📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 জিহাদের সূচনা

📄 জিহাদের সূচনা


মদানী যুগ মানেই জিহাদের যুগ। তাই রাসূলুল্লাহর সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ সম্পর্কে জানার আগে জিহাদ কী তা বোঝা জরুরি। মদানী যুগ ছিল ১০ বছর স্থায়ী আর এই অল্প সময়ে রাসূলুল্লাহ নিজে ১৯টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ৫৫টির বেশি সামরিক অভিযান পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ এই ১০ বছরের মধ্যে ৭০টিরও বেশি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, বছরে গড়ে ৭টি করে যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই ব্যাপক প্রস্তুতি, অর্থায়ন, অস্ত্রায়ণ এবং সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করা এই প্রতিটি কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়াও তখনকার প্রযুক্তিতে আকাশপথের ব্যবহার ছিল না তাই একেকটি অভিযান বা যুদ্ধস্থলে পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় করে পৌঁছাতে এবং সেখান থেকে ফিরে আসতে অনেক সময় লেগে যেতো। এর থেকে বোঝা যায় মদীনার যুগ ছিল কেবলই যুদ্ধের যুগ এবং এই যুদ্ধগুলোর পেছনে অনেক শ্রম, সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে রাসূলুল্লাহ কেন এসব যুদ্ধের পেছনে এত সময় ও শক্তি ব্যয় করলেন।

জিহাদ নিয়ে আলোচনা করা আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো বর্তমানে জিহাদের ব্যাপারে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জিহাদ কী, এর উদ্দেশ্য কী এবং এর পেছনের কারণ কী ইত্যাদি এসব ব্যাপারে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। রাসূলুল্লাহর জীবন দেখলে এই প্রতিটি প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন জবাব পাওয়া সম্ভব।

জিহাদ শব্দের আক্ষরিক অর্থ 'প্রচেষ্টা', এর মানে হলো 'সংগ্রাম বা চেষ্টা করা'। কিন্তু ইসলামে এ শব্দটি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। আরবিতে এমন কিছু শব্দ আছে যেগুলোর আভিধানিক অর্থ একরকম কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় শব্দগুলোর ভিন্ন অর্থ রয়েছে। যেমন: আরবি শব্দ 'সালাত' এর আভিধানিক অর্থ হলো 'দুআ'। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় সালাত বলতে দুআ বোঝায় না, বরং বিশেষ একটি ইবাদাত বোঝায় যা মুসলিমরা দৈনিক পাঁচবার আদায় করে থাকে। তেমনিভাবে যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা হলেও ইসলামি পরিভাষায় যাকাত হলো একটি বিশেষ ইবাদাত, বছরান্তে সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে দান করা। এভাবেই ইসলাম পুরনো শব্দকে নতুন অর্থে সংজ্ঞায়িত করে। তেমনি জিহাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ 'প্রচেষ্টা' হলেও যেকোনো প্রকার প্রচেষ্টাকে, এমনকি হোক তা ইসলামের পথে, তাকে জিহাদ বলে গণ্য করা হয় না। বরং সালাত বা যাকাতের মতো জিহাদ শব্দ দ্বারাও একটি বিশেষ ইবাদাতের কথা বোঝানো হয়। তাই ইসলামি পরিভাষায় শব্দটির অর্থ হলো যারা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণ করে অর্থাৎ যারা আল্লাহর শত্রু তাদের বিরুদ্ধে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করা। চারটি সুপ্রতিষ্ঠিত মাযহাবের সংজ্ঞা অনুযায়ী জিহাদ মানে হলো আল্লাহর পথে আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করা।

আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পথে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য সকল যুদ্ধ হলো অন্যায় ও অসত্যের পক্ষে যুদ্ধ। কাজেই ইসলামের দৃষ্টিতে সকল প্রকার রক্তপাত নিষিদ্ধ, শুধু ব্যতিক্রম হলো জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ। এর পক্ষে দলীল হলো,

"যারা ঈমান এনেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর রাস্তায়, আর যারা কুফরী করেছে তারা লড়াই করে তাগূতের পথে। সুতরাং তোমরা লড়াই কর শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল।” (সূরা নিসা, ৪: ৭৬)

