়ে দিত না। তাই নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে সংযত রাখা মক্কার মুসলিমদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। এটা ছিল তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা। জিহাদের হুকুম আসার পর আবু বকর বললেন, 'আমি জানতাম জিহাদের হুকুম আসবে। একদিন না একদিন আমাদেরকে লড়তে হবেই। আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি তাতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ছাড়া উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।'
মদীনার প্রাথমিক দিনগুলোতে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলে যে হিজরতের আগেই এ ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু জিহাদের আসল প্রশিক্ষণ মদীনাতে শুরু হয়। আল্লাহ তাআলার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই প্রস্তুতি, আর তাই রাসূলুল্লাহ শুরু থেকেই মুসলিমদেরকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ ছিল শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকারের প্রশিক্ষণ। এটিই ছিল রাসূলুল্লাহর নেওয়া চতুর্থ প্রকল্প।
রাসূলুল্লাহ যে বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তাকে ঠিক প্রচলিত অর্থে সেনাবাহিনী বলা যায় না। কারণ তাঁরা পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। বরং তাদেরকে বলা চলে মিলিশিয়া বা বেসামরিক যোদ্ধা- তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল কিন্তু তাঁরা নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হতো। শর্তগুলো হলো:
১) ইসলাম ২) বয়ঃপ্রাপ্ত হতে হবে ৩) মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে ৪) এমন কোনো শারীরিক ত্রুটি না থাকা যা থাকলে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না। ৫) আর্থিক সামর্থ্য থাকা, এই ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ প্রত্যেক যোদ্ধার খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য রাসূলুল্লাহর ছিল না। প্রত্যেককে নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হতো।
একই সাথে রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনীকে আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন। কুরআনে জিহাদ বিষয়ক অসংখ্য আয়াত আছে যা একজন মুসলিমকে জিহাদের ময়দানের জন্য আত্মিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
"নিশ্চয় আল্লাহ মু'মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং যে সওদা তোমরা (আল্লাহর সাথে) করেছো, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহাসাফল্য।” (সূরা আত-তওবা, ৯: ১১১)
জিহাদের শিক্ষার সাথেই এসেছে ধৈর্যের শিক্ষা:
"তোমরা যদি আহত হয়ে থাক, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে। আর এ দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি। এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান। আর আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন না। আর এ কারণে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে পাক-সাফ করতে চান এবং কাফেরদেরকে ধবংস করে দিতে চান।
তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল। আর তোমরা তো মৃত্যু আসার আগেই মরণ কামনা করতে, কাজেই এখন তো তোমরা তা চোখের সামনে উপস্থিত দেখতে পাচ্ছ।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪০-১৪৩)
এই আয়াতগুলো হলো মুসলিমদের জন্য জিহাদের ব্যাপারে প্রস্তুতিমূলক ও উদ্বুদ্ধকারী আয়াত। এছাড়াও জিহাদের মর্যাদার ব্যাপারে এসেছে রাসূলুল্লাহর অসংখ্য হাদীস।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, আমাকে এমন কাজের কথা বলে দিন, যা জিহাদের সমতুল্য হয়। তিনি বলেন, এরকম কিছু নেই। এরপর তিনি বললেন, তুমি কি এতে সক্ষম হবে যে, মুজাহিদ যখন বেরিয়ে যায়, তখন থেকে তুমি মসজিদে প্রবেশ করবে এবং দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে থাকবে এবং এতটুকু আলস্য করবে না? আর সিয়াম পালন করতে থাকবে এবং সিয়াম ভাঙবে না। লোকটি বললো, তা কার সাধ্য? আবু হুরাইরা মন্তব্য করেন, 'মুজাহিদ তখনও নেকী পায় যখন তার ঘোড়া রশিতে বাঁধা অবস্থায় ঘোরাঘুরি করে। ' 86
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, একজন মুজাহিদের সওয়াব ক্রমাগত সালাত ও সিয়াম রাখার চেয়ে বেশি। কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করা নাফসের জিহাদ থেকে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, সালাত ও সাওম নাফসের জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। মুসলিমরা যখন তাবুকের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসলো তখন রাসূলুল্লাহ মুয়ায ইবন জাবালকে ডেকে বললেন,
"তুমি যদি জানতে চাও তবে আমি তোমাকে দ্বীনের মূলভিত্তি, স্তম্ভ আর চূড়া সম্পর্কে বলবো। ইসলাম হলো দ্বীনের ভিত্তি, এর স্তম্ভ হলো সালাত আর এর চূড়া হলো জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ।" 87
উমার ইবন উবাইদুল্লাহর আযাদকৃত দাস আবুন নাযার থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেন, আমি উমার ইবন উবাইদুল্লাহর লেখক ছিলাম। তিনি বলেন, আমার নিকট আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা একটি চিঠি লেখেন। তখন আমি হারুরিয়ার দিকে অভিযানে বের হয়েছিলাম। আমি চিঠিটি পড়লাম, তাতে লেখা ছিল,
কোনো এক সম্মুখসমরে আল্লাহর রাসূল সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি সাহাবীদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, শোনো, তোমরা শত্রুর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্খা কোরো না এবং আল্লাহ তাআলার কাছে নিরাপত্তার দুআ চাইবে। কিন্তু যদি তোমরা কখনো শত্রুর সম্মুখীন হও তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রেখো, তরবারীর ছায়াতলে জান্নাত। 88
যাইদ ইবন খালিদ আল-জুহানি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: 'যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ করে দিল, সেও জিহাদে অংশগ্রহণ করলো। আর যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধান করলো, সেও জিহাদে অংশ নিল। 89
একই সাথে রাসূলুল্লাহ সাহাবিদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সাহাবিরা শারীরিকভাবে শক্তসমর্থ ছিলেন, তাঁরা যে ধরনের কাজ করতেন তাতে তাদের যথেষ্ট শারীরিক দক্ষতা ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন ছিল। যেমন, মক্কা ও মদীনার আশেপাশে কোনো সমুদ্র ছিল না, তাই তাঁরা সাঁতার জানতেন না। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সাঁতার শেখার নির্দেশ দেন। তিনি তাদেরকে তীর চালনা, লক্ষ্যভেদ ইত্যাদি নানারকম সামরিক দক্ষতায় দক্ষ করে তুলছিলেন।
সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুক্রদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও – যাদেরকে তোমরা জান না, কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তোমাদের কোনো হক অপূর্ণ থাকবে না।” (সূরা আনফাল, ৮: ৬০)
উকবাহ ইবন আমির থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ মিম্বারে বসে সূরা আনফালের এই আয়াতটি পাঠ করে বললেন, আলা ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী, ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী, ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী! "শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী!” 90
এখানে রামী বলতে মূলত বোঝানো হচ্ছে নিক্ষেপ করা, তা হতে পারে তীর বা অন্য যেকোনো কিছু যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
উকবাহ ইবন আমীর এ বিষয়ে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, এটি লিপিবদ্ধ হয়েছে সুনান আবু দাউদে। তিনি বলেন,
'আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি: মহান আল্লাহ একটি তীরের কারণে তিনজন মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এক, তীর প্রস্তুতকারীকে, যে জিহাদের সৎ উদ্দেশ্যে তা তৈরি করেছে। দুই, তীর নিক্ষেপকারীকে এবং তিন, তীরের তৃণবাহীকে, যে প্রতিবার তীর নিক্ষেপকারীকে তীর নিক্ষেপের জন্য সহযোগিতা করেছে। কাজেই তোমরা তীর নিক্ষেপ করো এবং ঘোড়ায় চড়ো। তবে ঘোড়ায় আরোহণ করার চাইতে তীর নিক্ষেপই আমার কাছে বেশি প্রিয়। তিন প্রকারের বিনোদন ছাড়া আর কোনো প্রকারের বিনোদন অনুমোদিত নয়, সেগুলো হলো, এক, পুরুষের জন্য তার ঘোড়াকে কৌশলের প্রশিক্ষণ দান, দুই, নিজ স্ত্রীর সাথে আমোদ-প্রমোদ করা এবং তিন, তীর ধনুক চালনার প্রশিক্ষণ নেওয়া। যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, বিরাগভাজন হয়ে তার ব্যবহার ছেড়ে দেয়, সে যেন একটি উত্তম নি'আমত ত্যাগ করলো। সে নি' আমত ত্যাগ করলো এবং অকৃতজ্ঞ হলো। 91
এরকম আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে তিনটির বদলে চারটির কথা বলা হয়েছে এবং চতুর্থটি হলো নিজে সাঁতার শেখা এবং অন্যদেরকে তা শেখানো। সুতরাং এ চারটি জিনিস ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক উপকরণ সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।
সামরিক প্রশিক্ষণের উপর এই ব্যাপক গুরুত্ব দেখিয়ে দেয় মুসলিমরা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুরো সমাজের ব্যাপক সামরিকায়ন করা হয় এবং সমাজের মনোযোগ ও প্রচেষ্টার একটা বড় অংশকে সমরশক্তির পেছনে ব্যয় করা হয় যেন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে পারে। রাসূলুল্লাহর সময়ে এভাবেই মুসলিম সমাজ নিজেকে প্রস্তুত করছিল। নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ মুসলিমদেরকে তাদের জান-মাল-কথা দিয়ে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তৎকালীন অবস্থা মুসলিমদের অনুকূলে ছিল না। কুরাইশরা তাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার পরপরই কুরাইশরা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে চিঠি লিখে বলে,
'তুমি আশ্রয় দিয়েছ আমাদের সবচেয়ে ভয়ানক শত্রুকে। হয় তুমি তাকে হত্যা করবে, অথবা তাকে মদীনা থেকে বের করে দেবে। যদি তা না করো, তবে আমরা শপথ করছি, তোমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেব না। আমরা তোমাদের পুরুষদের হত্যা করবো এবং তোমাদের স্ত্রীদেরকে দাসী বানিয়ে ছাড়বো।'
এমন আরো একটি ঘটনা ঘটে যখন সাদ ইবন মুয়ায কাবা তাওয়াফ করার জন্য মক্কায় যান। তখন তিনি উমাইয়্যা ইবন খালাফের সাথে দেখা করেন। উমাইয়্যা ইবন খালাফের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব জাহেলিয়াতের সময় থেকেই। তিনি উমাইয়্যাকে কাবা তাওয়াফ করার জন্য সুবিধাজনক সময়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। যখন কাবায় লোকজন কম থাকবে তখন তিনি তাওয়াফ করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরা কিছুটা দেরিতে তাওয়াফ করলেন। কিন্তু আবু জাহেল তাদের দেখে ফেললো। তখন সে উমাইয়্যাকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার সাথে থাকা লোকটি কে?' উমাইয়্যা বললো, 'সে হলো সাদ ইবন মুয়ায।' সাদ ইবন মুয়ায বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মদীনায় যে দুইটি গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল এর মধ্যে একটি ছিল আল-আওস গোত্র। সাদ ইবন মুয়ায আল-আওস গোত্রের প্রধান ছিলেন। আবু জাহেল উমাইয়্যাকে বললো, 'তুমি তাকে কাবা তাওয়াফ করতে সাহায্য করে কাজটা ঠিক করোনি, কারণ তাঁর গোত্রের লোকেরাই মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছে।'
তখন সাদ ইবন মুয়ায আবু জাহেলকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, 'দেখো, তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ করতে বাধা দাও, তাহলে তোমাদের কাফেলাকেও আমি চলাচলে বাধা দেবো।' কুরাইশদের কাফেলাগুলোকে মদীনা হয়ে যেতে হতো, তাই সাদ তাকে কাফেলা আটকানোর হুমকি দেন। এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, কুরাইশরা অনবরত বিভিন্ন উপায়ে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতো। নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে এ জাতীয় হুমকি ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সামরিকীকরণের খুব প্রয়োজন ছিল।