এই আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সকল যুদ্ধকে দুইভাগে ভাগ করেছেন, একটি যুদ্ধ হলো আল্লাহর পথে ঈমানদারদের যুদ্ধ এবং অপরটি তাগুতের পক্ষে কাফিরদের যুদ্ধ। সংক্ষেপে তাগূত হলো সেই সত্তা বা উপাস্য যাকে আল্লাহর পাশাপাশি ইবাদাত করা হয় অথবা সেই সীমালঙ্ঘনকারী যে নিজেকে এমন আনুগত্য বা কর্তৃত্বের আসনে দাবি করেছে যা কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।

আল্লাহর রাস্তায় ঈমানদারদের যুদ্ধ একটি প্রশংসনীয় ইবাদাত। ইসলামের দৃষ্টিতে যে কোনো যুদ্ধের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর দ্বীনকে সুসংহত করা। এই কারণে জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধের বৈধতা ইসলামে নেই। ইসলামে জিহাদের একটাই উদ্দেশ্য, তা হলো শুধুমাত্র 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' - এর জন্য যুদ্ধ, একমাত্র এই যুদ্ধই হলো ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ।

আল্লাহ তাআলা হলেন খালিক, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, তাই বৈধতা ও অবৈধতাকে সংজ্ঞায়িত করার অধিকার একমাত্র তাঁর। যে কোনো আইনকে বৈধতা এবং অগ্রাধিকার দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। উদাহরণস্বরূপ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সপ্তাহের ৭টা দিনই সমান, কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়াজালের কাছে শুক্রবার সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর চেয়ে অধিক পছন্দনীয়। ভৌগলিক বা সৌর ক্যালেন্ডারের হিসেবে রামাদান মাসের সাথে অন্যান্য মাসের কোনো পার্থক্য নেই, কিন্তু আল্লাহ তাআলা অন্যান্য মাসের চেয়ে এই রামাদান মাসকে অধিক পছন্দনীয় মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। ঠিক একইভাবে তিনি জিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশদিনকে পছন্দ করেছেন, এ দশদিনের আমলগুলোর জন্য বিশেষ পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন। আবার রামাদানের শেষ দশ রাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এই শেষ দশ রাতের বিজোড় রাতগুলোর মধ্য থেকে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল লাইলাতুল কদর নির্ধারণ করেছেন যেটি বছরের শ্রেষ্ঠতম রাত। যেকোনো কিছুর পবিত্রতা ও যেকোনো কাজের বৈধতা প্রদানের মালিক কেবল আল্লাহ আযযা ওয়াজাল।

জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অন্য সব কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার দাসে পরিণত করা। সুতরাং সৃষ্টির দাস না হয়ে বরং মানুষ সৃষ্টিকর্তার দাস হবে- এটাই মানুষের জন্য সাজে, কেননা, মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা এবং সৃষ্টির সেরা হয়ে সে আরেক সৃষ্টির ইবাদাত করতে পারে না। জিহাদের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো মুসলিম-অমুসলিম সকলকে ইসলামের কল্যাণময় শাসনের ছায়াতলে নিয়ে আসা। ইসলামে কাউকে মুসলিম হওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় না, তবে ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে বাধ্য করা হয় যাতে করে মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য বুঝতে পারে এবং ইসলাম গ্রহণে উৎসাহী হয়।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন আল্লাহ সেইসব লোকদের দেখে অভিভূত হন যাদেরকে শেকলবদ্ধ করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। একজন আলিম এই কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন, এরা হলো সেসব লোক যাদেরকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এর ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে।

গড়পড়তা মানুষ দ্বীনের ব্যাপারে খুব একটা চিন্তিত নয়, হোক সে মুসলিম বা অমুসলিম। রাসূলুল্লাহ যখন মক্কাবাসীদের ডেকে বলেছিলেন, 'আমি এসেছি তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে' তখন আবু লাহাব রাসূলুল্লাহকে বলেছিল, 'ধ্বংস হোক তোমার হাত। এসব অনর্থক আলাপ করার জন্যই কি তুমি আমাদের ডেকেছ?'

আবু লাহাবের বিরক্তির কারণ হলো সে দুনিয়া কামানো বন্ধ করে এসেছিল এই ভেবে যে, রাসূলুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবেন। রাসূলুল্লাহর বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সত্যি, কিন্তু আবু লাহাবের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, কারণ সেখানে দুনিয়ার লাভের কোনো কথা নেই। তাই যখন আবু লাহাব দেখতে পেল যে, রাসূলুল্লাহ সবাইকে তাওহীদের পথে ডাকছেন তখন সে খুব রেগে গেল। ওই সময়ই আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মাসাদ (১১১: ১-৫) নাযিল করেন।

জিহাদ হলো এমন একটি পন্থা যা মানুষকে ইসলামকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। মাক্কী জীবনের ১৩ বছরের দাওয়াতী কার্যক্রমে খুব অল্প লোকই মুসলিম হয়েছিল, কিন্তু যখন সাহাবারা মদীনায় এসে জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ শুরু করলেন এবং লোকেরা ইসলামের ছায়ায় আসলো তখন তারা তাদের কথা গুরুত্বের সাথে নিতে বাধ্য হলো, কারণ তখন তাদের হাতে কর্তৃত্ব ছিল। তাঁরা শাসনক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দাওয়াত দিয়েছেন বিধায় এই দাওয়াহ অনেক কার্যকরী হয়েছিল। মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছিল।

যেখানে মক্কায় ১৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও রাসূলুল্লাহর সাথে মাত্র ১০০ জনের মতো সাহাবা ছিলেন, সেখানে মদীনাতে প্রতি বছর হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতো। মক্কা বিজয়ের সময় অংশ নিয়েছিল দশ হাজার মুসলিম, বিদায় হাজ্জে অংশ নিয়েছে নব্বই হাজার, আর যখন রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করলেন তখন জানাযা পড়েছিল ১ লক্ষ চৌদ্দ হাজার মুসলিম। এই পরিসংখ্যানটি দেখিয়ে দেয় জিহাদের মাধ্যমে ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকরী হলে কত দ্রুত ইসলাম মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

জিহাদের হুকুম নাযিল হয়েছে কয়েকটি ধাপে, ইবনুল কায়্যিম তাঁর যা'দ-উল-মাআদ গ্রন্থে বলেছেন প্রাথমিক যুগে জিহাদ নিষিদ্ধ ছিল, জিহাদ করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। রাসূলুল্লাহ তখন মুসলিমদের ধৈর্যধারণ করতে বলেছেন। এরপর তাদেরকে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয় তবে তা বাধ্যতামূলক ছিল না; নিছক অনুমতি দেওয়া হয়।

"যুদ্ধে অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।” (সূরা হাজ্জ্ব, ২২: ৩৯)

পরবর্তী পর্যায়ে ধাপে তাদেরকে আক্রমণকারী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়।

"আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা, ২: ১৯০)

অবশেষে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সীমালঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দিলেন। এরপর সর্বশেষ ধাপের নির্দেশ এল এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মাহর জন্য চূড়ান্ত বিধান প্রকাশ করলেন। এই ধাপে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহকে সমস্ত কাফিরদেরদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

"...আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ করে..." (সূরা তাওবাহ, ৯: ৩৬)

এ সম্পর্কিত একটি হাদীস রয়েছে যা ২০ জনেরও অধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলো,

ইবন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
'আমি আদিষ্ট হয়েছি মানুষের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই ও মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল, আর তারা সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়। তারা যদি এ কাজগুলো করে, তবে আমার পক্ষ থেকে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর ওপর ন্যস্ত।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 জিহাদের উদ্দেশ্য

📄 জিহাদের উদ্দেশ্য


আল্লাহ তাআলা কুরআনের কিছু আয়াতে জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন:

# ইসলামের প্রচার
আল্লাহ তাআলার দ্বীন বিজয়ী না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাওয়া।
“আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায়; এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়...” (সূরা আনফাল, ৮: ৩৯)

# ইবাদাতের স্থানসমূহ সুরক্ষিত রাখা
“আল্লাহ মু’মিনদের থেকে শত্রুদেরকে হটিয়ে দেবেন। আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে – যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধু এই অপরাধে যে, তারা বলে আমাদের রব আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে (খ্রিস্টানদের নির্জন গির্জা, ইবাদত খানা, (ইহুদিদের) উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ বিধ্বস্ত হয়ে যেতো, যেগুলাতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহর সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর।” (সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৮-৪০)