টিকাঃ
৮৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৪।
৮৭. ইমাম নববীর ৪০ হাদীস, হাদীস ২৯।
৮৮. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৭৫।
৮৯. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ইমারাহ, হাদীস ১৯৮।
৯০. তিরমিযী, অধ্যায় রাসূলুল্লাহর তাফসীর, হাদীস ৩৩৬৩ (আরবি রেফারেন্স)।
৯১. আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৩৭।
📄 সামরিক অভিযানের শুরু: গাযওয়া ও সারিয়া
আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে জিহাদের অনুমতি পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ পাঠানো শুরু করলেন 'সারিয়া'। সীরাহর বইগুলোতে দু'ধরনের যুদ্ধের কথা এসেছে, একটি হলো সারিয়া ও অপরটি হলো গাযওয়া। বদর বা উহুদের যুদ্ধকে বলা হয় গাযওয়ায়ে বদর বা গাযওয়ায়ে উহুদ; অন্যদিকে আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে সামরিক অভিযানকে বলা হয়েছে সারিয়ায়ে আবু উবাইদাহ। পার্থক্য হলো, যেসব অভিযানে রাসূলুল্লাহ অংশগ্রহণ করেননি সেগুলোকে সারিয়া বলা হয় আর রাসূলুল্লাহ নিজে যেসব অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে বলা হয় গাযওয়া। গাযওয়া বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় সেসব যুদ্ধ যেগুলোতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে সেনাদল পাঠানো হয় আর সারিয়া বলতে বোঝানো হয় সেনা অভিযান (Military Raid)।
রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম যে গাযওয়ায় অংশ নিয়েছেন সেটি হলো গাযওয়াত উল আবওয়া। এই গাযওয়াতে কোনো যুদ্ধ হয়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাইদাহ ইবন হারিসের নেতৃত্বে সারিয়া পাঠান। এ দলে ৬০ জন মুহাজির ছিলেন। তাঁরা সবাই পায়ে হেঁটে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা রাতে হাঁটতেন আর দিনে লুকিয়ে থাকতেন। এ অভিযানে তীর ছোঁড়াছুড়ি হয়েছিল কিন্তু কেউ মারা যায়নি। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিমদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যিনি তীর ছুঁড়েছিলেন তিনি হলেন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস। তিনি বলেছেন, 'আমিই সেই জন যে আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তীর নিক্ষেপ করি।'
এরপর হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে আরেকটি সারিয়া পাঠানো হয়। এ অভিযানে ৩০ জন মুহাজিরকে পাঠানো হয়। এবার তাঁরা উটে চড়ে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা কুরাইশদের একটি কাফেলা আক্রমণ করার জন্য গিয়েছিলেন। এ কাফেলাতে কুরাইশদের প্রচুর সম্পদ ছিল এবং এর সাথে অনেক রক্ষক ছিল। শেষপর্যন্ত এ অভিযানেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কেননা সে এলাকায় এক গোত্রনেতার সাথে রাসূলুল্লাহ এবং কুরাইশদের চুক্তি ছিল। কোনো ধরনের মারামারি যাতে না হয় সে ব্যাপারে তিনি লক্ষ্য রেখেছিলেন। এ ঘটনার পর আবু জাহেল তার লোকদের কাছে গিয়ে সতর্ক করে বললো যে, মুহাম্মাদ 'ক্রুদ্ধ সিংহের' ন্যায় তাদের পেছনে লেগেছে, কেননা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবু জাহেল তার লোকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বললো যে, মুহাম্মাদ তাদের কাফেলা ও তাদের উপর আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করছে।
আরো একটি গাযওয়া সংঘটিত হয়েছিল যার নাম গাযওয়ায়ে বুয়াত। কুরাইশদের একটি কাফেলা দখল করার জন্য এই অভিযান পরিচালিত হয় কিন্তু কাফেলাটি পাওয়া যায়নি।