জিহাদ হলো মানুষের রক্ষাকবচ। যদি জিহাদের হুকুম না থাকতো, তাহলে মু’মিনরা ধ্বংস হয়ে যেতো, একে বলা হয় সুন্নাত-উল-মুদাফা'আহ। যদি না আল্লাহ তাআলা জিহাদের হুকুম জারি করতেন, তাহলে খ্রিস্টানদের গীর্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদগুলো ধ্বংস হয়ে যেতো। যে কারণে মসজিদের সাথে খ্রিস্টানদের গীর্জা ও ইহুদিদের উপাসনালয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার কারণ হলো, মুসলিমরা সর্বপ্রথম জিহাদ শুরু করেনি, বরং সর্বপ্রথম যাদের উপর জিহাদের হুকুম নাযিল হয়েছে তারা হলো বনী ইসরাইল, তারাই সর্বপ্রথম আল্লাহর পথে জিহাদে অংশ নিয়েছে। এ কারণে তাদের ইবাদাতখানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বনী ইসরাইলের আগের জাতিদেরকে জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়নি। সে সময়ে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন মু'জিযার মাধ্যমে নবীদের শত্রুদের ধ্বংস করে দিতেন, তাই তখন মু'মিনদের যুদ্ধে জড়ানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। সর্বপ্রথম জিহাদ করেছে মূসার উম্মাত।

"তারা এমন লোক - যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।” (সূরা হাজ্জ, ২২: ৪১)

# দুনিয়ার বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার উচ্ছেদ করা
জিহাদের উদ্দেশ্য অশান্তি সৃষ্টি করা নয় বরং অশান্তি এবং যাবতীয় অন্যায় ও জুলম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়াই জিহাদের উদ্দেশ্য। শয়তানের উদ্দেশ্য ভালো কাজকে মন্দ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং মন্দ কাজকে ভালো হিসেবে। জিহাদ একটি ইবাদাত এবং এই ইবাদাতকে অশান্তি বা ফিতনা ভাবার কোনো কারণ নেই, কেননা আল্লাহ তাআলাই বলছেন জিহাদের মাধ্যমে বস্তুত শান্তি প্রতিষ্ঠা পায়।

"... আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেতো। কিন্তু বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহ একান্তই দয়ালু, করুণাময়।” (সূরা বাকারাহ, ২: ২৫১)

# জিহাদ হলো মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা
"... আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান..." (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৪)

সুতরাং সশস্ত্র যুদ্ধ হলো মু'মিন ও কাফির উভয় পক্ষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। জিহাদের মাধ্যমে আল্লাহ মু'মিনদের ধৈর্য পরীক্ষা করেন। তিনি যাচাই করেন মু'মিনরা তাঁর রাহে কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। একজন মু'মিন আল্লাহ তাআলার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার হিসেবে নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করতে পারে, আর জিহাদের মাধ্যমেই প্রমাণ হয় বান্দা কাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে, আল্লাহকে নাকি তাঁর সৃষ্টিকে।

জিহাদ হলো এমন একটি আমল যার মাধ্যমে অন্তরের রোগ ধরা পড়ে। যেমন মুনাফিক্বরা মুসলিমদের সাথে বেশ ভালোভাবেই মিশে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের আসল চেহারা প্রকাশ পেত জিহাদের সময়, এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

"তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতি বছর তারা দুই-একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে..." (সূরা তাওবা, ৯: ১২৬)

রাসূলুল্লাহর ﷺ সময় প্রতিবছর প্রায় একটি অথবা দুইটি যুদ্ধ সংঘটিত হতো আর তখন মুনাফিকদের নিফাক প্রকাশ পেত।

"আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে - যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও - যাদেরকে তোমরা জান না, কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তোমাদের কোনো হক অপূর্ণ থাকবে না।” (সূরা আনফাল, ৮: ৬০)

"যুদ্ধ কর ওদের সাথে আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন, তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন - আর দূর করবেন তাদের মনের ক্ষোভ। আর আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবাহ, ৯: ১৪-১৫)

"সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর আপনি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করেননি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলেন, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ - যেন ঈমানদারদের প্রতি ইহসান করতে পারেন যথার্থভাবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিজ্ঞাত। আর এমনিভাবেই আল্লাহ নস্যাৎ করে দেবেন কাফেরদের সমস্ত কলা-কৌশল।” (সূরা আনফাল, ৮: ১৭-১৮)

# সত্য থেকে বাতিলকে পৃথক করে দেওয়া, মুনাফিকদের দ্বিমুখিতা প্রকাশ করে দেওয়া
"আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মু'মিনদেরকে (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছো যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন নাপাককে পাক থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে জানাবেন, তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো, আর যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে তোমাদের জন্য রয়েছে বিরাটা প্রতিদান।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৭৯)

এভাবেই জিহাদ ভালো থেকে খারাপকে আলাদা করে ফেলে। এ আয়াতসমূহ উহুদ যুদ্ধের পরে অবতীর্ণ হয় কারণ আবদুল্লাহ ইবন উবাই মাঝপথে এ অভিযান থেকে মূল বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে আলাদা হয়ে যায়।

# জিহাদ হলো আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার একটি কৌশল
"আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করতে থাকুন, আপনি নিজের সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের যিম্মাদার নন! আর আপনি মু'মিনদেরকে উৎসাহিত করতে থাকুন। শীঘ্রই আল্লাহ কাফেরদের শক্তি-সামর্থ খর্ব করে দেবেন। আর আল্লাহ শক্তি-সামর্থের দিক দিয়ে অত্যন্ত কঠোর এবং কঠিন শাস্তিদাতা।” (সূরা নিসা, ৪: ৮৪)

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুজাহিদ বাহিনী গঠন

📄 মুজাহিদ বাহিনী গঠন


মক্কায় যারা ঈমান এনেছিলেন তাদের উপর কাফেররা নানাভাবে অত্যাচার করতো তবুও তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখাটা আরবদের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না, কারণ তাদের গোত্রভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় যুদ্ধ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গোত্রের কেউ আক্রান্ত হলে কেউ ছেড়ে দিত না। তাই নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে সংযত রাখা মক্কার মুসলিমদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। এটা ছিল তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা। জিহাদের হুকুম আসার পর আবু বকর বললেন, 'আমি জানতাম জিহাদের হুকুম আসবে। একদিন না একদিন আমাদেরকে লড়তে হবেই। আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি তাতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ছাড়া উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।'

মদীনার প্রাথমিক দিনগুলোতে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলে যে হিজরতের আগেই এ ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু জিহাদের আসল প্রশিক্ষণ মদীনাতে শুরু হয়। আল্লাহ তাআলার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই প্রস্তুতি, আর তাই রাসূলুল্লাহ শুরু থেকেই মুসলিমদেরকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ ছিল শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকারের প্রশিক্ষণ। এটিই ছিল রাসূলুল্লাহর নেওয়া চতুর্থ প্রকল্প।

রাসূলুল্লাহ যে বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তাকে ঠিক প্রচলিত অর্থে সেনাবাহিনী বলা যায় না। কারণ তাঁরা পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। বরং তাদেরকে বলা চলে মিলিশিয়া বা বেসামরিক যোদ্ধা- তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল কিন্তু তাঁরা নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হতো। শর্তগুলো হলো:

১) ইসলাম ২) বয়ঃপ্রাপ্ত হতে হবে ৩) মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে ৪) এমন কোনো শারীরিক ত্রুটি না থাকা যা থাকলে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না। ৫) আর্থিক সামর্থ্য থাকা, এই ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ প্রত্যেক যোদ্ধার খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য রাসূলুল্লাহর ছিল না। প্রত্যেককে নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হতো।

একই সাথে রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনীকে আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন। কুরআনে জিহাদ বিষয়ক অসংখ্য আয়াত আছে যা একজন মুসলিমকে জিহাদের ময়দানের জন্য আত্মিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

"নিশ্চয় আল্লাহ মু'মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং যে সওদা তোমরা (আল্লাহর সাথে) করেছো, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহাসাফল্য।” (সূরা আত-তওবা, ৯: ১১১)

জিহাদের শিক্ষার সাথেই এসেছে ধৈর্যের শিক্ষা:

"তোমরা যদি আহত হয়ে থাক, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে। আর এ দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি। এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান। আর আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন না। আর এ কারণে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে পাক-সাফ করতে চান এবং কাফেরদেরকে ধবংস করে দিতে চান।

তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল। আর তোমরা তো মৃত্যু আসার আগেই মরণ কামনা করতে, কাজেই এখন তো তোমরা তা চোখের সামনে উপস্থিত দেখতে পাচ্ছ।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪০-১৪৩)

এই আয়াতগুলো হলো মুসলিমদের জন্য জিহাদের ব্যাপারে প্রস্তুতিমূলক ও উদ্বুদ্ধকারী আয়াত। এছাড়াও জিহাদের মর্যাদার ব্যাপারে এসেছে রাসূলুল্লাহর অসংখ্য হাদীস।