গাযওয়াত আল আশিরাতেও একটি কাফেলা আটক করার জন্য সেনাদল পাঠানো হয় কিন্তু সেটিও পাওয়া যায়নি। এরপরে ঘটে সারিয়ায়ে সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং গাযওয়ায়ে বদর উলা। হিজরতের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।
📄 সারিয়ায়ে নাখলা
ইসলামের ইতিহাসে এই সারিয়া বেশ তাৎপর্য বহন করে। এই সারিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন জাহশ। এই সারিয়াতে অল্পসংখ্যক সাহাবীকে তাঁর সাথে পাঠানো হয়, উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের একটি কাফেলা আক্রমণ করা। অভিযানের আগে রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবন জাহশের হাতে একটি চিঠি দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে দুইদিন পর চিঠিটি পড়ার নির্দেশ দিলেন।
রাসূলুল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবন জাহশ দুইদিন পরে চিঠিটি খুললেন। চিঠিতে রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন মক্কা ও তাইফের মধ্যবর্তী একটি জায়গায় যেতে। চিঠিতে আরো লেখা ছিল, অভিযানে প্রেরিত সাহাবীদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় যেতে চান তাঁরা যেন আবদুল্লাহ ইবন জাহশকে অনুসরণ করেন। অর্থাৎ এই সারিয়াতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল না, কেউ চাইলে অংশ না নেওয়ারও সুযোগ ছিল। সম্ভবত অভিযানটি বেশ বিপদজনক হওয়ায় এরূপ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশকে যে এলাকায় যেতে বলা হয়েছিল সেটি কাফেরদের ভূখণ্ডের কাছাকাছি ছিল। সেখানে একটি কুরাইশ কাফেলা পাওয়া যাবে, সেটি আক্রমণ করাই ছিল এই সারিয়ার উদ্দেশ্য। এর আগ পর্যন্ত যতগুলো সারিয়া পরিচালিত হয়েছে সেগুলো ছিল মদীনার কাছাকাছি, কিন্তু এবারের বিষয়টি ভিন্ন। মক্কা ও তাইফের মধ্যবর্তী এই জায়গাটি মদীনা থেকে বেশ দূরে হওয়ায় এ অভিযানটি বিপদজনক ছিল। আবদুল্লাহ ইবন জাহশ পত্রে যা লিখা ছিল তা দলের অন্যান্যদের জানিয়ে দিলেন এবং বললেন যে তিনি এই অভিযানে যাবেন এবং যার ইচ্ছা হয় তিনি যেন তাঁকে অনুসরণ করেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহশসহ দলের সবার জন্য এ অভিযানটি ঐচ্ছিক ছিল। দলের সবাই আবদুল্লাহ ইবন জাহশ এর সাথে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে কেউই দল থেকে বের হননি। তাদের এই অদম্য বাসনাই বলে দেয় তাঁরা দুনিয়ার জন্য যুদ্ধ করতেন না, বরং তাঁরা আল্লাহর জন্যই যুদ্ধ করতেন।
তাঁরা শেষ পর্যন্ত কুরাইশ কাফেলা খুঁজে পেলেন। কাফেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন একটা শক্তিশালী ছিল না, মাত্র চারজন লোক পাহারায় ছিল। তাঁরা কাফেলার খুব কাছাকাছি চলে আসলেন, তীরের সীমানার ভেতর কাফেলা চলে আসলো। কিন্তু তখন সাহাবারা একটি ব্যাপার নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। সেদিন ছিল রজব মাসের শেষ দিন আর চারটি পবিত্র আরবি মাসের একটি হলো রজব। আরবরা এই চারটি পবিত্র মাসে নিজেদেরকে যাবতীয় যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত রাখত। তাই তারা ভাবলেন, একদিন পরে আক্রমণ করলেই হয়, পবিত্র মাসে আর যুদ্ধ করতে হবে না। কিন্তু সমস্যা হলো তাঁরা যদি পরদিনের জন্য অপেক্ষা করেন তবে কাফেলা মক্কার পবিত্র সীমানার ভেতরে ঢুকে যাবে, পবিত্র সীমানার ভেতরেও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, হয় তাদেরকে পবিত্র মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে হবে, নতুবা মক্কার পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে হবে। অবশেষে তাঁরা সেদিনই অর্থাৎ রজব মাসে কাফেলা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের ছোঁড়া তীরের আঘাতে চারজন পাহারাদারের আলহাদরামি নামে একজন মারা গেল, আরেকজন পালিয়ে গেল আর বাকি দুইজনকে কারাবন্দী হিসেবে আটক করা হলো। পুরো কাফেলা মুসলিমদের হাতে চলে আসে। এরপর তাঁরা মদীনায় ফিরে এলেন। 92