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, আমাকে এমন কাজের কথা বলে দিন, যা জিহাদের সমতুল্য হয়। তিনি বলেন, এরকম কিছু নেই। এরপর তিনি বললেন, তুমি কি এতে সক্ষম হবে যে, মুজাহিদ যখন বেরিয়ে যায়, তখন থেকে তুমি মসজিদে প্রবেশ করবে এবং দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে থাকবে এবং এতটুকু আলস্য করবে না? আর সিয়াম পালন করতে থাকবে এবং সিয়াম ভাঙবে না। লোকটি বললো, তা কার সাধ্য? আবু হুরাইরা মন্তব্য করেন, 'মুজাহিদ তখনও নেকী পায় যখন তার ঘোড়া রশিতে বাঁধা অবস্থায় ঘোরাঘুরি করে। ' 86

এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, একজন মুজাহিদের সওয়াব ক্রমাগত সালাত ও সিয়াম রাখার চেয়ে বেশি। কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করা নাফসের জিহাদ থেকে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, সালাত ও সাওম নাফসের জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। মুসলিমরা যখন তাবুকের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসলো তখন রাসূলুল্লাহ মুয়ায ইবন জাবালকে ডেকে বললেন,

"তুমি যদি জানতে চাও তবে আমি তোমাকে দ্বীনের মূলভিত্তি, স্তম্ভ আর চূড়া সম্পর্কে বলবো। ইসলাম হলো দ্বীনের ভিত্তি, এর স্তম্ভ হলো সালাত আর এর চূড়া হলো জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ।" 87

উমার ইবন উবাইদুল্লাহর আযাদকৃত দাস আবুন নাযার থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, আমি উমার ইবন উবাইদুল্লাহর লেখক ছিলাম। তিনি বলেন, আমার নিকট আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা একটি চিঠি লেখেন। তখন আমি হারুরিয়ার দিকে অভিযানে বের হয়েছিলাম। আমি চিঠিটি পড়লাম, তাতে লেখা ছিল,

কোনো এক সম্মুখসমরে আল্লাহর রাসূল সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি সাহাবীদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, শোনো, তোমরা শত্রুর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্খা কোরো না এবং আল্লাহ তাআলার কাছে নিরাপত্তার দুআ চাইবে। কিন্তু যদি তোমরা কখনো শত্রুর সম্মুখীন হও তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রেখো, তরবারীর ছায়াতলে জান্নাত। 88

যাইদ ইবন খালিদ আল-জুহানি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: 'যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ করে দিল, সেও জিহাদে অংশগ্রহণ করলো। আর যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধান করলো, সেও জিহাদে অংশ নিল। 89

একই সাথে রাসূলুল্লাহ সাহাবিদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সাহাবিরা শারীরিকভাবে শক্তসমর্থ ছিলেন, তাঁরা যে ধরনের কাজ করতেন তাতে তাদের যথেষ্ট শারীরিক দক্ষতা ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন ছিল। যেমন, মক্কা ও মদীনার আশেপাশে কোনো সমুদ্র ছিল না, তাই তাঁরা সাঁতার জানতেন না। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সাঁতার শেখার নির্দেশ দেন। তিনি তাদেরকে তীর চালনা, লক্ষ্যভেদ ইত্যাদি নানারকম সামরিক দক্ষতায় দক্ষ করে তুলছিলেন।

সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুক্রদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও – যাদেরকে তোমরা জান না, কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তোমাদের কোনো হক অপূর্ণ থাকবে না।” (সূরা আনফাল, ৮: ৬০)

উকবাহ ইবন আমির থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ মিম্বারে বসে সূরা আনফালের এই আয়াতটি পাঠ করে বললেন, আলা ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী, ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী, ইন্নাল কুওয়্যাতার রামী! "শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী!” 90

এখানে রামী বলতে মূলত বোঝানো হচ্ছে নিক্ষেপ করা, তা হতে পারে তীর বা অন্য যেকোনো কিছু যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

উকবাহ ইবন আমীর এ বিষয়ে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, এটি লিপিবদ্ধ হয়েছে সুনান আবু দাউদে। তিনি বলেন,

'আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি: মহান আল্লাহ একটি তীরের কারণে তিনজন মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এক, তীর প্রস্তুতকারীকে, যে জিহাদের সৎ উদ্দেশ্যে তা তৈরি করেছে। দুই, তীর নিক্ষেপকারীকে এবং তিন, তীরের তৃণবাহীকে, যে প্রতিবার তীর নিক্ষেপকারীকে তীর নিক্ষেপের জন্য সহযোগিতা করেছে। কাজেই তোমরা তীর নিক্ষেপ করো এবং ঘোড়ায় চড়ো। তবে ঘোড়ায় আরোহণ করার চাইতে তীর নিক্ষেপই আমার কাছে বেশি প্রিয়। তিন প্রকারের বিনোদন ছাড়া আর কোনো প্রকারের বিনোদন অনুমোদিত নয়, সেগুলো হলো, এক, পুরুষের জন্য তার ঘোড়াকে কৌশলের প্রশিক্ষণ দান, দুই, নিজ স্ত্রীর সাথে আমোদ-প্রমোদ করা এবং তিন, তীর ধনুক চালনার প্রশিক্ষণ নেওয়া। যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, বিরাগভাজন হয়ে তার ব্যবহার ছেড়ে দেয়, সে যেন একটি উত্তম নি'আমত ত্যাগ করলো। সে নি' আমত ত্যাগ করলো এবং অকৃতজ্ঞ হলো। 91

এরকম আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে তিনটির বদলে চারটির কথা বলা হয়েছে এবং চতুর্থটি হলো নিজে সাঁতার শেখা এবং অন্যদেরকে তা শেখানো। সুতরাং এ চারটি জিনিস ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক উপকরণ সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।

সামরিক প্রশিক্ষণের উপর এই ব্যাপক গুরুত্ব দেখিয়ে দেয় মুসলিমরা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুরো সমাজের ব্যাপক সামরিকায়ন করা হয় এবং সমাজের মনোযোগ ও প্রচেষ্টার একটা বড় অংশকে সমরশক্তির পেছনে ব্যয় করা হয় যেন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে পারে। রাসূলুল্লাহর সময়ে এভাবেই মুসলিম সমাজ নিজেকে প্রস্তুত করছিল। নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ মুসলিমদেরকে তাদের জান-মাল-কথা দিয়ে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তৎকালীন অবস্থা মুসলিমদের অনুকূলে ছিল না। কুরাইশরা তাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার পরপরই কুরাইশরা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাছে চিঠি লিখে বলে,

'তুমি আশ্রয় দিয়েছ আমাদের সবচেয়ে ভয়ানক শত্রুকে। হয় তুমি তাকে হত্যা করবে, অথবা তাকে মদীনা থেকে বের করে দেবে। যদি তা না করো, তবে আমরা শপথ করছি, তোমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেব না। আমরা তোমাদের পুরুষদের হত্যা করবো এবং তোমাদের স্ত্রীদেরকে দাসী বানিয়ে ছাড়বো।'

এমন আরো একটি ঘটনা ঘটে যখন সাদ ইবন মুয়ায কাবা তাওয়াফ করার জন্য মক্কায় যান। তখন তিনি উমাইয়্যা ইবন খালাফের সাথে দেখা করেন। উমাইয়্যা ইবন খালাফের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব জাহেলিয়াতের সময় থেকেই। তিনি উমাইয়্যাকে কাবা তাওয়াফ করার জন্য সুবিধাজনক সময়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। যখন কাবায় লোকজন কম থাকবে তখন তিনি তাওয়াফ করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরা কিছুটা দেরিতে তাওয়াফ করলেন। কিন্তু আবু জাহেল তাদের দেখে ফেললো। তখন সে উমাইয়্যাকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার সাথে থাকা লোকটি কে?' উমাইয়্যা বললো, 'সে হলো সাদ ইবন মুয়ায।' সাদ ইবন মুয়ায বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মদীনায় যে দুইটি গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল এর মধ্যে একটি ছিল আল-আওস গোত্র। সাদ ইবন মুয়ায আল-আওস গোত্রের প্রধান ছিলেন। আবু জাহেল উমাইয়্যাকে বললো, 'তুমি তাকে কাবা তাওয়াফ করতে সাহায্য করে কাজটা ঠিক করোনি, কারণ তাঁর গোত্রের লোকেরাই মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছে।'

তখন সাদ ইবন মুয়ায আবু জাহেলকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, 'দেখো, তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ করতে বাধা দাও, তাহলে তোমাদের কাফেলাকেও আমি চলাচলে বাধা দেবো।' কুরাইশদের কাফেলাগুলোকে মদীনা হয়ে যেতে হতো, তাই সাদ তাকে কাফেলা আটকানোর হুমকি দেন। এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, কুরাইশরা অনবরত বিভিন্ন উপায়ে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতো। নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে এ জাতীয় হুমকি ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সামরিকীকরণের খুব প্রয়োজন ছিল।

টিকাঃ
৮৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৪।
৮৭. ইমাম নববীর ৪০ হাদীস, হাদীস ২৯।
৮৮. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ১৭৫।
৮৯. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ইমারাহ, হাদীস ১৯৮।
৯০. তিরমিযী, অধ্যায় রাসূলুল্লাহর তাফসীর, হাদীস ৩৩৬৩ (আরবি রেফারেন্স)।
৯১. আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৩৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সামরিক অভিযানের শুরু: গাযওয়া ও সারিয়া

📄 সামরিক অভিযানের শুরু: গাযওয়া ও সারিয়া


আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে জিহাদের অনুমতি পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ পাঠানো শুরু করলেন 'সারিয়া'। সীরাহর বইগুলোতে দু'ধরনের যুদ্ধের কথা এসেছে, একটি হলো সারিয়া ও অপরটি হলো গাযওয়া। বদর বা উহুদের যুদ্ধকে বলা হয় গাযওয়ায়ে বদর বা গাযওয়ায়ে উহুদ; অন্যদিকে আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে সামরিক অভিযানকে বলা হয়েছে সারিয়ায়ে আবু উবাইদাহ। পার্থক্য হলো, যেসব অভিযানে রাসূলুল্লাহ অংশগ্রহণ করেননি সেগুলোকে সারিয়া বলা হয় আর রাসূলুল্লাহ নিজে যেসব অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে বলা হয় গাযওয়া। গাযওয়া বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় সেসব যুদ্ধ যেগুলোতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে সেনাদল পাঠানো হয় আর সারিয়া বলতে বোঝানো হয় সেনা অভিযান (Military Raid)।

রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম যে গাযওয়ায় অংশ নিয়েছেন সেটি হলো গাযওয়াত উল আবওয়া। এই গাযওয়াতে কোনো যুদ্ধ হয়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ উবাইদাহ ইবন হারিসের নেতৃত্বে সারিয়া পাঠান। এ দলে ৬০ জন মুহাজির ছিলেন। তাঁরা সবাই পায়ে হেঁটে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা রাতে হাঁটতেন আর দিনে লুকিয়ে থাকতেন। এ অভিযানে তীর ছোঁড়াছুড়ি হয়েছিল কিন্তু কেউ মারা যায়নি। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিমদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যিনি তীর ছুঁড়েছিলেন তিনি হলেন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস। তিনি বলেছেন, 'আমিই সেই জন যে আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তীর নিক্ষেপ করি।'

এরপর হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে আরেকটি সারিয়া পাঠানো হয়। এ অভিযানে ৩০ জন মুহাজিরকে পাঠানো হয়। এবার তাঁরা উটে চড়ে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা কুরাইশদের একটি কাফেলা আক্রমণ করার জন্য গিয়েছিলেন। এ কাফেলাতে কুরাইশদের প্রচুর সম্পদ ছিল এবং এর সাথে অনেক রক্ষক ছিল। শেষপর্যন্ত এ অভিযানেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কেননা সে এলাকায় এক গোত্রনেতার সাথে রাসূলুল্লাহ এবং কুরাইশদের চুক্তি ছিল। কোনো ধরনের মারামারি যাতে না হয় সে ব্যাপারে তিনি লক্ষ্য রেখেছিলেন। এ ঘটনার পর আবু জাহেল তার লোকদের কাছে গিয়ে সতর্ক করে বললো যে, মুহাম্মাদ 'ক্রুদ্ধ সিংহের' ন্যায় তাদের পেছনে লেগেছে, কেননা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবু জাহেল তার লোকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বললো যে, মুহাম্মাদ তাদের কাফেলা ও তাদের উপর আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করছে।

আরো একটি গাযওয়া সংঘটিত হয়েছিল যার নাম গাযওয়ায়ে বুয়াত। কুরাইশদের একটি কাফেলা দখল করার জন্য এই অভিযান পরিচালিত হয় কিন্তু কাফেলাটি পাওয়া যায়নি।

গাযওয়াত আল আশিরাতেও একটি কাফেলা আটক করার জন্য সেনাদল পাঠানো হয় কিন্তু সেটিও পাওয়া যায়নি। এরপরে ঘটে সারিয়ায়ে সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং গাযওয়ায়ে বদর উলা। হিজরতের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px