এ ঘটনাটি সবার চায়ের কাপে ঝড় তুললো, সবার মুখে মুখে এই অভিযান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। কুরাইশরা এই সুযোগের হাতছাড়া করতে ভুল করলো না। তারা এই ঘটনাকে পুঁজি করে ব্যাপক হৈ-চৈ লাগিয়ে দিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালো। তারা খুব বড় করে এই কাহিনি প্রচার করতে লাগলো। তারা বলে বেড়ালো – মুহাম্মাদ আর তাঁর লোকেরা পবিত্র মাসের রীতি ভেঙেছে। তাঁরা পবিত্র মাসে রক্তপাত করেছে, আমাদের লোকদের বন্দী হিসেবে তুলে নিয়েছে। পবিত্র মাসে আমাদের সম্পদ চুরি করেছে, এই করেছে, সেই করেছে - এভাবে তারা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক শোরগোল তুললো। অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবীরা ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন, 'আমি তো তোমাদেরকে এই পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেইনি।' অন্যান্য মুসলিমরা তাদেরকে নিন্দা জানাতে লাগলেন- তোমরা এমন কাজ কীভাবে করলে? কার নির্দেশে করলে? 93
অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবীরা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। তাঁরা মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত বোধ করতে থাকলেন। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারটি কীভাবে বিচার করবেন তা নিয়ে তাঁরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ অভিযানে বন্দী ব্যক্তি ও কাফেলার কোনোকিছু গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে সারিয়ার সদস্যরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন, অথচ তাদের দখলকৃত কাফেলার সম্পদ কেউ গ্রহণ করছে না, বরং সবাই তাদের প্রতি নারাজ। অন্যদিকে কুরাইশরা এ ঘটনাটির সুযোগ নিচ্ছিল। এরপর সূরা বাকারাহর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়,
“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফিতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে”। (সূরা বাক্বারাহ, ২: ২১৭)
এই ঘটনার পর আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, 'সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করা কি ইসলামের বিধানে আছে?; আল্লাহ তাআলা এই প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিলেন, ;হ্যাঁ, আবদুল্লাহ ও তাঁর লোকেরা যে কাজ করেছেন অর্থাৎ পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা অনেক বড় পাপ।' কিন্তু এরপরেই আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে শিখিয়ে দিলেন কীভাবে এই সব ঘটনা সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হয়।
আল্লাহ তাআলা বললেন, এই সাহাবারা যা করেছেন তা ভীষণ গুনাহের কাজ কিন্তু এরপরই আল্লাহ তাআলা কুফফারদের দ্বারা সংঘটিত বড় বড় অপরাধগুলোর তালিকা তুলে ধরলেন।
প্রথমত, আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। কুরাইশের লোকেরা মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিত।
দ্বিতীয়ত, কুফরি করা, এটি হলো আরো একটি বড় গুনাহের কাজ যা কুরাইশের লোকেরা অনবরত করেই যাচ্ছিল।
তৃতীয়ত, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেওয়া। মুসলিমদেরকে তখন মক্কায় যেতে দেওয়া হতো না।
চতুর্থত, সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা- কুরাইশরা মুহাজিরদের মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল।
এই আয়াতটি সবাইকে পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে দেখতে শেখালো। আল্লাহ তাআলা বললেন, আবদুল্লাহ ইবন জাহশ যা করেছিলেন, তা ভুল ছিল, কিন্তু কুরাইশরা ১৩ বছর ধরে যা করে আসছে তা আরো অনেক গুণ বড় অপরাধ। আল্লাহ চাননি, কাফিরদের প্রচারণার প্রভাবে মুসলিমরা নিজেদের ভুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ুক আর কাফিরদের অপরাধগুলো ভুলে যাক।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ও তাঁর সঙ্গীরা যখন দেখলেন যে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের কৃতকর্মের উপর বেশি আলোকপাত করেছেন এবং এই ব্যাপারে সব কিছু পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন তখন তাঁরা স্বস্তি পেলেন। এখন তারা আশা করছেন স্বীকৃতির! এরপর আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারাহর নিচের আয়াতটি (২: ২১৮) অবতীর্ণ করেন:
"আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে লড়াই জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুণাময়।”
আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, যদিও আবদুল্লাহ ইবন জাহশ ও তাঁর সঙ্গীরা ভুল করেছেন, তবুও তাঁরা আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করতেই পারেন। যেহেতু তাঁরা মুজাহিদ, কাজেই তাঁরা অবশ্যই জিহাদের পুরস্কারের আশা রাখবেন।
টিকাঃ
৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৯।
৯৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪১।
📄 সারিয়ায়ে নাখলা থেকে পাওয়া শিক্ষা
১) কাফিরদের একটি কৌশল হলো, তারা মুসলিমদের একটি ভুল খুঁজে বের করবে এবং ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে ব্যাপক হৈ-চৈ করবে। তারা সত্যকে অসম্পূর্ণ কিংবা বিকৃতভাবে তুলে ধরবে। মুসলিমদেরকে খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করবে। মুসলিমদের কাফেরদের এই ধরনের অভ্যাসের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, তাকে পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সঠিকভাবে পরিস্থিতি বিচার করতে হবে। ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারাহর উপরোক্ত আয়াতের (২: ২১৭-২১৮) মাধ্যমে সবার কাছে সারিয়ার পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
সুতরাং আজকের দিনে যদি মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে অথবা ইসলামকে সহিংসতার ধর্ম বলে অভিযুক্ত করা হয় তবে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, ইরাকে এক মিলিয়নের বেশি মানুষকে খুন করা হয়েছে, ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে অত্যাচারিত হচ্ছে। কাশ্মীর, চেচনিয়া, চীনের মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে অন্যায়-অত্যাচারের স্বীকার হয়েছে। মুসলিমদের অত্যাচারিত হওয়ার এই তালিকা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। যদি মুসলিমরা কোনো ভুল করে ফেলে, তাহলে ইতিহাস থেকে এই ব্যাপারগুলো তুলে আনতে হবে আর এতে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে মুসলিমরা যদি ভুল কিছু করেও থাকে, তবুও তা মুসলিমদের উপর কাফেরদের কৃত অন্যায়-অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
পুরো পরিস্থিতিকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে... মুসলিমদের মিডিয়া ধোঁকার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে, মিডিয়া সত্যের পক্ষে নেই। আল্লাহ তাআলার শত্রুরা মুসলিমদের পক্ষে নেই।
একজন মুসলিমকে এসব ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। যেকোনো কিছু শোনামাত্র বিশ্বাস করা উচিত নয়। কুরাইশরা সেদিন মুসলিমদের সাথে যা করেছিল, আজকে ইসলামের শত্রুরা ঠিক তা-ই করছে। তারা সেসব দাঈদের হত্যা করছে যারা সত্যিকারের ইসলাম প্রচার করছেন, অথবা তাদেরকে কারাবন্দী করছে কিংবা হত্যার হুমকি দিচ্ছে। সত্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেই মুসলিমদের নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে, মুসলিমদের রক্ত হয়ে পড়েছে মূল্যহীন। এ অবস্থায় মুসলিমদের দিকে কাফিরদের আঙুল তোলার কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না, বরং মুসলিমদেরই উচিত কাফেরদের কৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধের তালিকা তাদের দিকে ছুঁড়ে মারা।
২) মুসলিমদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা থাকা খুব জরুরি। নবীজি দুইজন মুসলিমকে ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দী কাফিরদের ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ থেকে বোঝা যায়, মুসলিমদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা কতটা জরুরি।